টুটুল ভাই, লিনা আপু ও আহমদ মোস্তফা কামাল ভাই এর জেমকন সাহিত্য পুরস্কার ’১৩ লাভ। (শেষ পর্ব)
কথায় কথা বাড়ে। আহমদ মোস্তফা কামাল ভাইয়ের পুরস্কার লাভ, আমার বউডার বদলীর অর্ডার দুটি খবর ঘণ্টা দুইয়েকের ব্যবধানে আসে। প্রথম খবরটি দিল টুটুল ভাইয়া, সাথে লীনা আপুর দীর্ঘ রিভিউ আমাকে এই লেখার রসদ ও বাল্যস্মৃতি রোমন্থনের উপহার হিসেবে এনে দেয়। যার সাথে যুক্ত হয় প্রাসঙ্গিক বা অপ্রাসংগিক অনেক কিছু। আমার বধূটি এতদিন আমার কাছ থেকে দুরে থাকায় প্রিয় বন্ধুদের প্রিয় পিঞ্চিং আমাকে কি পরিমাণ আদর আপ্যায়ন করছে তার কিছুটা ধারনা হয়ত দিতে পেরেছি। এটাই ছিল আমার প্রথম পর্বে প্রতিশ্রুত গল্প বলার বিষয়। কিন্তু প্রথম পর্বে অনেক মন্তব্য পেয়েছি যার উত্তর আমি দিয়েছি কিন্তু শাশ্বত স্বপন ভাইয়ের একটি প্রশ্ন ছিল, ভাবিকে আপনি অনেক ভালবাসেন? তার উত্তরটা এখানে দেবার চেষ্টা করছি। প্রশ্নটা অতি ছোট হলেও আমার কাছে তার গুরুত্ব অনেক। মন্তব্যের ঘরে দিলে হয়ত তা আমার ব্যক্তিগত ব্লগে থাকবে না।
হ্যাঁ ভাই, প্রথমত বউ হিসেবে তো ভালবাসিই, সবাই তার বউকে ভালবাসে। কিন্তু ওকে আরও অনেক অনেক বেশী ভালবাসি এজন্য যে আল্লাহ্ সোবহানাতায়ালা ওর মাধ্যমে আমাকে পৃথিবীর সবচেয়ে স্রেষ্ঠ দুটি সম্পদ দান করেছেন। আমার দুটি সন্তান,মৌ ও জুনাঈদ যাদের আপনারা ইতিমধ্যে চিনে ফেলেছেন। তয় আমার বউডারে, আমি কখনও টুনটুনি পাখি,কখনও আবার কাঠ ঠুকরা বলি। এইটা আমি লিখেওছিলাম। কিন্তু কেউ প্রশ্ন করেননি, কারনটা কি? আমিই বলছি, যখন সব কিছু ঠিকঠাক থাকে তখন সে টুনটুনি পাখি, সপ্ত স্বরে সুর তোলা কোন গানের স্থায়ী বা অন্তরা, নয়ত শান্ত শিষ্ট বহমান নদী বা শরৎ সমীরণে প্রাণমন ভরে তোলে এমনই কুহকিনি।
তখন
দিবসও রজনী আমি যেন কার আশায় আশায় থাকি,
তাই চমকিত মন চকিত স্বপন তৃষিত আকুল আঁখি,
এমন গান গেলেও আপত্তি নেই।
কিন্তু কোন বিষয়ে কিছু বলেছি তো হয়েছে কাম, ভীষণ রণ রঙ্গিনী রূপ। এ আবার ভিন্ন টাইপের রণসজ্জা বা রণ কৌশল, টোটালি কথা বলা বন্ধ ।
তখন যদি
কাঁদালে তুমি মোরে ভাল বাসারই ঘায়ে,
নিবিড়ও বেদনাতে পুলকও লাগে গায়ে।।
গা ঘেষেও গেয়ে যান, কোন সাড়া শব্দ নাই। যেন চিনতেই পারে না। আপনাদের যারা গ্রামে কখনও থেকেছেন তাদের অবশ্যই জানা আছে। বিশেষ করে গ্রীষ্মের দুপুরে আপনি খেয়ে দেয়ে একটু শুয়েছেন, কাঠ ঠুকরা পাখি তার লম্বা ও ভীষন শক্ত ঠোট দিয়ে মরা গাছের ডালে এমন জোরে জোরে ঠোকর মারে, আর তার শব্দ হাইড্রলিক হর্ণকেও হারমানিয়ে আপনার কান ভেদ করে অন্তর ছেদন করে ছাড়ে। আপনার ঘুম তো সুদুর পরাহত, অস্বস্থি ও বিরক্তিতে মন প্রাণ ভরে যাবে। আমার বউটি এক দুদিন না চেনার ভান করে থাকলে আমারও এমন দশাই হয়। আমাদের কথা বার্তা বন্ধ হলে মৌ জুনাঈদ কেমনে জানি বুঝে যায়। দেখি ওদেরও মন খারাপ। তাই কি আর করি নিজেই রণে ভংগ দিয়ে নিঃশর্ত আত্নসমর্পণ করি। আপনাদের কানে কানে বলি এমন পরাজয়ে লস নাই বরং লাভই হয়। বিশ্বাস না হলে একাবার ট্রাই মারতে পারেন।
আমার স্ত্রীর ট্রান্সফার হওয়াতে আমি সত্যি অনেক খুশি, আমার চেয়েও আমার ছেলেমেয়ে বেশী খুশি। আর এ খুশিতে লেখাটাও এদিক সেদিক অনেক ঘুরে আসল। যেহেতু ঘোরা ঘুড়ি অনেক হল তাই তানবীরা আপুর সৌজন্যে আর একটা বাস্তব গল্প হতে পারে। তার আগে একটু দিব্য জ্ঞানে ভান করে দেখি তো, কেউ বিরক্ত হয় কিনা? ফলাফল তো ৫১,৪৯। কি করি, আচ্ছা বলেই ফেলি।
কাসেম, ছালাম, কালাম তিন ভাই। পেশায় মাছ ব্যবসায়ী। গ্রামের বিভিন্ন জনের পুকুর লিজ নিয়ে মাছ চাষ করে। আবার চাষ হয়েছে এমন পুকুরও ঠিকাতে কিনে নেয়। কাসেম বিয়ে সাদী করলেও অন্য দুই ভাই অবিবাহিত। সংসারে মা ও বৃদ্ধ বাবা বর্তমান। বাবা বৃদ্ধ হলেও ছেলেরা যেখানেই মাছ ধরতে যায়। বুড়া মিয়া লাঠি ভর দিয়ে তাদের সাথে যায়। ছেলেরা মাছ ধরে আর বুড়া পাকড়াও করা মাছ খালুই বা মাছ রাখার বালতিতে রাইখা পাহাড়া দেয়। মাছ ধরার বিভিন্ন কৌশল আছে তবে ঘটনাকে সংক্ষিপ্ত করার জন্য আমার গল্পের সাথে সংশ্লিষ্ট পদ্ধতিটির কথাই বলি। মাছ চাষের বড় বড় মজা পুকুর গুলো বেশীর ভাগই কচুরী পানায় ভর্তি থাকে। পৌষ মাঘ মাসে যখন উত্তর বঙ্গে তীব্র শীত পড়ে তখন পুকুরের মাছগুলো কচুরী পানার লম্বা লম্বা শিকড়ের ভিতর আশ্রয় নেয়। এই কচুরী পানা গুলোকে ছোট ছোট ভাগে ভাগ করে ঘাটের মত বানানো ডাঙ্গায় টেনে তুললে সাথে সাথে মাছ গুলোও ডাঙ্গায় উঠে আসে। তারপর এক এক আঁটি কচুরী পানা আলাদা করে ঝাড়া দিলে ভিতর থেকে লুকানো মাছগুলো বের হয়ে আসে। বের হয়ে আসা মাছগুলো যখন লাফালাফি ফালাফালি গুল্লি গুল্লি করে ছুটা ছূটি করে তখন যারা মাছ মারছে তারা তো বটেই যারা দর্শনার্থী তাদেরও আনন্দের কোন কমতি হয়, তা আমার কখনও মনেই হয় নি। মাছ ধরা যে কতটুকু আনন্দ ও মজার তা একমাত্র যারা কখনও এ কাজটি করেছেন তারাই অনুভুতিতে তার স্বাদ আস্বাদন করতে পারবেন। আর বরষী দিয়ে মাছ ধরা, আহারে-
মাঘ মাসের সকাল, তীব্র শীতে সবাই কাহিল। গরীব মানুষগুলো শীত বস্ত্রের অভাবে ভোর বেলায় ঘুম থেকে উঠে খড় কোটা জ্বালিয়ে আগুনের তাপে শীতের তীব্রতা থেকে নিজেদের বাঁচানোর চেষ্টা করছে। এক বাড়িতে আগুন জ্বালালে আশ পাশের কয়েক বাড়ির লোক এসে তাতে ভাগ বসাচ্ছে। ঘন কুয়াসায় দুই হাত দুরে কাউকে দেখা যাচ্ছে না। কিন্ত এই শীতও চারজন মানুষকে কাবু করতে পারে না। এটা কি নেশা না পেশা। না নেশা নয় এটা পেশা। পেট নামক যে অসন্তুষ্ট থলেটি আছে সে যে কোন কিছুকেই পরোয়া করে না। যখন যা দরকার তার তা চাই-ই-চাই। এই পেটের দায়ে চার বাপ বেটা বামন পুকুরে সেই প্রত্যুষ কাল থেকে কচুরী পানা টেনে উঠাচ্ছে। মাছও উঠছে বেশ। এই শীতেও কিছু উৎসাহী ছেলে- বুড়ো মাছ শিকার দেখতে অকুস্থলে ভিড় করছে। কচুরী পানা যত জোরেই ঝাড়াঝাড়ি করা হউক না কেন সম্পুর্ণ মাছ বের করা সম্ভব হয় না। কিছু মাছ আছে রোদ উঠলে পরে রোদের তাপে বাইরে বেরিয়ে আসে। তাই ছোট ছেলেরা অর্ধ ব্যবহৃত কচুরি পানার আশপাশ ঘোর ঘোর করে সুযোগ মত কোন মাছ বেরিয়ে এলে তা আপনা হস্তগত করার মানষে। আর বুড়া মিয়া পাকড়াও করা মাছ গুলোকে সামলানোর পাশাপাশি হুর হুর করে ছেলেগুলোকে তাড়িয়ে দেয়। চলছিল ভালই, হঠাৎ এমনি করে ছেলেদের তাড়াতে গিয়ে একখানা ভাংগা শামুক পায়ে খেচ করে গেল বিঁধে। বুড়া মিয়া ও মা গো, মইরা গেলাম চিৎকার দিয়া পা ধইরা বইসা পড়ল। সকলে ছুটে বুড়া মিয়ার কাছে গেল, ছেলেরাও চিৎকার শুনে লাফিয়ে উঠল। সবাই দেখলাম, পায়ের গোড়ালী দিয়া দরদর করে রক্ত পড়ছে। কিতাব আলী ভাই ছিলেন, উনি ক্ষত স্থানটি চেপে ধরে বড় ছেলে কাশেমকে বললেন, কিছু কচি দূর্বা ঘাস তুলে এনে চিবিয়ে দিতে। ঘাস চিবানো হলে কিতাব ভাই ক্ষত স্থানে লাগিয়ে একখানা নেকড়া কাপড় দিয়ে বেঁধে দিলেন। আঘাত এমন ঘোরতর কিছু নয়। ছেলেদের কড়া হুকুমে বুড়া মিয়া শান্ত ভাবে সুবোধ বালকের মত বসে রইল।
ঘটনা ঘটেছে সকাল বেলা কিন্তু এখন দুপুর এর মধ্যে যেই এসেছে সেই জিজ্ঞেস করেছে দাদাজান, চাচা মিয়া আফনের নাকি শামুক দিয়া পাও কাইট্যা গেছে। শামুক কেচা কাটায় অনেক ব্যথা হয়। হারেছ ডাক্তারের কাছথন কয়ডা বড়ি নিয়া খাইয়েন। বুড়া বয়সে এই কষ্ট আহারে। ছেলে বুড়া যুবক কিশোর এমনকি উনার বয়সের ও যেই আসে সবাইর একই কথা। দুপুর না হইতেই পুড়া গ্রামে খবর ছড়ায় পড়ল, কাসেমের বাপের সামুকে পা কাটা গেছে। খবরটা সুক্কুর আলীর কানেও পৌছাল। এই বদমাশের আবার ১০-১২ জনের একটা গ্রুপ ছিল। সব কয়ডা একসাথে হইলে সুক্কুর কইল ল যাই শামুক কেচারে দেইখ্যা আসি। শামুক কেচা মানে! আরে বুঝলি না,শামুক টা কি এমনি এমনি বুইড়ার পা কাটছে। শামুকেরে বুইড়া পা দিয়া কেচা দিছে। শামুক বেচারা নিরীহ প্রানী, সহ্য করবার পারে নাই তাই ভাঙ্গনের আগে কামড় দিয়া পা খানা কাইটা দিল। কথা বারাইস না ল যাই হামুক কেচারে দেইখ্যা আসি। ওরা আবার শামুক উচ্চারন করতে পারে না, বলে হামুক।
দল বল নিয়া আসছে বুড়া মিয়ারে দেখতে, দেইখ্যা ভালই ভালই চইলা যা, না যাওয়ার আগে দলের ভিতর থেইক্যা কে জানি আওয়াজ মারলো শামুক কেচা। আশ পাশের যত পোলাপাইন ছিল কথাটা ওগোর কানেও গেল। পোলাপাইনে পাইল মওকা। দুরে গিয়া, গাছ বা ঝাড়ের আড়াল থেইক্যা আচমকা বলে উঠে শামুক কেচা। বুড়া মিয়া অনেক ক্ষন চুপ মাইরা সব শুনছিল। আগে তো আড়ালে আবডালে বলত, এর মধ্যে এক ছেলে কিছু দূর থেকে যেই বলেছে হামুক কেচা, বুইড়ার ছোট পোলা ওই ছেলেরে ধইরা দিছে মাইর। মাইর খাইয়া পোলায় ভ্যাঁ ভ্যাঁ কইরা কান্তে কান্তে বাড়ি যাচ্ছিল। রাস্তায় ওর চাচার সাথে দেখা। চাচা কান্নার কারন জিজ্ঞেস করাতে কইল হামুক কেচার পুলা মারছে। হামুক কেচাডা আবার কেডা? ঘটনার বিবরণ শুনে চাচা তো মহা ক্ষেপা। শালার জাইলা বাড়ির পোলা শেখ বাড়ির পোলারে মারে, এত সাহস। আজ খবর আছে। এ নিয়া পুকুর পারে তো এক মহা কেচাল। কিন্তু কিতাব ভাই থাকাতে খুব বেশী দূর কেচাল আর আগায় নি। তবে জেলে বাড়ির নামটা ধীরে ধীরে হাড়িয়ে গিয়ে হামুক কেচার বাড়িটাই স্থায়ী হয়ে গেল। আজও হামুক কেচার বাড়ি থাকলেও ঐ বুড়া মিয়া আর এ বাড়ির বাসিন্দা নাই। তিনি এখন আপন নিবাসে।
যদিও আমার লেখা আহামরি কিছু না তবুও ভেবেছিলাম লেখাটা আমি টুটুল ভাই, লিনা আপু ও আহমদ মোস্তফা কামাল ভাইকে উৎসর্গ করব। আরাফাত শান্তর কোন লেখায় আমি হতাশা না পেলেও আজ শবে বরাত কাহিনীতে ওর লেখায় হতাশা পেলাম। তাই আমি আমার এ লেখাটা শান্তকে এ বলে ঊৎসর্গ করছি, না কখনও হতাশা নয়। আর চাইতে তো হবে তার কাছেই যাকে তুমি বিশ্বাস কর। তুমি বললাম কারন ব্লগে আমরা যারা লিখি তারা সবাই আপন আপন ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। আমার বিশ্বাস ও দোয়া তুমিও শীগগিরই তোমার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাবে।
২৫/০৬/২১০৩ খ্রিঃ





ভাল্লাগছে
আমার জন্য ভীষন বড় পাওনা
ভাল লাগছে, শুভকামনা।
আপনার ভাল লাগাতে আমার ও অনেক ভাল লাগছে। আপনাকেও শুভ কামনা।
দারুন
আপনার লেখা গুলো আরও দারুন। ভাল থাকবেন।
মন্তব্য করুন