ভাদ্র ভাসান
আমার বই নিয়ে কিছু কথাঃ
ভাদ্র ভাসানঃ
স্বপ্নের হাত ধরে কৃষ্ণপক্ষের রাত্রির অন্ধকারে অনন্তের পথে ছুটে চলা স্মৃতিগুলো প্রত্যেক মানুষের জীবনে জোনাকীর মত জ্বলে আর নিভে। ‘আলোকিত অন্ধকারের জনপথ’--গল্পে একজন চিকিৎসকের মহানুভবতা, দায়িত্ব ও কর্তব্য প্রকাশ পেয়েছে--যা বাস্তবে বিরল। বাহিরে আলোকিত অথচ ভিতরে অন্ধকারাচ্ছন্ন মানুষগুলো কত নির্দয়! আবার নানা ছলে, বিশেষ করে ধর্মীয় ছলে বুঝাতে পারলে এই নির্দয় মানুষগুলোকেও আলোকিত না হোক, মানবিক স্রোতে আনা যায়। ‘বেদনাময় সময়ের ভীড়ে’--নায়কের মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী বিধ্বস্ত জীবনের গল্পঃ যুদ্ধ পরবর্তী রাষ্ট্রীয় ঘূর্ণিঝড়ে ছিন্ন পাতার মত হারিয়ে যাওয়া জীবনে হঠাৎ ক্ষণিকের জন্য ট্রেন নামক সময়ের ভেলায় তার হারিয়ে যাওয়া ভালোবাসার আল্পণার সাথে দেখা। ‘না বলা কথা’--না বলার আলো আঁধারীর মাঝেই হারিয়ে যায়। ‘সময়ের লাশ’--গল্পে বৃদ্ধ বয়সে উত্তম পুরুষের বাচন শৈলীতে নায়িকা নায়কের সাথে তার প্রেমের কাহিনী এবং ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পটভুমির কিয়দংশ বর্ণনা করেছেন। এখানে নায়ক ’৫২ সালের সময়ের ধারক, নায়িকা মাতৃভূমির ধারক অর্থাৎ গল্পটি যেন, ’৫২ এর সময়ের সাথে লাজুক মাতৃভূমির ভালোবাসা-লুকোচুরি-মিছিল-আন্দোলন-যুদ্ধ-মৃত্যুর খেলা।
‘স্বপ্নের আঙ্গিনা’--গল্পে ছেলে সন্তানের জন্য পুরুষের তথা সমাজের যে আকাঙ্খা--তা বাস্তবায়নের জন্য হাজার বছর ধরে কত নারী যে দুঃসহ জ্বালা-যন্ত্রণা নিয়ে জীবন-যাপন করেছে; কিংবা গর্ভাবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছে; আজও করছে--তার হিসাব মিলানো সম্ভব নয়। ‘ঝরা পাতার গান’--গল্পে নায়ক এমনি প্রকৃতি প্রেমিক যে, স্ত্রীর গর্ভকালীন সময়ের দায়িত্বের কথা ভুলে প্রকৃতিতে হারিয়ে যান, ফিরে এসে দেখেন, সন্তান রেখে স্ত্রী না ফেরার দেশে চলে গেছেন। সন্তানের মুখও নায়ককে প্রকৃতি থেকে ফেরাতে পারেনি। এ গল্পে নায়কের দৃষ্টিতে এবং তার আত্নোপলব্ধির কিয়দংশে বাংলার শীতকালীন প্রকৃতির রূপ ফুটে উঠেছে। ‘সিঁদুর রাঙা স্মৃতি’--গল্পে দেশে দেশে যুগে যুগে সংখ্যালঘুরা বিশেষ করে, ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা নিরাপত্তা ও ভবিষ্যতের কথা ভেবে পূর্ব পুরুষের ভিটা-মাটি, প্রেম-ভালোবাসা তথা হাজার স্মৃতি পেছনে ফেলে দেশ ত্যাগ করে--এ বিষয়টি গল্পে প্রকাশ পেয়েছে।
‘অনামিকা’ গল্পে কুড়িয়ে পাওয়া অনামিকা নামক এক নারী শিশুকে নিয়ে চিরকুমার পিতার হৃদয় বিদারক কাহিনীঃ অজানা এক রোগে অনামিকার মৃত্যু এবং জনস্বার্থে হাসপাতালে মৃত কন্যা দান--চিরকুমার পিতাসহ আরো অনেককে চোখের জলে ভাসিয়ে যায়। ‘সমর্পণ’--গল্পে পূজারিণী জাত-পাত, বর্ণ বিভেদ না বুঝেই নিজের অজান্তে স্বহৃদয় পূজার অর্ঘ হিসাবে পূজারীকে দান করে; ধ্যান করতে থাকে ব্রাক্ষণ বর পাবার আশায়। ‘শরতের সরোদ’ গল্পে নায়ক কবি মন নিয়ে ভরা যৌবনের জলতরঙ্গে শরতের কোন এক পড়ন্ত ভাদ্র বেলায় ভালোবাসার প্রবাসী সঙ্গীকে নিয়ে গ্রাম বাংলার রূপের সাগরে হারিয়ে যায়। প্রকৃতির মাঝে হারিয়ে যাওয়া প্রেম-ভালোবাসার বন্ধনে বাস্তবতার সূর্য জ্বলে উঠে; প্রবাসী সঙ্গী আবার চলে যায়। ‘শ্যাওলা-কাঁটা-বেড়া’--গল্পে সমাজের মানুষ সৃষ্ট বিধি-নিষেধ তোয়াক্কা না করে, আবেগ দিয়ে সময়ের উল্টোস্রোতে শত বাঁধা পেরিয়ে, নিজেদের স্বপ্ন পূরণের অভিলাশ নিয়ে, দুটি নিষ্পাপ জীবনের ভালোবাসা গন্তব্যহীন পথে অনন্ত যাত্রায় ছুটে চলেছে।
গ্রাম বাংলায় প্রচলিত মিথ আছে যে, ভাদ্র মাসে বিয়ে করতে নেই, ভাদ্র বেলায় দূরে যাত্রা করতে নেই; এ মাসকে অপয়া, অশুভ হিসাবে ধরা হয়। এখানে ভাদ্র শব্দে অশুভ-অপয়া-দুঃখ-কষ্ট-জ্বালা-যন্ত্রণার ছায়াপাত করা হয়েছে। অমানবিকতা, হিংসা, অপ্রাপ্তি-- নানাবিধ কষ্টের বিষয়গুলো এই ভাদ্র শব্দের ভেলায়, ভেলা ভাসানোর মত এবারের বই মেলায় ভাসিয়ে দেওয়া হল।
বইটি উৎসর্গ করা হয়েছে বাংলা সাহিত্যের শিকড় সন্ধানী মৌলিক গবেষক, সৃজনশীল সাহিত্যিক, নন্দিত সন্মোহক অধ্যাপক ড. সফিউদ্দিন আহমদকে।
ভাদ্র ভাসান এর গল্প সংখ্যা ১১টি, বইটির পৃস্ঠা সংখ্যা ৮০, জিনিয়াস পাবলিকেশন্স থেকে প্রকাশিত (বই মেলায় স্টল নং ৩৬০-৬১), নতুন বই এর প্রচ্ছদ এঁকেছেন রাজিব রায়, মূল্য ১২০ টাকা।





শুভকামনা।
বইটির অনেক অনেক সফলতা কামনা করছি
মন্তব্য করুন