দুঃখ-বিলাস
ধারাবাহিক উপন্যাসঃ হৃদয়ের এপিঠ-ওপিঠ (পর্ব-১৪)
--শাশ্বত স্বপন
যেমনি তার চেহারা, তেমনি তার কথার স্বর। সবাই তাকে ভালোবাসত। সে ততক্ষণই বাসায় পড়ত যতক্ষণ শিক্ষকরা তার পাশে বসে থাকত। সেই কারণেই তার টিচার এর সংখ্যা সাবজেক্ট এর চেয়ে বেশি ছিল। টিফিন পিরিয়ডে সে টাকা খুব একটা খরচ করতে পারত না। কারণ তার প্রিয় খাবারগুলো বাসা থেকেই সরবরাহ করা হত। আব্বু, আম্মু বা আত্মীয়দের দেওয়া টাকা তার ব্যাগেই থাকত।
স্কুলে একদিন দোতলার সিঁড়ি বেয়ে উঠতে গিয়ে হঠাৎ ন্যান্সি নিচে পড়ে যাচ্ছিল। ঐ মুহূর্তে ফ্রান্সিস এসে তাকে ধরে। না ধরলে নিচে পড়ে তার মাথা ফেটে যেত। সে কিছুক্ষণ ফ্রান্সিসের দিকে তাকিয়েছিল। ন্যান্সী তার সাথে কথোপকথনবিহীন কিছু স্মৃতি মনে করতে লাগল। পিটি করার সময় সে এই ছেলেকে দেখত। সে ভালো কমান্ড করতে পারে। মাঝে মাঝে ধাক্কাও লেগে যেত ছুটোছুটি করতে গিয়ে। তবে ন্যান্সি ছেলেটাকে এড়িয়ে চলত। কেন যে এড়িয়ে চলত--তা সে নিজেও জানে না। পাশাপাশি চলমান দুইটা গাড়ি বাসা থেকে স্কুলে আসত। আবার স্কুল থেকে বাসায় যেত। গাড়ি গাড়িকে দেখত। যাত্রীরা দেখেও না দেখার ভান করত। ছাদ থেকে দু’জন দু’জনকে লক্ষ্য করত। কিন্তু কখনও কোন ইঙ্গিত করত না। তবে একদিন ফ্রান্সিসকে পলিথিনের ব্যাগ দিয়ে ঘুড়ি উড়াতে দেখে ন্যান্সি ফোঁকলা দাঁতে হেসেছিল। ফ্রান্সিস ছাদ থেকে তার দিকে তাকাতেই সে হাসি থামিয়ে মায়ের কাছ ছুটে এসে গলা জড়িয়ে ধরে। তাদের ছাদে ফুলের বাগান। মৌমাছি আর প্রজাপতি ফুলে ফুলে উড়ে বেড়াচ্চে। ন্যান্সি দৌঁড়ে প্রজাপতি ধরতে যায়। হৈহুল্লোর আর আনন্দ নিয়েই তার জীবন।
আজ ফ্রান্সিস না ধরলে নির্ঘাত মাথা ফেটে যেত। স্কুলে একদিন ধাক্কা লেগেছিল। ন্যান্সি রাগে ব্লাইণ্ড বয় বলেছিল। পলিথিনের ঘুড়ি উড়াতে দেখে সে হেসেছিল। আজ, এখন সব তার মনে পড়ছে। সে দৌড়ে ক্লাসে চলে গেল। একটা ধন্যবাদও জানাল না। এরপর থেকে শুরু হল দু’জনার যাত্রা। চোখাচোখি করে গাড়িতে উঠা। ছাদ থেকে দু’জন দু’জনকে দেখে নির্বাক দর্শকের মতো। এভাবে চলতে লাগল এক বছর। দু’জনে ক্লাশ নাইন-এ উঠল। গানের আসরে ফ্রান্সিস একদিন বলল, “ইউ আর ভেরী সুইট গার্ল, অ্যাই লাভ ইউ।” ন্যান্সি কেন জানি রেগে গেল। অবশ্য তার কিছু কারণও ছিল। টিফিন পিরিয়ডের পর ক্লাসে আসলে প্রায়ই ন্যান্সি তার ব্যাগের উপর একটা করে ফুল পেত। সে প্রথম দুই দিন কিছু মনে করেনি। কিন্তু বান্ধবীরা যখন তাকে নিয়ে হাসি-ঠাট্টা শুরু করল তখন সে মাইন্ড করল। আজও এমন এক ঘটনা ঘটেছে। কে ফুল দিয়ে যায়--তা সে নিজেও জানে না। বিদেশি ইংরেজ মেয়েরা তাকে আজ সরাসরি জিজ্ঞাসা করল, হোয়াট ইজ দ্যা মেটার, ন্যান্সি। হু ইজ দ্যা বয়? প্লিজ ছে এ্যাজ। ন্যান্সি রেগে বলল, আই ডন্ট নো।
-- নো, ইউ আর লায়ার।
-- প্লিজ, ইউ বিলিভ। আই ডন্ট নো।
সেই রাগ আর ফ্রান্সিসের মিষ্টি কথা এই দুয়ে মিলে সে রেগে গেল। ম্যাডামের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে উঠল। ম্যাডাম তার দিকে তাকাল।
-- হোয়াট ইজ দ্যা মেটার, ন্যান্সি? হোয়াই আর ইউ সাউটিং?
ন্যান্সি ফ্রান্সিসের দিকে তাকাল।
-- ফ্রান্সিস ডিসটার্বিং?
ন্যান্সি কোন কথা বলল না। মাথা নিচু করে রইল। সে বুঝল, চিৎকার করা তার ঠিক হয়নি। রাগত চোখে ম্যাডাম ফ্রান্সিসকে দূরে বসতে বলল। বান্ধবীরা কানাকানি করতে লাগল। ফ্রান্সিস গম্ভীর হয়ে অন্যত্র চলে গেল। সবাই চলে গেলে ফ্রান্সিস ন্যান্সির বান্ধবীকে দিয়ে তাকে ডেকে আনে। ন্যান্সি ফ্রান্সিসের নিকট এসে মাথা নিচু করে থাকে। ফ্রান্সিস উত্তেজিত হয়ে কথা বলে, ইউ আর মাইন্ডলেস। ইউ আর ফুলিস। ওয়াট ইজ ফলস অফ মাইন? আই লাভ ইউ? ইজ দি মাই ক্রাইম? আই ডন্ট টক টু ইউ! ইউ আর ক্রুয়েল গার্ল। আই হেট ইউ।
ফ্রান্সিসের চোখে জল এসে যায়। ন্যান্সি ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে। জীবনে এত বড় কথা কেউ বলেনি। এত রাগ কেউ তাকে দেখায়নি কোনদিন। ফ্রান্সিস চলে গেল। ফিরে আর তাকাল না। ন্যান্সি খুবই কষ্ট পেয়েছে। ন্যান্সির হৃদয়ে শুরু হল পরিবর্তন। এই ঘটনার পর তার ব্যাগের উপর আর কখনও ফুল জমা পড়েনি। ফ্রান্সিস ন্যান্সিকে কাছে পেলে মাইগুলেস, ক্রয়েল গার্ল--এই দুইটা শব্দ উচ্চারণ করে। ন্যান্সি রাগে ক্ষোভে ফুলে উঠে। কিছু বলতে পারে না। ন্যান্সি বাসায় এসে পুরো ঘটনা তার মাকে জানায়। রেহানা ফ্রান্সিসকে ডেকে এনে ন্যান্সির সাথে আপোষ করিয়ে দেয়। দু'’জনে খুশি হয়ে হাসতে থাকে। তারা প্রতিজ্ঞা করে আর কখনও মনোমালিন্য হবে না। শুরু হল ন্যান্সির কথা বলা। সে এত বেশি কথা বলে যে, ফ্রান্সিস কথা বলার সুযোগও পায় না। দু’জনে দু’জনার বাসার টেলিফোন নং বিনিময় করল। শুরু হল নতুন কিছু--যা প্রেম নামে বিশেষিত। অথচ প্রেম কি জিনিস তারা দু’জনে তা বুঝেও না। বুঝার বয়সও হয়নি। শুধু বন্ধু হিসেবে দু’জন দু’জনা। ফ্রান্সিসের আব্বা ও আম্মা বেশির ভাগ সময় অফিস ও অন্যান্য কাজে বাইরে থাকত। বাসায় ফ্রান্সিস, ম্যাক্সিম ও মেরিওনা থাকত। ম্যাক্সিম ও মেরিওনা এক রুমে পাশাপাশি দু’টি সীটে, ফ্রান্সিস অন্য রুমে থাকত। তার আম্মা ও আব্বার রুমে একটা এবং তার রুমে একটা টেলিফোন ছিল।
ফ্রান্সিস কোন এক বিকাল বেলা ছাদে উঠল। দেখল ন্যান্সি আজ ছাদে নাই। অথচ প্রতিদিনই সে ছাড়ে উঠে। ফ্রান্সিস নিচে চলে গেল। ফোন করল। ন্যান্সিও এই আশাই করেছিল।
-- হ্যালো, ন্যান্সি।
-- ইয়েস, ন্যান্সি। হাউ আর ইউ? আই এ্যাম সিক। হেড পেইন করছে।
-- মীনস?
-- ব্রেইন ট্রাবল।
-- হোয়াই?
-- ডন্ট নো।
-- ডক্টর?
-- ইয়েস, ডক্টর কেম এণ্ড ওয়েন্ট এওয়ে।
প্রতিদিন তারা কমপক্ষে দশ বার টেলিফোন করত। রাতে ঘুমাবার আগে টেলিফোনে কথা বলতে বলতে ন্যান্সিই আগে ঘুমিয়ে যেত। যখন ফ্রান্সিস বুঝত, ন্যান্সির ঘুম ঘুম অবস্থা তখন সে টেলিফোন রেখে দিত। মিঃ ও মিসেস চৌধুরী বেড়াতে গেলে ন্যান্সিকে সঙ্গে নিত। সে আবার ফ্রান্সিসকে নেওয়ার জন্য বায়না ধরত। ফ্রান্সিসের আব্বার সাথে মিঃ চৌধুরী ও মিসেস চৌধুরীর অস্তরঙ্গ সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। মিঃ চৌধুরী জার্মানীতে ব্যবসার কারণে গেলে ফ্রান্সিসদের নিজস্ব বাড়িতে গিয়ে উঠে। মিঃ চৌধুরী ফ্রান্সিসদের বিরাট সহায়-সম্পত্তি দেখে এসেছে। এদিকে ফ্রান্সিসের মা বাঙালী হওয়ায় রেহানার সাথে খুব ভাল সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। ফ্রান্সিসের মা দীপা হিন্দু ছিল। জার্মানী যাওয়ার পর এবং বিয়ের পরে খ্রীস্টান হয়ে যায়।
ধারাবাহিক উপন্যাসঃ হৃদয়ের এপিঠ-ওপিঠ (পর্ব-১৫)
--শাশ্বত স্বপন
পারিবারিক সম্পর্কে কারণে তারা দু’জন বিভিন্ন জায়গায় বেড়াতে যেত। নিচের অডিটোরিয়ামে তারা দু’জনই বিভিন্ন অনুষ্ঠানে উপস্থাপক হত। ন্যান্সিদের নিজস্ব বাসার নিচ তলার পুরো অংশই সাংস্কৃতির কেন্দ্রস্থল। সংগীত ও বিভিন্ন যন্ত্র বাজানো সে এখান থেকেই শিখত। তার সংগীত ও যন্ত্র শিক্ষার জন্য বড় মাপের ওস্তাদ ছিল। প্রথম পর্যায়ে কিসটা ন্যান্সির কাছে লজ্জা লাগলেও পরে সহজ হয়ে উঠে। তারা এক সাথে ছবি দেখত, ছবি তুলত। কোন এক পরিবার ঐতিহাসিক কোন স্থানে বেড়াতে গেলে তারা দু’জন অবশ্যই যেত। সবই চলত সকলের চোখের সামনে। কেউ কোনদিন তাদের কিছু বলেনি। আসলে দু’পরিবারের প্রধান কর্তা ও কর্ত্রীরাই ছেলেমেয়েদের সময় দিতে পারত না। তারা বেশির ভাগ সময় থাকত বাইরে। ন্যান্সি ও ফ্রান্সিস একসাথে ব্যাডমিন্টন, লুকোচুরি ইত্যাদি খেলত। সব খেলা ন্যান্সিদের বাসায়ই হত। ন্যান্সিদের খেলার নানান সরঞ্জাম ছিল। সেগুলো ম্যাক্সিম, ম্যারিওনাও ব্যবহার করত। কখনও বিকিনি পড়ে ন্যান্সি ফ্রান্সিসের সামনে গোসল করত, কখনও একসাথে। কখনও ফ্রান্সিসের ভাই-বোনরাও একসাথে গোসল করত। ন্যান্সিকে অনেক আনন্দই বেশিক্ষন করতে দেওয়া হত না। কারণ অতিরিক্ত কোনকিছু তার দেহে সইত না। অসুখ জিনিসটা লেগেই থাকত।
এভাবে তাদের মধ্যে তিন বছর কেটে গেছে। ন্যান্সি ও ফ্রান্সিস ও লেভেল-এ ভর্তি হয়েছে। এখন তারা দু’জন গাড়ি হাঁকিয়ে অনেক দূর চলে যায়। মাঝে মাঝে রোড রং ও সিগন্যাল রং করে পুলিশে ধরা পড়লে ন্যান্সি তার বাবার নাম ও ঠিকানা বলত। পুলিশ সসম্মানে ছেড়ে দিত। ফ্রান্সিস অবাক হত। সে ভাবত, এ দেশে ধনীদের কত দাম! তারা প্রায়ই চাইনিজ খেতে যেত। কখনও দু’জনে। কখনও স্বপরিবারে। কখনও ফ্রান্সিস, ন্যান্সি, ম্যাক্সিম ও ম্যারিওনা এক সাথে মিলে যেত। একদিন দু’জনে হুইস্কি খেয়ে মাতাল অবস্থায় বাড়ি ফিরলে রেহানা একটু বকেন। ফলে ন্যান্সি পুরো একদিন দরজা বন্ধ করে রাখল। কিছুই খেল না। এমনকি ফ্রান্সিসের টেলিফোনও রিসিভ করল না। কেউ কর্তৃত্ব দেখালে তার অসহ্য লাগে। ফ্রান্সিস বিকালে এসে অনুরোধ করে দরজা খোলায়। পওে দু’জনে একসাথে খেয়ে খেলতে চলে যায়।
এভাবে পাঁচ বছর কেটে যায়। তাদের মাঝে দৈহিক কোন সম্পর্ক হয়েছিল কিনা তা ন্যান্সির ডায়েরী থেকে বুঝা গেল না। ডায়রীর শেষের দিকে অনেক পাতা খালি। কিছুই লেখা নেই। পরবর্তী ঘটনা ডাক্তারের দেওয়া কাগজ থেকে বুঝা গেল। ন্যান্সি একদিন জোর করে ফ্রান্সিসকে নিয়ে চিটাগাং রোডের দিকে যায়। রাস্তায় হঠাৎ গাড়ি স্টার্ট বন্ধ হয়ে যায়। ফ্রান্সির দরজা খুলে যেই বাইরে এসেছে তখনই একটা পাঁচ টন মালবাহী ট্রাক তার পিছন দিক থেকে এসে তার দেহের উপর দিয়ে চলে যায়। তার মাথাটা বোমা ফাটার মতো একটা প্রচণ্ড শব্দ করে। ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন মাথা চড়িয়ে পড়ে চারিদিকে। ন্যান্সি প্রচণ্ড জোরে আর্তচিৎকার করে। যার ফলে সে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। গাড়িতে তখন তাদের প্রিয় একটা গান চলছিল--‘ও--’ ডিয়ার, আই লাভ ইউ...।’
তারপরের ঘটনা অতি সহজ। ফ্রান্সিসের আব্বা ও আম্মার কথা কিছু জানা গেল না। ডাক্তার কোথাও কিছু লেখেনি। তবে অবস্থাটা আমি উপলব্ধি করতে পারি। তারা চিরতরে জার্মানীতে ট্রান্সফার হয়ে গেছে। বাংলাদেশের সড়ক দুর্ঘটনা নিশ্চয়ই তারা তাদের এলাকায় ছড়াবে। ছড়াবে এদেশে দুর্ঘটনা নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার। তাই দুর্ঘটনার এদেশে তারা আর আসবে না। ন্যান্সি দুই বছর পাবনা মানসিক হাসপাতালে ছিল, ভালো হয়নি। বিদেশে পাঠানো হয়েছে। ক্ষণিকের জন্য ভালো হলেও আবার একই অবস্থা। তারপর বাসায় এনে প্রাইভেট চিকিৎসা শুরু হল। সাইক্রিয়াটিস্টদের পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট বোর্ড গঠন করা হলো, তাতেও কিছুই হলো না। ন্যান্সি প্রায়ই ফ্রান্সিস ফ্রান্সিস... করে উঠে। অবশেষে সকলের সিদ্ধাস্ত হলো, ফ্রান্সিস সদৃশ কোন ছেলেকে খুঁজে বের করতে হবে। ফ্রান্সিসকে সে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসত--যা ডায়েরীতে লেখা একটা পাতা থেকে বুঝা যায়--‘আই লাভ ফ্রান্সিস মোর দেন অল।’
ডায়েরীর এক পাতায় দু’জনের প্রিয় বিষয় সম্পর্কে লেখা আছে। ডায়েরীতে ন্যান্সি প্রতিদিন দু’একটা লাইন হলেও লিখত। লেখা আছে--দু’জনের প্রিয় রং গোলাপী, দু’জনেরই বেড়াতে ভালো লাগে। তাদের প্রিয় ফল আপেল, প্রিয় কথা ভালোবাসি। প্রিয় ব্যক্তিত্ব ড্যাডি এণ্ড মাম্মী। তবে ফ্রান্সিসের ওয়েস্টার্ণ সিরিজের বই ভালো লাগে। ন্যান্সির প্রেমের বই ভালো লাগে। তার লেখা আর আমার কল্পনা থেকে যতটুকু বুঝা যায়, তাদের ভালোবাসার সম্পর্ক হয়তো আরো অনেক বেশি গভীর ছিল। অনেক কথাই হয়তো ন্যান্সি তার ডায়েরীতে লেখেনি। জীবনের বহু ঘটনা-কল্পনা-আশা-আকাঙ্খা কাগজের পাতায় লেখা যায় না। অনেক কথা লেখার মাঝেই লুকিয়ে থাকে। কল্পনার সাহায্যে হয়তো অনেক কথাই লেখা যায়। কিন্তু তার মধ্যে অনেক ফাঁক-ফোঁকর রয়ে যায়।
ধারাবাহিক উপন্যাসঃ হৃদয়ের এপিঠ-ওপিঠ (পর্ব-১৬)
--শাশ্বত স্বপন
সেলিম বেশ লেট করে ঘুম থেকে উঠে অফিসে গেছে। আমি ঘুম থেকে উঠে দেখি দশটা বাজে। সেলিম আমাকে না উঠিয়ে কাগজে লিখে গেছে, আজ রুমে ফিরবে না। অফিসের কাজে অনেক দূরে যাবে। চোখ-মুখ ধুয়ে চিন্তা করতে বসলাম। নাস্তা খেলাম। আবার চিন্তা করতে শুরু করলাম। কিছুই ভালো লাগে না। এখন সম্মুখে শুধু ন্যান্সি আর ন্যান্সি। বাইরে যাওয়া উচিত, দেহ ও মনের জড়তা কাটানোর জন্য। কিন্তু কোথায় যাব--তা জানি না। গস্তব্যহীন এ জীবনে কোন স্বপ্নই দীর্ঘ ছিল না। সব স্বপ্নই ছিল সরু আর নাতিদীর্ঘ। যেদিন রাতে কিংবা ভোর রাতে আল্পনাকে স্বপ্নে দেখি, সেদিন ঘুম থেকে দেরী করে উঠি। তারপর একটা চিঠি লিখতে চেষ্টা করি। কাটি আর লিখি। কিছুদূর লিখে ভাবি, এ চিঠি তো আল্পনার কাছে কোনদিন যাবে না। কি লাভ লিখে? তবু মন মানে না। লিখি, তবু লিখি। আত্মতৃপ্তির জন্য মানুষ তো কত কিছুই করে। আমরা অনেক কিছুই কোন কারণ ছাড়াই করি। কারণ নিয়ে এখন আর মানুষ ভাবে না। একদিন, ম্যাক্সিম গোর্কী তার ধনী মার্কিন বন্ধুর খাবার তালিকা শুনে মাথায় হাত দিলেন। তিনি ধনী বন্ধুকে বললেন, তিনি এত যৎ সামান্য আহার গ্রহণ করেন, তাহলে এত টাকা দিয়ে কি করেন? বন্ধু উত্তর দিয়েছিল, আরো টাকা দিয়ে আরো টাকা গড়ি। কেন গড়েন? তার কোটিপতি বন্ধু বোধহয় ভাবেন না, ভাবতে চান না। তারা সবাই কিসের পিছনে ছুটে চলেছেন, তা বোধহয়, তারা নিজেরাও জানার সময় পান না বা জানতে চান না। আমাদের দেশের নজরুল চৌধুরীরা জানেন না, তারা কোথায় যাচ্ছেন। বিধাতা বিভিন্নভাবে তাদের বোঝাচ্ছেন কিন্তু বুঝেও বুঝতে চাইছেন না। টাকা দিয়ে তারা সব কিনতে চান। একটা সই দিয়ে একশত কোটি টাকা তারা ডান-বাম করতে পারেন। কিন্তু হাজার সই দিয়েই ন্যান্সিদের সুস্থ্য করতে পারেন না। তারা নিজেরাও জীবন্মৃত, ন্যান্সিরাও জীবন্মৃত। আমার জীবনে এক সময় একটা লক্ষ্য ছিল। আজ আর কোন লক্ষ্য নেই । এখন জীবন যেদিকে চলে, চলুক না। দরজায় হঠাৎ কড়া নাড়ার শব্দ শোনা গেল।
-- কে?
-- স্যার আমি।
-- ও সিঁদুর, ভিতরে এসো।
দু’দিন সিঁদুরকে পড়াতে যাওয়া হয়নি। তাই হয়তো দেখতে এসেছে অসুখ হলো কিনা। এর আগেও সে একবার এসেছিল। তখন রুমে সেলিমও ছিল। আজ সেলিম নেই।
-- স্যার, আপনার কি হয়েছে?
-- তেমন কিছু না। দু’দিন থেকে খুব টেনশনে ভুগছি।
-- কিসের টেনশন?
-- ব্যক্তিগত।
-- ও--
সিঁদুর সেলিমের টেবিলের দিকে গেল। একটি কবিতা লাল কালি দিয়ে লেখা--টাঙানো রয়েছে টেবিল সংলগ্ন দেয়ালে। সিঁদুর কাছে গিয়ে পড়তে শুরু করল।
“কবিতা, তোমার কি কখনও মরতে ইচ্ছে করে?
করে না? আমার মাঝে মাঝেই মরতে ইচ্ছে করে
মাঝে মাঝে খুবই ইচ্ছে করে...।”
-- স্যার, কে লিখেছে? নাম যখন নেই, তখন নিশ্চয়ই আপনি। আপনি এত ভালো কবিতা লিখতে পারেন। স্যার, আমার কবিতাটা কেমন হয়েছে?
-- তুমি কি স্কুলে যাবে?
-- হ্যাঁ, স্কুলে যাব। ভাবলাম, যাওয়ার পথে আপনার সাথে দেখা করে যাই। স্যার বললেন না কেমন হয়েছে?
-- সুন্দর, খুব সুন্দর। একেবারে তোমার মতো ভালো ও সুন্দর।
-- যা--।
-- তুমি এমন কবিতা লিখেছ, মনে হচ্ছে, পৃথিবীর কেউ তোমাকে কোন দিন ভালোবাসেনি--ভালোবাসেও না। তাই?
-- স্যার, আমি যাই। আপনি কখন পড়াতে যাবেন?
-- ঠিক সময়ে।
-- আসি স্যার।
-- সিঁদুর, তোমাকে আমি পড়াই। আমি জানি, তোমার বিদ্যা কত দূর। এ কবিতা তুমি লিখনি, আমি নিশ্চিৎ।
সিঁদুর অবাক হল না। আড়চোখে তাকাল। যেন এমন ঘটবে--তা সে জানে।
-- টাঙানো কবিতাটা তোমার ভালো লাগে?
-- হ্যাঁ, খুব।
-- নিয়ে যাও ওটা; নইলে দু-এক দিনের মধ্যে কুটিকুটি হয়ে যাবে।
-- কেন স্যার?
-- আমার একটা বদ অভ্যাস আছে। আমি কবিতা, গান লিখি আর ছিঁড়ে ফেলি। এটাও ছিঁড়ে ফেলেছিলাম। আমার রুম-ম্যাট এর ভালো লেগেছে, তাই ও ছিঁড়া কাগজ থেকে লিখে নিয়ে টাঙিয়ে রেখেছে।
-- সে যদি এসে না দেখে?
-- কিছুই বলবে না। সে এখন কবিতার জগতে নেই--আছে গদ্যের জগতে।
-- মানে--?
-- কিছু না, তুমি নিয়ে যাও।
-- স্যার, আমাকে আরো কবিতা দেবেন। কবিতা আমার ভালো লাগে।
কবিতা ভালো লাগে এমন পাঠক-পাঠিকার সংখ্যা আমার চোখে খুব কমই পড়েছে। যদিওবা দু’একজন পাঠক-পাঠিকার ভালো লাগে। তাও বিশেষ বিশেষ জনের বিশেষ বিশেষ কবিতা--তাও আবার তাদের বিশেষ বিশেষ সময়। এখন হয়তো সিঁদুরের কবিতা ভালো লাগে। আর কয়দিন পর ভালো কবিতাও ভালো লাগবে না। চারদিকে এখন গদ্যের জয় জয়কার।
-- সিঁদুর, ‘‘কবিতার শেষ হল--শুরু হলো গল্পের
রাত পেরিয়ে শুরু হলো দিনের।” এই সময় কবিতা ভালো লাগে?
-- জানি না স্যার, আগে ভালো লাগত না, এখন ভালো লাগে।
-- তোমার কবিতার কবি বুঝি ভালোবাসার কাঙাল? খুব কবিতা লেখে?
-- স্যার, আমি আসি--
-- কবিতা নিলে না?
সিঁদুর কবিতা নিয়ে চলে যেতে লাগল। দ্রুত হাঁটতে গিয়ে দরজায় ধাক্কা খেল। ফিরে আমার দিকে তাকাল। কি ভাবল কে জানে? এদের ভাবনার শেষ নেই। এদের চেনা বড় কঠিন। এরা সময়ে মায়াবী, সময়ে হিংস্র। এমন নারীদের সাথে আমার পরিচয় ছিল, যারা ঘন ঘন প্রেম করত। আবার দু’একটা মেয়েকে তাদের প্রেমিকের জন্য আধা পাগল হতে দেখেছি। বিয়ে হলে দেখা যায়, সব ভুলে গেছে। আবার এমন সব মেয়ে দেখেছি, যারা সাত-আট বছরের জীবন-মরণ প্রেমকে বিসর্জন দিয়ে ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার বা কোন সচ্ছল বরের হাতে হাত রেখে সব ভুলে গেছে। তবে একটা বিবাহিতা বান্ধবী আমাকে অবাক করেছিল। বিয়ের পর তাকে প্রশ্ন করি,
-- লাকী, দেলোয়ারকে মনে পড়ে?
-- কি যে বলিস শোভন, যাকে বিয়ে করেছি, সে আমার স্বামী--শুধু স্বাম--স্বামী বলতে যা বোঝায়। আমার প্রেম-ভালোবাসা সমৃদ্ধ হৃদয়ের সবটুকু জায়গা জুড়ে তো দেলোয়ার দখল করে আছে।
বলতে বলতে লাকী আবেগ প্রবণ হয়ে উঠল। আমি জানি, সে বেশ সচ্ছল পরিবারে ভালো ছেলের ঘর করছে। দেলোয়ারকে ভুলে যাওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু একি ডায়ালগ। কিছু কিছু ব্যতিক্রম স্বীকার করে নিতেই হয়। তবে এ ব্যতিক্রমও পরবর্তী পর্যায়ে আস্তে আস্তে চলে যায়। কিন্তু আমার বিষাক্ত স্মৃতি কি ধীরে ধীরে মুছে যাবে? অসম্ভব। হিন্দু মেয়েকে ভালোবেসেছিলাম। বিয়ের আগের দিন তাকে জোর করে তুলে আনতে চেয়েছিলাম। অস্ত্র দিয়েও কিছু করতে পারিনি। আল্পনাকে আনতে পারিনি। সমাজের হাতে বন্দি হয়ে যে আঘাত সয়েছি--তা কি সহজে ভুলে যাব? প্রেম পাগল একটা কিশোর ছেলেকে সবাই জেলে ঢুকিয়ে দিল। দুই বছর তিন মাস পর জেল থেকে ফিরলাম। ধর্মের জিকির তুলে যে সব দাঁড়িওয়ালারা ও টিকিওয়ালারা আমাদের মিলনে বাঁধা দিয়েছিল--তাদের প্রকৃত রূপ দেখে আমি বিস্মিত হয়েছি। ধর্মের সাথে স্রষ্টার ব্যবধান যে এরাই বাড়িয়েছে--তা আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি। আমি কি এত কষ্টের স্মৃতি ভুলে যাব?
সিঁদুর চলে গেছে। বাসায় গিয়ে আজ তাকে বলতে হবে, সিঁদুর তোমাকে আর পড়াতে পারব না। সপ্তাহে দুই-এক দিন হয়তো আসতে পারব। টেপ-রেকর্ডার চালু করলাম। কোন গান ভাল লাগছে না। রেডিও-এর চ্যানেল ঘুরাতেই শাহনাজ রহমত উল্লাহর গাওয়া একটা গান বেজে উঠল--‘যে ছিল দৃষ্টির সীমানায়--যে ছিল হৃদয়ের আঙিনায়--সে হারাল কোথায়--কোন দূর অজানায়--সেই চেনা মুখ কতদিন দেখিনি...।’ সারা দেহ থর থর করে কেঁপে উঠল। চোখ দু’টি নিদ্রার ভান করল। বিছানায় শুয়ে পড়লাম। নেশাগ্রস্ত রোগীর মতো নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে লাগলাম। মনে মনে বলে উঠলাম--‘‘আল্পনা...আল্পনা...তুমি আজ কোথায়? ‘‘আমি কি রকমভাবে বেঁচে আছি--তুমি একবার এসে দেখে যাও--একি মানব জন্ম! এভাবে কি মানুষ বাঁচতে পারে!” হায়রে হৃদয়, তুমি কত খারাপ! যারা আমাকে জন্ম দিয়েছে--তাদেরকে কদাচিৎ স্মরণ করি। করলেও তেমন দুঃখ অনুভব করি না। বাবাকে তো মুক্তিযোদ্ধা, কমরেড ভেবে ঘৃণা করি। অথচ আল্পনাকে কিছুতেই ভুলতে পারি না। বড় যন্ত্রণা দেয় এ হৃদয়। এতিম হওয়ার যন্ত্রণার চেয়ে ব্যর্থ প্রেমের যন্ত্রণা আরো গভীর। হৃদয়কে বুঝাই, “হৃদয়, তুমি যা চাও--তা দেবার যোগ্যতা, ক্ষমতা, সময় আমার নেই।” সে বুঝে না--বুঝতে চায় না। ছোট শিশুর মতো আপেলের জন্য বায়না ধরে আছে। অথচ ঘরে অর্থ নেই, বাইরে কার্ফ্যু চলছে--কি করে জীবন বাজী রেখে বাজার থেকে ওর জন্য আপেল আনব? মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে শিশুটাকে হত্যা করে ফেলি। কিন্তু পারি না--কেউ তা পারে না। শিশুটা আপেলের জন্য কাঁদছে। আমি ক্রমাগত আম, আঙ্গুর, বিভিন্ন খেলনা দিয়ে তাকে বুঝাচ্ছি কিন্তু তার কান্না থামছে না। সে অবিরাম কেঁদে চলেছে। জানি না, কবে তার কান্না থাকবে।
ধারাবাহিক উপন্যাসঃ হৃদয়ের এপিঠ-ওপিঠ (পর্ব-১৭)
--শাশ্বত স্বপন
মুরাদ কখন রুমে ঢুকেছে, খেয়াল করিনি। ওর সাথে অনেকক্ষণ আলাপ করলাম। টেস্টে মোটামুটি ভালো রেজাল্ট করেছে। টিউশনি বন্ধ রাখতে বললাম। আমার চাকুরি সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু না বলে, শুধু চাকুরি হয়েছে--এ কথাই বললাম। ও খুশি হয়ে বিস্তারিত জানতে চাইলে আমি এড়িয়ে গেলাম। মুরাদকে বললাম, কাল-পরশু টাকা দিয়ে আসব। হঠাৎ ওর চোখ, মুখ কেমন হয়ে উঠল। মনে হলো, ওর মাথা ব্যথা করছে। আমাকে লুকাবার জন্য তড়িঘড়ি করে চলে গেল। ডাকলাম কিন্তু শুনল না।
সন্ধ্যার পর সিঁদুরকে পড়াতে গেলাম। প্রথমেই অংক করানো শুরু করলাম। ওর টেবিলের উপর তাকাতেই দেখি, যে কবিতাটা দিয়েছিলাম--তা টাঙিয়ে রেখেছে। কবিতা নিয়ে কিছু বলতে ইচ্ছে করল না। কবিতা আমার ভালো লাগে না। প্রাণহীন জড় পদার্থ মনে হয়। আজকাল বাংলাদেশকে কবির দেশ হিসেবে আখ্যা দেওয়া যায়। শিক্ষিতদের আশি-নব্বই পার্সেন্ট কোন না কোন বিশেষ সময়ে কবিতা লিখে থাকে। ইচ্ছে করলেই ডাইল ভাতের মতো কবিতা লিখতে পারে। আর যদি মাসিক, সাপ্তাহিক কোন ম্যাগাজিনে ছাপানো হবে বলে কবিতা চাওয়া হয়, তাহলে যে জীবনে কোন কবিতাও লিখেনি--সেও কবি হয়ে উঠে। একেবারে না পারলেও কবিতা ধার করে নিজের নামে প্রচার করে। আমার এক বন্ধুর কথা মনে পড়ে। সে কলেজ বার্ষিকী পত্রিকার সাথে এমনভাবে যুক্ত যে, সে যাই লিখুক--তাই ছাপা হবে। সারা রাত ঘেমেও সে একটা কবিতার ছয় লাইনও লিখতে পারেনি। যা লিখেছে তাও কয়েকটা কবিতা থেকে নকলকৃত। ওর দুঃখ দেখে অবশেষে ওর প্রেমিকার নামে একটা প্রেমের কবিতা লিখে দিলাম। ওতো খুশিতে আটখানা। যেন এরকম একটা কবিতাই সে লিখতে চেয়েছে। ছাপালে কি হবে, মেয়েটি কবিতাও পাত্তা দিল না, তাকেও পাত্তা দিল না। এক বছর পর শুনলাম, সে সত্যি কবি হয়ে গেছে। তাদের প্রকাশনী থেকে সে একটা কবিতার বই বের করেছে। প্রথমেই ছিল আমার লেখা কবিতাটি। কবি সে-ই আর মেয়েটি নাকি বই পেয়ে পুকুরে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে। পরে শুনেছি মেয়েটির বিয়ে হয়ে গেছে। আর কবিবন্ধু কবিতা ছেড়ে বিদেশ চলে গেছে।
সিঁদুরের অংক করা শেষ। তিনটা অংক করতে দিয়েছিলাম। তিনটাই ভুল। অন্যান্য পড়া ধরতে গিয়ে দেখি, সবই হ-য-ব-র-ল। কিছুই পারছে না। হঠাৎ সে ‘স্যার’ বলেই কেঁদে দিল। কারণ জিজ্ঞাসা করলাম। সে বলতে চাইছে কিন্তু লজ্জাবশতঃ বলতে পারছে না। ভেবে নিলাম, আজ আর পড়াব না। কোথাও থেকে সে বড় ধরনের আঘাত পেয়েছে। প্রথম যেদিন ওদের বাসায় ঢুকি তখন ও পড়ার ফাঁকে বলেছিল, আমাকে নাকি চেনা চেনা লাগে। তার উক্তি ছিল এ রকম--
-- স্যার, আপনার কোন ভাই আছে?
-- হ্যাঁ, আছে।
-- কি নাম?
-- মুরাদ।
-- কি করে?
-- এবার বি.এ পরীক্ষা দেবে।
-- কোন কলেজ থেকে?
-- ঢাকা কলেজ।
-- আপনার মতো চেহারা--আমার একটা ভাই আছে--ঢাকা কলেজে পড়ে। নাম পিযুষ। সে আই.এসসি পরীক্ষা দেবে।
আজ সিঁদুরের অবস্থা দেখে প্রথম দিনের কথোপকথন মনে পড়ছে। আজ আমার বিদায়ের ব্যাপারে কিছু বললাম না। সইতে পারবে না হয়ত। ও আমাকে কি যেন, বলতে চায়, অথচ বলছে না। আগামীকাল এ সময়ে আসব বলে চলে এলাম আমার রুমে। পর দিন সকালে ডায়েরীসহ আমি ন্যান্সিদের বাসায় যাবার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি। এমন সময় দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ পেলাম। দরজা খুলতেই দেখি ড্রাইভার। তার সাথে কথা বলে বুঝলাম, আমি আসার পর অর্থাৎ গতকাল সকাল থেকে এই পর্যস্ত ন্যান্সি খুব গোলমাল করেছে। আজ সকালে উঠে আমাকে দেখতে না পেয়ে জামা-কাপড় পুড়িয়ে ফেলেছে। তাই মিসেস নজরুল এক্ষুণি আমাকে যেতে বলেছেন।
গাড়িতে উঠে ভাবছি। ন্যান্সি সকালবেলা উঠেই আমাকে খুঁজেছে। আমার জন্য চিৎকার করেছে। আমার মাঝে ফ্রান্সিসের কি বৈশিষ্ট্য থাকতে পারে। এ পৃথিবীতে কারো সাথেই কারো সম্পূর্ণ মিল নেই। সদৃশ হতে পারে। ফ্রান্সিসের দেহ-সর্বস্ব বাঙালীদের মতো হল কেন? ফ্রান্সিসের মায়ের কি আগে বাঙালী পুরুষের সাথে বিয়ে হয়েছিল? ফ্রান্সিস কি...? হতেও পারে। ডাক্তারকে জিজ্ঞাসা করতে হবে। ন্যান্সি তার মা-বাবাকে সহ্য করতে পারে না। কেন? ঘটনায় কোন বিরোধীতা ছিল। তার মা-বাবা কি এ ব্যাপারে জড়িত? ডাক্তার মামাকে শুধু মানে, তাও মাঝে মাঝে নাকি তার উপরও রেগে উঠে। পাগলের আচার-আচরণ অদ্ভুত--এটা আমি জানি। পাগল আর এ্যাবনরমাল কি এক? মেন্টাল পেসেন্ট বা কি? আমি তো সব কিছুকেই পাগল ভাবতে শুরু করেছি। ডাক্তারের কাছ থেকে জানতে হবে। আগাম চিস্তা-ভাবনা করে লাভ নেই। তবে একটা ব্যাপারে আমার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে, আমি ডাক্তান নই অথচ আমাকে ডাক্তারের চেয়ে বড় ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হবে কেন?
জীবনে কখনও অভিনয় করিনি। দর্শক হিসেবে নাটকের অভিনয় শুধু উপভোগ করেছি। তবে দৈনন্দিন জীবনে যা করছি--তাওতো নাটক। জীবন নাটক জ্ঞাতে আর অজ্ঞাতে হয়। কিন্তু এই নাটক আমার জ্ঞাতেই আমাকে করতে হবে। পরিচালক ডাঃ রকিব আহসান। অভিনয়ের প্রধান চরিত্র শোভন ও ন্যান্সি। আরো অভিনেতা-অভিনেত্রী, কলা-কুশলীরা আছেন। নায়িকা মেন্টাল পেসেন্ট। নায়ককে তার সর্বক্ষণ সঙ্গী থাকতে হবে। পরিচালকের কথা মতো কাজ করতে হবে। হ্যাঁ, এটা একটা নাটক। এখানে কেউ মরবে কিনা--জানি না। ডাক্তারও জানে না। আমি কোথায় যাচ্ছি, তা কি আমি নিশ্চিতভাবে জানি? হয়তো জানি, হয়তো জানি না। এরপর হয়তো কপালে আরো দুঃখ আছে। আবার এমনও হতে পারে ন্যান্সি ভালো হয়ে আমাকে ছাড়া অন্য কাউকে জীবন সাথী...। এই নাটকের শেষাংশ ডাক্তার লেখেননি। ডাক্তারও নিশ্চিতভাবে জানেন না--নাটকের শেষে কি হবে? অতএব আমার ইচ্ছা পূরণ হতেও পারে। জীবন নাটকে অনেক কিছুই ঘটে যায়--যা মানুষ কল্পনাও করতে পারে না। আমার জীবনে ঘটুক এমন কোন ঘটনা। আমাদের এ হতাশাদীপ্ত, জীবন্মৃত জীবনে লটারী না মিললে কোনদিন বড় হতে পারব না--কোনদিন মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারব না। এ পৃথিবীর সবাই বড় হতে চায়--আমিও চাই।
ধারাবাহিক উপন্যাসঃ হৃদয়ের এপিঠ-ওপিঠ (পর্ব-১৮)
--শাশ্বত স্বপন
গাড়ি এসে একেবারে গ্যারেজের সামনে থামল। আমি নামলাম। দোতলায় তাকালাম। ন্যান্সি হাতে টেপ-রেকর্ডার নিয়ে দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল। মনে হচ্ছে নিচে ফেলে দেবে। আমি লজ্জার মাথা খেয়ে ডাকলাম, ‘ন্যান্সি’। ডাক শুনে তার চোখ-মুখ খুশিতে চিকচিক করে উঠল। সে টেপ-রেকর্ডার তার পায়ের কাছে রেখে দিল। আমার কাছে আসতে বললাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই দৌঁড়ে আমার কাছে ছুটে আসল। হাতে একটা প্যাডের কাগজ ভাঁজ করা। সামনে এসে আমার দিকে তাকাল, হাসল। ভাঁজ করা কাগজটা আমার ডান হাতে দিয়ে বাম হাত ধরে ফুলের বাগানের দিকে নিয়ে যেতে লাগল। দোতলার জানালা দিয়ে মিসেস চৌধুরী ব্যাপারটা লক্ষ্য করছিল। কাজের বুয়াও খুশিতে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সুইমিং পুলের সামনে আমাকে বসাল, নিজেও বসল। কাগজটা পড়তে বলল, ভাঁজ করা কাগজটা পড়লাম। “ফ্রান্সিস, তুমি চলে গিয়েছিলে কেন? আমি তো ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে তোমাকে নিয়ে কত স্বপ্ন দেখেছি। কি দেখেছি জান? বলব না। টেলিফোন করি, কেউ ধরে না। মাথা ঘুরছে, কিছুই ভালো লাগে না।”
তারপর, কাঁটাছিঁড়া। কিছুই বুঝা গেল না। বানান ভুল। বাংলা হাতের লেখা খুবই খারাপ। আমার বুঝতে কষ্ট হচ্ছে দেখে সে কাগজটা ছিঁড়ে ফেলল। আমি জিজ্ঞাসা করলাম,
-- সাঁতার কাটবে?
-- দুপুরে--
-- দুপুরে?
-- হ্যাঁ।
-- সকালে নাস্তা করেছ?
মুখ গোমড়া হয়ে গেল। বুয়া পিছনে এসে দাঁড়িয়েছিল। সে এসে আমাকে জানাল যে, ন্যান্সি সকাল থেকে এ পর্যন্ত কিছুই খায়নি। আমি আবার ওর দিকে তাকালাম।
-- খাওনি কেন?
-- তুমি খাওনি কেন?
-- আমি খেয়েছি তো।
-- কখন? আমি দেখেনি তো।
ন্যান্সি বাংলার চেয়ে ইংরেজিতেই বেশি কথা বলে। তাই আমাকেও তার মতো ইংরেজিতে কথা বলতে হয়। সে যখন বাংলায় বলে আমিও তখন বাংলায় বলি।
খাবার টেবিলে বসে তার মায়ের কাছ থেকে শুনলাম, ফ্রান্সিস ছাড়াও তার আরো বন্ধু ছিল। যদিও তারা তেমন ঘনিষ্ঠ ছিল না; হয়তো ফ্রান্সিসের কারণে। দু’জনের গল্পের ফাঁকে হয়তো অন্যান্য বয় ফ্রেণ্ডদের সময়ই দিতে পারত না। ন্যান্সির জন্য আমাকে খেতে হচ্ছে। তবে এবার দুই প্লেটে। সে খাচ্ছে আর কি এক গানের সুর ধরে গুনগুন করছে। তার মা মাঝে মাঝে স্মৃতিকথা উঠালে ন্যান্সি মনোযাগ দেয়। হঠাৎ সে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। তাপর শুরু হলো মাথার যন্ত্রণা। কি যেন তার মনে হলো। পাগল জীবনে অনেক দেখেছি কিন্তু এমন পাগল কোনদিন দেখিনি। খাবারগুলো তার মায়ের দিকে ছুঁড়তে লাগল। পাশে আয়নার সামনে রাখা বিদেশী খেলনা গাড়িটা ভেঙ্গে ফেলল। আমি কিছুই বলছি না। দর্শকের মতো শুধু দেখছি। ব্যাপারটা অবাক লাগছিল। একটু আগে যাকে সুস্থ্য মনে হলো এখন সে অসুস্থ। ন্যান্সি আমার হাত ধরল। নিয়ে গেল নিজের রুমে। ভয় ছিল, আমাকেই আঘাত করে বসে কিনা। না, সে রকম কোন লক্ষণ দেখা গেল না। আমাকে আসলে সে কি ভাবে, ফ্রান্সিস না অন্য কিছু। ফ্রান্সিস সদৃশ্য ভেবে সে কি দইয়েল স্বাদ ঘোলে মিটাচ্ছে?
ন্যান্সির রুম পাঁচটা। অর্থাৎ পুরো একটা দোতলা বিল্ডিং তার নিজের জন্য। বিছানা মোট চারটা। যখন যেখানে ইচ্ছা সে আগে শুতো। অসুস্থ হওয়ার পর তিনটি রুম বন্ধ করে দেয়া হয়। নিচ তলার অডিটোরিয়াম একেবারেই বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। কাজের বুয়া আমাকে সব দেখাচ্ছে। ন্যান্সি আমার হাত ধরে আছে। যেন, সে একটা শিশু। শিশুর মতো গাল ফুলে আছে। শিশুর মতো এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে। যেন, এইসব জায়গা সে আগে কখনও দেখেনি। বুয়া চাবি দিয়ে নিচ তলার তালা খুলল। দু’জনে রুমে ঢুকলাম। অন্ধকার কক্ষ। সুইচ টিপ দিয়েই বুয়া অন্য কক্ষে চলে গেল। বাতি জ্বলতেই দেখি বেশ বড় এক অডিটোরিয়াম। ন্যান্সি এমনভাবে তাকাল যেন সে কিছুই চেনে না--আগে কখনো এখানে আসেনি--এ জায়গা কখনও দেখেনি। এক্সিডেন্ট দেখার পর তার স্মৃতিশক্তি কি পুরোপুরি লোপ পেয়েছে? এখানে যে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হতো এ ব্যাপারে আমি নিশ্চিত। চারদিকে বেশ গুছগাছ, বিভিন্ন মহামনীষীর ছবি, নিচে কার্পেট বিছানো অত্যন্ত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। মনে হয়, সকালবেলা কে যেন গুছগাছ করে রেখে গেছে। বড় এক ছবি, মঞ্চের একপাশে টানানো। ভালো করে তাকিয়ে দেখলাম ছবিটা ন্যান্সির। জীবস্ত হাসি, মনে হয় এইতো সেদিনের ছবি। বুয়ার কাছ থেকে জানতে পারলাম, ছবিটি ন্যান্সির অষ্টম শ্রেণিতে থাকা অবস্থার তোলা। অন্য পাশে মা-বাবার সাথে আরেকটি বড় ছবি। পাশের এক কক্ষে গেলাম। এখানে রাখা আছে বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র। বুঝা যায়, সংগীতের স্রোতধারা একদা এখানে বয়ে যেত। এখানেও নানা প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলীর ছবি টাঙ্গানো। অন্য কক্ষগুলোতে গেলাম। কোনটা নৃত্যের, কোনটি সাজগোজের। পাশে ছোট দু’টি বাথরুম আছে। এখনও টেপ থেকে পানি পড়ছে। সব দেখে মনে হলো, আজ বিকালে বোধহয়, কোন অনুষ্ঠান আছে।
ন্যান্সির ছবির কাছে আসলাম, ওকে জিজ্ঞেস করলাম--“ছবিটি কার? তার হাসি দেখে মনে হয়, সে যেন চিনেছে। আবার মনে হয়, সে এমনি হাসছে। এখানে কারা অনুষ্ঠান করত? এখন বা তারা কোথায়? বুয়াকে জিজ্ঞাসা করতেই দেখি মিসেস নজরুল হাজির। নিচ তলার এই অডিটোরিয়ামে পুরো সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের কথা বললেন। এখানে মাসে চার-পাঁচটি অনুষ্ঠাত হত। অনুষ্ঠানের উপস্থাপিকা হতো ন্যান্সি। প্রথমে ভালোভাবে উপস্থাপন করতে পারত না। জড়তা থেকে যেত। পরে ন্যান্সি আর ফ্রান্সিস মিলে উপস্থাপনা করত। মিসেস চৌধুরীর চোখ ছলছল করছে। একটা চেয়ার দেখিয়ে বললেন, এখানে ন্যান্সি বসত। পাশের চেয়ারটিতে ফ্রান্সিস। আর অন্যগুলোতে আমরা বসতাম। এখনো এই জায়গাটা জাঁকজমক রাখার কারণ হল--ন্যান্সির স্মৃতিতে ধীরে ধীরে এই মঞ্চের ইতিহাস ফিরে আসে কিনা। যারা আগে এখানে আসত, অর্থাৎ গানের শিক্ষকরা, গুনগ্রাহীরা, বন্ধুরা--এরা ন্যান্সির পাগলামীর কারণে কেউ আসে না। একমাত্র ফ্রান্সিসের চেহারা ছাড়া সব চেহারা সে ভুলে গেছে। ফ্রান্সিসকে সে আমাদের চেয়ে বেশি ভালোবাসত। এখানে এসে মিসেস নজরুল থেমে গেলেন। কিছুক্ষণ পর আবার বললেন, যারা ন্যান্সিকে ভালোবাসত তারা ওর এই মানসিক অবস্থা দেখে দীর্ঘশ্বাস ছাড়yক--এ আমি চাই না। অনেকে আমার অগোচরে বলেই ফেলত, খ্রীস্টান একটা ছেলেকে ন্যান্সি এত ভালোবাসত! মা-বাবার চরম উদাসীনতার কারণেই এ অবস্থা হয়েছে। মাঝে বেশ কয়েকবার এখানে অনুষ্ঠান হয়েছিল। ন্যান্সিকে তার চেয়ারে বসিয়ে রাখা হয়েছিল। তার প্রিয় গান, কবিতা, কৌতুক শোনানো হয়েছিল কিন্তু তার কোন পরিবর্তন হয়নি। শুধু ফ্রান্সিস, ফ্রান্সিস, ফ্রান্সিস...।
ন্যান্সি এখনও আমার হাত ধরে আছে। এদিক-ওদিক শিশুর মতো তাকাচ্ছে। সে জোর করে এখান থেকে অন্য কোথাও নিয়ে যেতে চাইছে। এক জায়গায় সে বেশিক্ষণ স্থির থাকতে পারে না। মিসেস নজরুল তাকে স্থির হতে বলল। সে মায়ের কথায় আরো রেগে গেল। এবার আমাকে বাইরে নেবার জন্য আরো বেশি জোর করতে লাগল। কেউ কর্তৃত্ব দেখালে সে এখনো রাগ করে। এই স্বভাবটা তার এখনো রয়ে গেছে। আমি বাইরে যেতে চাইছি না বলে চিৎকার শুরু করল। মনে হয়, এ ঘরে তার দম বন্ধ হয়ে আসছে। বাইরে এলাম। সে বাইরে এসে এমনভাবে একটা নিঃশ্বাস নিল--মনে হল, এতক্ষণ তার শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। আমাকে সাথে নিয়ে সে দৌঁড়াতে চায়। আমার বেশ লজ্জা লাগছে। সে দৌঁড়ে বাগানে চলে গেল। হাসতে হাসতে আবার ফিরে এল। শিশুর মতো খেলা করতে লাগল আমাকে ঘিরে। মনে হচ্ছে, এতদিনে সে বন্ধুর মতো একজন বন্ধু পেয়েছে। সে দৌঁড়ে চলে যায়। আবার ফিরে আসে। যেন--‘এই গাঙ্গে কুমীর নাই নাইয়া-ধুইয়া বাড়ি যাই।’ আবার যেন, সে ভয় পেয়েই আমার কাছে ছুটে আসে। ক্রমে ক্রমে তার প্রতি আমার মায়া বাড়তে লাগল।
পরাজিত সৈনিক আমি। পরাজয়ের কোন ভয় আমার নেই। নেই কোন লজ্জা। তবে পরাজয়ের মাঝেও যদি সারা ভূ-খণ্ডের কিছু অংশ দখল করতে পারি তবে তাও হবে জিরো থেকে সম্মুখের কোন সংখ্যা। আর যদি পারি বিজয়ের বেশে সবটুকু দখল করতে তবে তা হবে দুর্লভ পাওয়া। এ পৃথিবীতে অসম্ভব বলতে কিছু নেই। গত দিন যা অসম্ভব ছিল--আজ তা সম্ভব হয়েছে। আজ যা অসম্ভব হয়তো কাল তা সম্ভব হতেও পারে।
ধারাবাহিক উপন্যাসঃ হৃদয়ের এপিঠ-ওপিঠ (পর্ব-১৯)
--শাশ্বত স্বপন
আমি মিসেস চৌধুরী ও বুয়ার দৃষ্টি আকর্ষণ করলাম। দেখলাম তারা বেশ হাসি-খুশি। আমাকে নিয়ে ন্যান্সি চলে এল সুইমিং পুলের ধারে। সে খুব আনন্দে সাঁতার কাঁটছে। মাঝে মাঝে আমাকে পানি ছিটিয়ে দিচ্ছে। জৈষ্ঠ্য-আষাঢ় মাসে ডোবার মাঝে নতুন পানি পেয়ে ব্যাঙ যেমন আনন্দ করে সেও তেমনি করছে। সে গোল টিউবে ভর দিয়ে সাঁতার কাটছে। সাঁতার জানে কিনা--আমি জানি না। এখন আমার পর্যবেক্ষণের সময়। পেছনে তাকিয়ে দেখলাম আমাদের দিকে কেউ তাকাচ্ছে কিনা। ন্যান্সি ফ্রক পরিহিতা ছিল। ওড়না ওর গায়ে কখনও দেখিনি। পাগল বলে কথা নয়--ধনী মেয়েরা কখনও ওড়না পরে না--পড়তে চায় না। ইউরোপীয় স্টাইলে তারা চলতে পছন্দ করে। ভিজা অবস্থায় তাকে খুবই সুন্দর লাগছিল। আমাকে সে পানিতে নামতে বলছে। আমি ইচ্ছে করেই নামছি না। একটা মাত্র ড্রেস পড়ে এসেছি। এটা ভিজালে কার পোষাক পড়ব? আমাকে সে ভিজাতে লাগল।
-- প্লিজ, আস।
-- একটা ড্রেসই আমার। ভিজালে পড়ব কি?
-- আমার সালোয়ার-কামিজ পড়বে।
-- এগুলো মেয়েদের ড্রেস।
-- না, তুমি পড়বে, আস, আস বলছি। আসবে না, আচ্ছা--
হঠাৎ করে সে টিউব ছেড়ে দিল। পানিতে তলিয়ে যেতে লাগল। চিৎকার করে বলতে লাগল,‘ হেলপ, হেলপ, হেলপ মী...।’ আমি আর দেরি না করে লাফ দিয়ে পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়লাম। সে আমাকে জড়িয়ে ধরল। আমার দু’গালে দু’টা চুমো দিয়ে আমাকে ধরে পা ছুঁড়াছুঁড়ি করতে লাগল। টিউবটি আমি হাত দিয়ে ধরলাম। সে সরিয়ে দিল। তারপর সাঁতার কাটতে শুরু কর। তাহলে, সে সাঁতার কাটতে পারে? সুইমিং পুলের পাশে বসার সুন্দর একটা প্লেস আছে, কাপড়-চোপড় বদলানোর জন্য। আমি উপরে উঠে এলাম। সেও আসল। শরীরে অবিন্যস্ত ফ্রক। আমি রাগ করে অন্যদিকে তাকিয়ে রইলাম। সে আমার মুখ ঘুরিয়ে তার দিকে আনল, হাসল। কত সুন্দর হাসি! আল্পনার হাসিও খুব সুন্দর ছিল। তবে দুটি হাসিই দু’রকম। পৃথিবীতে কোন কিছুর সাথে কোন কিছুর হুবহু মিল নেই। আমি তার লজ্জা পর্যবেক্ষন করার জন্য বুকের দিকে তাকালাম। সে প্রথমে বুঝতে পারেনি। হঠাৎ বুঝতে পেরে ফ্রকের উপরের অংশটা বিন্যস্ত করার জন্য সে নিজেই ঘুরে গেল। আমি আবার উৎসুক হতেই সে একটা কিল লাগিয়ে দিল আমার বুকে। অপরাধ তার বুকের দিকে তাকালাম কেন? লজ্জা তাহলে ঠিকই আছে। সে তার পিঠ আমার দিকে রেখে মাথা হেলিয়ে দিল আমার বুকে। বুঝলাম, ফ্রান্সিসের সাথে এসব ঘটত। সে চোখ বুজে রইল।
-- ন্যান্সি, ঠাণ্ডা লাগবে। চল, ফ্রক বদলাবে না?
-- না, যাব না। ওখানে ভালো লাগে না।
-- আমার ঠাণ্ডা লাগবে তো।
-- তোমার ঠাণ্ডা লাগবে, চল, হাত ধর--
আমি হাত ধরলাম। দোতলার সিঁড়িতে পা রাখতেই দেখি বুয়া একটা লুঙ্গি, একটা গেঞ্জি নিয়ে নিচে নামছে। অবাক কাণ্ড, সবই নতুন। বুঝলাম, সুইমিং পুলে যাওয়ার সাথে সাথে এগুলো কিনে আনতে লোক পাঠানো হয়েছে। আমাকে একটা রুম দেখানো হলো। ন্যান্সি ধমক দিয়ে আমাকে তার রুমেই নিয়ে গেল। একটা ছোট রুমে খুব সুন্দর তিনটি আলমারী। মনে হয়, সে এখানেই ড্রেস চেঞ্জ করে। ন্যান্সি একটা আলমারী খুলতে চেষ্টা করছে। আলমালী তালাবদ্ধ। বুয়া চাবি এনে খুলে দিল। বুয়া আমাকে জানাল, এই তিন আলমারীতে কাপড়, থ্রী পিছ,টু-পিছ, ফ্রক-সালোয়ার-সেমিজ ইত্যাদি সংখ্যা আট-নয় শত হবে। আমি অবাক। সে এক একটা পোষাক মাসে দুই-এক দিন পড়ত। তারপর যেখানে-সেখানে ফেলে রাখত। পওে ঐগুলো গরীবদের দিয়ে দেওয়া হতো। ছোটবেলা থেকে সে বহু প্রেজেনটেশন পেয়ে আসছে। তার জন্য কোন অনুষ্ঠান হলে পোষাক, প্রসাধনী সামগ্রী ইত্যাদি বেশি আসত। মনে পড়ে গেল মধূসুদনের কথা। হায়রে মধুসূদন, তোমার উত্তরসূরী আজ আমার সামনে। বুয়া আলমারী খুলতেই সে থ্রি-পিছ আর একটা সালোয়ার-কামিজ বের করল। আমাকে বলল, কোনটা সে পড়বে? আমি টু-পীছের কথা বললাম। আমার জন্য সে ফ্রক বের করেছে। আমাকে ফ্রক পরাবে। আমি লুঙ্গি, গেঞ্জি দেখালাম। সে নাক ছিটকায়। এবার আমি জোর করে তাকে অন্য রুমে নিয়ে গেলাম। নয়তো সব জামা-কাপড় বের করে বিশৃংখলার সৃষ্টি করবে। এসব জামা-কাপড় অনেকগুলো এ রুমের আলনায়ই থাকত। কিন্তু তার পাগলামীর জন্য সবই আলমারীতে তালা বদ্ধ করে রাখা হয়েছে।
সে তোয়ালে দিয়ে তার শরীর মুছে ফেলল। আমি অন্য রুমে যেতেই সে হাত ধরে তার সামনে দাঁড় করাল। আমি শার্ট-প্যান্ট খুলে লুঙ্গি, গেঞ্জি পরিধান করেছি। সে মিটিমিটি হাসছে আমার পোষাক চেঞ্জ দেখে। তারপর সে আমাকে অন্যদিকে তাকাতে বলল। আমি অন্যদিকে তাকিয়ে রইলাম। আশেপাশে কেউ নেই। সে তার ফ্রক খুলল। আমি টের পেলাম। ফিরে তাকাতেই সে দু’হাত দিয়ে বুক ঢেকে পেছন ফিরে বসে পড়ল। আমি পিঠের দিকে তাকালাম। পিঠে দিলাম এক চুমো।
-- এই, সরে যাও--অন্যদিকে তাকাও--আমি ইয়েস বললে তুমি তাকাবে।
-- কেন, আমার পোষাক চেঞ্জ এর সময় তুমি দেখেছ না।
-- তুমি তো ছেলে।
-- তুমি কি মেয়ে?
-- হ্যাঁ, অন্যদিকে তাকাও। পরে পুরস্কার দেব।
-- তাই--?
-- হ্যাঁ, সত্যি বলছি।
হায়রে পাগল। জাতে মাতাল তালে ঠিক। আমি অন্যদিকে এ্যাটেনশন হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। ইয়েস বলতে তাকালাম। সে টু-পীছ পড়ে ফেলেছে। আবার অন্যদিকে তাকালাম তার কথা মতো। সে আমার গলা ধরে ঠোঁটের উপর বসিয়ে দিল গাঢ় চুম্বন। থুথু লেগে গেছে। সাথে সাথে বলে দিল, এটা হলো পুরস্কার। তাকিয়ে রইলাম ওর দিকে। ও হাসছে। সে আমার ভেজা শার্ট, প্যান্ট, তার ফ্রক সবই ফেলে দিল নিচে। তারপর সে তোয়ালে দিয়ে আমার মাথা মুছতে লাগল। ভালোভাবে আমি মাথা মুছিনি সত্য কিন্তু তার দৃষ্টি আমার দিকে গেল? আমি অবাক, কে বলবে সী ইজ মেন্টাল পেসেন্ট? লাজ-লজ্জা সবই যখন আছে তখন...। কি জানি, এ দুনিয়াতে কত জাতের পাগল আছে। এক জনের সঙ্গে অন্য জনের সাদৃশ্য না থাকাই স্বাবাবিক। আসলে সূক্ষèভাবে, আমরা কেউ সুস্থ নই--সবাই আপেক্ষিক সুস্থ। তাই একজন অন্য জনকে মনে করি অসুস্থ। মুসলমানে মুসলমানে যুদ্ধ করে বাংলাদেশ ও পাকিস্তান হয়ে গেল। বিশ্বে, এদের অসুস্থই ভেবেছে। কিন্তু তৎকালীন সমজে বাঙালীরা বুঝতে পেরেছিল ধর্মগত মিল হলেও সংস্কৃতিগত, ভাষাগত, শিক্ষাগত তথা জাতিসত্ত্বাতে বিরাট ব্যবধান। তাই ধর্মের মিল দিয়ে একত্রে থাকা সম্ভব নয়। তাছাড়া ধর্ম ভীরুরা ছিল ধর্ম ব্যবসায়ীদের দ্বারা আক্রান্ত। ধর্মের সূত্র টেনে পাকিস্তানিরা বাংলাদেশের সংস্কৃতিতে বিরাট আঘাত হেনেছিল। বাঙালীরা বুঝল, বাঙালী বিধর্মীদের সাথে ভাই-বোন হিসেবে স্বাচ্ছন্দে থাকা যায়। কিন্তু পাকিস্তানি মুসলমানদের সাথে তা মোটেও সম্ভব হচ্ছে না। তাই সব ভেবে চিন্তে বাঙালীরা সময়ের প্রয়োজনে জাতিসত্ত্বাকে ধর্মের উপর স্থান দিল। তাই বলে ধর্মকে তারা কখনো খাট করে দেখেনি। সময়ের প্রয়োজনে জাতিসত্ত্বাকে প্রাধান্য দিয়েছে মাত্র। বাঙালীরা নিশ্চয় নিজেদেরকে অসুস্থ ভাবে না। আজকের বাংলাদেশে একদল মৌলবাদীদের ভাবে অসুস্থ। আবার মৌলবাদীরা ঐ দলটিকে ভাবে অসুস্থ। আসলে কারা অসুস্থ--তা নির্ণয় করা খুবই সহজ, আবার খুবই কঠিন।
ধারাবাহিক উপন্যাসঃ হৃদয়ের এপিঠ-ওপিঠ (পর্ব-২০)
--শাশ্বত স্বপন
ন্যান্সি আমার দিকে তাকিয়ে আছে। হঠাৎ উঃহু করে আমাকে জড়িয়ে ধরল। মাথা ধরেছে। এই তিন বছরে তার দেহে যে পরিমাণ ঔষধ গেছে--তা তার ওজনের বেশি হবেই। ফলে ক্রিয়ার প্রতিক্রিয়া তো হবেই। একটু পরে মাথা ব্যথা কমে গেল। সে হেসে উঠল। আমাকে নিয়ে কোথায় যাওয়া যায়, তাই ভাবতে লাগল। বুয়া চা বিস্কুট, কলা, আঙুর, আপেল, কোক ইত্যাদি নিয়ে এল। সে এগুলো বুয়াকে বারান্দায় রাখতে বলল। আমাকে নিয়ে বারান্দায় গেল। তার এখন কি যে আনন্দ হচ্ছে--তা তার চোখ মুখ দেখেই বোঝা যায়। আমি সোফায় বসলাম। ও আমার পাশে বসল। একটা আঙুর আমার মুখে পুড়ে দিল। ভয় পেয়ে আঙুল সরিয়ে নিল। ভেবেছিল আমি কামড় দেব। ফ্রান্সিসের সাথে নিশ্চয়ই এসব ঘটেছে। আমি তার মুখে আঙুর দিতেই সে আঙুলে কামড় বসিয়ে দিল। উঃহু বলে সরিয়ে আনতেই সে দু’হাত দিয়ে আঙুলটাকে ধরে ফুঁ দিতে লাগল। দু’জনেই হাসতে লাগলাম। হাসি আমার মুখ থেকে খুব কমই আসে। মনে হচ্ছে, ন্যান্সির কাছ থেকে আমি নতুন করে হাসতে শিখছি। এক সময় আল্পনাকে অনেক হাসাতাম। আল্পনার মন খারাপ থাকলে পেটে সুরসুরি দিতাম।
চায়ের একটা কাপ আমাকে দিতেই তার চোখ-মুখে এমন একটা ভাব লক্ষ্য করলাম যা আমাকে বিস্মিত করল। এক চোখ বোঁজা অবস্থার উঃ আঃ করতে লাগল।
-- ন্যান্সি, কেমন লাগছে তোমার?
-- আমাকে ধর...আমি...
কিছুক্ষণ কি এক যন্ত্রণায় ছটফট করল। কি যেন আবোল-তাবোল বকল, কিছুই বুঝলাম না। এমন সব শব্দ করল যা সাজালে কি অর্থ হয় ভাবতে লাগলাম। গাড়ি...ফুল...সবকিছু...না...উহু...ব্যথা...যাব না...ও ও ও...ফ্রান্সিস...। ন্যান্সি ঘুমিয়ে গেছে। মিসেস নজরুল দেখে গেলেন। বেশ লজ্জা পেলাম। তিনি আমার জড়তা কাটানোর জন্য জিজ্ঞাসা করলেন--
-- ঘুমিয়ে গেছে?
-- হ্যাঁ, মাথায় খুব যন্ত্রণা।
-- প্রায়ই হয়। সবে তো শুরু। ও এমন কাজ হঠাৎ হঠাৎ করে বসে--যা ভাবাও যায় না।
-- কি সব কথা বলল--কিছুই বুঝলাম না।
-- এরকম কথা কম্পিউটারে রেকর্ড করা হয়েছে--কিছুই ধরা পড়েনি। ওকে বিছানায় শুইয়ে দাও।
আমি তাই করলাম। রুমে আমি আর ন্যান্সি ছাড়া আর কেউ নেই। বিছানায় শুইয়ে ওর মুখের দিকে তাকালাম। একটু পরেই দেখি সে চোখ খুলল। চোখ ছলছল করছে।
-- আমার কিছু ভালো লাগছে না।
-- সমুদ্র দেখবে?
-- হ্যাঁ, দেখব। এক্ষুণি দেখব।
-- না, এক্ষুণি না। ঘুমাও পরে যাব--
ন্যান্সি কি যেন ভাবছে। মিসেস নজরুল একটা টেপ-রেকর্ডার রেখে গেল। আমি একটা ক্যাসেট নাড়াচাড়া করলাম। রবীন্দ্র সংগীতের ক্যাসেট। চালু করলাম। ‘ধন্য হল সকল অঙ্গ--পূর্ণ হল অস্তর--সুন্দর হে সুন্দর...।’ আমার কোন অঙ্গ ধন্য হয়েছে কিনা জানি না--তবে হৃদয়ের পুরো অংশ বেদনাতে ভরে গেছে। এক হৃদয়ে এত বেদনা কি করে থাকে? হৃদয় কি কম্পিউটারের মতো এত বেদনা ধারণক্ষম?
আমি জানি, এখন খুব ভালোভাবে উপলব্ধি করি--এই মেয়েটিকে ছেড়ে কোথাও বোধহয় যেতে পারব না। যেতে চাইলেও এরা আমাকে যেতে দেবে না। ন্যান্সি তো যেতে দেবেই না। কিন্তু ‘আমি’ যেতে চাই--পারি না। আমি বাঁচার মতো বাঁচতে চাই কিন্তু পারি না। জীবন্ত লাশ হয়ে আমি বেঁচে আছি। পারি না কোন সিদ্ধান্ত নিতে। সাহস আছে কিন্তু দেখাতে পারি না। হৃদয়ে অনেক দুঃখ-কষ্টের কথা আছে--কাউকে বলতে পারি না--বলার মতো মানুষ পাই না। আমি কি--আমি নিজেই জানি না। টেপে গান বাজছে--‘গ্রাম ছাড়া ঐ রাঙা মাটির পথ আমার মন ভুলায়রে...।’ আমি উৎকণ্ঠে ন্যান্সিকে বললাম, ন্যান্সি, গ্রামে যাবে?
সে দৌঁড়ে এসে আমার গলা জড়িয়ে ধরল। আমি ওর দিকে তাকালাম। সে তার হাত দিয়ে আমার চোখ মুছে দিল। বুঝলাম, আমার চোখে পানি। আজকাল কি হয়েছে আমার? আমি কি অসার? আমি কাঁদি--চোখ দিয়ে পানি ঝরে অথচ আমি নিজেই কিছু উপলব্ধি করতে পারি না। সেলিম ওর দুঃখ-কষ্ট অনেক কিছুই আমাকে বলেছে অথচ আমি ওর কাছে তেমন কিছুই বলিনি। মুখ-চোরা স্বভাব আমার। নিজের কথা নিজের অজান্তেই লুকিয়ে রাখি।
-- তুমি কাঁদছ কেন?
-- কৈ নাতো, চোখে ডিস্টার্ব আছে।
-- আঙ্কেলকে বল।
-- বলব, অবশ্যই বলব।
-- গান ভালো লাগে?
-- খুব--
অনেক বেলা গড়িয়ে গেছে। লাঞ্চের সময় বুয়া দু’জনকে ডাকল। দু’জনে দুই প্লেটে খেতে বসলাম। খাবার টেবিলে বসে সে এমন সব কাণ্ড করছে--যা দেখে ছোট শিশুর কথা মনে পড়ে। আমি কিছুই বলছি না। তার শিশু সুলভ কাণ্ড-কারখানা দেখছি। সে এটা খাবে না, ওটা খাবে না। চৌত্রিশটা আইটেম দেওয়া আছে। যেটা তার ভালো মনে হয়, সেটাও একটু মুখে নিয়ে ফেলে দেয়। বুয়া, রেহানা তাকে এটা-ওটা খেতে বলে, সে আরো রেগে যায়। তার মায়ের দিকে সে খাবার ছুঁড়ে মারে। বুয়াকে তরকারি ছুঁড়ে মারে। কারণ বুয়া তাকে তরকারি খেতে কর্তৃত্ব দেখিয়েছে। সরাসরি এ বাড়ির সদস্য যদিও নয় তবুও ডাক্তারকে ন্যান্সি বেশি ভালোবাসে। সে যা করতে চায়--ডাক্তার তাতেই সায় দেয়। নিষেধ করে না। বুয়ার কাছ থেকে জানতে পারলাম, একদিন সে টিভি ভাঙ্গতে চাইল--ডাক্তার তাকে অনুমতি দিল। সে টিভি ভেঙ্গে ফেলল আছাড় দিয়ে। ডাক্তার হাত তালি দিল। কিন্তু ন্যান্সি গম্ভীর হয়ে রইল। মনে হয়, সে খুশি হয়নি। বুয়া টিভি ভাঙ্গার গল্প বলার সাথে সাথে ন্যান্সি চিৎকার জুড়ে দিল। রেহানা ও বুয়া দু’জনেই চলে গেল। আমি ডাকলাম, “ন্যান্সি আমার কাছে বস।” সে গাল ফুলিয়ে আছে। আমার প্লেট ফেলে দিল। সেও খাবে না--আমাকেও খেতে দেবে না।বললাম, ‘আমি চলে যাব এক্ষুণি।’
সে আবার চিৎকার জুড়ে দিল। আমি উঠে দাঁড়াতেই সে আমাকে আবার বসাল। মাপ চাওয়া ভঙ্গীতে আমার পায়ের সামনে ফ্লোরে বসে পড়ল। আমি অনেকটাই জোর করে তাকে কিছু পরিমাণ খাওয়ালাম। সে চেয়ারে বসে আমার গায়ে হেলান দিয়ে পড়ল। আমি আর খেলাম না। চলে এলাম ওর বিছানায়। ও টেপ চালু করতে গেল। মিউজিকের তালে তালে গুন গুন করে গান গাইছে আর নাচছে। বিছানায় গড়াগড়ি দিতেই মুরাদের কথা মনে পড়ল। ওর টাকার দরকার। সন্ধ্যায় সিঁদুরকে বলতে হবে, তোমাকে আর পড়াতে পারব না। হয়তো সপ্তাহে দুই-একদিন আসতে পারব--যা না আসাই ভালো। বুয়া আমাকে ডাকল। ন্যান্সি বুয়াকে দেখে মারতে গেল। বুয়া দৌঁড়ে চলে গেলে। ন্যান্সি বুয়ার দৌঁড়ানো দেখে হাসল।
ধারাবাহিক উপন্যাসঃ হৃদয়ের এপিঠ-ওপিঠ (পর্ব-২১)
--শাশ্বত স্বপন
রুমে ঢুকল একজন দর্জি, হাতে ফিতা। ফেলে দেওয়া প্যান্ট হাতে নিয়ে বুয়া দর্জির পেছনে দাঁড়াল। দর্জি লোকটি তার সাথে শিশু সুলভ কথাবার্তা বলতে শুরু কর। সুস্থ্য অবস্থায় তার দোকানেই সে সব কিছু বানাত। এ পরিবারে সে একজন প্রাইভেট টেইলার। তার কাছ থেকে ফিতা নিয়ে খেলতে লাগল। আমি ওকে আদর করে ফিতা হাতে নিলাম। দর্জি আমার জামা-কাপড়ের মাপ নিয়ে চলে গেল। আমি অবাক হলাম। এই বোধহয়, তাদের দেওয়া শুরু হলো। আমি ওকে বুঝিয়ে-শুনিয়ে ঘুমের ট্যাবলেট খাওয়ালাম। ও আমাকেও খাওয়াতে চাইল। আমি মিছিমিছি খেলাম। ও খুশি হল। দু’জনে ছাদে গেলাম। সাবধান করে দেওয়া হলো যেন, সে লাফ না দেয়। আমি ওর হাত ধরেই রইলাম। ও দৌঁড়াতে চাইল। আমি নিষেধ করলাম। ছাদে অসংখ্য ফুলের বাগান। ফুল গাছের পাশে ফুলের নেম-প্লেট দেওয়া আছে। এতসব ফুলের নাম জীবনেও শুনিনি। সব বিদেশি ফুল। একজন মালীও আছে। পাশে তার জন্য ছোট্ট একটা রুমও আছে। উনি বোধহয়, ওখানে থাকেন। অদূরে সুন্দর একটা বাথরুমও আছে। বিরাট বড় ছাদ। দুই দালান সংযুক্ত করে প্রসারিত। মালী আমাদের ফুল দিল। ন্যান্সি খুশিতে নেচে নেচে প্রজাপতি ধরতে লাগল। আল্পনার সাথে ঘটে যাওয়া কোন এক ঘটনার পর থেকে আমি ফুলকে ঘৃণা করতে শুরু করি। আজ পর্যন্তও ফুলকে ভালোবাসতে পারিনি। ফুলের মূল্য আমি দিতে পারি না। ফুলকে কেন জানি ভয় পাই--ভালো লাগে না। আমি জানি, এ আমার এক অসুস্থতা। ইচ্ছে করলে হয়তো এ ব্যাপার সুস্থ্য হতে পারি কিন্তু ইচ্ছা করে না। ফুল আহা মরি তেমন কোন গুরুত্বপূর্ণ বস্তু হিসেবে কখনও আমার কাছে মনে হয়নি। পেটে ক্ষুধা নিয়ে সৌন্দর্য চর্চা বিড়ম্বনা ছাড়া আর কিছুই নয়। কখনও কোনভাবে ফুল হাতে আসলে তা হাতের আঙুলের চাপে পিষে যায় নতুবা পকেটস্থ হয়ে যা হবার তা হয়। মালীর দেওয়া বিদেশি ফুল প্যান্টের পকেটে রাখলাম। সে আমাকে কি যেন আকার-ইঙ্গিতে বোঝাতে চাইছে। আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। এই ছাদ থেকে সে ফ্রান্সিকে দেখত--তাই বোঝাতে চাইছে কিনা--বুঝতে পারছি না। এক ফ্রান্সিস ছাড়া আর সবাইকে সে ভুলে গেছে। আমার বিশ্বাস হতে চায় না। ন্যান্সি কি অভিনয় করছে? না, না সে কি সম্ভব! পাগল তত্ত্ব বোঝা এত সহজ নয়। কিন্তু লিখতে তো বেশ পারে। যেহেতু সে ফ্রান্সিস বলে চিৎকার দিয়ে জ্ঞান হারিয়েছে সেহেতু ঐ শব্দটা স্মৃতি কক্ষে জমে আছে। আর বাকি সব...কোথায় গেছে? হ্যাঁ, সেটাও প্রশ্ন। মস্তিস্কের কোন কক্ষে তালাবদ্ধ হয়ে আছে; নাকি শূন্যে হারিয়ে গেছে ,কোন সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তবে এইটুকু বুঝি, সে ঐদিন থেকে পৃথিবীতে দ্বিতীয় জন্ম নিয়েছে। সত্যিকারের শিশুর মতো নয়--বেশ বৈচিত্র্য নিয়ে।
মিসেস নজরুল ছাদে কিছুক্ষণ গল্প করলেন। তিনি ন্যান্সির পাশে বসেছিলেন। ন্যান্সি তার মায়ের পাশ থেকে সরে এসে আমার পাশে বসল। আমাকে নিয়ে অন্য দিকে সরে যেতে চাইল। যেন আমি আপন,তারা পর। মিসেস নজরুলের কাছে ভৃত্যের মতো ছোট ভাইয়ের সমস্যাটা জানালাম। সে হাসি মুখে রাজী হল। আমাকে আরো আশ্বাস দিল, যখন আমার যা কিছু লাগে, তাই যেন নিজের বাড়ির মতো ভেবে চাই। আজ যে দুই হাজার টাকা চাইলাম, এটা তিনি পকেট খরচ হিসেবে আমাকে দেবেন আর মাসিক দশ হাজার টাকা বেতন হিসেবে ম্যানেজারের কাছ থেকে নিতে বললেন। আমি অবাক হলাম। এটা কি চাকুরি, ভিক্ষা, দান নাকি অন্য কিছু। তারা আমার পেছনে এত খরচ করবেন! আমি অবাক হলাম। কি এমন কাজ! তার জন্য এত! এতো আলাউদ্দীনের আশ্চর্য প্রদীপ!
এতক্ষণে ঘুমের ট্যাবলেটের ক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে। ন্যান্সি আমার গায়ে হেলান দিয়ে ঘুমাতে চাইছে। অমি ওকে নিয়ে নিচে চলে এলাম। মিসেস নজরুল আগেই নিচে নেমে গেছে। আমি ওকে বিছানায় শুইয়ে দিলাম। মাথায় হাত রাখলাম। কিছুক্ষণের মধ্যে ঘুমিয়ে গেল। পেছনে শব্দ পেয়ে তাকাতেই দেখি মিসেস নজরুল। হাতে টাকা নিয়ে হাসি মুখে এগিয়ে আসছেন।
-- নাও, এখানে দুই হাজার নয়--তিন হাজার টাকা আছে। যখন যা লাগে চাইবে--নিজের বাড়ি এবং নিজের মা না হোক, খালাম্মা ভেবে যখন যা খুশি চাইবে। নিজের বাড়ির মতো খাওয়া-দাওয়া করবে। এটা কোন চাকুরি নয় বাবা, এটা...এটা মনে কর, তোমার বোন, তোমার বোন মেন্টাল পেসেন্ট...।
মিসেস নজরুল কান্না জর্জরিত কণ্ঠে অনেক কিছু বললেন। কান্না থামাতে না পেরে মুখে কাপড় চেপে রইলেন। আমি মুহূর্তের এই ফাঁকটুকুতে হঠাৎ করে বলে উঠলাম,
-- এখন থেকে আপনাকে আন্টি ডাকব। মা-বাবার আদরের কথা ভুলেই গেছি। সেই ছোটবেলা থেকেই আমরা দু’ভাই বলতে গেলে এতিম।
-- তোমার ভাই ইচ্ছে করলে এখানে থেকে পড়তে পারে।
-- না, না--হোস্টেলে থাক। ও আমার এ চাকুরি সম্পকে জানে না। জানাতেও চাই না।
বুয়া এসে জানাল তার ফোন আসছে। তিনি চলে গেলেন। তারা এই অবস্থা ভোগ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে গেছেন। যে কোন অসুবিধা তারা টাকার মাধ্যমে তৎক্ষণাৎ সমাধান করতে পারেন। এই সমস্যাটাও টাকা দিয়ে সমাধান করতে চেয়েছেন, পারেননি। কোন আধ্যাত্মিক শক্তি যেন বোঝাতে চাইল, টাকা দিয়ে সব সমস্যার সমাধান হয় না।
ধারাবাহিক উপন্যাসঃ হৃদয়ের এপিঠ-ওপিঠ (পর্ব-22)
--শাশ্বত স্বপন
পৃথিবীকে জয় করে নিলেও স্রষ্টার কাছে পরাজয় বরণ করতে হবেই। এটা সবাই জানে। তবুও জয় করার চেষ্টা করে মৃত্যু পর্যন্ত। মৃত্যুকে জয় করতে গিয়েই পরাজয় বরণ করতে হয়। স্রষ্টা মানুষকে কোন না কোন দিক দিয়ে অসম্পূর্ণ রাখেনই। দেখা যাবে, খুব ধনী ব্যক্তি তার তিন মেয়ে, ছেলে নাই অথবা তিন ছেলে, মেয়ে নাই। আবার হয়তো দেখা যাবে কোন সন্তানই নাই। এই যে ন্যান্সি, আট বছরের সাধনার ফল, সে মেন্টাল পেসেন্ট। নজরুল চৌধুরী এদেশের দশজন ধনীর মধ্যে একজন। অথচ তিনিও অসম্পূর্ণ। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, আমাদের সংসার, আমাদের দুই ভাইকে নিয়ে কেন স্রষ্টা এত খেলা খেলছেন? এখানে কি মজা তার? তিনি আমাদের মরতে দিচ্ছেন না,জীবন্ত লাশ করে রেখেছেন। কি জানি, হয়তো এবার মুখের দিকে তাকাবেন। মিসেস নজরুল যে কথা শোনালেন--তা কি ভিতর থেকে, না বাহির থেকে, নাকি আবেগ থেকে। আবেগ থেকে মানুষ এমন সব বেফাঁস কথাবার্তা বলে ফেলে যা পরে চিন্তা করে সেও লজ্জা পায়। কিন্তু তিনি তো সত্যি বললেন। তিনি কি কোন ফাঁক রেখে কথা বলেছেন? ‘বোন’--হ্যাঁ বোনই তো। প্রথমে তো বোনই--তারপরে দেখা যাবে। কোন নারী প্রথমেই প্রেমিকা বা বউ পরিচিতা হয় না--হয় বান্ধবী নয়তো বোন । এই বোন আর আপন বোন এক নয়। সবাইকে আপন বোন ভাবলে বিয়ে করব কাকে? প্রেম করব কার সাথে। আর ন্যান্সির সাথে যেভাবে মিশে আছি তাতে কি ভাবা উচিত? কিন্তু সে তো মেন্টাল পেসেন্ট। হোক পেসেন্ট--মানুষ তো, নারী তো। ভালো হলে না হয়, দেখা যাবে। এখন সে আমার প্রেমিকা যাকে শুধুই ভালোবাসার নিঃশ্বাস দেব--কামনার নিঃশ্বাস নয়। মানুষ কথা দেয়--আবার কথা ফিরিয়েও নেয়। ঠিক দেয়ালে টেনিস বল মারার মতো। আন্টি কি পরে আমাকে ফিরিয়ে দেবে? এই যে তিনি আমাকে আপন বাড়ির মতো ভাবতে বললেন, এটা কি সৌজন্যতা নাকি সত্যিই। কি হিসেবে আমি এটাকে আপন বাড়ি ভাবব? আমি যদি আপন হতাম তবে কথা ছিল। আমি তো তাদের আত্মীয়-পুত্রও নই। যদি...। না, না এরা মেনে নেবে না। কিছুতেই না। আমি তাদের ভাতিজা, ভাগনে কিছু নই। আমি পথের মানুষ। আমার পায়েল নিচে আমার অধিকারভুক্ত সাড়ে তিন হাত মাটি নেই--আমার ঠিকানা নেই--গস্তব্যহীন জীবন আমার। বিষে বিষে বিষাক্ত আমার জীবন।
এরপর আমার কাছে যা যা আসতে লাগল--তা দেখে আমি নিজেও বিমূর্ত হলাম। প্রথমতঃ একটা আংটি। আংটিটি নাকি ফ্রান্সিসের আঙুলে ছিল। ন্যান্সি তাকে দিয়েছিল। পোস্টমর্টেমের পর আরও কিছু ঐ বাসায় দেওয়া হয়েছিল। ম্যাক্সিম এগুলো এ বাড়িতে দিয়ে গেছে। কারণ এগুলো সবই ন্যান্সির দেওয়া। এরপর একটা ঘড়ি, একটি স্বর্ণ খচিত ক্যাপ ও একটি সোনার চেইন। আমাকে এগুলো দেওয়া হলো এই কারণে যে, আমার দেহে এগুলো দেখে তার কোন ভাবান্তর হয় কিনা। আমি সবকিছু পরিধান করে আয়নার সামনে দাঁড়ালাম। মনে মনে বললাম, ভাই ফ্রান্সিস কি প্রেমের মাঝে তুমি ছিলে! একটা বেল্ট দেওয়া হলো--এটাও ফ্রান্সিসের। ব্যাডমিন্টন খেলার সময় মাজায় নয়তো কপালে এটা বাঁধে। বলা হলো, পরে আরো কিছু দেওয়া হবে। আমি ছোট্ট একটা চিঠি লিখলাম, যাতে ঘুম থেকে উঠে এটা দেখে। তাহলে হয়তো গণ্ডগোল করবে না। গালে একটা চুমো দিলাম। পকেট থেকে ফুল বের করে হাতে একটা ধরিয়ে দিলাম। আর একটা চিঠির উপর রেখে চিঠিসহ মুখের সামনে রাখলাম।
এই চেহারা নিয়ে সিঁদুরের বাসায় যাওয়া ঠিক হবে না। ক্যাপ, ঘড়ি, চেইন খুলে ফেললাম। সাধারণ পোশাক পরে আন্টির সামনে গেলাম। টিউশনির কথা বললাম। ছাত্রীর কয়দিন পর পরীক্ষা--তাও বললাম।
-- বল কি? ঘুম থেকে উঠেই গণ্ডগোল করবে। তোমাকে ছাড়া এ বাড়ির সবাইকে ওর অসহ্য লাগে। তুমি যাকে পড়াও তার মা-বাবাকে কিছু একটা অসুবিধা অথবা চাকুরির কথা বলে বিদায় নাও। আর যদি কর বা করতে হয় তবে ওকে ঘুম পাড়িয়ে যেতে পারবে। গাড়িতে আসবে-যাবে। যেহেতু তোমার ছাত্রীর সামনে পরীক্ষা।
-- না, তা দরকার হবে না-- দেখি বিদায় নিয়ে আসতে পারি কিনা। একটা চিঠি লিখে হাতের কাছে রেখেছি। ঘুম থেকে উঠে ওটা পড়লে মনে হয় বিরক্ত করবে না। আমি দুই ঘন্টার মধ্যে চলে আসব। এতক্ষন ও ঘুমাবে মনে হয়।
-- ও কিন্তু ভালোভাবে পড়তে পারে না। আগে তো ফ্রান্সিস ছাড়া আর কোন স্মৃতি শক্তি ছিল না। এখন আস্তে আস্তে লেখাপড়াটার স্মৃতিটা আসছে।
-- ও
-- তুমি গাড়িতে চড়ে যাও। ও অন্তত: তিন ঘন্টা ঘুমাবে।
-- আমি যেখানে যাচ্ছি, সেখান থেকে টেলিফোন করব, যদি দেরী হয়ে যায়।
-- তুমি তো এ বাসার টেলিফোন নম্বর জান না।
-- ডায়েরীতে দেখেছিলাম। মনে নেই এখন।
-- ৯৮৯৪৬০৬, দাঁড়াও লিখে দিচ্ছি।
আন্টি ফোন নম্বর কাগজে লিখে আমাকে দিল। ড্রাইভার গাড়ি দিয়ে সিঁদুরের বাসায় পৌঁছে দিল। গাড়ি বাইরে অপেক্ষায় রইল। নক করে ঘরে ঢুকতেই সিঁদুর থাণ্ডারড্ হয়ে গেল। তার মুখ শুকনো।
-- স্যার, এই বিকালে আসলেন যে?
-- পরে বলব। আগে বল, তোমার মুখে শুকনো কেন?
সিঁদুরের মুখটা এবার গম্ভীর হয়ে গেল। সে বইপত্র গোছাতে লাগল।
-- স্যার, মা-বাবা আমাকে কোলকাতা পাঠিয়ে দেবে।
-- বল কি!
-- ওখানে আমার মামা-মামী আছেন। আমাদের অবশ্য ওখানে বাড়িও আছে।
-- কবে যাবে?
-- পরীক্ষার পর মনে হয়।
-- তা অনেক সময়।
এদেশের সিংহভাগ হিন্দুদের এক ঠ্যাং এদেশে, আরেক ঠ্যাং ভারতে। বাঙালীত্ব ধুকে ধুকে মার খাচ্ছে ধর্ম তত্ত্বের কাছে। এদেশ এরা নিরাপদ ভাবে না। সেই দেশ বিভাগের সময় থেকে যাত্রা শুরু হয়েছে এখনো থামছে না। কি করবে? মুসলমান প্রধান দেশ মানে ইসলামী রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করলে, এরা তো ভয়ে কাঁপবেই। অথচ স্বাধীনতার যুদ্ধ হয়েছিল ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্র গঠনের জন্য।
-- স্যার, আপনাকে একটা কথা বলব?
-- কি কথা?
-- পড়া শেষে বলব।
-- আমিও পড়া শেষে তোমাকে আমার একটা সুসংবাদ দেব।
-- কি সুসংবাদ স্যার?
-- পড়া শেষে।
-- না স্যার, না শুনলে অংক করতে ভুল হয়ে যাবে।
-- প্লীজ, ডোন্ট রিকোয়েস্ট।
দুই মাসও হয়নি এ টিউশনির বয়স অথচ কত আপন! বিদায়ের কথা বললে হয়তো আর বাকি সময়টুকুও পড়ানো যাবে না। তাই কোনকিছু না বলে অনেকটা জোর করে অংক, ইংরেজি, শেষ করলাম। জ্যামিতি করাতে গিয়ে ওর দিকে তাকালাম। বিষাদ চেহারা! বুঝলাম না। জিজ্ঞাসা করতে ইচ্ছে করছে না। আজ তার যতই খারাপ অবস্থা হোক--আমি আজ বিদায় নেবই--আমাকে নিতেই হবে। মায়ার বন্ধন আমার জন্য নিষিদ্ধ। আমাকে সব ভালোবাসা দু’পাশে কাটিয়ে সম্মুখে যেতে হবে। আমি ওর মা-বাবাকে আসতে বললাম। সিঁদুর অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। জানতে চাইল কি ব্যাপার? আমি আশ্বাস দিলাম তেমন কিছু নয়। সে তার মা-বাবাকে নিয়ে এলো। চাকুরি সম্পর্কে তাদের অবহিত করলাম। দু’জনে খুশি হলেও সিঁদুর গম্ভীর হয়ে আছে। তাদেরকে চাকুরির নমুনাটা অন্যভাবে বলেছি। দু’জনে আমার মঙ্গল কামনা করে চলে গেলেন। মা-বাবা যেতেই দেখি, সিঁদুরের চোখে জল।
-- তাহলে স্যার আপনাকে আমার কথা বলে লাভ কি? আপনি তো...
-- আমি তোমাকে কখনও ভুলব না, মাঝে মাঝেই আসব।
-- আসবেন তো?
-- অবশ্যই।
ধারাবাহিক উপন্যাসঃ হৃদয়ের এপিঠ-ওপিঠ (পর্ব-23)
--শাশ্বত স্বপন
সিঁদুর কিছুটা আশ্বস্ত হলো। ওকে টেলিফোন নম্বর দিলাম। ও খুব খুশি হলো। আমাকে ওদের টেলিফোন নম্বরও দিল। এবার ওর কথা শুনব। ওকে ওর কথা বলতে বললাম। ও আজ বলবে না। টেলিফোনে বলবে। আমি অবাক হলাম। কি যে বলবে আমাকে, তাও আবার টেলিফোনে। আমাকে বসতে বলে, ও অন্য কক্ষে চলে গেলে। কিছুক্ষণ পর খাবার-দাবার আর একটা খাম নিয়ে এলো। হাতে খামটা দিল। বুঝলাম, টাকা। খেয়ে-দেয়ে চলে এলাম রাস্তায়। গাড়ি অপেক্ষায় আছে। উঠলাম গাড়িতে। তাকালাম পূর্বদিকে তিনতলা জানালায়। সিঁদুর জানালা দিয়ে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। গাড়ি যে ওয়েট-এ ছিল--সে কথা ওকে আমি বলিনি। ভাবছে, স্যার কি রকম! না জানি, কত বড় চাকুরি। হ্যাঁ, বড় চাকুরিই বলতে হয়। কেউ ডিগ্রী পাস করে মামা-কাকার জোরে বড় চাকুরি পায়; কেউ মাস্টার্স পাস করেও মামা-কাকার তদবীর ছাড়া সাধারণ একটা চাকুরিও পায় না। আমি কি বড় চাকুরি পেয়েছি? হ্যাঁ, বড়ই তো! দশ হাজার টাকা বেতন। প্রাসংগিক খরচও কমপক্ষে পাঁচ হাজার, এর কম হবে না। আমি তো মামা-কাকার সাহায্য নেইনি। তবে এটা কি ব্যতিক্রম কোন চাকুরি? না কি কোন চাকুরিই নয়? ন্যান্সিদের বাসায় চলে এলাম। ন্যান্সি ঘুমুচ্ছে। খামটা ছিঁড়লাম। এক হাজার টাকা। এক মাস পূর্ণ হয়নি অথচ...। তারপর একটা চিঠি।
স্যার,
আমি একটা ছেলেকে ভালোবাসতাম। ছেলেটি আমাকে অবশ্য আগে অফার দিয়েছিল। আমি যতবার এড়িয়ে যাই, সে ততবার সামনে আসে। এভাবে ফিরাতে ফিরাতে একদিন ওর প্রেমে পড়ে যাই। ওর নাম পিযুষ। আপনার কাছে প্রথম দিন মামাত ভাই বলেছিলাম। আসলে ও আমার জীবন-মরণ হয়ে উঠেছিল। কিন্তু এখন! ও খুব সুন্দর কবিতা লিখতে পারে--যা আমার মন কেড়ে নিয়েছিল। প্রায় এক বছর পর জানতে পারলাম সে পিযুষ নয়, সে মুসলমান। আমি এখনো তার আসল নাম জানি না--জানতেও চাইনি। সে গরুর মাংস খায়। গোপন সূত্রে জানতে পেরেছি, কাছিমের মাংসও খায়। আমি একদিন ওকে খুব বকে চলে আসি। আর কোনদিন ওর সাথে কথা বলিনি। বান্ধবীদের মাধ্যমে চিঠি দিত। সে কি চিঠি। সবই রক্ত! ও আগে বলেছিল ওর বাসা নারিন্দায় এবং সেই বাসা বিক্রি করে ওরা স্বপরিবারে কোলকাতা চলে যাবে। সব মিথ্যা স্যা--সব মিথ্যা। ওকে আমি ভুলতেও পারি ন। সত্যিই ওকে আমি ভালোবেসে ফেলেছি। ওর চিঠি আপনাকে পরে দেখাব। একটা জিনিস বেশ লক্ষ্য করার মতো, ওর চেহারা আপনার মতো। আমি আজ আর কিছু বলতে চাই না।
ইতি
সিঁদুর
বুয়া চা-বিস্কুট নিয়ে এলো। চিঠি পড়ার সাথে সাথে মনটা কেমন যেন করছিল। আমার মতো চেহারা? সব চিন্তা বাদ দিয়ে ন্যান্সির ঘুম ভাঙ্গা পর্যন্ত অপেক্ষা করলাম। সিঁদুরের যে কিছু একটা ঘটেছে--সেটা আমি আগেই টের পেয়েছি। বারান্দায় চা-বিস্কুট খেয়ে হাঁটলাম কিছুক্ষণ। মনের অজান্তে আল্পনার কাছে খুলে ধরলাম একটা চিঠি--‘‘আল্পনা, আমার অন্তর্যামী জানেন, কি বিষাক্ত বেদনা বুকে নিয়ে আজও বেঁচে আছি। এক জ্বলন্ত লোহা যেন আমার বুকের ভিতরে শ্মশান জ্বালায় সেই যে জ্বলতে শুরু করেছে, আজও জ্বলেই চলেছে। দশ বছরের প্রেমধারা এভাবে যে দু’ভাগ হয়ে যাবে--ভাবিনি। তুমি কি ভেবেছিলে আল্পনা? নিশ্চয় নয়। তবে কেন এমন হল? বিয়ের আগে কেন তুমি আমার সাথে পালিয়ে আসলে না। আমাদের প্রেম নিয়ে ছিনিমিনি খেলার অধিকার ঐ টিকি আর দাঁড়িওয়ালাদের কে দিয়েছে? জানালায় তাকিয়ে তাকিয়ে শাখা-সিঁদুর পড়ে তোমার চলে যাওয়া দেখলাম। বিয়ের আগে একবার জোর করে আনতে চেয়েছি--পারিনি। বিয়ের পরে চলে যাওয়া মুহূর্তেও আটকাতে চেয়েছি--পারিনি। থুথু দিয়েছিলাম ঐ টিকিদের উপর। অপমান আর বেয়াদবি করেছিলাম দাঁড়িওয়ালাদের সাথে। আমি জিততে পারিনি। সমাজের কাছে ব্যক্তি, সব সময়ই পরাজিত হয়। আমি পরাজিত হয়ে জেলে গেলাম আরেকটা ’৪৭ সৃষ্টি করার অপরাধে...। যারা আহত হয়েছিল তাদের আহত করার ইচ্ছা আমার ছিল না--ইচ্ছা ছিল সমাজকে আহত করার। আল্পনা, প্রেমশক্তি বড় ভয়াবহ! তুমি আজ কতদূরে আল্পনা। আমি ন্যান্সির মাঝে তোমাকে খুঁজি। বিশ্বাস কর তোমাকেই খুঁজি।..”
হঠাৎ পিছনের কারো ডাকে সজাগ হলাম। তাকিয়ে দেখি বুয়া। ন্যান্সি জেগেছে। আমি দরজায় দাঁড়ালাম। দেখি, কি করে? সে প্রথমে উঠেই হাতের ফুল দেখে অবাক হলো। ঘুম ভাঙ্গা মুখ গম্ভীর হয়ে আছে। বালিশের পাশে চিঠির উপর ফুল দেখে স্মিত একটু হাসল। চিঠিটা পড়তে চেষ্টা করল। মুখ কুচকে যাচ্ছে। মনে হয়, লেখা ভালো করে পড়তে পারছে না। ডানে-বায়ে আমাকে খুঁজছে। কোথাও দেখতে না পেয়ে আ আ করে চিৎকার শুরু কর। বুয়াকে আমার উপস্থিতির কথা বলতে নিষেধ করলাম। সে বুয়াকে ডেকে চিঠি পড়তে বলল। বুয়া পড়তে জানে না। সে ন্যান্সিকেই পড়তে বলল। আমার কথা জিজ্ঞেস করল। বুয়া বলল, চিঠিতে লেখা আছে। আমি দরজার পাশে লুকালাম। সে আবার পড়ল। কি বুঝল কে জানে? সে দৌড়ে বারান্দায় গেল। গ্রীল ধরে আমার অপেক্ষায় রইল। বুয়া তার কাছে চলে গেল। পিছু পিছু গিয়ে তার চোখ ধরলাম।
-- এই কে?
-- বলতো আমি কে?
-- ও, তুমি। কোথায় গিয়েছিলে?
-- বাইরে।
-- ফুল, কাগজ...?
-- আমি রেখেছি।
সে হাসছে। কিশোরীর মতো দৃষ্টি নিয়ে যুবতীর মতো দেহ ভঙ্গিতে আমার বুকের একেবারে কাছে এসে দাঁড়াল। বুকের পশম নাড়াচাড়া করতে লাগল।
-- তুমি আমাকে ছেড়ে কোথাও যাবে না।
-- তুমি তো ভালো হয়ে আমাকে ছেড়ে চলে যাবে।
-- না, আমি তোমাকে ছেড়ে কোথাও যাব না।
-- আমিও যাব না--তোমাকে ছেড়ে কোথাও যাব না।
ন্যান্সি খুব খুশি হলো। ওকে জড়িয়ে ধরে চাপ দিতেই বসে পড়ল। তাহলে নারীত্বের বিষয়গুলোতে সে ঠিকই আছে। আবার উঠে দাঁড়িয়ে একটি চুমো দিয়ে দৌড়ে তার রুমে চলে গেল। ফুল বিছানা থেকে তুলে আমার হাতে দিল। আমি বললাম,
-- তুমি ফুলের চেয়ে সুন্দর।
-- যা, তুমি সুন্দর।
-- ছাদে যাবে?
-- হু।
ধারাবাহিক উপন্যাসঃ হৃদয়ের এপিঠ-ওপিঠ (পর্ব-২৪)
--শাশ্বত স্বপন
সন্ধ্যা হয়ে আসছে। সূর্যের আভার তেজও ম্রিয়মাণ হয়ে যাচ্ছে। আকাশ পরিষ্কার। অনেক দূরে বেশ কিছু মেঘ খণ্ডও দেখা যায়। ওকে গান গাইতে বললাম। দু’একটা গানের প্রথম দু’এক কলি গুনগুন করে গাইল--যার মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝলাম না। জোর করেও আর গান আদায় করতে পারলাম না। তবে ওর কণ্ঠস্বর এখনও বেশ সুমিষ্ট। আমি ন্যান্সির প্রিয় নজরুল সংগীতের একটা গানের কিছুটা গাইলাম। ওকেও সাথে গাইতে বললাম। দু’জনেই গাইলাম--‘যত ফুল তত ভুল কণ্টক জাগে--মাটিরও পৃথিবী তাই এত ভালো লাগে..।’ না তেমন ভাবোদয় হলো না। আমি তার হাত ধরলাম। সে হাত ছাড়িয়ে নিল। ছুটোছুটি করতে শুরু করল। সে বলল, ‘আমাকে ধর তো।’ আমি নিজের জড়তা কাটাবার চেষ্টা করলাম। তারপর দু’জনে ফুল গাছের আশেপাশে দৌড়িয়ে দৌড়িয়ে ছুটোছুটি খেলতে শুরু করলাম। কিছুতেই ধরতে পারছি না। যদি বা দু’একবার ধরতে পারি, সে ঝাপটা দিয়ে ছুটে যায়। বুদ্ধি করে একটা গাছের আড়ালে লুকালাম। ঘুরতে ঘুরতে আমার কাছে আসতেই জড়িয়ে ধরলাম। দু’হাত বুকের উপর চেপে বসায় তার কেমন যেন লাগছিল। সে বসে পড়ল। আমাকে সরিয়ে দিল। সে ক্লান্ত। সে আর ছুটবে না।
-- তুমি পঁচা।
-- কেন? কি করেছি আমি?
-- আবার হাসছ। এভাবে ধরেছ কেন?
-- কিভাবে ধরেছি?
ভেংচাতে লাগল আমাকে। রাগ করে একটু দূরে যেতেই কেমন করে উঠল। দৌঁড়ে আমার কাছে চলে এলো। মাথা পেইন করছে। চেয়ারে গিয়ে বসলাম। সুন্দর জায়গা। ও আমার গায়ে হেলান দিয়ে আহ, উহু করতে লাগল।
-- ন্যান্সি, খুব যন্ত্রণা?
-- জানি না।ফ্রান্সিস--ফ্রান্সিস--
-- এইতো আমি--
বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। যার জন্য সে বেঁচে আছে সে তো নেই...আমি ফ্রান্সিসের ছায়া হয়ে কিভাবে ওকে নরমাল করব?
ন্যান্সির দু’চোখে পানি ঝরছে।
-- চল, নিচে চলে যাই।
-- আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দাও।
আমি তাই করলাম। আহ্ উহু করতে করতে এক সময় ঘুমিয়ে গেল। আমি ওর ঠোঁটে ভালোবাসার নিঃশ্বাস মুখে নিয়ে চুমো দিলাম। বাঃ! সে হাসছে। লাফ দিয়ে উঠে দিল দৌঁড়। দূরে গিয়ে সে হাসছে। তাহলে এতক্ষণ সে কি অভিনয় করল? না, না অভিনয় নয়। মেন্টাল পেসেন্টদের কত কি বৈশিষ্ট্য। ন্যান্সি প্রস্রাব করবে। সে ছাদের প্রান্তে বাথরুমের দিকে হাঁটতে লাগল। আমিও ওর পিছু পিছু গেলাম। আমাকে বাথ রুমের বাইরে অন্যদিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে বলল। সে বাথরুমে ঢুকল। আবার বাইরে এলো। সে আমাকে সাবধান করে দিল, যেন বাথ রুমের দিকে না তাকাই। আমি ঐ জায়গা থেকে দূরে যেতে চাইলাম। সে যেতেও দেবে না। ভয় পায়। আমাকে পশ্চিমমুখী করে দাঁড় করিয়ে বাথরুমে ঢুকল। আমি আড়চোখে তাকালাম। সে আবার হুমকী দিল। আমি কানে ধরে দাঁড়ালাম। সে হেসে বাথরুমের দরজা বন্ধ করল। মালী মনে হয়, এই সন্ধ্যায় মসজিদে নামাজ পড়তে গেছে অথবা রেস্ট-এ আছে। কোথাও তাকে দেখলাম না। দশ-বার সেকেণ্ড পরে সে বাথরুমেই চিৎকার করে উঠল। দরজা খুলেই আমাকে জড়িয়ে ধরল। পেন্ট ধরে আছে। আমি প্যান্টের ফিতা লাগালাম চোখ বুঁজে। সে ভয়ে কাঁপছে। পায়ে প্রস্রাব লেগে আছে। সে আমার হাত শক্ত করে তার ডান হাতের কুচকীতে এঁটে রেখেছে।
-- কি হয়েছে?
-- ঐ যে...
-- কি?
আমি দরজা খুললাম। দেখি তেলাপোকা--পৃথিবীর আদি প্রাণী। হাসলাম। আমাকে নিয়ে নিচে যেতে চাইল। সেখানে প্রস্রাব করবে। আমি তার পায়ের দিকে তাকালাম। সে লজ্জায় চোখ বুঁজে রইল। আমার বুকের উপর চোখ বুঁজেই কি যেন আঁকছে। হায়রে স্রষ্টা, লাজ-লজ্জা তুমি ঠিকই রেখেছ। শুধু মাথাটা...। কেন যে তুমি এসব খেলছো? কেনইবা তুমি আমাকে এখানে এনেছ? তুমি যদি মাটির মানুষ নিয়ে খেলতে এত ভালোবাস তবে আমি কেন পারব না?
-- ঐ মেয়ে এখন যে লজ্জা পাচ্ছ, প্যান্ট তো খুলে যাচ্ছিল। পোকা কি তোমাকে খাবে? কোথায় উঠেছিল পোকাটা?
-- যা--জানি না।
-- বেচারা পিপাসার্ত। পানি খেতে আসছিল। আর তুমি পানি--
-- যা--তুমি যাও, পানি দিয়ে আস।
-- না--নিচে চল।
-- ভয় পাও?
-- কি? ভয়!
যদিও প্রস্রাব চাপেনি তবুও ন্যান্সিকে সাহস দেখানোর জন্য বাথরুমে গেলাম। প্রস্রাব করলাম। হাত মুঠি করে বের হলাম। বুঝালাম, তেলাপোকা ধরেছি। সে ভয়ে দূরে চলে গেল। ছিঃ ছিঃ করতে লাগল। নিচে গিয়ে হাত ধুয়ে নিলাম। নয়তো সে আমার হাতই আর ধরত না। সে এসি করা বাথরুমে গিয়ে বেশ সময় ব্যয় করল। ঝর্ণা ছেড়ে গোসল করে বের হলো। আমাকে দেখে লজ্জায় অন্য রুমে চলে গেল। আমি বুকের ভিতরে একটা সুপ্ত কথাকে চাপা দিয়ে ছাড়লাম। আজ এ অবস্থা বলে আমি এত কাছাকাছি। একেবারে...। অথচ আমাকে এ বাড়িতে খুব বেশি হলে দারোয়ান, মালী, পিয়ন এ ধরনের একটা চাকুরি পেতেও মামা-কাকা ধরতে হতো। আমি একটা ম্যাগাজিন পড়তে শুরু করলাম। এখন এ রুমে বিভিন্ন পত্রিকা ও ম্যাগাজিন দেওয়া হয়। ন্যান্সি ইচ্ছে করেই বের হচ্ছে না। সে থ্রী-পিছ চেঞ্জ করে টু-পীছ পড়েছে। আমাকে পড়ে দেখাল। তারপর আবার সেমিজ পড়ে দেখাল। আমি কিছু বলছি না বলে সে দৌড়ে এসে ম্যাগাজিন ছুঁড়ে ফেলে দিল। আমি রাগত স্বরে বললাম--
-- কি হয়েছে?
-- তেলাপোকা।
-- কোথায়?
-- ছাদের বাথরুমে।
এখনো সে তেলাপোকার কথা ভাবছে। কিন্তু আমি জানি লজ্জার কারণে আসতে পারছে না।অথচ না এসেও পারছে না। তাই ‘তেলাপোকা’! সে বুঝতে পেরেছে আমি তার এই ‘তেলাপোকা’ তত্ত্ব বুঝেছি। সে অন্যদিকে মুখ করে আমার পাশে শুয়ে গুনগুন করতে লাগল। আমার পা তার পায়ের উপর পড়তেই বৈদ্যুতিক শক খাওয়ার মতো উঠে গেল। মুখটা গম্ভীর হয়ে গেল।
-- যা--তুমি পঁচা।
-- আমি এক্ষুণি মরে যাব।
-- মর গিয়ে।
-- এই সত্যি মরে যাব কিন্তু।
-- এ্যা! মরতো।
আমি মরার ভান করলাম। ও ভেবেছে সত্যি সত্যি মরে গেছি এবং ডাকলেই বেঁচে যাব। আমাকে ডাকতে ডাকল। উঠি না বলে গোঙাতে শুরু করল। আমি তবুও নিরব হয়ে রইলাম।
-- আমি আর মরতে বলব না—ওঠ--ওঠ।
আমি উঠলাম। হাসলাম। দিলাম এক চুমো। এবার সে হাসল। ডাক্তারের আসার সময় হয়ে গেছে। আমি টেপ অন করলাম। গান শুনছি। ওর দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম। ও দরজায় চলে গেল। আমি তাকিয়ে আছি। সেও তাকিয়ে আছে। এই মুহূর্তে ডাক্তার কাশি দিয়ে ঢুকলেন। ন্যান্সি তার হাত ধরল। শিশুর মতো এটা-ওটা দিয়ে খেলতে শুরু করল। ডাক্তার আমার পাশে বসলেন। বুয়া চা-বিস্কুট, পানীয় দিয়ে গেল।
-- শোভন, এ দু’দিন ওকে মোটামুটি শান্তই দেখেছ। কিন্তু মাঝে মাঝে এমন সব কাজ করে যা তুমি নিজেও সহ্য করতে পারবে না। তবু করতে হবে। তুমি হয়তো লক্ষ্য করেছ এখন ফ্রান্সিস স্মৃতি আর লজ্জাবোধটা অক্ষুন্ন আছে। কিন্তু দেখবে কোন এক সময় ফ্রান্সিস ছাড়া আর কোন বোধ শক্তি থাকে না। প্রায় প্রতিমাসে মাসিক এর আগে পরে সে প্রচণ্ড উন্মাদ হয়ে উঠে। তাই দায়িত্ব যখন নিয়েছ তখন তোমাকে আগে থেকেই মানসিক প্রস্তুতি নিতে হবে। তোমাকে আঘাতও করতে পারে।
ধারাবাহিক উপন্যাসঃ হৃদয়ের এপিঠ-ওপিঠ (পর্ব-২৫)
--শাশ্বত স্বপন
আমি ঘাবড়ে গেলাম ভিতরে ভিতরে। প্রকাশ করলাম না। হাস্যোচ্ছলে ন্যান্সির দিকে তাকালাম। সে বুয়াকে সঙ্গে নিয়ে খেলছে। সে আমাকেও আঘাত করবে। ভাবতেই বুকটা শুকিয়ে যায়।
-- স্যার, মাঝে মাঝে ওকে একেবারে সুস্থ্য মনে হয়। ও যদি অনেকক্ষণ চেষ্টা করে তাহলে পড়তে পারে।
-- এগুলো আগেও হয়েছে। তুমি ওকে বোঝাও, তুমি ফ্রান্সিস। এ্যাক্সিডেন্ট-এ তুমি মরনি--এটা ওর কল্পনা ছিল।
-- ঠিক আছে স্যার, আমার দায়িত্ব পালন করার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করব।
-- এ বাড়িতে ন্যান্সি ছাড়া অন্য কোন অসুবিধা আছে?
-- না স্যার। কোন অসুবিধা নেই। বরং সুবিধাগুলো কল্পনাতীত।
-- ও ভাল কথা। তোমার জন্য বিরাট সারপ্রাইজ আছে।
সারপ্রাইজ! কি সে সারপ্রাইজ? যদি সারপ্রাইজটা ন্যান্সি হয় তবে নিশ্চয় আমি মহাখুশি। আর যদি এসব না দিয়ে বিনিময় প্রথা চলে, তবে খুবই দুঃখ পাব। কিছু কিছু ভালোবাসা আছে যার মূল্য টাকা দিয়ে হয় না। আমি কি ন্যান্সিকে সত্যিই তেমন ভালোবাসি। নাকি লোভ? আমি বুঝতে পারছি আমি বিপথে চলছি--একটু একটু করে খারাপ হয়ে যাচ্ছি। আমি জেনে শুনে বিষ পান করছি। তবুও পেছনে ফিরতে চাই না।
-- কি সারপ্রাইজ, স্যার?
-- তোমাকে এরপর থেকে এখানে রাতেও থাকতে হবে। তবে যৌন কামনা পুরোপুরি বিসর্জন দিয়ে। আমি জানি, তুমি পারবে। ফ্রান্সিস যে সব জায়গায় ওকে নিয়ে ঘুরেছে--তুমিও সে সব জায়গায় যাবে। তোমাকে কাল থেকে ড্রাইভার গাড়ি চালানো শিখাবে। গাড়ি চালানো শিখা হয়ে গেলে তুমি বিভিন্ন জায়গায় ওকে নিয়ে ঘুরতে যাবে। কক্সবাজার, ন্যাশনাল পার্ক, কোর্টবাড়ি, শফিপুর ইত্যাদি জায়গায়ও যেতে হবে। তবে দূরের পথ বিমানেই যাবে। জার্মানেও ওকে নিয়ে যাওয়ার চিন্তা-ভাবনা করছি। সেখানে ফ্রান্সিসদের বাড়ি। ওর মা-বাবা, ভাই-বোন সব আছে।
-- ফ্রান্সিস কোথায় কোথায় যেত তার কোন লিস্ট--?
-- আগামীকাল সকালে তোমাকে ছোট এটা ডায়েরী দেওয়া হবে। ওখানে সব লেখা আছে।
ডাক্তার ন্যান্সিকে আদর করে চলে গেল। আমি ডাক্তারের কথাগুলো ভাবতে লাগলাম। পেছন থেকে থেকে ন্যান্সি চোখ ধরল।
-- বলতো কে?
-- ন্যান্সি।
-- না।
হ্যাঁ, ন্যান্সি।
হে-হে-হে করে হেসে উঠল। কিশোরীর মতো হাসি। আমি তাকিয়ে রইলাম। সে আঙুল দিয়ে খোঁচা দেওয়ার ভঙ্গীতে বলল,
--- চোখ উঠিয়ে ফেলব। হা-- করে তাকিয়ে থাক কেন?
--- তুমি সুন্দর তাই।
তার চোখ-মুখ তৎক্ষণাৎ লাল হয়ে উঠল। আমি হাত জোড় করে মাফ চাইলাম। ও খুশি হলো, পাশে বসল। গায়ে হেলান দিয়ে গুনগুন করতে লাগল। গ্লাস ভর্তি ফলের রস এলো। আমি খেতে শুরু করলাম। আমার দেখাদেখি সেও খেল।
রাতে নজরুল চৌধুরী, রেহেনা, ন্যান্সি ও আমি এক সাথে খেতে বসলাম। যে লোককে অফিসে সবাই সম্মান করে, ভয় পায়, যিনি শুধু কর্তৃত্ব দেখান--সেই কোটিপতির সামনে বসে সাপার করছি! টেবিলে খেতে বসে সে আমাকে পুত্রের মতো স্নেহ করল। তার ও তার স্ত্রীর ব্যবহারে আমি তথা আমার মতো আধপেটা দরিদ্র মানুষটার মনে হলো--এ যেন স্বপ্নের স্বর্গ। আমি তাদের বশীভূত হলাম। বাবাকে বাবা বলেছি কবে--মনে নেই, বাবা প্রাণীটার প্রতি আজীবনই আমার ক্ষোভ ছিল, ঘৃণা ছিল। তাদের ব্যবহার আর স্মৃতিকথা সব মিলে আমার চোখে পানি এসে গেল! খাবারের উপর দু'ফোটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। হায়রে খাবার! এই খাবারের অভাবে মা মরেছে। আমাদের মুখে অন্ন দিয়ে নিজে নিরন্ন থেকেছে। ওষুধের অভাবে বোন মারা গেছে। রিলিফের গম আনতে গিয়ে দাদী আর ফিরেনি। আজ আমি এমন এক বাসায় খাচ্ছি যারা স্বাধীনতার বিরুদ্ধে ছিল, আমার বাবাও তো এমন হতে পারত। আমি এদেরকে ভালোবাসি, ভালোবাসতে হচ্ছে। এদের আন্ডারে হাজার হাজার শ্রমিক কাজ করে। এরা আজ মহান, বিরাট ব্যক্তিত্ব। রাষ্ট্র এদের কথায় উঠে বসে। হাজার হাজার পরাজিত সৈনিকেরা তাকে সম্মান করে। এদেরকে আমার খুব ভালো লাগে, খুব--। ধর্ম ব্যবসা করে, পাকিস্তানিদের আনুগত্য বজায় রেখে তার বাবা তাকে যা দিয়ে গেছে তাই সে চালিয়ে যাচ্ছে। তাকে এখন আর ধর্ম ব্যবসা করতে হয় না--কারো আনুগত্য স্বীকার করতে হয় না। এরা সময়কে চিনে। জীবন কি--তা বুঝে। ধর্ম, স্বর্গ, নরক সম্পর্কে এদের ধারণা পরিষ্কার। তাই পার্থিব সমস্যা ছাড়া আধ্যাত্মিক সমস্যা নিয়ে বাহিরে যা ভাবে, ভিতরে তার উল্টো ভাবে। হঠাৎ চাচার কথা মনে পড়ল। মৃত্যু মুহূর্তে চাচা আমার হাত ধরে আমাকে একটি সত্য অথচ জঘণ্য কথা বলতে চাইল--যার প্রায়শ্চিত্ত করার জন্য আমাদের দু’ভাইকে এ বাড়িতে আশ্রয় দিয়েছে। সে রুমের আমি ছাড়া বাকি সবাইকে চলে যেতে বলল। আমি অদম্য আগ্রহ নিয়ে জানতে চাইলাম--কি কথা? তারপর যা বলল--তা আমি স্বপ্নের ঘোরে শুনছি নাকি বাস্তবে--বিশ্বাস করতে পারছি না। হিমালয় পর্বত যেন, আমার এ ক্ষুদ্র দেহের উপর ভেঙ্গে-চুড়ে পড়ল। সে মারা গেল। তার দিকে আর একবারও ফিরে তাকালাম না--কাঁদলাম না। অথচ আমার প্রচণ্ড কাঁদা উচিত ছিল। চাচার জন্য না হোক, বাবার জন্য। আমি অবাক, প্রচণ্ড অবাক হলাম। মুখ থুথুতে ভরে উঠল। আমি চাচার কথা আবার আমার স্মৃতিপর্দায় রিপিট করলাম--শোভন, তোমার বা-বা...আমা-র...খুব ঘ-নি-ষ্ঠ..বন্ধু..ছিল। বাল্যকাল..থেকে...এ-ক-সা-থে...। সে হঠাৎ দ-ল প-রিবর্ত-ন করে সি-রাজ সিক-দারের পার্টি-তে...যোগ...। ডাকা-ত (আহ্)...। তাই আ-মরা...ওকে (ওহ্) খু-ন ক-রি। তুমি আ-মা-কে ...ক্ষ-মা...আ...আ...আ...। মৃত্যু মুহূর্তে বুকের প্রচণ্ড কষ্ট নিয়ে আর বলতে পারেনি। তার জানাজায়, দাফনে আমি ছিলাম না। সেই দিনই চলে আসি ঢাকাতে। মুরাদ তখন ঢাকাতেই পড়ত--ঢাকাতেই থাকত। ঐ পরিবারের সাথে আশ্রিত সম্পর্ক সেদিনই শেষ হয়ে যায়। কিন্তু আমি আজও বলি ’৭৪-এ কে বা কারা যেন বাবাকে ধরে নিয়ে যায়...।
ধারাবাহিক উপন্যাসঃ হৃদয়ের এপিঠ-ওপিঠ (পর্ব-২৬)
--শাশ্বত স্বপন
ন্যান্সি আমার চোখে পানি দেখে ভাবল তার বাবার কথার কারণেই আমি কাঁদছি। সে খাবারসহ প্লেট তার বাবার মুখের দিকে ছুঁড়ে মারল। তরকারির প্লেটগুলো মায়ের দিকে ছুঁড়ে মারল। আমি ন্যান্সিকে ধমক দিয়ে থামালাম। ওকে একটু দূরে নিয়ে ব্যাপারটা বুঝালাম। তাকে ক্ষমা চাইতে বললাম। সে ক্ষমা চাইল মা-বাবার কাছে। নজরুল চৌধুরী ন্যান্সিকে আদর করে তার রুমে চলে গেল। আন্টি তাকে আদর করে আবার খাওয়াতে লাগল। এ পরিবারকে সে অনেক দুঃখ দিয়েছে। আরো যে কত দেবে। যে পরিমাণ আনন্দ নিয়ে সে এ বাড়িতে জন্মেছিল--সে পরিমাণ দুঃখ দিয়েই কি সে বাড়ি ত্যাগ করবে?
আমি ওকে ওর রুমে নিয়ে গেলাম। সে বিছানার মাঝখানে কোল বালিশটা পার্টিশন হিসেবে রাখল। শুয়ে পড়ল। আমাকে শুতে বলল। আমি ঘুমাবার ভান করলাম। ও আমার এক হাত ধরে রাখল যাতে, আমি উঠে গেলে ও বুঝতে পারে। বুয়া এসে জানাল একজন নার্স আসছে। এখানে যে নার্স আসে-- তা আমি জানতাম না। মনে হয়, আজ থেকে নার্সের ডিউটি শুরু হলো। জানা গেল, আজ থেকে দিনে দুই-তিন বার সে আসবে। সে এসে ডাক্তারের কথামতো ইনজেকশন দেবে। ঔষধ খাওয়াবে। সে রকিব ডাক্তারের ক্লিনিকে কাজ করে। এখন নার্স ন্যান্সিকে ইনজেকশন দেবে। ন্যান্সি কিছুতেই ইনজেকশন নেবে না। আমাকে নার্স মিছিমিছি ইনজেকশন দিল। তবুও সে ইনজেকশন নেবে না। আমি নার্সকে চলে যেতে বললাম। অনেক ইনজেকশন দেওয়া হয়েছে। কিছুই যখন হচ্ছে না, তখন কি লাভ এসব দিয়ে। হয়তো সে রাত জাগবে, জাগুক। দেখি, রাতে কি করে? হঠাৎ মনে পড়ল মুরাদের হোস্টেলে যেতে হবে। ন্যান্সিকে বুঝালাম। সে কিছুতেই যেতে দিতে চায় না। গেলে তাকে সঙ্গে নিতে হবে, এটা তার শর্ত। কিন্তু ওকে নেওয়া সম্ভব না। কখন পাগলামী শুরু করে।
-- ন্যান্সি, তুমি বারান্দায় দাঁড়িয়ে থেক, আমি যাব আর আসব।
-- না, আমাকে নিতে হবে।
-- কাল নেব--
-- সত্যি?
-- সত্যি সত্যি সত্যি--তিন সত্যি।
-- কখন আসবে?
-- যাব আর আসব। এই ধর ঘন্টাখানেক।
-- ঠিক আছে, বেশি দেরি যেন না হয়।
গাড়ি নিয়ে ঢাকা কলেজে হোস্টেলে এসে থামলাম। মুরাদের রুমে গিয়ে দেখি ও নেই। টিউশনিতে গেছে। রুমমেটের সাথে কিছুক্ষণ আলাপ করলাম। আধ ঘন্টা সময় পার হয়ে গেল। রুমমেট মনির বাইরে গেল দেখতে, মুরাদ আসছে কিনা। পঁয়তাল্লিশ মিনিটের মাথায় দু’জনে রুমে ঢুকল।
-- কখন আসছেন?
-- পৌনে এক ঘন্টা হলো।
-- টিউশনি ছিল তাই--
-- তোর নাকি মাঝে মাঝে মাথা ব্যথা হয়?
-- কই, তেমন নয়। তুই বলেছিস বুঝি?
মনিরকে লক্ষ্য করে কথাটা বলেই সে মাথা নিচু করে রইল। আমি ওকে দুই হাজার টাকা দিলাম। টিউশনি সব বাদ দিতে বললাম।
-- তোর, যখন যা লাগবে, এই ফোন নম্বর-এ জানাবি।
-- আচ্ছা, ভাইয়া বেতন কত?
-- পাঁচ হাজার-এর মতো। উপরি আছে।
-- বাঃ! চমৎকার।
হঠাৎ ও কেমন করে উঠল। আমার দিকে তাকাতেই দেখি চোখ-মুখ লাল হয়ে গেছে। মাথার যন্ত্রণা শুরু হয়েছে।
-- কি রে, তোর কি হয়েছে?
-- ভাইয়া আজ প্রায় তিন-চার মাস ধরে মাথার কি যে যন্ত্রণা! আগেও হতো। তেমন কিছু মনে করিনি। সাধারণ ওষুধ খেয়েই ব্যথা সারতাম। এক ডাক্তারকে দেখানোর পর সে কতগুলো এক্স-রে করতে বলল। সবগুলো এক্স-রে করতে প্রায় তিন হাজার টাকা লাগবে। এত টাকা তারপর ওষুধপত্র। তোমার অবস্থার কথা চিন্তা করে তোমাকে এতদিন কিছু বলিনি। আমার মনে হয়, আমার বড় কোন সমস্যা হয়েছে।
-- তুই এতদিন কেন জানাসনি?
-- কি করার আছে আমাদের।
প্রচণ্ড যন্ত্রণা নিয়ে ও এতগুলো কথা বলল। মনির ওর পাশে বসে মাথায় হাতে বুলাচ্ছে।
--তুই কাল সকাল দশটার দিকে আমায় ফোন করবি। আমি তোকে জানাব--কখন আমি আসব।
ওর মাথার যন্ত্রণা কিছুটা কমলে আমি ন্যান্সিদের বাসায় চলে এলাম। দুই ঘন্টা ব্যয় হয়ে গেছে। ন্যান্সি আমাকে দেখেছে কিন্তু কোন কথা বলছে না, নড়াচড়াও করছে না। মনে হচ্ছে, সে গম্ভীর হয়ে আছে। বুয়া জানাল, ন্যান্সি দশ-বার বার মা-বাবার কাছে গিয়েছে আমার খোঁজ নেবার জন্য। দারোয়ানকে পর্যন্ত জিজ্ঞাসা করে এসেছে। আর বুয়াতো সব সময়ই আছেই। বারান্দায় গিয়ে ওর পাশে দাঁড়ালাম। মুখ ফিরিয়ে একবার আমার দিকে তাকাল। রাত সাড়ে দশটা বেজে গেছে। দেখলাম ওর দ’ুচোখ বেয়ে পানি ঝরছে। আমি ওর হাতটা ধরতেই ঝাড়া দিয়ে একটু দূরে চলে গেল। আমি আবার ওর কাছে গেলাম। একটা ক্যাসেট কিনে এনেছি, দেখালাম, মোটেও খুশি হলো না। বললাম, ‘ন্যান্সি, খুব একটা কাজে আটকা পড়েছিলাম।’
সে কানে হাত রাখল। আমার কোন কৈফিয়ত সে শুনতে চায় না। আমি মাফ চাইলাম। মাফ করল না। সে এবার শব্দ করে কাঁদতে লাগল। আন্টি আসায় সে আরও ক্ষেপে গেল। অবস্থা বুঝে উনি চলে গেলেন। আমি বিছানায় গিয়ে মাথায় হাত রাখলাম। সে বসা অবস্থা থেকে কাত হয়ে শুয়ে পড়ল। মুখে ছোট্ট করে চুমো দিলাম। মাথায় মাথা রেখে আমিও কান্নার ভান করলাম। আমার দিকে তাকিয়ে দেখল আমি সত্যি কাঁদছি কিনা। আমি অভিমান করে নতুন ক্যাসেটের গান চালু করলাম। ‘আমি চলে গেলে পাষাণের বুকে লিখ না আমার নাম...।’ টেপে মাথা রেখে উদাসীন হলাম। সে বিছানা থেকে উঠল। মুখ গোমরা করে আছে এখনো। সে আবার বারান্দায় চলে গেল। আমি ওর পিছন পিছন গিয়ে জড়িয়ে ধরলাম। কোন বাঁধা দিল না। মুখটা ঘুরিয়ে স্মিত একটু হাসল। আমি জোরে চাপ দিলাম। উঃ কওে উঠল। তবুও সরে দাঁড়াল না।
--আচ্ছা, তুমি কি ফ্রান্সিস?
আমি অবাক। এ রকম প্রশ্নের জন্য আমি মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। অগত্যা বলে উঠলাম,
-- তুমিই বল আমি কে?
-- তুমি ফ্রান্সিস।
-- হ্যাঁ, আমি ফ্রান্সিস।
তার মুখ-চোখ আর আচরণ দেখে বুঝা গেল, উত্তরটা মনোপুত হয়নি। আমি চুপ করে রইলাম। ও আমার হাত থেকে মুক্ত হয়ে ইংলিশ গানের ক্যাসেট ছাড়ল। আমার কেমন জানি মনে হল, ও যেন ভালো হয়ে যাচ্ছে। সে বিছানায় চলে গেল। আমাকে ডাকল না। আন্টি নিজেই চা, ফলের রস, বিস্কুট দিয়ে গেলেন। আমাকে বলে গেলেন আমি যেন পাশের কক্ষে ঘুমাই। তিনি নিজে বিছানা গোছগাছ করে দিয়েছেন। আমি তার কথায় সায় দিলাম। মেয়ের বিছানায় গিয়ে মেয়েকে আদর করতে লাগলেন। ন্যান্সি ভ্র“ক্ষেপও করল না। সে গানে মশগুল হয়ে রইল। আন্টি চলে গেলেন। ক্যাসেটের এক পিঠের ফিতা শেষ না হতেই উল্টিয়ে দিলাম। ক্যাসেটের এ গান আমার পরিচিত। ডাক্তারের দেওয়া কাগজে দেখেছি। এ্যাক্সিডেন্ট...এর মুহূর্তে এ গানই চলছিল। আমি তার দিকে তাকাতেই দেখি তার মাথার যন্ত্রণা শুরু হয়ে গেছে। হঠাৎ সে চিৎকার করতে লাগল। বিছানা এলোমেলো করে ফেলল। গান চলছে‘‘ও ডিয়ার, আই লাভ ইউ...।’ আমি ছুটে এলাম ওর কাছে। কি সব কথা বলছে? সবই ইংরেজিতে। আমি টেপ বন্ধ করলাম। ফ্রান্সিস ফ্রান্সিস বলতে বলতে আমার বুকে হেলান দিল। ওর মুখের উপর আমার মুখে ঘষে বললাম, ন্যান্সি, আমি তোমাকে ছেড়ে কোথাও যাব না। কে যেন বুকের ভিতর মোচড় দিয়ে উঠল। আল্পনাকে মনে পড়ল। হ্যাঁ, আল্পনাই। আল্পনাই জেগে উঠেছে। আমি কি আল্পনাকে ভুলে যেতে চাইছি? কখনও কি ভুলতে পারব? এ পৃথিবী কখনও কিছু মনে রাখে না। এ আকাশ তার বুকে কখনও কোন নাম বা ইতিহাস লিখে রাখে না। সব মানুষই একদিন ভালোবাসার এপার-ওপার সব ভুলে যায়। আমিও হয়তো ভুলে যাব। ভুলে যাব সবকিছু। তখন আমার জীবন আর মৃত্যুর মধ্যে কোন তফাৎ থাকবে না। দুঃখকে যত দূরে ফেলে দিতে চাই--সে হৃদয়ের তত কাছে আসে। আমি তাকে যতই ঘৃণা করি--সে বিশ্ব বেহায়ার মতো আমাকে ততই আঁকড়ে ধরে। আমি ভুলে যেতে চাই আমার বিষাক্ত স্মৃতিকে।
ধারাবাহিক উপন্যাসঃ হৃদয়ের এপিঠ-ওপিঠ (পর্ব-২৭)
--শাশ্বত স্বপন
আমি ওকে বিছানায় শুইয়ে জগন্ময় মিত্রের ক্যাসেট ছাড়লাম। মশারী টানিয়ে দিলাম। আমার বিছানায় কাঁত হলাম। ঘুম আসছে না। টেপ অটো সিস্টেম। এক পিঠ শেষ হতেই অন্য পিঠ বাজতে শুরু করল। ঘুমের ট্যাবলেট হাতে নিলাম। আমার প্রিয় গানটা শুরু হলো--“গভীর নিশীতে ঘুম ভেঙ্গে যায়--কে যেন আমারে ডাকে...।’ আল্পনারও এই গানটা প্রিয় ছিল। টেপ বন্ধ করলাম। ঘুমের ট্যাবলেট খেয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লাম।
সকালবেলা ন্যান্সির হৈ চৈ কানে এলো। আমার উঠতে ইচ্ছে করছে না। বুয়া তাকে আমার বিছানা দেখিয়ে দিল। সে বালিশ হাতে নিয়ে আমার বিছানায় শুয়ে পড়ল। বুঝলাম, সকাল ঘুম থেকে জেগে আমাকে না দেখেই চিৎকার করছিল।
-- জানো ন্যান্সি, রাতে তোমাকে নিয়ে অনেক দূরে চলে গেছি।
-- কই, আমি তো যাইনি।
-- স্বপ্নে
-- স্বপ্নে, ও, কোথায়?
-- জানি না। তবে সেখানে তুমি আর আমি ছাড়া আর কেউ নেই।
-- ঐা--
-- হ্যাঁ
-- চল, সেখানে যাই।
-- হ্যাঁ, যাব, নিশ্চয় যাব। তোমাকে নিয়ে আমি অনেক দূরে চলে যাব।
দশটার দিকে ডাক্তার এলো। তাকে মুরাদের কথা সব বললাম। বুয়া জানাল আমার ফোন এসেছে। আমি ড্রয়িং রুমে গিয়ে ফোন ধরলাম। মনির ফোন করছে। সে জানাল, মুরাদ মাথার যন্ত্রণার কেমন জানি করছে। আমি ডাক্তারকে জানালাম। ন্যান্সিকে সাথে নিয়ে আমি ও ডাক্তার ছুটলাম হোস্টেলে। গাড়িতে বোঝালাম, কোন কথা বলবে নv--বিরক্ত করবে না। সে আমার কথায় খুশি হলো এবং সম্মতি দিল।
তারপরের ঘটনা বড় দুঃসহ। ডাক্তারের কাছ থেকে জানতে পারলাম, মুরাদের ব্রেইন-ক্যান্সার হয়েছে। আমি যেন কিছু শুনিনি। সুপার সনিক সাউণ্ড যেন, যা কর্ণে প্রবেশ করে না। শ্রাব্যতার সীমায় আসা মাত্র শক্ত হয়ে গেলাম। সহস্র বেদনা ডিঙ্গিয়ে এখানে আমার আগমন। পাষাণে বুক বেঁধেছি। আমি কাঁদব না। কিছুতেই না। ডাক্তার আমাকে সান্ত্বনা দিয়ে চলে গেল। আমি চিৎকার করতে চাইলাম। ভিতরের পরাজিত সৈনিক আমাকে চিৎকার করতে দিল না। রাতে ন্যান্সির বুকে মাথা রেখে কাঁদলাম। ন্যান্সি ওর বুক থেকে আমার মাথা সরাল না। বরং আরো চেপে ধরর। এ মিলন, কামনার নিঃশ্বাসে নয়, ভালোবাসার নিঃশ্বাসে।
-- তোমার কি হয়েছে?
-- তুমি ভালো হও ন্যান্সি। তোমাকে পরে বলব।
-- আমি তো ভালো আছি। আচ্ছা, আমার কি হয়েছে?
-- কিচ্ছু হয়নি তোমার। তুমি চুপ কর।
নজরুল চৌধুরী তার নিজের খরচে মুরাদকে সিঙ্গাপুরে চিকিৎসার জন্য পাঠালেন। আমি যেতে পারলাম না। আমি ন্যান্সিকে সুস্থ্য করার জন্য কক্সবাজার, রাঙ্গামাটি, কোর্টবাড়ি, ন্যাশনাল পার্ক, শফিপুর ইত্যাদির জায়গায় বেড়াতে লাগলাম। প্রচণ্ড দুঃখের মাঝেও হাসলাম। কাউকে কষ্ট বুঝতে দিলাম না। টেলিফোনে মুরাদের খোঁজ-খবর নিলাম। আউট অফ ট্রিটমেন্ট। বেশি সময় পার হয়ে গেছে। প্রতিদিন খারাপ সংবাদ আসে। আমি ন্যান্সিকে নিয়ে আনন্দ করি। নিভৃত কোন সময়ে ভাবী, কাঁদি। নজরুল চৌধুরী, মিসেস রেহেনা আমাকে দেখেন। সান্ত্বনা দেন। শত কষ্টের মাঝেও ন্যান্সির সঙ্গতার সামান্য ত্র“টি করিনি। কখনও প্রচণ্ড বিরক্ত হই কিন্তু দায়িত্ব আর তাদের মহানুভবতার কথা ভেবে নিরবে সহ্য করি সব। আমি মাসে মাসে টাকা কখনও নেইনি। শুধু খাবার আর প্রাসংঙ্গিক বিষয় ছাড়া আর কিছুই নিতে চাইতাম না। ন্যান্সির অসুস্থতার ক্রমে ক্রমে উন্নতি হতে লাগল। সে আমাকে ফ্রান্সিস ভাবতে শুরু করেছে। কিন্তু মাঝে মাঝে তার মানসিক অবস্থা এত নিচে নেমে যায় যে, তখন তাকে সত্যিই পাগলী বলে মনে হয়। এর মাঝে একদিন সিঁদুর আমাকে টেলিফোনে সব জানাল। কেন যে এত পরে জানাল--তাও বুঝলাম।
মুরাদ ওকে ভালোবাসত। শুনে আমি অবাক হয়ে গেলাম। মুরাদ পিযুষ নামে হিন্দু পরিচয় দিয়ে ওকে ভালোবেসেছে। সিঁদুরও ওকে ভালোবাসত। দু’জনার ভালোবাসার চরম এক মুহূর্তে সিঁদুর জেনে গেল পিযুষ মুসলমান। সিঙ্গাপুরে যাওয়ার আগে সে সিঁদুরদের বাসায় ক্ষমা চাইতে গিয়েছিল। তার সত্যিকারের সব পরিচয় সে দিয়েছে। সিঁদুর চিনতে পেরেছে, সে যে আমার ভাই। তাই সে অনেক দেরি করে ব্যাপারটা আমাকে জানাল। সিঁদুরের টেলিফোনের কথা এখনও আমার কানে ভাসে--‘‘স্যার, আমি জানি, ও আমাকে সত্যি ভালোবাসে। ও স্রষ্টা মানে না--ধর্মও মানে না। এসব কথা চিঠিতে আমাকে শেষে জানিয়েছে। ওকে আমি খুব ভালোবাসি স্যার কিন্তু আমি তো ধর্মের বাইরে কিছু করতে পারব না। আমি মা-বাবার কাছে বন্দি--মা-বাবা সমাজের কাছে--সমাজ ধর্মের কাছে বন্দি। এতসব বন্দি দশা থেকে...। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে সবকিছু ভেঙ্গে ওর পাশে আমার যাওয়া উচিত। ও আর বাঁচবে কিনা জানি না। ওকে আমি এখন খুব ফিল করি স্যার। আমার মনে হয়, ওকে ছাড়া আমি বাঁচব না। ওকে না পেতাম--তবু তো জানতাম ও বেঁচে আছে কিন্তু...। স্যার, আমি ডিসিশন নিয়েছি, ও ভালো হয়ে ফিরলে আমি ওকে বিয়ে করব। আমি ওকে অনেক কষ্ট দিয়েছি স্যার, অনেক কষ্ট দিয়েছি! ও, ওর ধর্ম পালন করবে, আমি আমার ধর্ম। আপনি আমাদের হেলপ্ করবেন।’’
ধারাবাহিক উপন্যাসঃ হৃদয়ের এপিঠ-ওপিঠ (পর্ব-28)
--শাশ্বত স্বপন
আমি সিঁদুরকে কিছু বলিনি। অবাক হয়ে শুনেছি সব কথা। আমার বাবা, আমি, মুরাদ ধর্মতত্ত্ব ত্যাগ করে বাঙালী জাতি স্বত্তার আকর্ষণে ছুটছি। এ যে মিথ্যা, মিথ্যা। ধর্ম তত্ত্ব জাতি তত্ত্বের উপরে, অনেক উপরে ভর করে আছে। ধর্ম ডিঙ্গিয়ে মনুষ্যত্ব আর জাতি তত্ত্বের গলায় মালা দেওয়া যায় না। ধর্ম তত্ত্বে নিষেধ আছে কিনা জানি না--তবে এটাই চলছে। কবিতাটা মনে পড়ে--
‘কবিতা, তোমার কি কখনও মরচে ইচ্ছে করে?
করে না? আমার কিন্তু মাঝে মাঝেই মরচে ইচ্ছে করে।
মাঝে মাঝে খুবই ইচ্ছে করে
গদ্যের মোটেও তা ইচ্ছে করে না
সে চিরঞ্জীব, সাপের মতো ছোলুম বদলায়...।’
মুরাদ একটা চিঠি পাঠিয়েছে আমার কাছে। আমি পিছনে তাকালাম। ন্যান্সি এই রুমে নেই। অন্য রুমে মনে হয়। চিঠিটা পড়তে শুরু করলাম--‘‘ভাইয়া, আমাকে ক্ষমা করো। আমি জানি, আমি বাঁচব না। তোমার সার্মথ্য ছিল না বলেই তোমাকে আমার অসুখের কথা বলিনি। আর সবচেয়ে আসল কথা আমার নিজেরই মরতে ইচ্ছে করে। এ পৃথিবী আমার ভালো লাগে না। তোমাকে খুব দেখতে ইচ্ছে করে। ভাইয়া, তোমার চাকুরি সম্পর্কে আমি সব জেনেছি। ন্যান্সি আপাকে আমার সালাম দিও। তার সুস্থতা কামনা করি। আমি মরব--এই নিয়ে ভাবি না। ভাবি, তুমি বড্ড একা হয়ে যাবে। মা-বাবা মরে গেয়ে বেঁচে গেছেন। আমরা জীবিত থেকে জীবন্ত লাশ হয়ে আছি। ভাইয়া, আল্পনা বৌদিকে খুব মনে পড়ে। কত সেবা-যতœ সে আমাদের করেছে। তুমি বৌদি ডাকতে বলেছিলে--আমি তাই ডাকলাম। এখনও ডাকলাম। খুব যন্ত্রণা ভাইয়া, খুব--। তুমি ভালো থেকো। আমাদের স্মৃতি নিয়ে তুমি বেঁচে থেক ভাইয়া। ইতি, তোমার স্নেহের মুরাদ।
বুকের ভিতর যেন ভূমিকম্প হলো। ইচ্ছে করে, এই ভূমিকম্পে কম্পিত করে এসব দালান, ঘর-বাড়ি--সমস্ত পৃথিবী ধ্বংশ করে ফেলি। আমাদের এ বিষাক্ত পৃথিবীর কোন প্রয়োজন নেই। ন্যান্সি এর মধ্যে এসে বেশ যন্ত্রণা শুরু করেছে। প্রচণ্ড রাগে দিলাম এক থাপ্পড়। ও কাঁদতে শুরু করল। না, না আমাকে ভেঙ্গে পড়লে চলবে না। শূন্য থেকে উঠছি। বিশ-ত্রিশ পর্যন্ত যেতে হবে। পারলে একশত পর্যন্ত যাব। হোয়াট ইজ লাইফ, হোয়াই ইজ মানি, হোয়াট ইজ লাভ? আই ওয়ান্ট টু সি।
ন্যান্সিকে খুব আদর করলাম। বললাম, আমার ভাইয়ের কথা। ও খুব দুঃখ প্রকাশ করল। ও নতুন স্মৃতিতে ভালো হতে শুরু করেছে। আমাকে নিয়ে তার স্বপ্নের শেষ নেই। সে নতুন জীবন নিয়ে সুস্থ হবে--তবুও ভালো, সে সুস্থ হোক। আগের চেয়ে পাগলামী তার অনেক কমেছে। একবার সে আমাকে আঘাত করেছে। কারণ পুরো একদিন আমি বাইরে ছিলাম। বাসায় এসে তার বারণ সত্ত্বেও সিগারেট পান করেছি। তাকে ভ্র“ক্ষেপ করিনি। তাই সে কাঁচের জগ ছুঁড়ে মেরেছে। মাথা ফেটে রক্ত ঝরেছিল। তা দেখেই কান্না শুরু করেছে। সেবা-যতœ সেই করেছে। তারপর আর কখনও সে আমাকে আঘাত করেনি। তবে ঝগড়া করেছে। ডাক্তার, নজরুল চৌধুরী--এরা সবাই ভেবেছে বিভিন্ন জায়গায় বেড়ালে ন্যান্সির আগের স্মৃতি ফিরে আসতে পারে। বিভিন্ন স্থানে ঘুরেও পুরোপুরি সুস্থ্র হবার লক্ষণ আমি পাইনি। বরং সে আমাকে নিয়েই নতুন করে জীবন-নীড় এর স্বপ্ন রচনা করে চলেছে। সে জানে, সে অসুস্থ এবং খুব শীঘ্রই সে ভালো হবে। সবাই সিদ্ধান্ত নিয়ে আমাকে আর ন্যান্সিকে সিঙ্গাপুরে পাঠাল। যেদিন সিঙ্গাপুরে পদার্পণ করলাম--সেদিনই মুরাদ মারা গেল। আমি বিদেশের মাটিতে ভাইয়ের জন্য চিৎকার করে উঠলাম। আকাশের দিকে তাকিয়ে থুথু ছুঁড়লাম। দুইবার তারপর আবার তিনবার। ন্যান্সি ভয় পেয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরে আছে। মুরাদের বিছানায় গিয়ে দেখি একটা চিঠি। খুলেনি সে। নার্স জানাল, চিঠি আজ সকালে এসেছে। সে এমন অসুস্থ ছিল যে, খুলে পড়তে পারেনি। নার্স তাকে পড়ে শোনাত কিন্তু তার শারীরিক অবস্থার কথা চিন্তা করে পড়ে শোনায়নি। বিদেশি নার্স। বাংলা বুঝতও না। তবুও সে পড়ে শোনাতে চেয়েছিল। আমি চিঠিটা খুলে পড়লাম, ‘‘পিযুষ,
জানি না, তুমি কেমন আছ? আমরা দু’জন বড় বিষাক্ত এক সময়ের শিকার। আজ তুমি কোথায়--আর আমি কোথায়। নিয়তি আমাদের কতদূর নিয়ে গেছে ইচ্ছা করলেও আমরা দু’জনে সব বাঁধা ভেঙ্গে মিলিত হতে পারি না। প্রতিটি বাঁধাই অদৃশ্য পাথর-দেওয়ালে ঘেরা। আমাকে মঙ্গল সূত্রে বাঁধার জন্য আত্মীয়রা উঠে পড়ে লেগেছে। কিন্তু আমি জানি, এ হৃদয়ের অন্তর্যামী শুধু তুমি। এক তুমিই বুঝতে পার, আমার কি কষ্ট! সারাক্ষণ ভাবী, আমার যেন তোমার মতো অসুখ হয়। দু’জনেই যেন পাশাপাশি বেড সীটে মরে যেতে পারি। কিন্তু ঈশ্বর বড় নির্মম, বড় নিষ্ঠুর। তোমাকে যেভাবে যতটুকু পেয়েছি তার বেশি পরম ঈশ্বরও বোধহয় আর বেশি সহ্য করতে পারেনি। দু’তীরে দু’টি মন মাঝখানে নদী। তবু তো তুমি এপারে--আমি ওপারে। এইটুকু অপূর্ণ পাওয়াই হোক পরম পাওয়া। ভালোবাসার পবিত্র হৃদয় থেকে আশীর্বাদ--ভালো হও--ভালো থাক। ইতি, তোমারই সিঁদুর।’’
মুরাদের লাশ নিয়ে চলে এলাম বাংলাদেশে। মনে পড়ল, ছাপান্ন হাজার বর্গমাইলের বাংলাদেশে আমাদের অধিকারে সাড়ে তিন হাত মাটিও নেই। নজরুল চৌধুরী আজিমপুর গোরস্থানে মুরাদের দাফনের সমস্ত ব্যবস্থা করলেন। ন্যান্সি দাফনের দিন একটা কথাও আমার সাথে বলেনি। পাশে পাশে থেকেছে। সে বুঝেছে--তার বোধশক্তি ভালো কাজ করছে। আমি জিতব--আমি জিতব। পরাজিত সৈনিকের পোশাক পাল্টাব; বিজয়ী পোশাকে আমি এ বাড়ি দখল করব। প্রেমশক্তি যুদ্ধশক্তির চেয়েও ভয়াবহ। আমি অস্ত্র ছাড়াই প্রেমশক্তির মাধ্যমে বিজয়ী হব। পুরনো দুঃখ, কষ্ট, স্মৃতি--সব ভুলে যাব।
ধারাবাহিক উপন্যাসঃ হৃদয়ের এপিঠ-ওপিঠ (পর্ব-29)
--শাশ্বত স্বপন
ন্যান্সিকে নিয়ে এখন অন্য খেলায় মেতে উঠেছি। সে এখন সব বুঝে। সে অসুস্থ হবার পর থেকে তার মা-বাবাকে কখনও মাম্মী-ড্যাডি বলে ডাকেনি। আমি আজ থেকে মাম্মী-ড্যাডি ডাকতে বললাম। তাকে মা-বাবার সাথে পরিচয় করালাম। সে মাম্মি-ড্যাডি ডাকতেও শুরু করেছে। পুরনো স্মৃতি তার কিছুই মনে নেই। এখন সে খুব একটা ফ্রান্সিস ফ্রান্সিস করে না। এদিকে সেলিম শিউলীকে না পেয়ে অন্য একটা মেয়েকে বিয়ে করেছে। ওদের বাসায় আমার যাওয়া-আসা খুব কম হয়। শিউলী বদরুন্নেসায় ভর্তি হয়ে অন্য এক ছেলের সাথে চুটিয়ে প্রেম করছিল। সেলিম তা সহ্য করতে না পেরে বিগত দিনের ভালোবাসা বিসর্জন দিয়ে বড় ঘরের রূপসী এক মেয়েকে বিয়ে করে সুখেই আছে। ওর স্ত্রীর সাথে পরিচয় হতেই সে এমনভাবে তাকাল যে, আমাকে মাথা নিচু করে থাকতে হলো। বুঝতে পারলাম, সে তার স্ত্রীকে সব বলে দিয়েছে। আমি সেলিমকে আমার চাকুরি ও ন্যান্সি সম্পর্কে সব বলেছি। আর সে তার নিশী সঙ্গিনীকে তো বলবেই। একসাথে ঘুমালে কত গোপন কথাই যে ফাঁস হয়ে যায়।
ন্যান্সি আবার কবিতা গান রিহার্সাল দিতে লাগল। কিন্তু সব কিছুতেই সে যেন নতুন। তাই আমি যা গাইতাম--সে তাই গাইত। হাসতে হাসতে ছুটে যেতাম বাগানে, সুইমিং পুলে, ছাদে। এ বাড়ির সবকিছুই আমার চেনা হয়ে গেছে। কোথায় কতটি বাতি, কতগুলো ফুলগাছ--সব জানা হয়ে গেছে। ন্যান্সি আমাকে পেয়ে দুঃখ-যন্ত্রণাই ভুলে গেছে। সে দিন দিন সুস্থ্য হয়ে যাচ্ছে। আমিও ঠিক তেমনি পুরনো সব স্মৃতিকে ভুলে যেতে লাগলাম। শুধু আল্পনা--বড় যন্ত্রণা দেয়। মাঝে মাঝে মুরাদের মৃত্যুও...।
আমি সিঁদুরদের বাসায় ঐ বিদায় নেবার পর আর যাইনি। টেলিফোনে আর চিঠিতে তার সাথে যোগাযোগ হয়েছে। একদিন বুয়া আমাকে একটা চিঠি দিল। সিঁদুর পাঠিয়েছে কোলকাতা থেকে। কবে সে কোলকাতা গেল , আমাকে জানাওনি।
স্যার,
আমার প্রণাম নিবেন। আমার মানসিক অবস্থা বুঝতে পেরে বাবা আমাকে জোর করে কোলকাতা নিয়ে আসে। এখানে এসেই বিয়ে ঠিক করে। আমি চেষ্টা করেও আপনার সাথে যোগাযোগ করতে পারিনি। আমার খুব কষ্ট হচ্ছে স্যার। পিযুষ যদি সুস্থ হয়ে ফেরে ওকে বলবেন, আমাকে যেন ক্ষমা করে দেয়। আসার দশদিন আগে পিযুষের কাছে চিঠি পাঠিয়েছি। উত্তর আর জানা হলো না। ওকে কোলকাতা আসতে বলবেন। আপনার ও পিযুষের সুস্থ ও সুখী জীবন কামনায়--
আপনার স্নেহের সিঁদুর।
(চিঠি পাওয়া মাত্র উত্তর দিবেন)
সিঁদুর
প্রযতেœ: মনীন্দ্র পাল
১৩২, কাঁচরাপাড়া
নদীয়া, কোলকাতা।
ভারত
দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে চিঠিটা মুষ্ঠিবদ্ধ করলাম। কি করব এখন? উত্তর লিখব? ছিঁড়ে ফেলব? ভাবতে পারছি না। চিন্তা শক্তি কাজ করছে না কেন?
মাসের পর মাস এভাবেই ন্যান্সিকে সঙ্গ দিতে লাগলাম। একদিন গাড়িতে চড়ে মীরপুর-এর রাস্তা ধরে চিড়িয়াখানায় যাচ্ছি। গাড়ি আমি চালাচ্ছি। ন্যান্সি, পাশে বসে আছে। যেন, সে আমার সহধর্মিণী। সে লাল রংয়ের শাড়ি পড়েছে। রাজকন্যার মতো লাগছে। যেন, পূর্ণ যৌবনা নদী। এ নদীর আঁকাবাঁকা সব পথ আমার দেখা-সব জায়গা আমি ছুঁয়েছি। এ নদীর দেখেছি মোহনা--দেখেছি জোয়ার--দেখেছি ভাটা--দেখেছি শেওলার জঞ্জাল। এ নদী আমার জন্য নাব্য--শুধু আমার জন্য। এ সম্পদ আমার--জলমহল আমার। আমি একে সাধনা করে পেয়েছি। টাকা-পয়সা বড় কথা নয়। প্রেম-ভালোবাসায় কখনও টাকা-পয়সার লেন-দেন হয় না। আমি ন্যান্সিকে ভালোবাসি, খুব ভালোবাসি।
এর মাঝে আমি কান কথা শুনেছি। ন্যান্সি নাকি প্রেগনেট ছিল। ফ্রান্সিসকে নাকি ষড়যন্ত্র করে হত্যা করা হয়েছে। ফ্রান্সিসের মৃত্যু আর গর্ভপাত--এ দুটোই তাকে এ অবস্থা করেছে। আমি কান কথা গ্রাহ্য করিনি। তবে মনে আমারও সন্দেহ ছিল। ডাক্তার কাগজে যা লিখে দিয়েছে--তা সবি তাদের বানানো লেখা। ওখানে অনেক ফাঁক-ফোঁকর থাকলে থাকতেও পারে। জার্মানে ফ্রান্সিসদের বাসায় গেলে মৃত্যুর রহস্য হয়তো অনেকটা জানা যেত। আমার খেয়ে কাজ নেই। আমি এক স্বার্থপর মানুষ। ঘটনা ঘটেছে বলেই তো এখানে আমার নাটকীয় আগমন। সে সতী হোক--আর অসতী হোক--তাকে আমি ভালোবাসি। ভালোবাসায় সতী-অসতীর জায়গা নেই--সবই সতী। আমি রামের যোগ্য উত্তরসূরী নই যে, ন্যান্সির সতীত্ব প্রমাণ করতে যাব। দিন পাল্টে গেছে। নারীরা এখনও যে দ্রোপদী হয়নি, সেটাই ভাগ্য। নারীরা এখন যে ধর্ম প্রবর্তক হয়নি, সেটা আরো ভাগ্য--নইলে টিকি আর দাঁড়ির কি অবস্থা হতো--ভেবে পাই না। মীরপুর দশ-এ আসতেই হঠাৎ এক লোকাল বাস চলন্ত অবস্থায় আমাদের গাড়ির একেবারে সামনে এসে পড়ল। ন্যান্সি প্রচণ্ড জোরে চিৎকার দিয়ে আমার গায়ের উপর পড়ে গেল। আমি কোন দিকে না তাকিয়ে বাম দিকে সাইড নিলাম। লোকাল বাস ডান দিকে সাইড নিল। সাইড নিতে বাম্পারে ধাক্কা লেগেছে একটু। ন্যান্সির চিৎকারের ফলে আমার দু’কান স্তব্ধ হয়ে আছে। আমি এই গাড়িতেই অজ্ঞান ন্যান্সিকে নিয়ে ধানমন্ডিতে রকিব ডাক্তারের ক্লিনিকে গেলাম। ডাক্তার তখন ছিল না। নার্সরা তার জ্ঞান ফিরাল। টেলিফোনে খবর দিতেই নজরুল চৌধুরী আর মিসেস রেহেনা গাড়ি নিয়ে হাজির। ন্যান্সির জ্ঞান ফেরা মাত্র আমরা তার কাছে গেলাম। অবাক দৃষ্টিতে সে তাকিয়ে আছে। সে সবাইকে হরিণ চোখা দৃষ্টিতে দেখে আমার দিকে তাকিয়ে বলে উঠল--‘হু আর ইউ?’ মিসেস নজরুল ন্যান্সির পাশে এসে বললেন--‘ও ফ্রান্সিস, ওকে চিনতে পারছিস না?’ ন্যান্সি আমার দিকে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। মুখে দুই হাত চেপে ধরে কেমন যেন করছে। ঘন ঘন নিঃশ্বাস ছাড়ছে। মাথায় খুব যন্ত্রণা মনে হয়। নার্স এই অবস্থা দেখে ঘুমের ইনজেকশন দিয়ে ঘুম পাড়াল।
ধারাবাহিক উপন্যাসঃ হৃদয়ের এপিঠ-ওপিঠ (পর্ব-30)
--শাশ্বত স্বপন
তারপর!!! আমার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসতে চাইল। আমি যেন নিজের কানকেও বিশ্বাস করতে পারলাম না। আমি যেন ন্যান্সি হয়ে যাচ্ছি। ক্লিনিকের সবকিছু ভেঙ্গে ফেলতে ইচ্ছে করছে। খুন করতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু কাকে? তা জানি না। আমি ন্যান্সির সামনে থেকে দূরে চলে এলাম। সে আমাকে চিনছে না। সে আগের স্মৃতি ফিরে পেয়েছে। কিশোরী মেয়ের মতো কথা বলছে। আড়াই বছরের সহধর্মিণী। (৭৩০+১৮৭) ২৪ ঘন্টা যার সাথে আমি কাটিয়েছি--সে আমাকে চিনল না। ফ্রান্সিসের মতো চেহারা বলে সে প্রথমে একটু অবাক হয়েছিল। ঘুম ভাঙ্গার পর নজরুল চৌধুরী তার অফিসের কর্মচারি হিসেবে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিলেন। মিসেস রেহেনা ও ডাঃ রকিব--কেউ কথা বলল না। আমি চলে এলাম। হ্যাঁ, তারা তো এই দিনটির জন্য এতদিন এত টাকা খরচ করেছে। এতদিন এই দিনটির জন্যই তারা প্রতীক্ষা করেছে। আমি দু’দিন ন্যান্সিদের বাসায় গেলাম না। সেলিমের বাসায় থাকলাম। নজরুল চৌধুরী মুরাদের সমস্ত খরচ বহন করেছে বলে, আমি এ পর্যন্ত তার কাছ থেকে কোন বেতন নেইনি। পকেট খরচ তারা ইচ্ছে করেই দিত। সেলিমকে সব বললাম। ও অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইল। দু’দিন পর বিকালের দিকে বাসায় গেলাম। দারোয়ান বলল, ‘স্যার নাকি আপনেরে টাকা-পয়সা দিয়ে বিদায় করে দিয়েছেন?’ ভাবলাম, আমাকে বৃত্তের বাহিরে রাখা হয়েছে। তবুও ভিতরে ঢুকলাম। বাইরের পুরো পরিবেশ পাল্টে গেছে। ন্যান্সি তার খালাত বোন এ্যামি ও তানজির সাথে নিচে নামছে। দু’জনেই হাসি-খুশি। আমি তাকিয়ে রইলাম। এ্যামি ও তানজি আমাকে চিনে। কিন্তু আজ এমন ভাব দেখাল, যেন তারা আমাকে কোনদিন দেখেনি। বুঝলাম, সবই চৌধুরীদের চাল।
-- আপনি কে? গত পরশু আঙ্কেল এর ক্লিনিকেও দেখেছি। আপনি আমাদের অফিসেরÑ?
-- জ্বি, জ্বি অফিসের কর্মচারি।
-- কি কাজ করেন?
-- জ্বি স্যার যখন যা বলেন--তখন তাই করি।
-- ও। ফ্রান্সিসের মতো অবিকল দেখতে--তাই না এ্যামি?
-- হতে পারে হয়তো। চল...
আমার গলা শুকিয়ে যাচ্ছে। আমার আর উপরে উঠতে ইচ্ছে করে না। আমার বিবেক আমাকে বলছে--
-- শোভন, আমি জিতলাম--তুমি হারলে। এই সিঁড়ি বেয়ে আর উপরে উঠতে চেষ্টা করো না--এ পথ তোমার জন্য নয়। বেশি বড় হতে চেয়ো না--ঝড়ে পড়ে যাবে।
এক ধাপ, দুই ধাপ করে নিচে নামলাম। উপর থেকে ডাক এলো। নজরুল চৌধুরী ডেকে পাঠিয়েছেন। উপরে গেলাম। দু’দিনে অনেক কিছু পরিবর্তন করা হয়েছে। আজ বোধহয়, বিরাট অনুষ্ঠান আছে। এখন আমার ঠাঁই হলো ড্রয়িং রুমে। ডাক্তার ও নজরুল চৌধুরী আসলেন। আমার মুখ দিয়ে যে কথা সহজে বের হবে না--এ ব্যাপারে আমি নিশ্চিৎ। আমাকে কি বলবেন, তাও আমি জানি।
-- শোনো শোভন, তোমার সাথে আমার একটা চুক্তি হয়েছিল--সেই চুক্তি অনুযায়ী তুমি সফল হয়েছ। এই তোমার কাগজপত্র। তুমি আগামীকাল চিটাগাং গিয়ে জয়েন করতে পার।
ডাক্তার বলে উঠল,
-- কিন্তু ন্যান্সির সাথে কথাতো দূরের কথা, দেখাও করবে না। ও যেন কিছুতেই বুঝতে না পারে অসুস্থ অবস্থার কোন কথা।
-- তাহলে, আমি টেলিফোন করে দিচ্ছি--তুমি আমার হোটেলে গিয়ে থাক।
আমি নজরুল চৌধুরীর দিকে তাকালাম।
-- না স্যার, কোন প্রয়োজন নেই।
-- তোমার কিছু বলার আছে?
-- স্যার, আমি সফল হতে পারিনি বরং আপনারা সফল হয়েছেন।
-- কি বলতে চাও তুমি?
-- আমি যেভাবে ওকে আপনাদের কাছে দিতে চেয়েছি--সেভাবে পারিনি। ও নিজেই ভালো হয়েছে। আমার উসিলা শুধু একটা এ্যাক্সিডেন্ট। আমার কিছুই নেওয়ার অধিকার নেই।
-- না, না তা কেন? তুমি কাল চিটাগাং চলে যাও। এখানকার জামা-কাপড় যাবতীয় সব তোমার ওখানে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। এখন কোথায় যাবে?
-- জানি না স্যার--
ডাক্তার চুপ করে আছে। ভেবেছিলাম কোন কথা বলব না। বলেও ফেললাম। আমি আমার নিজের প্রতি বিশ্বস্ত নই। আমি আমার নিজের কাছে কথা দিয়েও কথা রাখতে পারি না। আমি চলে এলাম। চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে হচ্ছিল, আমি কিচ্ছু চাই না। আমার ন্যান্সিকে ফিরিয়ে দাও। না,না, আমি কোন অধিকারে তাকে চাইব। এমন তো কোন চুক্তি ছিল না যে, ভালো করতে পারলে আমার সাথে বিয়ে দেবে। বরং যে চুক্তি ছিল, তিনি তো তাই করেছেন। কাগজগুলো রাস্তায় এসে ছিঁড়তে ইচ্ছা করল। কিন্তু আমার বিবেক বলছে, ‘‘শোভন, তুমি কিন্তু পরাজিত। এখন তুমি আমার কথা মতো চলবে। তুমি জিতলে, আমি কোন কথা বলতাম না। কিন্তু আমি জিতেছি। তাই তোমাকে বলব, কাগজগুলো ছিঁড় না। যা বাস্তব--তাই মেনে নাও। তবে একটা কথা শোনো--ন্যান্সি তো আবার কোন এ্যাক্সিডেন্ট-এ তোমার কাছে ফিরে আসতেও পারে ।
হ্যাঁ, আসবে, ও আসবে। ও অবশ্যই আসবে। হৃদয়ের টান কত দূর আমি দেখব। ও কবে আসবে? ওর সাথে এত ছবি তুললাম; সে সব ছবি ওর হাতে গেলে, ও নিশ্চয় ভাববে। ন্যান্সি, তুমি আগের মতো হয়ে যেও--আমি তোমার জন্য অপেক্ষায় থাকব। আমি যে বিরাট এক ঘোরের মধ্যে আছি--তা আমি জানি। এক হোটেলে এসে সীট ভাড়া নিলাম। সারা রাত মদ খেলাম, সিগারেট খেলাম। বুক গলা জ্বলে গেল। তবুও খেলাম। কানের ভিতর সুরের লহরী নিয়ে ভেসে এলো ‘যখন তোমার কেউ ছিল না--তখন ছিলাম আমি--এখন তোমার সব হয়েছে--পর হলাম আমি।’ মদ আর মদ--এটাই আমার আগামী জীবন। সকাল এগারটায় ঘুম থেকে উঠলাম। আজ ন্যান্সিদের বাসায় বিরাট অনুষ্ঠান। আজ তার জন্মদিন। কত মানুষ আসবে। কত আনন্দ হবে। আমি ডাক্তারের কাছে গেলাম। তাকে বললাম, আমি ওকে শেষ বারের মতো দেখব। উনি বোঝালেন আমাকে অনেকেই চেনে। তাই যাওয়া ঠিক হবে না। সুকান্তের একটা কবিতার চার লাইন মনে পড়ল--
“আমি যেন সেই বাতিওয়ালা
যে সন্ধ্যায় রাজপথে--বাতি জ্বালিয়ে ফেরে
অথচ নিজের ঘরে নেই বাতি জ্বালাবার সামর্থ্য,
নিজের ঘরেই জমে থাকে দুঃসহ অন্ধকার।”
কবিতাংশ কেন মনে পড়ল? আমার জীবনের সাথে কি এ পদ্যের বেদনাগত কোন মিল আছে? ভাবতে আর ইচ্ছে করছে না।
ধারাবাহিক উপন্যাসঃ হৃদয়ের এপিঠ-ওপিঠ (পর্ব-31)
--শাশ্বত স্বপন
ফকিরাপুল এসে সোনালী পরিবহনে উঠলাম। স্লিপিং কোচ। ঘন্টার পর ঘন্টা চলে যাচ্ছে, ঘুম আসছে না। ড্রাইভার টেপের সুইচ অন করতেই গান ভেসে এলো। এক একটা গান আমার হৃদয়ের মরুভূমিতে বালু উড়াতে লাগল। ‘জ্বিতাথা জিসকে লিয়ে--জিসকে লিয়ে মার তাথা--এক এহি লাড়কি থি-জিসে ম্যায় পেয়ার কারতা থা...।’ এরপর গান আর গান। গাড়ি চিটাগাং এসে গেছে। আমি ইচ্ছে করেই শেষে নামলাম। রাত হয়ে গেছে। অফিসে এলাম। সবাইকে পরিচয় দিতেই সম্মান করল। খাওয়া, থাকার ব্যবস্থা করল। আমার হাসতে ইচ্ছে করে, এই ভেবে যে, এটা আমার সম্পত্তি। দু’দিন পর চৌধুরীর কাছ থেকে বড় একটা চিঠি এলো। লোক দিয়ে জামা-কাপড়, টেপ-রেকর্ডার সব পাঠিয়েছেন। এগুলো সবই তাদের। চিঠিতে যে সব লেখা আছে--তা আমাকে মানতে হবে। ‘‘কখনও ন্যান্সির সাথে দেখা বা কথা বলার চেষ্টা করবে না। কারো মাধ্যমে ন্যান্সিকে কিছু জানাতে চেষ্টা করবে না। খুব শীঘ্রই ন্যান্সির বিয়ে। তাই ঢাকাতে না বলা পর্যন্ত আসবে না। আমার সাথে প্রয়োজনীয় সব কথা টেলিফোনেই সারবে। লাইসেন্স তোমাকে দিলেও মালিক আমি। বিশ্বাস অক্ষুণ্ন রাখলে ট্রাভেলস্ সহ আরো কিছুর মালিক হতে পারবে। কথার বরখেলাপ করলে ...। তোমার কাছে যুগ্ম কোন ছবি থাকলে তা ঢাকায় পাঠিয়ে দেবে...।
আরো অনেক নিয়ম। এমনিতেই হাজার নিয়মের বৃত্তে আটকা পড়তে পড়তে নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে তার মধ্যে আরেকটা বৃত্ত। ও গড! আমি এখন শূন্য পার হচ্ছি--এবার সামনে যাব। রাতে জামা-কাপড়গুলো ভাঁজ করে রাখতেই দেখি একটা চিঠি। কোলকাতা থেকে পাঠানো হয়েছে। চিঠির উপরে লেখা ‘পাইবে মুরাদ’। পাঠানো হয়েছে আমার নামে। নিশ্চয় সিঁদুর পাঠিয়েছে। মুরাদ নেই, ও জানে না এখনও। আমি ওকে জানাই নি। কখনও চিঠি পাঠাইনি। এ চিঠি কি করব? মুরাদের রিহার্সাল দেব? নাকি ফেলে দেব? আমি মনের অনিচ্ছা সত্ত্বেও চিঠি খুললাম। তারিখ দেখে বুঝলাম, চিঠি অনেক আগে এসেছে। ন্যান্সিদের বাসার কেউ জামা-কাপড়ের মাঝে চিঠিটা দিয়ে দিয়েছে। ‘‘মুরাদ, এই প্রথম তোমাকে তোমার সত্যিকারের নামে ডাকলাম। তোমার সিঁদুর এখন সত্যি সত্যি সিঁদুর পড়ে। প্রায় একবছর হলো বড় ঘরে আমার বিয়ে হয়েছে। স্যার, তুমি--কেউ আমার কাছে চিঠি লেখনি। এখানে খাদ্য, টাকা, ভালোবাসা কোন কিছুরই অভাব নেই। শুধু তুমি। রাত বারটা। আমার স্বামীকে নরম মাংসের স্বাদ দিয়ে ঘুম পাড়ালাম। মুরাদ তোমাকে খুব দেখতে ইচ্ছে করে। অভিমান করে একটা চিঠিও পাঠালে না। তুমি যদি আমার মতো হতে, তবে বুঝতে কি কষ্ট! কি কষ্ট! জেনেছি আমার ধর্মের পাতা থেকে--মানুষের মৃত্যুর পরও জন্ম থাকে-যদি মরণের পরও জন্ম হয় গো আমার--সে জন্মে যেন পাই তোমাকে। তোমার চিঠির আশায় রইলাম। ইতি, তোমারই, সিঁদুর।’’
‘তোমারই সিঁদুর’--সিঁদুর জানে মুরাদ জীবিত আছে। আমি তাকে জানাব না। সে আজীবন জানবে, মুরাদ বেঁচে আছে। তার মুরাদ বেঁচে আছে--এটা তার বিশ্বাস। এই বিশ্বাসে কেন আমি আঘাত করব? আমি মুরাদের হয়ে ওর কাছে চিঠি পাঠাব। অন্তত: এ পৃথিবীর একজনের কাছে আমার ভাই বেঁচে থাক। আমি চিঠিতে লিখব--সিঁদুর, তুমি ভালো থেক, সুখে থেক, আমাকে ভুলে যেও, তুমি আমাকে ভুলে যেও। আর কি লিখব? ছোট ভাইয়ের প্রেমিকার কাছে আমি কি লিখব? ও গড, তুমি বলে দাও। আমার এ বিষাক্ত সময়ে তুমি কোথায়? আই ওয়ান্ট ইউর হেলপ।
এর মধ্যে ন্যান্সির বিয়ের খবর পেলাম। আমাকে দাওয়াত দেওয়া হয়নি। বৌ-ভাত বিডিআর দরবার হলে হবে। আমি নজরুল চৌধুরীর সাথে ঢাকা দেখা করলাম। উনি অবাক হলেন আমাকে দেখে। আমার এ আকস্মিক উপস্থিতি তিনি মোটেও আশা করেননি। দু’জন লোক তিনি আমার সাথে দিলেন। আমি বুঝতে পারছি, উনি আমাকে সন্দেহ করছেন। আমি জিদ ধরেছি ন্যান্সিকে আজ আমি দেখবই। তার কথা মতো চোখে চশমা, মুখে দাঁড়ি লাগিয়ে বিকাল বেলা বিয়ে দেখতে গেলাম। আমার সাথে দু’জন লোক অতন্দ্র প্রহরীর মতো লেগে আছে। দু’জনের কেউ কোন কথা বলছে না। আন্টিকে দেখলাম বেশ হাসিখুশি। সবাই আনন্দে আছে। কেউ আমাকে চিনতে পারেনি। এটাই স্বাভাবিক। দুইটা সিংহাসন। একটাতে ন্যান্সি, অন্যটাতে তার স্বামী বসে আছে। এই সেই নারী--যার দেহের রক্ত বিন্দু পর্যন্ত আমার চেনা। সে তো আমার হতে পারত। কি বিষাক্ত সময় আমার! মরে যেতে ইচ্ছে করে। যে মরতে চায়, যম তাকে ছুঁতেও চায় না। যে মরতে চায় না, যম তাকেই ধরে। কি বিভৎস কষ্ট আমার! কেউ নেই, ভালোবাসার একটু ছোঁয়া দেবে। কেউ নেই, কেউ নেই--আমি এতিম। কি বিষাক্ত অথচ কত সুন্দর জুটি। আহা! মাথাটা কেমন যেন চক্কর দিল। প্রকৃতির মাঝে ঘড়ি--এরকম একটা সিনারী দেখে ছবি কিনে এনেছি। প্রেজেনটেশনটা দিলাম। আজ আমি ন্যান্সির বিয়ে খাব। আমার পাশের দু’ব্যক্তি আলাপ করছেন। এ বিয়েতে আশি লক্ষ টাকা শুধু খাবার খরচে ব্যয় হচ্ছে। দাওয়াতের কার্ড চার রকমের করা হয়েছে। বিদেশি ও কোটিপতিদের প্রথম শ্রেণির কার্ড, লক্ষপতিদের দ্বিতীয় শ্রেণির কার্ড। প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিদের তৃতীয় শ্রেণির আর বাকি সবাইকে চতুর্থ শ্রেণির কার্ড দেওয়া হয়েছে। ভিক্ষুকদের কোন কার্ড নেই, তবে এদের আলাদাভাবে খাবার দেওয়া হবে। ভিক্ষুকদের আসতে বলা হয়নি--এরা ইচ্ছে করেই এসেছে। আমিও তো ইচ্ছে করেই এসেছি। আমার জায়গা হওয়া উচিত ঐ ভিক্ষুকদের মাঝে। চারিদিকে কত বাতি। বর-কনেদের আশে-পাশে কত ফুলপরী! স্বর্গ থেকে এসেছে যেন। আমি এক দৃষ্টিতে ন্যান্সির দিকে তাকালাম। অনেকক্ষণ। আমাকে অনুসরণকারীরা চেয়ারে বসাল। খেতে বলল। অনেকের মাঝে খেতে বসেছি। খাবার মুখে দিতেই আমার বিবেক হে হে করে হেসে উঠল। হাসতে হাসতে সে আবার কাঁদতে শুরু করল। আমাকে বলল, শোভন, তুমি চিটাগাং চলে যাও--চলে যাও। আমি মাথা ব্যথার কথা বলে উঠে আসলাম। চারিদেকে ফুল আর ফুলপরীদের ভীড়। দুপুর থেকে বিকাল পর্যন্ত মানুষ আসছে, খাচ্ছে, দেখছে, অবাক হচ্ছে, চলে যাচ্ছে স্বর্গ-স্বপ্ন নিয়ে। সেলিমের বাসায় খেলাম। ও সব ভুলে যেতে বলল। স্রষ্টাকে ইচ্ছেমতো গালমন্দ করল। শিউলীর উপমা টানল নাস্তিক স্টাইলে। আমি খুশি হলাম। ও সত্যি নাস্তিক হয়ে গেছে। এখন আর কথার মধ্যে ধর্মের জড়তা নেই। কিন্তু আমি এখনও স্রষ্টার দিকে চেয়ে আছি--ন্যান্সি আসবে, আল্পনা আসবে...কবে আসবে--জানি না। হয়তো সেদিন আমি পৃথিবীতেই থাকব না। সেলিমের বুক সেলফ থেকে ইংরেজি কবিতার বই পড়তে লাগলাম। কোন কবিতাই ভালো লাগছে না। পৃষ্ঠা উল্টাতে উল্টাতে হঠাৎ রবার্ট ব্রাউনিং এর ‘দ্য প্যাট্রি অ্যাট্--কবিতাটি চোখে পড়ল।
‘‘ইট ওয়াজ রোজেস, রোজেস, অল দ্য ওয়ে,
উইথ মার্টল মিক্সড ইন মাই পাথ লাইক ম্যাড;
....................................................
স্টোনস এ্যট মী ফল মাই ইয়ার’র মিসডিডস
দাস আই ইনটারড, এন্ড দাস আই গো!...”
ধারাবাহিক উপন্যাসঃ হৃদয়ের এপিঠ-ওপিঠ (পর্ব-32)
--শাশ্বত স্বপন
বাঙালী যুবক ন্যান্সিকে বিয়ে করে আমেরিকা নিয়ে যাবে। তারপর মাঝে মাঝে আসবে। আমেরিকায় যুবকের বাড়ি আছে, ব্যবসা আছে। তার গ্রীন কার্ড আছে। আচ্ছা, ছেলেটি কি ন্যান্সি সম্পর্কে কিছু জানে না? অবশ্যই জানে। এসব অজানা থাকে নাকি? সে আমেরিকা থাকে। সেও দুই নম্বর--ন্যান্সিও দুই নম্বর। টু এন্ড টু মেকস ফোর। হে হে হে... এ হাসি কি সুখের নাকি অতি দুঃখ-কষ্ট থেকে? জানি না। ছেলেটি ন্যান্সিকে বিয়ে করেছে নাকি? সে বিয়ে করেছে নজরুল চৌধুরীর বিরাট সাম্রাজ্য, প্রতিপত্তি ও সম্মান। কোটিপতিদের ছেলেরা যেমন, মেয়েরাও তেমন। আজকের ডিস অ্যান্টিনার যুগে দুই নম্বর, এক নম্বর বলতে কিছু নেই। সবই এক নম্বর। অনেকে বলে খাদ্যদ্রব্যের মতো, ব্যবহার্য দ্রব্যের মতো মানুষও নাকি দুই নম্বর হয়ে যাচ্ছে। দেশ এখন বোম্বের, ইউরোপের, আমেরিকার কালচার খাদকের মতো পেট ভরে গিলছে। প্রগতিশীল মানুষেরা বাহবা দিচ্ছে। আর মৌলবাদীরা এসব কালচারকে নষ্টামী টাইটেল দিয়ে টিকি-ধূতি, টুপি-দাঁড়ি দিয়ে সাধ্যমতো ঢাকতে চেষ্টা করছে। কিন্তু পারছে না। তাদের ঘরের ভিতরেই ক্রমাগত জন্ম হচ্ছে প্রগতিশীল বিভীষণ। আবহমানকালের দেশি কালচার ডাস্টবিনে, ড্র্রেনের নালা দিয়ে গড়িয়ে যাচ্ছে। টোকাইরা কুড়িয়ে কুড়িয়ে জমাচ্ছে বস্তায়। দেশি কালচার এখন টোকাইদের বস্তায়, ডাস্টবিনে, আধপেটা-একপেটা মানুষদের ভাঙ্গা ঘরে শোভা পাচ্ছে বড় অবহেলায়, বড় অনাদরে। তাতে আমর কি আসে যায়? আমি কোটিপতিদের সন্তান নই, প্রগতিশীল নই, মৌলবাদী নই। তবে আমার এত মাথা ব্যথা কেন? যা--, যতসব অপ্রাসংগিক ফালতু প্যাঁচাল।
আচ্ছা, আমার কি ঐ ছেলেটার প্রতি হিংসা হচ্ছে? হবে না কেন? আমি তো আর দশ জনের মতো একজন স্বার্থপর মানুষ। নজরুল চৌধুরীর সব কিছুই তো আমার প্রাপ্য ছিল। ছিঃ, ছিঃ আমি এত লোভী, এত খারাপ! হ্যাঁ, আমি খারাপ--খুব খারাপ হয়ে যাচ্ছি আমি। আমি ন্যান্সির সাথে দেখা করতে পারব না--যোগাযোগ করতে পারব না। নিষেধ আছে। নিষেধ ভাঙ্গলে জীবনের ভয় আছে। আমি কি করতে পারি এখন? আমি তো জেনে শুনেই বিষ পান করেছি। তবে মরতে এত ভয় কেন? যে মেয়ের হাজার জনের সামনে বিয়ে হচ্ছে সেটাইতো সত্য। আমি কোন অধিকারে ওকে দখল করব। ওতো আমাকে চিনে না। আমরা দু’জনে বিয়ের সবকিছু করেছি--তাতে কিছু আসে যায় না। আমার কাছে এ সম্পদের কোন দলিল নেই। অতএব কেঁদেও লাভ নেই। ও সুখে থাক--ভালো থাক...।
নিজেকে যত বোঝাই--ততই অবুঝ হই। স্যারের কাছে বিদায় নিয়েছি। তিনি জানেন, আমি চিটাগাং চলে গেছি। কিন্তু আমি যাই নি। বিবেকের কথা আমি মানিনি। আমি এখন এয়ারপোর্টের এক জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি ফ্রান্সিসের প্রিয় পোষাক পরিধান করে। যে পোষাক পড়ে সে মারা গিয়েছিল। সাদা শার্ট-সাদা প্যান্ট। আমি এমনভাবে দাঁড়িয়ে আছি যেন, ন্যান্সি আমাকে দেখতে পায়। গ্লাসের একপাশে আমি অন্যপাশে সে ও তার স্বামী। পাগড়ী আর চশমা খুলে তাকালাম। শুধু ন্যান্সি দেখল। অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। আমি হাসলাম। হঠাৎ সে দৌঁড়ে আসতে লাগল। বেশ দূরে দরজা। ঐ দরজা দিয়ে আমার এখানে আসতে তার দুই-তিন মিনিট লাগবে। আমি দ্রুত পাগড়ী আর চশমা পড়লাম। শার্টের উপর চাঁদর জড়ালাম। অন্যত্র চলে গেলাম। তারপর কি হয়েছে--আমি জানি না। এয়ারপোর্টের এক কোণায় গিয়ে দাঁড়ালাম। দেখলাম, ন্যান্সি আর তার স্বামী সিঁড়ি বেয়ে বিমানে উঠছে। স্বামী আগে ঢুকে গেল। ন্যান্সি চারিদিকে তাকাচ্ছে। আমি আগের পোশাকে দাঁড়িয়ে আছি। ফ্রান্সিস এর মৃত্যু মুহূর্তের গান আমার হৃদয় থেকে উৎসারিত হলো। ‘ও’--ডিয়ার, আই লাভ ইউ...।’ আমার চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে হলো, ন্যান্সি তুমি চলে এসো--। আমি টা-টা দিচ্ছি। সে আমাকে দেখেছে। সে যেতে চাইছে না ভিতরে। তার স্বামী তার হাত ধরে তাকে বৃত্তের ভিতরে নিয়ে গেল। তাদের বৃত্তের বাইরে যাওয়া তাদের জন্য নিষিদ্ধ। আমাদের বৃত্তের বাইরে যাওয়া আমাদের জন্যও নিষিদ্ধ। তবুও বিষাক্ত হৃদয় চিৎকার করে বলতে চাইল--ন্যান্সি, তুমি চলে এসো--।
গায়ের সমস্ত শক্তি দিয়ে ডাকতে চাইলাম আবার, ন্যান্সি--তুমি চলে এসো--। কিন্তু এ ডাক হৃদয়ে বারবার কম্পিত হলো। বৃত্তের বাইরে গেল না। অসংখ্য বৃত্ত ঘিরে ধরল আমার হৃদয়ের বিস্ফোরিত কণ্ঠস্বরকে। এসব দৃশ্য দেখার পর আমার মরে যাওয়া উচিত। আমি কেন এখনও বেঁচে আছি? কার জন্য বেঁচে আছি? আল্পনার জন্য, ন্যান্সির জন্য, সময়ের প্রয়োজনে, নাকি স্বপ্নের জন্য? স্বপ্ন কি মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে? হ্যাঁ, রাখে। আমি তো স্বপ্নকে নিয়েই বেঁচে আছি। কি স্বপ্ন আমার--বড় হবার? হলাম না হয় বড়। আমি কি আল্পনাকে পাব, ন্যান্সিকেই বা পাব? কাউকে পাব না। তাই বলে কি জীবন চলে না? হ্যাঁ চলে। উন্মাদ যেভাবে ট্রাক চালায়--সেভাবে চলে। কিন্তু আমি জানি, আমার চলবে না। প্রথম ভালোবাসার নীল দংশনের পর যে ওঝার নরম স্পর্শে বাঁচতে ইচ্ছে হচ্ছিল, সে নেই। আজ থেকে আর বাঁচার ইচ্ছাও থাকবে না।
ধারাবাহিক উপন্যাসঃ হৃদয়ের এপিঠ-ওপিঠ (পর্ব-৩৩)
--শাশ্বত স্বপন
হা-হা-হা--আমার হাসি পাচ্ছে কেন? বাতাসে কি লাফিং গ্যাস আছে? কি জানি, দেখা তো যায় না। প্রমাণ করে বিশ্বাস করতে হয়। প্রমাণ ছাড়া বিশ্বাস করা কি যায় না? তা জানি না--তবে সব কিছু প্রমাণ করতে নেই। কিছু কিছু প্রমাণ ছাড়াই বিশ্বাস করে মেনে নিতে হয়। যেমন--ঈশ্বর এক ও অদ্বিতীয়। আচ্ছা, ঈশ্বর কি আমাকে আমার লোভের শাস্তি দিলেন? কি পাপ আমার? তিনি তো আমাকে বাঁচার মতো বেঁচে থাকার জন্যই পাঠিয়েছেন এবং আমি তো সে চেষ্টাই...। তবে পৃথিবীই কি স্বর্গ--পৃথিবীই কি নরক? আমার মতো এত ক্ষুদ্র জীবের পক্ষে ঈশ্বরের বিচার বুঝা সম্ভব নয়। আচ্ছা, আমি কি মানসিক রোগী হয়ে যাচ্ছি। ডাঃ রকিব আহসান--এর ‘মানসিক রোগীর বৈশিষ্ট্য ও চিকিৎসা’--বইটা আমি পড়েছি। হ্যাঁ, হ্যাঁ, বই-এর লেখা অনুযায়ী আমি তো মানসিক রোগী। আমি আগেও মানসিক রোগী ছিলাম। তবে তখন প্রচ্ছন্ন ছিল। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে, এখন প্রকট রূপ ধারণ করেছে এবং করাটাই স্বাভাবিক। ও গড, আই ডন্ট ইউর হেলপ্ টু লীভ। ইউ কিল মী এ্যট ওয়ানস্, প্লিজ। আই ডন্ট লাভ মাই লাইফ, দিস্ ওয়ার্ল্ড এন্ড এভরিথিং। দেয়ার ইজ নো লাভ ফর মী ইন দ্য ওয়ার্ল্ড। প্লিজ ইউ লাভ মী, ইউ লাভ মী। আই ডন্ট টু বি এ মেন্টাল পেসেন্ট...। আমি কার সাথে কথা বলছি? ঈশ্বরের সাথে? হ্যাঁ। ঈশ্বরের সাথে কেউ কথা বলতে পারে? না। হ্যাঁ, হ্যাঁ, আই এ্যাম এ মেন্টাল পেসেন্ট!!
চ্যালেঞ্জার কোচে চড়ে জড় পদার্থের মতো চিটাগাং চলে এলাম। রুমে এসে বাছাই করা ছ্যাকা খাওয়া গানের ক্যাসেটটি ধীরে ধীরে টেপে ঢুকালাম। গান বেজে চলল। ফ্রীজ খুললাম। মদের বোতল বের করলাম কয়েকটা। আমার মত পরাজিত সৈনিকের জন্য এগুলো ভালো ঔষধ। ভাবলাম, এগুলো সবই নজরুল চৌধুরীর। ইচ্ছে করলে আমাকে নেংটা করে পথে ছুঁড়ে ফেলে দিতে পারে। আমার কিছুই নেই। মাসের টাকা কোনদিন নেইনি, ছোট ভাইয়ের চিকিৎসায় বহু টাকা ব্যয় হয়েছে বলে। হঠাৎ কেন জানি, আমার হৃদয়ের এপিঠ-ওপিঠ দেখতে ইচ্ছে করল। আমি চোখ বুঁজে কল্পনার পর্দায় হৃদয়টাকে দেখলাম। বিশ্বাস হচ্ছে না আমার। এটা কি আমার হৃদয়! নাকি নীল বর্ণের কোন বস্তু! আমার জীবনে ভালোবাসার রং নীল হলো কেন? কালো হতে পারত, গাঢ় লাল হতে পারত, অন্য কোন রং হতে পারত। আমি আবার চোখ বুঁজলাম। ভালোভাবে আমার হৃদয়ের নীল শ্মশান ভূমিটাকে পর্যবেক্ষণ করলাম। একি হৃদয়ের এ-পিঠে আল্পনার নীল বর্ণের কঙ্কাল--ওপিঠে ন্যান্সির একই বর্ণের কঙ্কাল! আরো অস্পষ্ট লক্ষ লক্ষ কীট-পতঙ্গের মতো প্রাণীর নীল বর্ণের কঙ্কাল। একি! বাংলাদেশের মানচিত্র! ছাপান্না হাজার বর্গমাইল! ঈশ্বর কি এদেশের কেয়ামত আমার হৃদয়ে...? ওহ! কি ভয়ঙ্কর, বিভৎস নীল বর্ণের কঙ্কল দু’টি! একি! মানচিত্র নীল বর্ণের কঙ্কাল হয়ে যাচ্ছে কেন? না--আমি দেখতে চাই না। চোখ খুললাম।
না, এসবই কল্পনা--বাস্তব না। আমি ভুল দেখছি। হ্যাঁ, ভুল। আমি তো মানসিক রোগী। সত্যিই আমি মেন্টাল পেসেন্ট? হৃদয়কে কোনদিন দেখার ইচ্ছে আমার হয়নি ঘৃণা করি বলে। আজ কি ভালোবেসে দেখতে ইচ্ছে করল, নাকি অতি ঘৃণা থেকে? উত্তর খুঁজে পাচ্ছি না। মদের পর মদ শেষ হয়ে যাচ্ছে। সিগারেট একটা শেষ হতেই আরেকটা জ্বালাচ্ছি। আমি কি আবার অবুঝ শিশু হয়ে যাচ্ছি? কোন উত্তর নেই। এটা আমার হৃদয় নয়। আমি এ হৃদয়কে ত্যাজ্য করলাম। যার হৃদয় নেই--সে অমানুষ। আমি অমানুষ। অমানুষ কি? কোন জন্তু, পাখি...। কোন উত্তর নেই। হৃদয়হীন মানুষ হলো জীবন্ত লাশ। আমি জীবন্ত লাশ। আমি পুরুষ ও স্ত্রী জাতীর মতো তৃতীয় কোন প্রাণী। ‘‘যিতাথা জিসকে লিয়ে..., সেই দিন আমার কবে যে আসবে...”--গান বেজে চলেছে ক্রমান্বয়ে। দেহ ভালোবাসার নীল দংশনে জ্বলে পুড়ে মরছে।
আমি মানুষের মতো বাঁচতে চেয়েছিলাম। তোমরা আমাকে বাঁচতে দাওনি। আমি কাকে বলছি এসব কথা? নজরুল চৌধুরীকে, ন্যান্সিকে, এ সমাজকে, নাকি এদেশকে। উত্তর খুঁজে পাচ্ছি না। প্রশ্ন হয়, উত্তর হয় না কেন? মাথার উত্তর বিভাগ কি কাজ করছে না? আমি কি পাগল হয়ে যাচ্ছি? কাল থেকে আমি নগ্ন হয়ে পথে পথে ঘুরে বেড়াব? নাকি পঙ্গু ভিক্ষুক হব? তারপর মৃত্যু মুহূর্তে বলব, “ছাপান্ন হাজার বর্গমাইলের এ বাংলাদেশে আমার অধিকারে সাড়ে তিন হাত মাটিও নেই। এসবই তো মানুষের জন্য সিদ্ধ। তবে আমার জন্য কেন নিষিদ্ধ? আমি কি মানুষ নই? তবে আমি কি?” ও, আমি তো অমানুষ। অমানুষদের কি সাড়ে তিন হাত ভূমি থাকার প্রয়োজন নেই? অমানুষরা কি নরকের জীব? কোন উত্তর নেই।
মনে পড়ে ’৭১-এর কথা, মনে পড়ে ’৭৪। মনে পড়ে দাদীকে, মাকে, বাবাকে, চাচাকে, আল্পনাকে, আল্পনার বিয়ের দৃশ্যটাকে, জেলকে, টিকি-দাঁড়িদেরকে, বীথিকে, মুরাদকে, সিঁদুরকে, ন্যান্সিকে--সব, সব স্মৃতি মনে পড়ে। মনে পড়ে এয়ারপোর্ট। দেহের অণুতে, পরমাণুতে যেন আর্সেনিক বয়ে যাচ্ছে। এ বিষাক্ত দেহ এখন ক্লান্ত। সে একা থাকতে চায়। তার এ বিষাক্ত দেহ দিয়ে সে কাউকে বিষাক্ত করতে চায় না। এ দেহ এইডস রোগীর দেহের চেয়েও ভয়াবহ। এ দেহ এখন সাড়ে তিন হাত মাটি চায়--এ বিশাল পৃথিবীর কাছে সে সাড়ে তিন হাত মাটি চায়।
চোখ চায় আল্পনাকে, ন্যান্সিকে দেখতে। আমি মদের বোতল ভেঙ্গে ভাঙ্গা কাঁচ দিয়ে হাত কাটলাম আজ বহুদিন পর। লিখলাম আল্পনা। কেন আল্পনা লিখলাম? ন্যান্সি তো লিখতে পারতাম। তবে আমি কি শুধু আল্পনাকে ভালোবাসি? ন্যান্সি কি আল্পনার বিকল্প কোন প্রতিচ্ছবি? পাশে লিখলাম শোভন। হঠাৎ ভাঙ্গা বোতল, সিগারেট, ম্যাচ, গ্লাস পড়তে লাগল দু’নামের মাঝে। দেয়াল একটা, দুইটা, তিনটা... আরো...। চোখে সব ঝাপসা লাগছে। চোখ আল্পনাকে দেখতে পাচ্ছে না বহুদিন ধরে। সে এখন ক্লান্ত। সে চিরতরে নিদ্রা যেতে চায়। দেহ শান্তি পাচ্ছে না বিষাক্ত স্মৃতির জন্য। সে প্রচণ্ড কষ্ট পাচ্ছে, প্রচণ্ড কষ্ট। সে নির্জীব বস্তু হতে চায়। মাথায় বেদনার স্মৃতিতে ভরে গেছে। বেদনা ভারী, খুব ভারী। মাথা আর বইতে পারছে না। সে নির্জীব বস্তু হতে চায়। হাত-পাও বিদ্রোহ করছে। আমার জন্য কারো ভালোবাসা নেই। মদ আর সিগারেট ট্রেনের গতিতে চলছে। মাথা, চোখ, হাত-পা সবই বিদ্রোহ করছে। আমি জানালা দিয়ে আকাশের দিকে তাকাচ্ছি। এক হাতে সিগারেট, অন্য হাতে মদের গ্লাস। অনেক কষ্টে সিড়ি হাতড়িয়ে ছাদে উঠলাম। আকাশের দিকে তাকারাম। প্রশ্ন করলাম বিশাল আকাশকে লক্ষ্য করে, পৃথিবীতে আমাকে কেন পাঠানো হয়েছিল? আমাকে কেন এত কষ্ট দেওয়া হলো? আমার জন্য এটাই কি নরক? প্রশ্নগুলো বারবার করলাম। কোন উত্তর এলো না। সারা দেহ কেঁপে উঠল। চোখ, মুখ, যকৃৎ, হৃদপিণ্ড, পাকস্থলী, বৃক্ক--সব যেন ঘুরছে--সবাই যেন বিদ্রোহ করছে। ছয় লিটার বিষাক্ত রক্তের এ দেহ আকাশের দিকে তাকিয়ে নিষ্ঠুর পৃথিবীকে থুথু দিয়ে চিৎকার করে উঠল। এটম বোমা বিস্ফোরণের মতো যেন, শক্তিশালী এক কণ্ঠস্বর--“আমি নির্জীব হতে চাই...!!!”





মন্তব্য করুন