উত্তরাধুনিক নীতিগল্প
একদা প্রত্যূষে অতিকায় এক চিনার বৃক্ষের মূলে বসিয়া অস্থিচর্মসার এক শকুন পরম মনোযোগ সহকারে সদ্যধৌত তুলসীপাতা ভক্ষণ করিতেছিল। দূর হইতে এই দৃশ্য দেখিয়া চোখেমুখে সহানুভূতি আর আগ্রহের ছাপ ফুটাইয়া আগাইয়া আসিল এক ধাড়ি ছাগ। নিকটবর্তী হইয়া শকুনকে শুধায়—‘ওহে মহাকাশচারী দিগ্বীজয়ী খেচর, মগডালে উপবিষ্ট না হইয়া এই গান্ধা মর্ত্যে তুমি কী করিতেছ?’
শকুন তুলসীপাতা ভক্ষণ থামাইয়া শূন্য দৃষ্টিতে ছাগের দিকে তাকাইয়া থাকে। অতঃপর খানিকটা শক্তি সঞ্চয় করিয়া দূর্বল কণ্ঠে বলিয়া ওঠে—‘ কী করুম কত্তা। দ্যাশ স্বাধীন হবার পর থিকা আর আগের মতো খাইতে পাইনা, ভুখা পেটে গাছের মাথায় ওঠার শক্তি পাইনা। তাই নীচে বইসা রইছি। ভালো-মন্দ কিছু খাইতে পাইলেই আবার উড়াল দিয়া উঁচা আসনে বসতাম।’
-‘ তা ঐ তুলসীপাতা ভক্ষণ করিলে কি আর শক্তি মিলিবে? উহাতে তো কোনপদের ভাইটামিনই নাই। বলদায়ক কিছু খাইবার চেষ্টা কর।’ –মুখে চুকচুক জাতীয় শব্দ করিয়া ছাগ শকুনকে ভর্তসনা করে।
-‘আর তো খাওনের কিছু পাইনা কত্তা। আচ্ছে কন দেহি কী খাইলে গায় এট্টু শক্তি পামু?’—বিমর্ষ শকুন জানিতে চায়।
ছাগ কথা না বলিয়া সামনে দুই পা ঘোটকের মতো করিয়া শূন্যে উঠাইয়া ম্যা ম্যা আওয়াজে আশপাশ প্রকম্পিত করিয়া ফেলে। তাহার পর ঘুরিয়া ঘুরিয়া, নাচিয়া নাচিয়া বিষ্ঠা ত্যাগ করিতে থাকে। ছোট ছোট সবজে আভার গোলাকৃতি লাদিতে জমিন সয়লাব হইয়া যায়। উহার দিকে ইশারা করিয়া শকুনকে বলে—‘ ইহা ভক্ষণ কর। ইহাতে সর্বপদের ভাইটামিন রহিয়াছে। আমার জ্ঞাতিগুষ্ঠী যাহাদের তরতর করিয়া পাহাড়ে আরোহন করিতে দেখ তাহারা সবাই ইহার বলে বলীয়ান। প্রতিদিন নিয়ম করিয়া ইহা দ্বারা ফলার করিয়া থাকে।’
শকুন দ্বিধামিশ্রিত পদে খানিকটা আগাইয়া আসে। এদিক সেদিক দেখিয়া ঠোকর দিয়া একখানা লাদি মুখে পুরিয়া লয়। বিস্বাদ, পুঁতিগন্ধময় হইলেও উহাতে তাহার বিবমিষার উদ্রেক হয়না। ক্ষুধার্ত শকুন একাদিক্রমে অনেকগুলি লাদি গলাধঃকরণ করে, শেষদিকে অভ্যস্ত মুখে উহাকে তাহার বুন্দিয়ার মতো সুস্বাদু লাগে। মুখ মারিয়া আসিলে সে ক্ষান্ত দেয়। তবে গায়ে গতরে কিছুটা নব উদ্যমও অনুভব করে।
ছাগের লাদিতে শক্তিমান শকুন হাঁচড়াইয়া-পাঁচড়াইয়া চিনার বৃক্ষের প্রথম বৃহৎ শাখাটিতে চড়িয়া হাঁফাইতে থাকে। উপরের শাখা হইতে আর এক নিদারুণ অভব্য শাখামৃগ অর্ধভুক্ত কেলা ছুড়িয়া মারিলে শকুন আত্মরক্ষার্থে আবার ভূপতিত হয়। বুঝিতে পারে মগডালে আরোহন ব্যাতিরেকে আত্মশ্লাঘার সহিত বাঁচিবার আর কোন উপায় নাই। কিন্তু এই মহূর্তে যে তাহার অত উপরে উঠিবার মতো শক্তি নাই।
তাই সে প্রতিদিন প্রাতরাশের সহিত ছাগের লাদি ভক্ষণ পূর্বক শক্তিবৃদ্ধি করিয়া একের পর এক শাখা বিজয় করিতে থাকে। শাখামৃগেরা প্রবল প্রচেষ্টায়ও তাহার টিকি স্পর্শ করিতে ব্যর্থ হয়। অবশেষে একদিন এক ঝটকায় সে চিনার বৃক্ষের সর্বোচ্চ শাখায় পৌছাইয়া যায়। মগডালে বসিয়া দুই দিকে দুই ডানা প্রসারিত করিয়া (খানিকটা টাইটানিক চলচ্চিত্রের প্রধাণ চরিত্রের ন্যায়) অনিঃশেষ আত্মগরিমায় নিজের বিজয় কেতন উড়াইয়া দেয়।
কিন্তু বিধি বাম! নীচ হইতে অনেকদিন যাবৎ তক্কে তক্কে থাকা এক শিকারী এমন সাজানো শিকার দেখিতে পাইয়া চোখের নিমেষে বন্দুকের এক গুলিতে উহার কল্লা উড়াইয়া দেয়। চার হস্ত-পদ ছড়াইয়া শকুন মাটিতে পড়িবার পূর্বেই পটল তোলে, মৃদুমন্দ কাতরানীর সুযোগও তাহার ললাটে জোটেনা।
সারকথাঃ ছাগের লাদিতে সাময়িক শক্তি ও মর্যাদা বৃদ্ধি হইলেও পতন অবশ্যম্ভাবী।





হক কথা...
ধন্যবাদ বস...যদিও হক্কথারে আজকাল পায়ে মাড়িয়ে চলে যায় অনেক জ্ঞানপাপী...
যাক মুকুল ভাই অবশেষে প্রাণখোলা একটা হাসি উপহার দিলেন এই অধমরে
ছাগের লাদিতে সাময়িক শক্তি ও মর্যাদা বৃদ্ধি হইলেও পতন অবশ্যম্ভাবী
সেটাই
জ্বি। টুটুল ভাইকে একটা টোটাল ধন্যবাদ কষ্ট করে পড়ার জন্য
হেহে!! সহমত!!!
হ, দ্বিমত করার কায়দা রাখে নাই কিছু লোকজন...
নীতিগল্প উমদা হইছে।
ধন্যবাদ সাঈদ ভাই। ভালো থাকবেন
প্রথম আলোর সাপ্লিমেন্ট রসআলোর প্রথমদিকে এইরকম একটা গল্প এসেছিলো শর্টকাটে। তবে আপনার এই গল্পে বর্ণনারস অনেক বেশী উমদা।
নুশেরাপা প্রথম আলোর গল্পটা আমি পড়িনি তবে কাছা কাছি ধরনের একটা গল্প ইংরেজীতে পড়েছিলাম। সেটা মাথায় ঢুকে ছিল। ইদানিং কালের কিছু বুদ্ধিবৃত্তিক পেশাজীবীদের আত্মা বিকিকিনি করতে দেখে এই হাবিজাবি লেখা
ওখানেও লেখা ছিলো অনুবাদ তবে আপনার ভাবানুবাদ অনেক বেশী ভালো তার চেয়ে। যাদের কথা বললেন উনারা অন্য কিছু খেয়ে নামতেন, ছাগুর লাদি খেয়ে পতনটা চোখে লাগে।
উমদা
মানিক ভাইকে অনেকদিন পাইনা, কেমন আছেন ভাই?
সিরাম !!
ধন্যবাদ
আপনি কি সচলায়তনের মামুন হক?
ট্যাগ লাগাও ক্যান
? মামুনভাই আমরা বন্ধুর একমাত্র বন্ধু যাকে চর্মচোক্ষে দেখার সৌভাগ্য হইছে আমার।
ট্যাগ লাগাই নাই তো জানতে চাইছে ওকে কারেকশন: আপনি কি সচলায়তনে লিখে থাকেন?
জ্বি ভাই, আমি সচলায়তনেও লিখি
সৌভাগ্য আপনার একার না ভইন, আপনার সাথে দেখা হওয়া আমার জন্যও দারুণ সম্মানের ব্যাপার। আর যা চমৎকার চা বানান আপনি!!
ও মামুন ভাই, ঝাক্কাস, লেখাটা চ্রম মাত্রায় গতানুগতিক হইয়াছে, ব্যাপক আনন্দ পাইলুম
আনন্দ পাইছ এখন আনন্দ দাও। তোমার নতুন লেখার অপেক্ষায় আছি
ঠিকাসে, বুঝতে পারছিলাম অবশ্য কী হচ্ছে...
তবু হাতের জোরে ভাল্লাগসে...
সুহান , আগেও দেখছি তুমি কেমনে কেমনে জানি আমার গল্পগুলা আগেই ধরে ফেল। তোমার জ্বালায় এখন আরও চিন্তাভাবনা করে লিখতে হবে
সারকথাঃ ছাগের লাদিতে সাময়িক শক্তি ও মর্যাদা বৃদ্ধি হইলেও পতন অবশ্যম্ভাবী
ইয়ূপ বস
মন্তব্য করুন