ইভানের ছেলেবেলাঃ একটি বিশুদ্ধ কবিতা
মধ্য রাশিয়ার একটি সূর্যালোকিত দিন।
কোন একটা পাখির অদ্ভুত ডাক শোনা যাচ্ছে।
সোনালী চুলের একটা ছেলে দাঁড়িয়ে আছে পাইন গাছে ঝুলে থাকা প্রকাণ্ড মাকড়সা জালের সামনে! উজ্জ্বল সূর্যকিরণে ছেলেটি আশ্চর্য তীক্ষ্ণ কৌতূহলী চোখে তাকিয়ে মাকড়শার জালের দিকে। সহসাই ছেলেটি দৃষ্টিসীমা থেকে আড়াল হয় কয়েক মুহূর্তের জন্যে। আমাদের দৃষ্টি পাইন গাছের উপরের দিকে উঠতে উঠতে একখানে এসে থেমে যায়, আর ছেলেটি পুনরায় দৃশ্যমান হয় বেশ খানিকটা দূরে।
ছেলেটি দৌড়াতে থাকে। চারপাশের দৃশ্যাবলী সরে যেতে থাকে দ্রুততার সাথে। দূরে একটা প্রজাপতি দেখা যায়, ফুলে ফুলে উড়ে বেড়াচ্ছে। ছেলেটির চোখে আবার সেই অদ্ভুত মায়াময় কৌতূহল। ছেলেটির কৌতূহল ক্রমশ আনন্দে রূপ নেয়। কেমন এক নিষ্কলুষ নির্মল আনন্দে খলখল হাসি হেসে ওঠে ছেলেটি। আমাদের মনে হয় ওই প্রজাপতিকেই লক্ষ্য করে ছেলেটি গ্রাভিটির নিয়ম অস্বীকার করে উড়তে থাকে। ঠিক তারপরই আমাদের আবার মনে হয় সে নীচে মাটির কাছে নেমে যাচ্ছে।
ছেলেটি মাটি ফুড়ে বের হয়ে আসা কোন গাছের শিকড়ের শিরা উপশিরা দেখতে থাকে কৌতূহলী চোখে। ওর মুখে এসে পড়ে সূর্যরশ্মি। ছেলেটির মা পানির পাত্র নিয়ে ফিরছিলেন। ছেলেটি মায়ের কাছে ছুটে যায়। তারপর পানির পাত্রে মুখ ডুবিয়ে পানি পান করে। এক অদ্ভুত স্বপ্নময় দৃশ্য! ছেলেটি পানির পাত্র থেকে মুখ তুলে বলে-“ মা, আমি একটা কোকিলের ডাক শুনেছি”। মা মৃদু স্নেহময় হাসিতে পুত্রের দিকে তাকান। কিন্তু হঠাৎ প্রচণ্ড গুলির শব্দে এই স্বপ্নদৃশ্য ভাঙা আয়নার মত টুকরো টুকরো হয়ে যায়।
আর ইভান নামের ছেলেটি জেগে ওঠে যুদ্ধে বিধ্বস্ত পরিত্যক্ত একটা উয়িন্ড মিলের ভেতর। সেই স্বপ্নময় সূর্যালোকিত উপত্যকা কোথায় যেন উধাও হয়ে যায় আমাদের চোখের সামনে থেকে। তার পরিবর্তে আমরা দেখতে পাই ধ্বংসে জীর্ণ এক প্রান্তর। চারদিকে শুধু মৃত্যু আর ধ্বংসের ছায়া। তবু এর ভেতর দিয়েই ইভান এগুতে থাকে তার গন্তব্যের দিকে।
প্রথমবার যখন ‘ইভানস চাইল্ডহুড’ দেখেছিলাম এইটুকু দেখেই কেমন এক অদ্ভুত ভালোলাগায় মন ভরে গিয়েছিল। পুরো সিনেমাটাতেই স্পেস আর সময়ের দুর্দান্ত কারুকাজ দেখে আন্দ্রেই তারকোভস্কির প্রেমে পড়ে গিয়েছিলাম। মনে হয়েছিল এতো সিনেমা নয়, ‘কবিতা’! সিনেমার প্রতিটি ফ্রেমেই দুর্দান্ত সব দৃশ্যকাব্যের সৃষ্টি হয়েছে। তারপর তারকোভস্কির মিরর, আন্দ্রেই রুবলভ, নস্টালজিয়া, স্টকার দেখে মুগ্ধ হয়েছি। আর ভেবেছি আন্দ্রেই তারকোভস্কি তো শুধু একজন ফিল্মমেকার নন, একজন অসাধারণ কবিও বটে!
ইভানস চাইল্ডহুডের ইভান যুদ্ধের নিষ্ঠুরতায় দিশেহারা এক বালক। ইভান যুদ্ধে তার পরিবারের সবাইকে হারিয়েছে। সিনেমাটা দেখতে দেখতে মনে হয়েছে ইভানের অতীত বলতে কিছু নেই। যুদ্ধের ডামাডোলে সব যেন উধাও হয়েছে কোথাও! শুধু মাঝে মাঝে স্বপ্নের দৃশ্যগুলিতে ইভানের ঝলমলে শৈশব এসে উঁকি দিয়ে গেছে। ইভানের পুরো জগত থেকে এই বাস্তবতা আর স্বপ্ন আলাদা করা যায় না। সব যেন মিলে মিশে একাকার।
যখন ইভান কর্দমাক্ত জলাভূমি পেরিয়ে পৌছায় সেনা ঘাঁটিতে, একটা শিশুর অবয়বে আমরা যেন এক দানব দেখতে পাই। ইভানের সেই অদ্ভুত তীক্ষ্ণ দৃষ্টি আর আশ্চর্য একগুয়েমি সত্যি ভোলার নয়। একটা শিশুর অবয়বে এমন দানবীয় সত্ত্বা আরোপ অনেকেই মেনে নিতে পারেনি। আলোচনা সমালোচনা হয়েছিল অনেক। এইসব সমালোচনার জবাব দিয়েছিলেন জ্য পল সার্ত্রেঁ-
“We continue to see Ivan from the outside, just as in the ‘realistic’ scenes; the truth is that the whole world is a hallucination for this child, and that this very child, monster and martyr, is in this universe a hallucination for the others. This is why the first sequence cleverly introduces us to the true and false world of a child of the war, in describing everything from the child’s actual flight through the woods to the false death of his mother . . . Madness? Reality? Both: in war, all soldiers are mad; this monstrous child is an objective witness to their madness because he is the maddest one of all”।
তারকোভস্কি কি যে দারুণ দক্ষতায় সিনেমার প্রতিটি ফ্রেমে কবিতা এঁকেছেন! প্রতিটি স্বপ্নদৃশ্য আমার আলাদা আলাদা ভাবে মনে আছে।
পাতকুয়ার ভেতর ইভান আর তার মা দিনের বেলাতেই দেখতে পেল তারা। ইভান জিজ্ঞেস করল- “এখন তো দিনের বেলা, তবে তারা দেখা যাচ্ছে কেন?” মা বললেন-“ ওই তারাটার জন্যে তো এখন রাতের বেলা!”
সেই অসংখ্য কমলা লেবু ভর্তি ট্রাক, ইভানের ছোট্ট বোন আর সমুদ্র তীরে ট্রাক থেকে পড়ে যাওয়া অসংখ্য ছড়ানো ছিটানো কমলার মাঝে দাঁড়ানো ঘোড়া, সত্যি ভোলার নয়। এই স্পেশাল এফেক্টেসের যুগেও তারকোভস্কির মত এমন সেলুলয়েডে কবিতা লিখতে পারে কয়জন।
আরো একটা দৃশ্য আমার মনে গেঁথে আছে সেই দৃশ্যের অপুর্ব সৌন্দর্য আর যুদ্ধাবস্থার অসহ্য নীরবতা মুর্ত করে তোলার জন্যে। মাশা আর ক্যাপ্টেন খোলিনের বনভূমির মধ্যে একটা সম্ভাব্য সেক্সুয়াল অ্যাডভেঞ্চারের সেই দৃশ্য। যুদ্ধের ঠিক পূর্ববর্তী সময়ের নীরব অথচ ভীতিকর মুহূর্তকে অসাধারণ ব্যাঞ্জনায় ফুটিয়ে তুলেছেন তারকোভস্কি।
সিনেমা রিভিউ লিখতে বসে আমি সিনেমার কোন কাহিনীই তো বললাম না! ও আর আমি বললাম না। আপনারাই না হয় দেখে নেবেন! আমি শুধু একটা বিশুদ্ধ কবিতার কয়েকটা লাইন আওড়ে গেলাম মাত্র। শুধু বলি “ইভানস চাইল্ডহুড” ইভান নামের এক বালকের গল্প, যে পৃথিবী জুড়ে মানুষের জোর করে বসিয়ে দেয়া সীমানার বলি। ইভান শৈশবহীন এক শিশুর গল্প, মানবিকতাহীন মানুষের গল্প, নিষ্কলুষ মনে ঘৃণার বীজ বুনে দিলে কি হয় তার গল্প, একটা ফুল ফোটার আগেই তার হারিয়ে যাবার গল্প।





মন্তব্য করুন