ইউজার লগইন

সুপ্রভাত বাংলাদেশ : এই সুন্দর স্বর্ণালী সকালে (ফিচার রিপোর্ট)

১....
ফ্রেমে বাঁধানো ছবিটার দিকে তাকিয়ে আজও চোখের জল ফেলেন আদাবর এলাকার গৃহিনী সবিতা শাহনাজ । খেলাচ্ছলে ঘরের ইলেকট্রিসিটির প্লাগ পয়েন্টে হাত দিয়ে বসেছিল ৪ বছরের অবুঝ শিশু শাহেদ। সেই যে ছেলেটি জ্ঞান হারালো , আর ফিরে আসেনি। ছেলের চলে যাওয়া কিছুতেই মেনে নিতে পারেন না সবিতা ।

চট্টগ্রামের সামিরা শাহিনের গল্পটাও একই রকম। বারান্দা থেকে বাতাসে উড়ে গিয়ে কাপড় আটকে ছিল , রাস্তার ওপরের ইলেকট্রিসিটির তারে । স্বামী আজগর শাহিনকে জানানোর পর, পর্দা ঝোলানোর স্টিলের স্ট্যান্ড নিয়ে কাপড় তুলতে গিয়ে ঘটে যায় বেদনাদায়ক সে ঘটনা । পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্যকে হারানোর ধাক্কা আজও সামলে উঠতে পারেননি সামিরা ।

সামিরা ,সবিতা হারিয়েছেন তাদের প্রিয়জন । কিন্তু শাহেদ , মুনীমের আত্মা যেন শান্তি পেয়েছে । বৈদ্যুতিক আঘাতে আর খালি হয়না আর কোন মায়ের কোল । আন্দরকিল্লায় মুনীমের ঘরের সামনে গিয়ে দেখা গেল ১১ কেভি লাইনের উপর বসে পাখি গাইছে , লম্বা লোহার রড দিয়ে ১১ কেভি লাইনে ছুঁয়ে ভাইয়ের স্মৃতিচারণ করছে মাজিদ শাহিন।

সবিতা , সামিরাদের বেদনাবিধুর দিনের ঘটনাগুলো আজ যেন সুদূর অতীত । বৈদ্যুতিক শকে মৃত্যুর হার পৌছে গেছে শূন্যের কোঠায় , শান্তি পেয়েছে আজগর , শাহেদের আত্মা ।

২....
রাশেদ সাহেবের শৈশব কেটেছে বরিশালে । নদী-নালার সাথে সম্পর্ক তার রক্তে মিশে আছে । ঘন্টার পর ঘন্টা নদীতে সাঁতরে বেড়াতেন তিনি । কিন্তু প্রাইভেট ইউনি পড়ুয়া দু'ছেলে মেয়ের কেউ সাঁতার জানে না । এ ভয়ে ছেলেমেয়েদের নিয়ে কখনও দেশে বেড়াতে যাননি রাশেদ সাহেব । "এত বড় শহর কিন্তু সাঁতার শেখার ব্যবস্থা ছিল না কোথাও" .. রাশেদ সাহেবের কথায় আক্ষেপ ঝরে পড়ে । শেষমেশ ভেবেছিলেন বর্ষায় ফকিরাপুল শান্তিনগরের রাজপথে জন্ম নেয়া সাগরেই সাঁতার শেখাবেন ছেলেমেয়েদের । কিন্তু রোজ রোজই বৈদ্যুতিক তার ছিঁড়ে পড়ে থাকতো সে পানিতে , রাজপথগুলো হয়ে থাকত মৃত্যু ফাঁদ হয়ে । এবার বর্ষার অপেক্ষা করছেন রাশেদ সাহেব , শুনেছেন এবছর স্মরণকালের দীর্ঘতম জলাবদ্ধতা হবে ঢাকার রাস্তায় । সে পানিতে শয়ে শয়ে তার ছিঁড়ে পড়ে থাকলেও এবার সাঁতার কাটা যাবে নির্ভয়ে । " সাঁতার শেখানো হলে এবার সবাইকে নিয়ে দেশে ঈদ করব , যেখানে ওদের শেকড় , সেখানটা ওরা চিনে আসবে , বিপন্ন জীবনে আসবে নতুন সম্ভাবনা" ... রাশেদ সাহেবের চোখে দ্যুতি খেলা করে ।

৩...
রেজাউল করিম দীর্ঘদিন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন , সততা থেকে বিচ্যুত হননি কোনদিন । অবসর সময়টা পার করছেন এলাকায় জনসেবা করে । মানুষের কাছাকাছি গিয়ে যে চিত্রটি তিনি পেয়েছিলেন , সেটা তার কাছে ছিল রীতিমত আঁতকে ওঠার মত । এলাকার প্রায় প্রতিটা বাড়িতে ইলেকট্রিক মিটারে চলে কারচুপি , মিটার রিডারদের সাথে সখ্যতা করে সবাই সরকারকে ফাঁকি দেন । সামাজিক অবক্ষয়ের এহেন দুর্দশাগ্রস্থ অবস্থা দেখে মানুষের উপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছিলেন । "সে বিশ্বাস আজ ফিরে এসেছে , এলাকার মানুষের মিটার রিডারদের সাথে ঘুষদেয়া নেয়া পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে । মিটার ঘোরে না বলে সবার মিটার রিডিং বড় কোন অংক ছুঁতেই পারছে না , তাই ঘুষ দেয়ার প্রয়োজনীয়তা পুরোপুরি হারিয়ে গেছে । যখন মানুষের মাঝে জন্ম নেয়া নিষ্ঠা আর সততা দেখি , তখন মনে হয় এবার শান্তিতে মরতে পারব"

৪...
খুলনার খালিশপুরে মোজাম্মেল প্রধানকে মাত্র কয়েকদিন আগেও সবাই ডাকত "ঘাটের মড়া"। যৌবনে মল্লবিদ হিসেবে মোজাম্মেলের খ্যাতি যশ চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল , এক বসায় আস্ত ৭/৮ টি মুরগী খেয়ে ফেলতেন । সেই মানুষটি হঠাৎ করেই যেন বয়সের ভারে ন্যূজ হয়ে গেলেন , অনেক বছর ভাল করে কিছু খেতে পারেননি । অস্থি চর্মসার কাক ভুষুন্ডি হয়ে বেঁচে আছেন গত দু'টি দশক । হঠাৎ করেই সেই মানুষটির মুখে রুচি ফিরে এসেছে । গায়ে গতরে নতুন মাংস লাগছে । ক্ষীণ কন্ঠে জানালেন ... "আবার সেই স্বাদ পাচ্ছি খাবারে" । গ্যাস পাইপলাইনে গ্যাস বন্ধ হয়ে যাবার পর , মোজাম্মেলের ছেলেদের বাসায় রান্না হচ্ছে খড়িতে । গ্যাসের রান্নায় হারিয়ে গিয়েছিল যে স্বাদ , খড়ির চুলোয় আবার তা ফিরে আসছে।

৫...
জীবন সংগ্রামে চারদশক আগে রংপুর থেকে ঢাকায় পাড়ি জমিয়েছিলেন কামাল আহমেদ । ছোটবেলায় দেখেছিলেন খরার দুর্বিষহ প্রকোপ । বৃষ্টি চেয়ে গ্রামে সেসময় আয়োজন করা হত প্রার্থনা আর গানের । সেসব ক্থা ভেবে কাতর হতেন কামাল সাহেব । চৈত্রের দাবদাহে কলে পানি না পেয়ে কামাল সাহেবের শৈশবের মধুর স্মৃতিগুলো ফিরে আসে যেন বারবার ।

হাসি-আনন্দের চিরচেনা ছবিগুলো ফিরে আসছে যেন দেশ জুড়েই , বহুবছর পর পূর্ণিমার আলো ঝলসে যাচ্ছে বাংলাদেশ , আল্লাহ মেঘ দে পানি দে'র সুরে প্রকম্পিত হচ্ছে সংস্কৃতিঙ্গন , শিল্প চর্চায় এসেছে গতি , দুর্নীতির শেকড় উপরে চারদিকে নতুন করে সূচিত হয়েছে সুনীতির জয়গান। নতুন দিনের প্রভাতফেরীতে হাত হাত রেখে চলুন এগিয়ে চলি সবাই ...

পোস্টটি ১০ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

টুটুল's picture


কঠিন দিলেন Smile
ভালো লাগলো
কিন্তু এত গ্যাপ ক্যান... কৈ ছিলেন এতদিন? এরম হাওয়া হৈয়া গেলে তো আমরা ভুইলা যামু

মেহরাব শাহরিয়ার's picture


এইতো টুটুল ভাই , আশে পাশেই ছিলাম । ইদানিং কেন যেন একটানা টানে না কিছু , তাই মাঝে মাঝে গ্যাপ দিই । এই লেখাটাও যেমন বেশ লম্বা হতে যাচ্ছিল , তারপর হঠাৎ করে শর্ট করে পোস্ট করে দিলাম ।

আপনাকে কথা দিয়েছিলাম কিছু একটা লিখলে শুরুতে এবি তেই দিব । সেটা মাথায় ছিল লেখার সময় ।

কেমন আছেন সবাই ? Smile

টুটুল's picture


হাহাহাহা
ধন্যবাদ
আমরা তো ভালই
আসেন বৃহষ্পতিবার ধানমন্ডি ৫ এ আড্ডাই

মেহরাব শাহরিয়ার's picture


এহহে আবার মিস মনে হয় , সেদিন তো প্রাচ্যের ডান্ডিতে যাচ্ছি । কোথায় , কারা বসছেন ?

ভাস্কর's picture


ভালো লাগলো স্যাটায়ার।

মেহরাব শাহরিয়ার's picture


অনেক ধন্যবাদ টু ভাস্করদা

সামী মিয়াদাদ's picture


জটিল লিখছেন....

মেহরাব শাহরিয়ার's picture


সম্মানিত বোধ করছি সামি ভাইয়ের কম্প্লিমেন্টস পেয়ে

নজরুল ইসলাম's picture


ভালো লাগলো লেখাটা

১০

মেহরাব শাহরিয়ার's picture


ধন্যবাদ নজরুল ভাই , স্বআপনার এলাকা কি স্বর্গের সীমানার মাঝে পড়ে ?

১১

লোকেন বোস's picture


স্বপ্নগুলো সত্যি হোক

১২

অপরিচিত_আবির's picture


কিসের লোডশেডিং? কোথায় লোডশেডিং মেহরাব ভাই? আপনাগো কথা শুনলেতো বুয়েট হৈতে পাস করে বাইরইতে ইচ্ছা করে না, এতো আরামের জিন্দেগী কে ছাড়বে Wink

১৩

ভাঙ্গা পেন্সিল's picture


কিসের লোডশেডিং? কোথায় লোডশেডিং মেহরাব ভাই?

মর হালা :@

১৪

তানবীরা's picture


যাদের জন্য এই ঝাকুনি তারা কুম্ভীর নিদ্রা থেকে জাগবে না, সেটাই হলো মোদ্দা কথা।

১৫

নীড় সন্ধানী's picture


প্রতিটা প্যারা ভালো লেগেছে। প্রতিকার জানা নেই, তবুও!

১৬

অদ্রোহ's picture


লেখার ঝাঁঝটা আসলেই কড়া হয়েছে ,যথারিতি মেহরাবীয় স্টাইলে ছক্কা !

মেহরাব ভাই ইদানীং রীতিমত ডুমুরের ফুল(কারণটা অবশ্য অনুমেয়) ,যাই হোক ,অনেক দিন কুলখানি খাইনা ,শহীদ হওয়ার আগে খবর দিয়েন:D

১৭

সুবর্ণা's picture


আসলেই সুদিন ফিরে আসছে। মানুষ আবার এসির বদলে তালপাখার বাতাস খাবে আর ফ্রোজেন ফুডের বদলে মুড়ি মুড়কি খাবে।

১৮

মেহরাব শাহরিয়ার's picture


রবিবাবুর প্রার্থনায় ৮০ বছর পর কাজ হয়েছে ...
"দাও ফিরিয়ে সে অরণ্য ..."

১৯

মুক্ত বয়ান's picture


হা হা হা হা হা হা হা হা হা হা হা হা হা হা হা হা হা!!!

হাস্তে হাস্তে গড়াগড়ি!!!! Smile

২০

মেহরাব শাহরিয়ার's picture


আমি দিব্য চোখে দেখছি ৪০৬ নাম্বার রুমে তুমি গড়াগড়ি খাচ্ছো । রশীদ হলের রুম কিন্তু গড়াগড়ি খাওয়ার জন্য অত নিরাপদ না (মেঝেতে ধুলা , রুমে জায়গা কম + ৩ টা রুমমেট Smile )

Smile Smile

বুয়েটে কারেন্ট যায় না , বড়ই মিস করি ভাই

২১

নরাধম's picture


দারুন লিখেছ। হাজার বছরের আবহমান বাংলা তার ঐতিহ্য ফিরে পাচ্ছে, ভাবতে ভালই লাগে!

২২

মেহরাব শাহরিয়ার's picture


আমরা এই দেশ ছেড়ে মার্কিন মুল্লুকে উল্লুকের মত দৌড়ে যাচ্ছি । কত্ত খারাপ আমরা , ভাবেনতো !!!

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.