চক্বরের টুকিটাকি
চক্বরের টুকিটাকি
নিজের মনেই মাঝে মাঝে ভাবি আমি এমন ব্যাপক আকারে ঘোরাঘুরির প্রতি নিবিষ্ট হলাম কিসের মন্ত্রণায়! যেখানে বাংলাদেশের নারীরা এ পাড়া থেকে সে পাড়ায় যাওয়া ও পরিণত বয়সে একটি অপরাধের মধ্যে পড়ে। কিভাবে কিভাবে যেন হয়ে গেল।
ক্লাস টেনে পড়ি আমরা ১৯৯৩ সালে। নিউ টেনের ছাত্ররা নিজেদের তো অনেককিছু মনে করেই। আমাদের ১৯৬৯ সালে প্রতিষ্ঠিত মনিপুর হাইস্কুলে আমরা প্রথম নিউ টেনের ছাত্রী যারা গতানুগতিকতার বাইরে বেশ কিছু কাজ করি। ১৯৯৩ সালের পুরোটা বিশেষ করে বৃহস্পতিবার হাফ বেলা স্কুল যেদিন থাকতো সেদিন আমরা রিকশায় ঘণ্টা ঘুরেছি দিনের পর দিন। তখনকার সময় রিকশায় ঘণ্টা ছিল ২০টাকা এবং এটা আমাদের জন্যে বেশ বড় অংকের টাকা ছিল। তবু আমরা ঘুরেছি। মীরপুর দুই নাম্বার থেকে রিকশা নিয়ে আমরা ক্যান্টনমেন্ট, চন্দ্রিমা উদ্যান, মাজার রোড, বোটানিক্যাল গার্ডেন, চিড়িয়াখানা, ধানমন্ডি এসব জায়গায় গিয়েছি অহরহ।
কেয়ামত থেকে কেয়ামত : নিউটেনে আমাদের প্রথম অ্যাডভেঞ্চার বান্ধবীরা একসাথে সিনেমা হলে সিনেমা দেখা। ৯৩ সালে সালমান শাহ আর মৌসুমীর প্রথম সিনেমা ”কেয়ামত থেকে কেয়ামত” মুক্তি পায়। আমাদের মাঝে তখন এই সিনেমা দেখার জন্যে চরম আলোড়ন বিলোড়ন চলছে। কিন্তু কোনভাবেই সুযোগ করতে পারছি না কাক্সিক্ষত সিনেমা দেখার। অবশেষে বাসায় রাজি হলো যদি সাথে অভিভাবক কেউ যায়। কে যাবে আমাদের সাথে! আমাদের বান্ধবীদের মধ্যে টুসির আম্মু আবার আমাদের ডিরেক্ট টিচার। আমাদের এই শিক্ষিকা আবার বেশ প্রগতিশীল। তিনি আমাদের অসহায়ত্ব এবং সিনেমা দেখার আকুলতা দেখে একটু নরম হলেন। লিমার উপর পড়লো টিকেট সংগ্রহের দায়িত্ব। ঠিক হলো ২২শে এপ্রিল বৃহস্পতিবার, স্কুল হাফ ছুটি হলে আমরা শ্যামলী সিনেমা হলে গিয়ে ১২-৩ টা শো দেখব। গোপনভাবে সব পরিকল্পনা হলো, তবু রোকেয়া আপা মানে আমাদের টিচার সহ আমরা দশজন হয়ে গেলাম। মাবরুকার বাবা দারুণ পেজগি লাগিয়ে বসে আছেন। উনি কোনভাবেই মেয়েকে সিনেমা হলের মতো একটি ভয়াল জায়গায় যেতে দিবেন না। বান্ধবীদের একটি গ্রুপ রওনা হয়ে গিয়েছে। আমি মীরপুর দুই নম্বর বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে সকল কথার জাদুকরী দিয়ে বিশ্বাস করাতে যে সিনেমা দেখতে গেলে কোন বিপদ হবার সম্ভাবনা নেই, আমাদের সাথে একজন শিক্ষিকা যাচ্ছেন এবং আমরা সংখ্যায় ১০জন। অনেক অনুরোধের পর উনি আমাদের ছাড়লেন। আমি ঘড়ি দেখে বুঝলাম রিকশায় গেলে সিনেমা শুরু হবার আগে পৌঁছানো দুষ্কর। তাড়াহুড়ো কওে একটা মিশুক ঠিক করে ঝটপট আংকেলকে আর কোন কথা বলার সুযোগ না দিয়ে লাফ দিয়ে মিশুকে মাবরুকাসহ উঠে পড়লাম। গিয়ে দেখি হলের সামনে রোকয়ো আপা এবং টুসি ছাড়া বাকীরা (জেরীন, লিমা, তন্বি,তুলি,শিমু, তানি) উদ্বিগ্ন হয়ে অপেক্ষা করছে। লিমা আমাদের ঢুকে পড়তে বললো। ও লাইটম্যানের সাথে সিস্টেম করতে গেলো বাকী দুজন এলে যেন আমাদের কাছে বসিয়ে দেয় সেটা বলতে। আহা সিনেমা তাও জীবনে প্রথমবার বান্ধবীরা একসাথে দেখা শুরু করলাম। রেডিওতে ঘুরে ফিরে শোনা গান ”এখন তো সময় ভালোবাসার” আগুন এবং রুনা লায়লার গলায় এমন সাউন্ড সিস্টেমে শুনতে একদম অন্যরকম লাগছে। আমরা একে অন্যের শিহরণ ভাগাভাগি করে নিচ্ছি। পৌনে একটা বেজে গেলো টুসি আর রোকেয়া আপার কোন দেখা নেই। লাইটম্যান আমাদের কাছে একটা টিকিট দাবী করলো, পয়সা বেশি দিবে। লিমা অগত্যা একটা টিকিট দিয়ে দিলো। সোয়া একটায় আপা এবং টুসি এলো। এখন সিট একটা কম হয়। উপায়! উপায় একটাই আমি যেহেতু সবচাইতে কম স্বাস্থ্যের অধিকারী টুসি আর আমি এক সিটে বসতে হবে। এছাড়া আর কোন সমাধান নেই। আমার তখন এমন অবস্থা যে আমাকে যদি বান্ধবীদের পায়ের কাছে বসতে বলে তাও আমি রাজি। সিনেমা চলছে আমরা দেখছি, ”একা আছি তো কি হয়েছে”.. টুসি আফসোস করছে ”বাবা বলে ছেলে নাম করবে” গানটা মিস করেছে বলে। আমরা সবাই একসাথে সালমান শাহর প্রেমে পড়ে যাবার অবস্থা। ”ও আমার বন্ধু গো প্রিয় সাথী পথ চলার” গানটা শুনে তানি তো একদম কুপোকাত। এত হ্যান্ডসাম নায়ক জাফর ইকবালের পর আর কেউ আসেনি রোকেয়া আপা বলেন। শুধু হাইট এবটু কম। সেটা তার চেহারার ইনোসেন্স দিয়ে পুষিয়ে যাচ্ছে।
সিনেমা শেষ, নায়ক নায়িকার মৃত্যু হয়েছে - আমরা কতগুলো কিশোরী মনের সব আবেগ দিয়ে ভেউ ভেউ করে কাঁদছি...
মীরপুরের অক্সিজেন : আমাদের প্রিয় মীরপুর ঢাকাবাসীর কাছে সেই সেদিন পর্যনÍ সন্ত্রাসের এক উপশহর ছাড়া কিছুই ছিল না। কোথায় বাসা, মীরপুর শুনলে ”ও মীরপুর” বলে এমন এক ভঙ্গীমা করতো সবাই যেন ব্রিটিশ আমলের কালাপানি সেটা। যাই হোক আমাদের মীরপুরকে কেউ অস্বীকার করতে পারতো না তার সম্পদের কারণে - বোটানিক্যাল গার্ডেন, চিড়িয়াখানা। আমরা কিশোরীরা এমন এক চক্রে আবদ্ধ যে ক্লাশ টেনে উঠে গেলেও কেউ তখন পর্যন্ত বোটানক্যিাল গার্ডেনে যাইনি - ঐখানে ভদ্র মেয়েরা যায় না, যারা প্রেম করে শুধু তারা যায় ইত্যাদি ইত্যাদি নানা কথা শুনা সারা। আর কোন ছোট বেলায় চিড়িয়াখানায় গিয়েছিলাম তা আমাদওে মনেই পড়ে না। ৯৩ সালের ২৭ জুন রবিবার স্কুল বন্ধ। এদিকে আমাদের এক বান্ধবী মাবরুকার জন্মদিন। আমরা সকাল বেলাতেই সেই সাড়ে ন’টায় তার বাসায় গিয়ে সদলবলে উপস্থিত - আমি,লিমা, জেরীন, রিমি,কাজলা,তুমা। মাবরুকাকে নিয়ে চলে গেলাম সাতজনে বোটানিক্যাল গার্ডেন। হাঁটতে হাঁটতে পায়ে ফোস্কা। এত বড় এরিয়া! বাপস...আমাদের বুদ্ধিমতী তুমা একদল ছেলের সাথে লেগে গেল ঝগড়া। ছেলেদের আজেবাজে মনÍব্য যারা পাবলিক বাসে করে স্কুলে আসি তাদের একদম গা সওয়া হয়ে গেছে। তুমা এসবের সাথে অভ্যস্ত না দেখে খুব সহজেই প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে ফেলেছে। তুমাকে বুঝিয়ে শুনিয়ে আমরা আস্তে আস্তে ওখান থেকে কেটে পড়ি। কারণ বাসায় যদি কোনভাবে জানে এ ভ্রমণের কথা তাহলে বেশ বেকায়দায় পড়তে হবে সবাইকে।
বোটানিক্যাল গার্ডেনে আমরা কারণে অকারণে মন ভালো তে মন খারাপে গেছি বারবার বহুবার।
ক্লাস টেনের প্রিটেস্ট পরীক্ষা চলছে, ৯৩ সালের সেপ্টেম্বর মাস। ইংরেজি প্রথম পত্র পরীক্ষার দিন সাংঘাতিক বৃষ্টি, আমাদের আধাআধি শেষ হওয়া স্কুল বিল্ডিং এর গরাদবিহীন জানালা দিয়ে পানি ঢুকে পরীক্ষার খাতা ভিজে, ইলেকট্রিসিটি গিয়ে আমাদেও অবস্থা দফারফা, অর্ধেক পরীক্ষা দেয়ার পর ইংরেজি প্রথম পত্র পরীক্ষা বাতিল ঘোষণা করা হলো। নাচতে নাচতে বাসায় চলে আসব তা না, বৃষ্টিতে বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে সব গিয়ে উপস্থিত হলাম বোটানিক্যাল গার্ডেনে। মনে আনন্দ আর ধরে না। আমি এখনো চোখ বুঁজলে বোটানিক্যাল গার্ডেনে হাঁটু কাদার ভেতর স্কুলের সাদা ড্রেস পরা মাবরুকার আছাড় খাওয়া দেখতে পাই।
মধুর পাগলামি : ৯৩ তে মীরপুরে শ্যাওড়া পাড়ার কাছাকাছি বিখ্যাত চাইনিজ ব্লু ল্যাগুন, আমরা বহুকষ্টে কিছু টাকা যোগাড় করে জীবনে প্রথমবারের মতো বান্ধবীরা চাইনিজ রেস্টুরেন্টে গেলাম। অল্পকিছু আইটেম খেতেই আমাদের ৬০০টাকা শেষ। এরপর সেই ভরদুপুরে আমরা নিলাম ঘণ্টার রিকশা। গেলাম সংসদ ভবন এলাকায়। সংসদ ভবন আমাদের আড্ডা দেবার সবচাইতে প্রিয় জায়গাগুলোর একটাতে পরিণত হয় পরবর্তী বছরগুলোতে। এখানে প্রতি বিকালেই কোন না কোন এক গ্রুপ বন্ধুদের পাওয়া যেত। চাইনিজ খাওয়ার দিনটা (০৪.১১.১৯৯৩-বৃহস্পতিবার) আমার স্মৃতিতে আজো স্মরণীয় কারণ এত বাজে চাইনিজ খাবার আমরা আমাদের পরবর্তী জীবনে আর কখনো খাইনি।
একই বছর ডিসেম্বরে ১৩ তারিখে স্কুলে গেলাম একটা কাজে সবাই, সাড়ে আটটার ভেতর স্কুলে কাজ শেষ। কি করা যায় কি করা যায় করতে করতে কাজীপাড়াতে আরেক বান্ধবীবর বাসায় সব গিয়ে ঢুকলাম। চললো তাস্ খেলা। ধুর, তাস্ খেলতে আর ভালো লাগছে না, টাকা পয়সা যার কাছে যা আছে একসাথে করে দেখা গেল কিরশা নেয়া যায় ঘণ্টা হিসেবে, বের হয়ে নিলাম রিকশা - সেই আমরা ৬জন - লোচন, মাবরুকা, লিমা, শর্মিলা, জেরীন, কাজলা। রিকশা নিয়ে ঘুরতে ঘুরতে চলে গেলাম যাদুঘর। যাদুঘরেও আমাদের অনেকেরই প্রথমবারের মতো যাওয়া। আমরা আরাম করে ঘুরলাম পুরো যাদুঘর। পরনে স্কুল ড্রেস। তাই মনে শংকা, পরিচিত কেউ দেখলে খবর আছে! যাদুঘর থেকে,বের হয়ে লোভে পড়ে যা টাকা ছিল তা দিয়ে আমরা চকবার আইসক্রীম খেয়ে ফেললাম বীরদর্পে। খাচ্ছি আর হাঁটছি এমন সময় এক বান্ধবী হায় হায় করে উঠলো, আমাদের কাছে আসলে আর এক টাকাও নেই। আমাদের ফেরার উপায় বলতে ডাইরেক্ট বেবীট্যাক্সি নিয়ে বাসায় যাওয়া। আমার বাসায় এই দুপুরবেলা কেউ থাকার প্রশ্নই উঠে না, আব্বু আম্মু দুজনই অফিসে। কথা বলছি আর কি করা যায় ভাবছি- জেরীন বললো চল্ আমরা কারো গাড়ীতে লিফট নেবার চেষ্টা করি। নতুন আইডিয়া শুনে আমরা বেশ উজ্জীবিত হয়ে উঠলাম। আমরা বাংলা মটর, ওয়ালসো টাওয়ারের সামনে। চেষ্টা করছি গাড়ী থামানোর। কেউ থামে না। শেষ পর্যন্ত একটা ঝাঁ চকচকে কার থামলো, আমরা পেছনের সিটে চাপাচাপি করে ৬জন বসলাম, কারণ সামনে ড্রাইভারের পাশের সিটে আরেকজন বসা। ওমা একটু পরে বুঝতে পারলাম আমরা আসলে নায়ক বাপ্পারাজের গাড়ীতে উঠেছি। মীরপুর ১০নম্বর গোল চত্বরে আমরা নামলাম, বাপ্পারাজকে অশেষ ধন্যবাদ জানিয়ে।





এই আশায় বেঁচে থাকি...
গাড়ির লিফট নেওয়াটা শুনে মজা পাইলাম, অবাকও হইলাম। পছন্দ হইছে
ছোট বেলা থেইকাই তুমি ইরাম দস্যি মেয়ে ?

লেখা পছন্দ হৈছে
সেইরম
লেখা ভাল্লাগছে। এমুন লেখা আরও দিয়েন।
আইচ্ছা, এত কিছু এত ডিটেইলস মনে রাখেন কেম্নে?!
নিয়মিত ডায়রী লিখতাম এই সেদিন পর্যন্তও যে!
ভালো লাগলো । অনেক ভালো । ক্যানসেলড পরীক্ষার কথাটা বেশ লাগলো ।
এটা একটা সিরিজ চলছে, বেশ অনেকগুলো কিস্তি হবে, এই ব্লগেই আরো ৩টা কিস্তি আগে দেয়া আছে।
পড়ার জন্য ধন্যবাদ
মন্তব্য করুন