ইউজার লগইন

জাহাজীর মন খারাপ

বেশ খারাপ লাগছে। বেশ কিছুদিন ধরে এই রকম খারাপ প্রায়ই লাগছে।

ইতালির জ়েনোয়া বন্দরে আমাদের জাহাজটায় গত ১৮ ঘন্টা ধরে কাজ়

করছে। ছেড়ে যাওয়ার আর ৬ ঘন্টা আছে।

কেন খারাপ লাগছে। কারণ ইতালিতে কাল কিসের যেন একটা উতসব

আছে। জাহাজের সাইড রেলিং থেকে দূরের শহর দেখে বোঝা যাচ্ছে।

এমনকি বন্দর কর্তৃপক্ষও বলছে যে দ্রুত যেন কাজ শেষ করি, না হলে

কোন কারন ছাড়া আমাদেরকে ২ দিন বসে থাকতে হবে। তাতে বন্দর

ও জাহাজ ভাড়াটের অনেক ক্ষতি হবে। সবাই তাদের আনন্দের প্রস্তুতি

নিচ্ছে আর আমরা সেই আনন্দ থেকে দূরে চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি।

গতবছর আমার নিজের দেশের বন্দর থেকেও ঈদের আগে একি ভাবে

বিদায় নিতে হয়েছে। আমরা কি মচ্ছব, যে সব আনন্দ থেকে বিদায়

নিতে হচ্ছে।

খুব বেশি পড়াশোনা করতে পারিনি, তাই প্রাইভেটে মেরিনারস ট্রেইনিং

করে, জাহাজের একজন ক্রু হতে পেরেছি। আমার বন্ধু বান্ধবরা জানে

আমি খুব ভাল একটা চাকরি করছি। কারণ আমি আমার মাকে একটা

ফ্ল্যাট কিনে দিতে পেরেছি, যদিও কিস্তিতে। ১০ বছর ধরে, পরিশোধ

করতে পারব। কিনে দিতে পারবনা কেন? কেন আমার কাছে টাকা

থাকবে না? বেতন যাই হক খরচ করার মত জ়ায়গা কোথায়? বেশির

ভাগ টাকাই আমার ব্যাঙ্ক একাউন্টে থেকে যায়। বেতনটাও খুব একটা

মন্দ নয়। আমার দেশের ব্যাঙ্কে চাকরি করা একজন অফিসার এর

২গুন। বাংলাদেশে চাকরি করা আমাদের শিপিং লাইন এর ম্যানেজার এর

থেকেও বেশি। জাহাজের খাবার দাবার বেশ ভাল। যা আমি দেশে থাকলে

কালে ভদ্রে খেতে পারতাম। শুধু একটাই সমস্যা, সবই ফ্রিজ এর।

একটুও সাদ গন্ধ নাই। মনে হয় সব খাবারেই প্রিজারভাটিভ দেওয়া। খুব

ভাল মানের ভদকা, রাম আর স্কচ থাকে সবসময়। যেগুলো আমাদের

দেশের কিছু মানুষ পেলে নিজেকে ধন্য মনে করবে। শুধু এখন ভাল

লাগে, মদ্যাসক্ত অবস্থায়, দ্রুত চলতে থাকা জাহাজের নতুন আলো

ওয়ালা শহরের দিকে দুলতে দুলতে ছুটে চলা, এবং সেই শহরের দেখা

পাবার আশায় অপেক্ষা করা। আর ভাল লাগে ১২-১৮ ঘন্টা ধরে

নিজের দায়িত্ত পালন করা। তাহলে আর কোন কিছু মাথায় আসে না।

ক্রুদের কতগুলো অভ্যাস আছে, একে অপরের সাথে সস্তা যৌন আলাপ

করা আর তার সাথে আছে পর্ণ ম্যাগাজিন গুলো দেখা। এটাই ওদের এক

প্রকার বিনোদন। কিন্তু কতক্ষন এইগুলা ভাল লাগে। কিছুদিন পর খুবই

বিরক্তি আর ঘেন্না ধরে যায়। কিন্তু কি আর করা যাবে, ধুসর সমুদ্রের

মাঝে, সারাক্ষন দুলুনির মধ্যে, ওইটাই একমাত্র প্রমান করে যে,

আমরা লোহা হয়ে নই।

ঢং ঢং ঘন্টা বাজল। আমার শিফট শুরু হয়েছে। একটু দুরের শহরের

দিকে তাকিয়ে ভাবলাম, তাও ভাল। মাকে একটা ভালো ফ্ল্যাট এ রেখে

তার একটা বউমার সপ্ন দেখিয়ে আশায় রাখতে পেরেছি। দেশে থাকলে

তো মাকে ভাত টাও যোগাড় করে দিতে হিমশিম খেতাম।

(লেখক কোন জাহাজী নন। শুধুমাত্র তাদের কে দূরে থেকে দেখে তাদের মন খারাপ করা একাকিত্তকে একটু অনুভব করার বৃথা চেষ্টা করা মাত্র)

পোস্টটি ১২ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

বিষণ্ণ বাউন্ডুলে's picture


অসাধারন..

গৌতম's picture


পড়তে বেশ লাগলো। ...কিন্তু জাহাজীর কষ্ট উপলব্ধি করে পড়তে পারলাম না।

তানবীরা's picture


জাহাজী, বৈমানিক লাইফগুলোর প্রতি আমার অদম্য আকর্ষন কাজ করে ছোটবেলা থেকেই।
এই লেখাটা আরো বিস্তৃত হতে পারতো। Puzzled

প্রিয়'s picture


লেখাটা আরো একটু এলাবোরেট করলে পড়তে আর ভাল লাগতো।

অতিথি's picture


তাজবির ভাই, আপনার লেখার লিঙ্ক দেখে আমি ভেবেছিলাম ব্লগার জাহাজি পোলার ব্লগ। পরে খেয়াল করলাম জাহাজি বর্তমানে আমার সাথে লিঙ্কড নেই, আর আপনার ব্লগ লিঙ্ক দেখলাম। যাই হোক, অনেক সুন্দর হয়েছে। অনেকটা জাহাজি পোলার মতই বর্ণনা। তবে জাহাজি জেনুইন জাহাজি। আগে এইচআরসি'র শিপে ক্যাডেট ছিল এখন ক্যাডেটশিপ শেষ, প্রমোশন হয়ে গেছে।

লেখালেখি করছেন দেখে ভালো লাগল আর আমি এই ব্লগে রেজি. করেছিলাম, কোন কনফার্মেশন দেয়নাই।

ভালো থাকবেন।

লীনা দিলরুবা's picture


একাকীত্ব আর একঘেয়ে জীবনটাই জাহাজের কষ্ট।
পোষ্ট ভালো পেলাম।

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.