ইউজার লগইন

ধারাবাহিক উপন্যাসঃ হৃদয়ের এপিঠ-ওপিঠ (সম্পূর্ণ)

ধারাবাহিক উপন্যাসঃ হৃদয়ের এপিঠ-ওপিঠ
--শাশ্বত স্বপন

আমার কিছু কথা

উত্তম পুরুষের বাচন শৈলীতে রচিত ‘হৃদয়ের এপিঠ-ওপিঠ’ উপন্যাসটি ব্যক্তিগত জীবনের পাওয়া না পাওয়ার এই লেখার নায়ক শোভন--যাকে চারপাশের সহস্র জ্বালা-যন্ত্রণা জমাট পাথরের মত আঁকড়ে ধরেছে। মা-বাবা হারিয়ে আত্মীয়-স্বজনহীন এই নিষ্ঠুর পৃথিবীতে সে এক টুকরো লাল ফিতের মত আহত ভালোবাসা নিয়ে তুষের আগুনে জ্বলে-পুড়ে বিরহের বিষাক্ত স্রোতে ভেসে যাচ্ছে লক্ষ্যহীন পথে। সময় আর ধর্মের শক্ত শিকলে বাঁধা বিধর্মী এক কিশোরীকে ভালবাসার অপরাধ সন্ত্রাসে রুপ নিলে, তাকে জেল খাটতে হয়। রক্ত সম্পর্কহীন এক চাচার বাসায় আশ্রিত থাকাকালীন সে জানতে পারে--চাচা পিতা হত্যাকারীদের একজন। রাগে, ক্ষোভে এক ফোঁটা ভালবাসা, এক টুকরো শান্তির জন্য আপন বিবেককে বিসর্জন দিয়ে গন্তব্যহীন শ্যাঁওলা পথে পা বাড়ায়। বিখ্যাত ধনীর একমাত্র মানসিক বিকারগ্রস্ত কন্যাকে নিয়ে আগুন খেলায় সে মেতে উঠে। বিধর্মী মেয়েকে ভালবাসা অসম্পূর্ণ রেখে ব্রেইন ক্যান্সারে মারা যায় তার একমাত্র ছোট ভাই। কেউ কথা রাখেনি তার জীবনে। তার জন্য নিষিদ্ধ, অশান্তির এই বিষাক্ত পৃথিবীতে আহত হৃদয়ে এতিম এই পরাজিত সৈনিক ক্রমাগত দুঃখ-জ্বালা, স্মৃতিগত যšত্রণায় জ্বলতে জ্বলতে নিষিদ্ধ বৃত্তের সীমান্তে পৌঁছে যায়, হয়ে উঠে জীবন্ত লাশ। চুক্তি অনুযায়ী হারাতে হয় মানসিক রোগ হতে সুস্থ, সুন্দরী যুবতীকে। কিন্ত ভালবাসা কি চুক্তি মানে? ভালবাসা যা দেয়--তার চেয়ে অনেক বেশী কেড়ে নেয়। তবুও মানুষ ভালবাসার জন্য সহস্র শিকলের ত্রিভূজ ভেঙ্গে বাইরে বেড়িয়ে আসতে চায়। আর তাইতো ভালবাসার নীল দংশনে বিষাক্ত হয়ে উঠে হৃদয়ের এপিঠ-ওপিঠ।

১৯৯২ সালে এই উপন্যাসটি 'দৈনিক সকালের খবর' পত্রিকায় এবং ১৯৯৪ সালের বই মেলায় প্র্রকাশিত হয়েছিল। বুর্জোয়া সমাজের বেকার যুবকদের মাঝে উপন্যাসটির আবেদন এখনও অটুট আছে। আর তাই...

উৎসর্গ
বাংলাদেশের বেকার যুবকদের--
যারা ভুল করে, ভুল করে এবং
সেই ভুলের যন্ত্রণা সারাজীবন বয়ে বেড়ায়।

ধারাবাহিক উপন্যাসঃ হৃদয়ের এপিঠ-ওপিঠ (পর্ব-১)
--শাশ্বত স্বপন

দেড় বছর ধরে ছোটখাট একটা চাকুরি খুঁজছি। এমন কোনদিন নেই, যেদিন আমি চাকুরির জন্য ছুটোছুটি না করি। আজ এমন একটা অফিসের ওয়েটিং রুমে বসে আছি--যেখানে চাকুরির পদসংখ্যা বারটি আর আবেদন পত্র জমা পড়েছে তিন শত সাতাত্তরটি। পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে ধরেই নিয়েছি--আমার চাকুরি হবে না। তবুও আল্লাহ্র মহান অদৃশ্য শক্তির প্রতি দুর্বলতার কারণে ধৈর্য্য ধরে বসে আছি। দেখি, অদৃশ্য শক্তি আমার ব্যক্তিগত জীবনের পঁচিশ বছরের আশাহত মনের সমস্ত দুঃখ-কষ্টের মাঝে একটা বনফুল ফোটান কিনা। জীবনে সুখ নামক অদৃশ্য পাখিকে আপন করতে গিয়ে এমন সব বেদনার সম্মুখীন হয়েছি--যে বেদনা সুখ নামক আকাংখিত পাখীকে ক্রমাগত চাপা দিতে দিতে ছাপান্ন হাজার বর্গমাইল মাটির নিচে পুঁতে রেখেছে। সুখ কি জিনিষ--আমি জানি না। তবে জানতে চাই। আমি জানি, আমার হৃদয় খনিতে সুখ আছে--সুখ আছে ছাপান্ন হাজার বর্গমাইল মাটির গভীরে--যা আবিষ্কার করার জন্য অথবা খুঁজে বের করার জন্য, যেসব বিজ্ঞানীদের প্রয়োজন, যেসব সুস্থ্য মস্তিষ্কের মানুষ প্রয়োজন-- তারা নেই; আছে অসুস্থ্য মস্তিস্কের মানুষ--যারা নিজেদেরকে কেউ আল্লাহ্র প্রিয় বান্দা, কেউ বুদ্ধিজীবী, কেউ দেশসেবক হিসেবে মনে করে। এরা দলীয়ভাবে আপেক্ষিক ভালো, আপেক্ষিক পূজনীয় কিন্তু পরম পূজনীয় নয়। আপেক্ষিক পূজনীয় বলেই হিংসা-বিদ্বেষ এদের রক্ত প্রবাহে বয়ে চলে অবিরাম। আর এর ফলেই সুখের খনি আর আবিষ্কার করা হয় না বরং সুখ আরো গভীরে চাপা পড়তে থাকে। আমরা দুঃখের মাঝেই সুখের নীড় খুঁজে বেড়াই। পায়ে জুতো নেই বলে খুব একটা আফসোস করি না; কারণ আমাদের আশে পাশে অসংখ্য পঙ্গুরা ভিক্ষা করে, যাদের পা-ই নেই। যদিও বা হঠাৎ করে ধনসম্পদসহ কেউ সুখের ছোঁয়া পায়; তবে পরম আল্লাহ্কে অসংখ্যবার ধন্যবাদ জানায়; ঠিকমত নামাজ-রোজা কায়েম করে। তারপর আস্তে আস্তে নিজেকে বেহেস্তের যাত্রী প্রমাণ করতে গিয়ে ধর্মকে নিয়ে ব্যবসা শুরু করে। আর যদি সুখ না পায়, অর্থ-সম্পদ কপালে না জোটে, তবে একজন আরেকজনকে দোষারোপ করে; নয়তো আপন ভাগ্যের কপালে হাজারটা গালি দেয়।

আমাকে ‘ভাইভা’তে ডাকবে--সেই আশায় বসে আছি। আমার সিরিয়াল নং একাত্তর। একেবারে স্বাধীনতা যুদ্ধের সন। মাত্র বার জনের ভাইভা নেওয়া হয়েছে। দু’একজন ছাড়া সবাই গম্ভীরভাবেই ভাইভা কক্ষ থেকে বের হচ্ছে। বিরাট বড় অফিস। মনে হয়, ওয়েটিং রুমটাই সবচেয়ে বড়। না জানি, প্রতিদিন এখানে কত লোক ওয়েট করে। একটা রুম পূর্বদিকে--যা অন্যান্য রুমগুলো থেকে বেশ হাইফাই মনে হয়। জানতে পারলাম, ওটা মালিকের কক্ষ। বাইরে থেকেই যে ফিটফাট দেখা যাচ্ছে, ভেতরে না জানি কি স্বর্গীয় রূপ! আমার দেখারও ইচ্ছে নেই, জানারও ইচ্ছে নেই। আলু ভর্তা আর ডাউলের মেনুটা যদি মাছ আর নানান সব্জিতে ভরপুর থাকে--তবেই আমার পরম পাওয়া। অবশ্য এটা আপাতত। বড় হবার ইচছা সবারই আছে। একটা গরুও চায়, ময়লা গোয়াল ঘর ছেড়ে একটু পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পাকা করা মেঝের উপর থাকতে। মাঝে মাঝে আমার অনেক বড় হতে ইচ্ছে করে--অনেক বড়। জানি, এটা কোনদিনই সম্ভব না। আবার নিজেকেই বোঝাই, অতি বড় হইও না; ঝড়ে পড়ে যাবে। কিন্ত এটাওতো হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি, ছোট হয়ে থাকার ফলে প্রতিদিন ছাগলেরাও আমাকে মারিয়ে যাচ্ছে। আমি মাঝারি থাকতে চাই।

প্রার্থীরা একজন আরেক জনের সাথে কথা বলছে। জাহাজে বারটি পোস্ট খালি। প্রতিটি পোস্টই সাধারণ কেরাণী গোছের। এখানে যারা এসেছে তাদের কেউ এম.এ পাস, কেউ অনার্স পাস, কেউ ডিগ্রী পাস, কেউবা এইচ.এস.সি, এস.এস.সি পাস। একটা বাবুর্চি চাওয়া হয়েছে--যার শিক্ষাগত যোগ্যতা অন্ততঃ অষ্টম শ্রেণি হতে হবে। আমি বি.এ. পাস করেছি দেড় বছর আগে। অভাবের কারণে সামনে পড়ার ইচ্ছা জাগেনি। আর সাধারন কেরাণী মাপের চাকুরির জন্য এম.এ.পাস প্রার্থী দেখলে সামনে পড়ার যেটুকু ইচ্ছা থাকে, তাও বাষ্পীভূত হয়ে উড়ে যায়। প্রার্থীদের একজন একজন করে পশ্চিমের একটা কক্ষে ডাকা হচ্ছে। আমি দু'চোখ ভরে অফিসটা দেখছি আর অবাক হচ্ছি। অনেক জায়গায় চাকুরির জন্য ধন্না দিয়েছি কিন্তু এত হাইফাই, এত সুন্দর অফিস কখনও দেখিনি। যেন, পৃথিবীর আর এক নতুন রূপ। বাইরে এত গরম অথচ এখানে এ.সি’র গুণে কত আরাম! মালিক কক্ষে মালিক ব্যাটা না জানি কি সুখেই আছে। স্বর্গের যদি চোখ থাকত আর এই রূপটা দেখত; তবে নিশ্চয় লজ্জা পেত; নয়তো অন্তঃসার শূন্যের মত আরো গলাবাজি করত। আমাদের সমাজে জ্ঞানী, বুদ্ধিজীবী বলে আখ্যায়িত অনেকেই বেশ গলাবাজি করতে পারে। এরা একজন আরেক জনের জ্ঞানকে তুচ্ছ ভাবে, নিজেকে আরো জ্ঞানী ভাবে। শিক্ষকরা যেমন সবাইকে ছাত্র ভাবে; এরাও তেমনি সবাইকে তাদের বুদ্ধি বা জ্ঞানের অনুগত কিংবা অনুসারী মনে করে।

মালিক কক্ষ থেকে কোর্ট-টাই পরিহিত একজন লোক বের হলো। তার পিছু পিছু আরো চার-পাঁচজন। এই প্রথম ব্যক্তি নিশ্চয়ই মালিক। আমরা সবাই উঠে দাঁড়ালাম। তিনি সবার দিকে তাকালেন তাচ্ছিল্যভাবে। একজন লোক বেশ তোষামোদী ভঙ্গীতে মালিকের কাছাকাছি গেল।
- কয়টা দরখাস্ত জমা পড়েছে, জলিল?
- তিন শত সাতাত্তরটি স্যার।
- বল কি!
-হ্যাঁ, স্যার―
- ঠিক আছে। কেউ আসলে বসতে বলো। আমি মিনিষ্ট্রি-তে যাচ্ছি। ফোন আসলে দুইটার পরে করতে বলো। আমার ফিরতে একটা-দেড়টা বেজে যাবে।
- জ্বী স্যার―

নেম প্লেট-এ দেখেছি, তার নাম নজরুল চৌধুরী। আমি তার দিকে তাকিয়ে মনে মনে বললাম, “ভাই, বেহেস্তে কেমন আছেন?” হঠাৎ তার চোখ আমার দিকে পড়ল। আমি ঢোক গিললাম। মনে মনে যে কথা বললাম―তা শুনেছে নাকি? প্রথমবার সম্মিলিতভাবে সালাম দিয়েছিলাম। এখন আরেক বার দিলাম। তিনি মনে হয়, মনে মনে সালাম নিয়েছেন। ধনীরা গরীবদের সালাম মনে মনেই গ্রহণ করে। গরীবদের এরা তোয়াক্কাও করেন না। গরীবরা হলো এদের অনুগত, আদেশের দাস। তিনি আমার সামনে আসলেন। আমাকে চিনেন নাকি? এর মত লোক আমাকে চিনবে? অসম্ভব। আমার গলা শুকিয়ে যাচ্ছে। সবাই আমার আর তার দিকে তাকাচ্ছে। তিনি এবার সবার দিকে তাকালেন। তার চার-পাঁচ জন অনুসারীদের গাড়িতে উঠতে বলে তিনি নিজ কক্ষে আবার চলে গেলেন। ঢোকার সাথে সাথে রিং বাজল। আমার বয়সী একজন পিয়ন, অফিসে কাজ করে, ভেতরে ঢুকল। ফিরে এসে আমাকে ঢুকতে বলল। আমার মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়ল। আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। অনেকে অনেক কিছু জিজ্ঞাসা করতে শুরু করেছে। তারা কি যে বলছে--তা আমার মাথায় ঢুকছে না। আমার একমাত্র চিন্তা কেন তিনি...? ভিতরে ঢুকলাম। সালাম দিলাম। এই নিয়ে তিনবার। আগে যে দু’বার সালাম দিয়েছি―তা স্পষ্ট মনে নেই। বসতে বললেন। আমি বসলাম। তিনি সিগারেট ধরালেন। বা! কত আরামের জায়গা। ওয়েটিং রুম থেকে আরো আরাম। স্বর্গের আরাম কি আরো বেশি? আমি ঐরকম স্বর্গ চাই না―এ রকম আরাম হলেই চলবে। সিগারেটে দুই-তিনটা টান দিয়ে এস্ট্রেতে ফেলে রাখলেন। আমি তার সামনের অপরূপ টেবিলটার দিকে তাকিয়ে আছি। আশে পাশে তাকাতে ইচ্ছে করছে। মানুষের তৈরি স্বর্গটা দেখতে ইচ্ছে করে। কিন্তু উচিত হবে না। চুপচাপ বসে রইলাম। আমার চোখে রাজ্যের ঘুম নেমে আসছে। দু’এক মিনিট অতিবাহিত হয়েছে। তিনি এবার দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন।
- কি নাম তোমার?
- শোভন মৃধা।
- কি কর?
- জ্বী, চাকুরি খুঁজছি।
- অবাক হয়েছ?
আমি মাথা নেড়ে হ্যাঁ সম্মতি দিলাম। উনি আমাকে একটা কার্ড দিলেন। ঠিকানা অনুযায়ী বিকালে যেতে বললেন। পরে উনি আলাপ করবেন। মিনিস্ট্রি-তে যাবেন বলে তার হাতে সময় নেই। কার্ডটা আমি না পড়েই পকেটে ঢুকালাম। তিনি উঠলেন। আমাকে নিয়েই বের হলেন। আমি মাথা নিচু করে তার পিছু পিছু হাঁটলাম। নিচে নেমে ড্রাইভারকে বললেন, আমি যেখানে যেতে চাই, সেখানে যেন নামিয়ে দেওয়া হয়। একটা গাড়িতে তিনি উঠলেন। তার সাথে পিছনের সীটে আরো দু’জন উঠল। বাকীরা আরেকটা গাড়িতে উঠল। না জানি, কয়টা গাড়ি তার । আমি আমার ভাইভা’র কথা বললাম। তিনি বললেন, ‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌এ চাকুরির দরকার নেই। এখানে চাকুরী হবে না। যার হবার তার হয়েই আছে। ভাইভা দেওয়া হল না। গাড়িতে উঠতেই আরেক শান্তি। এসি করা গাড়ী। ড্রাইভার আমার সাথে কোন কথা বলল না। আমি তার সায় শব্দ না পেয়ে কিছু জিজ্ঞাসা করিনি। কার্ডটা পড়লাম। ৬৬ নং কামাল আতাতুর্ক রোড, বনানী। নিশ্চয়ই ওখানে বাড়ি। আমাকে তার বাড়িতে যেতে বলল কেন? বেশ চিন্তায় পড়লাম।

ধারাবাহিক উপন্যাসঃ হৃদয়ের এপিঠ-ওপিঠ (পর্ব-২)

কথা অনুযায়ী বিকাল বেলায় তার বাসায় উপস্থিত হলাম। বিরাট এলাকা। চারদিকে গাছ আর গাছ। মাঝে দু’টি বড় দালান। আশে পাশে ছোটখাটো পাকা করা ঘরও আছে। আমি বসে আছি, নজরুল চৌধুরীর বাস ভবনের লনে। আমার এক পাশে নজরুল চৌধুরী, অন্য পাশে আরেক জন লোক আর আমার সম্মুখে গম্ভীর অথচ অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে একজন মহিলা। সম্ভবত মিসেস নজরুল হবে। পাশের লোকটি আমার তথা পুরো জড়ো পরিবেশটা পরিবর্তন করার জন্য আমার দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালেন।
- তোমার নাম কি?
-শোভন মৃধা।
- আব্বার নাম?
- মরহুম ফরহাদ মৃধা।
- কবে মারা গেছেন?
- ’৭৪-এ।
- কিভাবে?
- কে বা কারা যেন আব্বাকে রাতের বেলায় ধরে নিয়ে যায়। তারপর আর কোনদিন ফেরেননি।
--উনার লাশ...?
- পাইনি। অনেক খোঁজাখুঁজি হয়েছে।
- তোমরা কয় ভাই-বোন?
- দুই ভাই, বোন নেই।
- তোমার মা...
- মা নেই।
- তাহলে এতদিন কোথায়...?
- বাবা নিখোঁজ হবার পর তার এক বন্ধুর বাসায় আমরা দুই ভাই মানুষ হয়েছি। মা শোকে শোকে...
- তারপর?
- আর কিছু বলতে ইচ্ছে করছে না।
নজরুল চৌধুরী এতক্ষণ মনোযোগ দিয়ে সব শুনছিলেন। এবার দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মহিলার দিকে তাকালেন। মহিলার চোখ ছলছল করছে। তিনি মৃদু হাসলেন আমার দিকে তাকিয়ে। তারপর বলতে শুরু করলেন―
- তুমি আমার অফিসে চাকুরির জন্য গিয়েছিলে?
- জ্বী।
- চাকুরি করবে?
- অবশ্যই। দেড় বছর ধরে একটা চাকুরি খুঁজছি।

গাম্ভীর্যপূর্ণ মহিলাটি এবার আমার দিকে করুণ দৃষ্টিতে তাকালেন। তারপর প্রশ্ন করলেন, ‘তোমার বাবা মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন?’ মুক্তিযোদ্ধা! আমার বাবা, আমার বাবা ছিলেন। মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন কিনা সে আমি ভাবতেও চাই না―বলতেও চাইনা। আজকাল মুক্তিযোদ্ধা অনেকটা উপহাসের কার্টুনের মত। যেন, ওয়েস্টার্ণ সিরিজের কোন এক গ্রুপের সৈনিক যারা বিপক্ষ শক্তির সাথে বিজয়ী কিন্তু আপন স্বপক্ষের (বিভীষণ) শক্তির কাছে চরমভাবে পরাজিত। পত্রিকার পাতায় মাঝে মাঝেই মুক্তিযোদ্ধা, পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধা তথা মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের করুণ চিত্র দেখা যায়। আমি কোন কথা বললাম না। উনি তার নিজের কথা বলতে শুরু করলেন―
- আমার ভাইও যুদ্ধে মারা গেছেন। তাই বলছিলাম। তুমি কিছু মনে করো না। যুদ্ধে কেউ পক্ষে, কেউ বিপক্ষে থাকে। এটাই তো যুদ্ধের নিয়ম। মুক্তিযোদ্ধারা আমার ভাইটাকে দালাল মনে করে...

উনি থেমে গেলেন। উনি ভাবছেন, আমার বাবা তার ভাইয়ের মত ছিল। আমার প্রচণ্ড রাগ হলো। এখানে একটা চাকুরি মিললে মিলতেও পারে। বাবা মুক্তিযোদ্ধা হোক আর রাজাকার হোক তাতে আমার কিছুই আসে যায় না। যদি বলি বাবা কমরেড ছিলেন। উনারা হাসবেন। যদি বলি সিরাজ সিকদারের সর্বহারা পার্টি করতেন। তাহলে তিনজনেই হয়তো চেয়ারে বিশেষ ভঙ্গীত বসবেন--যেন এক্ষুণি ডাকাত আসবে। আমি মহিলার দিকে তাকিয়ে আবার চোখ টেবিলের দিকে রাখলাম।

নজরুল চৌধুরী হঠাৎ শশব্যস্ত হয়ে উঠলেন। চায়ের একটা কাপ আমার দিকে বাড়ালেন। আরেক কাপ দ্বিতীয় লোকটিকে দিলেন। যার নাম, আমি এখনও জানি না। নিজে এক কাপ নিলেন। মহিলাটি কিছু গ্রহণ করল না। এমনকি চায়ের কাপও না। ট্রেতে ও প্লেটে ফলমুল জাতীয় নানা খাবার কাজের মহিলা দিয়ে গেছে। স্বর্গ বাসিন্দা এই কোটিপতির সাথে আমি খাবার খাচ্ছি। ভাবতেই অবাক লাগে। মুখে খাবার নিলেও গলা দিয়ে সহজে নামতে চায় না। একটা ব্যাপার বেশ অবাক লাগলো। এরা দু’জন, কেউ মহিলাকে কিছু মুখে দিতে বলল না। মহিলা আমার বাবা তথা মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যাপারে মনে হয়, কিছু বলতে চেয়েছিলেন। নজরুল চৌধুরী বলে উঠলেন, ‘রাখ এসব ফালতু কথা।’

হ্যাঁ, ফালতু কথা। এখন, এটা একটা ফালতু ব্যাপারই বটে। মুক্তিযুদ্ধ আমিই মেনে নিতে চাই না ভুক্তভোগী হয়েও, আর সেখানে উনারা...। আমি মুক্তিযুদ্ধের চেয়ে আমার বাবাকে, আমার মাকে বড় মনে করি। আমার ভালবাসা আল্পনাকে বড় মনে করি। মুক্তিযুদ্ধ আমাদের সংসার, আমাদের জীবন, আমাদের ভালোবাসা--সবকিছু ছিন্ন-ভিন্ন করে দিয়েছে। জাতীয় স্বার্থ দেখার মত মন-মানসিকতা যেটুকু ছিল তাও বিলীন হতে হতে একেবারে চৈত্র মাসের রৌদ্র তাপে শুকিয়ে যাওয়া পুকুরের তলায় ঠেকে গেছে। যেখানে আমার তথা আমাদের এ অবস্থা--যেখানে আমি না খেয়ে মরে গেলেও কেউ এক মুঠো খাবার দিয়ে সাহায্য করে না― সেখানে অন্য মানুষ কি অবস্থায় আছে―তারা কি করে বা করল―তা জানার সামান্য আগ্রহও আমার নেই। প্রতিহিংসা বলতে আমার মনে কিছু নেই। স্বার্থপর? হ্যাঁ, স্বার্থপর। আমার মতো অবস্থায় পড়লে বুলি আওড়ানো, মঞ্চ কাঁপানো বক্তারাও বুঝত, মা-বাবা হারানোর ব্যথা কত গভীর, কত জ্বালাময়। দশ বছরের তিলে তিলে গড়ে তোলা গভীর প্রেম বিসর্জন দেওয়া কত কষ্টের! আমাকে সবকিছুই মেনে নিতে হয়েছে। এখন আমার কোন লক্ষ্য নেই। জীবন যেদিকে চলে―চলুক না।

সবাই কেন জানি, চুপচাপ হয়ে আছে। আমি কি বলব―তাও ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না। হঠাৎ দোতলা থেকে প্রচণ্ড একটা শব্দ কানে ভেসে এলো। কিছু একটা ভেঙ্গেছে মনে হয়। গ্রীল দেওয়া দোতলার বারান্দার দিকে তাকালাম। দোতলার দরজাটা খোলা। মূল স্থানে শব্দটা যে আরো জোরালো হয়েছে―এ ব্যাপারে আমি নিশ্চিত। অথচ তিন জনের কেউ সেদিকে ফিরেও তাকাল না। টু শব্দটিও করল না। মনে হয়, উনারা যেন জানেন, দোতলায় কি হয়েছে। খোলা দরজা দিয়ে সালোয়ার-কামিজ পরিহিতা একটা মেয়ে বারান্দায় এলো। গ্রীল ধরে দাঁড়াল। আমরা দোতলা থেকে মনে হয়, পঞ্চাশ গজ দূরে। মোটামুটি পরিস্কার সব দেখা যাচ্ছে। তাকালাম মেয়েটির দিকে। কিশোরী ও যুবতীর মাঝামাঝি মনে হয়। বেশ রাগান্বিত। এই মুহুর্তে ভেঙ্গে যাওয়া ঘটনার সাথে সে জড়িত বলে মনে হচ্ছে। বারবার মাথায় হাত দিচ্ছে। এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে। এক স্থানে স্থির থাকতে পারে না। শিশুর মতো বায়না ধরে গুনগুন করে কি যেন চাইছে। একজন মহিলা দরজা দিয়ে তার কাছে আসল; হাতে এক গ্লাস পানি ও ঔষধ মনে হচ্ছে। মেয়েটি জোর করে গ্লাসটা নিজের হাতে নিয়ে গ্রীলের ফাঁক দিয়ে নিচে ফেলে দিল। আমি তিন জনের দিকে তাকালাম। একই অবস্থায় আছে। মেয়েটি হঠাৎ আমার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। আমিও তাকিয়ে রইলাম। তারপর তিন জনের দিকে তাকিয়ে দেখি, উনারা একবার আমার দিকে, একবার মেয়েটির দিকে তাকাচ্ছে এবং বেশ আগ্রহ দৃষ্টি নিয়ে। কিছুক্ষণ আগের উত্তেজিত মেয়েটি আমার দিকে তাকিয়ে একেবারে স্থির হয়ে আছে। যেন, কি সে দেখেছে। আমি ঢোক গিললাম। একটু ভয়ও পেলাম। মহিলাটি বেশ খুশী ভঙ্গীতে ব্যাপারটা পর্যবেক্ষণ করছে। ব্যাপারটা কিছুই বুঝে উঠতে পারিছ না। এখন আমার কি করণীয়―তাও ভাবতে পারছি না। আমি কি উঠে দাঁড়াব? চলে যাব? নাকি বলব, আজ আসি? কিছুই ভাবতে পারছি না। একজন কোটিপতির সামনে অনুমতি না নিয়ে দাঁড়িয়ে যাওয়াটা ঠিক হবে না। চাকুরির লোভটা আমাকে যেন চেয়ারের সাথে বেঁধে ফেলেছে। বি.এ পাস করে দেড় বছর ধরে চাকুরির পিছনে ঘুরছি―কোথাও চাকুরি পাচ্ছি না। সাধারণ একটা পিয়নের চাকুরিও মামা-কাকা ছাড়া হয় না। আমি মাথা নিচু করে রইলাম। মহিলাটি তার মেয়েকে ডাকছে, ‘আয় মা--আয়--।’

মহিলার চোখে জল। সে তা আঁচল দিয়ে মুছে আবার ডাকল। আমি বিহ্বল দৃষ্টিতে আবার তাকালাম। বেশ সুন্দরী। তবে রোগারোগা ভাব। অনেকটা নেশাগ্রস্ত রোগীর মত। মেয়েটি গ্রীল ভেঙ্গে লাফ দিয়ে আসতে চাইছে। দ্বিতীয় লোকটি হাতের ইঙ্গিতে কি যেন বোঝাল। মেয়েটি দরজা দিয়ে আবার চলে গেল। এতক্ষণে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লাম। একটা নাটকীয় অবস্থা হতে যেন মুক্তি পেলাম। দ্বিতীয় লোকটি বাসার দিকে তাকিয়ে আছে। তবে কি মেয়েটি এ পথে আসবে? মাত্র এক মিনিটের ব্যবধানে হঠাৎ মেয়েটি নিচতলা থেকে দৌড়ে এলো আমাদের সামনে। লোকটি মেয়েটির হাত ধরল; সে ঝাড়া দিল। কপাল ছুঁয়ে দেখল, জ্বর আছে কিনা। মেয়েটি এক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। কেউ কিছু বলছে না। সবাই যার যার আসনে চুপচাপ বসে আছে। আমার হৃৎস্পন্দন বেড়ে গেছে। সবাই রহস্যময় কিছু আবিষ্কারের আশায় আমার আর মেয়েটির দিকে তাকাচ্ছে। মেয়েটির চোখের জল দু’গাল বেয়ে ঝরছে। এলোমেলো চুল। এবার স্পষ্ট তাকে রোগী মনে হলো। পাগল পাগলও মনে হচ্ছে; নতুবা এই বয়েসী একটা মেয়ে এমন করে। পঞ্চাশ গজ দূরে তাকে যে রকম মনে করেছিলাম, কাছে আসার পর তাকে আরো সুন্দরী মনে হচ্ছে। যেমনি চেহারা--তেমনি গায়ের রং। তবে বেশ রোগা-রোগা। মুখমণ্ডল থেকে নিচের দিকে তাকাতেই ‘ফ্রান্সিস―’ বলে এমন জোরে চিৎকার করে উঠল যে, আমি ভয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালাম। ভয়ে হাত-পা সহ সমস্ত দেহ কাঁপতে শুরু করেছে। সে চিৎকার দিয়েই আমাকে জড়িয়ে ধরল। তিন জনে টিভির পর্দায় ভালো একটা ছবি যেন উপভোগ করছে। দ্বিতীয় ব্যক্তিটি খুশি খুশি ভাব নিয়ে বত্রিশ দাঁত বের করে হা করে তাকিয়ে আছে। নজরুল চৌধুরী ব্যবসায়ী ভঙ্গীতে ছোটখাটো ব্যবসায়ীর জয়-পরাজয়ের দৃশ্য দেখছে। মহিলাটি খুশিতে কাঁদতে শুরু করেছে। মেয়েটি খুব বেশি হলে তিরিশ সেকেণ্ডের মত আমাকে জড়িয়ে ধরেছিল। সে যে কোন নারী, এ যেন তার চিন্তায় ছিল না। কেন সে আমাকে জড়িয়ে ধরল? বুঝে না উঠতেই সে আমার হাতের তালু দিয়ে তার মুখমণ্ডল ঘষতে শুরু করল। একবারে উন্মাদের মত। তারপর হঠাৎ আমাকে ধাক্কা দিল। আমি পাকা গ্রাউণ্ডে পড়ে গেলাম। মনে হলো, সে যা চেয়েছিল--তা পেল না। দ্বিতীয় ব্যক্তি মেয়েটিকে ধরল। আদর করতে লাগল। সে ব্যক্তিকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে কেঁদে কি যেন বলতে লাগল। দু’একটা লাইন আমি ভালোভাবে বুঝতে পারলাম―“আংকেল, আই ওয়ান্ট ফ্রান্সিস, প্লিজ ফ্রান্সিসকে এনে দাও...। ”

ফ্রান্সিস কে? আমি বুঝতে পারলাম না। তবে কিছুটা অনুমান করতে পারলাম। মনে হয়, প্রেম ঘটিত ব্যাপার। অবশ্য এটা নাও হতে পারে। নজরুল চৌধুরী ও মহিলা মেয়েটিকে ধরতেই সে কামড় বসাতে চাইল। মনে হয়, ঘটনা বেশ বড়। এখনো আমি স্পষ্ট কিছু জানি না। এই যে এত মানুষ পৃথিবীতে, সবার জীবনে কত ঘটনাই থাকে। দুঃখ-কষ্ট, সুখ-শান্তি নিয়েই মানুষের জীবন। কখনো বড় কোন দুঃখ মানুষকে তেমন ক্ষতি করতে পারে না। আবার কখনো ছোট কোন দুঃখ মানুষকে এমন পথে চালিত করে, যে পথ থেকে সে কখনো ফিরে আসতে পারে না। তাদের দুঃখ ছোট না বড়―তা আমি জানি না। তবে কোন ব্যক্তির একেবারে মরে যাওয়ার চেয়ে জীবন্মৃত হয়ে থাকা অনেক কষ্টের, অনেক যন্ত্রণার।

লোকটি মেয়েটিকে জোর করে বাসায় নিয়ে যাচ্ছে। আমি হতবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছি। আমি পাকা লন থেকে উঠে দাঁড়িয়েছি। মেয়েটি কয়েকবার পিছন ফিরে আমার দিকে তাকাল। তারপর বাসার ভিতরে অদৃশ্য হলো। কিছুক্ষণ সবাই নিরব হয়ে রইল। দু’জনে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে চেয়ারে বসলেন। আমাকেও বসতে বললেন। লোকটি ফিরে এসে জানাল, টিভিটা ভেঙে ফেলেছে। সে ইনজেকশন দিয়ে এসেছে। কিছুক্ষণের মধ্যে ঘুমিয়ে যাবে। এতক্ষণে নিশ্চিত হলাম, উনি একজন ডাক্তার। লোকটি চেয়ারে বসল।

হঠাৎ একটা কুকুরের ঘেউ ঘেউ শব্দ আমার পিছন দিক থেকে গর্জে উঠল। এই শব্দ আমার জীবনে শোনা কোন কুকুরের নয়; বুঝতে পালাম, বিদেশি জাতের কুকুর। এতক্ষণ মনে হয়, ঘুমিয়ে ছিল। শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে। আমার চেয়ার থেকে চৌদ্দ-পনর গজ দূরে ছিল। এতক্ষণ খেয়াল করিনি। তার চাহনীর ভঙ্গী ভয়ঙ্কর। অনেকটা বাঘের মত। সারা শরীর লম্বা লম্বা পশমে ভরা। মুখ ঘুরিয়ে ডাক্তারের দিকে তাকালাম। তিনি বললেন, ‘তুমি কিছু মনে কর না। ও একজন মেন্টাল পেসেন্ট।’ নজরুল চৌধুরী বলে উঠলেন, ‘থাক, আজ থাক, তুমি কাল এসো। আজ আমারই ভালো লাগছে না।’

নজরুল চৌধুরীকে বেশ ক্লান্ত লাগছে। তিনি ডাক্তারকে কিছু বলতে দিলেন না। আর আমার কাছে বলবেনই বা কেন? আমি তাদের কি উপকারে আসতে পারি? মহিলাটি আজই ব্যাপারটা বলার জন্য আগ্রহ দেখালেও, পরে থেমে গেল। ডাক্তার আমারে কাঁধে হাত রেখে বলল, “ইচ্ছে করে এতক্ষণ পরিচিত হইনি। আমি একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ এবং ঐ যে মেয়েটিকে দেখলে―তার মামা। এ আমার বড় আপা, দুলাভাই। মেয়েটি তাদের একমাত্র সন্তান। এ বংশের প্রদ্বীপ ও উত্তরাধিকারিণী। তোমাকে তোমার চাকুরি সম্পর্কে কিছু বলব না। তুমি কাল এসো, ঠিক এ সময়ে।”

একটা চাকুরি, কি চাকুরি―আমি জানি না। তারা আজ কিছু বলতেও চাইছে না। গোলক ধাঁধাঁর মধ্যে পড়ে গেলাম। মেয়েটি আমাকে জড়িয়ে ধরল। কিন্তু কেন? আমাকে তো তার চেনার কথা না। সে মেন্টাল পেসেন্ট। অতএব পাগলে কিনা করে--ছাগলে কিনা খায়। এ নিয়ে ভাবা বোকামী মাত্র। আমি সালাম দিয়ে আমার পথ মাপতে শুরু করলাম। সামনে একটা গাড়ি। ড্রাইভার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। আমাকে যেতে দেখেই গাড়িতে উঠতে বলল। আমি ড্রাইভারের দিকে তাকালাম। তারপর পিছন ফিরে তাদের দিকে তাকালাম। আপত্তি সত্ত্বেও মহিলার কথা মত গাড়িতে উঠতে হল। ড্রাইভারকে সে ডেকে কি যেন, বুঝিয়ে দিল।

ধারাবাহিক উপন্যাসঃ হৃদয়ের এপিঠ-ওপিঠ (পর্ব-৩)

গোপীবাগের এক ছোট্ট ভাড়া করা বাসায় আমি থাকি, সাথে আরেক জন চাকুরিজীবী বন্ধু থাকে। ছোট ভাইটা ঢাকা কলেজে পড়ে, কলেজ হোস্টেলেই থাকে। ও নিজে টিউশনি করে। সে টাকায় ওর খরচ চলে না। আমি মাঝে মাঝেই কিছু টাকা ওকে দেই। গাড়ি আমার নির্দেশ মত গোপীবাগের প্রথম লেনে আসতেই থামতে বললাম। সে গাড়িটা রাস্তার একপাশে থামিয়ে আমার সাথে চলতে শুরু করল ।
- স্যার, বিবি সাব আপনের বাসাটা চিনে যাইতে কইছে।
- ও, আচ্ছা আসুন আমার সাথে।
আমি বুঝতে পারলাম, আমাকে তাদের প্রয়োজনে ডাকার সম্ভাবনা আছে। আমি কথা না বাড়িয়ে ড্রাইভারকে আমার রুমে নিয়ে আসলাম। তার কাছ থেকে জানতে পারলাম, নজরুল চৌধুরী বিরাট ব্যবসায়ী। মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকায় তার তিনটে অফিস। একটা জাহাজ ও মালামাল সংক্রান্ত ব্যবসা, একটা ট্রাভেলস্ সংক্রান্ত ব্যবসা এবং অন্যটি রপ্তানি ও আমদানিমূলক ব্যবসা। তার প্রাইভেট গাড়ির সংখ্যা ও বাড়ির সংখ্যা ড্রাইভার নিজেও জানে না। তবে তার ধারণা আট-নয়টা প্রাইভেট কার আছে। দেশে বাড়ির সংখ্যা ও দোকানের সংখ্যা দুইশত পঞ্চাশটারও বেশি হবে। বিদেশেও বাড়ি আছে। আমার আর শুনতে ইচ্ছে করল না। আমার জীবন যেখানে ক্ষুধার রাজ্যে গদ্যময়, সেখানে এসব রূঢ় বাস্তব গল্প শোনা মানে বিস্মিত হওয়া ছাড়া আর কিছু নয়। নজরুল চৌধুরীর মত আরো অনেক আছে এদেশে। পাকিস্তান আমলে নাকি বাইশ পরিবারের কাছে এদেশ জিম্মি ছিল। বর্তমানে কয় শত বা কয় হাজার পরিবারের কাছে জিম্মি―তা পর্যবেক্ষণ করলেও সঠিক তথ্য পাওয়া যাবে না। আমি ড্রাইভারকে মেয়েটি সম্পর্কে প্রশ্ন করতেই সে চমকে উঠল।
- হায়! হায়! এতক্ষণ আমি কি বললাম!
-কেন কি হয়েছে?
- আপনি কোন প্রশ্ন করলে উত্তর দেওয়া নিষেধ ছিল।
- কেন?
- জানি না। তয় কারণ নিশ্চয়ই আছে।
আসার সময় মহিলা মানে মিসেস নজরুল চৌধুরী তাকে কোন কিছু বলতেও নিষেধ করেছে। কিন্তু ব্যাপারটা কি? ড্রাইভার চলে গেল। চা খাওয়ার কথাও বলা হল না। চা খাওয়া আর না খাওয়া--অন্ততঃ বলাটা সৌজন্যতা। কিন্তু ড্রাইভারকে খাওয়ানোর সৌজন্যতা আমার মনে আসেনি। মানুষ সব সময় তার চেয়ে অপেক্ষকৃত ছোট লেভেলের মানুষকে সৌজন্যতা দেখাতে চায় না, যদি সেখানে স্বার্থ না থাকে। ড্রাইভার আর আমি অবশ্য সমান স্তরেরই। শিক্ষা ও ভাষাগত কারণে হয়তো সে নিচু কিন্তু তার চাকুরি আছে, আমার তাও নেই। তবুও তাকে ছোটই মনে হল। ড্রাইভার যদি অনেক সময় গল্প করত, তবে তাকে কিছু না কিছু খাওয়ানো হত। অনেকক্ষণ গল্প করলে অন্ততঃ চা, সিগারেট পান করার কথা মনে পড়ে।

বিছানায় শুয়ে পড়লাম। খাওয়ার কথা এতক্ষণ ভুলেই ছিলাম। ক্ষুধা জিনিসটা বেশ বুদ্ধিমান। এই ভাবনার সময়ে তার উদয় হওয়া উচিত নয়―সে হয়তো বুঝতে পেরেছে। তবে শরীরটা বেশ দুর্বল লাগছিল। ভাবতে চাই না ঘটে যাওয়া ঘটনাকে। তবুও এসে পড়ে, আসে। মুরাদের আসার কথা ছিল। এসেছে কিনা জানি না। হাত ঘড়ির কথা এতক্ষণ মনেই ছিল না। তাকিয়ে দেখি, সাড়ে সাতটা বেজে গেছে। টেবিলের উপর ঘড়িটা রাখতেই দেখি, একটা সাদা কাগজ ভাঁজ করা। খুলে দেখি মুরাদ লিখে গেছে ‘পরীক্ষা সামনে, ফর্ম ফিলাপ করতে হবে। এক হাজার টাকা লাগবে।’ ট্রাংকে খুব বেশি হলে তিনশত টাকা আছে। কয় তারিখের মধ্যে টাকাটা লাগবে, তাও লিখে যায়নি। পাতিলের দিকে তাকালাম। হ্যাঁ, বুয়া ভাত রান্না করে দিয়ে গেছে। আলু ভর্তা আর ডিম। দুইটার দিকে ভাত খেয়েছি। ক্ষুধাতো লাগবেই। নজরুল চৌধুরীর লনে এককাপ চা আর এক টুকরো ফল মুখে দিয়েছিলাম। কারো বাসায় নতুন আসলে একটু খাবার মুখে দিয়ে সৌজন্যতা দেখাতে হয়। বেশি খেতে নেই। গৃহকর্ত্রী-গৃহকর্তা আনকালচার ধারণা পোষণ করতে পারে। কোনমতে আলু ভর্তা, ডিম দিয়ে ভাত খেয়ে শুয়ে পড়লাম। মেয়েটির চেহারা চোখের পর্দায় ভেসে উঠল। সাথে সাথে আল্পনার চেহারাও। চোখের দুই মেরুতে দু’জন। একজন মেন্টাল পেসেন্ট―সে কখনো কেঁদে, কখনও হেসে আমার দিকে আসছে। অন্য জন কিশোরী থেকে বধূ হয়ে ক্রমাগত অদৃশ্য জগতে মিশে যাচ্ছে। আল্পনা...। সারাটা দেহ অসার হয়ে উঠল। দশ বছরের প্রেম। বিয়ের দৃশ্যটা চোখে ভাসলেই রাগে, ক্ষোভে, ঘৃণায় চোখ-মুখ লাল হয়ে উঠে। একটা ’৭১ আমাদের পুরো সংসার, আমাদের জীবন তছনছ করে দিয়েছে। এতিম হওয়ার পর থেকে ধুকে ধুকে মরতে মরতে জীবন্ত লাশ হয়ে বেঁচে আছি। মানুষের সবচেয়ে বড় শাস্তি হলো শান্তি থেকে বিচ্যুত হওয়া; আমি সেই অশান্তির মধ্যে নিমজ্জমান।

আমি ভুলে যেতে চাই, যা কিছু অতীত―ভুলে যেতে চাই ’৭১,’৭৪। ভুলে যেতে চাই মা-বাবাকে। ভুলে যেতে চাই আল্পনাকে। কিন্তু পারি না। মনে হয়, একটা বিশাল আকৃতির বেলুনকে চাপ দিচ্ছি। ফলে আরো প্রবল বেগে পানি ঝরছে। ছিদ্রের সংখ্যা আরো বাড়ছে। না, আমি এই বেলুনটাকে আর চাপ দেব না। এভাবেই পানি পড়তে থাক। এক সময় নিশ্চয় খালি হবে। কবে হবে জানি না। হৃদয়ের উপর চাপ দেওয়া বোকামী। মানুষের জীবনে এমন কিছু স্মৃতি থাকে, যা সে কখনও ভুলতে পারে না। আমিও পারব না। উপমা দিয়ে হৃদয়কে বোঝানা যায় না। কন্ট্রোল করতে গেলেও সমস্যা। হে আল্লাহ, যদি কষ্টই দিয়েছ―তবে তা বহিবার শক্তি দাও। যে মানুষ অন্য মানুষকে উপদেশ দেয়, সে নিজেও সেই সব উপদেশ মানতে পারে না। আমি অনেককে বোঝাই, যুক্তি দেখাই, অথচ নিজে বুঝতে চাই না―বুঝি না।

আমার রুমমেট সেলিম, আজ আর রুমে আসবে না। গতকাল বলে গেছে। কোথায় তার বন্ধুর বিয়ে হচ্ছে, সেখানে দু’দিন থাকতে হবে। রুমে শুধু আমি একা। ‘আমি বাঁচতে চাই’ উপন্যাসের শেষ অংশটা লিখতে ইচ্ছে করছে কিন্তু যে আগুন আর বরফ মিশ্রিত ভাষা দিয়ে লিখতে চাই―সে ভাষা এখনো হৃদয়ে আসে নাই। আমি আমার রক্ত দিয়ে, সূর্যের চোখের জলে প্লাবিত করে উপসংহার টানতে চাই―পারি না। শত চেষ্টা করেও পারি না। একটা কবিতা লিখব বলে ভাবলাম। কিন্তু হায়! শুরু হয় চিঠির মত; না হয় ছন্দ কবিতা, না হয় গদ্য কবিতা। এ যে বেদনার আত্মবিলাপ। রক্ত নদীর মোহনায় দাঁড়িয়ে হৃদয়ের বিস্ফোরিত কণ্ঠস্বর শুনি। এই মিলন মোহনায় দাঁড়িয়ে কি করে বিচ্ছেদ ঘটাব অনুপম আর কল্পনার শাশ্বত ধারার প্রেম। লেখা সামান্য এগোতেই সেই আল্পনা আর আল্পনা...। এখন আবার যুক্ত হয়েছে মানসিক রোগী। সন্ধ্যায় একটা টিউশনি আছে। এক হিন্দু মেয়েকে পড়াই। ভিকারুন্নেসা স্কুলের দশম শ্রেণির ছাত্রী--নাম সিঁদুর। দুই মাসও হয়নি অথচ মেয়েটি বলে আমি তার এক শত বছরের চেনা। অলরেডী সে আমাকে একটা কবিতাও লিখে দিয়েছে। বলেছে, কেমন হয়েছে বলবেন? কবিতাটি এরকম―
“আমাকে একটু ভালোবাসা দেবে?
এক টুকরো লাল ফিতের মতো ভালোবাসা।
কি বললে ! তোমার কাছে ভালোবাসা নেই?
আমি হচকিত হয়ে পাহাড়ের কাছে ছুঁটলাম
পাহাড়কে শুধালাম, পাহাড়, আমাকে একটু ভালোবাসা দেবে
অতি দূর নক্ষত্র থেকে ছুটে আসা
আমি এক শুষ্ক মরুভূমি
যার বুকে ভালোবাসার এক ফোঁটা জল নেই...। ”

এরকম কবিতা ভালো না বলে উপায় আছে? সে নিশ্চয় চেয়েছে, আমি কবিতাটি খুব ভালো বলি। আমি নিশ্চয় ভালো বলব। খারাপ হলেও ভালো বলতাম। কারন কবি চান তার কবিতা পাঠক ভালো বলুক। অন্ততঃপক্ষে সবাই একটা ধন্যবাদের আশা করে। আমি সিঁদুরকে নিশ্চয়ই ধন্যবাদ জানাব। আমিও কবিতা লিখি, তবে তা খুব বেশি হলে তিন-চার দিন থাকে। কখনও লিখি আর ছিঁড়ে ফেলি। কখনও কবিতাগুলি আহত হয়ে বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকে। কিন্তু উপন্যাস, গল্পগুলি যত্ন করে রেখে দিই। কেন? জানি না। কবিতা ভালো লাগে না; লাগলেও দু’একটা ভালো লাগে। তাও বেশী দিন নয়। সিঁদুর কবিতা লিখে। তার ভালো লাগা যেমন আপেক্ষিক, ভালো লাগার সময়টাও আপেক্ষিক।

ধারাবাহিক উপন্যাসঃ হৃদয়ের এপিঠ-ওপিঠ (পর্ব-৪)
--শাশ্বত স্বপন

সিঁদুর কেন আমাকে কবিতা দিল? এডভান্স চিন্তা-ভাবনা করে কোন লাভ নেই। কোন ছেলেকে হয়তো সে ভালোবাসে অথবা ভালোবাসতে চায় এবং তাকে হয়তো কবিতাটা দেবে। আমাকে দিয়ে হয়তো রিহার্সাল করিয়ে নিচ্ছে। মাথাটা কেন জানি ঘুরছে। বিছানায় কিছুক্ষণ শুয়ে রইলাম। যন্ত্রণাটা কমতেই আবার স্মৃতিতে এলো সেই মেয়েটার ছবি। ভাবতে শুরু করেছি, কেন সে এমন হলো? তার নাম কি? কবে এমন হয়েছে?

এই পর্যন্ত যে কয়টা ভালোবাসা এসেছে--তার মধ্যে একটা বাদে সব কয়টাই বেশ জমে উঠতেই ভেঙ্গে পড়ে। যখন জানতে পারে, মুক্তিযোদ্ধা বাবাকে ’৭৪-এ কে বা কারা হত্যা করেছে, তখন তারা আফসোস করে। যখন জানতে পারে, সম্পদ বলতে আমার তথা আমাদের কিছু নেই। তখন আমার প্রেমে বিভোর নায়িকারা পাশ কাটতে কাটতে এমন সব কাজ করে বসে, যা দেখে আমাকেই ঘৃণা করতে হয়। আই.এ. সেকেণ্ড ইয়ার-এ থাকাকালীন সময়ে ফাস্ট ইয়ার--এর এক ছাত্রীর সাথে বেশ জমে উঠেছিল। ওর নাম ফাহমিদা হালিম (বিথী)। ওকে আমার ভালো লাগার প্রথম কারণ, ওর আচার-আচরণ অনেকটা আল্পনার মত। দ্বিতীয় কারণ, সে নিজেই আমাকে অফার দিয়েছে এবং খুব একটা পাত্তা দেইনি বলে কলেজে আমার সাথে সারাক্ষণ জোঁকের মত লেগে থাকত। তখন আমার সার্টিফিকেট বয়স উনিশ হলেও আসল বয়স বাইশ বছর। আমি অনেকটা ইচ্ছে করেই আমার ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে তেমন কিছু ওকে বলিনি। সে আমাকে এতটাই ভালোবেসেছিল যে একদিন না দেখলে কেঁদে কেঁদে বাড়ি ফিরত। একবার, ক্রমাগত দশ দিন না পেয়ে এগার দিনের দিন তার দেহ সর্বস্ব দিয়ে আমাকে এমনভাবে উত্তেজিত করেছিল যে, ইচ্ছে করলে আমি তার সারা দেহ ভোগ করতে পারতাম। সে নিজেই তার পোষাক খুলে ফেলেছিল কিন্তু আমি পারিনি। আল্পনাকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে মুহূর্তের মধ্যে আমার বিবেক আমাকে আবেগ শূন্য করে ফেলল। বীথি সেদিন অবাক হয়ে গেল আমার চূড়ান্ত মুহূর্তের অবস্থা দেখে। আমি সেদিন বলেছিলাম, ‘বীথি, আমার হৃদয় বাসরে তোমাকে চিরস্থায়ীভাবে না শুইয়ে আমি তোমাকে...কখনও না। আমি তোমার মঙ্গল চাই। সমাজে তুমি কলঙ্কিত হও--আমি তা কখনও চাই না। এই মুহূর্তের স্বর্গীয় সুখ তোমার জীবনে বয়ে আনতে পারে নরকের জ্বালা।’ সেদিন সে প্রচণ্ড অবাক হয়ে গিয়েছিল। তারপর থেকে আরো প্রেম, আরো ভালোবাসায় সে আমাকে নিমজ্জিত করে ফেলল। আমাকে সে সকল পুরুষ থেকে শ্রেষ্ঠ পুরুষদের দলের একজন ভাবতে লাগল।

অনেকদিন পর যখন বীথি জানতে পারল, আমরা দু’ভাই এবং দু’জনেই বাবার এক বন্ধু, ইকবাল চাচার বাড়িতে আশ্রিত তখন থেকেই সে কেটে পড়তে শুরু করল। আমিও বুঝতে পারছি। ভালোবাসা করতে সার্টিফিকেট, জমি, টাকা, ঘর ইত্যাদি লাগে না। লাগে সময়, হৃদয় আর দেহ। কিন্তু বিয়ে করতে হলে ঘর লাগে, টাকা লাগে, হাড়ি-পাতিল, জগ-গ্লাস--সব লাগে। বিয়ে করা যে আমাকে উচিত নয়--সে কথা ভেবেই হয়তো সে কেটে পড়তে চাইছে। বীথিকে আমি মন-প্রাণ দিয়ে ভালোবাসতে কখনও পারিনি। তাকে দেখেছি আমার আল্পনার বিকল্প রূপে। এক আল্পনা ছাড়া দ্বিতীয় কাউকে মনপ্রাণ দিয়ে ভালোবেসেছিলাম কিনা সন্দেহ। যে হৃদয় আসনে চিরস্থায়ী দলিলপত্র দিয়ে আল্পনাকে বসিয়েছি, সেখানে কি অন্য কাউকে বসানো যায়? একই জমি দু’বার দু’জনের কাছে বিক্রি করা যায় না।

আরেক দিন, আমার টেস্ট পরীক্ষার ঠিক আগে, বীথি আমার পা ধরে কেঁদে কেঁদে বলল--“হয় তুমি আমাকে বিয়ে কর, নয় আমি আত্মহত্যা করব। বাবা-মা আমাকে অন্য এক ছেলের সাথে খুব শীঘ্রই বিয়ে দিতে চায়।” তার সাথে কথা হয়েছিল, দু’জনে পড়ব। আমি বি.এ পাস করে ছোট-খাটো একটা চাকুরি নিয়ে তাকে বিয়ে করব। অথচ সে সেকেণ্ড ইয়ার-এ উঠেই বিয়ের ভান শুরু করল। আমি তাকে অনেক বুঝলাম। আমার সাথে আরো চার-পাঁচ জন বন্ধু ছিল। ওকে বুঝাতে বুঝাতে একটা কাজী অফিসের সামনে এসেছি। সে আমাকে দোষারোপ করতে শুরু করল। আমাকে কাপুরুষ, ছোটলোক ইত্যাদি গালি-গালাজ করতে লাগল। আমি সহ্য করতে না পেরে রাগে, ক্ষোভে কাজী অফিসে ওকে নিয়ে জোর করে ঢুকলাম। কাজী তখন ছিল না। বন্ধুদের বললাম কাজী ডাকতে। এখন শুরু হলো উল্টো কান্না। বলতে শুরু করল, তার বাবা আমাকে ও তাকে খুন করে ফেলবে। তার মামারা খুব রাগী। সে কথা দিল আগামীকাল জামা-কাপড় নিয়ে তাদের বাড়ি ছেড়ে চলে আসবে। আমার বন্ধুরা বিশ্বাস করলেও, আমি করিনি। তারপর দিন সেতো আসেইনি, আত্মহত্যার কোন খবরও শুনিনি। শুনেছি এক ডাক্তার ছেলের সাথে তার বিয়ে হয়ে গেছে। ছেলেটির সাথে তার অনেক আগে থেকেই প্রেম ছিল। ছেলেটি তার খালাত ভাই। সুন্দরী মেয়ে। খালাত ভাই বিয়ে তো করবেই। আমার চিন্তা ছিল একটাই, সে কি আমাকে ভালোবাসত নাকি খালাত ভাইকে, নাকি দু’জনকেই? আজকাল ছেলে মেয়েরা একজনের উপর পুরোপুরি নির্ভর করতে পারে না। কারণ প্রেমের দুর্ঘটনা নাইনটি পার্সেন্ট। তাই একেক জন কমপক্ষে পাঁচজনের সাথে হট কালেকশন রাখে। কিন্তু আমি তো একজনকে হারিয়ে আরেক জনের মাঝে আল্পনাকে খুঁজি। অন্য কাউকে কেন ভালবাসতে পারি না? আমি জানি, যদি আমি কাউকে বিয়ে করি, সে হবে আমার ওয়াইফ, শুধুই ওয়াইফ। ভালোবাসার মানুষ পড়ে থাকবে ঐ দিগন্তে--যাকে মনে হবে, পাব কিন্তু বাস্তবে তা দুঃস্বপ্নের বালু তীরেই রয়ে যাবে।

ডিগ্রী কোর্সে ভর্তি হবার পর লেখক, কবি, গীতিকার, সুরকার, গায়ক নানা উপাধীতে আমাকে ডাকা হত, কেউ কেউ ব্যঙ্গও করত। আই,এ দ্বিতীয় বর্ষ থেকে সংস্কৃতি চর্চা করলেও ডিগ্রী কোর্সে ভর্তি হবার পর থেকে আমার মেধা পরিচিতি কলেজ গন্ডি পেরিয়ে জেলা সদর পর্যন্ত পৌঁছে যায়। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে, নানান সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে আমাকে গান, কবিতা--কিছু না কিছু পারফর্ম করতে হত। ২৬ মার্চ, ১৬ ডিসেম্বর বা কোন গুরুত্বপূর্ণ সময়ে আমার নেতৃত্বে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও হত। ধান ভানতে শিবের গীত গাইতে শুরু করেছি। যাই হোক, প্রায় এক বছর পর কলেজের এক অনুষ্ঠানে বীথি তার স্বামীকে নিয়ে এসেছিল। পরিচিত এক ছোট ভাইয়ের কাছ থেকে শুনলাম, সে নাকি আবার ভর্তি হয়েছে। আমাকে সে দেখে এমন ভান করল, যেন, সে আমাকে চিনেই না। বেশ মোটা হয়ে গেছে। এই এক বছরে তার বয়স যেন পাঁচ বছর বেড়ে গেছে। বন্ধুদের অনুরোধে আমার নিজের লেখা গানটা গাইলাম। যে গানটা জেল থেকে ফিরে আল্পনাকে শুনিয়েছিলাম। কিন্তু কথা আর হয়নি। সে চিরতরে কোলকাতা চলে গেছে। গান গাইতে শুরু করলাম--
“শুনেছি তোমার জীবন নাকি আলোয় ভরা
আমারও তো হৃদয় ছিল,
হৃদয় জুড়ে প্রেম ছিল,
সবি তো তুষের আগুনে জ্বালিয়েছি।
একদিন আমার সব ছিল
গান ছিল, সুর ছিল, প্রেমও ছিল
আজ কিছু আর নেই, কিছু আর নেই
সবিতো জ্বালিয়েছি, সবিতো হারিয়েছি...।”

বন্ধুরা সব অবাক। কারো মনেই হলো না, এই সেই মেয়ে! তার সামান্য পরিবর্তন নেই। স্বামীর পাশে কত সুখেই সে বসে আছে। কলেজের স্যারেরা ওর আর আমার ব্যাপারে অনেক কিছু জানত। গানটা গাওয়া উচিত হয়নি। সে আমি নিজেই বুঝেছি। তবুও গাইলাম। আমার চোখে জল এসে গেছে। এ জল আসা শুধু ওর জন্য নয়। বাবা-মা, আল্পনা--সবকিছু আমাকে...।

ধারাবাহিক উপন্যাসঃ হৃদয়ের এপিঠ-ওপিঠ (পর্ব-৫)
--শাশ্বত স্বপন

ফেলে আসা জীবন নদীর নানা বাঁক নিয়ে ভাবতে ভাবতে কখন যে রাত হয়ে গেছে খেয়ালও করিনি। ঘড়িতে চেয়ে দেখি বারটা। বিছানা থেকে জেগে উঠলাম। সেলিমের টেপ রেকর্ডার চালু করতে ইচ্ছা হলো। সন্ধ্যায় টিউশনিতে যাওয়া হয়নি। সিঁদুর তার কবিতার গুণ গান শোনার জন্য নিশ্চয় অপেক্ষা করছিল। ক্যাসেট বের করে অন্য ক্যাসেট দিলাম। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কবিতা পড়তে শুরু করলাম--‘কেউ কথা রাখেনি...।’ এভাবে রাত গড়াতে লাগল। প্রায়ই আমার ঘুম হয় না। জীবনে কত স্মৃতি আছে। সেগুলো তেমন একটা মনে পড়ে না। মা-বাবাকে মনে পড়লে দুঃখ লাগে না অথচ আল্পনা...। হায়রে হৃদয়, প্রেমিকা তোমার কাছে মা-বাবার চেয়ে বড়। হৃদয়ের সাথে কথা বলে কোন লাভ হয় না। সে ঈশ্বরের মত, কথা বলে না। মাঝে মাঝে আমার মুখ দিয়ে তত্ত্ব কথা বের করে। “নীল আকাশ সে তো কাছেই আছে। আমার মন বলে, ইচ্ছে করলে আমি ছুঁতে পারব। এইটুকু সান্ত্বনাই থাক। মিছিমিছি বিড়ম্বনা বাড়িয়ে কি লাভ...।” অথচ এ হৃদয় আবার কেঁদেও মরে। সেও মেনে নিতে চায় না--মেনে নিতে পারে না। সে খুব বেশি বুঝে অথচ ভালোবাসার ক্ষেত্রে অবুঝ শিশু। সে ক্ষণে প্রেমিক, ক্ষণে মানসিক রোগী, ক্ষণে হিংস্র, ক্ষণে পাগল, ক্ষণে বুদ্ধিমান--বড় জঘন্য আমার এ হৃদয়!

পরদিন বিকাল বেলা। রুমে বসে সেই মেয়েটার কথা ভাবতে লাগলাম। কি চাকুরি ওখানে পাওয়া যাবে? যে চাকুরিই হোক, অন্তত: কয়েকটা মাস করা লাগবে। অগ্রীম দুই হাজার টাকা চাইতে হবে। মুরাদকে এক হাজার টাকা দেওয়া লাগবে। প্রেম-টেম নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করলে চলবে না। এ নিয়ে আমি আর ভাবতে চাই না। এ বিষয়ে নিশ্চিত, এই বেকার সময়ে কোন সুস্থ মেয়ে আমার সাথে প্রেম করতে আসবে না। যদি বা আসে--যখন জানবে, মাই পকেট এম্টি, সি গোজ এওয়ে। অতএব, লাভ ইজ ফলস্ অফ মাইন। আমি এখন চাকুরি চাই। চাই বড় হতে--বড় লোক হতে। সবাই চায়--আমিও চাই। আজ বাবা বেঁচে থাকলে, সুস্থভাবে জীবন-যাপন করলে, সুবিধাবাদী রাজনীতি করলে--আমাদের অবস্থান নিশ্চয়ই অনেক উপরে থাকত। এলাকার কোন কোন বাড়িতে খাবার গুদামজাত করে রাখা হত, পরে বেশি দামে বিক্রি করা হত। অথচ অসংখ্য মানুষ না খেয়ে মরে গেলেও গুদামজাত খাদ্যের মালিকরা ফিরে তাকাত না। ভাবত মরুক, হাহাকার বাড়লেই মালের দাম বাড়বে। মায়ের কাছে শুনেছি, বাবা ডাকাতি করে যা কিছু আনতেন--তার সবি দরিদ্রদের মাঝে বিলিয়ে দিতেন। বাবার কথা অনুযায়ী, ডাকাতিটা ন্যায় সঙ্গত হলেও মা-দাদী কিছুতেই মেনে নিত না। কিন্তু সে মা-দাদীকে এমন সব দেশপ্রেম, সমাজতন্ত্রের কথা বলত--যা শুনলে ভালোই লাগত তাদের। কিন্তু মা দেশ প্রেমিকের চেয়ে বেশি ভালবাসত তার স্বামীকে, দাদী বেশি ভালোবাসত তার পুত্রকে। আমি ভালোবাসতাম আমার বাবাকে। অন্য হাজার ছেলের মত আমিও দেশের চেয়ে মা-বাবাকেই আজ বেশি অনুভব করি। এতিম হওয়ার চেয়ে দেশ পরাধীন থাকাই ভালো ছিল। যারা শূন্য ছিল, অথবা স্বল্প সম্পত্তির মালিক ছিল, তারা আজ রাষ্ট্রের পরিচালক আর আমরা জীবন্ত লাশ হয়ে দেশের বোঝা হয়ে আছি। আমরা কেউ সেদিন বাবাকে সেই পথ থেকে ফিরিয়ে আনতে পারিনি। বাবাকে ধরে রাখতে পারিনি আমাদের জীবনের সাথে। আজ ঘৃণা করি দেশপ্রেম, সমাজতন্ত্র। আস্তখুঁড়ে আজ হতাশাগ্রস্ত রোগীর মত সমাজতন্ত্র কাঁদছে। বড় বড় জ্ঞানীদের দ্বারা গঠিত এবং পরিচালিত সমাজতন্ত্রের বর্তমান অবস্থা দেখলে অবাক হতে হয়। অধিকাংশ বুদ্ধিজীবী, দেশপ্রেমিকরা এটাকে পূজা করত। অথচ এটা আজ এক বিরাট বিস্ময়! আমার বাবা এই তন্ত্রকে পূজা করত। এই তন্ত্রের জন্য সারা জীবন সংগ্রাম করেছেন। আজ বেঁচে থাকলে আমাদের সামনে বড় গলায় বলতে পারতেন না।

দৈনিক ইত্তেফাকের আবশ্যক কলাম বুকে নিয়ে শুয়েছিলাম। ঐ কোটিপতির কাছে চাকুরি না পেলে, অথবা পছন্দ না হলে এ আবশ্যক বিজ্ঞপ্তি ধরে দৌড়া দৌড়ি করতে হবে। দরজার কড়া নড়ে উঠল। কে?--বলতে বলতে ছিটকিনিটা খুললাম। ড্রাইভারের আস্সালমালাইকুম সম্বোধনটা হজম না করতেই দেখি সেই ভদ্র মহিলা। তাকে আমি আশা করিনি। ভেবেছিলাম, গতকাল ড্রাইভারকে চিনতে পাঠিয়েছে এজন্যই যে, দরকার হলে ডেকে পাঠাবে। মাত্র একদিনের ব্যবধানে গৃহকর্ত্রী হাজির। আজ অবশ্য একটু পরেই আমার নিজেরই যাওয়ার কথা ছিল। অনেকটা তোষামোদের ভঙ্গীতে তাকে সালাম দিয়ে রুমে আসতে বললাম। ভালো একটা চেয়ারের জন্য ছুটোছুটি করতেই দেখি, উনি আমার বিছানায় বসে পড়েছেন। ড্রাইভার বাইরে দাঁড়িয়ে রইল। কোটিপতির স্ত্রী আজ, এখন আমার রুমে। কোটিপতি মানে যাদের কোটি কোটি টাকা আছে, কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি আছে। কোটি টাকা তো দূরের কথা দশ হাজার টাকাও এক সঙ্গে কখনও দেখিনি। তবে দেখার ইচ্ছা জাগে, মাঝে মাঝে প্রবলভাবে জেগে উঠে। জাগবে না কেন? আমাদের সহায়-সম্পদ বলতে আমরা দু’টি ভাই ছাড়া আর কিছুই নেই। আর যেটুকু বিদ্যা--তা দিয়ে আজকের যুগে ঠেলাগাড়ি ঠেলতে পারছি না।
-- কেমন আছ?
-- জ্বী, ভালো।
-- এখানে কয় জনে থাক?
-- আমি আর আমার এক বন্ধু।
-- তোমার ভাই?
-- ঢাকা কলেজ হোস্টেলেই থাকে।
-- তুমি তো বি.এ পাস করেছ?
-- হ্যাঁ।

কিছুক্ষণ তিনি আর কথা বললেন না। তার চোখ বেশ ভারী হয়ে উঠছে। আমি তার দিকে তাকিয়ে আবার মাথা নিচু করে রইলাম। তিনি আমাকে আদর করতে করতে বললেন, ‘বাবা, তুমি আমার ছেলের মত, তুমিই পার--।’ উনি আর কিছুই বললেন না। থেমে গেলেন। কিছু বলতে চেয়ে বুঝে নিলেন, কিভাবে বলবেন। হয়তো গুছিয়ে উঠতে পারছেন না। আমি সময়ের জড়তা কাটাবার জন্য কথা বলতে শুরু করলাম--‘আপনারা আমাকে এটা চাকুরি দেবেন বলছিলেন। কি চাকুরি? মানে--।’

মিসেস নজরুল প্রসঙ্গ পাল্টে ফেললেন। এখানে কে রান্না করে দেয়, কিভাবে খাই, টাকা-পয়সার উৎস--ইত্যাদি সম্পর্কে আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন। আমার মনে হলো, নোট বই থাকলে নোট করে নিতেন। কারণ তার মনে থাকছে না। একই প্রশ্ন সময়ের ব্যবধানে তিনবারও করেছেন। ধনী পুরুষ বা মহিলাদের স্মরণ করার জন্য নিশ্চয়ই লোক থাকে। নতুবা একই কথা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে আনলে শ্রোতা নিজেও বিরক্ত হবেন। তার বয়স পঁয়তাল্লিশ-ছিচল্লিশ হবে। অবশ্য বেশিও হতে পারে। ধনী লোকদের স্ত্রীদের বয়স কসমেটিক্স আর সাজ-গোজের ফলে বেশ নিচে নেমে আসে। খালাম্মা, চাচী না বলে আপা বললে তারা বেশি খুশি হন। যত ঝড়-তুফান যাক তাদের সংসারে, তারা গয়নাগাটি পরিধান করতে ভুল করেন না। নিজের অবয়বের ব্যাপারে তারা খুবই সচেতন। এই যে আমার সম্মুখে মহিলা বসে আছেন, তিনি তার কন্যার কারণে হতাশাগ্রস্ত। তার কন্যা মেন্টাল পেসেন্ট। দুশ্চিন্তা হবার কথা। অথচ তার বেশ-ভূষা দেখে মনে হচ্ছে, কোন পার্লার থেকে এসেছেন। অবশ্য তিনি আমাকে বলেছেন, ইত্তেফাকের কোন এক সম্পাদকের সাথে তিনি একটা জরুরি বিষয় নিয়ে বলতে এসেছিলেন। সেই সাথে আমাকে তার বাসায় নিয়ে যাবার জন্যও ভাবছিলেন।

ধারাবাহিক উপন্যাসঃ হৃদয়ের এপিঠ-ওপিঠ (পর্ব-৬)
--শাশ্বত স্বপন

তিনি আমাকে চাকুরির ব্যাপারটা বলেও বলছেন না। আমি কিছুটা উপলব্ধি করতে পারছি। তবুও নিশ্চিত হতে পারছি না। পঁচিশ বছরের জীবনে যা ভাবি--তা কখনও হয়নি বরং যা আমি কল্পনাও করতে পারিনি--তাই আমার জীবনে ঘটে। তার মেয়েটা অন্ধ হলে বুঝতাম চোখ সমস্যা--কিডনী সমস্যা হলে, কিডনী ভাবতাম। মেয়েটির সারা অবয়ব স্বাভাবিক। তবে তারা আমাকে....? চাকুরির জন্য ধন্না দিতে হয় চাকুরি প্রার্থীকে আর উনি ধন্না দিচ্ছেন আমার কাছে। যদি কিডনী চায় এবং তা ম্যাচ হয় আমি দেব। যদি একটি চোখ চায়, তাদের কারো জন্য--আমি দেব। কারণ উনারা আমার দারিদ্র্যের সুযোগ নিয়েই চাওয়া ও পাওয়ার ব্যাপারে আশা পোষণ করছেন। আমি রাজী হব। তবে বিনিময়ে অনেক টাকা দাবী করব অথবা সম্পত্তি। আমার বাবা পরাজিত সৈনিক। আমিও পরাজিত সৈনিক। জীবনের অর্ধেক যদি বিদ্যার্জনের জন্য ব্যয় হয় এবং সেই বিদ্যা যদি জীবনের বাকি অর্ধেককে টানতে না পারে--তবে ঘৃণা করি এ বিদ্যাকে, এ জীবনের মানচিত্রকে। জীবন যুদ্ধে আমি পরাজিত আর ভবিষ্যতে জেতারও কোন সম্ভাবনা নেই। চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ-এ নাটকীয়ভাবে যদিও বা বিজয় আসে, সেই বিজয়ের কোন মানে হয় না। শেষ ভালো যার, সব ভাল তার--কথাটার মূল্যায়ন করার মত মন-মানসিকতা আমার নেই। কথাটা কোন ক্ষেত্রে প্রযোজ্য আমি জানি না। আমার ক্ষেত্রে, আমি এই কথাটাকে থুথু দেই। জীবনের ভাটায় জীবনের মূল্য ধীরে ধীরে কমতে থাকে। অবশ্য বিখ্যাত লোকদের ক্ষেত্রে মরে গেলেও তাদের দাম বেড়ে যায়। আমাদের বার্ধক্য জীবনে আমাদের দাম--সাড়ে তিন হাত মাটির সমান। ক্রমাগত আমরা মৃত্যুর দিকে যাচ্ছি। কখন মরে যাই--তাও ঠিক নেই। জীবনে, সুখ নামক বস্তুটা কি--আমি অনুভব করতে চাই। সেই আবহমানকাল থেকে আমরা সবাই দুঃখের মাঝেই সুখের নীড় গড়ে যাচ্ছি। স্বাধীন দেশেও দুঃখের মাঝেই বসবাস। আমি সুখের মাঝে সুখের নীড় বা সুখের মাঝে দুঃখের নীড় গড়তে চাই। সুখের মাঝে দুঃখের নীড়ের মূল্য আছে--কিন্তু দুঃখের মাঝে সুখের নীড়ের কোন মূল্য নেই।
--বাবা, তুমি আমার সাথে চল--
-- কিন্তু আমি, মানে আমার মনে হচ্ছে, আমাকে আপনি কি যেন বলতে চাইছেন। বলেও বলছেন না। আমি কিছু মনে করব না।
-- না, না কিছুই বলতে চাচ্ছি না। তোমার চাকুরি--
-- হ্যাঁ, চাকুরি--
-- রকিব মানে ডাক্তার তোমাকে সব বলবে। তুমি আমার সাথে চল।

আমি কিছু খাওয়াতে চাইলাম। উনি খেতে চাইলেন না। শুধু সৌজন্যতা রক্ষার্থে এক গ্লাস পানি পান করলেন। তারা দু’জনে গাড়ির সামনে গেলেন। আমি শার্ট-প্যান্ট পড়ে তাদের সাথে গাড়িতে উঠলাম। উনি তার সাথে আমাকে বসালেন। আমি ইতস্তত: অনুভব করছি। তার পাশে জড় পদার্থের মত বসে রইলাম। তার বাহ্যিক চেহারার কোন বিরক্তি বা জড়তা দেখলাম না। না থাকারই কথা। চলতে পথে তারা কত রকমের মানুষের সাথে গা ঘেষাঘেষি করে। এটাই তাদের কালচার। আমার অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনেক কিছু জিজ্ঞাসা করলেন। ভবিষ্যতের ব্যাপারে আমি হতাশাগ্রস্ত--যা শুনে উনি বেশ খুশিই হলেন। হয়তো ভাবছেন, ঠিক জায়গাতেই বড়শী ফেলেছেন। মাছ টোপ গিলবেই। টাকা দিলে বাঘের চোখ মিলে আর আমি তো কোটি কোটি দরিদ্রদের ভীড়ে এক নগণ্য দরিদ্র ব্যক্তি। মরে গেলে এক ভাই ছাড়া আর কেউ কাঁদবে বলে মনে হয় না। আমি এমন খ্যাতনামা ব্যক্তি নই, সমাজ সেবক নই, যে দেশের কোন সম্ভাবনা ধুলিসাৎ হয়ে যাবে। বরং মরে গেলেও দেশের একটা বেকার সমস্যা কমবে। একটা সাধারণ পিয়নের চাকুরিতে দু’হাজার দরখাস্ত জমা পড়ার সম্ভাবনা থাকলে অন্তত: একটা বাদ পড়বে। আমার জন্য ব্যবহার্য সামগ্রী অন্য খাতে ব্যয় হবে। বন্ধু মহলে কেউ বলে এত উদাসীন হওয়া ঠিক না। সেটা আমিও বুঝি। কিন্তু সাপে যাকে কামড়ায় সেই বুঝে সাপের বিষের কি জ্বালা! নেই মা, নেই বাবা, নেই কোন ঘনিষ্ঠ আত্মীয়-স্বজন। বাবা তার পরিবারের একমাত্র সন্তান ছিলেন। অতএব কাকা-ফুফু তো না থাকারই কথা। মা ছিলেন হিন্দু। যুদ্ধের আগে-পরে তার পরিবারের সবাই কোলকাতা চলে গেছে । অতএব, বাংলাদেশে মামা-কাকা নেই। নেই ভিটে-মাটি। যেটুকুও ছিল তাও বেপারী, শিকদার, মোড়ল প্রতাপশালীদের দখলে চলে গেছে। অবশেষে, আমার মাঝে যেই সাইজের বিদ্যা--তা নিয়ে আজকের যুগে মন্দির আর মসজিদ ছাড়া আর কোথাও যাবার সামর্থ্য আছে বলে, মনে হয় না। মসজিদ-মন্দিরে চাকুরির জন্য নয়--প্রার্থনা করার জন্য--‘‘হে বিধাতা, তুমি আমাকে চাকুরি দাও; নয়তো দুনিয়া থেকে বিদায় কর।”

গাড়ি বাসার ভিতর ঢুকে গেল। মিসেস নজরুলের সাথে তাদের ড্রয়িং রুমে গেলাম। দেখলাম, শুধু ডাক্তার বসে আছে। হাতে একটা ম্যাগাজিন। বসতে বললেন, বসলাম। অল্প সময়ের মধ্যে দেখি, চপ, চা, বিস্কুট, ফলমূল, পানীয় ইত্যাদি বিশ-পঁচিশ রকমের খাবার এসে গেছে। বেশ সজ্জিত ড্রয়িং রুম। দুই দেয়ালে দুইটা দামী পেইন্টিং ঝুলছে। ডাক্তার সম্মুখে বসে থাকায় আড়চোখে আশপাশটা দেখলাম। উনি খেতে বললেন। মিসেস নজরুল পাশের রুমে চলে গিয়েছেন। তার কথাবার্তা শোনা যাচ্ছে। তার মেয়ের সাথেই বোধহয় কথা হচ্ছে। আমি ডাক্তারকে আগে খাবার গ্রহণ করতে বললাম। তারপর আমিও খেতে শুরু করলাম। বেশ কিছু খাবার খাওয়ার পর মহিলা একটা ডায়েরী নিয়ে ডাক্তারের পাশে আসলেন। ডায়েরীটা তার হাতে দিয়ে আমার দিকে তাকালেন। চপটা নেবার জন্য আমাকে অনুরোধ করলেন। তিনি তার ভাইকে বললেন, ‘রকিব, তোরা কথা বল, আমি আসছি--।’

আমি যে কোন প্রশ্নের উত্তর দেবার জন্য প্রস্তুত আছি। আমার ভিতরে কোন ভয় নেই। জীবনের মূল্য এখন আমি অন্যভাবে ভাবী। মাঝে মাঝে ভাবী, আমি বোধ হয় বৃদ্ধ হয়ে যাচ্ছি। আমি স্বাভাবিকভাবেই একটু একটু করে একটা চপ খাচ্ছি। চপের অর্ধেক শেষ হতেই দেখি সেই মেয়েটি। একেবারে সেজেগুঁজে হাজির। আমার বুকের ভিতরটা কেঁপে উঠল। আবার কি জড়িয়ে ধরবে নাকি? না, তেমন কোন লক্ষণ দেখা গেল না। বরং অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টি নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইল। মুখটা গম্ভীর হয়ে আছে। তবুও দেখতে দারুণ চমৎকার। না জানি, সুস্থ অবস্থায় দেখতে কত সুন্দরী ছিল! অবশ্য ধনীদের অধিকাংশ মেয়েরাই সুন্দরী হয়। জন্মটা কালো হলেও কসমেটিক্স, পারলার আর পোশাকের গুণে সুন্দরী না হয়ে উপায় নেই। আর যে খাবার-দাবার--তা বস্তির কালো হেঙলা-পাতলা মেয়ে খেলেও নাদুস-নুদুস হয়ে উঠবে। মুখাবয়বও চিকচিক করবে। ডাক্তার কি যেন ইশারা করল। সে আমাকে সালাম দিল। আমি অবাক। কি সুন্দর মুখের সাউণ্ড। ডাক্তার ডাকতেই সে তার একেবারে কাছে বসে আমার দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখ মোটেও অন্য দিকে যাচ্ছে না। এই মুহূর্তের পরিবেশটার জড়তা কাটানোর জন্য ডাক্তার একটা কৌতুক বলা শুরু করলেন। বলার আগে মেয়েটির সম্মতি নিয়েছিলেন। কৌতুকের কথা শুনে মেয়েটি খুবই খুশি হলো। গল্পটা এরকম--“এক হাতুড়ে ডাক্তার বাইরে বের হবার আগে তার সহকারিকে বলে যান--যদি পেট ব্যথার রোগী আসে তবে যেন, সাত নাম্বার বোতলের ঔষধ দেয়। আর যদি মাথা ব্যথার রোগী আসে, তবে যেন, আট নাম্বার বোতলের ঔষধ দেয়। আর যদি পাতলা পায়খানার রোগী আসে, তবে যেন, পনর নাম্বার বোতলের ঔষধ দেয়। ঐ গায়ে তখন এই তিনটি রোগই প্রকট ছিল। হাতুরে ডাক্তার চলে যাবার পর এক পাতলা-পায়খানার রোগী এলো। সহকারী পনর নাম্বার বোতল খুঁজে বের করে দেখে, খালি বোতল। ঔষধ নেই। আরো কয়েকটা পনর নাম্বার বোতল খুঁজেও ঔষধ পাওয়া গেল না। অগত্যা সে কি করে? রোগী তো অলরেডী পায়খানা করেও দিয়েছে। অবস্থা সিরিয়াস!”

মেয়েটি ‘সিরিয়াস’ শব্দটি শুনা মাত্রই হাসতে শুরু করল। কি সুন্দর হাসি! আমি তাকাতেই সে হাসি থামিয়ে দিল। আবার আমার দিকে অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। ডাক্তার মেয়েটির মাথায় হাত দিয়ে বলতে লাগল--‘‘তারপর অবস্থা বেগতিক দেখে সহকারী একটা বুদ্ধি বের করল। সে পেট ব্যথার সাত নাম্বার আর মাথা ব্যথার আট নাম্বার বোতল দুইটার অর্ধেক অর্ধেক পরিমাণ পনর নাম্বার বোতলে ঢেলে রাখল। তারপর কয়েকবার ঝাঁকিয়ে রোগীকে খাওয়াতে লাগল। সাথে সাথে তার নিজের সুবুদ্ধির প্রশংসা করতে লাগল। রোগী এরই মধ্যে আরো একবার পায়খানা করে ফেলেছে। ঔষধ খাওয়ার কিছুক্ষণ পর রোগী অক্কা পেল।”

সবাই একসঙ্গে হাসতে শুরু করলাম। আমার হাসি শেষ হবার আগেই সে তার হাসি থামিয়ে অবাক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে রইল। আমি ভয় পেয়ে গেলাম। আসন থেকে মুহূর্তের মধ্যে যেন উঠতে পারি--তার প্রস্তুতি নিলাম। যা ভেবেছি--তাই হল। সে প্রচণ্ড গর্জনে ফ্রান্সিস ফ্রান্সিস...বলে চিৎকার করে আমার কাছে আসতে চাইল। ডাক্তার তাকে অন্য রুমে নিয়ে গেল। আরো দু’জন মহিলাও মেয়েটিকে ধরল। ডাক্তার ফিরে এসে আমার খুব কাছে আসলেন।
-- কিছু বুঝতে পারছ? ন্যান্সি সম্পর্কে তোমার ধারণা কি?
-- জ্বী, ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না। কিছুক্ষন আগেও স্বাভাবিক দেখলাম।

ধারাবাহিক উপন্যাসঃ হৃদয়ের এপিঠ-ওপিঠ (পর্ব-৭)
--শাশ্বত স্বপন

তিনি আমার পিছনে চলে গেলেন। অন্যদিকে তাকিয়ে কি যেন ভাবলেন। আমি মেয়েটির ন্যান্সি নামটি নিয়ে একটু ভাবলাম। এতক্ষণে নামটা জানা গেল। খুব সুন্দর নাম, ন্যান্সি। এতক্ষণ গল্পে মেয়েটি বলতে বলতে আমি নিজেই বিরক্ত হয়েছি। এখন ন্যান্সি বলা যাবে। ডাক্তার ডায়েরীটার কয়েকটা পাতা নাড়াচাড়া করলেন। আমি তার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে আমার সম্মুখে ভাবাবেশে তাকিয়ে রইলাম। তিনি বলতে শুরু করলেন, ‘মাই নাইস মিনস ন্যান্সি ইজ মেন্টাল পেসেন্ট একর্ডিং টু মেন্টাল সাইন্স এন্ড ট্রিটমেন্ট। সী ইজ নাইটিন ইয়ারস ওল্ড এণ্ড অনলি সিঙ্গেল ডটার অফ দা ফ্যামিলি। সী লাভ এ বয় নেমড ফ্রান্সিস...।’

ডাক্তার বেশ কিছুক্ষণ ইংরেজিতে কথা বলতে লাগলেন। যার সারমর্ম হলো--ন্যান্সি খ্রীস্টান এক ছেলেকে ভালোবাসত। ছেলেটির নাম ফ্রান্সিস রোজারিও। তারা জার্মানীর অধিবাসী। তার বাবা বাংলাদেশে অবস্থিত জার্মান কালচারাল সেন্টারে কাজ করত। ফ্রান্সিসরা দুই ভাই, এক বোন। তার মা বাঙালি। ফ্রান্সিস-এর চেহারা বাঙালীদের মতই বেশ হ্যাণ্ডসাম, দেখতে আমার মত, তবে আরো ফর্সা। উচ্চতা আমার মতই। কথাবার্তা খুবই মার্জিত। বাংলা বেশ বুঝত। ন্যান্সিদের বাসার সামনের একটা ফ্ল্যাটে তারা থাকত। দু’জনে ইংলিম মিডিয়ামে পড়ত। এই পর্যন্ত বলেই ডাক্তার থেমে গেলেন। ডিটেলস্ আর কিছু বললেন না। ঠিক এ সময়ে মিস্টার নজরুল ও মিসেস নজরুল রুমে ঢুকলেন। যেন, আগেই সিদ্ধান্ত ছিল। মিসেস নজরুল আমার পাশেই বসলেন।
-- আপনারা সরাসরি বলুন আমার চাকুরিটা কি?
মিসেস নজরুল আমার মাথায় হাত বুলাতে লাগলেন।
-- বাবা, তুমি ওকে নরমাল হতে সাহায্য কর। তোমার মাঝে ও ফ্রান্সিসকে দেখেছে। তাই--
নজরুল চৌধুরী বললেন,
-- বিনিময়ে তুমি যা চাও--তাই পাবে এবং এটাই তোমার চাকুরি।
ডাক্তার আমার কাঁধে হাত রাখলেন।
-- মনে কিছু কর না। আংকেল হিসেবে বলছি না। ন্যান্সির ডাক্তার হিসেবে আই ওয়ান্ট ইউর হেলপ্। ইউ হেলপ্ মী টু কাম রাউন্ড, ন্যান্সি।
-- কিভাবে সাহায্য করব?
-- আমি একজন সাইকিয়াট্রিস্ট। অনেক মেন্টাল পেসেন্ট সুস্থ করেছি কিন্তু ওকে পারছি না। তোমাকে আমি সব বুঝিয়ে বলব, কিভাবে কি করতে হবে।

আমি জানি, আমি একটা বোকা। বোকাদের প্রায় কাজেই ভুল হয়। যেহেতু আমি জানি, আমি একটা--বোকা তাই খুব চিন্তা-ভাবনা করে কাজ করি। উন্নতি কিছু না হলেও কোথাও হাসির বস্তু হিসেবে বিবেচিত হইনি; বরং আট-দশ জনে সম্মান, স্নেহ রেখেই কথা বলে। কিন্তু আগে বেশি চালাক ছিলাম আর সে কারণেই ভুল বেশি হত। সেই ভুলগুলোকে তখন ঠিক বলে মনে হত এবং মেনে নিতাম। কিন্তু বর্তমানে সেই সব ভুলগুলো আমাকে প্রায়ই কাঁদায়, ভাবায় কখনও অজান্তেই হেসে উঠি। একমাস আগেও এমন কিছু কাজ করেছি, যা বর্তমানে অনেকটা বোকামী করেছি বলে মনে হয়। এই যে তারা আমাকে ইউজ করতে চাইছে তাদের কন্যাকে সুস্থ্য করার জন্য, এদের কাছে আমরা ভিক্ষুক। অসময়ে এরা লাথি মারে, সময়ের প্রয়োজনে গায়ে হাত দিয়ে আদর করে। এটাই নিয়ম, এটাই বাস্তব। যে সাংবাদিক আজ অছি, ম্যাজিস্ট্রেটকে ঘুষখোর, দুর্নীতিবাজ বলে পত্রিকায় কলামের পর কলাম লিখে যায়--সেই সাংবাদিক, অছি কিংবা ম্যাজিস্ট্রেট পদে থাকলে একই কাজ করত। মুখে যতই মোটামোটা কথা বলা হোক না কেন, কার্যক্ষেত্রে তার একাংশও ফলে না। যে, যে পদে থাকে, তার কাজ সেই পদের বৃত্তেই থাকে এবং এই বাস্তবতা স্মরণ করেই তাদের এই নারী কেন্দ্রিক চাকুরির অফার এড়িয়ে যেতে চাইলাম। মুখের ভঙ্গীমায় তাই বুঝালাম। মিসেস নজরুল কাঁদো কাঁদো কণ্ঠে বলতে লাগলেন, ‌‌‌‌‌তুমি জান না বাবা, গতকাল তোমাকে দেখার পর থেকে ও কেমন জানি অন্যরকম হয়ে গেছে। তুমি আজ আসবে বলেই বুয়ারা ওকে সেজেগুঁজে দিয়েছে। নিজেও সাজগোজ করেছে। দুই বছর পাবনা রেখেও কিছু হলো না। ধানমণ্ডি মানসিক চিকিৎসা কেন্দ্রে রাখা হয়েছে। তাও কিছু হল না। বিদেশেও রাখা হয়েছে। একটু ভাল হলেও পরে আবার একই অবস্থায় ফিরে আসে। তোমার মাঝে ও ফ্রান্সিসকে দেখেছে। ভালো হলে হতেও পারে। তুমি সারাদিন ওর সঙ্গী হবে।

নজরুল চৌধুরী ভেবেছিল, সে বলা মাত্রই আমি সহাস্যে রাজী হয়ে যাব। আমার অনীহা ভাব বুঝতে পেরে সে রাগতস্বরে টাকার গরম দেখাতে লাগল। মেয়ের মানসিক রোগের কারণে সে খুবই সিরিয়াস হয়ে আছে। যে কোন মূল্যে সে মেয়েকে আরোগ্য দেখতে চায়।
-- তুমি মাসে কত টাকা চাও বল?
-- আমি পরে আপনাকে জানাব। আগে ভাবতে দিন। পরে একদিন দেখা করে...
-- শুন, তোমার অবগতির জন্য জানাচ্ছি, তোমাকে প্রতি মাসে দশ হাজার করে দেওয়া হবে। ডাক্তার মানে রকিব যা বলবে তুমি তাই করবে। ওকে যদি সুস্থ্য করতে পার, চিটাগাং-এর ট্রাভেলস্ লাইসেন্স তোমাকে দিয়ে দেব। আর যদি নাও পার তবুও একটা চাকুরি অন্তত: আমার আন্ডারে পাবে। তবে ভালো করার জন্য চেষ্টা দেখাতে হবে। কাজ দেখাতে হবে। ভেবে দেখ। আমার কথাবার্তায় হয়ত দুঃখ পেয়েছ । ডন্ট মাইন্ড। আই নো হাউ আই এ্যাম? ইউ ডন্ট নো, ইউ ডন্ট আন্ডার স্ট্যান্ড হাউ সরো ইন মাইন্ড অফ মাইন! আমার স্থলে তুমি হলে বুঝতে।

নজরুল চৌধুরী তার কক্ষে অশ্রু সিক্ত নয়নে চলে গেলেন। মিসেস নজরুল আমাকে নিয়ে খাবার টেবিলে চলে এলেন। খাবার টেবিলে রাজকীয় খাবার দেখে আমি হতবাক। এগুলো খেলে হজম হবে কিনা সন্দেহ। আলু ভর্তা জাতীয় খাবার যাদের প্রতিদিনের প্রধান আইটেম তাদের পাকস্থলীতে হঠাৎ এসব রাজকীয় খাবার সইবে কি করে। তিনি জোর করেই আমাকে খেতে বসালেন। রাত আটটা বেজে গেছে। খেয়ালই করিনি। কথা বলতে বলতে আর ভাবতে ভাবতে কত সময় পার হয়ে গেছে। আমি আবার হাত ঘড়িটার দিকে তাকালাম। হ্যাঁ, আটটা বাজে। এসি করা ডাইনিং। পুরো বাড়িটাই এসি করা। রুমের ভিতরে রাত-দিন সমান। ঘুম ঘুম নিঃশ্বাস এসে গেছে। সাধারণত: বারটা-একটার আগে খুব একটা ঘুমাই না। অথচ এসি করা এই বাসস্থলে ঘুমে চোখ বুজে আসছে। এতসব রাজকীয় খাবার আর আবাসস্থল দেখে আমি এটাকে স্বর্গ ভাবতে শুরু করেছি। এর চেয়ে বড় স্বর্গ চাই না। ধর্মান্ধ বন্ধুদের বললে, বলবে, ‘এইটুকু দেখেই অবাক! আরে ব্যাটা স্বর্গে এর চেয়ে হাজার গুণ হাইফাই, হাজার গুণ সুখ-শান্তি, হাজার গুণ ভালো খাবার...।’ মনে হবে, বন্ধু যেন স্বর্গ দেখে এসেছে, কিছু দিন বা কিছু কাল বেড়িয়ে এসেছে। ওয়াজ ব্যবসায়ী দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর ওয়াজ শুনলে তাই মনে হয়। তার ওয়াজ শুনলে মনে হয়, উনি দুনিয়াতে নাই, আখেরাতে চলে গেছে। উনার মরার সময় উনি বোধহয়, বিবর্তনবাদ এর জনক ডারউইন এর মত বলবে, মৃত্যুতে আমার ভয় নেই, আমি বেহেস্তে যাচ্ছি। যাই হোক, আমি সেই অবিশ্বাস্য কাল্পনিক স্বর্গ চাই না, আমি এরকম স্বর্গ চাই। চাই বাঁচার মত বাঁচতে। যে লোক আজীবন বস্তিতে থেকেছে, সে হঠাৎ আমার ধর্মান্ধ বন্ধুর কাল্পনিক স্বর্গে গেলে কেমন করবে, আমি ভেবে পাই না। এই যে, আমি চাচার বাসায় বেশ ছিলাম। মধ্যবিত্ত সংসার। মধ্যবিত্ত পরিবারে সমস্যা বেশি হলেও আমার মনে হয়, ক্ষুধা আর আনুসাংগিক ব্যাপারে তেমন ভাবতে হয়নি।

এই যে, যা আজ আমি স্বর্গ বা স্বর্গতুল্য ভাবছি, যা টিকি ও দাঁড়িওয়ালা বন্ধুর কাছে নগন্য--সেটাই আমি সইতে পারছি না। আর হাজার গুণ উন্নত ঐ কাল্পনিক স্বর্গে গেলে হাজার বার মরব। তখন স্রষ্টাও আমাকে বাঁচাতে বাঁচাতে ক্লান্ত হয়ে যাবে। যারা সব সময় ভেজাল দ্রব্যাদি খেয়ে অভ্যস্ত--তাদের পেটে হোটেল শেরাটনের খাঁটি দ্রব্যাদি সইবে কি করে। আমি ঐ স্বাপ্নিক স্বর্গ চাই না, চাই পার্থিব এই সাধারণ স্বর্গ। চাই সুখ, চাই এক টুকরো শান্তি, চাই বাঁচার মত বাঁচতে, তিন বেলা পেট ভরে খেতে। এই যে উনারা ধনী বলে এতসব রাজকীয় খাবার খাচ্ছেন। আমি গরীব বলে আলু ভর্তা ভাত আর মরিচ খাচ্ছি। উনারা স্বর্গে গিয়ে কি খাবেন? আমার বন্ধুর স্বাপ্নিক খাবার নিশ্চয়। তবে তাদের এখানে-ওখানে দুই জায়গায়ই লাভ। আমি ভাবতে চাই না। এখনো গায়ে জোর আছে, অবলম্বন আছে, এখনো বৃদ্ধ হইনি, দুর্বল হইনি, টুপি, দাঁড়ি কিংবা টিকি এখনো আমাকে গ্রাস করেনি। যুদ্ধ ক্ষেত্রে বীর সৈনিক নিশ্চিত পরাজয় জেনেও যেমন বীরের মত যুদ্ধ করে নিজেকে শক্তির অবিনাশিতাবাদ সূত্রের মত আপাত ধ্বংসে বিলিয়ে দেয়, আমিও তেমনি যুদ্ধ করে যাব। নিশ্চিত পরাজয় জেনেও যুদ্ধ করে যাব। সংগ্রাম ছাড়া জীবনের চাহিদা কখনও পূরণ হয় না। তিলে তিলে না মরার চেয়ে; তেলাপোকার মত না বেঁচে; বাঘের মত বাঁচাই শ্রেয়ঃ। মানুষ সিগারেটের প্যাকেটে ‘সংবিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ’ দেখেও ধূমপান করে; প্রেমের পরিণাম জেনেও প্রেম করে। আমিও একই রক্তমাংসে গড়া একজন মানুষ। তারা যদি মৃত্যুর পর নরকম ভোগ করে আমিও করব। তবুও আপন বিবেকের সামনে বাস্তব প্রমাণ সাপেক্ষ্য অকাট্য যুক্তিকে গলা টিপে ধরব না।

ধারাবাহিক উপন্যাসঃ হৃদয়ের এপিঠ-ওপিঠ (পর্ব-৮)
--শাশ্বত স্বপন

রাজকীয় খাবারের প্রথমে পোলাও এর সাথে রোস্ট। এটা অবশ্য বিয়ে বাড়িতে অনেক খেয়েছি। তারপর নাম-না-জানা এমন কিছু খাবার খেলাম--যা জীবনেও খাইনি। মুখে দেওয়া মাত্র গলে গেল। সাথে সাথে পাকস্থলীতে চলে গেল। আহা! শরীরে কি শিহরণ! স্বর্গে এর চেয়ে ভালো, এর চেয়ে স্বাদের খাবার আছে। এখানেই মুখ গহ্বর, চোখ, জিহ্বার আর পাকস্থলীর পরাজয় দেখে আমি দেহ সর্বস্ব লজ্জা পাচ্ছি আর ওখানে...।

কাজের বুয়া মিসেস চৌধুরীকে জানাল ন্যান্সি খুবই পাগলামী শুরু করেছে। চেয়ার-টেবিল উল্টে ফেলেছে। যে আয়না দিয়ে সে কিছুক্ষণ আগে সাজ-গোজ করে মুখ দেখেছে, সে আয়না ভাঙ্গতে গিয়ে হাত কেঁটে ফেলেছে। ডাক্তার ও মিঃ চৌধুরী কিছুক্ষণ আগে কি কাজে যেন বাইরে গেছে। মিসেস চৌধুরী এতক্ষণ আমাকে অতি য সহকারে আপ্যায়ন করছিল। তিনি দৌঁড়ে ন্যান্সির রুমে চলে গেলেন। আমি ন্যান্সির চিৎকার শুনতে পাচ্ছি। কেউ তাকে স্থির করতে পারছে না। মিসেস নজরুল ক্লান্ত হয়ে কিছুক্ষণ পরে ফিরলেন। আমি প্লেটে দেওয়া পুরো খাবার না খেয়েই হাত ধুয়ে ফেলেছি। তিনি আমার সামনে এসে কিছু বলেও বললেন না। আমি বুঝতে পারলাম, উনি আমার হেল্প চাচ্ছেন। আমি মিসেস নজরুলের মুখের দিকে তাকিয়ে সোজা ন্যান্সির রুমে চলে গেলাম। তিনিও আমার পিছু পিছু গেলেন। তিনি ন্যান্সির রুমে আগে ঢুকলেন। দেখা গেল চিৎকার আরো বেড়ে গেছে। আমি মিসেস নজরুলের পিছনে ছিলাম। ন্যান্সি দেখতে পায়নি। একটা মোটা বই মায়ের দিকে ছুঁড়ে মারতে আসছে। আমি প্রকাশিত হবার সাথে সাথেই সে আমাকে দেখে থেমে গেল। আমি তাকিয়ে রইলাম ন্যান্সির দিকে। বইটা হাতেই রয়েছে ছুঁড়ে মারার ভঙ্গীতে। মিসেস নজরুল আমার পিছনে চলে গেলেন। তার মুখে হাসি ফুটে উঠেছে। রুমের চারপাশে তাকালাম। এসি করা সত্য, তবে রুম না বলে ইউনিভার্সিটির কোন বিধ্বস্ত হোস্টেল কক্ষ বলা যায়--যেখানে কিছুক্ষন আগে দু’পক্ষের মারামারি হয়ে গেছে। এখানে দামী কোন সরঞ্জাম নেই। বুঝতে পারলাম যুদ্ধে ক্ষতি হবে বলে, হয়তো রাখা হয়নি। চেয়ার-টেবিল উল্টানো। বই, টুকরো পেপার আর কাগজে রুমের ফ্লোর ভরে আছে। টুকরো কাগজের পরিমাণ এত বেশি যে, ঠিক বুঝে উঠতে পারলাম না। বুয়া জানাল, কিছুক্ষণ আগে সব গোছ-গাছ ছিল, শুধু কাগজের টুকরো ছাড়া। এগুলো পরিষ্কার করা নিষেধ আছে। তাই পরিষ্কার করা হয়নি। কে নিষেধ করেছে প্রশ্নও করলাম না।

ন্যান্সির দিকে তাকালাম। সে তখনও বই ছুঁড়ে মারার বিশেষ ভঙ্গীতে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। তার ডান হাত বেয়ে রক্ত ঝরছে। আমি বুয়াকে ডেটল আনতে বললাম। মায়ের সামনে কিছু করতে লজ্জা লাগছিল। তাই সবাইকে যেতে বললাম। আমি জানি, মিসেস নজরুল ব্যাপারটা পর্যবেক্ষণ করবেন। আমি কি করি না করি? বুয়া ডেটল দিয়ে চলে গেল। আমি একটা সাধারণ ঠোঁট কাঁপানো হাসি দিয়ে হাতের বইটা নিলাম। বিছানায় ছুঁড়ে ফেলে তাকে বিছানায় বসতে বললাম। সে হরিণ চোখা দৃষ্টি নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি তার মাথায় হাত রাখলাম। আদর করলাম। সে তাকিয়েই আছে। হয়তো ভাবছে, এরপর কি করি। হয়তো আমার মাঝে ফ্রান্সিসকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। আমি ওর ডান হাত মুখের কাছে নিয়ে এলাম। কাঁটা স্থানে চুমো দিয়ে রক্ত পরিষ্কার করতেই দেখি, সে হাসছে। ডেটল দিয়ে পরিষ্কার করে পকেটে

রাখা রুমাল দিয়ে হাত বাঁধলাম। সে হাসি মুখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমিও হাসছি।
--ক্ষুধা লেগেছে?
-- হু।
-- খাবে?
-- হু।
-- চল--

বা! আমার সাথে হাঁটতে শুরু করল। খাবার টেবিলে গিয়ে দু’জনে বসলাম। ন্যান্সি চেয়ার টেনে আমার পাশে বসল। মিসেস নজরুল হাসছেন। মনে হচ্ছে, তিনি যেন, নতুন কোন আশার বাণী পেলেন। আমার প্লেটের খাবার আবার খেতে শুরু করলাম। সে তার প্লেটের খাবার ছুঁড়ে ফেলে দিল। আমার মাখা খাবার খেতে চাইল। মনে হচ্ছে, সে যেন একটি শিশু। ভাত মেখে খেতে জানে না। ছোট বেলায় মায়ের কাছে, দাদীর কাছে আমিও এমন বায়না ধরতাম। হাত দিয়ে পর্যন্ত খেতে চাইতাম না। আমাকে মা, দাদীর হাত দিয়ে খাওয়াতে হত। ন্যান্সিও সে রকম বায়না ধরবে নাকি? সর্বনাশ! সেও বায়না ধরেছে। তাকে আমার হাত দিয়ে খাওয়াতে হবে। সে তার হাত দু’টি গুটিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বসে আছে। তার পা দিয়ে আমার পা আঘাত করল। আমি বুঝামাত্র আশে পাশে তাকালাম। কোথাও কেউ নেই। মিসেস নজরুল বুঝতে পেরেই কেটে পড়েছেন। উপায়ান্ত না দেখে হাসি মুখে আমার মাথা খাবার তাকে খাওয়াতে লাগলাম। একটা ছোট কামড়ও বসিয়ে দিয়েছে আঙুলে। আমি উঃহু করে উঠতেই সে হাসতে শুরু করল। হঠাৎ কি মনে করে তার মুখ কালো হয়ে গেল। সে তার হাত দিয়ে আমাকে খাওয়াতে চাইল। আমি হাত ধোয়ার জন্য পানি দিলাম। ও হাত ধুয়ে নিল। আমাকে খাওয়াতেই বেশ করে দিলাম এক কামড়। সে তার বাম হাত দিয়ে আমাকে ধাক্কা দিয়ে উঃহু করে উঠল। তারপর আর খাওয়াতে চাইল না। তার হাত দিয়ে সে নিজে নিজেই খেতে লাগল। আমি তাকিয়ে রইলাম তার দিকে। ভাবলাম, এত সুন্দর একটা মেয়ে অথচ মানসিক রোগী। আমার বেশ মায়া লেগে গেল। আমার কারণে সে যদি ভালো হয়, তাহলে অবশ্যই তাকে সাহায্য করা উচিত। এমনিতে বয়সটাও খারাপ, নিজের উপর নিজের তেমন বিশ্বাস নেই। মাঝে মাঝে নিজেকে পাগলও ভাবী। আমি কি পারব তাদের সম্মান রাখতে। অন্তত: চেষ্টা করে দেখি না। আমি তার দিকে তাকিয়ে আছি বলে সে আমার মুখমণ্ডল অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিল। শেষের দিকে তাকেও খাওয়ালাম--সেও আমাকে খাওয়ালো। তারপর খাওয়া শেষ করে হাসতে হাসতে তার হাত ধুয়ে দিলাম। পানি পান করালাম। সেও একই কাজ করল। তারপর যা করল তার জন্য আদৌ আমি প্রস্তুত ছিলাম না। কানের কাছে ফিসফিস করে কি যেন বলতে চাইল। আমি কান পাততেই গালে চুমো বসিয়ে দিল। আই ইক্সক্লেইমড্ উইথ জয়।

বুঝলাম, ঘটনাগুলো ঘটত ফ্রান্সিসের সাথে। সে আমাকে তাই ভেবে এই অবস্থায় যা মনে পড়ছে, তাই করছে। আমিও চুমো দিতে চাইলাম। সে লজ্জা পেল। চুমো দিতে দিল না। হাত ধরে তার রুমে নিয়ে গেল। একটা মোড়ানো কাগজ খুলে দেখাল। দু’একটা লাইন ভালোভাবে লেখা, তারপর সব হিজিবিজি--যা বুঝা সম্ভব নয়! চিঠিতে দুইটা লাইন সে লিখেছে। ফ্রান্সিস, ইউ আর বিট্রেয়ার। ইয়েট আই লাভ ইউ...।

মনে হচ্ছে, কোন চিঠি তার মন মত হয় না বলেই সে শত শত চিঠির প্যাড টুকরো করে মুড়ে ছুঁড়ে ফেলেছে এখানে-সেখানে। কয়েকটা চিঠি দেখাল। প্রত্যেকটা চিঠিতে দু’এক লাইন লেখা, তারপর কাটাকুটি। তবে একটা জিনিস বেশ লক্ষ্য করলাম প্রত্যেকটি চিঠিতে কমন একটা লাইন আছেই, তা হল--‘আই লাভ ইউ। আই লাভ ইউ ভেরী মাচ।’ ফ্রান্সিসকে যে খুব ভালোবাসত--তা বুঝা যায়।

ধারাবাহিক উপন্যাসঃ হৃদয়ের এপিঠ-ওপিঠ (পর্ব-৯)
--শাশ্বত স্বপন

এত সহায়-সম্পত্তি অথচ শান্তি নাই। স্রষ্টা এখানে স্বর্গ দিয়েছেন ঠিকই কিন্তু শান্তি দেন নাই। তার বিচার বুঝা খুবই কষ্ট! কেন যে তিনি মানুষ নামের এই পুতুলকে নিয়ে খেলেন--বুঝি না। আমি বুঝি না--বুঝতেও চাই না। আমি বুঝি মানুষকে এ পৃথিবীতে বাঁচার মত বাঁচতে হলে, আগে পায়ের নিচে মাটি, তারপর টাকা-পয়সা, স্ত্রী-পুত্র--এরপর ক্রমান্বয়ে প্রাসংগিক যা প্রয়োজন হয়। ন্যান্সি তার বিছানা নিজ হাতে ঠিক করল। মাঝখানে কোল বালিশটা দিয়ে আমাকে একপার্শ্বে শোআতে বলল। ও অন্য পাশে শোবে। একই বিছানায়! এবার আমি ঢোক গিলতে শুরু করলাম। যদি শোয়া অবস্থায় জড়িয়ে ধরে আর সেই মুহূর্তে মিসেস নজরুল বা বুয়া এসে হাজির হয় তবে--। কি লজ্জা! না, না শোয়া যাবে না। আমি মাথা ব্যথার একটিং শুরু করলাম।
-- কি হয়েছে? মাথা ব্যথা?
-- হ্যাঁ, খুব, তুমি ঘুমাও--আমি তোমার মাথায় হাত বুলিয়ে দেই।
-- আমার ঔষধ আছে, দাঁড়াও এনে দিচ্ছি।

ছোট বালিকার মত কথাবার্তা। কে বলবে, এর বয়স উনিশ। কিশোরী অবস্থায় মেন্টাল পেসেন্ট হওয়াতে সেই স্বভাবই রয়ে গেছে। হঠাৎ ডাক্তার এসে হাজির। আমি দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। সে এসেও একটিং শুরু করল। ন্যান্সির কাছে মাথা ব্যথা শুনে সে আমাকে মিছিমিছি একটা ইনজেকশন দিল। সেই সুযোগে ন্যান্সিও ইচ্ছে করে ইনজেকশন নিল। ডাক্তার আমাকে ওর সাথে ঘুমের ভান করতে বলল। ও একটু পরেই নাকি ঘুমিয়ে যাবে। লজ্জা আর ব্যক্তিত্বের কাছে হার মেনে, আমি তাই করলাম। ভেবে নিলাম, এটা জীবনের কোন এক রঙ্গমঞ্চে অভিনয়। নাটকের অভিনয় থেকে এটা অবশ্য বাস্তব ধর্মী এবং অনেক বেশি পারিশ্রমিক পাওয়া যাবে। ন্যান্সিকে বিছানায় শুইয়ে মাথায় হাত বুলালাম। আগামীকাল কোথায় কোথায় ঘুরতে যাব--তা নিয়ে গল্প করলাম। তার একটা হাত আমার একটা হাত ধরে আছে। সে কথা শুনতে শুনতে এক সময় ঘুমিয়ে গেল। আমি হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে উঠে পড়লাম। এক দৃষ্টিতে ন্যান্সির দিকে তাকালাম। বড় মায়া লাগল। মনে হল, বন্ধন বোধহয় এতক্ষণে বেঁধে গেছে। হঠাৎ মন বলে উঠল, ঘুমাও ন্যান্সি ঘুমাও--আমি আসব--অবশ্যই কাল আসব। তোমাকে আমি ভাল করবই। যে বিষাক্ত স্মৃতিগত জ্বালায় আমি জ্বলছি, তা তোমার কাছে আসলে যদি প্রশমিত হয়--তবে আমি অবশ্যই আসব। তোমার মাঝে যদি আমার সমস্ত প্রেম-ভালোবাসা খুঁজে পাই--তবে অবশ্যই তোমার কাছে আসব। ন্যান্সি ঘুমিয়ে আছে। আমার দিকে কাত হয়ে শুয়েছিল। সেভাবেই আছে। কি সুন্দর চেহারা! পেসেন্ট হবার আগে না জানি কত সুন্দর ছিল। তার মুখের উপর আল্পনার স্মৃতি-ছায়া ফেললাম...। চোখ আর্দ্র হয়ে এলো। ডাক্তার পিছন থেকে ডাকলেন। তার সাথে চললাম খাবার টেবিলে। উনি খেতে বসলেন। আমি দাঁড়িয়ে রইলাম তার পাশে। দেহে-মনে ক্লান্তি অনুভব করলাম।
-- আমি আসি।
-- এক্ষুণি যাবে? ও হ্যাঁ, অনেক রাত হয়ে গেছে।
মনে মনে ভাবলাম, জন্ম আমাদের অন্ধকারে। অন্ধকারের সরু ভয়ঙ্কর পথ ধরেই আমাদের যাতায়াত। রাত আর দিন--দু’টাই আমাদের কাছে সমান। ডাক্তার মিসেস নজরুলকে ইশারা করতেই সে আমাকে তার হাতের ডায়েরীটা দিল। ডাক্তার খাবার রেখে আমাকে বলল,
-- তুমি কি মনস্থির করেছ?
-- না-হ্যাঁ এর মাঝামাঝি আছি। ভেবে দেখি, আজ রাতটা।
-- ডায়েরীটা তুমি পড়বে। ন্যান্সি আর ফ্রান্সিস--ওদের সম্পর্কের সব জানতে পারবে। ডায়েরীর ভিতরে ছয় পৃষ্ঠার একটা নিবন্ধ দেওয়া আছে। এখান থেকে ওর জন্ম ও তার পরবর্তী সময় সম্পর্কে বুঝতে পারবে।

গম্ভীর হয়ে রইলাম। উনি আরো কিছু কথা বললেন। যা আমার মাথায় ঢুকল না কানের ভিতর ঢুকল বুঝলাম না। বিদায় নিলাম। মিসেস নজরুল হাসি মুখে আমাকে নিয়ে নিচে নামলেন। ড্রাইভারকে ডাকলেন। গ্যারেজ থেকে নতুন মডেলের একটা গাড়ি বের হল। গাড়িতে উঠতে বলল। একটা বক্স আমার হাতে দিলেন তিনি। ‘এটা রাখ। বাবা, আমি জানি তুমি পারবে। আজকের ঘটনা দেখে ও শুনে আমি বিশ্বাস করি ও ভাল হবে। ও তোমার মাঝে ফ্রান্সিসকে দেখেছে।’ আমি কিছুই বললাম না। শুধু মনে মনে অনুচ্চারিত কিছু কথা হৃদয় থেকে কর্ণকুহরে সঞ্চালিত হলো। মিসেস চৌধুরী, আপনি জানেন না, আমার বাবা একজন পরাজিত সৈনিক, আমি একজন পরাজিত সৈনিক। আমার নিজের প্রতি যেখানে সামান্য বিশ্বাস নেই, সেখানে আপনার বিশ্বাসের মর্যাদা কি করে দেব? আরশোলা হয়ে যদি ঢুকি, তবে বাঘ হয়ে বের হব। সময়ের কাছে পরাজিত হয়ে আজ আমি হয়ে উঠেছি অর্থলোভী, হিংসুটে। প্রতিটি মানুষ সুখী হতে চায় কিংবা চেষ্টা করে। আমি চাই--চাই একটা পছন্দসই মন, সম্পত্তি, প্রতিপত্তি, সম্মান--সর্বোপরি আজকের যুগে যারা অমানুষ হয়েও মানুষ হিসেবে সম্মানিত, পূজনীয় তাদের মতো একজন মানুষ হতে চাই। আমি মহৎ হতে চাই না। আর মহৎ ব্যক্তি হওয়া কোনদিনই আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আমার এমন মেধা নেই যে, যা দিয়ে কিছু করব। টাকা নেই, সম্মান নেই, পেটে অন্ন তথা পায়ের নিচে মাটিই নেই। চোখ বুঁজে এখন পারি, বড় কোন রাস্তায় ট্রাকের আশায় শুয়ে থাকতে। জানি, এটা মহাপাপ, কাপুরুষতা। কিন্তু আত্মহত্যা করাও তো কম সাহসের কথা নয়। আমার জীবনের দুঃখ স্মৃতির একশত ভাগের দশ ভাগ যদি স্মরণ করি তখনি আমার সারা শরীর কাঁপতে থাকে। সামনের জীবনের দিকে তাকিয়ে তখন শুধু পানি আর পানি দেখি--মাটি নাই--আশা নাই। পরজীবীর মতো ঘৃণা সইতে সইতে চাচার বাসায় কতটা বছর ছিলাম। তিক্ততায় মুখ ভরে আসে। দেড় কোটি বেকারের এদেশে, চার-পাঁচ বছরের শিশু শ্রমিকের এদেশে, ভাওতাবাজি রাজনীতির এদেশে, ইতিহাস বিকৃতির এদেশে, হা-ভাতের এদেশে, দুর্নীতির এদেশে--এখন শুধু পারি, ধনী কোন ব্যক্তির জন্য জীবন উৎসর্গ করতে। প্রতিদিনের আত্মপ্রচার করা ভণ্ড মিছিলের সম্মুখে থেকে বোমার আঘাতে ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারি। তাতে পত্রিকার পাতা ভরবে দলের সদস্যরা আরো হৈ চৈ বাঁধাতে পারবে। সুযোগ সন্ধানী নেতা তথা তার দল আমার মৃত লাশ আর রক্তের উপর সিঁড়ি বানিয়ে ক্রমাগত উঠতে থাকবে তার তথা তাদের কাঙিক্ষত লক্ষ্যে। একটি লাশ নিয়ে হয়তো দুই-তিনটি দল করবে টানাটানি। কেউ আমার মাথা নেবে, কেউ পা নেবে, কেউ হাত নেবে। আর যে দল পাবে না--তারা আমার ছবি দিয়ে তাদের খায়েস মিটাবে। এভাবে আবহমানকাল ধরে যা চলছে তাই চলবে। এর কোন বিরাম নেই। আমি এভাবে মরব না। আর যদি মরি, তবে আমাদের ঐ শিশু শ্রমিক, কুলি-মজুর, রিকসাওয়ালা, বেকারদের নিয়ে যারা ব্যবসা করে তাদের একটাকে অন্তত: শেষ করব। আর যদি বাঁচি, তবে বাঘের মত বাঁচব। জনারণ্যেই হাঁটব, যদি কেউ বাঘ বলে গুলী করে--মরব। তবুও বাঁচার মতো দু’দিনই বাঁচব। রাজধানী দখল করলে যেমন পুরো দেশই দখল হয়; আমি তেমনি এ বাড়ির রাজধানী দখল করব।

ধারাবাহিক উপন্যাসঃ হৃদয়ের এপিঠ-ওপিঠ (পর্ব-১০)
--শাশ্বত স্বপন

আবেগ মানুষকে কত কি ভাবায়। সব কি সত্য হয়? মানুষ ভাবে এক, হয় আরেক। ভালোবাসার কথা ভাবলাম। মাত্র একদিনেই ন্যান্সির জন্য মনটা কেমন করছে। আমি কি ওকে ভালোবেসে ফেলেছি? এ কি করে সম্ভব!। শোষক আর শোষিতের মধ্যে যে সেঁতু থাকে সেতো ভালোবাসার নয়--ঘৃণার, হিংসার। গাড়ি ছেড়ে দেবার মুহূর্তে মিসেস নজরুলকে সালাম দেইনি। নিজের চিন্তা-ভাবনা আর আবেগের উপর দশটা গালি দিলাম। মনে মনে থুথুও ছুঁড়ে মারলাম। আমার বিবেক আমাকে বলছে--
-- তুমি জান না, তুমি কি আগুন নিয়ে খেলতে যাচ্ছ।
-- না, আমি জানি, সব জানি। পরাজিত সৈনিকের বিজয় দেখতে চাই।
-- টাকা, সম্পত্তি, সম্মান, ভালোবাসা তোমাকে ভালোবাসলেও সুখ-শান্তি তোমাকে কোনদিন ভালোবাসবে না।
-- আমি সুখ চাই না, শান্তি চাই না--আমি বড় হতে চাই।
-- তুমি কি সত্যিই যাবে?
-- হ্যাঁ, যাব।
-- আল্পনাকে ভুলে গেছ?
-- অসম্ভব, কোনদিনই না।
-- আজ রাতটা ভেবে দেখ।
হ্যাঁ, ভাবব, তবে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন হবে বলে মনে হয় না কারণ পঁচিশ বছরের পরবর্তী বছরগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে আমি সন্দিহান। পায়ের নিচে মাটি নেই। ছোট ভাইটাকে পারি না খরচ দিতে। নিজের পেটটাকে পারি না দু’বেলা খুশি করতে। মৃত্যুর পূর্বে তখন সম্মুখের কাউকে লক্ষ্য করে বলব, ছাপান্ন হাজার বর্গমাইলের বাংলাদেশে আমার জন্য, আমার অধিকারের সাড়ে তিন হাত ভূমিও নেই। এসবই তো মানুষের জন্য--সৃষ্টিকর্তা মানুষের জন্যই তো এসব কিছু সৃষ্টি করেছেন। এসব কিছু তো মানুষের জন্যই সিদ্ধ--তবে আমার জন্য কেন এসব নিষিদ্ধ? আমি কি মানুষ নই?

আমার বিবেক আমার যুক্তির কাছে হার মেনে চুপ মেরে আছে। যুগে যুগে প্রত্যেকের বিবেক প্রত্যেকের কাছে হার মানতে মানতে এক সময় বিবেকই বিলুপ্ত হয়ে যাবে। সবাই হবে তখন বিবেক বর্জিত। বিবেক বর্জিতদের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়বে--কমবে না। বিবেক দিয়ে মনুষ্যত্ব বাড়ানো যায় কিন্তু আজকের যুগে মানুষ নামক প্রাণিটিকে টিকিয়ে রাখা যায় না।

সিগারেটের দোকান চোখে পড়তেই হঠাৎ গাড়ি থামাতে বললাম। ড্রাইভারকে বড়লোকী স্টাইলে ৫৫৫ সিগারেট কিনতে বললাম। ম্যাচও আনতে বললাম। পকেটের পুরো টাকা খরচ করলাম। বিবেককে হারিয়েছি। বড় আনন্দ লাগছে। আমি বড়লোক হব কিনা জানি না, তবে ধনী হতে পারব। কাল থেকে হবে যাত্রা শুরু। গাড়ি ইত্তেফাকের মোড়ে আসতেই তাকে থামতে বললাম। ‘‘আমি হেঁটেই যেতে পারব”--একথা বলে ড্রাইভারকে বিদায় করলাম। ড্রাইভার আমাকে নামিয়ে দিয়ে চলে গেল। আজও সিঁদুরকে পড়াতে যাওয়া হয়নি। দুই মাস না যেতেই এত বন্ধ! টিউশনিটা বোধহয় বন্ধ হয়ে যাবে। যাক না বন্ধ হয়ে। টিউশনি করার দরকার নেই। এখন শুধু ন্যান্সি আর ন্যান্সি। এটাই আমার এম.এ কোর্স। এখান থেকে হয় এম.এ পাস করব, নয়তো ফেল করব। লক্ষ্য আমার এখন বড় হওয়া। কেউ ডাক্তার, কেউ ইঞ্জিনিয়ার, কেউ নেতা, কেউ ব্যবসায়ী হয়ে, কেউ মানুষের ভালোবাসা ও বিশ্বাস কিনে বেঁচে বড় হয় বা হতে চায়। আমি বিশ্বাস এর শিকড় ধরে ভালোবাসার সেঁতু বেয়ে বড় হতে চাই। এখানে আমার অর্থগত মূলধন নেই; অথচ পাব খাদ্য, ভালোবাসা, বেতন আর রিটায়ার্ট শেষে বিরাট সম্পত্তি ও সম্পদ। বড় হওয়ার জন্য সম্মুখে প্রশস্ত পিচ্ছিল পথ। সাবধানে পথ চলতে হবে। বেশি আশা করা বোধহয়, ঠিক হচ্ছে না। ভাগ্য বিধাতা ক্ষেপে গেলে শেষে দুঃখ ছাড়া কিছুই ঘটবে না। স্বপ্ন দেখতে বাঁধা কোথায়? আমাদের হা-হুতাশ জীবনে স্বপ্নের চেয়ে সান্ত্বনার মতো বড় আপন আর কে আছে? সবাই বড় হবার স্বপ্ন দেখে। দেখতে দেখতে এক শত তলা বিল্ডিং গড়ে। সেটা ঘুম ভাঙ্গলেই ভেঙ্গে যায়। তাই আবার গড়ে। ভাঙ্গা আর গড়া নিয়েই আমাদের স্বাপ্নিক জীবন। জীবনের অর্ধেক, হয়তো অর্ধেকের বেশি (যদি এ দুঃসহ জীবন চল্লিশ-পয়তাল্লিশ বছর লাস্টিং না করে) সময় সততা, বিদ্যা, দুঃখ-কষ্ট আর টিউশনি নিয়ে কাটিয়েছি। সেই সততা, বিদ্যা, দুঃখ-কষ্ট যখন আগত ভবিষ্যতের সুখ-শান্তির নিশ্চয়তা দিতে পারে না, তখন ঘৃণা করি সততা আর বিদ্যাকে। আমি ভালোবাসি বাস্তব, বিশ্বাস করি চক্ষু সম্মুখের বাস্তবকে। অবাস্তব আর অবিশ্বাসকে একেবারে উড়িয়ে দিচ্ছি না। কারণ আমি জানি, অবাস্তব আর অবিশ্বাসকে একেবারে উড়িয়ে দিতে গেলে বাস্তবের আর বিশ্বাসের মূল আর শাখা-প্রশাখায় টানা-হেঁচড়া শুরু হয়ে যাবে।

যারা বেশি জানে, বেশি বুঝে--তাদের বেশি ভুল হয়। কারণ তারা যেহেতু বেশি বুঝে--তাই তারা তাদের ভুল বেশি ধরতে পারে। আর যারা কম জানে, কম বুঝে--তারা কম ভুল করে। কারণ তারা তাদের ভুলগুলোকেও সঠিক মনে করে--যেহেতু তাদের বিচার, বোধ শক্তি কম। আমি বেশি বুঝি, না কম বুঝি--তা জানি না। তবে এইটুকু বুঝি, মাঝে মাঝে সময়ের প্রয়োজনে অনিচ্ছা সত্ত্বেও মানুষকে ভুল করতে হয়--আমিও করি। জেনে শুনেও মানুষ যুগ যুগ ধরে মিথ্যাকে প্রতিপালন করে আসছে। মিথ্যা হচ্ছে সত্য আর সত্য হচ্ছে মিথ্যা। আমি জানি, আমার বিচার শক্তি কম আর বিবেক শক্তি তো হেরেই যায়। তাই আমি সত্য আর মিথ্যার মাঝামাঝি। সত্য আমাকে ঠাঁই দিতে পারছে না বলে কখনও মিথ্যার কাছে ছুটে যাই। আর মিথ্যা না পারলে সত্যের কাছে। সুবিধাবাদী হয়েও সুবিধা করতে পারছি না। তাই নতুন নতুন কৌশল নিয়ে এগোচ্ছি সামনের দিকে, যেখানে মিথ্যার ভীড়ে সত্য কাফনের কাপড় পড়ে ঘুমিয়ে আছে।

আমি আগামীকাল এমন এক কাজে যাচ্ছি, যে কাজ থেকে আর হয়তো ফিরব না। পিপীলিকার পাখা গজালে যেমন আগুন খেতে চায়--আমিও তেমনি এক পিপীলিকা সদৃশ। আমিও আগুন খেতে চাই--হজম করতে চাই। পারব কিনা জানি না। মাটির মানুষ আমি। মাটিই পারে আগুন চাপা দিয়ে রাখতে। আবার মাটিই পারে তার বুকে আগুন জ্বালিয়ে রাখতে। এদেশে অসংখ্য পরাজিত সৈনিক। পরাজিত সৈনিকের পরাজয় দেখার মতো মানুষ এদেশে খুব কমই আছে। না খেয়ে মরে গেলেও আজকাল কেউ সাহায্য দেয় না। আর যদিও বা দেয়, তাও পার্থিব বা আধ্যাত্মিক স্বার্থে।

ধারাবাহিক উপন্যাসঃ হৃদয়ের এপিঠ-ওপিঠ (পর্ব-১১)
--শাশ্বত স্বপন

স্বার্থ ছাড়া পৃথিবীর কোন কাজ হয় না। এই যে, মা-বাবা-সন্তান--এখানেও স্বার্থ আছে। একজন নারী মা হওয়ার জন্য সন্তান গর্ভে ধারণ করে। তারপর সন্তান ভূমিষ্ঠ হলে লালন-পালন করে। আবহমান কাল ধরে পৃথিবীতে এ প্রথা চলে আসছে। সমাজে নারী সন্তানহীন হলে, তার কোন মূল্য নেই। বৈয়াকরণবিদরা ব্যাকরণে সন্তান না হলে, নারীকে বিশেষিত করেছেন বন্ধ্যারূপে। সন্তান জন্ম হয়ে মারা গেলে (অর্থাৎ যে নারীর সন্তান বাঁচে না) বিশেষিত করেছেন মৃতবৎসারূপে। আর, একটি মাত্র সন্তান হওয়ার পর জীবনে যদি আর কোন সন্তান না হয় তবে সেই নারীকে বিশেষিত করেছে কাকবন্ধ্যারূপে। পুরুষের কারণে সন্তান না হলে বা পুরুষের সন্তান না থাকলে কি বিশেষণ আছে--তা আমার জানা নেই। তবে সন্তান জন্মের ব্যাপারে পুরুষ অক্ষম হলে, সে সমাজের চোখে হাস্যকর কোন বস্তুরূপে বিবেচিত হয়। অতএব, মা-বাবার স্বার্থ পুত্র-কন্যার উপস্থিতি, তাদের সুপ্ত ভালোবাসা ঢেলে দেওয়া। তারপর বার্ধক্যে সেবা-যতেœর স্বার্থ থাকে। জন্মের পর শিশুর স্বার্থ মা-বাবার সন্তান বাৎসল্যতা। যে স্বার্থ ছাড়া সে বাঁচতে পারে না। সন্তানহীন নারী পারে না, পূর্ণাঙ্গ নারীরূপে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে। পুরুষ পারে না, নিজেকে পুরুষ ভাবতে। অতএব, জন্মে স্বার্থ--জন্মান্তে স্বার্থ। স্বার্থ ছাড়া পৃথিবী অচল, মানুষ অচল। আমি এই মহা মূল্যবান স্বার্থকে উদারনীতিতে ভাবব কেন? আমার স্বার্থও আমি দেখব, দশজনে যেমন দেখে। ক্ষমতার জন্য যেখানে নেতা-নেত্রীরা মানুষকে মানুষ ভাবে না। যেখানে তারা মানুষকে ভাবে উপরে উঠার সিঁড়ি। যাদের উপর ভর করে ক্ষমতায় যাওয়া--তাদের জীবন নিয়ে তারা করে ছিনিমিনি খেলা। আমি কারো জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলিনি। বরং আমাকে নিয়েই অনেকে খেলেছে। রাষ্ট্রও আমাকে তথা আমাদের নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে। আমি একটা মেন্টাল পেসেন্টকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনব। ভালোবেসে তার হৃদয় জয় করব। ভালোবাসায় স্বার্থ থাকুক তাও ভালো; তবুও সন্ত্রাস ভালো না--দুর্নীতি ভালো নয়--কালোবাজারী ভালো নয়।

রাত এগারটা বেজে গেছে। ইত্তেফাকের মোড় থেকে শাপলা চত্বর পর্যন্ত হাঁটলাম। তারপর ভাবতে ভাবতে মেসে আসতে লাগলাম। রুমে এসে চিন্তা করতে পারব না। সেলিমের বকবকানি আর টেপের গান--দু’টাই চিন্তা কেড়ে নেবে। সেলিম একটা মেয়েকে ভালোবাসে। আগে মেয়েটি তাকে মোটেও ভালোবাসতো না। এখন ভালোবাসে। তার বিশ্বাস, সে ফকির-টকিরের মাধ্যমে মেয়েটির মন জয় করেছে। আমার এসবে বিশ্বাস নেই। আমি তার কথায় শুধু সায় দিয়ে গেছি। ঢাকাতে এক বিখ্যাত রাজনীতিবিদের মেয়ের সাথে তার পরিচয় আছে। দু’জনে গান শিখত কোন এক সংগঠনে। মেয়েটির বাবা মন্ত্রী হবার পর এখন তাদের সাথে শুধু টেলিফোনে যোগাযোগ। তার কথাবার্তায় বোঝা যেত মেয়েটির সাথে তার ভালো টার্ম ছিল। কারণ দু’জনেই বস্তুবাদী ছিল। এই মেয়ের সাহায্যেই সে চাকুরি পেয়েছে। চাকুরি পাবার তিন-চার মাস পরে সে হঠাৎ একদিন বলল, এই মেসে সে থাকবে না। একটা হাইফাই ফ্ল্যাট ভাড়া নেবে। গ্রামের সেই বিশ্ব সুন্দরীকে সে ফ্ল্যাট দেখাবে। বিশ্ব সুন্দরী এই কারণেই বললাম, তার কাছে সেই মেয়ে নাকি পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি সুন্দরী মনে হয়। আমি অবশ্য প্রশ্ন করেছিলাম,
-- মন্ত্রীর মেয়ের চেয়ে সুন্দরী?
-- না, তা নয়।
-- তবে বিশ্ব সুন্দরী হলো কি করে?
-- তা তুই বুঝবি না।
-- এই মেয়ে ছেড়ে মন্ত্রীর মেয়েকে ধর।
-- বলিস কি, এটা সম্ভব?
-- কেন তোরা দু’জনেই তো বস্তুবাদী।
-- বস্তুবাদী হলেই হলো? এটা সম্ভব নয়।
-- তাহলে শিউলী কি করে সম্ভব হলো?
-- বাদ দে, তুই যখন তাবিজ-কবজ বিশ্বাস করতে চাস না--করিস না।
-- না করি তো, তোর তাবিজ-কবজ দিয়ে আমাকে একটা চাকুরি দে না।
-- চাকুরি-বাকুরি তাবিজ-কবজ দিয়ে হয় না।
-- শুধু ভালোবাসা হয়?
-- হ্যাঁ।

তাঁর সাথে যখন রুমে উঠি তখন সে নিজেকে নাস্তিক বলে বেশ জ্ঞানী ভাব দেখাত। অবশ্য সব নাস্তিকরাই নিজেদেরকে জ্ঞানী ভাবে। ভাবে, সে যা বুঝে যা সে বিশ্বাস করে--সেটাই সত্য--সেটাই সঠিক। ব্যাঙ যেমন কুয়াকে পৃথিবী ভাবে--তারাও তেমনি। তখন শিউলী সেলিমকে ভালোবাসত না। যেই না মেয়েটি তাকে ভালোবাসতে শুরু করেছে, তখনি সে সিগারেটসহ সকল ধূমপান ছেড়ে দিল। আধূনিক-এর সদস্য হলো। কারণ শিউলী তাকে এসব খেতে নিষেধ করেছে। অথচ এক সময় সৃষ্টি আর সৃষ্টিকর্তা সম্পর্কে এমন সব নাস্তিকবাদী কথা বলত--যা শুনলে কট্টর নাস্তিকও হাসত। আর আজ মসজিদ আর জায়নামাজ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে ওঠে। আমি অবশ্য তেমন কিছু মনে করিনি। এরকম বহু নাস্তিক দেখেছি, শুনেছি--যারা যৌবনে কিংবা কৈশোরে বেশ গলাবাজি করে কিন্তু বার্ধক্যে কোরান, গীতা আঁকড়ে ধরে কাঁদে। জায়নামাজ, গীতার পাতায় চোখের জল ফেলে। সেলিমের বেলায় অবশ্য একটু অবাক লেগেছিল। এত তাড়াতাড়ি সে মসজিদে ফিরে আসবে, ভাবিনি। আমি একদিন জিজ্ঞাসা করেছিলাম--
-- কি রে তুই না নাস্তিক?
-- তাতে কি? নামাজ পড়তে অসুবিধা নেই। মুসলমান হয়ে জন্ম নিয়েছি তো।
-- মুসলমান হয়ে জন্ম নাওনি, মুসলমানের ঘরে জন্ম নিয়েছ।
-- ঐ একই কথা।
-- নাস্তিকের কোন ধর্ম নেই। নাস্তিকরা তো নামাজ পড়ে না।
-- বাদ দে ওসব। এমন অনেকেই বলে। বার্ধক্যে এরাই বেশি নামাজ পড়ে।
-- তুই তো এখনও বার্ধক্যে আসিসনি।
-- হতে আর কয়দিন। যে কোন মুহূর্তে মরে যেতে পারি।
-- বলিস কি! তাহলে তোর শিউলী?
-- ঠাট্টা রাখ, ভালোবাসার তুই কিছু বুঝিস না। ভালোবাসিসনি তো?
--আমার চেয়ে বেশি ভালো কে বাসতে পারে? তুই জানিস না সেলিম, আমি কি রকম ভালোবাসতে পারি।
--রকম ভালোবাসা বুকে নিয়ে আজো বেঁচে আছি। সে আমি জানি--আর জানে প্রেম-স্রষ্টা।
-- তুই কি আমার কথায় দুঃখ পেয়েছিস? আরে আমার কথা আর পাগলের কথার মধ্যে কোন পার্থক্য আছে?

রোজার মাসে সে এমন সংযমী হলো--যা চিন্তাও করা যায় না। তিরিশটা রোজা নিখুঁতভাবে রাখল। দান-খয়রাত, নামাজ-রোজা, তপজী জপা--যেভাবে চলল তাতে আমার মনে হলো--‘উনি বোধহয় পৃথিবীতে আর থাকবেন না’। এক মাস সে কোন গানও গাইল না, কোন গান শুনলও না। তার বড় সখ হল, সে হজ্জ্ব করবে। তার নামের আগে আলহাজ্ব শব্দটা থাকবে। তার নাম হবে আলহাজ্ব মোঃ সেলিম সিকদার। অবশ্য টাকার অভাবে তার আশা দীর্ঘনিঃশ্বাস হয়ে রইল।

ধারাবাহিক উপন্যাসঃ হৃদয়ের এপিঠ-ওপিঠ (পর্ব--১২)
--শাশ্বত স্বপন

রুমে ঢোকার সাথে-সাথে আমার প্রিয় গান কানে ভেসে এল। ‘আমি জেনে-শুনে বিষ করেছি পান...।’ হ্যাঁ, আমি জেনে-শুনেই বিষ পান করতে যাচ্ছি। সেলিম তার বিছানায় শুয়েছিল। আমাকে দেখেই চিৎকার করে উঠল। আমাকে জড়িয়ে ধরে দু’গালে চুমো বসিয়ে দিল। চিৎকার করে বলল, শিউলীর চিঠি এসেছে। হায়রে সেকি আনন্দ! রসগোল্লা পর্যন্ত কিনে এনেছে। সবকিছু ভুলে ওর আনন্দে যোগ দিলাম। ও ক্যাসেট চেঞ্জ করে ইংরেজি গান ছাড়ল। নৃত্য শুরু করল। শিউলীর পাঠানো চিঠিটা চারবার আমাকে পড়ে শোনাল। তারপর বুকের বোতামটা খুলে গেঞ্জির নিচে চেপে বিছানায় গড়িয়ে পড়ল। এরকম পাগল না দেখলেও এদের পরিণাম সম্পর্কে আমার ধারণা স্পষ্ট। আমি বললাম--
--এত সুখ তোর সইবে নারে।
--দোস্ত, দোয়া কর। আমি এখনই নামাজ পড়ব।
--আরে বারটায় কিসের নামাজ?
-- আরে তুই বুঝবি না।
-- তবে এইটুকু বুঝি নামাজ কেন তুই পড়িস।
-- দেখ, কি করা যায় সেই চিন্তা কর। আগামী মাসে শিউলী আসবে।

সেলিম নামাজ-রোজা করে। আমি কিছুই করি না। ও স্রষ্টাকে ভয় পায়--আমিও ভয় পাই। সারা দিন পর রাতে যখন ডায়েরীতে কিছু লিখি তখন দুই-একটা মিথ্যা কথা ছাড়া আর কোন পাপ আমি দেখতে পাই না। হয়তো অজান্তে অনেক পাপ করি--যা বিবেচনায় ধরি না। অথচ সেলিম অলরেডি ঘুষ খাওয়া শুরু করেছে। সে এটাকে ঘুষ না বলে ‘উপরি’ বলে। ও আস্তিক আমিও আস্তিক। আস্তিকের সংজ্ঞায় আমরা দু’জনেই পড়ি। ও মুসলমান বলে নিজেকে মনে করে কিন্তু আমার সে ব্যাপারে সন্দেহ আছে। ও আসলে ধার্মিক, না ভণ্ড ধার্মিক, নাকি ধর্মের আবরণে ব্যবসা করছে--আমি স্পষ্ট বুঝতে পারছি না। মানুষের বাহ্যিক আচরণ দিয়ে তার অন্তর বিচার করা যায় না। সে তাবলীগে ছুটোছুটি করে। অথচ আমি প্রচলিত, জনপ্রিয় কোন ধর্মাচরণের ধারে কাছেও নাই। আমি চন্দ্রগুপ্ত এর প্রধানমন্ত্রী চাণক্য পন্ডিত (বিষ্ণুপদ দত্ত) এর অমর বাণী সব সময় মনে রাখি, ‘মন পবিত্র থাকলে পবিত্র স্থানে গমন অর্থহীন’। আমি মনে করি, অপবিত্র মনের মানুষেরাই পবিত্র স্থানে বেশি ছোটাছুটি করে, এত স্রষ্টা সন্তুষ্ট হয় বলে আমার মনে হয় না। নিজের স্বার্থে, স্রষ্টাকে সন্তুষ্ট করার জন্য নিষ্পাপ ব্যক্তির চেয়ে পাপী ব্যক্তিরা অন্ধের মত মসজিদ-মন্দির-মাজার-পীর আওলিয়া-পুরোহিত সহ আরো নানা স্থানে এবং নানা ব্যক্তির কাছে ছুটছে। যেখানে মানুষ না খেয়ে মরছে--জীবন যেখানে মৃত্যুতুল্য--মানুষ যেখানে বেড়েই চলেছে--অন্যায় যখন স্রষ্টার মসজিদ-মন্দিরেই ঘটছে--সেখানে টিকি, দাঁড়ি, টুপি দিয়ে এসব সমস্যার সমাধান হবে না। সমাজ পরিবর্তনশীল, মানুষের মন-মানসিকতা পরিবর্তনশীল। এ স্বাধীন হৃদয়কে পুরনো খাঁচায় মিছে আবদ্ধ করে লাভ কি? সে যখন খাঁচায় থাকছে না--থাকতে চাচ্ছে না, তখন বাইরের মুক্ত আলোতেই সত্য তুলে ধরা উচিত। সেলিম জেনে শুনেই পাপ করে। আবার নামাজ-রোজাও করে। তার কাছে এটাই আজকের নিয়ম। একেবারে সাধু হয়ে বর্তমানে টেকা যায় না। কথা ঠিকই। কিন্তু বর্তমান এমন হলো কেন? এতো একদিনে হয়নি। ধর্ম যখন ব্যবসার দ্রব্য হয়ে যাচ্ছে তখন কি লাভ এসব ঠেকিয়ে? এতো স্রষ্টা ছাড়া মনুষ্যজাতীর পক্ষে সম্ভব নয়। আমরা তাকেই ডাকি।

শিউলী আসবে আগামী মাসে। বদরুন্নেসা ও ভিকারুন্নেসা কলেজে ভর্তি টেস্ট দেবে। থাকবে ঢাকাতে--তার এক কাকার বাসায়। শিউলীকে দেখানোর জন্য তার ভাষায় হাইফাই একটা ফ্লাট দেখতে হবে। বিগত আট বছর ধরে সে এই মেয়েটির পিছনে লেগেছিল। এস.এস.সি পরীক্ষার পর সে সেলিমের স্বপ্নও থেকে বাস্তবে ধরা দিয়েছে। অতএব, কেন সে এত পাগল--তা আমি উপলব্ধি করতে পারি। আজ ন্যান্সির ব্যাপারে ওকে কিছু বললাম না। ওর যা অবস্থা তাতে বমি করার সম্ভাবনা আছে। হয়তো চিৎকার শুরু করে দেবে। সেলিম নামাজের ভঙ্গিতে কি যেন প্রার্থনা করল। তারপর টেপটা বুকের কাছে এসে গান ছাড়ল--“ওগো মোর মধুমিতা...।” নতুন রেকর্ড করা ক্যাসেট। গান শেষ হওয়ার সাথে সাথে আমাকে জানাল, শিউলী ফ্ল্যাট রুমে ঢোকার সাথে সাথে যেন, এ গানটা আমি ছাড়ি। আমি সায় দিলাম। সে কখনো একাত, কখনো ওকাত হচ্ছে। বালিশটা বুকের কাছে নিয়ে শিউলী প্রতীক ভেবে জড়িয়ে ধরছে। গ্লাসে গ্লাসে ওরস্যালাইন খাচ্ছে। সন্ধ্যা হতে তার ডায়রিয়া। বারবার পায়খানায় যাচ্ছে। কিছুক্ষণ পর পর তার মনের মত সাজানো জিনিসের নাম বলছে। কি কি দিয়ে রুম সাজাবে তার লিস্ট আমাকে শোনাচ্ছে। এখনও একমাস বাকী। যেভাবে লিস্ট শুরু করেছে-- সেভাবে প্রতিদিন যদি করতে থাকে তাহলে পঞ্চাশ বাই চল্লিশ ফুট রুমে, সেগুলোর জায়গা সংকুলান হবে কিনা সন্দেহ। হায়রে প্রেম! আমার কাছে ‘পুতুলের বিয়ে’ খেলার মতো মনে হয়। সে আনন্দে আছে। সে তার শিউলীকে পাবে--এই চিন্তায় সে বিভোর। তার ভালোবাসা তার বিশ্বাসকে খাট করে দেখার অধিকার আমার থাকা উচিত নয়। বারবার বিরক্তির ফলে ডায়েরী পড়তেও পারছি না। তাই অনেকটা জোর করে তার ছোট্ট ডিসপেনসারী থেকে ঘুমের একটা ট্যাবলেট খাওয়ালাম। তার মামার ঔষধের দোকান। সে দোকান থেকে প্রায়ই ঔষধ এনে এই ছোট ডিসপেনসারীতে রাখে। সে ঘুমাতে চেষ্টা করছে। টেপে বেজে চলেছে জগন্ময় মিত্রের গান। আমি কাত হয়ে ডায়েরীর প্রথম একটা পাতা মনোযোগ সহকারে লক্ষ্য করলাম।
নূসরাত চৌধুরী (ন্যান্সি)
৬৬, কামাল আতাতুর্ক রোড, বনানী
ফোন নং:৯৮৯৪৬০৬, ৯৬৬৬২০৪

প্রায় সবই ইংরেজিতে লেখা। মাঝে মাঝে বাংলা। বুঝা যাচ্ছে, সে ইংলিশ মিডিয়ামের ছাত্রী ছিল। বাংলা হাতের লেখা মোটেই পরিস্কার না। প্রথম পাতার উপরে তারিখ দেওয়া ০১.০২.৮৪। মানে আজ থেকে দশ বছর আগে। ডাক্তার বলেছেন তিন বছর যাবৎ মেন্টাল পেসেন্ট। তার মানে ’৯১-’৯২ থেকে ’৯৪। হঠাৎ সেলিম ঘুম থেকে জেগে উঠল। তার পায়খানা ধরেছে। চোখে তার রাজ্যের ঘুম। ট্যাবলেটটা খাওয়ানো ঠিক হয়নি। কি করব? যেভাবে পাগলামী শুরু করেছে তাতে সারা রাতেও ঘুমাতে পারত কিনা সন্দেহ। বাথরুম থেকে ফিরে এসে বলছে, আবার যেতে হবে। আবার বাথরুমে গেল। ফিরে এসে বলল, মাথা ভার ভার লাগছে। আমি ওকে শোয়ালাম। ওরস্যালাইন খাওয়ালাম। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলাম। না, উঠছে না। বিছানায় পায়খানা করলে করুক। সকালে ওকেই ধুতে হবে। তবুও ঘুমাক। একটি মেয়ে গ্রাম থেকে শহরে আসবে ভর্তি পরীক্ষা দিতে। চান্স পাবে কিনা কে জানে। ভর্তি পরীক্ষার কারণে সে সেলিমের সাথে দেখা করবে। তাতেই সেলিম কি মহাখুশি। আর যদি অন্য কিছুর অফার দেয়, দ্যাট মিনস পালিয়ে যাওয়া, বিয়ে--তাহলে নির্ঘাৎ উন্মাদ হয়ে যাবে। এই মেয়ে তার আশা-আকাক্সক্ষার সাথে নাও মিলতে পারে। ভাল লাগা, ভালোবাসা, বিয়ে--তিনটাই ভিন্ন বিষয়। নারী কি চীজ, সেলিম হয়তো জানে না। আমি জানি, ও না জেনে বিষপান করতে যাচ্ছে। আর আমি জেনে শুনে বাস্তবকে বুকে আঁকড়ে ধরে বিষপান করতে যাচ্ছি। আমি জানি, এখানে আমার জয়-পরাজয় দু’টাই অপেক্ষা করছে। সেলিম জয় ছাড়া এখন আর পরাজয়ের কথা ভাবছে না। সে জানে, যাদুর ফলে শিউলী তার জীবনে বন্দি। যে বিশ্বাসে সে পূজা করে--তা করুক না--তাতে আমার কি? তবে এ বিশ্বাস যেন অন্যতে সঞ্চালিত না হয়--এ বিশ্বাস যাতে খুনা-খুনির পর্যায়ে না যায়-- সে জন্যই আমার মাথা ব্যথা।

ধারাবাহিক উপন্যাসঃ হৃদয়ের এপিঠ-ওপিঠ (পর্ব-১৩)
--শাশ্বত স্বপন

মনোযোগ সহকারে ডায়েরী পড়া শুরু করলাম। ডাক্তারের দেওয়া ছয় পৃষ্ঠার কাগজটাও পাশাপাশি পড়তে লাগলাম। জন্ম তারিখ ও প্রিয়-অপ্রিয় কিছু জিনিস--যা ন্যান্সি পছন্দ করে। তার প্রিয় ফল আপেল। আমার সাথে মিলে গেছে। মাঝে মাঝে কাঁটাছেঁড়া--এমনভাবে লেখা যা বুঝাও কষ্টকর। দৈনন্দিন কার্যকলাপ-যার বেশির ভাগই ফ্রান্সিসকে নিয়ে লেখা। দুইটা ছবিও পাওয়া গেল। একটাকে ফ্রান্সিসের গায়ের উপর ন্যান্সি হেলান দিয়ে আছে। অন্যটিতে ফ্রান্সিস ন্যান্সিকে চুমো দিচ্ছে। সে বেশ লজ্জা পাচ্ছে। ন্যান্সি সামনের আটটি দাঁত বের করে, চোখ ছোট করে দেয়ালে হেলান দিয়ে আছে। খুব সুন্দর জুটি। আমি এমন কিছু ভাবলাম--যা অন্তরে ব্যক্ত, মুখে অব্যক্তই রইল। ডাক্তার এর দেওয়া পুরো কাগজ পড়লাম, ভাবলাম। বার বার বিস্মিত হলাম। স্বর্গ নামক স্থানটা বড় আকাংখিত হয়ে উঠল আমার কাছে। ঘুম আসছে না। আল্পনার স্মৃতি ভেসে আসছে। ক্যাসেট চেঞ্জ করলাম। হেমন্তের গান ছাড়লাম। চোখের পাতা ভারী হয়ে আসছে। ডায়েরীর পাতা ক্রমাগত পড়তে পড়তে ভোর করে ফেললাম। শেষের পাতা পড়ে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লাম। মনে মনে বললাম, “হে স্রষ্টা, ফ্রান্সিসকে নেওয়ার জন্য হিংস্র যখন হয়েছিলে তখন ন্যান্সিকেও নিয়ে যেতে।’ ছিয়ানব্বই পৃষ্ঠা। সামান্য সামান্য লেখা বলেই শেষ করতে পেরেছি। ভোরের আযান শোনা যাচ্ছে। ‘আসসালাতু খাইরুম মিনান না-ঊম...।’ কি মধুর আযানের সুর! শুনলে শুনতে ইচ্ছে করে। বারবার শুনতে ইচ্ছে করে। সেলিম আজ নামাজ পড়ার জন্য উঠবে না। তার শারীরিক অবস্থা চিন্তা করে আমি উঠালাম না।

পুরো ব্যাপারটা আমার কল্পনাতে নিয়ে গেলাম। গল্প দাঁড়াল এ রকম--নজরুল চৌধুরী ও রেহানা ইয়াসমিনের বিয়ে হওয়ার আট বছর পরও তাদের কোন সন্তান হয়নি। বহু সাধনার পর বিয়ের নবম বছরে তারা এ কন্যাকে পায়। ন্যান্সির জন্ম তারিখ ০২.০১.১৯৭৬। জন্ম থেকে সে পার্থিব স্বর্গসুখে বড় হতে লাগল। তার জন্মের পাঁচ বছর পর্যন্ত তাদের আত্মীয়-স্বজন ও গুণগ্রাহীরা ন্যান্সিকে ফুল দিতে দিতে ফুল বাগানের ফুলকুমারী বানিয়েছিল। তার বিছানা ফুলে ফুলে ভরে যেত। ফুলের উপর সে নিদ্রা যেত। ফুলের মূল্য সে কখনও অনুভব করেনি। সাত বছরের পর থেকে ফুলের পরিমাণ কমতে লাগল। তার ব্যক্তিগত বাড়ি-গাড়ি, গ্যারেজ, ফুলবাগান, অডিটোরিয়াম, চাকর-বাকর ইত্যাদি দিয়ে তার প্রাপ্য সম্মান দেওয়া হলো। পৃথিবীতে এসে সে চৌধুরী ও রেহানার নিঃসন্তান ও বন্ধ্যাত্ব এর অভিশাপ থেকে বাঁচিয়েছে। কোটি কোটি টাকা খরচ হয়েছে একটি সন্তান সাধনায়। আজমীর শরীফ থেকে শুরু করে মসজিদ, মাজার, এতিমখানা, কাঙ্গালী ভোজ, যাকাত, দান-খয়রাত ইত্যাদি কোনকিছুই বাদ ছিল না। ন্যান্সি কথা শেখার পর থেকে যা চাইত তার অনেক গুণ বেশি পেত। প্রতিদিনি তার টিচারের সংখ্যা সাবজেক্ট এর চেয়ে বেশি ছিল। টিচারদের গাড়ি করে নিয়ে আসা হত। আবার তাদের গন্তব্যস্থলে পৌঁছে দেয়া হত। ন্যান্সির দু’গালে, ঠোঁটে ও কপালে কত লক্ষ আশীর্বাদ স্বরূপ চুমো পড়েছে--তার হিসাব সাধারণ ক্যালকুলেটরে জায়গা হবে না। মাটি কি জিনিস--তা ন্যান্সি বইয়ে পড়েছে কিন্তু স্পষ্ট করে কখনও দেখেনি। জন্ম থেকে তার অসুখ লেগেই থাকত। মাথা ব্যথা, ঠাণ্ডা, জ্বর, সর্দি তার নিত্যদিনের ব্যাপার। পারিবারিক ডাক্তার ছিলেন দু’জন। যাদের একজন সকালে অন্যজন সন্ধ্যার পরে আসত। তাছাড়া রকিব তো তাদের আত্মীয় ডাক্তার। বাসার খরচ, বাগানোর খরচ, পানি, বিদ্যুৎ ইত্যাদি খরচ লেখার জন্য নিচ তলার কোন এক কামরায় একজন ম্যানেজার, একজন হিসাবরক্ষক ও আরেকজন রানিং কর্মী থাকত। ঔষধ খাওয়াতে খাওয়াতে রেহানাসহ কাজের বুয়ারাও হাতুড়ে ডাক্তার হয়ে গেছে। অনেক ঔষধের নাম ও কার্যকারিতা তারা বলতে পারবে। ন্যান্সির বয়স যখন আট বছর তখন থেকে বেশির ভাগ সময় সে কাজের বুয়াদের সেবা- যত্ন বড় হতে লাগল। মিসেস চৌধুরী মানে রেহানা বিভিন্ন ক্লাব, সমিতি, থিয়েটার ইত্যাদি নিয়ে থাকতেন। মাসে অন্তত একবার কোন না কোন কাজে দেশের বাইরে যেতেন। আর মিঃ চৌধুরী সকালে বের হলে কখন ফিরবেন--তা তিনি নিজেও জানতেন না। মেয়ের সাথে মুখোমুখি কথার চেয়ে টেলিফোনেই মনে হয় বেশি কথা হত। ন্যান্সিকে কেউ চড় দিয়েছিল একথা তাদের কোন শত্র“ও বলতে পারবে না। জীবনে অসুখ-বিসুখ ছাড়া সে কোন আঘাত পায়নি। গরীবের তথা ভিক্ষুক, অন্ধ, খোঁড়া--এদের কষ্ট সে কখনও বুঝতে পারেনি। অন্ধ, লেংড়ার চাল-চলন দেখে সে হাসত। তার কাছে এরা অন্যরকম কোন জীব মনে হতো। ন্যান্সির মোট ছত্রিশটা নাম। কিন্তু একটু বড় হয়ে সে নুসরাত চৌধুরী (ন্যান্সি) নামটি পছন্দ করে। স্কুলে এই নামই রাখা হয়।

ন্যান্সি যখন ক্লাস এইটে পড়ত, তখন একই ক্লাসে ফ্রান্সিস নামে জার্মানীর এক ছেলে তাদের ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে ভর্তি হলো। ছেলেটা জার্মানীর হলেও চেহারা বাঙালীদের মতো। তার বাবা জার্মানী। তার বাঙালী মা জার্মানে থাকা অবস্থায় রিগ্যালিও রোজারিওকে বিয়ে করে। তারা জার্মানীতে একই অফিসে কাজ করত। পরে তাদের দুজনকেই বাংলাদেশে অবস্থিত জার্মান কালচারাল সেন্টারে বদলী করা হয়। তাদের থাকার কোয়ার্টার হয় ন্যান্সিদের পাশের এক ভাড়া বাসায়। ন্যান্সিকে গাড়ি দিয়ে স্কুলে নিয়ে যাওয়া হতো। আবার গাড়ি করেই বাসায় নিয়ে আসা হতো। ড্রাইভারকে হাত করে সে গাড়ি চালানো বেশ শিখে ফেলেছে। তার মাও তাকে পরে অবশ্য এ ব্যাপারে সাহায্য করেছিল। ন্যান্সি ছোটবেলা থেকেই বেশ চঞ্চলা ছিল। দৌড়াদৌড়ি করা ছিল তার অভ্যাস। এক রুম থেকে আরেক রুমে গেলেও সে দৌড়ে যাবে। আর কেউ ঘুমালে তাকে জাগিয়ে উঠিয়ে রাগাতে তার ভালো লাগত। কেউ রাগলে সে হাসত। অবশ্য এ অভ্যাসটা আস্তে আস্তে কমে আসে। কেউ তার উপর কর্তৃত্ব দেখালে সে খুবই রেগে যেত। সে কাউকে ভয় পেত না--এমনকি বাড়ির শিক্ষকদেরও না। তবে স্কুলের শিক্ষকরা বেশির ভাগ বিদেশি হওয়ায় তাদের ভয় পেত। সে ক্লাসের ক্যাপটেন ছিল। ছাত্রী হিসেবে সে খুবই মেধাবী|

ধারাবাহিক উপন্যাসঃ হৃদয়ের এপিঠ-ওপিঠ (পর্ব-১৪)
--শাশ্বত স্বপন

যেমনি তার চেহারা, তেমনি তার কথার স্বর। সবাই তাকে ভালোবাসত। সে ততক্ষণই বাসায় পড়ত যতক্ষণ শিক্ষকরা তার পাশে বসে থাকত। সেই কারণেই তার টিচার এর সংখ্যা সাবজেক্ট এর চেয়ে বেশি ছিল। টিফিন পিরিয়ডে সে টাকা খুব একটা খরচ করতে পারত না। কারণ তার প্রিয় খাবারগুলো বাসা থেকেই সরবরাহ করা হত। আব্বু, আম্মু বা আত্মীয়দের দেওয়া টাকা তার ব্যাগেই থাকত।

স্কুলে একদিন দোতলার সিঁড়ি বেয়ে উঠতে গিয়ে হঠাৎ ন্যান্সি নিচে পড়ে যাচ্ছিল। ঐ মুহূর্তে ফ্রান্সিস এসে তাকে ধরে। না ধরলে নিচে পড়ে তার মাথা ফেটে যেত। সে কিছুক্ষণ ফ্রান্সিসের দিকে তাকিয়েছিল। ন্যান্সি তার সাথে কথোপকথনবিহীন কিছু স্মৃতি মনে করতে লাগল। পিটি করার সময় সে এই ছেলেকে দেখত। সে ভালো কমান্ড করতে পারে। মাঝে মাঝে ধাক্কাও লেগে যেত ছুটোছুটি করতে গিয়ে। তবে ন্যান্সি ছেলেটাকে এড়িয়ে চলত। কেন যে এড়িয়ে চলত--তা সে নিজেও জানে না। পাশাপাশি চলমান দুইটা গাড়ি বাসা থেকে স্কুলে আসত। আবার স্কুল থেকে বাসায় যেত। গাড়ি গাড়িকে দেখত। যাত্রীরা দেখেও না দেখার ভান করত। ছাদ থেকে দু’জন দু’জনকে লক্ষ্য করত। কিন্তু কখনও কোন ইঙ্গিত করত না। তবে একদিন ফ্রান্সিসকে পলিথিনের ব্যাগ দিয়ে ঘুড়ি উড়াতে দেখে ন্যান্সি ফোঁকলা দাঁতে হেসেছিল। ফ্রান্সিস ছাদ থেকে তার দিকে তাকাতেই সে হাসি থামিয়ে মায়ের কাছ ছুটে এসে গলা জড়িয়ে ধরে। তাদের ছাদে ফুলের বাগান। মৌমাছি আর প্রজাপতি ফুলে ফুলে উড়ে বেড়াচ্ছে। ন্যান্সি দৌঁড়ে প্রজাপতি ধরতে যায়। হৈহুল্লোর আর আনন্দ নিয়েই তার জীবন।

আজ ফ্রান্সিস না ধরলে নির্ঘাত মাথা ফেটে যেত। স্কুলে একদিন ধাক্কা লেগেছিল। ন্যান্সি রাগে ব্লাইণ্ড বয় বলেছিল। পলিথিনের ঘুড়ি উড়াতে দেখে সে হেসেছিল। আজ, এখন সব তার মনে পড়ছে। সে দৌড়ে ক্লাসে চলে গেল। একটা ধন্যবাদও জানাল না। এরপর থেকে শুরু হলো দু’জনার যাত্রা। চোখাচোখি করে গাড়িতে ওঠা। ছাদ থেকে দু’জন দু’জনকে দেখে নির্বাক দর্শকের মতো। এভাবে চলতে লাগল এক বছর। দু’জনে ক্লাস নাইন-এ উঠল। গানের আসরে ফ্রান্সিস একদিন বলল, “ইউ আর ভেরী সুইট গার্ল, অ্যাই লাভ ইউ।” ন্যান্সি কেন জানি রেগে গেল। অবশ্য তার কিছু কারণও ছিল। টিফিন পিরিয়ডের পর ক্লাসে আসলে প্রায়ই ন্যান্সি তার ব্যাগের উপর একটা করে ফুল পেত। সে প্রথম দুই দিন কিছু মনে করেনি। কিন্তু বান্ধবীরা যখন তাকে নিয়ে হাসি-ঠাট্টা শুরু করল তখন সে মাইন্ড করল। আজও এমন এক ঘটনা ঘটেছে। কে ফুল দিয়ে যায়--তা সে নিজেও জানে না। বিদেশি ইংরেজ মেয়েরা তাকে আজ সরাসরি জিজ্ঞাসা করল, হোয়াট ইজ দ্যা মেটার, ন্যান্সি। হু ইজ দ্যা বয়? প্লিজ ছে এ্যাজ। ন্যান্সি রেগে বলল, আই ডন্ট নো।
--নো, ইউ আর লায়ার।
--প্লিজ, ইউ বিলিভ। আই ডন্ট নো।

সেই রাগ আর ফ্রান্সিসের মিষ্টি কথা এই দুয়ে মিলে সে রেগে গেল। ম্যাডামের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে উঠল। ম্যাডাম তার দিকে তাকাল।
--হোয়াট ইজ দ্যা মেটার, ন্যান্সি? হোয়াই আর ইউ সাউটিং?
ন্যান্সি ফ্রান্সিসের দিকে তাকাল।
--ফ্রান্সিস ডিসটার্বিং?
ন্যান্সি কোন কথা বলল না। মাথা নিচু করে রইল। সে বুঝল, চিৎকার করা তার ঠিক হয়নি। রাগত চোখে ম্যাডাম ফ্রান্সিসকে দূরে বসতে বলল। বান্ধবীরা কানাকানি করতে লাগল। ফ্রান্সিস গম্ভীর হয়ে অন্যত্র চলে গেল। সবাই চলে গেলে ফ্রান্সিস ন্যান্সির বান্ধবীকে দিয়ে তাকে ডেকে আনে। ন্যান্সি ফ্রান্সিসের নিকট এসে মাথা নিচু করে থাকে। ফ্রান্সিস উত্তেজিত হয়ে কথা বলে, ইউ আর মাইন্ডলেস। ইউ আর ফুলিস। ওয়াট ইজ ফলস অফ মাইন? আই লাভ ইউ? ইজ দি মাই ক্রাইম? আই ডন্ট টক টু ইউ! ইউ আর ক্রুয়েল গার্ল। আই হেট ইউ।

ফ্রান্সিসের চোখে জল এসে যায়। ন্যান্সি ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে। জীবনে এত বড় কথা কেউ বলেনি। এত রাগ কেউ তাকে দেখায়নি কোনদিন। ফ্রান্সিস চলে গেল। ফিরে আর তাকাল না। ন্যান্সি খুবই কষ্ট পেয়েছে। ন্যান্সির হৃদয়ে শুরু হলো পরিবর্তন। এই ঘটনার পর তার ব্যাগের উপর আর কখনও ফুল জমা পড়েনি। ফ্রান্সিস ন্যান্সিকে কাছে পেলে মাইগুলেস, ক্রয়েল গার্ল--এই দুইটা শব্দ উচ্চারণ করে। ন্যান্সি রাগে ক্ষোভে ফুলে উঠে। কিছু বলতে পারে না। ন্যান্সি বাসায় এসে পুরো ঘটনা তার মাকে জানায়। রেহানা ফ্রান্সিসকে ডেকে এনে ন্যান্সির সাথে আপোষ করিয়ে দেয়। দু'’জনে খুশি হয়ে হাসতে থাকে। তারা প্রতিজ্ঞা করে আর কখনও মনোমালিন্য হবে না। শুরু হলো ন্যান্সির কথা বলা। সে এত বেশি কথা বলে যে, ফ্রান্সিস কথা বলার সুযোগও পায় না। দু’জনে দু’জনার বাসার টেলিফোন নং বিনিময় করল। শুরু হল নতুন কিছু--যা প্রেম নামে বিশেষিত। অথচ প্রেম কি জিনিস তারা দু’জনে তা বুঝেও না। বুঝার বয়সও হয়নি। শুধু বন্ধু হিসেবে দু’জন দু’জনা। ফ্রান্সিসের আব্বা ও আম্মা বেশির ভাগ সময় অফিস ও অন্যান্য কাজে বাইরে থাকত। বাসায় ফ্রান্সিস, ম্যাক্সিম ও মেরিওনা থাকত। ম্যাক্সিম ও মেরিওনা এক রুমে পাশাপাশি দু’টি সীটে, ফ্রান্সিস অন্য রুমে থাকত। তার আম্মা ও আব্বার রুমে একটা এবং তার রুমে একটা টেলিফোন ছিল।

ফ্রান্সিস কোন এক বিকাল বেলা ছাদে উঠল। দেখল ন্যান্সি আজ ছাদে নাই। অথচ প্রতিদিনই সে ছাদে উঠে। ফ্রান্সিস নিচে চলে গেল। ফোন করল। ন্যান্সিও এই আশাই করেছিল।
--হ্যালো, ন্যান্সি।
--ইয়েস, ন্যান্সি। হাউ আর ইউ? আই এ্যাম সিক। হেড পেইন করছে।
--মীনস?
--ব্রেইন ট্রাবল।
--হোয়াই?
--ডন্ট নো।
--ডক্টর?
--ইয়েস, ডক্টর কেম এণ্ড ওয়েন্ট এওয়ে।

প্রতিদিন তারা কমপক্ষে দশ বার টেলিফোন করত। রাতে ঘুমাবার আগে টেলিফোনে কথা বলতে বলতে ন্যান্সিই আগে ঘুমিয়ে যেত। যখন ফ্রান্সিস বুঝত, ন্যান্সির ঘুম ঘুম অবস্থা তখন সে টেলিফোন রেখে দিত। মিঃ ও মিসেস চৌধুরী বেড়াতে গেলে ন্যান্সিকে সঙ্গে নিত। সে আবার ফ্রান্সিসকে নেওয়ার জন্য বায়না ধরত। ফ্রান্সিসের আব্বার সাথে মিঃ চৌধুরী ও মিসেস চৌধুরীর অস্তরঙ্গ সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। মিঃ চৌধুরী জার্মানীতে ব্যবসার কারণে গেলে ফ্রান্সিসদের নিজস্ব বাড়িতে গিয়ে ওঠে। মিঃ চৌধুরী ফ্রান্সিসদের বিরাট সহায়-সম্পত্তি দেখে এসেছে। এদিকে ফ্রান্সিসের মা বাঙালি হওয়ায় রেহানার সাথে খুব ভাল সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। ফ্রান্সিসের মা দীপা হিন্দু ছিল। জার্মানী গিয়ে বিয়ে করার পরে খ্রীস্টান হয়ে যায়।

ধারাবাহিক উপন্যাসঃ হৃদয়ের এপিঠ-ওপিঠ (পর্ব-১৫)
--শাশ্বত স্বপন

পারিবারিক সম্পর্কে কারণে তারা দু’জন বিভিন্ন জায়গায় বেড়াতে যেত। নিচের অডিটোরিয়ামে তারা দু’জনই বিভিন্ন অনুষ্ঠানে উপস্থাপক হত। ন্যান্সিদের নিজস্ব বাসার নিচ তলার পুরো অংশই সাংস্কৃতির কেন্দ্রস্থল। সংগীত ও বিভিন্ন যন্ত্র বাজানো সে এখান থেকেই শিখত। তার সংগীত ও যন্ত্র শিক্ষার জন্য বড় মাপের ওস্তাদ ছিল। প্রথম পর্যায়ে কিসটা ন্যান্সির কাছে লজ্জা লাগলেও পরে সহজ হয়ে উঠে। তারা এক সাথে ছবি দেখত, ছবি তুলত। কোন এক পরিবার ঐতিহাসিক কোন স্থানে বেড়াতে গেলে তারা দু’জন অবশ্যই যেত। সবই চলত সকলের চোখের সামনে। কেউ কোনদিন তাদের কিছু বলেনি। আসলে দু’পরিবারের প্রধান কর্তা ও কর্ত্রীরাই ছেলেমেয়েদের সময় দিতে পারত না। তারা বেশির ভাগ সময় থাকত বাইরে। ন্যান্সি ও ফ্রান্সিস একসাথে ব্যাডমিন্টন, লুকোচুরি ইত্যাদি খেলত। সব খেলা ন্যান্সিদের বাসায়ই হত। ন্যান্সিদের খেলার নানান সরঞ্জাম ছিল। সেগুলো ম্যাক্সিম, ম্যারিওনাও ব্যবহার করত। কখনও বিকিনি পড়ে ন্যান্সি ফ্রান্সিসের সামনে গোসল করত, কখনও একসাথে। কখনও ফ্রান্সিসের ভাই-বোনরাও একসাথে গোসল করত। ন্যান্সিকে অনেক আনন্দই বেশিক্ষণ করতে দেওয়া হত না। কারণ অতিরিক্ত কোনকিছু তার দেহে সইত না। অসুখ জিনিসটা লেগেই থাকত।

এভাবে তাদের মধ্যে তিন বছর কেটে গেছে। ন্যান্সি ও ফ্রান্সিস ও লেভেল-এ ভর্তি হয়েছে। এখন তারা দু’জন গাড়ি হাঁকিয়ে অনেক দূর চলে যায়। মাঝে মাঝে রোড রং ও সিগন্যাল রং করে পুলিশে ধরা পড়লে ন্যান্সি তার বাবার নাম ও ঠিকানা বলত। পুলিশ সসম্মানে ছেড়ে দিত। ফ্রান্সিস অবাক হত। সে ভাবত, এ দেশে ধনীদের কত দাম! তারা প্রায়ই চাইনিজ খেতে যেত। কখনও দু’জনে। কখনও স্বপরিবারে। কখনও ফ্রান্সিস, ন্যান্সি, ম্যাক্সিম ও ম্যারিওনা এক সাথে মিলে যেত। একদিন দু’জনে হুইস্কি খেয়ে মাতাল অবস্থায় বাড়ি ফিরলে রেহানা একটু বকেন। ফলে ন্যান্সি পুরো একদিন দরজা বন্ধ করে রাখল। কিছুই খেল না। এমনকি ফ্রান্সিসের টেলিফোনও রিসিভ করল না। কেউ কর্তৃত্ব দেখালে তার অসহ্য লাগে। ফ্রান্সিস বিকালে এসে অনুরোধ করে দরজা খোলায়। পরে দু’জনে একসাথে খেয়ে, খেলতে চলে যায়।

এভাবে পাঁচ বছর কেটে যায়। তাদের মাঝে দৈহিক কোন সম্পর্ক হয়েছিল কিনা তা ন্যান্সির ডায়েরী থেকে বুঝা গেল না। ডায়রীর শেষের দিকে অনেক পাতা খালি। কিছুই লেখা নেই। পরবর্তী ঘটনা ডাক্তারের দেওয়া কাগজ থেকে বুঝা গেল। ন্যান্সি একদিন জোর করে ফ্রান্সিসকে নিয়ে চিটাগাং রোডের দিকে যায়। রাস্তায় হঠাৎ গাড়ি স্টার্ট বন্ধ হয়ে যায়। ফ্রান্সির দরজা খুলে যেই বাইরে এসেছে তখনই একটা পাঁচ টন মালবাহী ট্রাক তার পিছন দিক থেকে এসে তার দেহের উপর দিয়ে চলে যায়। তার মাথাটা বোমা ফাটার মতো একটা প্রচণ্ড শব্দ করে। ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন মাথা চড়িয়ে পড়ে চারিদিকে। ন্যান্সি প্রচণ্ড জোরে আর্তচিৎকার করে। যার ফলে সে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। গাড়িতে তখন তাদের প্রিয় একটা গান চলছিল--‘ও--’ ডিয়ার, আই লাভ ইউ...।’

তারপরের ঘটনা অতি সহজ। ফ্রান্সিসের আব্বা ও আম্মার কথা কিছু জানা গেল না। ডাক্তার কোথাও কিছু লেখেনি। তবে অবস্থাটা আমি উপলব্ধি করতে পারি। তারা চিরতরে জার্মানীতে ট্রান্সফার হয়ে গেছে। বাংলাদেশের সড়ক দুর্ঘটনা নিশ্চয়ই তারা তাদের এলাকায় ছড়াবে। ছড়াবে এদেশে দুর্ঘটনা নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার। তাই দুর্ঘটনার এদেশে তারা আর আসবে না। ন্যান্সি দুই বছর পাবনা মানসিক হাসপাতালে ছিল, ভালো হয়নি। বিদেশে পাঠানো হয়েছে। ক্ষণিকের জন্য ভালো হলেও আবার একই অবস্থা। তারপর বাসায় এনে প্রাইভেট চিকিৎসা শুরু হলো। সাইক্রিয়াটিস্টদের পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট বোর্ড গঠন করা হলো, তাতেও কিছুই হলো না। ন্যান্সি প্রায়ই ফ্রান্সিস ফ্রান্সিস... করে উঠে। অবশেষে সকলের সিদ্ধাস্ত হলো, ফ্রান্সিস সদৃশ কোন ছেলেকে খুঁজে বের করতে হবে। ফ্রান্সিসকে সে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসত--যা ডায়েরীতে লেখা একটা পাতা থেকে বুঝা যায়--‘আই লাভ ফ্রান্সিস মোর দেন অল।’

ডায়েরীর এক পাতায় দু’জনের প্রিয় বিষয় সম্পর্কে লেখা আছে। ডায়েরীতে ন্যান্সি প্রতিদিন দু’একটা লাইন হলেও লিখত। লেখা আছে--দু’জনের প্রিয় রং গোলাপী, দু’জনেরই বেড়াতে ভালো লাগে। তাদের প্রিয় ফল আপেল, প্রিয় কথা ভালোবাসি। প্রিয় ব্যক্তিত্ব ড্যাডি এণ্ড মাম্মী। তবে ফ্রান্সিসের ওয়েস্টার্ণ সিরিজের বই ভালো লাগে। ন্যান্সির প্রেমের বই ভালো লাগে। তার লেখা আর আমার কল্পনা থেকে যতটুকু বোঝা যায়, তাদের ভালোবাসার সম্পর্ক হয়তো আরো অনেক বেশি গভীর ছিল। অনেক কথাই হয়তো ন্যান্সি তার ডায়েরীতে লেখেনি। জীবনের বহু ঘটনা-কল্পনা-আশা-আকাঙ্খা কাগজের পাতায় লেখা যায় না। অনেক কথা লেখার মাঝেই লুকিয়ে থাকে। কল্পনার সাহায্যে হয়তো অনেক কথাই লেখা যায়। কিন্তু তার মধ্যে অনেক ফাঁক-ফোঁকর রয়ে যায়।

ধারাবাহিক উপন্যাসঃ হৃদয়ের এপিঠ-ওপিঠ (পর্ব-১৬)
--শাশ্বত স্বপন

সেলিম বেশ লেট করে ঘুম থেকে উঠে অফিসে গেছে। আমি ঘুম থেকে উঠে দেখি দশটা বাজে। সেলিম আমাকে না উঠিয়ে কাগজে লিখে গেছে, আজ রুমে ফিরবে না। অফিসের কাজে অনেক দূরে যাবে। চোখ-মুখ ধুয়ে চিন্তা করতে বসলাম। নাস্তা খেলাম। আবার চিন্তা করতে শুরু করলাম। কিছুই ভালো লাগে না। এখন সম্মুখে শুধু ন্যান্সি আর ন্যান্সি। বাইরে যাওয়া উচিত, দেহ ও মনের জড়তা কাটানোর জন্য। কিন্তু কোথায় যাব--তা জানি না। গস্তব্যহীন এ জীবনে কোন স্বপ্নই দীর্ঘ ছিল না। সব স্বপ্নই ছিল সরু আর নাতিদীর্ঘ। যেদিন রাতে কিংবা ভোর রাতে আল্পনাকে স্বপ্নে দেখি, সেদিন ঘুম থেকে দেরী করে উঠি। তারপর একটা চিঠি লিখতে চেষ্টা করি। কাটি আর লিখি। কিছুদূর লিখে ভাবি, এ চিঠি তো আল্পনার কাছে কোনদিন যাবে না। কি লাভ লিখে? তবু মন মানে না। লিখি, তবু লিখি। আত্মতৃপ্তির জন্য মানুষ তো কত কিছুই করে। আমরা অনেক কিছুই কোন কারণ ছাড়াই করি। কারণ নিয়ে এখন আর মানুষ ভাবে না। একদিন, ম্যাক্সিম গোর্কী তার ধনী মার্কিন বন্ধুর খাবার তালিকা শুনে মাথায় হাত দিলেন। তিনি ধনী বন্ধুকে বললেন, তিনি এত যৎ সামান্য আহার গ্রহণ করেন, তাহলে এত টাকা দিয়ে কি করেন? বন্ধু উত্তর দিয়েছিল, টাকা দিয়ে আরো টাকা গড়ি। কেন গড়েন? তার কোটিপতি বন্ধু বোধহয় ভাবেন না, ভাবতে চান না। তারা সবাই কিসের পিছনে ছুটে চলেছেন, তা বোধহয়, তারা নিজেরাও জানার সময় পান না বা জানতে চান না। আমাদের দেশের নজরুল চৌধুরীরা জানেন না, তারা কোথায় যাচ্ছেন। বিধাতা বিভিন্নভাবে তাদের বোঝাচ্ছেন কিন্তু বুঝেও বুঝতে চাইছেন না। টাকা দিয়ে তারা সব কিনতে চান। একটা সই দিয়ে একশত কোটি টাকা তারা ডান-বাম করতে পারেন। কিন্তু হাজার সই দিয়েই ন্যান্সিদের সুস্থ্য করতে পারেন না। তারা নিজেরাও জীবন্মৃত, ন্যান্সিরাও জীবন্মৃত। আমার জীবনে এক সময় একটা লক্ষ্য ছিল। আজ আর কোন লক্ষ্য নেই । এখন জীবন যেদিকে চলে, চলুক না। দরজায় হঠাৎ কড়া নাড়ার শব্দ শোনা গেল।
--কে?
--স্যার আমি।
--ও সিঁদুর, ভিতরে এসো।

দু’দিন সিঁদুরকে পড়াতে যাওয়া হয়নি। তাই হয়তো দেখতে এসেছে অসুখ হলো কিনা। এর আগেও সে একবার এসেছিল। তখন রুমে সেলিমও ছিল। আজ সেলিম নেই।
--স্যার, আপনার কি হয়েছে?
--তেমন কিছু না। দু’দিন যাবৎ খুব টেনশনে ভুগছি।
--কিসের টেনশন?
--ব্যক্তিগত।
--ও--
সিঁদুর সেলিমের টেবিলের দিকে গেল। একটি কবিতা লাল কালি দিয়ে লেখা--টাঙানো রয়েছে টেবিল সংলগ্ন দেয়ালে। সিঁদুর কাছে গিয়ে পড়তে শুরু করল।
“কবিতা, তোমার কি কখনও মরতে ইচ্ছে করে?
করে না? আমার মাঝে মাঝেই মরতে ইচ্ছে করে
মাঝে মাঝে খুবই ইচ্ছে করে...।”
--স্যার, কে লিখেছে? নাম যখন নেই, তখন নিশ্চয়ই আপনি। আপনি এত ভালো কবিতা লিখতে পারেন। স্যার, আমার কবিতাটা কেমন হয়েছে?
--তুমি কি স্কুলে যাবে?
--হ্যাঁ, স্কুলে যাব। ভাবলাম, যাওয়ার পথে আপনার সাথে দেখা করে যাই। স্যার বললেন না কেমন হয়েছে?
--সুন্দর, খুব সুন্দর। একেবারে তোমার মতো ভালো ও সুন্দর।
--যা--।
--তুমি এমন কবিতা লিখেছ, মনে হচ্ছে, পৃথিবীর কেউ তোমাকে কোন দিন ভালোবাসেনি--ভালোবাসেও না। তাই?
--স্যার, আমি যাই। আপনি কখন পড়াতে যাবেন?
--ঠিক সময়ে।
--আসি স্যার।
--সিঁদুর, তোমাকে আমি পড়াই। আমি জানি, তোমার বিদ্যা কত দূর। এ কবিতা তুমি লেখনি, আমি নিশ্চিৎ।

সিঁদুর অবাক হল না। আড়চোখে তাকাল। যেন এমন ঘটবে--তা সে জানে।
--টাঙানো কবিতাটা তোমার ভালো লাগে?
--হ্যাঁ, খুব।
--নিয়ে যাও ওটা; নইলে দু-এক দিনের মধ্যে কুটিকুটি হয়ে যাবে।
--কেন স্যার?
--আমার একটা বদ অভ্যাস আছে। আমি কবিতা, গান লিখি আর ছিঁড়ে ফেলি। এটাও ছিঁড়ে ফেলেছিলাম। আমার রুম-ম্যাট এর ভালো লেগেছে, তাই ও ছিঁড়া কাগজ থেকে লিখে নিয়ে টাঙিয়ে রেখেছে।
--সে যদি এসে না দেখে?
--কিছুই বলবে না। সে এখন কবিতার জগতে নেই--আছে গদ্যের জগতে।
--মানে--?
--কিছু না, তুমি নিয়ে যাও।
--স্যার, আমাকে আরো কবিতা দেবেন। কবিতা আমার ভালো লাগে।

কবিতা ভালো লাগে এমন পাঠক-পাঠিকার সংখ্যা আমার চোখে খুব কমই পড়েছে। যদিওবা দু’একজন পাঠক-পাঠিকার ভালো লাগে। তাও বিশেষ বিশেষ জনের বিশেষ বিশেষ কবিতা--তাও আবার তাদের বিশেষ বিশেষ সময়। এখন হয়তো সিঁদুরের কবিতা ভালো লাগে। আর কয়দিন পর ভালো কবিতাও ভালো লাগবে না। চারদিকে এখন গদ্যের জয় জয়কার।
--সিঁদুর, ‘‘কবিতার শেষ হল--শুরু হলো গল্পের
রাত পেরিয়ে শুরু হলো দিনের।” এই সময় কবিতা ভালো লাগে?
--জানি না স্যার, আগে ভালো লাগত না, এখন ভালো লাগে।
--তোমার কবিতার কবি বুঝি ভালোবাসার কাঙাল? খুব কবিতা লেখে?
--স্যার, আমি আসি--
--কবিতা নিলে না?

সিঁদুর কবিতা নিয়ে চলে যেতে লাগল। দ্রুত হাঁটতে গিয়ে দরজায় ধাক্কা খেল। ফিরে আমার দিকে তাকাল। কি ভাবল কে জানে? এদের ভাবনার শেষ নেই। এদের চেনা বড় কঠিন। এরা সময়ে মায়াবী, সময়ে হিংস্র। এমন নারীদের সাথে আমার পরিচয় ছিল, যারা ঘন ঘন প্রেম করত। আবার দু’একটা মেয়েকে তাদের প্রেমিকের জন্য আধা পাগল হতে দেখেছি। বিয়ে হলে দেখা যায়, সব ভুলে গেছে। আবার এমন সব মেয়ে দেখেছি, যারা সাত-আট বছরের জীবন-মরণ প্রেমকে বিসর্জন দিয়ে ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার বা কোন সচ্ছল বরের হাতে হাত রেখে সব ভুলে গেছে। তবে একটা বিবাহিতা বান্ধবী আমাকে অবাক করেছিল। বিয়ের পর তাকে প্রশ্ন করি,
--লাকী, দেলোয়ারকে মনে পড়ে?
--কি যে বলিস শোভন, যাকে বিয়ে করেছি, সে আমার স্বামী--শুধু স্বামী, স্বামী বলতে যা বোঝায়। আমার প্রেম-ভালোবাসা সমৃদ্ধ হৃদয়ের সবটুকু জায়গা জুড়ে তো দেলোয়ার দখল করে আছে।

বলতে বলতে লাকী আবেগ প্রবণ হয়ে উঠল। আমি জানি, সে বেশ সচ্ছল পরিবারে ভালো ছেলের ঘর করছে। দেলোয়ারকে ভুলে যাওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু একি ডায়ালগ। কিছু কিছু ব্যতিক্রম স্বীকার করে নিতেই হয়। তবে এ ব্যতিক্রমও পরবর্তী পর্যায়ে আস্তে আস্তে চলে যায়। কিন্তু আমার বিষাক্ত স্মৃতি কি ধীরে ধীরে মুছে যাবে? অসম্ভব। হিন্দু মেয়েকে ভালোবেসেছিলাম। বিয়ের আগের দিন তাকে জোর করে তুলে আনতে চেয়েছিলাম। অস্ত্র দিয়েও কিছু করতে পারিনি। আল্পনাকে আনতে পারিনি। সমাজের হাতে বন্দি হয়ে যে আঘাত সয়েছি--তা কি সহজে ভুলে যাব? প্রেম পাগল একটা কিশোর ছেলেকে সবাই জেলে ঢুকিয়ে দিল। দুই বছর তিন মাস পর জেল থেকে ফিরলাম। ধর্মের জিকির তুলে যে সব দাঁড়িওয়ালারা ও টিকিওয়ালারা আমাদের মিলনে বাঁধা দিয়েছিল--তাদের প্রকৃত রূপ দেখে আমি বিস্মিত হয়েছি। ধর্মের সাথে স্রষ্টার ব্যবধান যে এরাই বাড়িয়েছে--তা আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি। আমি কি এত কষ্টের স্মৃতি ভুলে যাব?

সিঁদুর চলে গেছে। বাসায় গিয়ে আজ তাকে বলতে হবে, সিঁদুর তোমাকে আর পড়াতে পারব না। সপ্তাহে দুই-এক দিন হয়তো আসতে পারব। টেপ-রেকর্ডার চালু করলাম। কোন গান ভালো লাগছে না। রেডিও-এর চ্যানেল ঘুরাতেই শাহনাজ রহমত উল্লাহর গাওয়া একটা গান বেজে উঠল--‘যে ছিল দৃষ্টির সীমানায়--যে ছিল হৃদয়ের আঙিনায়--সে হারাল কোথায়--কোন দূর অজানায়--সেই চেনা মুখ কতদিন দেখিনি...।’ সারা দেহ থর থর করে কেঁপে উঠল। চোখ দু’টি নিদ্রার ভান করল। বিছানায় শুয়ে পড়লাম। নেশাগ্রস্ত রোগীর মতো নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে লাগলাম। মনে মনে বলে উঠলাম--‘‘আল্পনা...আল্পনা...তুমি আজ কোথায়? ‘‘আমি কি রকমভাবে বেঁচে আছি--তুমি একবার এসে দেখে যাও--একি মানব জন্ম! এভাবে কি মানুষ বাঁচতে পারে!” হায়রে হৃদয়, তুমি কত খারাপ! যারা আমাকে জন্ম দিয়েছে--তাদেরকে কদাচিৎ স্মরণ করি। করলেও তেমন দুঃখ অনুভব করি না। বাবাকে তো মুক্তিযোদ্ধা, কমরেড ভেবে ঘৃণা করি। অথচ আল্পনাকে কিছুতেই ভুলতে পারি না। বড় যন্ত্রণা দেয় এ হৃদয়। এতিম হওয়ার যন্ত্রণার চেয়ে ব্যর্থ প্রেমের যন্ত্রণা আরো গভীর। হৃদয়কে বুঝাই, “হৃদয়, তুমি যা চাও--তা দেবার যোগ্যতা, ক্ষমতা, সময় আমার নেই।” সে বুঝে না--বুঝতে চায় না। ছোট শিশুর মতো আপেলের জন্য বায়না ধরে আছে। অথচ ঘরে অর্থ নেই, বাইরে কার্ফ্যু চলছে--কি করে জীবন বাজী রেখে বাজার থেকে ওর জন্য আপেল আনব? মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে শিশুটাকে হত্যা করে ফেলি। কিন্তু পারি না--কেউ তা পারে না। শিশুটা আপেলের জন্য কাঁদছে। আমি ক্রমাগত আম, আঙ্গুর, বিভিন্ন খেলনা দিয়ে তাকে বুঝাচ্ছি কিন্তু তার কান্না থামছে না। সে অবিরাম কেঁদে চলেছে। জানি না, কবে তার কান্না থাকবে।

ধারাবাহিক উপন্যাসঃ হৃদয়ের এপিঠ-ওপিঠ (পর্ব-১৭)
--শাশ্বত স্বপন

মুরাদ কখন রুমে ঢুকেছে, খেয়াল করিনি। ওর সাথে অনেকক্ষণ আলাপ করলাম। টেস্টে মোটামুটি ভালো রেজাল্ট করেছে। টিউশনি বন্ধ রাখতে বললাম। আমার চাকুরি সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু না বলে, শুধু চাকুরি হয়েছে--এ কথাই বললাম। ও খুশি হয়ে বিস্তারিত জানতে চাইলে আমি এড়িয়ে গেলাম। মুরাদকে বললাম, কাল-পরশু টাকা দিয়ে আসব। হঠাৎ ওর চোখ, মুখ কেমন হয়ে উঠল। মনে হলো, ওর মাথা ব্যথা করছে। আমাকে লুকাবার জন্য তড়িঘড়ি করে চলে গেল। ডাকলাম কিন্তু শুনল না।

সন্ধ্যার পর সিঁদুরকে পড়াতে গেলাম। প্রথমেই অংক করানো শুরু করলাম। ওর টেবিলের উপর তাকাতেই দেখি, যে কবিতাটা দিয়েছিলাম--তা টাঙিয়ে রেখেছে। কবিতা নিয়ে কিছু বলতে ইচ্ছে করল না। কবিতা আমার ভালো লাগে না। প্রাণহীন জড় পদার্থ মনে হয়। আজকাল বাংলাদেশকে কবির দেশ হিসেবে আখ্যা দেওয়া যায়। শিক্ষিতদের আশি-নব্বই পার্সেন্ট কোন না কোন বিশেষ সময়ে কবিতা লিখে থাকে। ইচ্ছে করলেই ডাল ভাতের মতো কবিতা লেখতে পারে। আর যদি মাসিক, সাপ্তাহিক কোন ম্যাগাজিনে ছাপানো হবে বলে কবিতা চাওয়া হয়, তাহলে যে জীবনে কোন কবিতাও লেখেনি--সেও কবি হয়ে উঠে। একেবারে না পারলেও কবিতা ধার করে নিজের নামে প্রচার করে। আমার এক বন্ধুর কথা মনে পড়ে। সে কলেজ বার্ষিকী পত্রিকার সাথে এমনভাবে যুক্ত যে, সে যাই লিখুক--তাই ছাপা হবে। সারা রাত ঘেমেও সে একটা কবিতার ছয় লাইনও লিখতে পারেনি। যা লিখেছে তাও কয়েকটা কবিতা থেকে নকলকৃত। ওর দুঃখ দেখে অবশেষে ওর প্রেমিকার নামে একটা প্রেমের কবিতা লিখে দিলাম। ওতো খুশিতে আটখানা। যেন এরকম একটা কবিতাই সে লিখতে চেয়েছে। ছাপালে কি হবে, মেয়েটি কবিতাও পাত্তা দিল না, তাকেও পাত্তা দিল না। এক বছর পর শুনলাম, সে সত্যি কবি হয়ে গেছে। তাদের প্রকাশনী থেকে সে একটা কবিতার বই বের করেছে। প্রথমেই ছিল আমার লেখা কবিতাটি। কবি সে-ই আর মেয়েটি নাকি বই পেয়ে পুকুরে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে। পরে শুনেছি মেয়েটির বিয়ে হয়ে গেছে। আর কবিবন্ধু কবিতা ছেড়ে বিদেশ চলে গেছে।

সিঁদুরের অংক করা শেষ। তিনটা অংক করতে দিয়েছিলাম। তিনটাই ভুল। অন্যান্য পড়া ধরতে গিয়ে দেখি, সবই হ-য-ব-র-ল। কিছুই পারছে না। হঠাৎ সে ‘স্যার’ বলেই কেঁদে দিল। কারণ জিজ্ঞাসা করলাম। সে বলতে চাইছে কিন্তু লজ্জাবশতঃ বলতে পারছে না। ভেবে নিলাম, আজ আর পড়াব না। কোথাও থেকে সে বড় ধরনের আঘাত পেয়েছে। প্রথম যেদিন ওদের বাসায় ঢুকি তখন ও পড়ার ফাঁকে বলেছিল, আমাকে নাকি চেনা চেনা লাগে। তার উক্তি ছিল এ রকম--
--স্যার, আপনার কোন ভাই আছে?
--হ্যাঁ, আছে।
--কি নাম?
--মুরাদ।
--কি করে?
--এবার বি.এ পরীক্ষা দেবে।
--কোন কলেজ থেকে?
--ঢাকা কলেজ।
--আপনার মতো চেহারা--আমার একটা ভাই আছে--ঢাকা কলেজে পড়ে। নাম পিযুষ। সে আই.এসসি পরীক্ষা দেবে।

আজ সিঁদুরের অবস্থা দেখে প্রথম দিনের কথোপকথন মনে পড়ছে। আজ আমার বিদায়ের ব্যাপারে কিছু বললাম না। সইতে পারবে না হয়ত। ও আমাকে কি যেন বলতে চায়, অথচ বলছে না। আগামীকাল এ সময়ে আসব বলে চলে এলাম আমার রুমে। পরদিন সকালে ডায়েরীসহ আমি ন্যান্সিদের বাসায় যাবার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি। এমন সময় দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ পেলাম। দরজা খুলতেই দেখি ড্রাইভার। তার সাথে কথা বলে বুঝলাম, আমি আসার পর অর্থাৎ গতকাল সকাল থেকে এই পর্যস্ত ন্যান্সি খুব গোলমাল করেছে। আজ সকালে উঠে আমাকে দেখতে না পেয়ে জামা-কাপড় পুড়িয়ে ফেলেছে। তাই মিসেস নজরুল এক্ষুণি আমাকে যেতে বলেছেন।
গাড়িতে উঠে ভাবছি। ন্যান্সি সকালবেলা উঠেই আমাকে খুঁজেছে। আমার জন্য চিৎকার করেছে। আমার মাঝে ফ্রান্সিসের কি বৈশিষ্ট্য থাকতে পারে। এ পৃথিবীতে কারো সাথেই কারো সম্পূর্ণ মিল নেই। সদৃশ হতে পারে। ফ্রান্সিসের অবয়ব বাঙালিদের মতো হল কেন? ফ্রান্সিসের মায়ের কি আগে বাঙালী পুরুষের সাথে বিয়ে হয়েছিল? ফ্রান্সিস কি...? হতেও পারে। ডাক্তারকে জিজ্ঞাসা করতে হবে। ন্যান্সি তার মা-বাবাকে সহ্য করতে পারে না। কেন? ঘটনায় কোন বিরোধীতা ছিল। তার মা-বাবা কি এ ব্যাপারে জড়িত? ডাক্তার মামাকে শুধু মানে, তাও মাঝে মাঝে নাকি তার উপরও রেগে উঠে। পাগলের আচার-আচরণ অদ্ভুত--এটা আমি জানি। পাগল আর এ্যাবনরমাল কি এক? মেন্টাল পেসেন্ট বা কি? আমি তো সব কিছুকেই পাগল ভাবতে শুরু করেছি। ডাক্তারের কাছ থেকে জানতে হবে। আগাম চিস্তা-ভাবনা করে লাভ নেই। তবে একটা ব্যাপারে আমার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে, আমি ডাক্তার নই অথচ আমাকে ডাক্তারের চেয়ে বড় ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হবে কেন?

জীবনে কখনও অভিনয় করিনি। দর্শক হিসেবে নাটকের অভিনয় শুধু উপভোগ করেছি। তবে দৈনন্দিন জীবনে যা করছি--তাওতো নাটক। জীবন নাটক জ্ঞাতে আর অজ্ঞাতে হয়। কিন্তু এই নাটক আমার জ্ঞাতেই আমাকে করতে হবে। পরিচালক ডাঃ রকিব আহসান। অভিনয়ের প্রধান চরিত্র শোভন ও ন্যান্সি। আরো অভিনেতা-অভিনেত্রী, কলা-কুশলীরা আছেন। নায়িকা মেন্টাল পেসেন্ট। নায়ককে তার সর্বক্ষণ সঙ্গী থাকতে হবে। পরিচালকের কথা মতো কাজ করতে হবে। হ্যাঁ, এটা একটা নাটক। এখানে কেউ মরবে কিনা--জানি না। ডাক্তারও জানে না। আমি কোথায় যাচ্ছি, তা কি আমি নিশ্চিতভাবে জানি? হয়তো জানি, হয়তো জানি না। এরপর হয়তো কপালে আরো দুঃখ আছে। আবার এমনও হতে পারে ন্যান্সি ভালো হয়ে আমাকে ছাড়া অন্য কাউকে জীবন সাথী...। এই নাটকের শেষাংশ ডাক্তার লেখেননি। ডাক্তারও নিশ্চিতভাবে জানেন না--নাটকের শেষে কি হবে? অতএব আমার ইচ্ছা পূরণ হতেও পারে। জীবন নাটকে অনেক কিছুই ঘটে যায়--যা মানুষ কল্পনাও করতে পারে না। আমার জীবনে ঘটুক এমন কোন ঘটনা। আমাদের এ হতাশাদীপ্ত, জীবন্মৃত জীবনে লটারী না মিললে কোনদিন বড় হতে পারব না--কোনদিন মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারব না। এ পৃথিবীর সবাই বড় হতে চায়--আমিও চাই।

ধারাবাহিক উপন্যাসঃ হৃদয়ের এপিঠ-ওপিঠ (পর্ব-১৮)
--শাশ্বত স্বপন

গাড়ি এসে একেবারে গ্যারেজের সামনে থামল। আমি নামলাম। দোতলায় তাকালাম। ন্যান্সি হাতে টেপ-রেকর্ডার নিয়ে দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল। মনে হচ্ছে নিচে ফেলে দেবে। আমি লজ্জার মাথা খেয়ে ডাকলাম, ন্যান্সি’। ডাক শুনে তার চোখ-মুখ খুশিতে চিকচিক করে উঠল। সে টেপ-রেকর্ডার তার পায়ের কাছে রেখে দিল। আমার কাছে আসতে বললাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই দৌঁড়ে আমার কাছে ছুটে আসল। হাতে একটা প্যাডের কাগজ ভাঁজ করা। সামনে এসে আমার দিকে তাকাল, হাসল। ভাঁজ করা কাগজটা আমার ডান হাতে দিয়ে বাম হাত ধরে ফুলের বাগানের দিকে নিয়ে যেতে লাগল। দোতলার জানালা দিয়ে মিসেস চৌধুরী ব্যাপারটা লক্ষ্য করছিল। কাজের বুয়াও খুশিতে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সুইমিং পুলের সামনে আমাকে বসাল, নিজেও বসল। কাগজটা পড়তে বলল, ভাঁজ করা কাগজটা পড়লাম। “ফ্রান্সিস, তুমি চলে গিয়েছিলে কেন? আমি তো ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে তোমাকে নিয়ে কত স্বপ্ন দেখেছি। কি দেখেছি জান? বলব না। টেলিফোন করি, কেউ ধরে না। মাথা ঘুরছে, কিছুই ভালো লাগে না।

তারপর, কাঁটাছিঁড়া। কিছুই বুঝা গেল না। বানান ভুল। বাংলা হাতের লেখা খুবই খারাপ। আমার বুঝতে কষ্ট হচ্ছে দেখে সে কাগজটা ছিঁড়ে ফেলল। আমি জিজ্ঞাসা করলাম,
--সাঁতার কাটবে?
--দুপুরে--
--দুপুরে?
--হ্যাঁ।
--নাস্তা করেছ?
মুখ গোমড়া হয়ে গেল। বুয়া পিছনে এসে দাঁড়িয়েছিল। সে এসে আমাকে জানাল যে, ন্যান্সি সকাল থেকে এ পর্যন্ত কিছুই খায়নি। আমি আবার ওর দিকে তাকালাম।
--খাওনি কেন?
--তুমি খাওনি কেন?
--আমি খেয়েছি তো।
--কখন? আমি দেখেনি তো।
ন্যান্সি বাংলার চেয়ে ইংরেজিতেই বেশি কথা বলে। তাই আমাকেও তার মতো ইংরেজিতে কথা বলতে হয়। সে যখন বাংলায় বলে আমিও তখন বাংলায় বলি।

খাবার টেবিলে বসে তার মায়ের কাছ থেকে শুনলাম, ফ্রান্সিস ছাড়াও তার আরো বন্ধু ছিল। যদিও তারা তেমন ঘনিষ্ঠ ছিল না; হয়তো ফ্রান্সিসের কারণে। দু’জনের গল্পের ফাঁকে হয়তো অন্যান্য বয় ফ্রেণ্ডদের সময়ই দিতে পারত না। ন্যান্সির জন্য আমাকে খেতে হচ্ছে। তবে এবার দুই প্লেটে। সে খাচ্ছে আর কি এক গানের সুর ধরে গুনগুন করছে। তার মা মাঝে মাঝে স্মৃতিকথা উঠালে ন্যান্সি মনোযাগ দেয়। হঠাৎ সে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। তারপর শুরু হলো মাথার যন্ত্রণা। কি যেন তার মনে হলো। পাগল জীবনে অনেক দেখেছি কিন্তু এমন পাগল কোনদিন দেখিনি। খাবারগুলো তার মায়ের দিকে ছুঁড়তে লাগল। পাশে আয়নার সামনে রাখা বিদেশি খেলনা গাড়িটা ভেঙ্গে ফেলল। আমি কিছুই বলছি না। দর্শকের মতো শুধু দেখছি। ব্যাপারটা অবাক লাগছিল। একটু আগে যাকে সুস্থ্য মনে হলো, এখন সে অসুস্থ। ন্যান্সি আমার হাত ধরল। নিয়ে গেল নিজের রুমে। ভয় ছিল, আমাকেই আঘাত করে বসে কিনা। না, সে রকম কোন লক্ষণ দেখা গেল না। আমাকে আসলে সে কি ভাবে, ফ্রান্সিস না অন্য কিছু। ফ্রান্সিস সদৃশ্য ভেবে সে কি দইয়েল স্বাদ ঘোলে মিটাচ্ছে?

ন্যান্সির রুম পাঁচটা। অর্থাৎ পুরো একটা দোতলা বিল্ডিং তার নিজের জন্য। বিছানা মোট চারটা। যখন যেখানে ইচ্ছা সে আগে শুতো। অসুস্থ হওয়ার পর তিনটি রুম বন্ধ করে দেয়া হয়। নিচ তলার অডিটোরিয়াম একেবারেই বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। কাজের বুয়া আমাকে সব দেখাচ্ছে। ন্যান্সি আমার হাত ধরে আছে। যেন, সে একটা শিশু। শিশুর মতো গাল ফুলে আছে। শিশুর মতো এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে। যেন, এইসব জায়গা সে আগে কখনও দেখেনি। বুয়া চাবি দিয়ে নিচ তলার তালা খুলল। দু’জনে রুমে ঢুকলাম। অন্ধকার কক্ষ। সুইচ টিপ দিয়েই বুয়া অন্য কক্ষে চলে গেল। বাতি জ্বলতেই দেখি বেশ বড় এক অডিটোরিয়াম। ন্যান্সি এমনভাবে তাকাল যেন সে কিছুই চেনে না--আগে কখনো এখানে আসেনি--এ জায়গা কখনও দেখেনি। এক্সিডেন্ট দেখার পর তার স্মৃতিশক্তি কি পুরোপুরি লোপ পেয়েছে? এখানে যে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হতো এ ব্যাপারে আমি নিশ্চিত। চারদিকে বেশ গুছগাছ, বিভিন্ন মহামনীষীর ছবি, নিচে কার্পেট বিছানো অত্যন্ত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। মনে হয়, সকালবেলা কে যেন গুছগাছ করে রেখে গেছে। বড় এক ছবি, মঞ্চের একপাশে টানানো। ভালো করে তাকিয়ে দেখলাম ছবিটা ন্যান্সির। জীবন্ত হাসি, মনে হয়, এইতো সেদিনের ছবি। বুয়ার কাছ থেকে জানতে পারলাম, ছবিটি ন্যান্সির অষ্টম শ্রেণিতে থাকা অবস্থার তোলা। অন্য পাশে মা-বাবার সাথে আরেকটি বড় ছবি। পাশের এক কক্ষে গেলাম। এখানে রাখা আছে বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র। বোঝা যায়, সংগীতের নানান স্রোতধারা একদা এখানে বয়ে যেত। এখানেও নানা প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলীর ছবি টাঙানো। অন্য কক্ষগুলোতে গেলাম। কোনটা নৃত্যের, কোনটি সাজগোজের। পাশে ছোট দু’টি বাথরুম আছে। এখনও টেপ থেকে পানি পড়ছে। সব দেখে মনে হলো, আজ বিকালে বোধহয়, কোন অনুষ্ঠান আছে।
ন্যান্সির ছবির কাছে আসলাম, ওকে জিজ্ঞেস করলাম--“ছবিটি কার? তার হাসি দেখে মনে হয়, সে যেন চিনেছে। আবার মনে হয়, সে এমনি হাসছে। এখানে কারা অনুষ্ঠান করত? এখন বা তারা কোথায়? বুয়াকে জিজ্ঞাসা করতেই দেখি মিসেস নজরুল হাজির। নিচ তলার এই অডিটোরিয়ামে পুরো সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের কথা বললেন। এখানে মাসে চার-পাঁচটি অনুষ্ঠাত হত। অনুষ্ঠানের উপস্থাপিকা হতো ন্যান্সি। প্রথমে ভালোভাবে উপস্থাপন করতে পারত না। জড়তা থেকে যেত। পরে ন্যান্সি আর ফ্রান্সিস মিলে উপস্থাপনা করত। মিসেস চৌধুরীর চোখ ছলছল করছে। একটা চেয়ার দেখিয়ে বললেন, এখানে ন্যান্সি বসত। পাশের চেয়ারটিতে ফ্রান্সিস। আর অন্যগুলোতে আমরা বসতাম। এখনো এই জায়গাটা জাঁকজমক রাখার কারণ হলো--ন্যান্সির স্মৃতিতে ধীরে ধীরে এই মঞ্চের ইতিহাস ফিরে আসে কিনা। যারা আগে এখানে আসত, অর্থাৎ গানের শিক্ষকরা, গুনগ্রাহীরা, বন্ধুরা--এরা ন্যান্সির পাগলামীর কারণে কেউ আসে না। একমাত্র ফ্রান্সিসের চেহারা ছাড়া সব চেহারা সে ভুলে গেছে। ফ্রান্সিসকে সে আমাদের চেয়ে বেশি ভালোবাসত। এখানে এসে মিসেস নজরুল থেমে গেলেন। কিছুক্ষণ পর আবার বললেন, যারা ন্যান্সিকে ভালোবাসত তারা ওর এই মানসিক অবস্থা দেখে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ুক--এ আমি চাই না। অনেকে আমার অগোচরে বলেই ফেলত, খ্রীস্টান একটা ছেলেকে ন্যান্সি এত ভালোবাসত! মা-বাবার চরম উদাসীনতার কারণেই এ অবস্থা হয়েছে। মাঝে বেশ কয়েকবার এখানে অনুষ্ঠান হয়েছিল। ন্যান্সিকে তার চেয়ারে বসিয়ে রাখা হয়েছিল। তার প্রিয় গান, কবিতা, কৌতুক শোনানো হয়েছিল কিন্তু তার কোন পরিবর্তন হয়নি। শুধু ফ্রান্সিস, ফ্রান্সিস, ফ্রান্সিস...।

ন্যান্সি এখনও আমার হাত ধরে আছে। এদিক-ওদিক শিশুর মতো তাকাচ্ছে। সে জোর করে এখান থেকে অন্য কোথাও নিয়ে যেতে চাইছে। এক জায়গায় সে বেশিক্ষণ স্থির থাকতে পারে না। মিসেস নজরুল তাকে স্থির হতে বলল। সে মায়ের কথায় আরো রেগে গেল। এবার আমাকে বাইরে নেবার জন্য আরো বেশি জোর করতে লাগল। কেউ কর্তৃত্ব দেখালে সে এখনো রাগ করে। এই স্বভাবটা তার এখনো রয়ে গেছে। আমি বাইরে যেতে চাইছি না বলে চিৎকার শুরু করল। মনে হয়, এ ঘরে তার দম বন্ধ হয়ে আসছে। বাইরে এলাম। সে বাইরে এসে এমনভাবে একটা নিঃশ্বাস নিল--মনে হলো, এতক্ষণ তার শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। আমাকে সাথে নিয়ে সে দৌঁড়াতে চায়। আমার বেশ লজ্জা লাগছে। সে দৌঁড়ে বাগানে চলে গেল। হাসতে হাসতে আবার ফিরে এলো। শিশুর মতো খেলা করতে লাগল আমাকে ঘিরে। মনে হচ্ছে, এতদিনে সে বন্ধুর মতো একজন বন্ধু পেয়েছে। সে দৌঁড়ে চলে যায়। আবার ফিরে আসে। যেন--‘এই গাঙ্গে কুমীর নাই, নাইয়া ধুইয়া বাড়ি যাই।’ আবার যেন, সে ভয় পেয়েই আমার কাছে ছুটে আসে। ক্রমে ক্রমে তার প্রতি আমার মায়া বাড়তে লাগল।

পরাজিত সৈনিক আমি। পরাজয়ের কোন ভয় আমার নেই। নেই কোন লজ্জা। তবে পরাজয়ের মাঝেও যদি সারা ভূ-খণ্ডের কিছু অংশ দখল করতে পারি তবে তাও হবে জিরো থেকে সম্মুখের কোন সংখ্যা। আর যদি পারি বিজয়ের বেশে সবটুকু দখল করতে তবে তা হবে দুর্লভ পাওয়া। এ পৃথিবীতে অসম্ভব বলতে কিছু নেই। গত দিন যা অসম্ভব ছিল--আজ তা সম্ভব হয়েছে। আজ যা অসম্ভব হয়তো কাল তা সম্ভব হতেও পারে।

ধারাবাহিক উপন্যাসঃ হৃদয়ের এপিঠ-ওপিঠ (পর্ব-১৯)
--শাশ্বত স্বপন

আমি মিসেস চৌধুরী ও বুয়ার দৃষ্টি আকর্ষণ করলাম। দেখলাম তারা বেশ হাসি-খুশি। আমাকে নিয়ে ন্যান্সি চলে এল সুইমিং পুলের ধারে। সে খুব আনন্দে সাঁতার কাঁটছে। মাঝে মাঝে আমাকে পানি ছিটিয়ে দিচ্ছে। জৈষ্ঠ্য-আষাঢ় মাসে ডোবার মাঝে নতুন পানি পেয়ে ব্যাঙ যেমন আনন্দ করে সেও তেমনি করছে। সে গোল টিউবে ভর দিয়ে সাঁতার কাটছে। সাঁতার জানে কিনা--আমি জানি না। এখন আমার পর্যবেক্ষণের সময়। পেছনে তাকিয়ে দেখলাম আমাদের দিকে কেউ তাকাচ্ছে কিনা। ন্যান্সি ফ্রক পরিহিতা ছিল। ওড়না ওর গায়ে কখনও দেখিনি। পাগল বলে কথা নয়--ধনী মেয়েরা কখনও ওড়না পরে না--পড়তে চায় না। ইউরোপীয় স্টাইলে তারা চলতে পছন্দ করে। ভেজা অবস্থায় তাকে খুবই সুন্দর লাগছিল। আমাকে সে পানিতে নামতে বলছে। আমি ইচ্ছে করেই নামছি না। একটা মাত্র ড্রেস পড়ে এসেছি। এটা ভিজালে কার পোষাক পড়ব? আমাকে সে ভিজাতে লাগল।
--প্লিজ, আসো।
--একটা ড্রেসই আমার। ভেজালে পড়ব কি?
--আমার সালোয়ার-কামিজ পড়বে।
--এগুলো মেয়েদের ড্রেস।
--না, তুমি পড়বে, আস, আস বলছি। আসবে না, আচ্ছা--

হঠাৎ করে সে টিউব ছেড়ে দিল। পানিতে তলিয়ে যেতে লাগল। চিৎকার করে বলতে লাগল,‘ হেলপ, হেলপ, হেলপ মী...।’ আমি আর দেরি না করে লাফ দিয়ে পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়লাম। সে আমাকে জড়িয়ে ধরল। আমার দু’গালে দু’টা চুমো দিয়ে আমাকে ধরে পা ছুঁড়াছুঁড়ি করতে লাগল। টিউবটি আমি হাত দিয়ে ধরলাম। সে সরিয়ে দিল। তারপর সাঁতার কাটতে শুরু করল। তাহলে, সে সাঁতার কাটতে পারে? সুইমিং পুলের পাশে বসার সুন্দর একটা প্লেস আছে, কাপড়-চোপড় বদলানোর জন্য। আমি উপরে উঠে এলাম। সেও আসল। শরীরে অবিন্যস্ত ফ্রক। আমি রাগ করে অন্যদিকে তাকিয়ে রইলাম। সে আমার মুখ ঘুরিয়ে তার দিকে আনল, হাসল। কত সুন্দর হাসি! আল্পনার হাসিও খুব সুন্দর ছিল। তবে দুটি হাসিই দু’রকম। পৃথিবীতে কোন কিছুর সাথে কোন কিছুর হুবহু মিল নেই। আমি তার লজ্জা পর্যবেক্ষণ করার জন্য বুকের দিকে তাকালাম। সে প্রথমে বুঝতে পারেনি। হঠাৎ বুঝতে পেরে ফ্রকের উপরের অংশটা বিণ্যস্ত করার জন্য সে নিজেই ঘুরে গেল। আমি আবার উৎসুক হতেই সে একটা কিল লাগিয়ে দিল আমার বুকে। অপরাধ তার বুকের দিকে তাকালাম কেন? লজ্জা তাহলে ঠিকই আছে। সে তার পিঠ আমার দিকে রেখে মাথা হেলিয়ে দিল আমার বুকে। বুঝলাম, ফ্রান্সিসের সাথে এসব ঘটত। সে চোখ বুজে রইল।
--ন্যান্সি, ঠাণ্ডা লাগবে। চল, ফ্রক বদলাবে না?
--না, যাব না। ওখানে ভালো লাগে না।
--আমার ঠাণ্ডা লাগবে তো।
--তোমার ঠাণ্ডা লাগবে, চল, হাত ধর--

আমি হাত ধরলাম। দোতলার সিঁড়িতে পা রাখতেই দেখি বুয়া একটা লুঙ্গি, একটা গেঞ্জি নিয়ে নিচে নামছে। অবাক কাণ্ড, সবই নতুন। বুঝলাম, সুইমিং পুলে যাওয়ার সাথে সাথে এগুলো কিনে আনতে লোক পাঠানো হয়েছে। আমাকে একটা রুম দেখানো হলো। ন্যান্সি ধমক দিয়ে আমাকে তার রুমেই নিয়ে গেল। একটা ছোট রুমে খুব সুন্দর তিনটি আলমারী। মনে হয়, সে এখানেই ড্রেস চেঞ্জ করে। ন্যান্সি একটা আলমারী খুলতে চেষ্টা করছে। আলমালী তালাবদ্ধ। বুয়া চাবি এনে খুলে দিল। বুয়া আমাকে জানাল, এই তিন আলমারীতে কাপড়, থ্রী পিছ,টু-পিছ, ফ্রক-সালোয়ার-সেমিজ ইত্যাদি সংখ্যা আট-নয় শত হবে। আমি অবাক। সে এক একটা পোষাক মাসে দুই-এক দিন পড়ত। তারপর যেখানে-সেখানে ফেলে রাখত। পরে ঐগুলো গরীবদের দিয়ে দেওয়া হতো। ছোটবেলা থেকে সে বহু প্রেজেনটেশন পেয়ে আসছে। তার জন্য কোন অনুষ্ঠান হলে পোষাক, প্রসাধনী সামগ্রী ইত্যাদি বেশি আসত। মনে পড়ে গেল মধূসুদনের কথা। হায়রে মধুসূদন, তোমার উত্তরসূরী আজ আমার সামনে। বুয়া আলমারী খুলতেই সে থ্রি-পিছ আর একটা সালোয়ার-কামিজ বের করল। আমাকে বলল, কোনটা সে পড়বে? আমি টু-পীছের কথা বললাম। আমার জন্য সে ফ্রক বের করেছে। আমাকে ফ্রক পরাবে। আমি লুঙ্গি, গেঞ্জি দেখালাম। সে নাক ছিটকায়। এবার আমি জোর করে তাকে অন্য রুমে নিয়ে গেলাম। নয়তো সব জামা-কাপড় বের করে বিশৃংখলার সৃষ্টি করবে। এসব জামা-কাপড় অনেকগুলো এ রুমের আলনায়ই থাকত। কিন্তু তার পাগলামীর জন্য সবই আলমারীতে তালা বদ্ধ করে রাখা হয়েছে।

সে তোয়ালে দিয়ে তার শরীর মুছে ফেলল। আমি অন্য রুমে যেতেই সে হাত ধরে তার সামনে দাঁড় করাল। আমি শার্ট-প্যান্ট খুলে লুঙ্গি, গেঞ্জি পরিধান করেছি। সে মিটিমিটি হাসছে আমার পোষাক চেঞ্জ দেখে। তারপর সে আমাকে অন্যদিকে তাকাতে বলল। আমি অন্যদিকে তাকিয়ে রইলাম। আশেপাশে কেউ নেই। সে তার ফ্রক খুলল। আমি টের পেলাম। ফিরে তাকাতেই সে দু’হাত দিয়ে বুক ঢেকে পেছন ফিরে বসে পড়ল। আমি পিঠের দিকে তাকালাম। পিঠে দিলাম এক চুমো।
--এই, সরে যাও--অন্যদিকে তাকাও--আমি ইয়েস বললে তুমি তাকাবে।
-- কেন, আমার পোষাক চেঞ্জ এর সময় তুমি দেখেছ না।
--তুমি তো ছেলে।
--তুমি কি মেয়ে?
--হ্যাঁ, অন্যদিকে তাকাও। পরে পুরস্কার দেব।
--তাই--?
--হ্যাঁ, সত্যি বলছি।

হায়রে পাগল! জাতে মাতাল তালে ঠিক। আমি অন্যদিকে এ্যাটেনশন হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। ইয়েস বলতে তাকালাম। সে টু-পীছ পড়ে ফেলেছে। আবার অন্যদিকে তাকালাম তার কথা মতো। সে আমার গলা ধরে ঠোঁটের উপর বসিয়ে দিল গাঢ় চুম্বন। থুথু লেগে গেছে। সাথে সাথে বলে দিল, এটা হলো পুরস্কার। তাকিয়ে রইলাম ওর দিকে। ও হাসছে। সে আমার ভেজা শার্ট, প্যান্ট, তার ফ্রক সবই ফেলে দিল নিচে। তারপর সে তোয়ালে দিয়ে আমার মাথা মুছতে লাগল। ভালোভাবে আমি মাথা মুছিনি সত্য কিন্তু তার দৃষ্টি আমার দিকে গেল? আমি অবাক, কে বলবে সী ইজ মেন্টাল পেসেন্ট? লাজ-লজ্জা সবই যখন আছে তখন...। কি জানি, এ দুনিয়াতে কত জাতের পাগল আছে। এক জনের সঙ্গে অন্য জনের সাদৃশ্য না থাকাই স্বাভাবিক। আসলে সূক্ষ্নভাবে, আমরা কেউ সুস্থ্ নই--সবাই আপেক্ষিক সুস্থ্। তাই একজন অন্য জনকে মনে করি অসুস্থ। মুসলমানে মুসলমানে যুদ্ধ করে বাংলাদেশ ও পাকিস্তান হয়ে গেল। বিশ্বে, এদের অসুস্থই ভেবেছে। কিন্তু তৎকালীন সমাজে বাঙালিরা বুঝতে পেরেছিল ধর্মগত মিল হলেও সংস্কৃতিগত, ভাষাগত, শিক্ষাগত তথা জাতিসত্ত্বাতে বিরাট ব্যবধান। তাই ধর্মের মিল দিয়ে একত্রে থাকা সম্ভব নয়। তাছাড়া ধর্ম ভীরুরা ছিল ধর্ম ব্যবসায়ীদের দ্বারা আক্রান্ত। ধর্মের সূত্র টেনে পাকিস্তানিরা বাংলাদেশের সংস্কৃতিতে বিরাট আঘাত হেনেছিল। বাঙালিরা বুঝল, বাঙালি বিধর্মীদের সাথে ভাই-বোন হিসেবে স্বাচ্ছন্দে থাকা যায়। কিন্তু পাকিস্তানি মুসলমানদের সাথে তা মোটেও সম্ভব হচ্ছে না। তাই সব ভেবে চিন্তে বাঙালিরা সময়ের প্রয়োজনে জাতিসত্ত্বাকে ধর্মের উপর স্থান দিল। তাই বলে ধর্মকে তারা কখনো খাট করে দেখেনি। সময়ের প্রয়োজনে জাতিসত্ত্বাকে প্রাধান্য দিয়েছে মাত্র। বাঙালিরা নিশ্চয় নিজেদেরকে অসুস্থ ভাবে না। আজকের বাংলাদেশে একদল মৌলবাদীদের ভাবে অসুস্থ। আবার মৌলবাদীরা ঐ দলটিকে ভাবে অসুস্থ। আসলে কারা অসুস্থ--তা নির্ণয় করা খুবই সহজ, আবার খুবই কঠিন।

ধারাবাহিক উপন্যাসঃ হৃদয়ের এপিঠ-ওপিঠ (পর্ব-২0)
--শাশ্বত স্বপন

ন্যান্সি আমার দিকে তাকিয়ে আছে। হঠাৎ উঃহু করে আমাকে জড়িয়ে ধরল। মাথা ধরেছে। এই তিন বছরে তার দেহে যে পরিমাণ ঔষধ গেছে--তা তার ওজনের বেশি হবেই। ফলে ক্রিয়ার প্রতিক্রিয়া তো হবেই। একটু পরে মাথা ব্যথা কমে গেল। সে হেসে উঠল। আমাকে নিয়ে কোথায় যাওয়া যায়, তাই ভাবতে লাগল। বুয়া চা বিস্কুট, কলা, আঙুর, আপেল, কোক ইত্যাদি নিয়ে এলো। সে এগুলো বুয়াকে বারান্দায় রাখতে বলল। আমাকে নিয়ে বারান্দায় গেল। তার এখন কি যে আনন্দ হচ্ছে--তা তার চোখ মুখ দেখেই বোঝা যায়। আমি সোফায় বসলাম। ও আমার পাশে বসল। একটা আঙুর আমার মুখে পুড়ে দিল। ভয় পেয়ে আঙুল সরিয়ে নিল। ভেবেছিল আমি কামড় দেব। ফ্রান্সিসের সাথে নিশ্চয়ই এসব ঘটেছে। আমি তার মুখে আঙুর দিতেই সে আঙুলে কামড় বসিয়ে দিল। উঃহু বলে সরিয়ে আনতেই সে দু’হাত দিয়ে আঙুলটাকে ধরে ফুঁ দিতে লাগল। দু’জনেই হাসতে লাগলাম। হাসি আমার মুখ থেকে খুব কমই আসে। মনে হচ্ছে, ন্যান্সির কাছ থেকে আমি নতুন করে হাসতে শিখছি। এক সময় আল্পনাকে অনেক হাসাতাম। আল্পনার মন খারাপ থাকলে পেটে সুরসুরি দিতাম।
চায়ের একটা কাপ আমাকে দিতেই তার চোখ-মুখে এমন একটা ভাব লক্ষ্য করলাম যা আমাকে বিস্মিত করল। এক চোখ বোঁজা অবস্থার উঃ আঃ করতে লাগল।
--ন্যান্সি, কেমন লাগছে তোমার?
--আমাকে ধর...আমি...
কিছুক্ষণ কি এক যন্ত্রণায় ছটফট করল। কি যেন আবোল-তাবোল বকল, কিছুই বুঝলাম না। এমন সব শব্দ করল যা সাজালে কি অর্থ হয় ভাবতে লাগলাম। গাড়ি...ফুল...সবকিছু...না...উহু...ব্যথা...যাব না...ও ও ও...ফ্রান্সিস...। ন্যান্সি ঘুমিয়ে গেছে। মিসেস নজরুল দেখে গেলেন। বেশ লজ্জা পেলাম। তিনি আমার জড়তা কাটানোর জন্য জিজ্ঞাসা করলেন--
--ঘুমিয়ে গেছে?
--হ্যাঁ, মাথায় খুব যন্ত্রণা।
--প্রায়ই হয়। সবে তো শুরু। ও এমন কাজ হঠাৎ হঠাৎ করে বসে--যা ভাবাও যায় না।
--কি সব কথা বলল--কিছুই বুঝলাম না।
--এরকম কথা কম্পিউটারে রেকর্ড করা হয়েছে--কিছুই ধরা পড়েনি। ওকে বিছানায় শুইয়ে দাও।
আমি তাই করলাম। রুমে আমি আর ন্যান্সি ছাড়া আর কেউ নেই। বিছানায় শুইয়ে ওর মুখের দিকে তাকালাম। একটু পরেই দেখি সে চোখ খুলল। চোখ ছলছল করছে।
--আমার কিছু ভালো লাগছে না।
--সমুদ্র দেখবে?
--হ্যাঁ, দেখব। এক্ষুণি দেখব।
--না, এক্ষুণি না। ঘুমাও পরে যাব--
ন্যান্সি কি যেন ভাবছে। মিসেস নজরুল একটা টেপ-রেকর্ডার রেখে গেল। আমি একটা ক্যাসেট নাড়াচাড়া করলাম। রবীন্দ্র সংগীতের ক্যাসেট। চালু করলাম। ‘ধন্য হলো সকল অঙ্গ--পূর্ণ হল অস্তর--সুন্দর হে সুন্দর...।’ আমার কোন অঙ্গ ধন্য হয়েছে কিনা জানি না--তবে হৃদয়ের পুরো অংশ বেদনাতে ভরে গেছে। এক হৃদয়ে এত বেদনা কি করে থাকে? হৃদয় কি কম্পিউটারের মতো এত বেদনা ধারণক্ষম?

আমি জানি, এখন খুব ভালোভাবে উপলব্ধি করি--এই মেয়েটিকে ছেড়ে কোথাও বোধহয় যেতে পারব না। যেতে চাইলেও এরা আমাকে যেতে দেবে না। ন্যান্সি তো যেতে দেবেই না। কিন্তু ‘আমি’ যেতে চাই--পারি না। আমি বাঁচার মতো বাঁচতে চাই কিন্তু পারি না। জীবন্ত লাশ হয়ে আমি বেঁচে আছি। পারি না কোন সিদ্ধান্ত নিতে। সাহস আছে কিন্তু দেখাতে পারি না। হৃদয়ে অনেক দুঃখ-কষ্টের কথা আছে--কাউকে বলতে পারি না--বলার মতো মানুষ পাই না। আমি কি--আমি নিজেই জানি না। টেপে গান বাজছে--‘গ্রাম ছাড়া ঐ রাঙা মাটির পথ আমার মন ভুলায়রে...।’ আমি উৎকণ্ঠে ন্যান্সিকে বললাম, ন্যান্সি, গ্রামে যাবে?
সে দৌঁড়ে এসে আমার গলা জড়িয়ে ধরল। আমি ওর দিকে তাকালাম। সে তার হাত দিয়ে আমার চোখ মুছে দিল। বুঝলাম, আমার চোখে পানি। আজকাল কি হয়েছে আমার? আমি কি অসার? আমি কাঁদি--চোখ দিয়ে পানি ঝরে অথচ আমি নিজেই কিছু উপলব্ধি করতে পারি না। সেলিম ওর দুঃখ-কষ্ট অনেক কিছুই আমাকে বলেছে অথচ আমি ওর কাছে তেমন কিছুই বলিনি। মুখ-চোরা স্বভাব আমার। নিজের কথা নিজের অজান্তেই লুকিয়ে রাখি।
--তুমি কাঁদছ কেন?
--কৈ নাতো, চোখে ডিস্টার্ব আছে।
--আঙ্কেলকে বল।
--বলব, অবশ্যই বলব।
--গান ভালো লাগে?
--খুব--

অনেক বেলা গড়িয়ে গেছে। লাঞ্চের সময় বুয়া দু’জনকে ডাকল। দু’জনে দুই প্লেটে খেতে বসলাম। খাবার টেবিলে বসে সে এমন সব কাণ্ড করছে--যা দেখে ছোট শিশুর কথা মনে পড়ে। আমি কিছুই বলছি না। তার শিশু সুলভ কাণ্ড-কারখানা দেখছি। সে এটা খাবে না, ওটা খাবে না। চৌত্রিশটা আইটেম দেওয়া আছে। যেটা তার ভালো মনে হয়, সেটাও একটু মুখে নিয়ে ফেলে দেয়। বুয়া, রেহানা তাকে এটা-ওটা খেতে বলে, সে আরো রেগে যায়। তার মায়ের দিকে সে খাবার ছুঁড়ে মারে। বুয়াকে তরকারি ছুঁড়ে মারে। কারণ বুয়া তাকে তরকারি খেতে কর্তৃত্ব দেখিয়েছে। সরাসরি এ বাড়ির সদস্য যদিও নয় তবুও ডাক্তারকে ন্যান্সি বেশি ভালোবাসে। সে যা করতে চায়--ডাক্তার তাতেই সায় দেয়। নিষেধ করে না। বুয়ার কাছ থেকে জানতে পারলাম, একদিন সে টিভি ভাঙ্গতে চাইল--ডাক্তার তাকে অনুমতি দিল। সে টিভি ভেঙ্গে ফেলল আছাড় দিয়ে। ডাক্তার হাত তালি দিল। কিন্তু ন্যান্সি গম্ভীর হয়ে রইল। মনে হয়, সে খুশি হয়নি। বুয়া টিভি ভাঙ্গার গল্প বলার সাথে সাথে ন্যান্সি চিৎকার জুড়ে দিল। রেহানা ও বুয়া দু’জনেই চলে গেল। আমি ডাকলাম, “ন্যান্সি আমার কাছে বস।” সে গাল ফুলিয়ে আছে। আমার প্লেট ফেলে দিল। সেও খাবে না--আমাকেও খেতে দেবে না।বললাম, ‘আমি চলে যাব এক্ষুণি।’

সে আবার চিৎকার জুড়ে দিল। আমি উঠে দাঁড়াতেই সে আমাকে আবার বসাল। মাপ চাওয়া ভঙ্গীতে আমার পায়ের সামনে ফ্লোরে বসে পড়ল। আমি অনেকটাই জোর করে তাকে কিছু পরিমাণ খাওয়ালাম। সে চেয়ারে বসে আমার গায়ে হেলান দিয়ে পড়ল। আমি আর খেলাম না। চলে এলাম ওর বিছানায়। ও টেপ চালু করতে গেল। মিউজিকের তালে তালে গুন গুন করে গান গাইছে আর নাচছে। বিছানায় গড়াগড়ি দিতেই মুরাদের কথা মনে পড়ল। ওর টাকার দরকার। সন্ধ্যায় সিঁদুরকে বলতে হবে, তোমাকে আর পড়াতে পারব না। হয়তো সপ্তাহে দুই-একদিন আসতে পারব--যা না আসাই ভালো। বুয়া আমাকে ডাকল। ন্যান্সি বুয়াকে দেখে মারতে গেল। বুয়া দৌঁড়ে চলে গেলে। ন্যান্সি বুয়ার দৌঁড়ানো দেখে হাসল।

ধারাবাহিক উপন্যাসঃ হৃদয়ের এপিঠ-ওপিঠ (পর্ব-২১)
--শাশ্বত স্বপন

রুমে ঢুকল একজন দর্জি, হাতে ফিতা। ফেলে দেওয়া প্যান্ট হাতে নিয়ে বুয়া দর্জির পেছনে দাঁড়াল। দর্জি লোকটি তার সাথে শিশু সুলভ কথাবার্তা বলতে শুরু করল। সুস্থ্য অবস্থায় তার দোকানেই সে সব কিছু বানাত। এ পরিবারে সে একজন প্রাইভেট টেইলার। তার কাছ থেকে ফিতা নিয়ে খেলতে লাগল। আমি ওকে আদর করে ফিতা হাতে নিলাম। দর্জি আমার জামা-কাপড়ের মাপ নিয়ে চলে গেল। আমি অবাক হলাম। এই বোধহয়, তাদের দেওয়া শুরু হলো। আমি ওকে বুঝিয়ে-শুনিয়ে ঘুমের ট্যাবলেট খাওয়ালাম। ও আমাকেও খাওয়াতে চাইল। আমি মিছিমিছি খেলাম। ও খুশি হলো। দু’জনে ছাদে গেলাম। সাবধান করে দেওয়া হলো যেন, সে লাফ না দেয়। আমি ওর হাত ধরেই রইলাম। ও দৌঁড়াতে চাইল। আমি নিষেধ করলাম। ছাদে অসংখ্য ফুলের বাগান। ফুল গাছের পাশে ফুলের নেম-প্লেট দেওয়া আছে। এতসব ফুলের নাম জীবনেও শুনিনি। সব বিদেশি ফুল। একজন মালীও আছে। পাশে তার জন্য ছোট্ট একটা রুমও আছে। উনি বোধহয়, ওখানে থাকেন। অদূরে সুন্দর একটা বাথরুমও আছে। বিরাট বড় ছাদ। দুই দালান সংযুক্ত করে প্রসারিত। মালী আমাদের ফুল দিল। ন্যান্সি খুশিতে নেচে নেচে প্রজাপতি ধরতে লাগল। আল্পনার সাথে ঘটে যাওয়া কোন এক ঘটনার পর থেকে আমি ফুলকে ঘৃণা করতে শুরু করি। আজ পর্যন্তও ফুলকে ভালোবাসতে পারিনি। ফুলের মূল্য আমি দিতে পারি না। ফুলকে কেন জানি ভয় পাই--ভালো লাগে না। আমি জানি, এ আমার এক অসুস্থতা। ইচ্ছে করলে হয়তো এ ব্যাপার সুস্থ্য হতে পারি কিন্তু ইচ্ছা করে না। ফুল আহা মরি তেমন কোন গুরুত্বপূর্ণ বস্তু হিসেবে কখনও আমার কাছে মনে হয়নি। পেটে ক্ষুধা নিয়ে সৌন্দর্য চর্চা বিড়ম্বনা ছাড়া আর কিছুই নয়। কখনও কোনভাবে ফুল হাতে আসলে তা হাতের আঙুলের চাপে পিষে যায় নতুবা পকেটস্থ হয়ে যা হবার তা হয়। মালীর দেওয়া বিদেশি ফুল প্যান্টের পকেটে রাখলাম। সে আমাকে কি যেন আকার-ইঙ্গিতে বোঝাতে চাইছে। আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। এই ছাদ থেকে সে ফ্রান্সিকে দেখত--তাই বোঝাতে চাইছে কিনা--বুঝতে পারছি না। এক ফ্রান্সিস ছাড়া আর সবাইকে সে ভুলে গেছে। আমার বিশ্বাস হতে চায় না। ন্যান্সি কি অভিনয় করছে? না, না সে কি সম্ভব! পাগল তত্ত্ব বোঝা এত সহজ নয়। কিন্তু লিখতে তো বেশ পারে। যেহেতু সে ফ্রান্সিস বলে চিৎকার দিয়ে জ্ঞান হারিয়েছে সেহেতু ঐ শব্দটা স্মৃতি কক্ষে জমে আছে। আর বাকি সব...কোথায় গেছে? হ্যাঁ, সেটাও প্রশ্ন। মস্তিস্কের কোন কক্ষে তালাবদ্ধ হয়ে আছে; নাকি শূন্যে হারিয়ে গেছে, কোন সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তবে এইটুকু বুঝি, সে ঐদিন থেকে পৃথিবীতে দ্বিতীয় জন্ম নিয়েছে। সত্যিকারের শিশুর মতো নয়--বেশ বৈচিত্র্য নিয়ে।

মিসেস নজরুল ছাদে কিছুক্ষণ গল্প করলেন। তিনি ন্যান্সির পাশে বসেছিলেন। ন্যান্সি তার মায়ের পাশ থেকে সরে এসে আমার পাশে বসল। আমাকে নিয়ে অন্য দিকে সরে যেতে চাইল। যেন আমি আপন, তারা পর। মিসেস নজরুলের কাছে ভৃত্যের মতো ছোট ভাইয়ের সমস্যাটা জানালাম। সে হাসি মুখে রাজী হলো। আমাকে আরো আশ্বাস দিল, যখন আমার যা কিছু লাগে, তাই যেন নিজের বাড়ির মতো ভেবে চাই। আজ যে দুই হাজার টাকা চাইলাম, এটা তিনি পকেট খরচ হিসেবে আমাকে দেবেন আর মাসিক দশ হাজার টাকা বেতন হিসেবে ম্যানেজারের কাছ থেকে নিতে বললেন। আমি অবাক হলাম। এটা কি চাকুরি, ভিক্ষা, দান নাকি অন্য কিছু। তারা আমার পেছনে এত খরচ করবেন! আমি অবাক হলাম। কি এমন কাজ! তার জন্য এত! এতো আলাউদ্দীনের আশ্চর্য প্রদ্বীপ!

এতক্ষণে ঘুমের ট্যাবলেটের ক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে। ন্যান্সি আমার গায়ে হেলান দিয়ে ঘুমাতে চাইছে। অমি ওকে নিয়ে নিচে চলে এলাম। মিসেস নজরুল আগেই নিচে নেমে গেছে। আমি ওকে বিছানায় শুইয়ে দিলাম। মাথায় হাত রাখলাম। কিছুক্ষণের মধ্যে ঘুমিয়ে গেল। পেছনে শব্দ পেয়ে তাকাতেই দেখি মিসেস নজরুল। হাতে টাকা নিয়ে হাসি মুখে এগিয়ে আসছেন।
--নাও, এখানে দুই হাজার নয়--তিন হাজার টাকা আছে। যখন যা লাগে চাইবে--নিজের বাড়ি এবং নিজের মা না হোক, খালাম্মা ভেবে যখন যা খুশি চাইবে। নিজের বাড়ির মতো খাওয়া-দাওয়া করবে। এটা কোন চাকুরি নয় বাবা, এটা...এটা মনে কর, তোমার বোন, তোমার বোন মেন্টাল পেসেন্ট...।
মিসেস নজরুল কান্না জর্জরিত কণ্ঠে অনেক কিছু বললেন। কান্না থামাতে না পেরে মুখে কাপড় চেপে রইলেন। আমি মুহূর্তের এই ফাঁকটুকুতে হঠাৎ করে বলে উঠলাম,
--এখন থেকে আপনাকে আন্টি ডাকব। মা-বাবার আদরের কথা ভুলেই গেছি। সেই ছোটবেলা থেকেই আমরা দু’ভাই বলতে গেলে এতিম।
--তোমার ভাই ইচ্ছে করলে এখানে থেকে পড়তে পারে।
--না, না--হোস্টেলে থাক। ও আমার এ চাকুরি সম্পকে জানে না। জানাতেও চাই না।

বুয়া এসে জানাল তার ফোন এসেছে। তিনি চলে গেলেন। তারা এই অবস্থা ভোগ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে গেছেন। যে কোন অসুবিধা তারা টাকার মাধ্যমে তৎক্ষণাৎ সমাধান করতে পারেন। এই সমস্যাটাও টাকা দিয়ে সমাধান করতে চেয়েছেন, পারেননি। কোন আধ্যাত্মিক শক্তি যেন বোঝাতে চাইল, টাকা দিয়ে সব সমস্যার সমাধান হয় না।

ধারাবাহিক উপন্যাসঃ হৃদয়ের এপিঠ-ওপিঠ (পর্ব-২২)

--শাশ্বত স্বপন

পৃথিবীকে জয় করে নিলেও স্রষ্টার কাছে পরাজয় বরণ করতে হবেই। এটা সবাই জানে। তবুও জয় করার চেষ্টা করে মৃত্যু পর্যন্ত। মৃত্যুকে জয় করতে গিয়েই পরাজয় বরণ করতে হয়। স্রষ্টা মানুষকে কোন না কোন দিক দিয়ে অসম্পূর্ণ রাখেনই। দেখা যাবে, খুব ধনী ব্যক্তি তার তিন মেয়ে, ছেলে নাই অথবা তিন ছেলে, মেয়ে নাই। আবার হয়তো দেখা যাবে কোন সন্তানই নাই। এই যে ন্যান্সি, আট বছরের সাধনার ফল, সে মেন্টাল পেসেন্ট। নজরুল চৌধুরী এদেশের দশজন ধনীর মধ্যে একজন। অথচ তিনিও অসম্পূর্ণ। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, আমাদের সংসার, আমাদের দুই ভাইকে নিয়ে কেন স্রষ্টা এত খেলা খেলছেন? এখানে কি মজা তার? তিনি আমাদের মরতে দিচ্ছেন না, জীবন্ত লাশ করে রেখেছেন। কি জানি, হয়তো এবার মুখের দিকে তাকাবেন। মিসেস নজরুল যে কথা শোনালেন--তা কি ভিতর থেকে, না বাহির থেকে, নাকি আবেগ থেকে। আবেগ থেকে মানুষ এমন সব বেফাঁস কথাবার্তা বলে ফেলে যা পরে চিন্তা করে সেও লজ্জা পায়। কিন্তু তিনি তো সত্যি বললেন। তিনি কি কোন ফাঁক রেখে কথা বলেছেন? ‘বোন’--হ্যাঁ বোনই তো। প্রথমে তো বোনই--তারপরে দেখা যাবে। কোন নারী প্রথমেই প্রেমিকা বা বউ পরিচিতা হয় না--হয় বান্ধবী নয়তো বোন । এই বোন আর আপন বোন এক নয়। সবাইকে আপন বোন ভাবলে বিয়ে করব কাকে? প্রেম করব কার সাথে। আর ন্যান্সির সাথে যেভাবে মিশে আছি তাতে কি ভাবা উচিত? কিন্তু সে তো মেন্টাল পেসেন্ট। হোক পেসেন্ট--মানুষ তো, নারী তো। ভালো হলে না হয়, দেখা যাবে। এখন সে আমার প্রেমিকা যাকে শুধুই ভালোবাসার নিঃশ্বাস দেব--কামনার নিঃশ্বাস নয়। মানুষ কথা দেয়--আবার কথা ফিরিয়েও নেয়। ঠিক দেয়ালে টেনিস বল মারার মতো। আন্টি কি পরে আমাকে ফিরিয়ে দেবে? এই যে তিনি আমাকে আপন বাড়ির মতো ভাবতে বললেন, এটা কি সৌজন্যতা নাকি সত্যিই। কি হিসেবে আমি এটাকে আপন বাড়ি ভাবব? আমি যদি আপন হতাম তবে কথা ছিল। আমি তো তাদের আত্মীয়-পুত্রও নই। যদি...। না, না এরা মেনে নেবে না। কিছুতেই না। আমি তাদের ভাতিজা, ভাগনে কিছু নই। আমি পথের মানুষ। আমার পায়ের নিচে আমার অধিকারভুক্ত সাড়ে তিন হাত মাটি নেই--আমার ঠিকানা নেই--গস্তব্যহীন জীবন আমার। বিষে বিষে বিষাক্ত আমার জীবন।

এরপর আমার কাছে যা যা আসতে লাগল--তা দেখে আমি নিজেও বিমূর্ত হলাম। প্রথমতঃ একটা আংটি। আংটিটি নাকি ফ্রান্সিসের আঙুলে ছিল। ন্যান্সি তাকে দিয়েছিল। পোস্টমর্টেমের পর আরও কিছু ঐ বাসায় দেওয়া হয়েছিল। ম্যাক্সিম এগুলো এ বাড়িতে দিয়ে গেছে। কারণ এগুলো সবই ন্যান্সির দেওয়া। এরপর একটা ঘড়ি, একটি স্বর্ণ খচিত ক্যাপ ও একটি সোনার চেইন। আমাকে এগুলো দেওয়া হলো এই কারণে যে, আমার দেহে এগুলো দেখে তার কোন ভাবান্তর হয় কিনা। আমি সবকিছু পরিধান করে আয়নার সামনে দাঁড়ালাম। মনে মনে বললাম, ভাই ফ্রান্সিস কি প্রেমের মাঝে তুমি ছিলে! একটা বেল্ট দেওয়া হলো--এটাও ফ্রান্সিসের। ব্যাডমিন্টন খেলার সময় মাজায় নয়তো কপালে এটা বাঁধে। বলা হলো, পরে আরো কিছু দেওয়া হবে। আমি ছোট্ট একটা চিঠি লিখলাম, যাতে ঘুম থেকে উঠে এটা দেখে। তাহলে হয়তো গণ্ডগোল করবে না। গালে একটা চুমো দিলাম। পকেট থেকে ফুল বের করে হাতে একটা ধরিয়ে দিলাম। আর একটা চিঠির উপর রেখে চিঠিসহ মুখের সামনে রাখলাম।
এই চেহারা নিয়ে সিঁদুরের বাসায় যাওয়া ঠিক হবে না। ক্যাপ, ঘড়ি, চেইন খুলে ফেললাম। সাধারণ পোশাক পরে আন্টির সামনে গেলাম। টিউশনির কথা বললাম। ছাত্রীর কয়দিন পর পরীক্ষা--তাও বললাম।
--বল কি? ঘুম থেকে উঠেই গণ্ডগোল করবে। তোমাকে ছাড়া এ বাড়ির সবাইকে ওর অসহ্য লাগে। তুমি যাকে পড়াও তার মা-বাবাকে কিছু একটা অসুবিধা অথবা চাকুরির কথা বলে বিদায় নাও। আর যদি কর বা করতে হয় তবে ওকে ঘুম পাড়িয়ে যেতে পারবে। গাড়িতে আসবে-যাবে। যেহেতু তোমার ছাত্রীর সামনে পরীক্ষা।
--না, তা দরকার হবে না--দেখি বিদায় নিয়ে আসতে পারি কিনা। একটা চিঠি লিখে হাতের কাছে রেখেছি। ঘুম থেকে উঠে ওটা পড়লে মনে হয় বিরক্ত করবে না। আমি দুই ঘন্টার মধ্যে চলে আসব। এতক্ষন ও ঘুমাবে মনে হয়।
--ও কিন্তু ভালোভাবে পড়তে পারে না। আগে তো ফ্রান্সিস ছাড়া আর কোন স্মৃতি শক্তি ছিল না। এখন আস্তে আস্তে লেখাপড়াটার স্মৃতিটা আসছে।
--ও
--তুমি গাড়িতে চড়ে যাও। ও অন্তত: তিন ঘন্টা ঘুমাবে।
--আমি যেখানে যাচ্ছি, সেখান থেকে টেলিফোন করব, যদি দেরী হয়ে যায়।
--তুমি তো এ বাসার টেলিফোন নম্বর জান না।
--ডায়েরীতে দেখেছিলাম। মনে নেই এখন।
--৯৮৯৪৬০৬, দাঁড়াও লিখে দিচ্ছি।
আন্টি ফোন নম্বর কাগজে লিখে আমাকে দিল। ড্রাইভার গাড়ি দিয়ে সিঁদুরের বাসায় পৌঁছে দিল। গাড়ি বাইরে অপেক্ষায় রইল। নক করে ঘরে ঢুকতেই সিঁদুর থাণ্ডারড্ হয়ে গেল। তার মুখ শুকনো।
--স্যার, এই বিকালে আসলেন যে?
--পরে বলব। আগে বল, তোমার মুখে শুকনো কেন?
সিঁদুরের মুখটা এবার গম্ভীর হয়ে গেল। সে বইপত্র গোছাতে লাগল।
--স্যার, মা-বাবা আমাকে কোলকাতা পাঠিয়ে দেবে।
--বল কি!
--ওখানে আমার মামা-মামী আছেন। আমাদের অবশ্য ওখানে বাড়িও আছে।
--কবে যাবে?
--পরীক্ষার পর মনে হয়।
--তা অনেক সময়।
এদেশের সিংহভাগ হিন্দুদের এক ঠ্যাং এদেশে, আরেক ঠ্যাং ভারতে। বাঙালিত্ব ধুকে ধুকে মার খাচ্ছে ধর্ম তত্ত্বের কাছে। এদেশ এরা নিরাপদ ভাবে না। সেই দেশ বিভাগের সময় থেকে যাত্রা শুরু হয়েছে এখনো থামছে না। কি করবে? মুসলমান প্রধান দেশ মানে ইসলামী রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করলে, এরা তো ভয়ে কাঁপবেই। অথচ স্বাধীনতার যুদ্ধ হয়েছিল ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্র গঠনের জন্য।
--স্যার, আপনাকে একটা কথা বলব?
--কি কথা?
--পড়া শেষে বলব।
--আমিও পড়া শেষে তোমাকে আমার একটা সুসংবাদ দেব।
--কি সুসংবাদ স্যার?
--পড়া শেষে।
--না স্যার, না শুনলে অংক করতে ভুল হয়ে যাবে।
--প্লীজ, ডোন্ট রিকোয়েস্ট।

দুই মাসও হয়নি এ টিউশনির বয়স অথচ কত আপন! বিদায়ের কথা বললে হয়তো আর বাকি সময়টুকুও পড়ানো যাবে না। তাই কোনকিছু না বলে অনেকটা জোর করে অংক, ইংরেজি, শেষ করলাম। জ্যামিতি করাতে গিয়ে ওর দিকে তাকালাম। বিষাদ চেহারা! বুঝলাম না। জিজ্ঞাসা করতে ইচ্ছে করছে না। আজ তার যতই খারাপ অবস্থা হোক--আমি আজ বিদায় নেবই--আমাকে নিতেই হবে। মায়ার বন্ধন আমার জন্য নিষিদ্ধ। আমাকে সব ভালোবাসা দু’পাশে কাটিয়ে সম্মুখে যেতে হবে। আমি ওর মা-বাবাকে আসতে বললাম। সিঁদুর অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। জানতে চাইল কি ব্যাপার? আমি আশ্বাস দিলাম তেমন কিছু নয়। সে তার মা-বাবাকে নিয়ে এলো। চাকুরি সম্পর্কে তাদের অবহিত করলাম। দু’জনে খুশি হলেও সিঁদুর গম্ভীর হয়ে আছে। তাদেরকে চাকুরির নমুনাটা অন্যভাবে বলেছি। দু’জনে আমার মঙ্গল কামনা করে চলে গেলেন। মা-বাবা যেতেই দেখি, সিঁদুরের চোখে জল।
--তাহলে স্যার আপনাকে আমার কথা বলে লাভ কি? আপনি তো...
--আমি তোমাকে কখনও ভুলব না, মাঝে মাঝেই আসব।
--আসবেন তো?
--অবশ্যই।

ধারাবাহিক উপন্যাসঃ হৃদয়ের এপিঠ-ওপিঠ (পর্ব-২৩)
--শাশ্বত স্বপন

সিঁদুর কিছুটা আশ্বস্ত হলো। ওকে টেলিফোন নম্বর দিলাম। ও খুব খুশি হলো। আমাকে ওদের টেলিফোন নম্বরও দিল। এবার ওর কথা শুনব। ওকে ওর কথা বলতে বললাম। ও আজ বলবে না। টেলিফোনে বলবে। আমি অবাক হলাম। কি যে বলবে আমাকে, তাও আবার টেলিফোনে। আমাকে বসতে বলে, ও অন্য কক্ষে চলে গেল। কিছুক্ষণ পর খাবার-দাবার আর একটা খাম নিয়ে এলো। হাতে খামটা দিল। বুঝলাম, টাকা। খেয়ে-দেয়ে চলে এলাম রাস্তায়। গাড়ি অপেক্ষায় আছে। উঠলাম গাড়িতে। তাকালাম পূর্বদিকে তিনতলা জানালায়। সিঁদুর জানালা দিয়ে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। গাড়ি যে ওয়েট-এ ছিল--সে কথা ওকে আমি বলিনি। ভাবছে, স্যার কি রকম! না জানি, কত বড় চাকুরি। হ্যাঁ, বড় চাকুরিই বলতে হয়। কেউ ডিগ্রী পাস করে মামা-কাকার জোরে বড় চাকুরি পায়; কেউ মাস্টার্স পাস করেও মামা-কাকার তদবীর ছাড়া সাধারণ একটা চাকুরিও পায় না। আমি কি বড় চাকুরি পেয়েছি? হ্যাঁ, বড়ই তো! দশ হাজার টাকা বেতন। প্রাসংগিক খরচও কমপক্ষে পাঁচ হাজার, এর কম হবে না। আমি তো মামা-কাকার সাহায্য নেইনি। তবে এটা কি ব্যতিক্রম কোন চাকুরি? না কি কোন চাকুরিই নয়? ন্যান্সিদের বাসায় চলে এলাম। ন্যান্সি ঘুমুচ্ছে। খামটা ছিঁড়লাম। এক হাজার টাকা। এক মাস পূর্ণ হয়নি অথচ...। তারপর একটা চিঠি।

স্যার,
আমি একটা ছেলেকে ভালোবাসতাম। ছেলেটি আমাকে অবশ্য আগে অফার দিয়েছিল। আমি যতবার এড়িয়ে যাই, সে ততবার সামনে আসে। এভাবে ফিরাতে ফিরাতে একদিন ওর প্রেমে পড়ে যাই। ওর নাম পিযুষ। আপনার কাছে প্রথম দিন মামাত ভাই বলেছিলাম। আসলে ও আমার জীবন-মরণ হয়ে উঠেছিল। কিন্তু এখন! ও খুব সুন্দর কবিতা লিখতে পারে--যা আমার মন কেড়ে নিয়েছিল। প্রায় এক বছর পর জানতে পারলাম সে পিযুষ নয়, সে মুসলমান। আমি এখনো তার আসল নাম জানি না--জানতেও চাইনি। সে গরুর মাংস খায়। গোপন সূত্রে জানতে পেরেছি, কাছিমের মাংসও খায়। আমি একদিন ওকে খুব বকে চলে আসি। আর কোনদিন ওর সাথে কথা বলিনি। বান্ধবীদের মাধ্যমে চিঠি দিত। সে কি চিঠি। সবই রক্ত! ও আগে বলেছিল ওর বাসা নারিন্দায় এবং সেই বাসা বিক্রি করে ওরা স্বপরিবারে কোলকাতা চলে যাবে। সব মিথ্যা স্যা--সব মিথ্যা। ওকে আমি ভুলতেও পারি না। সত্যিই ওকে আমি ভালোবেসে ফেলেছি। ওর চিঠি আপনাকে পরে দেখাব। একটা জিনিস বেশ লক্ষ্য করার মতো, ওর চেহারা আপনার মতো। আমি আজ আর কিছু বলতে চাই না।
ইতি
সিঁদুর

বুয়া চা-বিস্কুট নিয়ে এলো। চিঠি পড়ার সাথে সাথে মনটা কেমন যেন করছিল। আমার মতো চেহারা? সব চিন্তা বাদ দিয়ে ন্যান্সির ঘুম ভাঙ্গা পর্যন্ত অপেক্ষা করলাম। সিঁদুরের যে কিছু একটা ঘটেছে--সেটা আমি আগেই টের পেয়েছি। বারান্দায় চা-বিস্কুট খেয়ে হাঁটলাম কিছুক্ষণ। মনের অজান্তে আল্পনার কাছে খুলে ধরলাম একটা চিঠি--‘আল্পনা, আমার অন্তর্যামী জানেন, কি বিষাক্ত বেদনা বুকে নিয়ে আজও বেঁচে আছি। এক জ্বলন্ত লোহা যেন আমার বুকের ভিতরে শ্মশান জ্বালায় সেই যে জ্বলতে শুরু করেছে, আজও জ্বলেই চলেছে। দশ বছরের প্রেমধারা এভাবে যে দু’ভাগ হয়ে যাবে--ভাবিনি। তুমি কি ভেবেছিলে আল্পনা? নিশ্চয় নয়। তবে কেন এমন হলো? বিয়ের আগে কেন তুমি আমার সাথে পালিয়ে আসলে না। আমাদের প্রেম নিয়ে ছিনিমিনি খেলার অধিকার ঐ টিকি আর দাঁড়িওয়ালাদের কে দিয়েছে? জানালায় তাকিয়ে তাকিয়ে শাখা-সিঁদুর পড়ে তোমার চলে যাওয়া দেখলাম। বিয়ের আগে একবার জোর করে আনতে চেয়েছি--পারিনি। বিয়ের পরে চলে যাওয়ার মুহূর্তেও আটকাতে চেয়েছি--পারিনি। থুথু দিয়েছিলাম ঐ টিকিদের উপর। অপমান আর বেয়াদবি করেছিলাম দাঁড়িওয়ালাদের সাথে। আমি জিততে পারিনি। সমাজের কাছে ব্যক্তি, সব সময়ই পরাজিত হয়। আমি পরাজিত হয়ে জেলে গেলাম আরেকটা ’৪৭ সৃষ্টি করার অপরাধে...। যারা আহত হয়েছিল তাদের আহত করার ইচ্ছা আমার ছিল না--ইচ্ছা ছিল সমাজকে আহত করার। আল্পনা, প্রেমশক্তি বড় ভয়াবহ! তুমি আজ কতদূরে আল্পনা। আমি ন্যান্সির মাঝে তোমাকে খুঁজি। বিশ্বাস কর তোমাকেই খুঁজি।..”

হঠাৎ পিছনে কারো ডাকে সজাগ হলাম। তাকিয়ে দেখি বুয়া। ন্যান্সি জেগেছে। আমি দরজায় দাঁড়ালাম। দেখি, কি করে? সে প্রথমে উঠেই হাতের ফুল দেখে অবাক হলো। ঘুম ভাঙ্গা মুখ গম্ভীর হয়ে আছে। বালিশের পাশে চিঠির উপর ফুল দেখে স্মিত একটু হাসল। চিঠিটা পড়তে চেষ্টা করল। মুখ কুচকে যাচ্ছে। মনে হয়, লেখা ভালো করে পড়তে পারছে না। ডানে-বায়ে আমাকে খুঁজছে। কোথাও দেখতে না পেয়ে আ আ করে চিৎকার শুরু করল। বুয়াকে আমার উপস্থিতির কথা বলতে নিষেধ করলাম। সে বুয়াকে ডেকে চিঠি পড়তে বলল। বুয়া পড়তে জানে না। সে ন্যান্সিকেই পড়তে বলল। আমার কথা জিজ্ঞেস করল। বুয়া বলল, চিঠিতে লেখা আছে। আমি দরজার পাশে লুকালাম। সে আবার পড়ল। কি বুঝল কে জানে? সে দৌড়ে বারান্দায় গেল। গ্রীল ধরে আমার অপেক্ষায় রইল। বুয়া তার কাছে চলে গেল। পিছু পিছু গিয়ে তার চোখ ধরলাম।
--এই কে?
--বলতো আমি কে?
--ও, তুমি। কোথায় গিয়েছিলে?
--বাইরে।
--ফুল, কাগজ...?
--আমি রেখেছি।
সে হাসছে। কিশোরীর মতো দৃষ্টি নিয়ে যুবতীর মতো দেহ ভঙ্গিতে আমার বুকের একেবারে কাছে এসে দাঁড়াল। বুকের পশম নাড়াচাড়া করতে লাগল।
--তুমি আমাকে ছেড়ে কোথাও যাবে না।
--তুমি তো ভালো হয়ে আমাকে ছেড়ে চলে যাবে।
--না, আমি তোমাকে ছেড়ে কোথাও যাব না।
--আমিও যাব না--তোমাকে ছেড়ে কোথাও যাব না।
ন্যান্সি খুব খুশি হলো। ওকে জড়িয়ে ধরে চাপ দিতেই বসে পড়ল। তাহলে নারীত্বের বিষয়গুলোতে সে ঠিকই আছে। আবার উঠে দাঁড়িয়ে একটি চুমো দিয়ে দৌড়ে তার রুমে চলে গেল। ফুল বিছানা থেকে তুলে আমার হাতে দিল। আমি বললাম,
--তুমি ফুলের চেয়ে সুন্দর।
--যা, তুমি সুন্দর।
--ছাদে যাবে?
--হু।

ধারাবাহিক উপন্যাসঃ হৃদয়ের এপিঠ-ওপিঠ (পর্ব-২৪)
--শাশ্বত স্বপন

সন্ধ্যা হয়ে আসছে। সূর্যের আভার তেজও ম্রিয়মাণ হয়ে যাচ্ছে। আকাশ পরিষ্কার। অনেক দূরে বেশ কিছু মেঘ খণ্ডও দেখা যায়। ওকে গান গাইতে বললাম। দু’একটা গানের প্রথম দু’এক কলি গুনগুন করে গাইল--যার মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝলাম না। জোর করেও আর গান আদায় করতে পারলাম না। তবে ওর কণ্ঠস্বর এখনও বেশ সুমিষ্ট। আমি ন্যান্সির প্রিয় নজরুল সংগীতের একটা গানের কিছুটা গাইলাম। ওকেও সাথে গাইতে বললাম। দু’জনেই গাইলাম--‘যত ফুল তত ভুল কণ্টক জাগে--মাটিরও পৃথিবী তাই এত ভালো লাগে..।’ না তেমন ভাবোদয় হলো না। আমি তার হাত ধরলাম। সে হাত ছাড়িয়ে নিল। ছুটোছুটি করতে শুরু করল। সে বলল, ‘আমাকে ধর তো।’ আমি নিজের জড়তা কাটাবার চেষ্টা করলাম। তারপর দু’জনে ফুল গাছের আশেপাশে দৌড়িয়ে দৌড়িয়ে ছুটোছুটি খেলতে শুরু করলাম। কিছুতেই ধরতে পারছি না। যদি বা দু’একবার ধরতে পারি, সে ঝাপটা দিয়ে ছুটে যায়। বুদ্ধি করে একটা গাছের আড়ালে লুকালাম। ঘুরতে ঘুরতে আমার কাছে আসতেই জড়িয়ে ধরলাম। দু’হাত বুকের উপর চেপে বসায় তার কেমন যেন লাগছিল। সে বসে পড়ল। আমাকে সরিয়ে দিল। সে ক্লান্ত। সে আর ছুটবে না।
--তুমি পঁচা।
--কেন? কি করেছি আমি?
--আবার হাসছ। এভাবে ধরেছ কেন?
--কিভাবে ধরেছি?
ভেংচাতে লাগল আমাকে। রাগ করে একটু দূরে যেতেই কেমন করে উঠল। দৌঁড়ে আমার কাছে চলে এলো। মাথা পেইন করছে। চেয়ারে গিয়ে বসলাম। সুন্দর জায়গা। ও আমার গায়ে হেলান দিয়ে আহ, উহু করতে লাগল।
-- ন্যান্সি, খুব যন্ত্রণা?
-- জানি না। ফ্রান্সিস--ফ্রান্সিস--
-- এইতো আমি--
বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। যার জন্য সে বেঁচে আছে সে তো নেই...আমি ফ্রান্সিসের ছায়া হয়ে কিভাবে ওকে নরমাল করব?
ন্যান্সির দু’চোখে পানি ঝরছে।
-- চল, নিচে চলে যাই।
-- আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দাও।

আমি তাই করলাম। আহ্ উহু করতে করতে এক সময় ঘুমিয়ে গেল। আমি ওর ঠোঁটে ভালোবাসার নিঃশ্বাস মুখে নিয়ে চুমো দিলাম। বাঃ! সে হাসছে। লাফ দিয়ে উঠে দিল দৌঁড়। দূরে গিয়ে সে হাসছে। তাহলে এতক্ষণ সে কি অভিনয় করল? না, না অভিনয় নয়। মেন্টাল পেসেন্টদের কত কি বৈশিষ্ট্য। ন্যান্সি প্রস্রাব করবে। সে ছাদের প্রান্তে বাথরুমের দিকে হাঁটতে লাগল। আমিও ওর পিছু পিছু গেলাম। আমাকে বাথরুমের বাইরে অন্যদিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে বলল। সে বাথরুমে ঢুকল। আবার বাইরে এলো। সে আমাকে সাবধান করে দিল, যেন বাথ রুমের দিকে না তাকাই। আমি ঐ জায়গা থেকে দূরে যেতে চাইলাম। সে যেতেও দেবে না। ভয় পায়। আমাকে পশ্চিমমুখী করে দাঁড় করিয়ে বাথরুমে ঢুকল। আমি আড়চোখে তাকালাম। সে আবার হুমকী দিল। আমি কানে ধরে দাঁড়ালাম। সে হেসে বাথরুমের দরজা বন্ধ করল। মালী মনে হয়, এই সন্ধ্যায় মসজিদে নামাজ পড়তে গেছে অথবা রেস্ট-এ আছে। কোথাও তাকে দেখলাম না। দশ-বার সেকেণ্ড পরে সে বাথরুমেই চিৎকার করে উঠল। দরজা খুলেই আমাকে জড়িয়ে ধরল। পেন্ট ধরে আছে। আমি প্যান্টের ফিতা লাগালাম চোখ বুঁজে। সে ভয়ে কাঁপছে। পায়ে প্রস্রাব লেগে আছে। সে আমার হাত শক্ত করে তার ডান হাতের কুচকীতে এঁটে রেখেছে।
--কি হয়েছে?
--ঐ যে...
--কি?
আমি দরজা খুললাম। দেখি তেলাপোকা--পৃথিবীর আদি প্রাণী। হাসলাম। আমাকে নিয়ে নিচে যেতে চাইল। সেখানে প্রস্রাব করবে। আমি তার পায়ের দিকে তাকালাম। সে লজ্জায় চোখ বুঁজে রইল। আমার বুকের উপর চোখ বুঁজেই কি যেন আঁকছে। হায়রে স্রষ্টা, লাজ-লজ্জা তুমি ঠিকই রেখেছ। শুধু মাথাটা...। কেন যে তুমি এসব খেলছো? কেনইবা তুমি আমাকে এখানে এনেছ? তুমি যদি মাটির মানুষ নিয়ে খেলতে এত ভালোবাস তবে আমি কেন পারব না?
--এই মেয়ে, এখন যে লজ্জা পাচ্ছ, প্যান্ট তো খুলে যাচ্ছিল। পোকা কি তোমাকে খাবে? কোথায় উঠেছিল পোকাটা?
--যা--জানি না।
--বেচারা পিপাসার্ত। পানি খেতে আসছিল। আর তুমি পানি--
--যা--তুমি যাও, পানি দিয়ে আস।
--না--নিচে চল।
--ভয় পাও?
--কি? ভয়!
যদিও প্রস্রাব চাপেনি তবুও ন্যান্সিকে সাহস দেখানোর জন্য বাথরুমে গেলাম। প্রস্রাব করলাম। হাত মুঠি করে বের হলাম। বুঝালাম, তেলাপোকা ধরেছি। সে ভয়ে দূরে চলে গেল। ছিঃ ছিঃ করতে লাগল। নিচে গিয়ে হাত ধুয়ে নিলাম। নয়তো সে আমার হাতই আর ধরত না। সে এসি করা বাথরুমে গিয়ে বেশ সময় ব্যয় করল। ঝর্ণা ছেড়ে গোসল করে বের হলো। আমাকে দেখে লজ্জায় অন্য রুমে চলে গেল। আমি বুকের ভিতরে একটা সুপ্ত কথাকে চাপা দিয়ে ছাড়লাম। আজ এ অবস্থা বলে আমি এত কাছাকাছি। একেবারে...। অথচ আমাকে এ বাড়িতে খুব বেশি হলে দারোয়ান, মালী, পিয়ন এ ধরনের একটা চাকুরি পেতেও মামা-কাকা ধরতে হতো। আমি একটা ম্যাগাজিন পড়তে শুরু করলাম। এখন এ রুমে বিভিন্ন পত্রিকা ও ম্যাগাজিন দেওয়া হয়। ন্যান্সি ইচ্ছে করেই বের হচ্ছে না। সে থ্রী-পিছ চেঞ্জ করে টু-পীছ পড়েছে। আমাকে পড়ে দেখাল। তারপর আবার সেমিজ পড়ে দেখাল। আমি কিছু বলছি না বলে সে দৌড়ে এসে ম্যাগাজিন ছুঁড়ে ফেলে দিল। আমি রাগত স্বরে বললাম--
--কি হয়েছে?
--তেলাপোকা।
--কোথায়?
--ছাদের বাথরুমে।
এখনো সে তেলাপোকার কথা ভাবছে। কিন্তু আমি জানি লজ্জার কারণে আসতে পারছে না। অথচ না এসেও পারছে না। তাই ‘তেলাপোকা’! সে বুঝতে পেরেছে আমি তার এই ‘তেলাপোকা’ তত্ত্ব বুঝেছি। সে অন্যদিকে মুখ করে আমার পাশে শুয়ে গুনগুন করতে লাগল। আমার পা তার পায়ের উপর পড়তেই বৈদ্যুতিক শক খাওয়ার মতো উঠে গেল। মুখটা গম্ভীর হয়ে গেল।
--যা--তুমি পঁচা।
--আমি এক্ষুণি মরে যাব।
--মর গিয়ে।
--এই সত্যি মরে যাব কিন্তু।
--এ্যা! মরতো।
আমি মরার ভান করলাম। ও ভেবেছে সত্যি সত্যি মরে গেছি এবং ডাকলেই বেঁচে যাব। আমাকে ডাকতে ডাকল। উঠি না বলে গোঙাতে শুরু করল। আমি তবুও নিরব হয়ে রইলাম।
--আমি আর মরতে বলব না।| ওঠ--ওঠ।
আমি উঠলাম। হাসলাম। দিলাম এক চুমো। এবার সে হাসল। ডাক্তারের আসার সময় হয়ে গেছে। আমি টেপ অন করলাম। গান শুনছি। ওর দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম। ও দরজায় চলে গেল। আমি তাকিয়ে আছি। সেও তাকিয়ে আছে। এই মুহূর্তে ডাক্তার কাশি দিয়ে ঢুকলেন। ন্যান্সি তার হাত ধরল। শিশুর মতো এটা-ওটা দিয়ে খেলতে শুরু করল। ডাক্তার আমার পাশে বসলেন। বুয়া চা-বিস্কুট, পানীয় দিয়ে গেল।
--শোভন, এ দু’দিন ওকে মোটামুটি শান্তই দেখেছ। কিন্তু মাঝে মাঝে এমন সব কাজ করে যা তুমি নিজেও সহ্য করতে পারবে না। তবু করতে হবে। তুমি হয়তো লক্ষ্য করেছ এখন ফ্রান্সিস স্মৃতি আর লজ্জাবোধটা অক্ষুন্ন আছে। কিন্তু দেখবে কোন এক সময় ফ্রান্সিস ছাড়া আর কোন বোধ শক্তি থাকে না। প্রায় প্রতিমাসে মাসিক এর আগে পরে সে প্রচণ্ড উন্মাদ হয়ে উঠে। তাই দায়িত্ব যখন নিয়েছ তখন তোমাকে আগে থেকেই মানসিক প্রস্তুতি নিতে হবে। তোমাকে আঘাতও করতে পারে।

ধারাবাহিক উপন্যাসঃ হৃদয়ের এপিঠ-ওপিঠ (পর্ব-২৫)
--শাশ্বত স্বপন

আমি ঘাবড়ে গেলাম ভিতরে ভিতরে। প্রকাশ করলাম না। হাস্যোচ্ছলে ন্যান্সির দিকে তাকালাম। সে বুয়াকে সঙ্গে নিয়ে খেলছে। সে আমাকেও আঘাত করবে। ভাবতেই বুকটা শুকিয়ে যায়।
--স্যার, মাঝে মাঝে ওকে একেবারে সুস্থ্য মনে হয়। ও যদি অনেকক্ষণ চেষ্টা করে তাহলে পড়তে পারে।
--এগুলো আগেও হয়েছে। তুমি ওকে বোঝাও, তুমি ফ্রান্সিস। এ্যাক্সিডেন্ট-এ তুমি মরনি--এটা ওর কল্পনা ছিল।
--ঠিক আছে স্যার, আমার দায়িত্ব পালন করার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করব।
--এ বাড়িতে ন্যান্সি ছাড়া অন্য কোন অসুবিধা আছে?
--না স্যার। কোন অসুবিধা নেই। বরং সুবিধাগুলো কল্পনাতীত।
--ও ভাল কথা। তোমার জন্য বিরাট সারপ্রাইজ আছে।

সারপ্রাইজ! কি সে সারপ্রাইজ? যদি সারপ্রাইজটা ন্যান্সি হয় তবে নিশ্চয় আমি মহাখুশি। আর যদি এসব না দিয়ে বিনিময় প্রথা চলে, তবে খুবই দুঃখ পাব। কিছু কিছু ভালোবাসা আছে যার মূল্য টাকা দিয়ে হয় না। আমি কি ন্যান্সিকে সত্যিই তেমন ভালোবাসি। নাকি লোভ? আমি বুঝতে পারছি আমি বিপথে চলছি--একটু একটু করে খারাপ হয়ে যাচ্ছি। আমি জেনে শুনে বিষ পান করছি। তবুও পেছনে ফিরতে চাই না।
--কি সারপ্রাইজ, স্যার?
--তোমাকে এরপর থেকে এখানে রাতেও থাকতে হবে। তবে যৌন কামনা পুরোপুরি বিসর্জন দিয়ে। আমি জানি, তুমি পারবে। ফ্রান্সিস যে সব জায়গায় ওকে নিয়ে ঘুরেছে--তুমিও সে সব জায়গায় যাবে। তোমাকে কাল থেকে ড্রাইভার গাড়ি চালানো শেখাবে। গাড়ি চালানো শেখা হয়ে গেলে তুমি বিভিন্ন জায়গায় ওকে নিয়ে ঘুরতে যাবে। কক্সবাজার, ন্যাশনাল পার্ক, কোর্টবাড়ি, শফিপুর ইত্যাদি জায়গায়ও যেতে হবে। তবে দূরের পথ বিমানেই যাবে। জার্মানেও ওকে নিয়ে যাওয়ার চিন্তা-ভাবনা করছি। সেখানে ফ্রান্সিসদের বাড়ি। ওর মা-বাবা, ভাই-বোন সব আছে।
--ফ্রান্সিস কোথায় কোথায় যেত তার কোন লিস্ট--?
--আগামীকাল সকালে তোমাকে ছোট এটা ডায়েরী দেওয়া হবে। ওখানে সব লেখা আছে।
ডাক্তার ন্যান্সিকে আদর করে চলে গেল। আমি ডাক্তারের কথাগুলো ভাবতে লাগলাম। পেছন থেকে ন্যান্সি চোখ ধরল।
--বলতো কে?
--ন্যান্সি।
--না।
--হ্যাঁ, ন্যান্সি।
হে-হে-হে করে হেসে উঠল। কিশোরীর মতো হাসি। আমি তাকিয়ে রইলাম। সে আঙুল দিয়ে খোঁচা দেওয়ার ভঙ্গীতে বলল,
---চোখ উঠিয়ে ফেলব। হা-- করে তাকিয়ে থাক কেন?
---তুমি সুন্দর তাই।

তার চোখ-মুখ তৎক্ষণাৎ লাল হয়ে উঠল। আমি হাত জোড় করে মাফ চাইলাম। ও খুশি হলো, পাশে বসল। গায়ে হেলান দিয়ে গুনগুন করতে লাগল। গ্লাস ভর্তি ফলের রস এলো। আমি খেতে শুরু করলাম। আমার দেখাদেখি সেও খেল।

রাতে নজরুল চৌধুরী, রেহেনা, ন্যান্সি ও আমি এক সাথে খেতে বসলাম। যে লোককে অফিসে সবাই সম্মান করে, ভয় পায়, যিনি শুধু কর্তৃত্ব দেখান--সেই কোটিপতির সামনে বসে সাপার করছি! টেবিলে খেতে বসে সে আমাকে পুত্রের মতো স্নেহ করল। তার ও তার স্ত্রীর ব্যবহারে আমি তথা আমার মতো আধপেটা দরিদ্র মানুষটার মনে হলো--এ যেন স্বপ্নের স্বর্গ। আমি তাদের বশীভূত হলাম। বাবাকে বাবা বলেছি কবে--মনে নেই, বাবা প্রাণীটার প্রতি আজীবনই আমার ক্ষোভ ছিল, ঘৃণা ছিল। তাদের ব্যবহার আর স্মৃতিকথা সব মিলে আমার চোখে পানি এসে গেল! খাবারের উপর দু'ফোঁটা অশ্র“ গড়িয়ে পড়ল। হায়রে খাবার! এই খাবারের অভাবে মা মরেছে। আমাদের মুখে অন্ন দিয়ে নিজে নিরন্ন থেকেছে। ওষুধের অভাবে বোন মারা গেছে। রিলিফের গম আনতে গিয়ে দাদী আর ফিরেনি। আজ আমি এমন এক বাসায় খাচ্ছি যারা স্বাধীনতার বিরুদ্ধে ছিল, আমার বাবাও তো এমন হতে পারত। আমি এদেরকে ভালোবাসি, ভালোবাসতে হচ্ছে। এদের আন্ডারে হাজার হাজার শ্রমিক কাজ করে। এরা আজ মহান, বিরাট ব্যক্তিত্ব। রাষ্ট্র এদের কথায় উঠে বসে। হাজার হাজার পরাজিত সৈনিকেরা তাকে সম্মান করে। এদেরকে আমার খুব ভালো লাগে, খুব--। ধর্ম ব্যবসা করে, পাকিস্তানিদের আনুগত্য বজায় রেখে তার বাবা তাকে যা দিয়ে গেছে তাই সে চালিয়ে যাচ্ছে। তাকে এখন আর ধর্ম ব্যবসা করতে হয় না--কারো আনুগত্য স্বীকার করতে হয় না। এরা সময়কে চিনে। জীবন কি--তা বুঝে। ধর্ম, স্বর্গ, নরক সম্পর্কে এদের ধারণা পরিষ্কার। তাই পার্থিব সমস্যা ছাড়া আধ্যাত্মিক সমস্যা নিয়ে বাহিরে যা ভাবে, ভিতরে তার উল্টো ভাবে। হঠাৎ চাচার কথা মনে পড়ল। মৃত্যু মুহূর্তে চাচা আমার হাত ধরে আমাকে একটি সত্য অথচ জঘন্য নির্মম কথা বলতে চাইল--যার প্রায়শ্চিত্ত করার জন্য আমাদের দু’ভাইকে এ বাড়িতে আশ্রয় দিয়েছে। সে রুমের আমি ছাড়া বাকি সবাইকে চলে যেতে বলল। আমি অদম্য আগ্রহ নিয়ে জানতে চাইলাম--কি কথা? তারপর যা বলল--তা আমি স্বপ্নের ঘোরে শুনছি নাকি বাস্তবে--বিশ্বাস করতে পারছি না। হিমালয় পর্বত যেন, আমার এ ক্ষুদ্র দেহের উপর ভেঙ্গে-চুড়ে পড়ল। সে মারা গেল। তার দিকে আর একবারও ফিরে তাকালাম না--কাঁদলাম না। অথচ আমার প্রচণ্ড কাঁদা উচিত ছিল। চাচার জন্য না হোক, বাবার জন্য। আমি অবাক, প্রচণ্ড অবাক হলাম। মুখ থুথুতে ভরে উঠল। আমি চাচার কথা আবার আমার স্মৃতিপর্দায় রিপিট করলাম--শোভন, তোমার বা-বা...আমা-র...খুব ঘ-নি-ষ্ঠ..বন্ধু..ছিল। বাল্যকাল..থেকে...এ-ক-সা-থে...। সে হঠাৎ দ-ল প-রিবর্ত-ন করে সি-রাজ সিক-দারের পার্টি-তে...যোগ...। ডাকা-ত (আহ্)...। তাই আ-মরা...ওকে (ওহ্) খু-ন ক-রি। তুমি আ-মা-কে ...ক্ষ-মা...আ...আ...আ...। মৃত্যু মুহূর্তে বুকের প্রচণ্ড কষ্ট নিয়ে আর বলতে পারেনি। তার জানাজায়, দাফনে আমি ছিলাম না। সেই দিনই চলে আসি ঢাকাতে। মুরাদ তখন ঢাকাতেই পড়ত--ঢাকাতেই থাকত। ঐ পরিবারের সাথে আশ্রিত সম্পর্ক সেদিনই শেষ হয়ে
যায়। কিন্তু আমি আজও বলি ’৭৪-এ কে বা কারা যেন বাবাকে ধরে নিয়ে যায়...।


ধারাবাহিক উপন্যাসঃ হৃদয়ের এপিঠ-ওপিঠ (পর্ব-২৬)

--শাশ্বত স্বপন

ন্যান্সি আমার চোখে পানি দেখে ভাবল তার বাবার কথার কারণেই আমি কাঁদছি। সে খাবারসহ প্লেট তার বাবার মুখের দিকে ছুঁড়ে মারল। তরকারির প্লেটগুলো মায়ের দিকে ছুঁড়ে মারল। আমি ন্যান্সিকে ধমক দিয়ে থামালাম। ওকে একটু দূরে নিয়ে ব্যাপারটা বুঝালাম। তাকে ক্ষমা চাইতে বললাম। সে ক্ষমা চাইল মা-বাবার কাছে। নজরুল চৌধুরী ন্যান্সিকে আদর করে তার রুমে চলে গেল। আন্টি তাকে আদর করে আবার খাওয়াতে লাগল। এ পরিবারকে সে অনেক দুঃখ দিয়েছে। আরো যে কত দেবে। যে পরিমাণ আনন্দ নিয়ে সে এ বাড়িতে জন্মেছিল--সে পরিমাণ দুঃখ দিয়েই কি সে বাড়ি ত্যাগ করবে?

আমি ওকে ওর রুমে নিয়ে গেলাম। সে বিছানার মাঝখানে কোল বালিশটা পার্টিশন হিসেবে রাখল। শুয়ে পড়ল। আমাকে শুতে বলল। আমি ঘুমাবার ভান করলাম। ও আমার এক হাত ধরে রাখল যাতে, আমি উঠে গেলে ও বুঝতে পারে। বুয়া এসে জানাল একজন নার্স আসছে। এখানে যে নার্স আসে-- তা আমি জানতাম না। মনে হয়, আজ থেকে নার্সের ডিউটি শুরু হলো। জানা গেল, আজ থেকে দিনে দুই-তিন বার সে আসবে। সে এসে ডাক্তারের কথামতো ইনজেকশন দেবে। ঔষধ খাওয়াবে। সে রকিব ডাক্তারের ক্লিনিকে কাজ করে। এখন নার্স ন্যান্সিকে ইনজেকশন দেবে। ন্যান্সি কিছুতেই ইনজেকশন নেবে না। আমাকে নার্স মিছিমিছি ইনজেকশন দিল। তবুও সে ইনজেকশন নেবে না। আমি নার্সকে চলে যেতে বললাম। অনেক ইনজেকশন দেওয়া হয়েছে। কিছুই যখন হচ্ছে না, তখন কি লাভ এসব দিয়ে। হয়তো সে রাত জাগবে, জাগুক। দেখি, রাতে কি করে? হঠাৎ মনে পড়ল মুরাদের হোস্টেলে যেতে হবে। ন্যান্সিকে বুঝালাম। সে কিছুতেই যেতে দিতে চায় না। গেলে তাকে সঙ্গে নিতে হবে, এটা তার শর্ত। কিন্তু ওকে নেওয়া সম্ভব না। কখন পাগলামী শুরু করে।
--ন্যান্সি, তুমি বারান্দায় দাঁড়িয়ে থেক, আমি যাব আর আসব।
--না, আমাকে নিতে হবে।
--কাল নেব--
--সত্যি?
--সত্যি সত্যি সত্যি--তিন সত্যি।
--কখন আসবে?
--যাব আর আসব। এই ধর ঘন্টাখানেক।
--ঠিক আছে, বেশি দেরি যেন না হয়।
গাড়ি নিয়ে ঢাকা কলেজে হোস্টেলে এসে থামলাম। মুরাদের রুমে গিয়ে দেখি ও নেই। টিউশনিতে গেছে। রুমমেটের সাথে কিছুক্ষণ আলাপ করলাম। আধ ঘন্টা সময় পার হয়ে গেল। রুমমেট মনির বাইরে গেল দেখতে, মুরাদ আসছে কিনা। পঁয়তাল্লিশ মিনিটের মাথায় দু’জনে রুমে ঢুকল।
--কখন আসছেন?
--পৌনে এক ঘন্টা হলো।
--টিউশনি ছিল তাই--
--তোর নাকি মাঝে মাঝে মাথা ব্যথা হয়?
--কই, তেমন নয়। তুই বলেছিস বুঝি?
মনিরকে লক্ষ্য করে কথাটা বলেই সে মাথা নিচু করে রইল। আমি ওকে দুই হাজার টাকা দিলাম। টিউশনি সব বাদ দিতে বললাম।
--তোর, যখন যা লাগবে, এই ফোন নম্বর-এ জানাবি।
--আচ্ছা, ভাইয়া বেতন কত?
--পাঁচ হাজার-এর মতো। উপরি আছে।
--বাঃ! চমৎকার।
হঠাৎ ও কেমন করে উঠল। আমার দিকে তাকাতেই দেখি চোখ-মুখ লাল হয়ে গেছে। মাথার যন্ত্রণা শুরু হয়েছে।
--কি রে, তোর কি হয়েছে?
--ভাইয়া আজ প্রায় তিন-চার মাস ধরে মাথার কি যে যন্ত্রণা! আগেও হতো। তেমন কিছু মনে করিনি। সাধারণ ওষুধ খেয়েই ব্যথা সারতাম। পরে এক ডাক্তারকে দেখানোর পর সে কতগুলো এক্স-রে করতে বলল। সবগুলো এক্স-রে করতে প্রায় তিন হাজার টাকা লাগবে। এত টাকা তারপর ওষুধপত্র। তোমার অবস্থার কথা চিন্তা করে তোমাকে এতদিন কিছু বলিনি। আমার মনে হয়, আমার বড় কোন সমস্যা হয়েছে।
--তুই এতদিন কেন জানাসনি?
--কি করার আছে আমাদের।
প্রচণ্ড যন্ত্রণা নিয়ে ও এতগুলো কথা বলল। মনির ওর পাশে বসে মাথায় হাতে বুলাচ্ছে।
--তুই কাল সকাল দশটার দিকে আমায় ফোন করবি। আমি তোকে জানাব--কখন আমি আসব।

ওর মাথার যন্ত্রণা কিছুটা কমলে আমি ন্যান্সিদের বাসায় চলে এলাম। দুই ঘন্টা ব্যয় হয়ে গেছে। ন্যান্সি আমাকে দেখেছে কিন্তু কোন কথা বলছে না, নড়াচড়াও করছে না। মনে হচ্ছে, সে গম্ভীর হয়ে আছে। বুয়া জানাল, ন্যান্সি দশ-বার বার মা-বাবার কাছে গিয়েছে আমার খোঁজ নেবার জন্য। দারোয়ানকে পর্যন্ত জিজ্ঞাসা করে এসেছে। আর বুয়াতো সব সময়ই আছেই। বারান্দায় গিয়ে ওর পাশে দাঁড়ালাম। মুখ ফিরিয়ে একবার আমার দিকে তাকাল। রাত সাড়ে দশটা বেজে গেছে। দেখলাম ওর দ’ুচোখ বেয়ে পানি ঝরছে। আমি ওর হাতটা ধরতেই ঝাড়া দিয়ে একটু দূরে চলে গেল। আমি আবার ওর কাছে গেলাম। একটা ক্যাসেট কিনে এনেছি, দেখালাম, মোটেও খুশি হলো না। বললাম, ‘ন্যান্সি, খুব একটা কাজে আটকা পড়েছিলাম।’

সে কানে হাত রাখল। আমার কোন কৈফিয়ত সে শুনতে চায় না। আমি মাফ চাইলাম। মাফ করল না। সে এবার শব্দ করে কাঁদতে লাগল। আন্টি আসায় সে আরও ক্ষেপে গেল। অবস্থা বুঝে উনি চলে গেলেন। আমি বিছানায় গিয়ে মাথায় হাত রাখলাম। সে বসা অবস্থা থেকে কাত হয়ে শুয়ে পড়ল। মুখে ছোট্ট করে চুমো দিলাম। মাথায় মাথা রেখে আমিও কান্নার ভান করলাম। আমার দিকে তাকিয়ে দেখল আমি সত্যি কাঁদছি কিনা। আমি অভিমান করে নতুন ক্যাসেটের গান চালু করলাম। ‘আমি চলে গেলে পাষাণের বুকে লিখ না আমার নাম...।’ টেপে মাথা রেখে উদাসীন হলাম। সে বিছানা থেকে উঠল। মুখ গোমরা করে আছে এখনো। সে আবার বারান্দায় চলে গেল। আমি ওর পিছন পিছন গিয়ে জড়িয়ে ধরলাম। কোন বাঁধা দিল না। মুখটা ঘুরিয়ে স্মিত একটু হাসল। আমি জোরে চাপ দিলাম। উঃ করে উঠল। তবুও সরে দাঁড়াল না।
--আচ্ছা, তুমি কি ফ্রান্সিস?
আমি অবাক। এ রকম প্রশ্নের জন্য আমি মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। অগত্যা বলে উঠলাম,
--তুমিই বল আমি কে?
--তুমি ফ্রান্সিস।
--হ্যাঁ, আমি ফ্রান্সিস।
তার মুখ-চোখ আর আচরণ দেখে বুঝা গেল, উত্তরটা মনোপুত হয়নি। আমি চুপ করে রইলাম। ও আমার হাত থেকে মুক্ত হয়ে ইংলিশ গানের ক্যাসেট ছাড়ল। আমার কেমন জানি মনে হল, ও যেন ভালো হয়ে যাচ্ছে। সে বিছানায় চলে গেল। আমাকে ডাকল না। আন্টি নিজেই চা, ফলের রস, বিস্কুট দিয়ে গেলেন। আমাকে বলে গেলেন আমি যেন পাশের কক্ষে ঘুমাই। তিনি নিজে বিছানা গোছগাছ করে দিয়েছেন। আমি তার কথায় সায় দিলাম। মেয়ের বিছানায় গিয়ে মেয়েকে আদর করতে লাগলেন। ন্যান্সি ভ্র“ক্ষেপও করল না। সে গানে মশগুল হয়ে রইল। আন্টি চলে গেলেন। ক্যাসেটের এক পিঠের ফিতা শেষ না হতেই উল্টিয়ে দিলাম। ক্যাসেটের এ গান আমার পরিচিত। ডাক্তারের দেওয়া কাগজে দেখেছি। এ্যাক্সিডেন্ট...এর মুহূর্তে এ গানই চলছিল। আমি তার দিকে তাকাতেই দেখি তার মাথার যন্ত্রণা শুরু হয়ে গেছে। হঠাৎ সে চিৎকার করতে লাগল। বিছানা এলোমেলো করে ফেলল। গান চলছে ‘ও ডিয়ার, আই লাভ ইউ...।’ আমি ছুটে এলাম ওর কাছে। কি সব কথা বলছে? সবই ইংরেজিতে। আমি টেপ বন্ধ করলাম। ফ্রান্সিস ফ্রান্সিস বলতে বলতে আমার বুকে হেলান দিল। ওর মুখের উপর আমার মুখ ঘষে বললাম, ন্যান্সি, আমি তোমাকে ছেড়ে কোথাও যাব না। কে যেন বুকের ভিতর মোচড় দিয়ে উঠল। আল্পনাকে মনে পড়ল। হ্যাঁ, আল্পনাই। আল্পনাই জেগে উঠেছে। আমি কি আল্পনাকে ভুলে যেতে চাইছি? কখনও কি ভুলতে পারব? এ পৃথিবী কখনও কিছু মনে রাখে না। এ আকাশ তার বুকে কখনও কোন নাম বা ইতিহাস লিখে রাখে না। সব মানুষই একদিন ভালোবাসার এপার-ওপার সব ভুলে যায়। আমিও হয়তো ভুলে যাব। ভুলে যাব সবকিছু। তখন আমার জীবন আর মৃত্যুর মধ্যে কোন তফাৎ থাকবে না। দুঃখকে যত দূরে ফেলে দিতে চাই--সে হৃদয়ের তত কাছে আসে। আমি তাকে যতই ঘৃণা করি--সে বিশ্ববেহায়ার মতো আমাকে ততই আঁকড়ে ধরে। আমি ভুলে যেতে চাই আমার বিষাক্ত স্মৃতিকে।

ধারাবাহিক উপন্যাসঃ হৃদয়ের এপিঠ-ওপিঠ (পর্ব-২৭)
--শাশ্বত স্বপন

আমি ওকে বিছানায় শুইয়ে জগন্ময় মিত্রের ক্যাসেট ছাড়লাম। মশারী টানিয়ে দিলাম। আমার বিছানায় কাঁত হলাম। ঘুম আসছে না। টেপ অটো সিস্টেম। এক পিঠ শেষ হতেই অন্য পিঠ বাজতে শুরু করল। ঘুমের ট্যাবলেট হাতে নিলাম। আমার প্রিয় গানটা শুরু হলো--“গভীর নিশীতে ঘুম ভেঙ্গে যায়--কে যেন আমারে ডাকে...।’ আল্পনারও এই গানটা প্রিয় ছিল। টেপ বন্ধ করলাম। ঘুমের ট্যাবলেট খেয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লাম।

সকালবেলা ন্যান্সির হৈ চৈ কানে এলো। আমার উঠতে ইচ্ছে করছে না। বুয়া তাকে আমার বিছানা দেখিয়ে দিল। সে বালিশ হাতে নিয়ে আমার বিছানায় শুয়ে পড়ল। বুঝলাম, সকাল ঘুম থেকে জেগে আমাকে না দেখেই চিৎকার করছিল।
--জানো ন্যান্সি, রাতে তোমাকে নিয়ে অনেক দূরে চলে গেছি।
--কই, আমি তো যাইনি।
--স্বপ্নে
--স্বপ্নে, ও, কোথায়?
--জানি না। তবে সেখানে তুমি আর আমি ছাড়া আর কেউ নেই।
--তাই--
--হ্যাঁ
--চল, সেখানে যাই।
--হ্যাঁ, যাব, নিশ্চয় যাব। তোমাকে নিয়ে আমি অনেক দূরে চলে যাব।

দশটার দিকে ডাক্তার এলো। তাকে মুরাদের কথা সব বললাম। বুয়া জানাল আমার ফোন এসেছে। আমি ড্রয়িং রুমে গিয়ে ফোন ধরলাম। মনির ফোন করছে। সে জানাল, মুরাদ মাথার যন্ত্রণার কেমন জানি করছে। আমি ডাক্তারকে জানালাম। ন্যান্সিকে সাথে নিয়ে আমি ও ডাক্তার ছুটলাম হোস্টেলে। গাড়িতে বোঝালাম, কোন কথা বলবে নv--বিরক্ত করবে না। সে আমার কথায় খুশি হলো এবং সম্মতি দিল।

তারপরের ঘটনা বড় দুঃসহ। ডাক্তারের কাছ থেকে জানতে পারলাম, মুরাদের ব্রেইন-ক্যান্সার হয়েছে। আমি যেন কিছু শুনিনি। সুপার সনিক সাউণ্ড যেন, যা কর্ণে প্রবেশ করে না। শ্রাব্যতার সীমায় আসা মাত্র শক্ত হয়ে গেলাম। সহস্র বেদনা ডিঙ্গিয়ে এখানে আমার আগমন। পাষাণে বুক বেঁধেছি। আমি কাঁদব না। কিছুতেই না। ডাক্তার আমাকে সান্ত্বনা দিয়ে চলে গেল। আমি চিৎকার করতে চাইলাম। ভিতরের পরাজিত সৈনিক আমাকে চিৎকার করতে দিল না। রাতে ন্যান্সির বুকে মাথা রেখে কাঁদলাম। ন্যান্সি ওর বুক থেকে আমার মাথা সরাল না। বরং আরো চেপে ধরল। এ মিলন, কামনার নিঃশ্বাসে নয়, ভালোবাসার নিঃশ্বাসে।
--তোমার কি হয়েছে?
--তুমি ভালো হও ন্যান্সি। তোমাকে পরে বলব।
--আমি তো ভালো আছি। আচ্ছা, আমার কি হয়েছে?
--কিচ্ছু হয়নি তোমার। তুমি চুপ কর।

নজরুল চৌধুরী তার নিজের খরচে মুরাদকে সিঙ্গাপুরে চিকিৎসার জন্য পাঠালেন। আমি যেতে পারলাম না। আমি ন্যান্সিকে সুস্থ্য করার জন্য কক্সবাজার, রাঙ্গামাটি, কোর্টবাড়ি, ন্যাশনাল পার্ক, শফিপুর ইত্যাদির জায়গায় বেড়াতে লাগলাম। প্রচণ্ড দুঃখের মাঝেও হাসলাম। কাউকে কষ্ট বুঝতে দিলাম না। টেলিফোনে মুরাদের খোঁজ-খবর নিলাম। আউট অফ ট্রিটমেন্ট। বেশি সময় পার হয়ে গেছে। প্রতিদিন খারাপ সংবাদ আসে। আমি ন্যান্সিকে নিয়ে আনন্দ করি। নিভৃত কোন সময়ে ভাবী, কাঁদি। নজরুল চৌধুরী, মিসেস রেহেনা আমাকে দেখেন। সান্ত্বনা দেন। শত কষ্টের মাঝেও ন্যান্সির সঙ্গতার সামান্য ত্রুচি করিনি। কখনও প্রচণ্ড বিরক্ত হই কিন্তু দায়িত্ব আর তাদের মহানুভবতার কথা ভেবে নিরবে সহ্য করি সব। আমি মাসে মাসে টাকা কখনও নেইনি। শুধু খাবার আর প্রাসংঙ্গিক বিষয় ছাড়া আর কিছুই নিতে চাইতাম না। ন্যান্সির অসুস্থতার ক্রমে ক্রমে উন্নতি হতে লাগল। সে আমাকে ফ্রান্সিস ভাবতে শুরু করেছে। কিন্তু মাঝে মাঝে তার মানসিক অবস্থা এত নিচে নেমে যায় যে, তখন তাকে সত্যিই পাগলী বলে মনে হয়। এর মাঝে একদিন সিঁদুর আমাকে টেলিফোনে সব জানাল। কেন যে এত পরে জানাল--তাও বুঝলাম।

মুরাদ ওকে ভালোবাসত। শুনে আমি অবাক হয়ে গেলাম। মুরাদ পিযুষ নামে হিন্দু পরিচয় দিয়ে ওকে ভালোবেসেছে। সিঁদুরও ওকে ভালোবাসত। দু’জনার ভালোবাসার চরম এক মুহূর্তে সিঁদুর জেনে গেল পিযুষ মুসলমান। সিঙ্গাপুরে যাওয়ার আগে সে সিঁদুরদের বাসায় ক্ষমা চাইতে গিয়েছিল। তার সত্যিকারের সব পরিচয় সে দিয়েছে। সিঁদুর চিনতে পেরেছে, সে যে আমার ভাই। তাই সে অনেক দেরি করে ব্যাপারটা আমাকে জানাল। সিঁদুরের টেলিফোনের কথা এখনও আমার কানে ভাসে--‘‘স্যার, আমি জানি, ও আমাকে সত্যি ভালোবাসে। ও স্রষ্টা মানে না--ধর্মও মানে না। এসব কথা চিঠিতে আমাকে শেষে জানিয়েছে। ওকে আমি খুব ভালোবাসি স্যার কিন্তু আমি তো ধর্মের বাইরে কিছু করতে পারব না। আমি মা-বাবার কাছে বন্দি--মা-বাবা সমাজের কাছে--সমাজ ধর্মের কাছে বন্দি। এতসব বন্দি দশা থেকে...। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে সবকিছু ভেঙ্গে ওর পাশে আমার যাওয়া উচিত। ও আর বাঁচবে কিনা জানি না। ওকে আমি এখন খুব ফিল করি স্যার। আমার মনে হয়, ওকে ছাড়া আমি বাঁচব না। ওকে না পেতাম--তবু তো জানতাম ও বেঁচে আছে কিন্তু...। স্যার, আমি ডিসিশন নিয়েছি, ও ভালো হয়ে ফিরলে আমি ওকে বিয়ে করব। আমি ওকে অনেক কষ্ট দিয়েছি স্যার, অনেক কষ্ট দিয়েছি! ও, ওর ধর্ম পালন করবে, আমি আমার ধর্ম। আপনি আমাদের হেলপ্ করবেন।’’

ধারাবাহিক উপন্যাসঃ হৃদয়ের এপিঠ-ওপিঠ (পর্ব-২৮)
--শাশ্বত স্বপন

আমি সিঁদুরকে কিছু বলিনি। অবাক হয়ে শুনেছি সব কথা। আমার বাবা, আমি, মুরাদ ধর্মতত্ত্ব ত্যাগ করে বাঙালি জাতি স্বত্তার আকর্ষণে ছুটছি। এ যে মিথ্যা, মিথ্যা। ধর্ম তত্ত্ব জাতি তত্ত্বের উপরে, অনেক উপরে ভর করে আছে। ধর্ম ডিঙ্গিয়ে মনুষ্যত্ব আর জাতি তত্ত্বের গলায় মালা দেওয়া যায় না। ধর্ম তত্ত্বে নিষেধ আছে কিনা জানি না--তবে এটাই চলছে। একটা কবিতাটা মনে পড়ে--
‘কবিতা, তোমার কি কখনও মরতে ইচ্ছে করে?
করে না? আমার কিন্তু মাঝে মাঝেই মরতে ইচ্ছে করে।
মাঝে মাঝে খুবই ইচ্ছে করে
গদ্যের মোটেও তা ইচ্ছে করে না
সে চিরঞ্জীব, সাপের মতো ছোলুম বদলায়...।’

মুরাদ একটা চিঠি পাঠিয়েছে আমার কাছে। আমি পিছনে তাকালাম। ন্যান্সি এই রুমে নেই। অন্য রুমে মনে হয়। চিঠিটা পড়তে শুরু করলাম--‘‘ভাইয়া, আমাকে ক্ষমা করো। আমি জানি, আমি বাঁচব না। তোমার সার্মথ্য ছিল না বলেই তোমাকে আমার অসুখের কথা বলিনি। আর সবচেয়ে আসল কথা আমার নিজেরই মরতে ইচ্ছে করে। এ পৃথিবী আমার ভালো লাগে না। তোমাকে খুব দেখতে ইচ্ছে করে। ভাইয়া, তোমার চাকুরি সম্পর্কে আমি সব জেনেছি। ন্যান্সি আপাকে আমার সালাম দিও। তার সুস্থতা কামনা করি। আমি মরব--এই নিয়ে ভাবি না। ভাবি, তুমি বড্ড একা হয়ে যাবে। মা-বাবা মরে গেয়ে বেঁচে গেছেন। আমরা জীবিত থেকে জীবন্ত লাশ হয়ে আছি। ভাইয়া, আল্পনা বৌদিকে খুব মনে পড়ে। কত সেবা-যতœ সে আমাদের করেছে। তুমি বৌদি ডাকতে বলেছিলে--আমি তাই ডাকলাম। এখনও ডাকলাম। খুব যন্ত্রণা ভাইয়া, খুব--। তুমি ভালো থেকো। আমাদের স্মৃতি নিয়ে তুমি বেঁচে থেক ভাইয়া। ইতি, তোমার স্নেহের মুরাদ।

বুকের ভিতর যেন ভূমিকম্প হলো। ইচ্ছে করে, এই ভূমিকম্পে কম্পিত করে এসব দালান, ঘর-বাড়ি--সমস্ত পৃথিবী ধ্বংস করে ফেলি। আমাদের এ বিষাক্ত পৃথিবীর কোন প্রয়োজন নেই। ন্যান্সি এর মধ্যে এসে বেশ যন্ত্রণা শুরু করেছে। প্রচণ্ড রাগে দিলাম এক থাপ্পড়। ও কাঁদতে শুরু করল। না, না আমাকে ভেঙ্গে পড়লে চলবে না। শূন্য থেকে উঠছি। বিশ-ত্রিশ পর্যন্ত যেতে হবে। পারলে একশত পর্যন্ত যাব। হোয়াট ইজ লাইফ, হোয়াই ইজ মানি, হোয়াট ইজ লাভ? আই ওয়ান্ট টু সি।

ন্যান্সিকে খুব আদর করলাম। বললাম, আমার ভাইয়ের কথা। ও খুব দুঃখ প্রকাশ করল। ও নতুন স্মৃতিতে ভালো হতে শুরু করেছে। আমাকে নিয়ে তার স্বপ্নের শেষ নেই। সে নতুন জীবন নিয়ে সুস্থ হবে--তবুও ভালো, সে সুস্থ হোক। আগের চেয়ে পাগলামী তার অনেক কমেছে। একবার সে আমাকে আঘাত করেছে। কারণ পুরো একদিন আমি বাইরে ছিলাম। বাসায় এসে তার বারণ সত্ত্বেও সিগারেট পান করেছি। তাকে ভ্র“ক্ষেপ করিনি। তাই সে কাঁচের জগ ছুঁড়ে মেরেছে। মাথা ফেটে রক্ত ঝরেছিল। তা দেখেই কান্না শুরু করেছে। সেবা-যত্ন সেই করেছে। তারপর আর কখনও সে আমাকে আঘাত করেনি। তবে ঝগড়া করেছে। ডাক্তার, নজরুল চৌধুরী--এরা সবাই ভেবেছে বিভিন্ন জায়গায় বেড়ালে ন্যান্সির আগের স্মৃতি ফিরে আসতে পারে। বিভিন্ন স্থানে ঘুরেও পুরোপুরি সুস্থ হবার লক্ষণ আমি দেখিনি। বরং সে আমাকে নিয়েই নতুন করে জীবন-নীড় এর স্বপ্ন রচনা করে চলেছে। সে জানে, সে অসুস্থ এবং খুব শীঘ্রই সে ভালো হবে। সবাই সিদ্ধান্ত নিয়ে আমাকে আর ন্যান্সিকে সিঙ্গাপুরে পাঠাল। যেদিন সিঙ্গাপুরে পদার্পণ করলাম--সেদিনই মুরাদ মারা গেল। আমি বিদেশের মাটিতে ভাইয়ের জন্য চিৎকার করে উঠলাম। আকাশের দিকে তাকিয়ে থুথু ছুঁড়লাম। দুইবার তারপর আবার তিনবার। ন্যান্সি ভয় পেয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরে আছে। মুরাদের বিছানায় গিয়ে দেখি একটা চিঠি। খুলেনি সে। নার্স জানাল, চিঠি আজ সকালে এসেছে। সে এমন অসুস্থ ছিল যে, খুলে পড়তে পারেনি। নার্স তাকে পড়ে শোনাত কিন্তু তার শারীরিক অবস্থার কথা চিন্তা করে পড়ে শোনায়নি। বিদেশি নার্স। বাংলা বুঝতও না। তবুও সে পড়ে শোনাতে চেয়েছিল। আমি চিঠিটা খুলে পড়লাম, ‘‘পিযুষ, জানি না, তুমি কেমন আছ? আমরা দু’জন বড় বিষাক্ত এক সময়ের শিকার। আজ তুমি কোথায়--আর আমি কোথায়। নিয়তি আমাদের কতদূর নিয়ে গেছে ইচ্ছা করলেও আমরা দু’জনে সব বাঁধা ভেঙ্গে মিলিত হতে পারি না। প্রতিটি বাঁধাই অদৃশ্য পাথর-দেওয়ালে ঘেরা। আমাকে মঙ্গল সূত্রে বাঁধার জন্য আত্মীয়রা উঠে পড়ে লেগেছে। কিন্তু আমি জানি, এ হৃদয়ের অন্তর্যামী শুধু তুমি। এক তুমিই বুঝতে পার, আমার কি কষ্ট! সারাক্ষণ ভাবী, আমার যেন তোমার মতো অসুখ হয়। দু’জনেই যেন পাশাপাশি বেড সীটে মরে যেতে পারি। কিন্তু ঈশ্বর বড় নির্মম, বড় নিষ্ঠুর। তোমাকে যেভাবে যতটুকু পেয়েছি তার বেশি পরম ঈশ্বরও বোধহয় আর বেশি সহ্য করতে পারেনি। দু’তীরে দু’টি মন মাঝখানে নদী। তবু তো তুমি এপারে--আমি ওপারে। এইটুকু অপূর্ণ পাওয়াই হোক পরম পাওয়া। ভালোবাসার পবিত্র হৃদয় থেকে আশীর্বাদ--ভালো হও--ভালো থাক। ইতি, তোমারই সিঁদুর।’’

মুরাদের লাশ নিয়ে চলে এলাম বাংলাদেশে। মনে পড়ল, ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের বাংলাদেশে আমাদের অধিকারে সাড়ে তিন হাত মাটিও নেই। নজরুল চৌধুরী আজিমপুর গোরস্থানে মুরাদের দাফনের সমস্ত ব্যবস্থা করলেন। ন্যান্সি দাফনের দিন একটা কথাও আমার সাথে বলেনি। পাশে পাশে থেকেছে। সে বুঝেছে--তার বোধশক্তি ভালো কাজ করছে। আমি জিতব--আমি জিতব। পরাজিত সৈনিকের পোশাক পাল্টাব; বিজয়ী পোশাকে আমি এ বাড়ি দখল করব। প্রেমশক্তি যুদ্ধশক্তির চেয়েও ভয়াবহ। আমি অস্ত্র ছাড়াই প্রেমশক্তির মাধ্যমে বিজয়ী হব। পুরনো দুঃখ, কষ্ট, স্মৃতি--সব ভুলে যাব।

ধারাবাহিক উপন্যাসঃ হৃদয়ের এপিঠ-ওপিঠ (পর্ব-২৯)
--শাশ্বত স্বপন

ন্যান্সিকে নিয়ে এখন অন্য খেলায় মেতে উঠেছি। সে এখন সব বুঝে। সে অসুস্থ হবার পর থেকে তার মা-বাবাকে কখনও মাম্মী-ড্যাডি বলে ডাকেনি। আমি আজ থেকে মাম্মী-ড্যাডি ডাকতে বললাম। তাকে মা-বাবার সাথে পরিচয় করালাম। সে মাম্মি-ড্যাডি ডাকতেও শুরু করেছে। পুরনো স্মৃতি তার কিছুই মনে নেই। এখন সে খুব একটা ফ্রান্সিস ফ্রান্সিস করে না। এদিকে সেলিম শিউলীকে না পেয়ে অন্য একটা মেয়েকে বিয়ে করেছে। ওদের বাসায় আমার যাওয়া-আসা খুব কম হয়। শিউলী বদরুন্নেসায় ভর্তি হয়ে অন্য এক ছেলের সাথে চুটিয়ে প্রেম করছিল। সেলিম তা সহ্য করতে না পেরে বিগত দিনের ভালোবাসা বিসর্জন দিয়ে বড় ঘরের রূপসী এক মেয়েকে বিয়ে করে সুখেই আছে। ওর স্ত্রীর সাথে পরিচয় হতেই সে এমনভাবে তাকাল যে, আমাকে মাথা নিচু করে থাকতে হলো। বুঝতে পারলাম, সে তার স্ত্রীকে সব বলে দিয়েছে। আমি সেলিমকে আমার চাকুরি ও ন্যান্সি সম্পর্কে সব বলেছি। আর সে তার নিশী সঙ্গিনীকে তো বলবেই। একসাথে ঘুমালে কত গোপন কথাই যে ফাঁস হয়ে যায়।

ন্যান্সি আবার কবিতা গান রিহার্সাল দিতে লাগল। কিন্তু সব কিছুতেই সে যেন নতুন। তাই আমি যা গাইতাম--সে তাই গাইত। হাসতে হাসতে ছুটে যেতাম বাগানে, সুইমিং পুলে, ছাদে। এ বাড়ির সবকিছুই আমার চেনা হয়ে গেছে। কোথায় কতটি বাতি, কতগুলো ফুলগাছ--সব জানা হয়ে গেছে। ন্যান্সি আমাকে পেয়ে দুঃখ-যন্ত্রণাই ভুলে গেছে। সে দিন দিন সুস্থ্য হয়ে যাচ্ছে। আমিও ঠিক তেমনি পুরনো সব স্মৃতিকে ভুলে যেতে লাগলাম। শুধু আল্পনা--বড় যন্ত্রণা দেয়। মাঝে মাঝে মুরাদের মৃত্যুও...।

আমি সিঁদুরদের বাসায় ঐ বিদায় নেবার পর আর যাইনি। টেলিফোনে আর চিঠিতে তার সাথে যোগাযোগ হয়েছে। একদিন বুয়া আমাকে একটা চিঠি দিল। সিঁদুর পাঠিয়েছে কোলকাতা থেকে। কবে সে কোলকাতা গেল , আমাকে জানাওনি।

স্যার,
আমার প্রণাম নিবেন। আমার মানসিক অবস্থা বুঝতে পেরে বাবা আমাকে জোর করে কোলকাতা নিয়ে আসে। এখানে এসেই বিয়ে ঠিক করে। আমি চেষ্টা করেও আপনার সাথে যোগাযোগ করতে পারিনি। আমার খুব কষ্ট হচ্ছে স্যার। পিযুষ যদি সুস্থ হয়ে ফেরে ওকে বলবেন, আমাকে যেন ক্ষমা করে দেয়। আসার দশদিন আগে পিযুষের কাছে চিঠি পাঠিয়েছি। উত্তর আর জানা হলো না। ওকে কোলকাতা আসতে বলবেন। আপনার ও পিযুষের সুস্থ ও সুখী জীবন কামনায়--
আপনার স্নেহের সিঁদুর।
(চিঠি পাওয়া মাত্র উত্তর দিবেন)

সিঁদুর
প্রযত্নে: মনীন্দ্র পাল
১৩২, কাঁচরাপাড়া
নদীয়া, কোলকাতা।
ভারত

দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে চিঠিটা মুষ্ঠিবদ্ধ করলাম। কি করব এখন? উত্তর লিখব? ছিঁড়ে ফেলব? ভাবতে পারছি না। চিন্তা শক্তি কাজ করছে না কেন?

মাসের পর মাস এভাবেই ন্যান্সিকে সঙ্গ দিতে লাগলাম। একদিন গাড়িতে চড়ে মীরপুর-এর রাস্তা ধরে চিড়িয়াখানায় যাচ্ছি। গাড়ি আমি চালাচ্ছি। ন্যান্সি, পাশে বসে আছে। যেন, সে আমার সহধর্মিণী। সে লাল রংয়ের শাড়ি পড়েছে। রাজকন্যার মতো লাগছে। যেন, পূর্ণ যৌবনা নদী। এ নদীর আঁকাবাঁকা সব পথ আমার দেখা-সব জায়গা আমি ছুঁয়েছি। এ নদীর দেখেছি মোহনা--দেখেছি জোয়ার--দেখেছি ভাটা--দেখেছি শেওলার জঞ্জাল। এ নদী আমার জন্য নাব্য--শুধু আমার জন্য। এ সম্পদ আমার--জলমহল আমার। আমি একে সাধনা করে পেয়েছি। টাকা-পয়সা বড় কথা নয়। প্রেম-ভালোবাসায় কখনও টাকা-পয়সার লেন-দেন হয় না। আমি ন্যান্সিকে ভালোবাসি, খুব ভালোবাসি।

এর মাঝে আমি কান কথা শুনেছি। ন্যান্সি নাকি প্রেগনেট ছিল। ফ্রান্সিসকে নাকি ষড়যন্ত্র করে হত্যা করা হয়েছে। ফ্রান্সিসের মৃত্যু আর গর্ভপাত--এ দুটোই তাকে এ অবস্থা করেছে। আমি কান কথা গ্রাহ্য করিনি। তবে মনে আমারও সন্দেহ ছিল। ডাক্তার কাগজে যা লিখে দিয়েছে--তা সবি তাদের বানানো লেখা। ওখানে অনেক ফাঁক-ফোঁকর থাকলে থাকতেও পারে। জার্মানে ফ্রান্সিসদের বাসায় গেলে মৃত্যুর রহস্য হয়তো অনেকটা জানা যেত। আমার খেয়ে কাজ নেই। আমি এক স্বার্থপর মানুষ। ঘটনা ঘটেছে বলেই তো এখানে আমার নাটকীয় আগমন। সে সতী হোক--আর অসতী হোক--তাকে আমি ভালোবাসি। ভালোবাসায় সতী-অসতীর জায়গা নেই--সবই সতী। আমি রামের যোগ্য উত্তরসূরী নই যে, ন্যান্সির সতীত্ব প্রমাণ করতে যাব। দিন পাল্টে গেছে। নারীরা এখনও যে দ্রোপদী হয়নি, সেটাই ভাগ্য। নারীরা এখন যে ধর্ম প্রবর্তক হয়নি, সেটা আরো ভাগ্য--নইলে টিকি আর দাঁড়ির কি অবস্থা হতো--ভেবে পাই না। মীরপুর দশ-এ আসতেই হঠাৎ এক লোকাল বাস চলন্ত অবস্থায় আমাদের গাড়ির একেবারে সামনে এসে পড়ল। ন্যান্সি প্রচণ্ড জোরে চিৎকার দিয়ে আমার গায়ের উপর পড়ে গেল। আমি কোন দিকে না তাকিয়ে বাম দিকে সাইড নিলাম। লোকাল বাস ডান দিকে সাইড নিল। সাইড নিতে বাম্পারে ধাক্কা লেগেছে একটু। ন্যান্সির চিৎকারের ফলে আমার দু’কান স্তব্ধ হয়ে আছে। আমি এই গাড়িতেই অজ্ঞান ন্যান্সিকে নিয়ে ধানমন্ডিতে রকিব ডাক্তারের ক্লিনিকে গেলাম। ডাক্তার তখন ছিল না। নার্সরা তার জ্ঞান ফিরাল। টেলিফোনে খবর দিতেই নজরুল চৌধুরী আর মিসেস রেহেনা গাড়ি নিয়ে হাজির। ন্যান্সির জ্ঞান ফেরা মাত্র আমরা তার কাছে গেলাম। অবাক দৃষ্টিতে সে তাকিয়ে আছে। সে সবাইকে হরিণ চোখা দৃষ্টিতে দেখে আমার দিকে তাকিয়ে বলে উঠল--হু আর ইউ?’ মিসেস নজরুল ন্যান্সির পাশে এসে বললেন--‘ও ফ্রান্সিস, ওকে চিনতে পারছিস না?’ ন্যান্সি আমার দিকে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। মুখে দুই হাত চেপে ধরে কেমন যেন করছে। ঘন ঘন নিঃশ্বাস ছাড়ছে। মাথায় খুব যন্ত্রণা মনে হয়। নার্স এই অবস্থা দেখে ঘুমের ইনজেকশন দিয়ে ঘুম পাড়াল।

ধারাবাহিক উপন্যাসঃ হৃদয়ের এপিঠ-ওপিঠ (পর্ব-৩0)
--শাশ্বত স্বপন

তারপর!!! আমার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসতে চাইল। আমি যেন নিজের কানকেও বিশ্বাস করতে পারলাম না। আমি যেন ন্যান্সি হয়ে যাচ্ছি। ক্লিনিকের সবকিছু ভেঙ্গে ফেলতে ইচ্ছে করছে। খুন করতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু কাকে? তা জানি না। আমি ন্যান্সির সামনে থেকে দূরে চলে এলাম। সে আমাকে চিনছে না। সে আগের স্মৃতি ফিরে পেয়েছে। কিশোরী মেয়ের মতো কথা বলছে। আড়াই বছরের সহধর্মিণী। (৭৩০+১৮৭) ২৪ ঘন্টা যার সাথে আমি কাটিয়েছি--সে আমাকে চিনল না। ফ্রান্সিসের মতো চেহারা বলে সে প্রথমে একটু অবাক হয়েছিল। ঘুম ভাঙ্গার পর নজরুল চৌধুরী তার অফিসের কর্মচারি হিসেবে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিলেন। মিসেস রেহেনা ও ডাঃ রকিব--কেউ কথা বলল না। আমি চলে এলাম। হ্যাঁ, তারা তো এই দিনটির জন্য এতদিন এত টাকা খরচ করেছে। এতদিন এই দিনটির জন্যই তারা প্রতীক্ষা করেছে। আমি দু’দিন ন্যান্সিদের বাসায় গেলাম না। সেলিমের বাসায় থাকলাম। নজরুল চৌধুরী মুরাদের সমস্ত খরচ বহন করেছে বলে, আমি এ পর্যন্ত তার কাছ থেকে কোন বেতন নেইনি। পকেট খরচ তারা ইচ্ছে করেই দিত। সেলিমকে সব বললাম। ও অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইল। দু’দিন পর বিকালের দিকে বাসায় গেলাম। দারোয়ান বলল, ‘স্যার নাকি আপনেরে টাকা-পয়সা দিয়ে বিদায় করে দিয়েছেন?’ ভাবলাম, আমাকে বৃত্তের বাহিরে রাখা হয়েছে। তবুও ভিতরে ঢুকলাম। বাইরের পুরো পরিবেশ পাল্টে গেছে। ন্যান্সি তার খালাত বোন এ্যামি ও তানজির সাথে নিচে নামছে। দু’জনেই হাসি-খুশি। আমি তাকিয়ে রইলাম। এ্যামি ও তানজি আমাকে চিনে। কিন্তু আজ এমন ভাব দেখাল, যেন তারা আমাকে কোনদিন দেখেনি। বুঝলাম, সবই চৌধুরীদের চাল।
--আপনি কে? গত পরশু আঙ্কেল এর ক্লিনিকেও দেখেছি। আপনি আমাদের অফিসের--?
--জ্বি, জ্বি অফিসের কর্মচারি।
--কি কাজ করেন?
--জ্বি স্যার যখন যা বলেন--তখন তাই করি।
--ও, ফ্রান্সিসের মতো অবিকল দেখতে--তাই না এ্যামি?
--হতে পারে হয়তো। চল...

আমার গলা শুকিয়ে যাচ্ছে। আমার আর উপরে উঠতে ইচ্ছে করে না। আমার বিবেক আমাকে বলছে--
--শোভন, আমি জিতলাম--তুমি হারলে। এই সিঁড়ি বেয়ে আর উপরে উঠতে চেষ্টা করো না--এ পথ তোমার জন্য নয়। বেশি বড় হতে চেয়ো না--ঝড়ে পড়ে যাবে।
এক ধাপ, দুই ধাপ করে নিচে নামলাম। উপর থেকে ডাক এলো। নজরুল চৌধুরী ডেকে পাঠিয়েছেন। উপরে গেলাম। দু’দিনে অনেক কিছু পরিবর্তন করা হয়েছে। আজ বোধহয়, বিরাট অনুষ্ঠান আছে। এখন আমার ঠাঁই হলো ড্রয়িং রুমে। ডাক্তার ও নজরুল চৌধুরী আসলেন। আমার মুখ দিয়ে যে কথা সহজে বের হবে না--এ ব্যাপারে আমি নিশ্চিৎ। আমাকে কি বলবেন, তাও আমি জানি।
--শোনো শোভন, তোমার সাথে আমার একটা চুক্তি হয়েছিল--সেই চুক্তি অনুযায়ী তুমি সফল হয়েছ। এই তোমার কাগজপত্র। তুমি আগামীকাল চিটাগাং গিয়ে জয়েন করতে পার।
ডাক্তার বলে উঠল,
--কিন্তু ন্যান্সির সাথে কথাতো দূরের কথা, দেখাও করবে না। ও যেন কিছুতেই বুঝতে না পারে অসুস্থ অবস্থার কোন কথা।
--তাহলে, আমি টেলিফোন করে দিচ্ছি--তুমি আমার হোটেলে গিয়ে থাক।
আমি নজরুল চৌধুরীর দিকে তাকালাম।
--না স্যার, কোন প্রয়োজন নেই।
--তোমার কিছু বলার আছে?
--স্যার, আমি সফল হতে পারিনি বরং আপনারা সফল হয়েছেন।
--কি বলতে চাও তুমি?
--আমি যেভাবে ওকে আপনাদের কাছে দিতে চেয়েছি--সেভাবে পারিনি। ও নিজেই ভালো হয়েছে। আমার উসিলা শুধু একটা এ্যাক্সিডেন্ট। আমার কিছুই নেওয়ার অধিকার নেই।
--না, না তা কেন? তুমি কাল চিটাগাং চলে যাও। এখানকার জামা-কাপড় যাবতীয় সব তোমার ওখানে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। এখন কোথায় যাবে?
--জানি না স্যার--

ডাক্তার চুপ করে আছে। ভেবেছিলাম কোন কথা বলব না। বলেও ফেললাম। আমি আমার নিজের প্রতি বিশ্বস্ত নই। আমি আমার নিজের কাছে কথা দিয়েও কথা রাখতে পারি না। আমি চলে এলাম। চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে হচ্ছিল, আমি কিচ্ছু চাই না। আমার ন্যান্সিকে ফিরিয়ে দাও। না,না, আমি কোন অধিকারে তাকে চাইব। এমন তো কোন চুক্তি ছিল না যে, ভালো করতে পারলে আমার সাথে বিয়ে দেবে। বরং যে চুক্তি ছিল, তিনি তো তাই করেছেন। কাগজগুলো রাস্তায় এসে ছিঁড়তে ইচ্ছা করল। কিন্তু আমার বিবেক বলছে, ‘‘শোভন, তুমি কিন্তু পরাজিত। এখন তুমি আমার কথা মতো চলবে। তুমি জিতলে, আমি কোন কথা বলতাম না। কিন্তু আমি জিতেছি। তাই তোমাকে বলব, কাগজগুলো ছিঁড় না। যা বাস্তব--তাই মেনে নাও। তবে একটা কথা শোনো--ন্যান্সি তো আবার কোন এ্যাক্সিডেন্ট-এ তোমার কাছে ফিরে আসতেও পারে ।

হ্যাঁ, আসবে, ও আসবে। ও অবশ্যই আসবে। হৃদয়ের টান কত দূর আমি দেখব। ও কবে আসবে? ওর সাথে এত ছবি তুললাম; সে সব ছবি ওর হাতে গেলে, ও নিশ্চয় ভাববে। ন্যান্সি, তুমি আগের মতো হয়ে যেও--আমি তোমার জন্য অপেক্ষায় থাকব। আমি যে বিরাট এক ঘোরের মধ্যে আছি--তা আমি জানি। এক হোটেলে এসে সীট ভাড়া নিলাম। সারা রাত মদ খেলাম, সিগারেট খেলাম। বুক গলা জ্বলে গেল। তবুও খেলাম। কানের ভিতর সুরের লহরী নিয়ে ভেসে এলো ‘যখন তোমার কেউ ছিল না--তখন ছিলাম আমি--এখন তোমার সব হয়েছে--পর হলাম আমি।’ মদ আর মদ--এটাই আমার আগামী জীবন। সকাল এগারটায় ঘুম থেকে উঠলাম। আজ ন্যান্সিদের বাসায় বিরাট অনুষ্ঠান। আজ তার জন্মদিন। কত মানুষ আসবে। কত আনন্দ হবে। আমি ডাক্তারের কাছে গেলাম। তাকে বললাম, আমি ওকে শেষ বারের মতো দেখব। উনি বোঝালেন আমাকে অনেকেই চেনে। তাই যাওয়া ঠিক হবে না। সুকান্তের একটা কবিতার চার লাইন মনে পড়ল--
“আমি যেন সেই বাতিওয়ালা
যে সন্ধ্যায় রাজপথে--বাতি জ্বালিয়ে ফেরে
অথচ নিজের ঘরে নেই বাতি জ্বালাবার সামর্থ্য,
নিজের ঘরেই জমে থাকে দুঃসহ অন্ধকার।''-- কবিতাংশ কেন মনে পড়ল? আমার জীবনের সাথে কি এ পদ্যের বেদনাগত কোন মিল আছে? ভাবতে আর ইচ্ছে করছে না।

ধারাবাহিক উপন্যাসঃ হৃদয়ের এপিঠ-ওপিঠ (পর্ব-৩১)
--শাশ্বত স্বপন

ফকিরাপুল এসে সোনালী পরিবহনে উঠলাম। স্লিপিং কোচ। ঘন্টার পর ঘন্টা চলে যাচ্ছে, ঘুম আসছে না। ড্রাইভার টেপের সুইচ অন করতেই গান ভেসে এলো। এক একটা গান আমার হৃদয়ের মরুভূমিতে বালু উড়াতে লাগল। ‘জ্বিতাথা জিসকে লিয়ে--জিসকে লিয়ে মার তাথা--এক এহি লাড়কি থি-জিসে ম্যায় পেয়ার কারতা থা...।’ এরপর গান আর গান। গাড়ি চিটাগাং এসে গেছে। আমি ইচ্ছে করেই শেষে নামলাম। রাত হয়ে গেছে। অফিসে এলাম। সবাইকে পরিচয় দিতেই সম্মান করল। খাওয়া, থাকার ব্যবস্থা করল। আমার হাসতে ইচ্ছে করে, এই ভেবে যে, এটা আমার সম্পত্তি। দু’দিন পর চৌধুরীর কাছ থেকে বড় একটা চিঠি এলো। লোক দিয়ে জামা-কাপড়, টেপ-রেকর্ডার সব পাঠিয়েছেন। এগুলো সবই তাদের। চিঠিতে যে সব লেখা আছে--তা আমাকে মানতে হবে। ‘‘কখনও ন্যান্সির সাথে দেখা বা কথা বলার চেষ্টা করবে না। কারো মাধ্যমে ন্যান্সিকে কিছু জানাতে চেষ্টা করবে না। খুব শীঘ্রই ন্যান্সির বিয়ে। তাই ঢাকাতে না বলা পর্যন্ত আসবে না। আমার সাথে প্রয়োজনীয় সব কথা টেলিফোনেই সারবে। লাইসেন্স তোমাকে দিলেও মালিক আমি। বিশ্বাস অক্ষুণ্ন রাখলে ট্রাভেলস্ সহ আরো কিছুর মালিক হতে পারবে। কথার বরখেলাপ করলে ...। তোমার কাছে যুগ্ম কোন ছবি থাকলে তা ঢাকায় পাঠিয়ে দেবে...।

আরো অনেক নিয়ম। এমনিতেই হাজার নিয়মের বৃত্তে আটকা পড়তে পড়তে নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে তার মধ্যে আরেকটা বৃত্ত। ও গড! আমি এখন শূন্য পার হচ্ছি--এবার সামনে যাব। রাতে জামা-কাপড়গুলো ভাঁজ করে রাখতেই দেখি একটা চিঠি। কোলকাতা থেকে পাঠানো হয়েছে। চিঠির উপরে লেখা ‘পাইবে মুরাদ’। পাঠানো হয়েছে আমার নামে। নিশ্চয় সিঁদুর পাঠিয়েছে। মুরাদ নেই, ও জানে না এখনও। আমি ওকে জানাই নি। কখনও চিঠি পাঠাইনি। এ চিঠি কি করব? মুরাদের রিহার্সাল দেব? নাকি ফেলে দেব? আমি মনের অনিচ্ছা সত্ত্বেও চিঠি খুললাম। তারিখ দেখে বুঝলাম, চিঠি অনেক আগে এসেছে। ন্যান্সিদের বাসার কেউ জামা-কাপড়ের মাঝে চিঠিটা দিয়ে দিয়েছে। ‘‘মুরাদ, এই প্রথম তোমাকে তোমার সত্যিকারের নামে ডাকলাম। তোমার সিঁদুর এখন সত্যি সত্যি সিঁদুর পড়ে। প্রায় একবছর হলো বড় ঘরে আমার বিয়ে হয়েছে। স্যার, তুমি--কেউ আমার কাছে চিঠি লেখনি। এখানে খাদ্য, টাকা, ভালোবাসা কোন কিছুরই অভাব নেই। শুধু তুমি। রাত বারটা। আমার স্বামীকে নরম মাংসের স্বাদ দিয়ে ঘুম পাড়ালাম। মুরাদ তোমাকে খুব দেখতে ইচ্ছে করে। অভিমান করে একটা চিঠিও পাঠালে না। তুমি যদি আমার মতো হতে, তবে বুঝতে কি কষ্ট! কি কষ্ট! জেনেছি আমার ধর্মের পাতা থেকে--মানুষের মৃত্যুর পরও জন্ম থাকে-যদি মরণের পরও জন্ম হয় গো আমার--সে জন্মে যেন পাই তোমাকে। তোমার চিঠির আশায় রইলাম। ইতি, তোমারই, সিঁদুর।’’

‘তোমারই সিঁদুর’--সিঁদুর জানে মুরাদ জীবিত আছে। আমি তাকে জানাব না। সে আজীবন জানবে, মুরাদ বেঁচে আছে। তার মুরাদ বেঁচে আছে--এটা তার বিশ্বাস। এই বিশ্বাসে কেন আমি আঘাত করব? আমি মুরাদের হয়ে ওর কাছে চিঠি পাঠাব। অন্তত: এ পৃথিবীর একজনের কাছে আমার ভাই বেঁচে থাক। আমি চিঠিতে লিখব--সিঁদুর, তুমি ভালো থেক, সুখে থেক, আমাকে ভুলে যেও, তুমি আমাকে ভুলে যেও। আর কি লিখব? ছোট ভাইয়ের প্রেমিকার কাছে আমি কি লিখব? ও গড, তুমি বলে দাও। আমার এ বিষাক্ত সময়ে তুমি কোথায়? আই ওয়ান্ট ইউর হেলপ।

এর মধ্যে ন্যান্সির বিয়ের খবর পেলাম। আমাকে দাওয়াত দেওয়া হয়নি। বৌ-ভাত বিডিআর দরবার হলে হবে। আমি নজরুল চৌধুরীর সাথে ঢাকা দেখা করলাম। উনি অবাক হলেন আমাকে দেখে। আমার এ আকস্মিক উপস্থিতি তিনি মোটেও আশা করেননি। দু’জন লোক তিনি আমার সাথে দিলেন। আমি বুঝতে পারছি, উনি আমাকে সন্দেহ করছেন। আমি জিদ ধরেছি ন্যান্সিকে আজ আমি দেখবই। তার কথা মতো চোখে চশমা, মুখে দাঁড়ি লাগিয়ে বিকাল বেলা বিয়ে দেখতে গেলাম। আমার সাথে দু’জন লোক অতন্দ্র প্রহরীর মতো লেগে আছে। দু’জনের কেউ কোন কথা বলছে না। আন্টিকে দেখলাম বেশ হাসিখুশি। সবাই আনন্দে আছে। কেউ আমাকে চিনতে পারেনি। এটাই স্বাভাবিক। দুইটা সিংহাসন। একটাতে ন্যান্সি, অন্যটাতে তার স্বামী বসে আছে। এই সেই নারী--যার দেহের রক্ত বিন্দু পর্যন্ত আমার চেনা। সে তো আমার হতে পারত। কি বিষাক্ত সময় আমার! মরে যেতে ইচ্ছে করে। যে মরতে চায়, যম তাকে ছুঁতেও চায় না। যে মরতে চায় না, যম তাকেই ধরে। কি বিভৎস কষ্ট আমার! কেউ নেই, ভালোবাসার একটু ছোঁয়া দেবে। কেউ নেই, কেউ নেই--আমি এতিম। কি বিষাক্ত অথচ কত সুন্দর জুটি। আহা! মাথাটা কেমন যেন চক্কর দিল। প্রকৃতির মাঝে ঘড়ি--এরকম একটা সিনারী দেখে ছবি কিনে এনেছি। প্রেজেনটেশনটা দিলাম। আজ আমি ন্যান্সির বিয়ে খাব। আমার পাশের দু’ব্যক্তি আলাপ করছেন। এ বিয়েতে আশি লক্ষ টাকা শুধু খাবার খরচে ব্যয় হচ্ছে। দাওয়াতের কার্ড চার রকমের করা হয়েছে। বিদেশি ও কোটিপতিদের প্রথম শ্রেণির কার্ড, লক্ষপতিদের দ্বিতীয় শ্রেণির কার্ড। প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিদের তৃতীয় শ্রেণির আর বাকি সবাইকে চতুর্থ শ্রেণির কার্ড দেওয়া হয়েছে। ভিক্ষুকদের কোন কার্ড নেই, তবে এদের আলাদাভাবে খাবার দেওয়া হবে। ভিক্ষুকদের আসতে বলা হয়নি--এরা ইচ্ছে করেই এসেছে। আমিও তো ইচ্ছে করেই এসেছি। আমার জায়গা হওয়া উচিত ঐ ভিক্ষুকদের মাঝে। চারিদিকে কত বাতি। বর-কনেদের আশে-পাশে কত ফুলপরী! স্বর্গ থেকে এসেছে যেন। আমি এক দৃষ্টিতে ন্যান্সির দিকে তাকালাম। অনেকক্ষণ। আমাকে অনুসরণকারীরা চেয়ারে বসাল। খেতে বলল। অনেকের মাঝে খেতে বসেছি। খাবার মুখে দিতেই আমার বিবেক হে হে করে হেসে উঠল। হাসতে হাসতে সে আবার কাঁদতে শুরু করল। আমাকে বলল, শোভন, তুমি চিটাগাং চলে যাও--চলে যাও। আমি মাথা ব্যথার কথা বলে উঠে আসলাম। চারিদিকে ফুল আর ফুলপরীদের ভীড়। দুপুর থেকে বিকাল পর্যন্ত মানুষ আসছে, খাচ্ছে, দেখছে, অবাক হচ্ছে, চলে যাচ্ছে স্বর্গ-স্বপ্ন নিয়ে। সেলিমের বাসায় খেলাম। ও সব ভুলে যেতে বলল। স্রষ্টাকে ইচ্ছেমতো গালমন্দ করল। শিউলীর উপমা টানল নাস্তিক স্টাইলে। আমি খুশি হলাম। ও সত্যি নাস্তিক হয়ে গেছে। এখন আর কথার মধ্যে ধর্মের জড়তা নেই। কিন্তু আমি এখনও স্রষ্টার দিকে চেয়ে আছি--ন্যান্সি আসবে, আল্পনা আসবে...কবে আসবে--জানি না। হয়তো সেদিন আমি পৃথিবীতেই থাকব না। সেলিমের বুক সেলফ থেকে ইংরেজি কবিতার বই পড়তে লাগলাম। কোন কবিতাই ভালো লাগছে না। পৃষ্ঠা উল্টাতে উল্টাতে হঠাৎ রবার্ট ব্রাউনিং এর ‘দ্য প্যাট্রি অ্যাট্--কবিতাটি চোখে পড়ল।
‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌ ‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌...ইট ওয়াজ রোজেস, রোজেস, অল দ্য ওয়ে,
উইথ মার্টল মিক্সড ইন মাই পাথ লাইক ম্যাড;
....................................................
স্টোনস এ্যট মী ফল মাই ইয়ার’র মিসডিডস
দাস আই ইনটারড, এন্ড দাস আই গো!...

ধারাবাহিক উপন্যাসঃ হৃদয়ের এপিঠ-ওপিঠ (পর্ব-৩২)
--শাশ্বত স্বপন

বাঙালী যুবক ন্যান্সিকে বিয়ে করে আমেরিকা নিয়ে যাবে। তারপর মাঝে মাঝে আসবে। আমেরিকায় যুবকের বাড়ি আছে, ব্যবসা আছে। তার গ্রীন কার্ড আছে। আচ্ছা, ছেলেটি কি ন্যান্সি সম্পর্কে কিছু জানে না? অবশ্যই জানে। এসব অজানা থাকে নাকি? সে আমেরিকা থাকে। সেও দুই নম্বর--ন্যান্সিও দুই নম্বর। টু এন্ড টু মেকস ফোর। হে হে হে... এ হাসি কি সুখের নাকি অতি দুঃখ-কষ্ট থেকে? জানি না। ছেলেটি ন্যান্সিকে বিয়ে করেছে নাকি? সে বিয়ে করেছে নজরুল চৌধুরীর বিরাট সাম্রাজ্য, প্রতিপত্তি ও সম্মান। কোটিপতিদের ছেলেরা যেমন, মেয়েরাও তেমন। আজকের ডিস অ্যান্টিনার যুগে দুই নম্বর, এক নম্বর বলতে কিছু নেই। সবই এক নম্বর। অনেকে বলে খাদ্যদ্রব্যের মতো, ব্যবহার্য দ্রব্যের মতো মানুষও নাকি দুই নম্বর হয়ে যাচ্ছে। দেশ এখন বোম্বের, ইউরোপের, আমেরিকার কালচার খাদকের মতো পেট ভরে গিলছে। প্রগতিশীল মানুষেরা বাহবা দিচ্ছে। আর মৌলবাদীরা এসব কালচারকে নষ্টামী টাইটেল দিয়ে টিকি-ধূতি, টুপি-দাঁড়ি দিয়ে সাধ্যমতো ঢাকতে চেষ্টা করছে। কিন্তু পারছে না। তাদের ঘরের ভিতরেই ক্রমাগত জন্ম হচ্ছে প্রগতিশীল বিভীষণ। আবহমানকালের দেশি কালচার ডাস্টবিনে, ড্র্রেনের নালা দিয়ে গড়িয়ে যাচ্ছে। টোকাইরা কুড়িয়ে কুড়িয়ে জমাচ্ছে বস্তায়। দেশি কালচার এখন টোকাইদের বস্তায়, ডাস্টবিনে, আধপেটা-একপেটা মানুষদের ভাঙ্গা ঘরে শোভা পাচ্ছে বড় অবহেলায়, বড় অনাদরে। তাতে আমার কি আসে যায়? আমি কোটিপতিদের সন্তান নই, প্রগতিশীল নই, মৌলবাদী নই। তবে আমার এত মাথা ব্যথা কেন? যা--, যতসব অপ্রাসংগিক ফালতু প্যাঁচাল।

আচ্ছা, আমার কি ঐ ছেলেটার প্রতি হিংসা হচ্ছে? হবে না কেন? আমি তো আর দশ জনের মতো একজন স্বার্থপর মানুষ। নজরুল চৌধুরীর সব কিছুই তো আমার প্রাপ্য ছিল। ছিঃ, ছিঃ আমি এত লোভী, এত খারাপ! হ্যাঁ, আমি খারাপ--খুব খারাপ হয়ে যাচ্ছি আমি। আমি ন্যান্সির সাথে দেখা করতে পারব না--যোগাযোগ করতে পারব না। নিষেধ আছে। নিষেধ ভাঙ্গলে জীবনের ভয় আছে। আমি কি করতে পারি এখন? আমি তো জেনে শুনেই বিষ পান করেছি। তবে মরতে এত ভয় কেন? যে মেয়ের হাজার জনের সামনে বিয়ে হচ্ছে সেটাইতো সত্য। আমি কোন অধিকারে ওকে দখল করব। ওতো আমাকে চিনে না। আমরা দু’জনে বিয়ের সবকিছু করেছি--তাতে কিছু আসে যায় না। আমার কাছে এ সম্পদের কোন দলিল নেই। অতএব কেঁদেও লাভ নেই। ও সুখে থাক--ভালো থাক...।

নিজেকে যত বোঝাই--ততই অবুঝ হই। স্যারের কাছে বিদায় নিয়েছি। তিনি জানেন, আমি চিটাগাং চলে গেছি। কিন্তু আমি যাই নি। বিবেকের কথা আমি মানিনি। আমি এখন এয়ারপোর্টের এক জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি ফ্রান্সিসের প্রিয় পোষাক পরিধান করে। যে পোষাক পড়ে সে মারা গিয়েছিল। সাদা শার্ট-সাদা প্যান্ট। আমি এমনভাবে দাঁড়িয়ে আছি যেন, ন্যান্সি আমাকে দেখতে পায়। গ্লাসের একপাশে আমি অন্যপাশে সে ও তার স্বামী। পাগড়ী আর চশমা খুলে তাকালাম। শুধু ন্যান্সি দেখল। অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। আমি হাসলাম। হঠাৎ সে দৌঁড়ে আসতে লাগল। বেশ দূরে দরজা। ঐ দরজা দিয়ে আমার এখানে আসতে তার দুই-তিন মিনিট লাগবে। আমি দ্রুত পাগড়ী আর চশমা পড়লাম। শার্টের উপর চাঁদর জড়ালাম। অন্যত্র চলে গেলাম। তারপর কি হয়েছে--আমি জানি না। এয়ারপোর্টের এক কোণায় গিয়ে দাঁড়ালাম। দেখলাম, ন্যান্সি আর তার স্বামী সিঁড়ি বেয়ে বিমানে উঠছে। স্বামী আগে ঢুকে গেল। ন্যান্সি চারিদিকে তাকাচ্ছে। আমি আগের পোশাকে দাঁড়িয়ে আছি। ফ্রান্সিস এর মৃত্যু মুহূর্তের গান আমার হৃদয় থেকে উৎসারিত হলো I--ডিয়ার, আই লাভ ইউ...। আমার চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে হলো, ন্যান্সি তুমি চলে এসো--। আমি টা-টা দিচ্ছি। সে আমাকে দেখেছে। সে যেতে চাইছে না ভিতরে। তার স্বামী তার হাত ধরে তাকে বৃত্তের ভিতরে নিয়ে গেল। তাদের বৃত্তের বাইরে যাওয়া তাদের জন্য নিষিদ্ধ। আমাদের বৃত্তের বাইরে যাওয়া আমাদের জন্যও নিষিদ্ধ। তবুও বিষাক্ত হৃদয় চিৎকার করে বলতে চাইল--ন্যান্সি, তুমি চলে এসো--।

গায়ের সমস্ত শক্তি দিয়ে ডাকতে চাইলাম আবার, ন্যান্সি--তুমি চলে এসো--। কিন্তু এ ডাক হৃদয়ে বারবার কম্পিত হলো। বৃত্তের বাইরে গেল না। অসংখ্য বৃত্ত ঘিরে ধরল আমার হৃদয়ের বিস্ফোরিত কণ্ঠস্বরকে। এসব দৃশ্য দেখার পর আমার মরে যাওয়া উচিত। আমি কেন এখনও বেঁচে আছি? কার জন্য বেঁচে আছি? আল্পনার জন্য, ন্যান্সির জন্য, সময়ের প্রয়োজনে, নাকি স্বপ্নের জন্য? স্বপ্ন কি মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে? হ্যাঁ, রাখে। আমি তো স্বপ্নকে নিয়েই বেঁচে আছি। কি স্বপ্ন আমার--বড় হবার? হলাম না হয় বড়। আমি কি আল্পনাকে পাব, ন্যান্সিকেই বা পাব? কাউকে পাব না। তাই বলে কি জীবন চলে না? হ্যাঁ চলে। উন্মাদ যেভাবে ট্রাক চালায়--সেভাবে চলে। কিন্তু আমি জানি, আমার চলবে না। প্রথম ভালোবাসার নীল দংশনের পর যে ওঝার নরম স্পর্শে বাঁচতে ইচ্ছে হচ্ছিল, সে নেই। আজ থেকে আর বাঁচার ইচ্ছাও থাকবে না।

ধারাবাহিক উপন্যাসঃ হৃদয়ের এপিঠ-ওপিঠ (৩৩/শেষ পর্ব)
--শাশ্বত স্বপন

হা-হা-হা-| আমার হাসি পাচ্ছে কেন? বাতাসে কি লাফিং গ্যাস আছে? কি জানি, দেখা তো যায় না। প্রমাণ করে বিশ্বাস করতে হয়। প্রমাণ ছাড়া বিশ্বাস করা কি যায় না? তা জানি না--তবে সব কিছু প্রমাণ করতে নেই। কিছু কিছু প্রমাণ ছাড়াই বিশ্বাস করে মেনে নিতে হয়। যেমন--ঈশ্বর এক ও অদ্বিতীয়। আচ্ছা, ঈশ্বর কি আমাকে আমার লোভের শাস্তি দিলেন? কি পাপ আমার? তিনি তো আমাকে বাঁচার মতো বেঁচে থাকার জন্যই পাঠিয়েছেন এবং আমি তো সে চেষ্টাই...। তবে পৃথিবীই কি স্বর্গ--পৃথিবীই কি নরক? আমার মতো এত ক্ষুদ্র জীবের পক্ষে ঈশ্বরের বিচার বুঝা সম্ভব নয়। আচ্ছা, আমি কি মানসিক রোগী হয়ে যাচ্ছি। ডাঃ রকিব আহসান--এর ‘মানসিক রোগীর বৈশিষ্ট্য ও চিকিৎসা’--বইটা আমি পড়েছি। হ্যাঁ, হ্যাঁ, বই-এর লেখা অনুযায়ী আমি তো মানসিক রোগী। আমি আগেও মানসিক রোগী ছিলাম। তবে তখন প্রচ্ছন্ন ছিল। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে, এখন প্রকট রূপ ধারণ করেছে এবং করাটাই স্বাভাবিক। ও গড, আই ডন্ট ইউর হেলপ্ টু লীভ। ইউ কিল মী এ্যট ওয়ানস্, প্লিজ। আই ডন্ট লাভ মাই লাইফ, দিস্ ওয়ার্ল্ড এন্ড এভরিথিং। দেয়ার ইজ নো লাভ ফর মী ইন দ্য ওয়ার্ল্ড। প্লিজ ইউ লাভ মী, ইউ লাভ মী। আই ডন্ট টু বি এ মেন্টাল পেসেন্ট...। আমি কার সাথে কথা বলছি? ঈশ্বরের সাথে? হ্যাঁ। ঈশ্বরের সাথে কেউ কথা বলতে পারে? না। হ্যাঁ, হ্যাঁ, আই এ্যাম এ মেন্টাল পেসেন্ট!!

চ্যালেঞ্জার কোচে চড়ে জড় পদার্থের মতো চিটাগাং চলে এলাম। রুমে এসে বাছাই করা ছ্যাকা খাওয়া গানের ক্যাসেটটি ধীরে ধীরে টেপে ঢুকালাম। গান বেজে চলল। ফ্রীজ খুললাম। মদের বোতল বের করলাম কয়েকটা। আমার মত পরাজিত সৈনিকের জন্য এগুলো ভালো ঔষধ। ভাবলাম, এগুলো সবই নজরুল চৌধুরীর। ইচ্ছে করলে আমাকে নেংটা করে পথে ছুঁড়ে ফেলে দিতে পারে। আমার কিছুই নেই। মাসের টাকা কোনদিন নেইনি, ছোট ভাইয়ের চিকিৎসায় বহু টাকা ব্যয় হয়েছে বলে। হঠাৎ কেন জানি, আমার হৃদয়ের এপিঠ-ওপিঠ দেখতে ইচ্ছে করল। আমি চোখ বুঁজে কল্পনার পর্দায় হৃদয়টাকে দেখলাম। বিশ্বাস হচ্ছে না আমার। এটা কি আমার হৃদয়! নাকি নীল বর্ণের কোন বস্তু! আমার জীবনে ভালোবাসার রং নীল হলো কেন? কালো হতে পারত, গাঢ় লাল হতে পারত, অন্য কোন রং হতে পারত। আমি আবার চোখ বুঁজলাম। ভালোভাবে আমার হৃদয়ের নীল শ্মশান ভূমিটাকে পর্যবেক্ষণ করলাম। একি হৃদয়ের এ-পিঠে আল্পনার নীল বর্ণের কঙ্কাল--ওপিঠে ন্যান্সির একই বর্ণের কঙ্কাল! আরো অস্পষ্ট লক্ষ লক্ষ কীট-পতঙ্গের মতো প্রাণীর নীল বর্ণের কঙ্কাল। একি! বাংলাদেশের মানচিত্র! ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইল! ঈশ্বর কি এদেশের কেয়ামত আমার হৃদয়ে...? ওহ! কি ভয়ঙ্কর, বিভৎস নীল বর্ণের কঙ্কাল দু’টি! একি! মানচিত্র নীল বর্ণের কঙ্কাল হয়ে যাচ্ছে কেন? না--আমি দেখতে চাই না। চোখ খুললাম।

না, এসবই কল্পনা--বাস্তব না। আমি ভুল দেখছি। হ্যাঁ, ভুল। আমি তো মানসিক রোগী। সত্যিই আমি মেন্টাল পেসেন্ট? হৃদয়কে কোনদিন দেখার ইচ্ছে আমার হয়নি ঘৃণা করি বলে। আজ কি ভালোবেসে দেখতে ইচ্ছে করল, নাকি অতি ঘৃণা থেকে? উত্তর খুঁজে পাচ্ছি না। মদের পর মদ শেষ হয়ে যাচ্ছে। সিগারেট একটা শেষ হতেই আরেকটা জ্বালাচ্ছি। আমি কি আবার অবুঝ শিশু হয়ে যাচ্ছি? কোন উত্তর নেই। এটা আমার হৃদয় নয়। আমি এ হৃদয়কে ত্যাজ্য করলাম। যার হৃদয় নেই--সে অমানুষ। আমি অমানুষ। অমানুষ কি? কোন জন্তু, পাখি...। কোন উত্তর নেই। হৃদয়হীন মানুষ হলো জীবন্ত লাশ। আমি জীবন্ত লাশ। আমি পুরুষ ও স্ত্রী জাতীর মতো তৃতীয় কোন প্রাণী। ‘‘যিতাথা জিসকে লিয়ে..., সেই দিন আমার কবে যে আসবে...”--গান বেজে চলেছে ক্রমান্বয়ে। দেহ ভালোবাসার নীল দংশনে জ্বলে পুড়ে মরছে।

আমি মানুষের মতো বাঁচতে চেয়েছিলাম। তোমরা আমাকে বাঁচতে দাওনি। আমি কাকে বলছি এসব কথা? নজরুল চৌধুরীকে, ডাক্তারকে, ন্যান্সিকে, এ সমাজকে, নাকি এদেশকে। উত্তর খুঁজে পাচ্ছি না। প্রশ্ন হয়, উত্তর হয় না কেন? মাথার উত্তর বিভাগ কি কাজ করছে না? আমি কি পাগল হয়ে যাচ্ছি? কাল থেকে আমি নগ্ন হয়ে পথে পথে ঘুরে বেড়াব? নাকি পঙ্গু ভিক্ষুক হব? তারপর মৃত্যু মুহূর্তে বলব, “ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের এ বাংলাদেশে আমার অধিকারে সাড়ে তিন হাত মাটিও নেই। এসবই তো মানুষের জন্য সিদ্ধ। তবে আমার জন্য কেন নিষিদ্ধ? আমি কি মানুষ নই? তবে আমি কি?” ও, আমি তো অমানুষ। অমানুষদের কি সাড়ে তিন হাত ভূমি থাকার প্রয়োজন নেই? অমানুষরা কি নরকের জীব? কোন উত্তর নেই।

মনে পড়ে ’৭১-এর কথা, মনে পড়ে ’৭৪। মনে পড়ে দাদীকে, মাকে, বাবাকে, চাচাকে, আল্পনাকে, আল্পনার বিয়ের দৃশ্যটাকে, জেলকে, টিকি-দাঁড়িদেরকে, বীথিকে, মুরাদকে, সিঁদুরকে, ন্যান্সিকে--সব, সব স্মৃতি মনে পড়ে। মনে পড়ে এয়ারপোর্ট। দেহের অণুতে, পরমাণুতে যেন আর্সেনিক বয়ে যাচ্ছে। এ বিষাক্ত দেহ এখন ক্লান্ত। সে একা থাকতে চায়। তার এ বিষাক্ত দেহ দিয়ে সে কাউকে বিষাক্ত করতে চায় না। এ দেহ এইডস রোগীর দেহের চেয়েও ভয়াবহ। এ দেহ এখন সাড়ে তিন হাত মাটি চায়--এ বিশাল পৃথিবীর কাছে সে সাড়ে তিন হাত মাটি চায়।

চোখ চায় আল্পনাকে, ন্যান্সিকে দেখতে। আমি মদের বোতল ভেঙ্গে ভাঙ্গা কাঁচ দিয়ে হাত কাটলাম আজ বহুদিন পর। লিখলাম আল্পনা। কেন আল্পনা লিখলাম? ন্যান্সি তো লিখতে পারতাম। তবে আমি কি শুধু আল্পনাকে ভালোবাসি? ন্যান্সি কি আল্পনার বিকল্প কোন প্রতিচ্ছবি? পাশে লিখলাম শোভন। হঠাৎ ভাঙ্গা বোতল, সিগারেট, ম্যাচ, গ্লাস পড়তে লাগল দু’নামের মাঝে। দেয়াল একটা, দুইটা, তিনটা... আরো...। চোখে সব ঝাপসা লাগছে। চোখ আল্পনাকে দেখতে পাচ্ছে না বহুদিন ধরে। সে এখন ক্লান্ত। সে চিরতরে নিদ্রা যেতে চায়। দেহ শান্তি পাচ্ছে না বিষাক্ত স্মৃতির জন্য। সে প্রচণ্ড কষ্ট পাচ্ছে, প্রচণ্ড কষ্ট। সে নির্জীব বস্তু হতে চায়। মাথায় বেদনার স্মৃতিতে ভরে গেছে। বেদনা ভারী, খুব ভারী। মাথা আর বইতে পারছে না। সে নির্জীব বস্তু হতে চায়। হাত-পাও বিদ্রোহ করছে। আমার জন্য কারো ভালোবাসা নেই। মদ আর সিগারেট ট্রেনের গতিতে চলছে। মাথা, চোখ, হাত-পা সবই বিদ্রোহ করছে। আমি জানালা দিয়ে আকাশের দিকে তাকাচ্ছি। এক হাতে সিগারেট, অন্য হাতে মদের গ্লাস। অনেক কষ্টে সিড়ি হাতড়িয়ে ছাদে উঠলাম। আকাশের দিকে তাকালাম। প্রশ্ন করলাম বিশাল আকাশকে লক্ষ্য করে, পৃথিবীতে আমাকে কেন পাঠানো হয়েছিল? আমাকে কেন এত কষ্ট দেওয়া হলো? আমার জন্য এটাই কি নরক? প্রশ্নগুলো বারবার করলাম। কোন উত্তর এলো না। সারা দেহ কেঁপে উঠল। চোখ, মুখ, যকৃৎ, হৃদপিণ্ড, পাকস্থলী, বৃক্ক--সব যেন ঘুরছে--সবাই যেন বিদ্রোহ করছে। ছয় লিটার বিষাক্ত রক্তের এ দেহ আকাশের দিকে তাকিয়ে নিষ্ঠুর পৃথিবীকে থুথু দিয়ে চিৎকার করে উঠল। এটম বোমা বিস্ফোরণের মতো যেন, শক্তিশালী এক কণ্ঠস্বর--আমি নির্জীব হতে চাই...!!!

পোস্টটি ৩ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

শাশ্বত স্বপন's picture

নিজের সম্পর্কে

বাংলা সাহিত্য আমার খুব ভাল লাগে। আমি এখানে লেখতে চাই।