ইউজার লগইন

ধারাবাহিক উপন্যাসঃ হৃদয়ের এপিঠ-ওপিঠ (পর্ব-4-12)

ধারাবাহিক উপন্যাসঃ হৃদয়ের এপিঠ-ওপিঠ (পর্ব-৪)
--শাশ্বত স্বপন
সিঁদুর কেন আমাকে কবিতা দিল? এডভান্স চিন্তা-ভাবনা করে কোন লাভ নেই। কোন ছেলেকে হয়তো সে ভালবাসে অথবা ভালবাসতে চায় এবং তাকে হয়তো কবিতাটা দেবে। আমাকে দিয়ে হয়তো রিহার্সাল করিয়ে নিচ্ছে। মাথাটা কেন জানি ঘুরছে। বিছানায় কিছুক্ষণ শুয়ে রইলাম। যন্ত্রণাটা কমতেই আবার স্মৃতিতে এলো সেই মেয়েটার ছবি। ভাবতে শুরু করেছি, কেন সে এমন হলো? তার নাম কি? কবে এমন হয়েছে?

এই পর্যন্ত যে কয়টা ভালবাসা এসেছে--তার মধ্যে একটা বাদে সব কয়টাই বেশ জমে উঠতেই ভেঙ্গে পড়ে। যখন জানতে পারে, মুক্তিযোদ্ধা বাবাকে ’৭৪-এ কে বা কারা হত্যা করেছে, তখন তারা আফসোস করে। যখন জানতে পারে, সম্পদ বলতে আমার তথা আমাদের কিছু নেই। তখন আমার প্রেমে বিভোর নায়িকারা পাশ কাটতে কাটতে এমন সব কাজ করে বসে, যা দেখে আমাকেই ঘৃণা করতে হয়। আই.এ. সেকেণ্ড ইয়ার-এ থাকাকালীন সময়ে ফাস্ট ইয়ার--এর এক ছাত্রীর সাথে বেশ জমে উঠেছিল। ওর নাম ফাহমিদা হালিম (বিথী)। ওকে আমার ভাল লাগার প্রথম কারণ, ওর আচার-আচরণ অনেকটা আল্পনার মত। দ্বিতীয় কারণ, সে নিজেই আমাকে অফার দিয়েছে এবং খুব একটা পাত্তা দেইনি বলে কলেজে আমার সাথে সারাক্ষণ জোঁকের মত লেগে থাকত। তখন আমার সার্টিফিকেট বয়স উনিশ হলেও আসল বয়স বাইশ বছর। আমি অনেকটা ইচ্ছে করেই আমার ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে তেমন কিছু ওকে বলিনি। সে আমাকে এতটাই ভালোবেসেছিল যে একদিন না দেখলে কেঁদে কেঁদে বাড়ি ফিরত। একবার, ক্রমাগত দশ দিন না পেয়ে এগার দিনের দিন তার দেহ সর্বস্ব দিয়ে আমাকে এমনভাবে উত্তেজিত করেছিল যে, ইচ্ছে করলে আমি তার সারা দেহ ভোগ করতে পারতাম। সে নিজেই তার পোষাক খুলে ফেলেছিল কিন্তু আমি পারিনি। আল্পনাকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে মুহূর্তের মধ্যে আমার বিবেক আমাকে আবেগ শূণ্য করে ফেলল। বীথি সেদিন অবাক হয়ে গেল আমার চূড়ান্ত মুহূর্তের অবস্থা দেখে। আমি
সেদিন বলেছিলাম, ‘বীথি, আমার হৃদয় বাসরে তোমাকে চিরস্থায়ীভাবে না শোয়ায়ে আমি তোমাকে...কখনও না। আমি তোমার মঙ্গল চাই। সমাজে তুমি কলঙ্কিত হও--আমি তা কখনও চাই না। এই মুহূর্তের স্বর্গীয় সুখ তোমার জীবনে বয়ে আনতে পারে নরকের জ্বালা।’ সেদিন সে প্রচণ্ড অবাক হয়ে গিয়েছিল। তারপর থেকে আরো প্রেম, আরো ভালবাসায় সে আমাকে নিমজ্জিত করে ফেলল। আমাকে সে সকল পুরুষ থেকে শ্রেষ্ঠ পুরুষদের দলের একজন ভাবতে লাগল।

অনেকদিন পর যখন বীথি জানতে পারল, আমরা দু’ভাই এবং দু’জনেই বাবার এক বন্ধু, ইকবাল চাচার বাড়িতে আশ্রিত তখন থেকেই সে কেটে পড়তে শুরু করল। আমিও বুঝতে পারছি। ভালবাসা করতে সার্টিফিকেট, জমি, টাকা, ঘর ইত্যাদি লাগে না। লাগে সময়, হৃদয় আর দেহ। কিন্তু বিয়ে করতে হলে ঘর লাগে, টাকা লাগে, হাড়ি-পাতিল, জগ-গ্লাস--সব লাগে। বিয়ে করা যে আমাকে উচিত নয়--সে কথা ভেবেই হয়তো সে কেটে পড়তে চাইছে। বীথিকে আমি মন-প্রাণ দিয়ে ভালোবাসতে কখনও পারিনি। তাকে দেখেছি আমার আল্পনার বিকল্প রূপে। এক আল্পনা ছাড়া দ্বিতীয় কাউকে মনপ্রাণ দিয়ে ভালবেসেছিলাম কিনা সন্দেহ। যে হৃদয় আসনে চিরস্থায়ী দলিলপত্র দিয়ে আল্পনাকে বসায়েছি, সেখানে কি অন্য কাউকে বসানো যায়। একই জমি দু’বার দু’জনের কাছে বিক্রি করা যায় না।

আরেক দিন, আমার টেস্ট পরীক্ষার ঠিক আগে, বীথি আমার পা ধরে কেঁদে কেঁদে বলল--“হয় তুমি আমাকে বিয়ে কর, নয় আমি আত্মহত্যা করব। বাবা-মা আমাকে অন্য এক ছেলের সাথে খুব শীঘ্রই বিয়ে দিতে চায়।” তার সাথে কথা হয়েছিল, দু’জনে পড়ব। আমি বি.এ পাস করে ছোট-খাট একটা চাকুরি নিয়ে তাকে বিয়ে করব। অথচ সে সেকেণ্ড ইয়ার-এ উঠেই বিয়ের ভান শুরু করল। আমি তাকে অনেক বুঝলাম। আমার সাথে আরো চার-পাঁচ জন বন্ধু ছিল। ওকে বুঝাতে বুঝাতে একটা কাজী অফিসের সামনে এসেছি। সে আমাকে দোষারোপ করতে শুরু করল। আমাকে কাপুরুষ, ছোটলোক ইত্যাদি গালি-গালাজ করতে লাগল। আমি সহ্য করতে না পেরে রাগে, ক্ষোভে কাজী অফিসে ওকে নিয়ে জোর করে ঢুকলাম। কাজী তখন ছিল না। বন্ধুদের বললাম কাজী ডাকতে। এখন শুরু হল উল্টো কান্না। বলতে শুরু করল, তার বাবা আমাকে ও তাকে খুন করে ফেলবে। তার মামারা খুব রাগী। সে কথা দিল আগামীকাল জামা-কাপড় নিয়ে তাদের বাড়ি ছেড়ে চলে আসবে। আমার বন্ধুরা বিশ্বাস করলেও, আমি করিনি। তারপর দিন সেতো আসেইনি, আত্মহত্যার কোন খবরও শুনিনি। শুনেছি এক ডাক্তার ছেলের সাথে তার বিয়ে হয়ে গেছে। ছেলেটির সাথে তার অনেক আগে থেকেই প্রেম ছিল। ছেলেটি তার খালাত ভাই। সুন্দরী মেয়ে। খালাত ভাই বিয়ে তো করবেই। আমার চিন্তা ছিল একটাই, সে কি আমাকে ভালবাসত নাকি খালাত ভাইকে, নাকি দু’জনকেই? আজকাল ছেলে মেয়েরা একজনের উপর পুরোপুরি নির্ভর করতে পারে না। কারণ প্রেমের দুর্ঘটনা নাইনটি পার্সেন্ট। তাই একেক জন কমপক্ষে পাঁচজনের সাথে হট কালেকশন রাকে। কিন্তু আমি তো একজনকে হারিয়ে আরেক জনের মাঝে আল্পনাকে খুঁজি। অন্য কাউকে কেন ভালবাসতে পারি না? আমি জানি, যদি আমি কাউকে বিয়ে করি, সে হবে আমার ওয়াইফ, শুধুই ওয়াইফ। ভালবাসার মানুষ পড়ে থাকবে ঐ দিগন্তে--যাকে মনে হবে, পাব কিন্তু বাস্তবে তা দুঃস্বপ্নের বালু তীরেই রয়ে যাবে।

ডিগ্রী কোর্সে ভর্তি হবার পর লেখক, কবি, গীতিকার, সুরকার, গায়ক নানা উপাধীতে আমাকে ডাকা হত, কেউ কেউ ব্যাঙ্গও করত। আই,এ দ্বিতীয় বর্ষ থেকে সংস্কৃতি চর্চা করলেও ডিগ্রী কোর্সে ভর্তি হবার পর থেকে আমার মেধা পরিচিতি কলেজ গন্ডি পেরিয়ে জেলা সদর পর্যন্ত পৌঁছে যায়। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে, নানান সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে আমাকে গান, কবিতা--কিছু না কিছু পারফর্ম করতে হত। ২৬ শে মার্চ, ১৬ ই ডিসেম্বর বা কোন গুরুত্বপূর্ণ সময়ে আমার নেতৃত্বে নাটকও মঞ্চত্ব হত। ধান ভানতে শিবের গীত গাইতে শুরু করেছি। যাই হোক, প্রায় এক বছর পর কলেজের এক অনুষ্ঠানে বীথি তার স্বামীকে নিয়ে এসেছিল। পরিচিত এক ছোট ভাইয়ের কাছ থেকে শুনলাম, সে নাকি আবার ভর্তি হয়েছে। আমাকে সে দেখে এমন ভান করল, যেন, সে আমাকে চিনেই না। বেশ মোটা হয়ে গেছে। এই এক বছরে তার বয়স যেন পাঁচ বছর বেড়ে গেছে। বন্ধুদের অনুরোধে আমার নিজের লেখা গানটা গাইলাম। যে গানটা জেল থেকে ফিরে আল্পনাকে শুনিয়েছিলাম। কিন্তু কথা আর হয়নি। সে চিরতরে কোলকাতা চলে গেছে। গান গাইতে শুরু করলাম--
“শুনেছি তোমার জীবন নাকি আলোয় ভরা
আমারও তো হৃদয় ছিল,
হৃদয় জুড়ে প্রেম ছিল,
সবি তো তুষের আগুনে জ্বালিয়েছি।
একদিন আমার সব ছিল
গান ছিল, সুর ছিল, প্রেমও ছিল
আজ কিছু আর নেই, কিছু আর নেই
সবিতো জ্বালিয়েছি, সবিতো হারিয়েছি...।”
বন্ধুরা সব অবাক। কারো মনেই হল না, এই সেই মেয়ে! তার সামান্য পরিবর্তন নেই। স্বামীর পাশে কত সুখেই সে বসে আছে। কলেজের স্যারেরা ওর আর আমার ব্যাপারে অনেক কিছু জানত। গানটা গাওয়া উচিত হয়নি। সে আমি নিজেই বুঝেছি। তবুও গাইলাম। আমার চোখে জল এসে গেছে। এ জল আসা শুধু ওর জন্য নয়। বাবা-মা, আল্পনা--সবকিছু আমাকে...।

ধারাবাহিক উপন্যাসঃ হৃদয়ের এপিঠ-ওপিঠ (পর্ব-৫)

ফেলে আসা জীবন নদীর নানা বাঁক নিয়ে ভাবতে ভাবতে কখন যে রাত হয়ে গেছে খেয়ালও করিনি। ঘড়িতে চেয়ে দেখি বারটা। বিছানা থেকে জেগে উঠলাম। সেলিমের টেপ রেকর্ডার চালু করতে ইচ্ছা হল। সন্ধ্যায় টিউশনিতে যাওয়া হয়নি। সিঁদুর তার কবিতার গুণ গান শুনার জন্য নিশ্চয় অপেক্ষা করছিল। ক্যাসেট বের করে অন্য ক্যাসেট দিলাম। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কবিতা পড়তে শুরু করলাম--‘কেউ কথা রাখেনি...।’ এভাবে রাত গড়াতে লাগল। প্রায়ই আমার ঘুম হয় না। জীবনে কত স্মৃতি আছে। সেগুলো তেমন একটা মনে পড়ে না। মা-বাবাকে মনে পড়লে দুঃখ লাগে না অথচ আল্পনা...। হায়রে হৃদয়, প্রেমিকা তোমার কাছে মা-বাবার চেয়ে বড়। হৃদয়ের সাথে কথা বলে কোন লাভ হয় না। সে ঈশ্বরের মত, কথা বলে না। মাঝে মাঝে আমার মুখ দিয়ে তত্ত্ব কথা বের করে। “নীল আকাশ সে তো কাছেই আছে। আমার মন বলে, ইচ্ছে করলে আমি ছুঁতে পারব। এইটুকু সান্ত্বনাই থাক। মিছিমিছি বিড়ম্বনা বাড়িয়ে কি লাভ...।” অথচ এ হৃদয় আবার কেঁদেও মরে। সেও মেনে নিতে চায় না--মেনে নিতে পারে না। সে খুব বেশি বুঝে অথচ ভালোবাসার ক্ষেত্রে অবুঝ শিশু। সে ক্ষণে প্রেমিক, ক্ষণে মানসিক রোগী, ক্ষণে হিংস্র, ক্ষণে পাগল, ক্ষণে বুদ্ধিমান--বড় জঘন্য আমার এ হৃদয়!

পর দিন বিকাল বেলা। রুমে বসে সেই মেয়েটার কথা ভাবতে লাগলাম। কি চাকুরি ওখানে পাওয়া যাবে? যে চাকুরিই হোক, অন্তত: কয়েকটা মাস করা লাগবে। অগ্রীম দুই হাজার টাকা চাইতে হবে। মুরাদকে এক হাজার টাকা দেওয়া লাগবে। প্রেম-টেম নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করলে চলবে না। এ নিয়ে আমি আর ভাবতে চাই না। এ বিষয়ে নিশ্চিত, এই বেকার সময়ে কোন সুস্থ মেয়ে আমার সাথে প্রেম করতে আসবে না। যদি বা আসে--যখন জানবে, মাই পকেট এম্টি, সি গোজ এওয়ে। অতএব, লাভ ইজ ফলস্ অফ মাইন। আমি এখন চাকুরি চাই। চাই বড় হতে--বড় লোক হতে। সবাই চায়--আমিও চাই। আজ বাবা বেঁচে থাকলে, সুস্থভাবে জীবন-যাপন করলে, সুবিধাবাদী রাজনীতি করলে--আমাদের অবস্থান নিশ্চয়ই অনেক উপরে থাকত। এলাকার কোন কোন বাড়িতে খাবার গুদামজাত করে রাখা হত, পরে বেশি দামে বিক্রি করা হত। অথচ অসংখ্য মানুষ না খেয়ে মরে গেলেও গুদামজাত খাদ্যের মালিকরা ফিরে তাকাত না। ভাবত মরুক, হাহাকার বাড়লেই মালের দাম বাড়বে। মায়ের কাছে শুনেছি, বাবা ডাকাতি করে যা কিছু আনতেন--তার সবি দরিদ্রদের মাঝে বিলিয়ে দিতেন। বাবার কথা অনুযায়ী, ডাকাতিটা ন্যায় সঙ্গত হলেও মা-দাদী কিছুতেই মেনে নিত না। কিন্তু সে মা-দাদীকে এমন সব দেশপ্রেম, সমাজতন্ত্রের কথা বলত--যা শুনলে ভালই লাগত তাদের। কিন্তু মা দেশ প্রেমিকের চেয়ে বেশি ভালবাসত তার স্বামীকে, দাদী বেশি ভালোবাসত তার পুত্রকে। আমি ভালোবাসতাম আমার বাবাকে। অন্য হাজার ছেলের মত আমিও দেশের চেয়ে মা-বাবাকেই আজ বেশি অনুভব করি। এতিম হওয়ার চেয়ে দেশ পরাধীন থাকাই ভাল ছিল। যারা শূন্য ছিল, অথবা স্বল্প সম্পত্তির মালিক ছিল, তারা আজ রাষ্ট্রের পরিচালক আর আমরা জীবন্ত লাশ হয়ে দেশের বোঝা হয়ে আছি। আমরা কেউ সেদিন বাবাকে সেই পথ থেকে ফিরিয়ে আনতে পারিনি। বাবাকে ধরে রাখতে পারিনি আমাদের জীবনের সাথে। আজ ঘৃণা করি দেশপ্রেম, সমাজতন্ত্র। আস্তখুঁড়ে আজ হতাশাগ্রস্ত রোগীর মত সমাজতন্ত্র কাঁদছে। বড় বড় জ্ঞানীদের দ্বারা গঠিত এবং পরিচালিত সমাজতন্ত্রের বর্তমান অবস্থা দেখলে অবাক হতে হয়। অধিকাংশ বুদ্ধিজীবী, দেশপ্রেমিকরা এটাকে পূজা করত। অথচ এটা আজ এক বিরাট বিস্ময়! আমার বাবা এই তন্ত্রকে পূজা করত। এই তন্ত্রের জন্য সারা জীবন সংগ্রাম করেছেন। আজ বেঁচে থাকলে আমাদের সামনে বড় গলায় বলতে পারতেন না।

দৈনিক ইত্তেফাকের আবশ্যক কলাম বুকে নিয়ে শুয়েছিলাম। ঐ কোটিপতির কাছে চাকুরি না পেলে, অথবা পছন্দ না হলে এ আবশ্যক বিজ্ঞপ্তি ধরে দৌড়া দৌড়ি করতে হবে। দরজার কড়া নড়ে উঠল। কে?--বলতে বলতে ছিটকিনিটা খুললাম। ড্রাইভারের আস্সালমালাইকুম সম্বোধনটা হজম না করতেই দেখি সেই ভদ্র মহিলা। তাকে আমি আশা করিনি। ভেবেছিলাম, গতকাল ড্রাইভারকে চিনতে পাঠিয়েছে এজন্যই যে, দরকার হলে ডেকে পাঠাবে। মাত্র একদিনের ব্যবধানে গৃহকর্ত্রী হাজির। আজ অবশ্য একটু পরেই আমার নিজেরই যাওয়ার কথা ছিল। অনেকটা তোষামোদের ভঙ্গীতে তাকে সালাম দিয়ে রুমে আসতে বললাম। ভাল একটা চেয়ারের জন্য ছুটোছুটি করতেই দেখি, উনি আমার বিছানায় বসে পড়েছেন। ড্রাইভার বাইরে দাঁড়িয়ে রইল। কোটিপতির স্ত্রী আজ, এখন আমার রুমে। কোটিপতি মানে যাদের কোটি কোটি টাকা আছে, কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি আছে। কোটি টাকা তো দূরের কথা দশ হাজার টাকাও এক সঙ্গে কখনও দেখিনি। তবে দেখার ইচ্ছা জাগে, মাঝে মাঝে প্রবলভাবে জেগে উঠে। জাগবে না কেন? আমাদের সহায়-সম্পদ বলতে আমরা দু’টি ভাই ছাড়া আর কিছুই নেই। আর যেটুকু বিদ্যা--তা দিয়ে আজকের যুগে ঠেলাগাড়ি ঠেলতে পারছি না।
-- কেমন আছ?
-- জ্বী, ভাল।
-- এখানে কয় জনে থাক?
-- আমি আর আমার এক বন্ধু।
-- তোমার ভাই?
-- ঢাকা কলেজ হোস্টেলেই থাকে।
-- তুমি তো বি.এ পাস করেছ?
-- হ্যাঁ।

কিছুক্ষণ তিনি আর কথা বললেন না। তার চোখ বেশ ভারী হয়ে উঠছে। আমি তার দিকে তাকিয়ে আবার মাথা নিচু করে রইলাম। তিনি আমাকে আদর করতে করতে বললেন, ‘বাবা, তুমি আমার ছেলের মত, তুমিই পার--।’ উনি আর কিছুই বললেন না। থেমে গেলেন। কিছু বলতে চেয়ে বুঝে নিলেন, কিভাবে বলবেন। হয়তো গুছিয়ে উঠতে পারছেন না। আমি সময়ের জড়তা কাটাবার জন্য কথা বলতে শুরু করলাম--‘আপনারা আমাকে এটা চাকুরি দেবেন বলছিলেন। কি চাকুরি? মানে--।’

মিসেস নজরুল প্রসঙ্গ পাল্টে ফেললেন। এখানে কে রান্না করে দেয়, কিভাবে খাই, টাকা-পয়সার উৎস--ইত্যাদি সম্পর্কে আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন। আমার মনে হল, নোট বই থাকলে নোট করে নিতেন। কারণ তার মনে থাকছে না। একই প্রশ্ন সময়ের ব্যবধানে তিনবারও করেছেন। ধনী পুরুষ বা মহিলাদের স্মরণ করার জন্য নিশ্চয়ই লোক থাকে। নতুবা একই কথা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে আনলে শ্রোতা নিজেও বিরক্ত হবেন। তার বয়স পঁয়তাল্লিশ-ছিচল্লিশ হবে। অবশ্য বেশিও হতে পারে। ধনী লোকদের স্ত্রীদের বয়স কসমেটিক্স আর সাজ-গোজের ফলে বেশ নিচে নেমে আসে। খালাম্মা, চাচী না বলে আপা বললে তারা বেশি খুশি হন। যত ঝড়-তুফান যাক তাদের সংসারে, তারা গয়নাগাটি পরিধান করতে ভুল করেন না। নিজের অবয়বের ব্যাপারে তারা খুবই সচেতন। এই যে আমার সম্মুখে মহিলা বসে আছে, তিনি তার কন্যার কারণে হতাশাগ্রস্ত। তার কন্যা মেন্টাল পেসেন্ট। দুশ্চিন্তা হবার কথা। অথচ তার বেশ-ভূষা দেখে মনে হচ্ছে, কোন পার্লার থেকে এসেছেন। অবশ্য তিনি আমাকে বলেছেন, ইত্তেফাকের কোন এক সম্পাদকের সাথে তিনি একটা জরুরি বিষয় নিয়ে বলতে এসেছিলেন। সেই সাথে আমাকে তার বাসায় নিয়ে যাবার জন্যও ভাবছিলেন।

ধারাবাহিক উপন্যাসঃ হৃদয়ের এপিঠ-ওপিঠ (পর্ব-৬)
--শাশ্বত স্বপন

তিনি আমাকে চাকুরির ব্যাপারটা বলেও বলছেন না। আমি কিছুটা উপলব্ধি করতে পারছি। তবুও নিশ্চিত হতে পারছি না। পঁচিশ বছরের জীবনে যা ভাবি--তা কখনও হয়নি বরং যা আমি কল্পনাও করতে পারিনি--তাই আমার জীবনে ঘটে। তার মেয়েটা অন্ধ হলে বুঝতাম চোখ সমস্যা--কিডনী সমস্যা হলে, কিডনী ভাবতাম। মেয়েটির সারা অবয়ব স্বাভাবিক। তবে তারা আমাকে....? চাকুরির জন্য ধন্না দিতে হয় চাকুরি প্রার্থীকে আর উনি ধন্না দিচ্ছেন আমার কাছে। যদি কিডনী চায় এবং তা ম্যাচ হয় আমি দেব। যদি একটি চোখ চায়, তাদের কারো জন্য--আমি দেব। কারণ উনারা আমার দারিদ্র্যের সুযোগ নিয়েই চাওয়া ও পাওয়ার ব্যাপারে আশা পোষণ করছেন। আমি রাজী হব। তবে বিনিময়ে অনেক টাকা দাবী করব অথবা সম্পত্তি। আমার বাবা পরাজিত সৈনিক। আমিও পরাজিত সৈনিক। জীবনের অর্ধেক যদি বিদ্যার্জনের জন্য ব্যয় হয় এবং সেই বিদ্যা যদি জীবনের বাকি অর্ধেককে টানতে না পারে--তবে ঘৃণা করি এ বিদ্যাকে, এ জীবনের মানচিত্রকে। জীবন যুদ্ধে আমি পরাজিত আর ভবিষ্যতে জিতারও কোন সম্ভাবনা নেই। চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ-এ নাটকীয়ভাবে যদিও বা বিজয় আসে, সেই বিজয়ের কোন মানে হয় না। শেষ ভাল যার, সব ভাল তার--কথাটার মূল্যায়ন করার মত মন-মানসিকতা আমার নেই। কথাটা কোন ক্ষেত্রে প্রযোজ্য আমি জানি না। আমার ক্ষেত্রে, আমি এই কথাটাকে থুথু দেই। জীবনের ভাটায় জীবনের মূল্য ধীরে ধীরে কমতে থাকে। অবশ্য বিখ্যাত লোকদের ক্ষেত্রে মরে গেলেও তাদের দাম বেড়ে যায়। আমাদের বার্ধক্য জীবনে আমাদের দাম--সাড়ে তিন হাত মাটির সমান। ক্রমাগত আমরা মৃত্যুর দিকে যাচ্ছি। কখন মরে যাই--তাও ঠিক নেই। জীবনে, সুখ নামক বস্তুটা কি--আমি অনুভব করতে চাই। সেই আবহমানকাল থেকে আমরা সবাই দুঃখের মাঝেই সুখের নীড় গড়ে যাচ্ছি। স্বাধীন দেশেও দুঃখের মাঝেই বসবাস। আমি সুখের মাঝে সুখের নীড় বা সুখের মাঝে দুঃখের নীড় গড়তে চাই। সুখের মাঝে দুঃখের নীড়ের মূল্য আছে--কিন্তু দুঃখের মাঝে সুখের নীড়ের কোন মূল্য নেই।
--বাবা, তুমি আমার সাথে চল--
-- কিন্তু আমি, মানে আমার মনে হচ্ছে, আমাকে আপনি কি যেন বলতে চাইছেন। বলেও বলছেন না। আমি কিছু মনে করব না।
-- না, না কিছুই বলতে চাচ্ছি না। তোমার চাকুরি--
-- হ্যাঁ, চাকুরি--
-- রকিব মানে ডাক্তার তোমাকে সব বলবে। তুমি আমার সাথে চল।
আমি কিছু খাওয়াতে চাইলাম। উনি খেতে চাইলেন না। শুধু সৌজন্যতা রক্ষার্থে এক গ্লাস পানি পান করলেন। তারা দু’জনে গাড়ির সামনে গেলেন। আমি শার্ট-প্যান্ট পড়ে তাদের সাথে গাড়িতে উঠলাম। উনি তার সাথে আমাকে বসালেন। আমি ইতস্তত: অনুভব করছি। তার পাশে জড় পদার্থের মত বসে রইলাম। তার বাহ্যিক চেহারার কোন বিরক্তি বা জড়তা দেখলাম না। না থাকারই কথা। চলতে পথে তারা কত রকমের মানুষের সাথে গা ঘেষাঘেষি করে। এটাই তাদের কালচার। আমার অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনেক কিছু জিজ্ঞাসা করলেন। ভবিষ্যতের ব্যাপারে আমি হতাশাগ্রস্ত--যা শুনে উনি বেশ খুশিই হলেন। হয়তো ভাবছেন, ঠিক জায়গাতেই বড়শী ফেলেছেন। মাছ টোপ গিলবেই। টাকা দিলে বাঘের চোখ মিলে আর আমি তো কোটি কোটি দরিদ্রদের ভীড়ে এক নগণ্য দরিদ্র ব্যক্তি। মরে গেলে এক ভাই ছাড়া আর কেউ কাঁদবে বলে মনে হয় না। আমি এমন খ্যাতনামা ব্যক্তি নই, সমাজ সেবক নই, যে দেশের কোন সম্ভাবনা ধুলিসাৎ হয়ে যাবে। বরং মরে গেলেও দেশের একটা বেকার সমস্যা কমবে। একটা সাধারণ পিয়নের চাকুরিতে দু’হাজার দরখাস্ত জমা পড়ার সম্ভাবনা থাকলে অন্তত: একটা বাদ পড়বে। আমার জন্য ব্যবহার্য সামগ্রী অন্য খাতে ব্যয় হবে। বন্ধু মহলে কেউ বলে এত উদাসীন হওয়া ঠিক না। সেটা আমিও বুঝি। কিন্তু সাপে যাকে কামড়ায় সেই বুঝে সাপের বিষের কি জ্বালা! নেই মা, নেই বাবা, নেই কোন ঘনিষ্ঠ আত্মীয়-স্বজন। বাবা তার পরিবারের একমাত্র সন্তান ছিলেন। অতএব কাকা-ফুফু তো না থাকারই কথা। মা ছিলেন হিন্দু। যুদ্ধের আগে-পরে তার পরিবারের সবাই কোলকাতা চলে গেছে । অতএব, বাংলাদেশে মামা-কাকা নেই। নেই ভিটে-মাটি। যেটুকুও ছিল তাও বেপারী, শিকদার, মোড়ল প্রতাপশালীদের দখলে চলে গেছে। অবশেষে, আমার মাঝে যেই সাইজের বিদ্যা--তা নিয়ে আজকের যুগে মন্দির আর মসজিদ ছাড়া আর কোথাও যাবার সামর্থ্য আছে বলে, মনে হয় না। মসজিদ-মন্দিরে চাকুরির জন্য নয়--প্রার্থনা করার জন্য--‘‘হে বিধাতা, তুমি আমাকে চাকুরি দাও; নয়তো দুনিয়া থেকে বিদায় কর।”

গাড়ি বাসার ভিতর ঢুকে গেল। মিসেস নজরুলের সাথে তাদের ড্রয়িং রুমে গেলাম। দেখলাম, শুধু ডাক্তার বসে আছে। হাতে একটা ম্যাগাজিন। বসতে বললেন, বসলাম। অল্প সময়ের মধ্যে দেখি, চপ, চা, বিস্কুট, ফলমূল, পানীয় ইত্যাদি বিশ-পঁচিশ রকমের খাবার এসে গেছে। বেশ সজ্জিত ড্রয়িং রুম। দুই দেয়ালে দুইটা দামী পেইন্টিং ঝুলছে। ডাক্তার সম্মুখে বসে থাকায় আড়চোখে আশপাশটা দেখলাম। উনি খেতে বললেন। মিসেস নজরুল পাশের রুমে চলে গিয়েছেন। তার কথাবার্তা শুনা যাচ্ছে। তার মেয়ের সাথেই বোধহয় কথা হচ্ছে। আমি ডাক্তারকে আগে খাবার গ্রহণ করতে বললাম। তারপর আমিও খেতে শুরু করলাম। বেশ কিছু খাবার খাওয়ার পর মহিলা একটা ডায়েরী নিয়ে ডাক্তারের পাশে আসলেন। ডায়েরীটা তার হাতে দিয়ে আমার দিকে তাকালেন। চপটা নেবার জন্য আমাকে অনুরোধ করলেন। তিনি তার ভাইকে বললেন, ‘রকিব, তোরা কথা বল, আমি আসছি--।’

আমি যে কোন প্রশ্নের উত্তর দেবার জন্য প্রস্তুত আছি। আমার ভিতরে কোন ভয় নেই। জীবনের মূল্য এখন আমি অন্য ভাবে ভাবী। মাঝে মাঝে ভাবী, আমি বোধ হয় বৃদ্ধ হয়ে যাচ্ছি। আমি স্বাভাবিকভাবেই একটু একটু করে একটা চপ খাচ্ছি। চপের অর্ধেক শেষ হতেই দেখি সেই মেয়েটি। একেবারে সেজেগুঁজে হাজির। আমার বুকের ভিতরটা কেঁপে উঠল। আবার কি জড়িয়ে ধরবে নাকি? না, তেমন কোন লক্ষণ দেখা গেল না। বরং অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টি নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইল। মুখটা গম্ভীর হয়ে আছে। তবুও দেখতে দারুণ চমৎকার। না জানি, সুস্থ অবস্থায় দেখতে কত সুন্দরী ছিল! অবশ্য ধনীদের অধিকাংশ মেয়েরাই সুন্দরী হয়। জন্মটা কালো হলেও কসমেটিক্স, পারলার আর পোশাকের গুণে সুন্দরী না হয়ে উপায় নেই। আর যে খাবার-দাবার--তা বস্তির কালো হেঙলা-পাতলা মেয়ে খেলেও নাদুস-নুদুস হয়ে উঠবে। সুখাবয়বও চিকচিক করবে। ডাক্তার কি যেন ইশারা করল। সে আমাকে সালাম দিল। আমি অবাক। কি সুন্দর মুখের সাউণ্ড। ডাক্তার ডাকতেই সে তার একেবারে কাছে বসে আমার দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখ মোটেও অন্য দিকে যাচ্ছে না। এই মুহূর্তের পরিবেশটার জড়তা কাটানোর জন্য ডাক্তার একটা কৌতুক বলা শুরু করলেন। বলার আগে মেয়েটির সম্মতি নিয়েছিলেন। কৌতুকের কথা শুনে মেয়েটি খুবই খুশি হল। গল্পটা এরকম--“এক হাতুড়ে ডাক্তার বাইরে বের হবার আগে তার সহকারিকে বলে যান--যদি পেট ব্যথার রোগী আসে তবে যেন, সাত নাম্বার বোতলের ঔষধ দেয়। আর যদি মাথা ব্যথার রোগী আসে, তবে যেন, আট নাম্বার বোতলের ঔষধ দেয়। আর যদি পাতলা পায়খানার রোগী আসে, তবে যেন, পনর নাম্বার বোতলের ঔষধ দেয়। ঐ গায়ে তখন এই তিনটি রোগই প্রকট ছিল। হাতুরে ডাক্তার চলে যাবার পর এক পাতলা-পায়খানার রোগী এলো। সহকারী পনর নাম্বার বোতল খুঁজে বের করে দেখে, খালি বোতল। ঔষধ নেই। আরো কয়েকটা পনর নাম্বার বোতল খুঁজেও ঔষধ পাওয়া গেল না। অগত্যা সে কি করে? রোগী তো অলরেডী পায়খানা করেও দিয়েছে। অবস্থা সিরিয়াস!”

মেয়েটি ‘সিরিয়াস’ শব্দটি শুনা মাত্রই হাসতে শুরু করল। কি সুন্দর হাসি! আমি তাকাতেই সে হাসি থামিয়ে দিল। আবার আমার দিকে অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। ডাক্তার মেয়েটির মাথায় হাত দিয়ে বলতে লাগল--‘‘তারপর অবস্থা বেগতিক দেখে সহকারী একটা বুদ্ধি বের করল। সে পেট ব্যথার সাত নাম্বার আর মাথা ব্যথার আট নাম্বার বোতল দুইটার অর্ধেক অর্ধেক পরিমাণ পনর নাম্বার বোতলে ঢেলে রাখল। তারপর কয়েকবার ঝাঁকিয়ে রোগীকে খাওয়াতে লাগল। সাথে সাথে তার নিজের সুবুদ্ধির প্রশংসা করতে লাগল। রোগী এরই মধ্যে আরো একবার পায়খানা করে ফেলেছে। ঔষধ খাওয়ার কিছুক্ষণ পর রোগী অক্কা পেল।”
সবাই একসঙ্গে হাসতে শুরু করলাম। আমার হাসি শেষ হবার আগেই সে তার হাসি থামিয়ে অবাক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে রইল। আমি ভয় পেয়ে গেলাম। আসন থেকে মুহূর্তের মধ্যে যেন উঠতে পারি--তার প্রস্তুতি নিলাম। যা ভেবেছি--তাই হল। সে প্রচণ্ড গর্জনে ফ্রান্সিস ফ্রান্সিস...বলে চিৎকার করে আমার কাছে আসতে চাইল। ডাক্তার তাকে অন্য রুমে নিয়ে গেল। আরো দু’জন মহিলাও মেয়েটিকে ধরল। ডাক্তার ফিরে এসে আমার খুব কাছে আসলেন।
-- কিছু বুঝতে পারছ? ন্যান্সি সম্পর্কে তোমার ধারণা কি?
-- জ্বী, ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না। কিছুক্ষন আগেও স্বাভাবিক দেখলাম।

ধারাবাহিক উপন্যাসঃ হৃদয়ের এপিঠ-ওপিঠ (পর্ব-৭)
--শাশ্বত স্বপন

তিনি আমার পিছনে চলে গেলেন। অন্যদিকে তাকিয়ে কি যেন ভাবলেন। আমি মেয়েটির ন্যান্সি নামটি নিয়ে একটু ভাবলাম। এতক্ষণে নামটা জানা গেল। খুব সুন্দর নাম, ন্যান্সি। এতক্ষণ গল্পে মেয়েটি বলতে বলতে আমি নিজেই বিরক্ত হয়েছি। এখন ন্যান্সি বলা যাবে। ডাক্তার ডায়েরীটার কয়েকটা পাতা নাড়াচাড়া করলেন। আমি তার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে আমার সম্মুখে ভাবাবেশে তাকিয়ে রইলাম। তিনি বলতে শুরু করলেন, ‘মাই নাইস মিনস ন্যান্সি ইজ মেন্টাল পেসেন্ট একর্ডিং টু মেন্টাল সাইন্স এন্ড ট্রিটমেন্ট। সী ইজ নাইটিন ইয়ারস ওল্ড এণ্ড অনলি সিঙ্গেল ডটার অফ দা ফ্যামিলি। সী লাভ এ বয় নেমড ফ্রান্সিস...।’

ডাক্তার বেশ কিছুক্ষণ ইংরেজিতে কথা বলতে লাগলেন। যার সারমর্ম হল--ন্যান্সি খ্রীস্টান এক ছেলেকে ভালোবাসত। ছেলেটির নাম ফ্রান্সিস রোজারিও। তারা জার্মানীর অধিবাসী। তার বাবা বাংলাদেশে অবস্থিত জার্মান কালচারাল সেন্টারে কাজ করত। ফ্রান্সিসরা দুই ভাই, এক বোন। তার মা বাঙালি। ফ্রান্সিস-এর চেহারা বাঙালীদের মতই বেশ হ্যাণ্ডসাম, দেখতে আমার মত, তবে আরো ফর্সা। উচ্চতা আমার মতই। কথাবার্তা খুবই মার্জিত। বাংলা বেশ বুঝত। ন্যান্সিদের বাসার সামনের একটা ফ্ল্যাটে তারা থাকত। দু’জনে ইংলিম মিডিয়ামে পড়ত। এই পর্যন্ত বলেই ডাক্তার থেমে গেলেন। ডিটেলস্ আর কিছু বললেন না। ঠিক এ সময়ে মিস্টার নজরুল ও মিসেস নজরুল রুমে ঢুকলেন। যেন, আগেই সিদ্ধান্ত ছিল। মিসেস নজরুল আমার পাশেই বসলেন।
-- আপনারা সরাসরি বলুন আমার চাকুরিটা কি?
মিসেস নজরুল আমার মাথায় হাত বুলাতে লাগলেন।
-- বাবা, তুমি ওকে নরমাল হতে সাহায্য কর। তোমার মাঝে ও ফ্রান্সিসকে দেখেছে। তাইÑ
নজরুল চৌধুরী বললেন,
-- বিনিময়ে তুমি যা চাও--তাই পাবে এবং এটাই তোমার চাকুরি।
ডাক্তার আমার কাঁধে হাত রাখলেন।
-- মনে কিছু কর না। আংকেল হিসেবে বলছি না। ন্যান্সির ডাক্তার হিসেবে আই ওয়ান্ট ইউর হেলপ্। ইউ হেলপ্ মী টু কাম রাউন্ড, ন্যান্সি।
-- কিভাবে সাহায্য করব?
-- আমি একজন সাইকিয়াট্রিস্ট। অনেক মেন্টাল পেসেন্ট সুস্থ করেছি কিন্তু ওকে পারছি না। তোমাকে আমি সব বুঝিয়ে বলব, কিভাবে কি করতে হবে।

আমি জানি, আমি একটা বোকা। বোকাদের প্রায় কাজেই ভুল হয়। যেহেতু আমি জানি, আমি একটা--বোকা তাই খুব চিন্তা-ভাবনা করে কাজ করি। উন্নতি কিছু না হলেও কোথাও হাসির বস্তু হিসেবে বিবেচিত হইনি; বরং আট-দশ জনে সম্মান, স্নেহ রেখেই কথা বলে। কিন্তু আগে বেশি চালাক ছিলাম আর সে কারণেই ভুল বেশি হত। সেই ভুলগুলোকে তখন ঠিক বলে মনে হত এবং মেনে নিতাম। কিন্তু বর্তমানে সেই সব ভুলগুলো আমাকে প্রায়ই কাঁদায়, ভাবায় কখনও অজান্তেই হেসে উঠি। একমাস আগেও এমন কিছু কাজ করেছি, যা বর্তমানে অনেকটা বোকামী করেছি বলে মনে হয়। এই যে তারা আমাকে ইউজ করতে চাইছে তাদের কন্যাকে ভাল করার জন্য, এদের কাছে আমরা ভিক্ষুক। অসময়ে এরা লাথি মারে, সময়ের প্রয়োজনে গায়ে হাত দিয়ে আদর করে। এটাই নিয়ম, এটাই বাস্তব। যে সাংবাদিক আজ অছি, ম্যাজিস্ট্রেটকে ঘুষখোর, দুর্নীতিবাজ বলে পত্রিকায় কলামের পর কলাম লিখে যায়--সেই সাংবাদিক, অছি কিংবা ম্যাজিস্ট্রেট পদে থাকলে একই কাজ করত। মুখে যতই মোটামোটা কথা বলা হোক না কেন, কার্যক্ষেত্রে তার একাংশও ফলে না। যে, যে পদে থাকে, তার কাজ সেই পদের বৃত্তেই থাকে এবং এই বাস্তবতা স্মরণ করেই তাদের এই নারী কেন্দ্রিক চাকুরির অফার এড়িয়ে যেতে চাইলাম। মুখের ভঙ্গীমায় তাই বুঝালাম। মিসেস নজরুল কাঁদো কাঁদো কণ্ঠে বলতে লাগলেন, ‌‌‌‌‌তুমি জান না বাবা, গতকাল তোমাকে দেখার পর থেকে ও কেমন জানি অন্যরকম হয়ে গেছে। তুমি আজ আসবে বলেই বুয়ারা ওকে সেজেগুঁজে দিয়েছে। নিজেও সাজগোজ করেছে। দুই বছর পাবনা রেখেও কিছু হল না। ধানমণ্ডি মানসিক চিকিৎসা কেন্দ্রে রাখা হয়েছে। তাও কিছু হল না। বিদেশেও রাখা হয়েছে। একটু ভাল হলেও পরে আবার একই অবস্থায় ফিরে আসে। তোমার মাঝে ও ফ্রান্সিসকে দেখেছে। ভাল হলে হতেও পারে। তুমি সারাদিন ওর সঙ্গী হবে।

নজরুল চৌধুরী ভেবেছিল, সে বলা মাত্রই আমি সহাস্যে রাজী হয়ে যাব। আমার অনীহা ভাব বুঝতে পেরে সে রাগতস্বরে টাকার গরম দেখাতে লাগল। মেয়ের মানসিক রোগের কারণে সে খুবই সিরিয়াস হয়ে আছে। যে কোন মূল্যে সে মেয়েকে আরোগ্য দেখতে চায়।
-- তুমি মাসে কত টাকা চাও বল?
-- আমি পরে আপনাকে জানাব। আগে ভাবতে দিন। পরে একদিন দেখা করে...
-- শুন, তোমার অবগতির জন্য জানাচ্ছি, তোমাকে প্রতি মাসে দশ হাজার করে দেওয়া হবে। ডাক্তার মানে রকিব যা বলবে তুমি তাই করবে। ওকে যদি ভাল করতে পার, চিটাগাং-এর ট্রাভেলস্ লাইসেন্স তোমাকে দিয়ে দেব। আর যদি নাও পার তবুও একটা চাকুরি অন্তত: আমার আন্ডারে পাবে। তবে ভাল করার জন্য চেষ্টা দেখাতে হবে। কাজ দেখাতে হবে। ভেবে দেখ। আমার কথাবার্তায় হয়ত দুঃখ পেয়েছ । ডন্ট মাইন্ড। আই নো হাউ আই এ্যাম? ইউ ডন্ট নো, ইউ ডন্ট আন্ডার স্ট্যান্ড হাউ সরো ইন মাইন্ড অফ মাইন! আমার স্থলে তুমি হলে বুঝতে।

নজরুল চৌধুরী তার কক্ষে অশ্রু সিক্ত নয়নে চলে গেলেন। মিসেস নজরুল আমাকে নিয়ে খাবার টেবিলে চলে এলেন। খাবার টেবিলে রাজকীয় খাবার দেখে আমি হতবাক। এগুলো খেলে হজম হবে কিনা সন্দেহ। আলু ভর্তা জাতীয় খাবার যাদের প্রতিদিনের প্রধান আইটেম তাদের পাকস্থলীতে হঠাৎ এসব রাজকীয় খাবার সইবে কি করে। তিনি জোর করেই আমাকে খেতে বসালেন। রাত আটটা বেজে গেছে। খেয়ালই করিনি। কথা বলতে বলতে আর ভাবতে ভাবতে কত সময় পার হয়ে গেছে। আমি আবার হাত ঘড়িটার দিকে তাকালাম। হ্যাঁ, আটটা বাজে। এসি করা ডাইনিং। পুরো বাড়িটাই এসি করা। রুমের ভিতরে রাত-দিন সমান। ঘুম ঘুম নিঃশ্বাস এসে গেছে। সাধারণত: বারটা-একটার আগে খুব একটা ঘুমাই না। অথচ এসি করা এই বাসস্থলে ঘুমে চোখ বুজে আসছে। এতসব রাজকীয় খাবার আর আবাসস্থল দেখে আমি এটাকে স্বর্গ ভাবতে শুরু করেছি। এর চেয়ে বড় স্বর্গ চাই না। ধর্মান্ধ বন্ধুদের বললে, বলবে, ‘এইটুকু দেখেই অবাক! আরে ব্যাটা স্বর্গে এর চেয়ে হাজার গুণ হাইফাই, হাজার গুণ সুখ-শান্তি, হাজার গুণ ভাল খাবার...।’ মনে হবে, বন্ধু যেন স্বর্গ দেখে এসেছে, কিছু দিন বা কিছু কাল বেড়িয়ে এসেছে। ওয়াজ ব্যবসায়ী দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর ওয়াজ শুনলে তাই মনে হয়। তার ওয়াজ শুনলে মনে হয়, উনি দুনিয়াতে নাই, আখেরাতে চলে গেছে। উনার মরার সময় উনি বোধহয়, বিবর্তনবাদ এর জনক ডারউইন এর মত বলবে, মৃত্যুতে আমার ভয় নেই, আমি বেহেস্তে যাচ্চি। যাই হোক, আমি সেই অবিশ্বাস্য কাল্পনিক স্বর্গ চাই না, আমি এরকম স্বর্গ চাই। চাই বাঁচার মত বাঁচতে। যে লোক আজীবন বস্তিতে থেকেছে, সে হঠাৎ আমার ধর্মান্ধ বন্ধুর কাল্পনিক স্বর্গে গেলে কেমন করবে, আমি ভেবে পাই না। এই যে, আমি চাচার বাসায় বেশ ছিলাম। মধ্যবিত্ত সংসার। মধ্যবিত্ত পরিবারে সমস্যা বেশি হলেও আমার মনে হয়, ক্ষুধা আর আনুসাংগিক ব্যাপারে তেমন ভাবতে হয়নি।
এই যে, যা আজ আমি স্বর্গ বা স্বর্গতুল্য ভাবছি, যা টিকি ও দাঁড়িওয়ালা বন্ধুর কাছে নগন্য--সেটাই আমি সইতে পারছি না। আর হাজার গুণ উন্নত ঐ কাল্পনিক স্বর্গে গেলে হাজার বার মরব। তখন স্রষ্টাও আমাকে বাঁচাতে বাঁচাতে ক্লান্ত হয়ে যাবে। যারা সব সময় ভেজাল দ্রব্যাদি খেয়ে অভ্যস্ত--তাদের পেটে হোটেল শেরাটনের খাঁটি দ্রব্যাদি সইবে কি করে। আমি ঐ স্বাপ্নিক স্বর্গ চাই না, চাই পার্থিব এই সাধারণ স্বর্গ। চাই সুখ, চাই এক টুকরো শান্তি, চাই বাঁচার মত বাঁচতে, তিন বেলা পেট ভরে খেতে। এই যে উনারা ধনী বলে এতসব রাজকীয় খাবার খাচ্ছেন। আমি গরীব বলে আলু ভর্তা ভাত আর মরিচ খাচ্ছি। উনারা স্বর্গে গিয়ে কি খাবেন? আমার বন্ধুর স্বাপ্নিক খাবার নিশ্চয়। তবে তাদের এখানে-ওখানে দুই জায়গায়ই লাভ। আমি ভাবতে চাই না। এখনো গায়ে জোর আছে, অবলম্বন আছে, এখনো বৃদ্ধ হইনি, দুর্বল হইনি, টুপি, দাঁড়ি কিংবা টিকি এখনো আমাকে গ্রাস করেনি। যুদ্ধ ক্ষেত্রে বীর সৈনিক নিশ্চিত পরাজয় জেনেও যেমন বীরের মত যুদ্ধ করে নিজেকে শক্তির অবিনাশিতাবাদ সূত্রের মত আপাত ধ্বংসে বিলিয়ে দেয়, আমিও তেমনি যুদ্ধ করে যাব। নিশ্চিত পরাজয় জেনেও যুদ্ধ করে যাব। সংগ্রাম ছাড়া জীবনের চাহিদা কখনও পূরণ হয় না। তিলে তিলে না মরার চেয়ে; তেলাপোকার মত না বেঁচে; বাঘের মত বাঁচাই শ্রেয়ঃ। মানুষ সিগারেটের প্যাকেটে ‘সংবিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ’ দেখেও ধূমপান করে; প্রেমের পরিণাম জেনেও প্রেম করে। আমিও একই রক্তমাংসে গড়া একজন মানুষ। তারা যদি মৃত্যুর পর নরকম ভোগ করে আমিও করব। তবুও আপন বিবেকের সামনে বাস্তব প্রমাণ সাপেক্ষ্য অকাট্য যুক্তিকে গলা টিপে ধরব না।

ধারাবাহিক উপন্যাসঃ হৃদয়ের এপিঠ-ওপিঠ (পর্ব-৮)
--শাশ্বত স্বপন

রাজকীয় খাবারের প্রথমে পোলাও এর সাথে রোস্ট। এটা অবশ্য বিয়ে বাড়িতে অনেক খেয়েছি। তারপর নাম-না-জানা এমন কিছু খাবার খেলাম--যা জীবনেও খাইনি। মুখে দেওয়া মাত্র গলে গেল। সাথে সাথে পাকস্থলীতে চলে গেল। আহা! শরীরে কি শিহরণ! স্বর্গে এর চেয়ে ভাল, এর চেয়ে স্বাদের খাবার আছে। এখানেই মুখ গহ্বর, চোখ, জিহ্বার আর পাকস্থলীর পরাজয় দেখে আমি দেহ সর্বস্ব লজ্জা পাচ্ছি আর ওখানে...।

কাজের বুয়া মিসেস চৌধুরীকে জানাল ন্যান্সি খুবই পাগলামী শুরু করেছে। চেয়ার-টেবিল উল্টে ফেলেছে। যে আয়না দিয়ে সে কিছুক্ষণ আগে সাজ-গোজ করে মুখ দেখেছে, সে আয়না ভাঙ্গতে গিয়ে হাত কেঁটে ফেলেছে। ডাক্তার ও মিঃ চৌধুরী কিছুক্ষণ আগে কি কাজে যেন বাইরে গেছে। মিসেস চৌধুরী এতক্ষণ আমাকে অতি য সহকারে আপ্যায়ন করছিল। তিনি দৌঁড়ে ন্যান্সির রুমে চলে গেলেন। আমি ন্যান্সির চিৎকার শুনতে পাচ্ছি। কেউ তাকে স্থির করতে পারছে না। মিসেস নজরুল ক্লান্ত হয়ে কিছুক্ষণ পরে ফিরলেন। আমি প্লেটে দেওয়া পুরো খাবার না খেয়েই হাত ধুয়ে ফেলেছি। তিনি আমার সামনে এসে কিছু বলেও বললেন না। আমি বুঝতে পারলাম, উনি আমার হেল্প চাচ্ছেন। আমি মিসেস নজরুলের মুখের দিকে তাকিয়ে সোজা ন্যান্সির রুমে চলে গেলাম। তিনিও আমার পিছু পিছু গেলেন। তিনি ন্যান্সির রুমে আগে ঢুকলেন। দেখা গেল চিৎকার আরো বেড়ে গেছে। আমি মিসেস নজরুলের পিছনে ছিলাম। ন্যান্সি দেখতে পায়নি। একটা মোটা বই মায়ের দিকে ছুঁড়ে মারতে আসছে। আমি প্রকাশিত হবার সাথে সাথেই সে আমাকে দেখে থেমে গেল। আমি তাকিয়ে রইলাম ন্যান্সির দিকে। বইটা হাতেই রয়েছে ছুঁড়ে মারার ভঙ্গীতে। মিসেস নজরুল আমার আমার পিছনে চলে গেলেন। তার মুখে হাসি ফুটে উঠেছে। রুমের চারপাশে তাকালাম। এসি করা সত্য, তবে রুম না বলে ইউনিভার্সিটির কোন বিধ্বস্ত হোস্টেল কক্ষ বলা যায়--যেখানে কিছুক্ষন আগে দু’পক্ষের মারামারি হয়ে গেছে। এখানে দামী কোন সরঞ্জাম নেই। বুঝতে পারলাম যুদ্ধে ক্ষতি হবে বলে, হয়তো রাখা হয়নি। চেয়ার-টেবিল উল্টানো। বই, টুকরো পেপার আর কাগজে রুমের ফ্লোর ভরে আছে। টুকরো কাগজের পরিমাণ এত বেশি যে, ঠিক বুঝে উঠতে পারলাম না। বুয়া জানাল, কিছুক্ষণ আগে সব গোছ-গাছ ছিল, শুধু কাগজের টুকরো ছাড়া। এগুলো পরিষ্কার করা নিষেধ আছে। তাই পরিষ্কার করা হয়নি। কে নিষেধ করেছে প্রশ্নও করলাম না।

ন্যান্সির দিকে তাকালাম। সে তখনও বই ছুঁড়ে মারার বিশেষ ভঙ্গীতে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। তার ডান হাত বেয়ে রক্ত ঝরছে। আমি বুয়াকে ডেটল আনতে বললাম। মায়ের সামনে কিছু করতে লজ্জা লাগছিল। তাই সবাইকে যেতে বললাম। আমি জানি, মিসেস নজরুল ব্যাপারটা পর্যবেক্ষণ করবেন। আমি কি করি না করি? বুয়া ডেটল দিয়ে চলে গেল। আমি একটা সাধারণ ঠোঁট কাঁপানো হাসি দিয়ে হাতের বইটা নিলাম। বিছানায় ছুঁড়ে ফেলে তাকে বিছানায় বসতে বললাম। সে হরিণ চোখা দৃষ্টি নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি তার মাথায় হাত রাখলাম। আদর করলাম। সে তাকিয়েই আছে। হয়তো ভাবছে, এরপর কি করি। হয়তো আমার মাঝে ফ্রান্সিসকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। আমি ওর ডান হাত মুখের কাছে নিয়ে এলাম। কাঁটা স্থানে চুমো দিয়ে রক্ত পরিষ্কার করতেই দেখি, সে হাসছে। ডেটল দিয়ে পরিষ্কার করে পকেটে

রাখা রুমাল দিয়ে হাত বাঁধলাম। সে হাসি মুখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমিও হাসছি।
--ক্ষুধা লেগেছে?
-- হু।
-- খাবে?
-- হু।
-- চল--
বা! আমার সাথে হাঁটতে শুরু করল। খাবার টেবিলে গিয়ে দু’জনে বসলাম। ন্যান্সি চেয়ার টেনে আমার পাশে বসল। মিসেস নজরুল হাসছেন। মনে হচ্ছে, তিনি যেন, নতুন কোন আশার বাণী পেলেন। আমার প্লেটের খাবার আবার খেতে শুরু করলাম। সে তার প্লেটের খাবার ছুঁড়ে ফেলে দিল। আমার মাখা খাবার খেতে চাইল। মনে হচ্ছে, সে যেন একটি শিশু। ভাত মেখে খেতে জানে না। ছোট বেলায় মায়ের কাছে, দাদীর কাছে আমিও এমন বায়না ধরতাম। হাত দিয়ে পর্যন্ত খেতে চাইতাম না। আমাকে মা, দাদীর হাত দিয়ে খাওয়াতে হত। ন্যান্সিও সে রকম বায়না ধরবে নাকি? সর্বনাশ! সেও বায়না ধরেছে। তাকে আমার হাত দিয়ে খাওয়াতে হবে। সে তার হাত দু’টি গুটিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বসে আছে। তার পা দিয়ে আমার পা আঘাত করল। আমি বুঝামাত্র আশে পাশে তাকালাম। কোথাও কেউ নেই। মিসেস নজরুল বুঝতে পেরেই কেটে পড়েছেন। উপায়ান্ত না দেখে হাসি মুখে আমার মাথা খাবার তাকে খাওয়াতে লাগলাম। একটা ছোট কামড়ও বসিয়ে দিয়েছে আঙুলে। আমি উঃহু করে উঠতেই সে হাসতে শুরু করল। হঠাৎ কি মনে করে তার মুখ কালো হয়ে গেল। সে তার হাত দিয়ে আমাকে খাওয়াতে চাইল। আমি হাত ধোয়ার জন্য পানি দিলাম। ও হাত ধুয়ে নিল। আমাকে খাওয়াতেই বেশ করে দিলাম এক কামড়। সে তার বাম হাত দিয়ে আমাকে ধাক্কা দিয়ে উঃহু করে উঠল। তারপর আর খাওয়াতে চাইল না। তার হাত দিয়ে সে নিজে নিজেই খেতে লাগল। আমি তাকিয়ে রইলাম তার দিকে। ভাবলাম, এত সুন্দর একটা মেয়ে অথচ মানসিক রোগী। আমার বেশ মায়া লেগে গেল। আমার কারণে সে যদি ভাল হয়, তাহলে অবশ্যই তাকে সাহায্য করা উচিত। এমনিতে বয়সটাও খারাপ, নিজের উপর নিজের তেমন বিশ্বাস নেই। মাঝে মাঝে নিজেকে পাগলও ভাবী। আমি কি পারব তাদের সম্মান রাখতে। অন্তত: চেষ্টা করে দেখি না। আমি তার দিকে তাকিয়ে আছি বলে সে আমার মুখমণ্ডল অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিল। শেষের দিকে তাকেও খাওয়ালাম--সেও আমাকে খাওয়ালো। তারপর খাওয়া শেষ করে হাসতে হাসতে তার হাত ধুয়ে দিলাম। পানি পান করালাম। সেও একই কাজ করল। তারপর যা করল তার জন্য আদৌ আমি প্রস্তুত ছিলাম না। কানের কাছে ফিসফিস করে কি যেন বলতে চাইল। আমি কান পাততেই গালে চুমো বসিয়ে দিল। আই ইক্সক্লেইমড্ উইথ জয়।

বুঝলাম, ঘটনাগুলো ঘটত ফ্রান্সিসের সাথে। সে আমাকে তাই ভেবে এই অবস্থায় যা মনে পড়ছে, তাই করছে। আমিও চুমো দিতে চাইলাম। সে লজ্জা পেল। চুমো দিতে দিল না। হাত ধরে তার রুমে নিয়ে গেল। একটা মোড়ানো কাগজ খুলে দেখাল। দু’একটা লাইন ভালোভাবে লেখা, তারপর সব হিজিবিজি--যা বুঝা সম্ভব নয়! চিঠিতে দুইটা লাইন সে লিখেছে। ফ্রান্সিস, ইউ আর বিট্রেয়ার। ইয়েট আই লাভ ইউ...।

মনে হচ্ছে, কোন চিঠি তার মন মত হয় না বলেই সে শত শত চিঠির প্যাড টুকরো করে মুড়ে ছুঁড়ে ফেলেছে এখানে-সেখানে। কয়েকটা চিঠি দেখাল। প্রত্যেকটা চিঠিতে দু’এক লাইন লিখা, তারপর কাটাকুটি। তবে একটা জিনিস বেশ লক্ষ্য করলাম প্রত্যেকটি চিঠিতে কমন একটা লাইন আছেই, তা হল--‘আই লাভ ইউ। আই লাভ ইউ ভেরী মাচ।’ ফ্রান্সিসকে যে খুব ভালোবাসত--তা বুঝা যায়।
ধারাবাহিক উপন্যাসঃ হৃদয়ের এপিঠ-ওপিঠ (পর্ব-9)
--শাশ্বত স্বপন

এত সহায়-সম্পত্তি অথচ শান্তি নাই। স্রষ্টা এখানে স্বর্গ দিয়েছেন ঠিকই কিন্তু শান্তি দেন নাই। তার বিচার বুঝা খুবই কষ্ট! কেন যে তিনি মানুষ নামের এই পুতুলকে নিয়ে খেলেন--বুঝি না। আমি বুঝি না--বুঝতেও চাই না। আমি বুঝি মানুষকে এ পৃথিবীতে বাঁচার মত বাঁচতে হলে, আগে পায়ের নিচে মাটি, তারপর টাকা-পয়সা, স্ত্রী-পুত্র--এরপর ক্রমান্বয়ে প্রাসংগিক যা প্রয়োজন হয়। ন্যান্সি তার বিছানা নিজ হাতে ঠিক করল। মাঝখানে কোল বালিশটা দিয়ে আমাকে একপার্শ্বে শুতে বলল। ও অন্য পাশে শুবে। একই বিছানায়! এবার আমি ঢোক গিলতে শুরু করলাম। যদি শোয়া অবস্থায় জড়িয়ে ধরে আর সেই মুহূর্তে মিসেস নজরুল বা বুয়া এসে হাজির হয় তবে--। কি লজ্জা! না, না শোয়া যাবে না। আমি মাথা ব্যথার একটিং শুরু করলাম।
-- কি হয়েছে? মাথা ব্যথা?
-- হ্যাঁ, খুব, তুমি ঘুমাও--আমি তোমার মাথায় হাত বুলিয়ে দেই।
-- আমার ঔষধ আছে, দাঁড়াও এনে দিচ্ছি।

ছোট বালিকার মত কথাবার্তা। কে বলবে, এর বয়স উনিশ। কিশোরী অবস্থায় মেন্টাল পেসেন্ট হওয়াতে সেই স্বভাবই রয়ে গেছে। হঠাৎ ডাক্তার এসে হাজির। আমি দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। সে এসেও একটিং শুরু করল। ন্যান্সির কাছে মাথা ব্যথা শুনে সে আমাকে মিছিমিছি একটা ইনজেকশন দিল। সেই সুযোগে ন্যান্সিও ইচ্ছে করে ইনজেকশন নিল। ডাক্তার আমাকে ওর সাথে ঘুমের ভান করতে বলল। ও একটু পরেই নাকি ঘুমিয়ে যাবে। লজ্জা আর ব্যক্তিত্বের কাছে হার মেনে, আমি তাই করলাম। ভেবে নিলাম, এটা জীবনের কোন এক রঙ্গমঞ্চে অভিনয়। নাটকের অভিনয় থেকে এটা অবশ্য বাস্তব ধর্মী এবং অনেক বেশি পারিশ্রমিক পাওয়া যাবে। ন্যান্সিকে বিছানায় শুইয়ে মাথায় হাত বুলালাম। আগামীকাল কোথায় কোথায় ঘুরতে যাব--তা নিয়ে গল্প করলাম। তার একটা হাত আমার একটা হাত ধরে আছে। সে কথা শুনতে শুনতে এক সময় ঘুমিয়ে গেল। আমি হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে উঠে পড়লাম। এক দৃষ্টিতে ন্যান্সির দিকে তাকালাম। বড় মায়া লাগল। মনে হল, বন্ধন বোধহয় এতক্ষণে বেঁধে গেছে। হঠাৎ মন বলে উঠল, ঘুমাও ন্যান্সি ঘুমাও--আমি আসব--অবশ্যই কাল আসব। তোমাকে আমি ভাল করবই। যে বিষাক্ত স্মৃতিগত জ্বালায় আমি জ্বলছি, তা তোমার কাছে আসলে যদি প্রশমিত হয়--তবে আমি অবশ্যই আসব। তোমার মাঝে যদি আমার সমস্ত প্রেম-ভালোবাসা খুঁজে পাই--তবে অবশ্যই তোমার কাছে আসব। ন্যান্সি ঘুমিয়ে আছে। আমার দিকে কাত হয়ে শুয়েছিল। সেভাবেই আছে। কি সুন্দর চেহারা! পেসেন্ট হবার আগে না জানি কত সুন্দর ছিল। তার মুখের উপর আল্পনার স্মৃতি-ছায়া ফেললাম...। চোখ আর্দ্র হয়ে এলো। ডাক্তার পিছন থেকে ডাকলেন। তার সাথে চললাম খাবার টেবিলে। উনি খেতে বসলেন। আমি দাঁড়িয়ে রইলাম তার পাশে। দেহে-মনে ক্লান্তি অনুভব করলাম।
-- আমি আসি।
-- এক্ষুণি যাবে? ও হ্যাঁ, অনেক রাত হয়ে গেছে।
মনে মনে ভাবলাম, জন্ম আমাদের অন্ধকারে। অন্ধকারের সরু ভয়ঙ্কর পথ ধরেই আমাদের যাতায়াত। রাত আর দিন--দু’টাই আমাদের কাছে সমান। ডাক্তার মিসেস নজরুলকে ইশারা করতেই সে আমাকে তার হাতের ডায়েরীটা দিল। ডাক্তার খাবার রেখে আমাকে বলল,
-- তুমি কি মনস্থির করেছ?
-- না-হ্যাঁ এর মাঝামাঝি আছি। ভেবে দেখি, আজ রাতটা।
-- ডায়েরীটা তুমি পড়বে। ন্যান্সি আর ফ্রান্সিস--ওদের সম্পর্কের সব জানতে পারবে। ডায়েরীর ভিতরে ছয় পৃষ্ঠার একটা নিবন্ধ দেওয়া আছে। এখান থেকে ওর জন্ম ও তার পরবর্তী সময় সম্পর্কে বুঝতে পারবে।
গম্ভীর হয়ে রইলাম। উনি আরো কিছু কথা বললেন। যা আমার মাথায় ঢুকল না কানের ভিতর ঢুকল বুঝলাম না। বিদায় নিলাম। মিসেস নজরুল হাসি মুখে আমাকে নিয়ে নিচে নামলেন। ড্রাইভারকে ডাকলেন। গ্যারেজ থেকে নতুন মডেলের একটা গাড়ি বের হল। গাড়িতে উঠতে বলল। একটা বক্স আমার হাতে দিলেন তিনি। ‘এটা রাখ। বাবা, আমি জানি তুমি পারবে। আজকের ঘটনা দেখে ও শুনে আমি বিশ্বাস করি ও ভাল হবে। ও তোমার মাঝে ফ্রান্সিসকে দেখেছে।’ আমি কিছুই বললাম না। শুধু মনে মনে অনুচ্চারিত কিছু কথা হৃদয় থেকে কর্ণকুহরে সঞ্চালিত হল। মিসেস চৌধুরী, আপনি জানেন না, আমার বাবা একজন পরাজিত সৈনিক, আমি একজন পরাজিত সৈনিক। আমার নিজের প্রতি যেখানে সামান্য বিশ্বাস নেই, সেখানে আপনার বিশ্বাসের মর্যাদা কি করে দেব? আরশোলা হয়ে যদি ঢুকি, তবে বাঘ হয়ে বের হব। সময়ের কাছে পরাজিত হয়ে আজ আমি হয়ে উঠেছি অর্থলোভী, হিংসুটে। প্রতিটি মানুষ সুখী হতে চায় কিংবা চেষ্টা করে। আমি চাই--চাই একটা পছন্দসই মন, সম্পত্তি, প্রতিপত্তি, সম্মান--সর্বোপরি আজকের যুগে যারা অমানুষ হয়েও মানুষ হিসেবে সম্মানিত, পূজনীয় তাদের মতো একজন মানুষ হতে চাই। আমি মহৎ হতে চাই না। আর মহৎ ব্যক্তি হওয়া কোনদিনই আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আমার এমন মেধা নেই যে, যা দিয়ে কিছু করব। টাকা নেই, সম্মান নেই, পেটে অন্ন তথা পায়ের নিচে মাটিই নেই। চোখ বুঁজে এখন পারি, বড় কোন রাস্তায় ট্রাকের আশায় শুয়ে থাকতে। জানি, এটা মহাপাপ, কাপুরুষতা। কিন্তু আত্মহত্যা করাও তো কম সাহসের কথা নয়। আমার জীবনের দুঃখ স্মৃতির একশত ভাগের দশ ভাগ যদি স্মরণ করি তখনি আমার সারা শরীর কাঁপতে থাকে। সামনের জীবনের দিকে তাকিয়ে তখন শুধু পানি আর পানি দেখি--মাটি নাই--আশা নাই। পরজীবীর মতো ঘৃণা সইতে সইতে চাচার বাসায় কতটা বছর ছিলাম। তিক্ততায় মুখ ভরে আসে। দেড় কোটি বেকারের এদেশে, চার-পাঁচ বছরের শিশু শ্রমিকের এদেশে, ভাওতাবাজি রাজনীতির এদেশে, ইতিহাস বিকৃতির এদেশে, হা-ভাতের এদেশে, দুর্নীতির এদেশে--এখন শুধু পারি, ধনী কোন ব্যক্তির জন্য জীবন উৎসর্গ করতে। প্রতিদিনের আত্মপ্রচার করা ভণ্ড মিছিলের সম্মুখে থেকে বোমার আঘাতে ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারি। তাতে পত্রিকার পাতা ভরবে দলের সদস্যরা আরো হৈ চৈ বাঁধাতে পারবে। সুযোগ সন্ধানী নেতা তথা তার দল আমার মৃত লাশ আর রক্তের উপর সিঁড়ি বানিয়ে ক্রমাগত উঠতে থাকবে তার তথা তাদের কাঙিক্ষত লক্ষ্যে। একটি লাশ নিয়ে হয়তো দুই-তিনটি দল করবে টানাটানি। কেউ আমার মাথা নেবে, কেউ পা নেবে, কেউ হাত নেবে। আর যে দল পাবে না--তারা আমার ছবি দিয়ে তাদের খায়েস মিটাবে। এভাবে আবহমানকাল ধরে যা চলছে তাই চলবে। এর কোন বিরাম নেই। আমি এভাবে মরব না। আর যদি মরি, তবে আমাদের ঐ শিশু শ্রমিক, কুলি-মজুর, রিকসাওয়ালা, বেকারদের নিয়ে যারা ব্যবসা করে তাদের একটাকে অন্তত: শেষ করব। আর যদি বাঁচি, তবে বাঘের মত বাঁচব। জনারণ্যেই হাঁটব, যদি কেউ বাঘ বলে গুলী করে--মরব। তবুও বাঁচার মতো দু’দিনই বাঁচব। রাজধানী দখল করলে যেমন পুরো দেশই দখল হয়; আমি তেমনি এ বাড়ির রাজধানী দখল করব।

ধারাবাহিক উপন্যাসঃ হৃদয়ের এপিঠ-ওপিঠ (পর্ব-10)
--শাশ্বত স্বপন

আবেগ মানুষকে কত কি ভাবায়। সব কি সত্য হয়? মানুষ ভাবে এক, হয় আরেক। ভালোবাসার কথা ভাবলাম। মাত্র একদিনেই ন্যান্সির জন্য মনটা কেমন করছে। আমি কি ওকে ভালোবেসে ফেলেছি? এ কি করে সম্ভব!। শোষক আর শোষিতের মধ্যে যে সেঁতু থাকে সেতো ভালোবাসার নয়--ঘৃণার, হিংসার। গাড়ি ছেড়ে দেবার মুহূর্তে মিসেস নজরুলকে সালাম দেইনি। নিজের চিন্তা-ভাবনা আর আবেগের উপর দশটা গালি দিলাম। মনে মনে থুথুও ছুঁড়ে মারলাম। আমার বিবেক আমাকে বলছে--
-- তুমি জান না, তুমি কি আগুন নিয়ে খেলতে যাচ্ছ।
-- না, আমি জানি, সব জানি। পরাজিত সৈনিকের বিজয় দেখতে চাই।
-- টাকা, সম্পত্তি, সম্মান, ভালোবাসা তোমাকে ভালোবাসলেও সুখ-শান্তি তোমাকে কোনদিন ভালোবাসবে না।
-- আমি সুখ চাই না, শান্তি চাই না--আমি বড় হতে চাই।
-- তুমি কি সত্যিই যাবে?
-- হ্যাঁ, যাব।
-- আল্পনাকে ভুলে গেছ?
-- অসম্ভব, কোনদিনই না।
-- আজ রাতটা ভেবে দেখ।
হ্যাঁ, ভাবব, তবে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন হবে বলে মনে হয় না কারণ পঁচিশ বছরের পরবর্তী বছরগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে আমি সন্দিহান। পায়ের নিচে মাটি নেই। ছোট ভাইটাকে পারি না খরচ দিতে। নিজের পেটটাকে পারি না দু’বেলা খুশি করতে। মৃত্যুর পূর্বে তখন সম্মুখের কাউকে লক্ষ্য করে বলব, ছাপান্ন হাজার বর্গমাইলের বাংলাদেশে আমার জন্য, আমার অধিকারের সাড়ে তিন হাত ভূমিও নেই। এসবই তো মানুষের জন্য--সৃষ্টিকর্তা মানুষের জন্যই তো এসব কিছু সৃষ্টি করেছেন। এসব কিছু তো মানুষের জন্যই সিদ্ধ--তবে আমার জন্য কেন এসব নিষিদ্ধ? আমি কি মানুষ নই?
আমার বিবেক আমার যুক্তির কাছে হার মেনে চুপ করে আছে। যুগে যুগে প্রত্যেকের বিবেক প্রত্যেকের কাছে হার মানতে মানতে এক সময় বিবেকই বিলুপ্ত হয়ে যাবে। সবাই হবে তখন বিবেক বর্জিত। বিবেক বর্জিতদের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়বে--কমবে না। বিবেক দিয়ে মনুষ্যত্ব বাড়ানো যায় কিন্তু আজকের যুগে মানুষ নামক প্রাণিটিকে টিকিয়ে রাখা যায় না।
হঠাৎ গাড়ি থামাতে বললাম। ড্রাইভারকে বড়লোকী স্টাইলে ৫৫৫ সিগারেট কিনতে বললাম। ম্যাচও আনতে বললাম। পকেটের পুরো টাকা খরচ করলাম। বিবেককে হারিয়েছি। বড় আনন্দ লাগছে। আমি বড়লোক হব কিনা জানি না, তবে ধনী হতে পারব। কাল থেকে হবে যাত্রা শুরু। গাড়ি ইত্তেফাকের মোড়ে আসতেই তাকে থামতে বললাম। ‘‘আমি হেঁটেই যেতে পারব”--একথা বলে ড্রাইভারকে বিদায় করলাম। ড্রাইভার আমাকে নামিয়ে দিয়ে চলে গেল। আজও সিঁদুরকে পড়াতে যাওয়া হয়নি। দুই মাস না যেতেই এত বন্ধ! টিউশনিটা বোধহয় বন্ধ হয়ে যাবে। যাক না বন্ধ হয়ে। টিউশনি করার দরকার নেই। এখন শুধু ন্যান্সি আর ন্যান্সি। এটই আমার এম.এ কোর্স। এখান থেকে হয় এম.এ পাস করব, নয়তো ফেল করব। লক্ষ্য আমার এখন বড় হওয়া। কেউ ডাক্তার, কেউ ইঞ্জিনিয়ার, কেউ নেতা, কেউ ব্যবসায়ী হয়ে, কেউ মানুষের ভালোবাসা ও বিশ্বাস কিনে বেঁচে বড় হয় বা হতে চায়। আমি বিশ্বাস এর শিকড় ধরে ভালোবাসার সেঁতু বেয়ে বড় হতে চাই। এখানে আমার অর্থগত মূলধন নেই; অথচ পাব খাদ্য, ভালোবাসা, বেতন আর রিটায়ার্ট শেষে বিরাট সম্পত্তি ও সম্পদ। বড় হওয়ার জন্য সম্মুখে প্রশস্ত পিচ্ছিল পথ। সাবধানে পথ চলতে হবে। বেশি আশা করা বোধহয়, ঠিক হচ্ছে না। ভাগ্য বিধাতা ক্ষেপে গেলে শেষে দুঃখ ছাড়া কিছুই ঘটবে না। স্বপ্ন দেখতে বাঁধা কোথায়? আমাদের হা-হুতাশ জীবনে স্বপ্নের চেয়ে সান্ত্বনার মতো বড় আপন আর কে আছে? সবাই বড় হবার স্বপ্ন দেখে। দেখতে দেখতে এক শত তলা বিল্ডিং গড়ে। সেটা ঘুম ভাঙ্গলেই ভেঙ্গে যায়। তাই আবার গড়ে। ভাঙ্গা আর গড়া নিয়েই আমাদের স্বাপ্নিক জীবন। জীবনের অর্ধেক, হয়তো অর্ধেকের বেশি (যদি এ দুঃসহ জীবন চল্লিশ-পয়তাল্লিশ বছর লাস্টিং না করে) সময় সততা, বিদ্যা, দুঃখ-কষ্ট আর টিউশনি নিয়ে কাটিয়েছি। সেই সততা, বিদ্যা, দুঃখ-কষ্ট যখন আগত ভবিষ্যতের সুখ-শান্তির নিশ্চয়তা দিতে পারে না, তখন ঘৃণা করি সততা আর বিদ্যাকে। আমি ভালোবাসি বাস্তব, বিশ্বাস করি চক্ষু সম্মুখের বাস্তবকে। অবাস্তব আর অবিশ্বাসকে একেবারে উড়িয়ে দিচ্ছি না। কারণ আমি জানি, অবাস্তব আর অবিশ্বাসকে একেবারে উড়িয়ে দিতে গেলে বাস্তবের আর বিশ্বাসের মূল আর শাখা-প্রশাখায় টানা-হেঁচড়া শুরু হয়ে যাবে।

যারা বেশি জানে, বেশি বুঝে--তাদের বেশি ভুল হয়। কারণ তারা যেহেতু বেশি বুঝে--তাই তারা তাদের ভুল বেশি ধরতে পারে। আর যারা কম জানে, কম বুঝে--তারা কম ভুল করে। কারণ তারা তাদের ভুলগুলোকেও সঠিক মনে করে--যেহেতু তাদের বিচার, বোধ শক্তি কম। আমি বেশি বুঝি, না কম বুঝি--তা জানি না। তবে এইটুকু বুঝি, মাঝে মাঝে সময়ের প্রয়োজনে অনিচ্ছা সত্ত্বেও মানুষকে ভুল করতে হয়--আমিও করি। জেনে শুনেও মানুষ যুগ যুগ ধরে মিথ্যাকে প্রতিপালন করে আসছে। মিথ্যা হচ্ছে সত্য আর সত্য হচ্ছে মিথ্যা। আমি জানি, আমার বিচার শক্তি কম আর বিবেক শক্তি তো হেরেই যায়। তাই আমি সত্য আর মিথ্যার মাঝামাঝি। সত্য আমাকে ঠাঁই দিতে পারছে না বলে কখনও মিথ্যার কাছে ছুটে যাই। আর মিথ্যা না পারলে সত্যের কাছে। সুবিধাবাদী হয়েও সুবিধা করতে পারছি না। তাই নতুন নতুন কৌশল নিয়ে এগোচ্ছি সামনের দিকে, যেখানে মিথ্যার ভীড়ে সত্য কাফনের কাপড় পড়ে ঘুমিয়ে আছে।
আমি আগামীকাল এমন এক কাজে যাচ্ছি, যে কাজ থেকে আর হয়তো ফিরব না। পিপীলিকার পাখা গজালে যেমন আগুন খেতে চায়--আমিও তেমনি এক পিপীলিকা সদৃশ। আমিও আগুন খেতে চাই--হজম করতে চাই। পারব কিনা জানি না। মাটির মানুষ আমি। মাটিই পারে আগুন চাপা দিয়ে রাখতে। আবার মাটিই পারে তার বুকে আগুন জ্বালিয়ে রাখতে। এদেশে অসংখ্য পরাজিত সৈনিক। পরাজিত সৈনিকের পরাজয় দেখার মতো মানুষ এদেশে খুব কমই আছে। না খেয়ে মরে গেলেও আজকাল কেউ সাহায্য দেয় না। আর যদিও বা দেয়, তাও পার্থিব বা আধ্যাত্মিক স্বার্থে।

ধারাবাহিক উপন্যাসঃ হৃদয়ের এপিঠ-ওপিঠ (পর্ব-11)
--শাশ্বত স্বপন

স্বার্থ ছাড়া পৃথিবীর কোন কাজ হয় না। এই যে, মা-বাবা-সন্তান--এখানেও স্বার্থ আছে। একজন নারী মা হওয়ার জন্য সন্তান গর্ভে ধারণ করে। তারপর সন্তান ভূমিষ্ঠ হলে লালন-পালন করে। আবহমান কাল ধরে পৃথিবীতে এ প্রথা চলে আসছে। সমাজে নারী সন্তানহীন হলে, তার কোন মূল্য নেই। বৈয়াকরণবিদরা ব্যাকরণে সন্তান না হলে, নারীকে বিশেষিত করেছেন বন্ধ্যারূপে। সন্তান জন্ম হয়ে মারা গেলে (অর্থাৎ যে নারীর সন্তান বাঁচে না) বিশেষিত করেছেন মৃতবৎসারূপে। আর, একটি মাত্র সন্তান হওয়ার পর জীবনে যদি আর কোন সন্তান না হয় তবে সেই নারীকে বিশেষিত করেছে কাকবন্ধ্যারূপে। পুরুষের কারণে সন্তান না হলে বা পুরুষের সন্তান না থাকলে কি বিশেষণ আছে--তা আমার জানা নেই। তবে সন্তান জন্মের ব্যাপারে পুরুষ অক্ষম হলে, সে সমাজের চোখে হাস্যকর কোন বস্তুরূপে বিবেচিত হয়। অতএব, মা-বাবার স্বার্থ পুত্র-কন্যার উপস্থিতি, তাদের সুপ্ত ভালোবাসা ঢেলে দেওয়া। তারপর বার্ধক্যে সেবা-যতেœর স্বার্থ থাকে। জন্মের পর শিশুর স্বার্থ মা-বাবার সন্তান বাৎসল্যতা। যে স্বার্থ ছাড়া সে বাঁচতে পারে না। সন্তানহীন নারী পারে না, পূর্ণাঙ্গ নারীরূপে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে। পুরুষ পারে না, নিজেকে পুরুষ ভাবতে। অতএব, জন্মে স্বার্থ--জন্মান্তে স্বার্থ। স্বার্থ ছাড়া পৃথিবী অচল, মানুষ অচল। আমি এই মহা মূল্যবান স্বার্থকে উদারনীতিতে ভাবব কেন? আমার স্বার্থও আমি দেখব, দশজনে যেমন দেখে। ক্ষমতার জন্য যেখানে নেতা-নেত্রীরা মানুষকে মানুষ ভাবে না। যেখানে তারা মানুষকে ভাবে উপরে উঠার সিঁড়ি। যাদের উপর ভর করে ক্ষমতায় যাওয়া--তাদের জীবন নিয়ে তারা করে ছিনিমিনি খেলা। আমি কারো জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলিনি। বরং আমাকে নিয়েই অনেকে খেলেছে। রাষ্ট্রও আমাকে তথা আমাদের নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে। আমি একটা মেন্টাল পেসেন্টকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনব। ভালোবেসে তার হৃদয় জয় করব। ভালোবাসায় স্বার্থ থাকুক তাও ভাল; তবুও সন্ত্রাস ভাল না--দুর্নীতি ভাল নয়--কালোবাজারী ভাল নয়।
রাত এগারটা বেজে গেছে। ইত্তেফাকের মোড় থেকে শাপলা চত্বর পর্যন্ত হাঁটলাম। তারপর ভাবতে ভাবতে মেসে আসতে লাগলাম। রুমে এসে চিন্তা করতে পারব না। সেলিমের বকবকানি আর টেপের গান--দু’টাই চিন্তা কেড়ে নেবে। সেলিম একটা মেয়েকে ভালোবাসে। আগে মেয়েটি তাকে মোটেও ভালোবাসতো না। এখন ভালোবাসে। তার বিশ্বাস, সে ফকির-টকিরের মাধ্যমে মেয়েটির মন জয় করেছে। আমার এসবে বিশ্বাস নেই। আমি তার কথায় শুধু সায় দিয়ে গেছি। ঢাকাতে এক বিখ্যাত রাজনীতিবিদের মেয়ের সাথে তার পরিচয় আছে। দু’জনে গান শিখত কোন এক সংগঠনে। মেয়েটির বাবা মন্ত্রী হবার পর এখন তাদের সাথে শুধু টেলিফোনে যোগাযোগ। তার কথাবার্তায় বুঝা যেত মেয়েটির সাথে তার ভাল টার্ম ছিল। কারণ দু’জনেই বস্তুবাদী ছিল। এই মেয়ের সাহায্যেই সে চাকুরি পেয়েছে। চাকুরি পাবার তিন-চার মাস পরে সে হঠাৎ একদিন বলল, এই মেসে সে থাকবে না। একটা হাইফাই ফ্লাট ভাড়া নেবে। গ্রামের সেই বিশ্ব সুন্দরীকে সে ফ্লাট দেখাবে। বিশ্ব সুন্দরী এই কারণেই বললাম, তার কাছে সেই মেয়ে নাকি পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি সুন্দরী মনে হয়। আমি অবশ্য প্রশ্ন করেছিলাম,
-- মন্ত্রীর মেয়ের চেয়ে সুন্দরী?
-- না, তা নয়।
-- তবে বিশ্ব সুন্দরী হলো কি করে?
-- তা তুই বুঝবি না।
-- এই মেয়ে ছেড়ে মন্ত্রীর মেয়েকে ধর।
-- বলিস কি, এটা সম্ভব?
-- কেন তোরা দু’জনেই তো বস্তুবাদী।
-- বস্তুবাদী হলেই হল? এটা সম্ভব নয়।
-- তাহলে শিউলী কি করে সম্ভব হল?
-- বাদ দে, তুই যখন তাবিজ-কবজ বিশ্বাস করতে চাস না--করিস না।
-- না করি তো, তোর তাবিজ-কবজ দিয়ে আমাকে একটা চাকুরি দে না।
-- চাকুরি-বাকুরি তাবিজ-কবজ দিয়ে হয় না।
-- শুধু ভালোবাসা হয়?
-- হ্যাঁ।
তাঁর সাথে যখন রুমে উঠি তখন সে নিজেকে নাস্তিক বলে বেশ জ্ঞানী ভাব দেখাত। অবশ্য সব নাস্তিকরাই নিজেদেরকে জ্ঞানী ভাবে। ভাবে, সে যা বুঝে যা সে বিশ্বাস করে--সেটাই সত্য--সেটাই সঠিক। ব্যাঙ যেমন কুয়াকে পৃথিবী ভাবে--তারাও তেমনি। তখন শিউলী সেলিমকে ভালোবাসত না। যেই না মেয়েটি তাকে ভালোবাসতে শুরু করেছে, তখনি সে সিগারেটসহ সকল ধূমপান ছেড়ে দিল। আধূনিক-এর সদস্য হল। কারণ শিউলী তাকে এসব খেতে নিষেধ করেছে। অথচ এক সময় সৃষ্টি আর সৃষ্টিকর্তা সম্পর্কে এমন সব নাস্তিকবাদী কথা বলত--যা শুনলে কট্টর নাস্তিকও হাসত। আর আজ মসজিদ আর জায়নামাজ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে উঠে। আমি অবশ্য তেমন কিছু মনে করিনি। এরকম বহু নাস্তিক দেখেছি, শুনেছি--যারা যৌবনে কিংবা কৈশোরে বেশ গলাবাজি করে কিন্তু বার্ধক্যে কোরান, গীতা আঁকড়ে ধরে কাঁদে। জায়নামাজ, গীতার পাতায় চোখের জল ফেলে। সেলিমের বেলায় অবশ্য একটু অবাক লেগেছিল। এত তাড়াতাড়ি সে মসজিদে ফিরে আসবে, ভাবিনি। আমি একদিন জিজ্ঞাসা করেছিলাম--
-- কি রে তুই না নাস্তিক?
-- তাতে কি? নামাজ পড়তে অসুবিধা নেই। মুসলমান হয়ে জন্ম নিয়েছি তো।
-- মুসলমান হয়ে জন্ম নেওনি, মুসলমানের ঘরে জন্ম নিয়েছ।
-- ঐ একই কথা।
-- নাস্তিকের কোন ধর্ম নেই। নাস্তিকরা তো নামাজ পড়ে না।
-- বাদ দে ওসব। এমন অনেকেই বলে। বার্ধক্যে এরাই বেশি নামাজ পড়ে।
-- তুই তো এখনও বার্ধক্যে আসিসনি।
-- হতে আর কয়দিন। যে কোন মুহূর্তে মরে যেতে পারি।
-- বলিস কি! তাহলে তোর শিউলী?
-- ঠাট্টা রাখ, ভালোবাসার তুই কিছু বুঝিস না। ভালোবাসিসনি তো?
--আমার চেয়ে বেশি ভালো কে বাসতে পারে? তুই জানিস না সেলিম, আমি কি রকম ভালোবাসতে পারি।
--রকম ভালোবাসা বুকে নিয়ে আজো বেঁচে আছি। সে আমি জানি--আর জানে প্রেম-স্রষ্টা।
-- তুই কি আমার কথায় দুঃখ পেয়েছিস? আরে আমার কথা আর পাগলের কথার মধ্যে কোন পার্থক্য আছে?
রোজার মাসে সে এমন সংযমী হল--যা চিন্তাও করা যায় না। তিরিশটা রোজা নিখুঁতভাবে রাখল। দান-খয়রাত, নামাজ-রোজা, তপজী জপা--যেভাবে চলল তাতে আমার মনে হল--‘উনি বোধহয় পৃথিবীতে আর থাকবেন না’। এক মাস সে কোন গান গাইলও না, কোন গান শুনল না। তার বড় সখ হল, সে হজ্জ্ব করবে। তার নামের আগে আলহাজ্ব শব্দটা থাকবে। তার নাম হবে আলহাজ্ব মোঃ সেলিম সিকদার। অবশ্য টাকার অভাবে তার আশা দীর্ঘনিঃশ্বাস হয়ে রইল।

ধারাবাহিক উপন্যাসঃ হৃদয়ের এপিঠ-ওপিঠ (পর্--12)
--শাশ্বত স্বপন

রুমে ঢুকার সাথে-সাথে আমার প্রিয় গান কানে ভেসে এল। ‘আমি জেনে-শুনে বিষ করেছি পান...।’ হ্যাঁ, আমি জেনে-শুনেই বিষ পান করতে যাচ্ছি। সেলিম তার বিছানায় শুয়েছিল। আমাকে দেখেই চিৎকার করে উঠল। আমাকে জড়িয়ে ধরে দু’গালে চুমো বসিয়ে দিল। চিৎকার করে বলল, শিউলীর চিঠি এসেছে। হায়রে সেকি আনন্দ! রসগোল্লা পর্যন্ত কিনে এনেছে। সবকিছু ভুলে ওর আনন্দে যোগ দিলাম। ও ক্যাসেট চেঞ্জ করে ইংরেজি গান ছাড়ল। নৃত্য শুরু করল। শিউলীর পাঠানো চিঠিটা চারবার আমাকে পড়ে শোনাল। তারপর বুকের বোতামটা খুলে গেঞ্জির নিচে চেপে বিছানায় গড়িয়ে পড়ল। এরকম পাগল না দেখলেও এদের পরিণাম সম্পর্কে আমার ধারণা স্পষ্ট। আমি বললাম--
--এত সুখ তোর সইবে নারে।
--দোস্ত, দোয়া কর। আমি এখনই নামাজ পড়ব।
--আরে বারটায় কিসের নামাজ?
-- আরে তুই বুঝবি না।
-- তবে এইটুকু বুঝি নামাজ কেন তুই পড়িস।
-- দেখ, কি করা যায় সেই চিন্তা কর। আগামী মাসে শিউলী আসবে।
সেলিম নামাজ-রোজা করে। আমি কিছুই করি না। ও স্রষ্টাকে ভয় পায়--আমিও ভয় পাই। সারা দিন পর রাতে যখন ডায়েরীতে কিছু লিখি তখন দুই-একটা মিথ্যা কথা ছাড়া আর কোন পাপ আমি দেখতে পাই না। হয়তো অজান্তে অনেক পাপ করি--যা বিবেচনায় ধরি না। অথচ সেলিম অলরেডি ঘুষ খাওয়া শুরু করেছে। সে এটাকে ঘুষ না বলে ‘উপরি’ বলে। ও আস্তিক আমিও আস্তিক। আস্তিকের সংজ্ঞায় আমরা দু’জনেই পড়ি। ও মুসলমান বলে নিজেকে মনে করে কিন্তু আমার সে ব্যাপারে সন্দেহ আছে। ও আসলে ধার্মিক, না ভণ্ড ধার্মিক, নাকি ধর্মের আবরণে ব্যবসা করছে--আমি স্পষ্ট বুঝতে পারছি না। মানুষের বাহ্যিক আচরণ দিয়ে তার অন্তর বিচার করা যায় না। সে তাবলীগে ছুটোছুটি করে। অথচ আমি কোন ধর্মের ছায়াঘেষাও নই। আমি চন্দ্রগুপ্ত এর প্রধান মন্ত্রী চাণক্য পন্ডিত (বিষ্ণুপদ দত্ত) এর অমর বাণী সব সময় মনে রাখি, ‘মন পবিত্র থাকলে পবিত্র স্থানে গমন অর্থহীন’। আমি মনে করি, অপবিত্র মনের মানুষেরাই পবিত্র স্থানে বেশী ছোটাছুটি করে, এত স্রষ্টা সন্তুষ্ট হয় বলে আমার মনে হয় না। নিজের স্বার্থে, স্রষ্টাকে সন্তুষ্ট করার জন্য নিষ্পাপ ব্যক্তির চেয়ে পাপী ব্যক্তিরা অন্ধের মত মসজিদ-মন্দির-মাজার-পীর আওলিয়া-পুরোহিদ সহ আরো নানা স্থানে এবং নানা ব্যক্তির কাছে ছুটছে। যেখানে মানুষ না খেয়ে মরছে--জীবন যেখানে মৃত্যুতুল্য--মানুষ যেখানে বেড়েই চলেছে--অন্যায় যখন স্রষ্টার মসজিদ-মন্দিরেই ঘটছে--সেখানে টিকি, দাঁড়ি, টুপি দিয়ে এসব সমস্যার সমাধান হবে না। সমাজ পরিবর্তনশীল, মানুষের মন-মানসিকতা পরিবর্তনশীল। এ স্বাধীন হৃদয়কে পুরনো খাঁচায় মিছে আবদ্ধ করে লাভ কি? সে যখন খাঁচায় থাকছে না--থাকতে চাচ্ছে না, তখন বাইরের মুক্ত আলোতেই সত্য তুলে ধরা উচিত। সেলিম জেনে শুনেই পাপ করে। আবার নামাজ-রোজাও করে। তার কাছে এটাই আজকের নিয়ম। একেবারে সাধু হয়ে বর্তমানে টেকা যায় না। কথা ঠিকই। কিন্তু বর্তমান এমন হল কেন? এতো একদিনে হয়নি। ধর্ম যখন ব্যবসার দ্রব্য হয়ে যাচ্ছে তখন কি লাভ এসব ঠেকিয়ে? এতো স্রষ্টা ছাড়া মনুষ্যজাতীর পক্ষে সম্ভব নয়। আমরা তাকেই ডাকি।
শিউলী আসবে আগামী মাসে। বদরুন্নেসা ও ভিকারুন্নেসা কলেজে ভর্তি টেস্ট দেবে। থাকবে ঢাকাতে--তার এক কাকার বাসায়। শিউলীকে দেখানোর জন্য তার ভাষায় হাইফাই একটা ফ্লাট দেখতে হবে। বিগত আট বছর ধরে সে এই মেয়েটির পিছনে লেগেছিল। এস.এস.সি পরীক্ষার পর সে সেলিমের স্বপ্নও থেকে বাস্তবে ধরা দিয়েছে। অতএব, কেন সে এত পাগল--তা আমি উপলব্ধি করতে পারি। আজ ন্যান্সির ব্যাপারে ওকে কিছু বললাম না। ওর যা অবস্থা তাতে বমি করার সম্ভাবনা আছে। হয়তো চিৎকার শুরু করে দেবে। সেলিম নামাজের ভঙ্গিতে কি যেন প্রার্থনা করল। তারপর টেপটা বুকের কাছে এসে গান ছাড়ল--“ওগো মোর মধুমিতা...।” নতুন রেকর্ড করা ক্যাসেট। গান শেষ হওয়ার সাথে সাথে আমাকে জানাল, শিউলী ফ্লাট রুমে ঢুকার সাথে সাথে যেন, এ গানটা আমি ছাড়ি। আমি সায় দিলাম। সে কখনো একাত, কখনো ওকাত হচ্ছে। বালিশটা বুকের কাছে নিয়ে শিউলী প্রতীক ভেবে জড়িয়ে ধরছে। গ্লাসে গ্লাসে ওরস্যালাইন খাচ্ছে। সন্ধ্যা হতে তার ডায়রিয়া। বারবার পায়খানায় যাচ্ছে। কিছুক্ষণ পর পর তার মনের মত সাজানো জিনিসের নাম বলছে। কি কি দিয়ে রুম সাজাবে তার লিস্ট আমাকে শোনাচ্ছে। এখনও একমাস বাকী। যেভাবে লিস্ট শুরু করেছে-- সেভাবে প্রতিদিন যদি করতে থাকে তাহলে পঞ্চাশ বাই চল্লিশ ফুট রুমে, সেগুলোর জায়গা সংকুলান হবে কিনা সন্দেহ। হায়রে প্রেম! আমার কাছে ‘পুতুলের বিয়ে’ খেলার মতো মনে হয়। সে আনন্দে আছে। সে তার শিউলীকে পাবে--এই চিন্তায় সে বিভোর। তার ভালোবাসা তার বিশ্বাসকে খাট করে দেখার অধিকার আমার থাকা উচিত নয়। বারবার বিরক্তির ফলে ডায়েরী পড়তেও পারছি না। তাই অনেকটা জোর করে তার ছোট্ট ডিসপেনসারী থেকে ঘুমের একটা ট্যাবলেট খাওয়ালাম। তার মামার ঔষধের দোকান। সে দোকান থেকে প্রায়ই ঔষধ এনে এই ছোট ডিসপেনসারীতে রাখে। সে ঘুমাতে চেষ্টা করছে। টেপে বেজে চলেছে জগন্ময় মিত্রের গান। আমি কাত হয়ে ডায়েরীর প্রথম একটা পাতা মনোযোগ সহকারে লক্ষ্য করলাম।
নূসরাত চৌধুরী (ন্যান্সি)
৬৬, কামাল আতাতুর্ক রোড, বনানী
ফোন নং: ৪০৩৩০৪, ৪০৪৪৯২
প্রায় সবই ইংরেজিতে লেখা। মাঝে মাঝে বাংলা। বুঝা যাচ্ছে, সে ইংলিশ মিডিয়ামের ছাত্রী ছিল। বাংলা হাতের লেখা মোটেই পরিস্কার না। প্রথম পাতার উপরে তারিখ দেওয়া ০১.০২.৮৪। মানে আজ থেকে দশ বছর আগে। ডাক্তার বলেছেন তিন বছর যাবৎ মেন্টাল পেসেন্ট। তার মানে ’৯১-’৯২ থেকে ’৯৪। হঠাৎ সেলিম ঘুম থেকে জেগে উঠল। তার পায়খানা ধরেছে। চোখে তার রাজ্যের ঘুম। ট্যাবলেটটা খাওয়ানো ঠিক হয়নি। কি করব? যেভাবে পাগলামী শুরু করেছে তাতে সারা রাতেও ঘুমাতে পারত কিনা সন্দেহ। বাথরুম থেকে ফিরে এসে বলছে, আবার যেতে হবে। আবার বাথরুমে গেল। ফিরে এসে বলল, মাথা ভার ভার লাগছে। আমি ওকে শোয়ালাম। ওরস্যালাইন খাওয়ালাম। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলাম। না, উঠছে না। বিছানায় পায়খানা করলে করুক। সকালে ওকেই ধুতে হবে। তবুও ঘুমাক। একটি মেয়ে গ্রাম থেকে শহরে আসবে ভর্তি পরীক্ষা দিতে। চান্স পাবে কিনা কে জানে। ভর্তি পরীক্ষার কারণে সে সেলিমের সাথে দেখা করবে। তাতেই সেলিম কি মহাখুশি। আর যদি অন্য কিছুর অফার দেয়, দ্যাট মিনস পালিয়ে যাওয়া, বিয়ে--তাহলে নির্ঘাৎ উন্মাদ হয়ে যাবে। এই মেয়ে তার আশা-আকাক্সক্ষার সাথে নাও মিলতে পারে। ভাল লাগা, ভালোবাসা, বিয়ে--তিনটাই ভিন্ন বিষয়। নারী কি চীজ, সেলিম হয়তো জানে না। আমি জানি, ও না জেনে বিষপান করতে যাচ্ছে। আর আমি জেনে শুনে বাস্তবকে বুকে আঁকড়ে ধরে বিষপান করতে যাচ্ছি। আমি জানি, এখানে আমার জয়-পরাজয় দু’টাই অপেক্ষা করছে। সেলিম জয় ছাড়া এখন আর পরাজয়ের কথা ভাবছে না। সে জানে, যাদুর ফলে শিউলী তার জীবনে বন্দি। যে বিশ্বাসে সে পূজা করে--তা করুক না--তাতে আমার কি? তবে এ বিশ্বাস যেন অন্যতে সঞ্চালিত না হয়--এ বিশ্বাস যাতে খুনা-খুনির পর্যায়ে না যায়-- সে জন্যই আমার মাথা ব্যথা।

ধারাবাহিক উপন্যাসঃ হৃদয়ের এপিঠ-ওপিঠ (পর্ব-13)
--শাশ্বত স্বপন

মনোযোগ সহকারে ডায়েরী পড়া শুরু করলাম। ডাক্তারের দেওয়া ছয় পৃষ্ঠার কাগজটাও পাশাপাশি পড়তে লাগলাম। জন্ম তারিখ ও প্রিয়-অপ্রিয় কিছু জিনিস--যা ন্যান্সি পছন্দ করে। তার প্রিয় ফল আপেল। আমার সাথে মিলে গেছে। মাঝে মাঝে কাঁটাছেঁড়া--এমনভাবে লেখা যা বুঝাও কষ্টকর। দৈনন্দিন কার্যকলাপ-যার বেশির ভাগই ফ্রান্সিসকে নিয়ে লেখা। দুইটা ছবিও পাওয়া গেল। একটাকে ফ্রান্সিসের গায়ের উপর ন্যান্সি হেলান দিয়ে আছে। অন্যটিতে ফ্রান্সিস ন্যান্সিকে চুমো দিচ্ছে। সে বেশ লজ্জা পাচ্ছে। ন্যান্সি সামনের আটটি দাঁত বের করে, চোখ ছোট করে দেয়ালে হেলান দিয়ে আছে। খুব সুন্দর জুটি। আমি এমন কিছু ভাবলাম--যা অন্তরে ব্যক্ত, মুখে অব্যক্তই রইল। ডাক্তার এর দেওয়া পুরো কাগজ পড়লাম, ভাবলাম। বার বার বিস্মিত হলাম। স্বর্গ নামক স্থানটা বড় আকাংখিত হয়ে উঠল আমার কাছে। ঘুম আসছে না। আল্পনার স্মৃতি ভেসে আসছে। ক্যাসেট চেঞ্জ করলাম। হেমন্তের গান ছাড়লাম। চোখের পাতা ভারী হয়ে আসছে। ডায়েরীর পাতা ক্রমাগত পড়তে পড়তে ভোর করে ফেললাম। শেষের পাতা পড়ে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লাম। মনে মনে বললাম, “হে স্রষ্টা, ফ্রান্সিসকে নেওয়ার জন্য হিংস্র যখন হয়েছিলে তখন ন্যান্সিকেও নিয়ে যেতে।’ ছিয়ানব্বই পৃষ্ঠা। সামান্য সামান্য লেখা বলেই শেষ করতে পেরেছি। ভোরের আযান শোনা যাচ্ছে। ‘আসসালাতু খাইরুম মিনান না-ঊম...।’ কি মধুর আযানের সুর! শুনলে শুনতে ইচ্ছে করে। বারবার শুনতে ইচ্ছে করে। সেলিম আজ নামাজ পড়ার জন্য উঠবে না। তার শারীরিক অবস্থা চিন্তা করে আমি উঠালাম না।
পুরো ব্যাপারটা আমার কল্পনাতে নিয়ে গেলাম। গল্প দাঁড়াল এ রকম--নজরুল চৌধুরী ও রেহানা ইয়াসমিনের বিয়ে হওয়ার আট বছর পরও তাদের কোন সন্তান হয়নি। বহু সাধনার পর বিয়ের নবম বছরে তারা এ কন্যাকে পায়। ন্যান্সির জন্ম তারিখ ০২.০১.১৯৭৬। জন্ম থেকে সে পার্থিব স্বর্গসুখে বড় হতে লাগল। তার জন্মের পাঁচ বছর পর্যন্ত তাদের আত্মীয়-স্বজন ও গুণগ্রাহীরা ন্যান্সিকে ফুল দিতে দিতে ফুল বাগানের ফুলকুমারী বানিয়েছিল। তার বিছানা ফুলে ফুলে ভরে যেত। ফুলের উপর সে নিদ্রা যেত। ফুলের মূল্য সে কখনও অনুভব করেনি। সাত বছরের পর থেকে ফুলের পরিমাণ কমতে লাগল। তার ব্যক্তিগত বাড়ি-গাড়ি, গ্যারেজ, ফুলবাগান, অডিটোরিয়াম, চাকর-বাকর ইত্যাদি দিয়ে তার প্রাপ্য সম্মান দেওয়া হলো। পৃথিবীতে এসে সে চৌধুরী ও রেহানার নিঃসন্তান ও বন্ধ্যাত্ব এর অভিশাপ থেকে বাঁচিয়েছে। কোটি কোটি টাকা খরচ হয়েছে একটি সন্তান সাধনায়। আজমীর শরীফ থেকে শুরু করে মসজিদ, মাজার, এতিমখানা, কাঙ্গালী ভোজ, যাকাত, দান-খয়রাত ইত্যাদি কোনকিছুই বাদ ছিল না। ন্যান্সি কথা শেখার পর থেকে যা চাইত তার অনেক গুণ বেশি পেত। প্রতিদিনি তার টিচারের সংখ্যা সাবজেক্ট এর চেয়ে বেশি ছিল। টিচারদের গাড়ি করে নিয়ে আসা হত। আবার তাদের গন্তব্যস্থলে পৌঁছে দেয়া হত। ন্যান্সির দু’গালে, ঠোঁটে ও কপালে কত লক্ষ আশীর্বাদ স্বরূপ চুমো পড়েছে--তার হিসাব সাধারণ ক্যালকুলেটরে জায়গা হবে না। মাটি কি জিনিস--তা ন্যান্সি বইয়ে পড়েছে কিন্তু স্পষ্ট করে কখনও দেখেনি। জন্ম থেকে তার অসুখ লেগেই থাকত। মাথা ব্যথা, ঠাণ্ডা, জ্বর, সর্দি তার নিত্যদিনের ব্যাপার। পারিবারিক ডাক্তার ছিলেন দু’জন। যাদের একজন সকালে অন্যজন সন্ধ্যার পরে আসত। তাছাড়া রকিব তো তাদের আত্মীয় ডাক্তার। বাসার খরচ, বাগানোর খরচ, পানি, বিদ্যুৎ ইত্যাদি খরচ লেখার জন্য নিচ তলার কোন এক কামড়ায় একজন ম্যানেজার, একজন হিসাবরক্ষক ও আরেকজন রানিং কর্মী থাকত। ঔষদ খাওয়াতে খাওয়াতে রেহানাসহ কাজের বুয়ারাও হাতুড়ে ডাক্তার হয়ে গেছে। অনেক ঔষধের নাম ও কার্যকারিতা তারা বলতে পারবে। ন্যান্সির বয়স যখন আট বছর তখন থেকে বেশির ভাগ সময় সে কাজের বুয়াদের সেবা- যত্ন বড় হতে লাগল। মিসেস চৌধুরী মানে রেহানা বিভিন্ন ক্লাব, সমিতি, থিয়েটার ইত্যাদি নিয়ে থাকতেন। মাসে অন্তত একবার কোন না কোন কাজে দেশের বাইরে যেতেন। আর মিঃ চৌধুরী সকালে বের হলে কখন ফিরবেন--তা তিনি নিজেও জানতেন না। মেয়ের সাথে মুখোমুখি কথার চেয়ে টেলিফোনেই মনে হয় বেশি কথা হত। ন্যান্সিকে কেউ চড় দিয়েছিল একথা তাদের কোন শত্র“ও বলতে পারবে না। জীবনে অসুখ-বিসুখ ছাড়া সে কোন আঘাত পায়নি। গরীবের তথা ভিক্ষুক, অন্ধ, খোঁড়া--এদের কষ্ট সে কখনও বুঝতে পারেনি। অন্ধ, লেংড়ার চাল-চলন দেখে সে হাসত। তার কাছে এরা অন্যরকম কোন জীব মনে হতো। ন্যান্সির মোট ছত্রিশটা নাম। কিন্তু একটু বড় হয়ে সে নূসরাত চৌধুরী (ন্যান্সি) নামটি পছন্দ করে। স্কুলে এই নামই রাখা হয়।
ন্যান্সি যখন ক্লাশ এইটে পড়ত, তখন একই ক্লাশে ফ্রান্সিস নামে জার্মানীর এক ছেলে তাদের ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে ভর্তি হলো। ছেলেটা জার্মানীর হলেও চেহারা বাঙালীদের মতো। তার বাবা জার্মানী। তার বাঙালী মা জার্মানে থাকা অবস্থায় রিগ্যালিও রোজারিওকে বিয়ে করে। তারা জার্মানীতে একই অফিসে কাজ করত। পরে তাদের দুজনকেই বাংলাদেশে অবস্থিত জার্মান কালচারাল সেন্টারে বদলী করা হয়। তাদের থাকার কোয়ার্টার হয় ন্যান্সিদের পাশের এক ভাড়া বাসায়। ন্যান্সিকে গাড়ি দিয়ে স্কুলে নিয়ে যাওয়া হতো। আবার গাড়ি করেই বাসায় নিয়ে আসা হতো। ড্রাইভারকে হাত করে সে গাড়ি চালানো বেশ শিখে ফেলেছে। তার মাও তাকে পরে অবশ্য এ ব্যাপারে সাহায্য করেছিল। ন্যান্সি ছোটবেলা থেকেই বেশ চঞ্চলা ছিল। দৌড়াদৌড়ি করা ছিল তার অভ্যাস। এক রুম থেকে আরেক রুমে গেলেও সে দৌড়ে যাবে। আর কেউ ঘুমালে তাকে জাগিয়ে উঠিয়ে রাগাতে তার ভালো লাগত। কেউ রাগলে সে হাসত। অবশ্য এ অভ্যাসটা আস্তে আস্তে কমে আসে। কেউ তার উপর কর্তৃত্ব দেখালে সে খুবই রেগে যেত। সে কাউকে ভয় পেত না--এমনকি বাড়ির শিক্ষকদেরও না। তবে স্কুলের শিক্ষকরা বেশির ভাগ বিদেশি হওয়ায় তাদের ভয় পেত। সে ক্লাসের ক্যাপটেন ছিল। ছাত্রী হিসেবে সে খুবই মেধাবী।

পোস্টটি ৩ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

শাশ্বত স্বপন's picture

নিজের সম্পর্কে

বাংলা সাহিত্য আমার খুব ভাল লাগে। আমি এখানে লেখতে চাই।