অচিন দেশে যাত্রা( প্রথম পর্ব)
মিনহা খালাকনাকুম, ওয়া ফি হা নুয়ীদুকুম ওয়া মিনহা নুখরিজুকুম তারাতান উখড়া। এই মাটি হতেই তোমাকে সৃষ্টি করা হয়েছে,এই মাটিতেই তোমাকে রাখা হল এবং এই মাটি হতেই তোমাকে আবার পূনরুত্থিত করা হবে।
ঘন বসতিপূর্ণ লোকালয়ে রাস্তার পাশের পারিবারিক কবরস্থানে কারও দাফন কার্য চলছে। দাফন কার্যে অংশগ্রহনকারী সম্মিলিত মুসল্লীগনের মুখনিঃসৃত উপরোক্ত দোয়া রাস্তা থেকেই শোনা যাচ্ছে। বাড়ি থেকে কবর স্থান পর্যন্ত লোকজন মাটি দেয়া সমাপ্ত হলে যে দোয়া পড়া হয় তাঁর জন্য বিষন্ন মনে অপেক্ষা করছে। বাড়ির ভিতর ও বাহির বিভিন্ন স্থান থেকে চাপা ও উচ্চ স্বরে কান্নার আওয়াজ ভেসে আসছে। এই গ্রাম পার হলেই আমার গ্রাম তাই এই গ্রামের আমার সময়কার সকলকেই চিনি। আমার সময়কার বললাম কারন আজ ২৫ বছর গ্রাম ছেড়ে ঢাকা শহরে আছি, দুই ঈদ ও বিশেষ কারণ ছাড়া গ্রামের বাড়ি আসা হয় না। তাই নিজের বংশের অনেকের ছেলেময়েকেই চিনি না ,অর্ধ প্রবাসি হবার পর যাদের জন্ম হয়েছে তাদের চেনার কোন সুযোগ নাই। সে যাই হউক এ রকম পরিস্থিতিতে দোয়ায় সামিল না হওয়া কোন অবস্থাতেই যুক্তিপূর্ণ নয়। তাছাড়া এই গ্রামে আমার যেমন অনেক আত্নীয় আছে তেমনি এই বাড়ি ও আশ পাশের অনেক বাড়িতেই আমার সাথে বা একই সময়ে পড়ত এমন অনেকেই আছে। তাই কে মারা গেল তা জানার প্রয়োজন আছে বৈ কি!
ড্রাইভার নির্দেশমত গাড়ী থামালে নেমে পড়লালাম। উৎসুক কয়েকজন এগিয়ে এল, দুই তিন জন আমার বা বেশী বয়সী পরিচিত লোককে পেলাম। উনাদের কাছে মৃতের নাম জানার সাথে সাথে নিজের মাঝে চরম প্রতিক্রিয়া হল, বলেন কি, কি হয়েছিল। যে মারা গেছে এবং যা কাহিনী শুনলাম তা যে সিনেমা বা নাটকে হয়ে থাকে। আর মৃতের পরিচয় জানার পর তাঁর স্ত্রী ও ছেলেমেয়েকে না দেখে গেলে হয়ত এক সময় নিজেকে নিজের কাছেই অপরাধী মনে হবে। এরই মধ্যে জানাজা শেষের দোয়াও পড়া হয়ে গেল। মৃতের বড় ভাইয়ের দিকে এগিয়ে গেলাম। আমাকে জড়িয়ে ধরে তাঁর স্থিতি হয়ে আসা কান্না আবার যেন উথলে উঠল। আমি যে তাদের বাড়ীতে কত এসেছি, কত খেয়েছি, তাঁর হিসেব নেই। কতদিন দূরে কোথাও টিপ খেলতে গিয়ে রাতে বাসায় না গিয়ে ওদের বাসায় ঘুমিয়েছি বা কখনও আমার বাসায় ও ঘুমিয়েছে তাঁর হিসেব আজ করে শেষ করতে পারব কি, কিন্তু সে যে আমার কিশোর বয়সের অকৃত্রিম বন্ধু।আর এতদিন তাঁর খোঁজ খবর না রাখার জন্য নিজেকে নিজেই অপরাধীর কাঠগড়ায় দাড় করলাম। ওর বিধবা স্ত্রী ও ছেলে মেয়েকে সান্তনা দিয়ে যখন গাড়ীতে বসলাম, গাড়ী ধীর গতি থেকে ধীরে ধীর গতি বাড়ছিল আর আমার স্মৃতির মানসপট আবছা থেকে পরিষ্কার হতে হচ্ছিল।
পঞ্চম শ্রেনী পাশ করে ষষ্ট শ্রেণীতে উর্ত্তীণ হয়েছে। আমি যে স্কুলে পড়েছি সে স্কুলে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্তই পড়া যায় তাই স্কুল বদল করতে হবে। পাশের গ্রামে হাই স্কুল আছে। ওখানে ভর্তি না হলে শহরে যেতে হবে। অনেক চিন্তা ভাবনা করে বাড়ি থেকে সিদ্ধান্ত হল শহর যাবার দরকার নাই, পাশের গ্রামে যে স্কুল সেই স্কুলেই ভর্তি হতে। অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত এই স্কুলে পড়ে পরে শহরে গেলেই হবে। একদিন বড় ভাই সাথে করে নিয়ে গেল স্কুলে ভর্তি করতে। যথারিতি ভর্তি হয়ে গেলাম।
আমি যে স্কুল থেকে এসেছি আমি ছিলাম সে স্কুলে আমার ক্লাসে প্রথম। তাই নতুন স্কুলে কে প্রথম তা জানার আগ্রহ আমাকে তারা করল। দেখলাম আমার চেয়ে লম্বা, নাদুস নুদুস চেহেরার,চটপটে দুরন্ত স্বভাবের একটি ছেলে। অনেক পুরনো নামকরা স্কুলে প্রায় শ খানেক ছাত্রের মাঝে প্রথম হওয়া ছেলেটিকে দেখে আমার নিজের মাঝে ওর মত হওয়ার একটি সুপ্ত বাসনা কাজ করল। এর মাঝেই স্কুলটিও দেখা হয়ে গেল। বিশাল খেলার মাঠের চারদিকে নারকেল সুপারির গাছ, দুই ঈদের ঈদের নামাজ পড়া হয় তাই মাঠে তাই নামাজের জন্য পশ্চিম পাশে পাকা মিম্বর করা হয়েছে। উত্তর দিকে স্কুলের মূল ভবন হলেও পূর্ব ও পশ্চিমে ইউ আকৃতির করে শিক্ষকদের অফিস, কমনরুম পাঠাগার ও ছাত্র ছাত্রীদের পয়নিঃস্কাশনের ব্যবস্থা করা আছে। বারান্দার সামনে ঢালাই করা কংক্রিটের স্তম্ভটির উপর সোজা একটি পাইপে জাতীয় পতাকা উড়ানো হয়। প্রথম দিন আমার আগের স্কুলের চেয়ে দ্বিগুনের ও বেশী লাইনে দাঁড়ানো ছাত্রের উপস্থিতে জাতীয় পতাকা উড়ানোর সময় দেখলাম প্রধান শিক্ষকের সাথে সকল শিক্ষক উপস্থিত হয়েছেন। ছাত্র শিক্ষক মিলে প্রায় সাড়ে নয় শ মানুষের প্রাণ খুলে, গলা ছেড়ে, জাতীয় সঙ্গীত গাওয়ার সময় আজকের মত তাঁর মর্যদা না বুঝলেও কেন জানি আমার ভীষণ ভাল লাগল। আমার মনে হচ্ছিল আমাদের সাথে সাথে সবুজের আচ্ছাদনকারী বৃক্ষরাজি, ও স্কুল বিল্ডিং সকলেই আমার সুরে সুরে গাইছে এবং তাদের কমিউনিটির সাথে আমাদের জাতীয় সঙ্গীতটি যে জাতীয় সঙ্গীত ছাড়াও সত্যি সত্যি তাল,লয় সুরে একটি অসাধারন সঙ্গীত তার আলোচনা করছে। জাতীয় সঙ্গীত শেষ হলে আমরা ক্লাসের দিকে যাচ্ছিলাম, কোন ভাল বা আবেগময় কাজের সমাপ্তি ঘটলে যেমন তাঁর রেশ বা আবেশ কিছুক্ষনের জন্য হলেও মোহাবিষ্ট করে, তেমনি কেন জানি আমাকে মোহাবিষ্ট করেছিল। শুধু সেদিন কেন যতদিন ছাত্র ছিলাম স্কুলে প্রতিদিনই এই স্বাদ আস্বাদন করেছি। আমার গ্রামের স্কুলটি পরে হাই স্কুলে উন্নীত হয়, আমার ফুফাত ভাই ওই স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিল। আমি বি,আই,টি(রাজশাহী) ছুটি হলে যখন গ্রামের বাড়িতে যেতাম প্রায়ই সকাল সকাল স্কুলে যেতাম, দলবেঁধে গাওয়া জাতীয় সঙ্গীত শুনা ও মাস্টারি করার জন্য। আমাকে আমার ভাইটি অংকের ক্লাস নিতে বলত,স্কুলের সুবিধা অসুবিধার কথা বলত। সে ছিল আমার গ্রামের সকল কিছুর সহায়ক। আজ সে আমাদের মাঝে নেই। তাই আজ আমি যখন নিজে প্রায়শই হারমোনিয়ামে জাতীয় সঙ্গীতের সুর তুলি, এর মাহাত্ব সুর তাল লয় আমাকে যেমন অন্য ভুবনে নিয়ে যায়, তেমনই অসময়ে চলে যাওয়া এ ভাইটির কথা স্বরণ করে সেই অন্য ভুবনে তাকেও খোজার চেষ্টা করি। কিন্তু কেন যে সে আমার উপর এত রাগ করল, আমি কোনদিন তাঁর দেখা পাইনি।
যাক, প্রথম দিন ক্লাস হল অর্ধেক, টিফিন পিরিয়ডের সময় থেকে আরম্ভ হল মাঠে বিভিন্ন খেলার অনুশীলন আর কমন রুমে চলল নাচ গান ও নৃত্যের রিহার্সেল। আমি প্রথম দিন কোন কিছুতেই অংশ গ্রহণ করলাম না। শুধু দেখলাম।
এই স্কুলটি পড়াশুনার পাশাপাশি ক্রীড়া ও সাংকেতিক চর্চার জন্য বিশেষ নামডাক ছিল। ২৬শে মার্চ বিজয়, ১৬ই ডিসেম্বর স্বাধীনতা ও ২১ ফেব্রোয়ারী মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হওয়া রিতিমত রুটিন হয়ে গিয়েছিল। একুশে ফেব্রোয়ারী উপলক্ষে অন্য একটি হাই স্কুলের সাথে আমাদের প্রীতি ফুটবল ম্যাচ খেলার আয়োজন করা হল। খেলোয়ার সিলেকশনে ষষ্ট শ্রেণী থেকে আমি ও ক্লাসে প্রথম হওয়া বন্ধুটি স্কুলের দলে খেলার সুযোগ পেলাম। ক্রীড়া শিক্ষক ওকে সেন্টার ফরোয়ার্ড ও আমাকে লেফট উইং এ খেলালেন। কোন পক্ষ গোল করতে না পারলেও বা আমরা জিততে না পারলেও খেলায় একে অপরের সমন্বয়ের সাথে সাথে দুজনের মধ্যে বন্ধুত্বের সমন্বয়টি অনেকটাই পাকাপুক্ত হয়ে গেল।
খেলা শেষে দুজনে একসাথেই বাড়ীর উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম। ওর বাড়ী কাছে হওয়াতে ও হেটেই স্কুলে আসত কিন্তু আমার বাড়ী মাইল তিনেক দূরে হবার জন্য আমাকে বাই সাইকেলে যাতায়াত করতে হত। আজই প্রথম সন্ধ্যার দিকে স্কুল থেকে বাড়ী যাচ্ছি। ওদের পারিবারিক কবরস্থানটির পাশ দিয়েই যাতায়াতের কাচা রাস্তা। কবরস্থানটি লাগোয়া পিছন দিকে রাস্তার দুপাশেই জংগল। লতাগুল্ম ছাড়াও ঘন জংগলে বিশাল বিশাল গাছ, আর গাছে কত রকমের পাখির সাথে বিশাল বিশাল শকুনগুলোর দাপাদাপি দিনের বেলায়ও আমাদেরকে ভয়ার্ত করে তুলত। মাঝে মাঝে খরগোশ, নাদুস নুদুস চেহেরার শিয়াল,সর্প মামা ও আরও অনেকে তাদের প্রয়োজন মত রাস্তার এপার অপার হতো। সবাই এক ভৌ দৌড়ে পার হলেও নাদুস নুদুস শিয়াল মামারা অনেকটা জমিদারি স্টাইলে রাস্তা পার হবার সময় পথচারিদের দিকে কেমন জানি ভেঙচি কাটার ভংগিতে তাকাত, অথবা ভাবখানা এমন যে একা পেলে তোমাকে কোন একটা মজা দেখাব। অন্ধকার ধেয়ে আসার সাথে সাথে ছোট ছোট পোকা চোখে এসে পড়ছিল, হাজার রকমের পাখির কিচিরমিচির, রাস্তার দুই পাশের সুউচ্চ গাছগুলোর ডালপালা দুলে দুলে সূর্যি মামার বিদায় ও সন্ধ্যা, প্রকারান্তরে রাত্রিকে আগমন জানানো উপলক্ষে একে অপরকে কোলাকলি করছিল। জংগলের শেষ ভাগে বাঁশের ঝাড়ে বাশগুলোর ক্যাচর ম্যাচর শব্দ ভুতুরে পরিবেশটাকে রীতিমত ভয়ার্ত করে তুলল। জোরে সাইকেল চালিয়ে রাস্তাটুকু পার হয়ে ওদের বাড়ির কাছে এসে দাড়ালাম। আমি সাইকেল চালালাম তাই আমি হাপাচ্ছি, কিন্তু ও কেন হাপাচ্ছে তেমনটা বুঝলাম না।
ও বাড়িতে ঢোকার জন্য বললেও আমি রাত হয়ে যাবে অজুহাতে সেদিন আর ওদের বাড়ি গেলাম না। কিন্তু এ আহবান যে আমাদের বন্ধুত্বের মাঝে একটা অদেখা, অলেখা বন্ধন তৈরী করল, তা সময়েই বলে দেবে। (চলবে)





চলুক। বেশ হচ্ছে। বর্ণনাভঙ্গি খুব প্রাঞ্জল।
ধন্যবাদ ভাইয়্যা
ধন্যবাদ ভাইয়্যা
সাবলীল লেখা। ভাল লাগলো।
ধন্যবাদ আপু। অনেকদিন পর আমার লেখায় মন্তব্য করলেন।
মন্তব্য করুন