মানুষের জীবন খুবই অদ্ভুত
মরিৎস্-কে নিয়ে ভাল ভাল কত কথা একসময় বলতে পারতাম। অনেক দিন ধরে আর পারি না। অনেক দিন আগে এটা যখন শুরু হচ্ছিলো তখন একবার খেয়াল করেছিলাম, মরিৎস্-এর ব্যবহারে আর আগের মতো আন্তরিকতা নেই। দিন দিন সেটা খিটখিটে মেজাজের বড়কর্তাদের মতো হয়ে উঠছিল। আমি ভেবেছিলাম আর বিশটা জার্মান খিটখিটে বস্ যেমন হয় তেমনি হয়তো হবে। বিধি বাম। দেখা গেল আরো বেশি খারাপ অবস্থা। দিনে দিনে কথাবার্তা শুধুই খড় থেকে খড়তর হলো। মানুষ কত দ্রুত বদলায়
অথচ সম্পর্কের প্রথম দিকে আমাদের সেকি উচ্ছ্বাস একে অপরকে নিয়ে। একেকটা মাইলফলক অতিক্রান্ত হওয়ার কালকে আমাদের সম্মিলিত উদযাপন দেখে চোখ টাঁটাতো মানুষের।
আজকাল আর কোনকিছুতে অবাক লাগে না। আশ্চর্যান্বিত হওয়া ভুলে গেছি। ভাল লাগা ভুলি নি এখনও যদিও। এখনও সন্ধ্যাবেলা মাথা তুলে আকাশের রং দেখতে ভাল লাগে। এখনও ভাল লাগে প্রিয়জনের মুখের হাসি। নতুন কিছু করার আনন্দ। আছে, এই জিনিসগুলো। এগুলোয় ভর দিয়ে পাড়ি দিই জীবনযমুনা প্রতিদিন।
এছাড়া আর কিইবা করার আছে। বিধির লিখন যাবে না খন্ডন। বিধি যদিও নিজেই আমি। তবে নিয়ন্ত্রণ করে অন্য কেউ। সেই অন্য কেউটা কে, সেটা পুরোপুরি জানি না আমি। কোন এক অ্যানিমেশন সিনেমার চরিত্র হবে হয়তো।
এই যমুনা নদীর তলে বড় বড় বোয়াল মাছ রয়েছে। ছয়-সাত কেজি একেকটার ওজন। সে মাছগুলো অনেকেই ধরে বেঁচে। সাহেবরা সেই চার-পাঁচ বছর বা তারও বেশি বয়সী মাছগুলোকে বাজার থেকে কিনে বাসায় এনে কাটান। মানুষ দিয়ে। তারপর গিন্নিদের সে মাছ রান্নার দায়িত্ব। সবশেষে খাওয়া। একটা জীবনকে আরেকটা জীবনের গিলে ফেলা।
আমরা সবাই আসলে পৃথিবীর আদিম সেই খাদ্যশেকলের অংশ। একদিন এ দেহও খেয়ে ফেলবে ওই মাছের চেয়ে ক্ষুদ্র কোন প্রাণ, তার ক্ষুধার তাড়নায়।
সময় সময় আমার মনে হয়, পৃথিবীটা খুব কঠিন একটা জায়গা। যেখানে মানুষ যতো চেষ্টাই করুক, কিছু জায়গায় কোন মূল্য পাবে না এটাই স্বাভাবিক। কিছু কিছু জায়গায় বৈষম্য স্বাভাবিক। কেউ আজীবন ঠকবে এবং একই সঙ্গে ঠকানোর দায় মাথায় নিয়ে বাঁচবে স্বাভাবিক। কেউ সারাজীবনের সবকিছু একজনের তরে বিলিয়ে দেবে, আর অন্য কেউ সেই একজনকে সবকিছুসহ বড় সহজে উঠিয়ে নিয়ে যাবে- স্বাভাবিক।
মানুষের জীবন খুবই অদ্ভুত। শুধু বোয়াল মাছের মতো কারও জালে ধরা পড়ে, টুকরো হয়ে, চুলায় চড়ে বসবার অনিশ্চয়তা নেই, তাছাড়া আর সব রকমের অনিশ্চয়তা আছে। তাই নিয়ে ভাল থাকার লড়াইয়ে লেগে আছি প্রত্যেকটা ছোট-বড় প্রাণ আমরা। বুকের ভেতর সবার প্রাণটাই ধুকপুক করে। কষ্ট লাগলে কষ্ট হয়। ভাল লাগলে আনন্দ। জীবন নিয়ে ভাবি না আর। ভাবনা-চিন্তা বন্ধ।
গান শুনতেছিলাম সেদিন। বাংলা লোকগীতি গত দশ-বারো বছরে ইউটিউবের হাত ধরে অনেক প্রসারিত হয়েছে। অন্যান্য ধারার গানের ক্ষেত্রেও ঘটেছে বিষয়টা। কিন্তু যদি প্রভাবের কথা চিন্তা করি, তাহলে দেখা যায় লোকগীতিগুলোর জন্য এমন একটা স্বল্পমূল্যের আর্কাইভ বেশি জরুরি ছিল অন্যান্য ধারাগুলোর চেয়ে। যেটির সুবাদে আজ যখনই ভাবনা-চিন্ত বন্ধ এই কথাটা ভাবি তখন চিন্তার গতিপথ ঘুরিয়ে দিতে মুহূর্তেই চালিয়ে দিতে পারি,
"বন্ধু তুমি ভরা নদীর জোয়ার-ভাটা না
ঘরে ঘরে ঢেউ আসে তুমি আসো না।"
সব আজ হাতের কাছে। পেয়ে যাই বড় সহজে। শুধু সেই ছেলেটাকে খুঁজে পাই না, এককালে যে আশ্রয় নিয়েছিল আমার ভেতরে।
---





মন্তব্য করুন