আমার স্ত্রীর মৃত্যুর কোল থেকে ফিরে আসা”-প্রথম মা/বাবা হবার অনুভূতি
সকাল থেকে আকাশটা কেমন জানি মেঘলা, মনে হচ্ছে বৃষ্টি হবে, শরীরটাও খুব একটা ভাল লাগছে না, কেমন জানি মেজমেজ করছে, একটা আলসেমো ভাব। 19 ফেব্রুয়ারী, 2008ইং আমার স্ত্রী সকাল থেকে পেইন অনুভূব করছিলেন। বিষয়টি অবশ্য সে আমাকে জানিয়েছিল, কিন্তু খুব একটা গুরুত্ব দেয়নি, ভেবেছিলাম হয়তবা গ্যাসটিকের পেইন-টেইন হবে। এই ভেবে চলে আসি অফিসে, অফিস শেষ করে বাসায় ফেরার পর সে আমাকে বিষয়টি আবারও অবগত করে, তখন কথাটি আর ফেলে দেওয়ার মত উপক্রম ছিল না। অনেক সিদ্ধান্তের পর তাকে প্রথমে নিয়ে যাই আজিমপুর মা ও শিশু স্বাস্থ্য ক্লিনিকে, ওখানে সবোর্চ্চ 30 মিনিট চেকআপের পর ডিউটিরত ডাক্তার জানালেন ও কিছু না, ঠিক হয়ে যাবে।অতঃপর সেখান থেকে বের হয়ে আসি বাসার উদ্দেশ্যে, ফেরার পথে ব্যাক সাইডে আবারও জোড়ালো পেইন শুরু হল। তখন কোন উপায়ন্তর না দেখে সিএনজি ড্রাইভারকে নিয়ে মগবাজার আদদীন হাসপাতালে চলে আসি। আদদীন হাসপাতালের ডাক্তার চেকআপ করে বলল.. রোগীকে ভর্তি করাতে হবে, সঙ্গে সঙ্গে ডাক্তার এর সাথে আলোচনা করে ভর্তি করে ফেলি। অতঃপর তাকে (স্ত্রীকে) বেডে নিয়ে গিয়ে একটি পেইন হওয়ার একটি ইনজেকশন দেয়। এভাবে কেটে গেল প্রায় 5টি ঘন্টা, রাত তখন আনুমানিক 10টা, যদিও সময়টা খুব একটা পড়ে পড়ছে না। ডাক্তার এর সাথে আলোচনাকালে উনাকে বলি যে, ম্যাডাম নরমাল ডেলিভারি যাতে হয় একটু খেয়াল রাখবেন। ডাক্তার বিষয়টি শুনে ওকে (স্ত্রীকে) নিয়ে আবার লেবার রুমে প্রবেশ করল, তার কিছুক্ষন পর এসে বলল সরি, পেটে বাচ্চা বড় হয়ে গেছে..নরমালে করাতে গেলে যেকোন ধরনের দূঘটর্না ঘটতে পারে, এখন আপনারাই সিদ্ধান্ত নেন কি করবেন। কথাটি শুনে খুব খারাপ লাগছিল, তারপরও স্ত্রীর ঐ অবস্থাটির কথা চিন্তা করে ডাক্তারকে সিদ্ধান্ত দেই ঠিক আছে যেভাবে ভাল হয় সেভাবে প্রস্তুতি নেন, এরই মধ্যে অন্য একজন পুরুষ ডাক্তার বলল আপনার রোগীর ব্লাড লাগতে পারে, অনুগ্রহ হাতের কাছে ব্লাড রেডি রাখবেন। আমি সঙ্গে সঙ্গে বন্ধু-বান্ধব, আত্নীয়-স্বজন সকলকে জানাই কার বি+ রক্ত আছে, অতঃপর পাওয়া গেল তিনজনকে। যাক সব চিন্তার অবসান হল, শুধু এখন অপেক্ষার পালা। রাত তখন 11টা, ওকে (স্ত্রীকে) নিয়ে যাওয়া হলো ওটিতে 11:10 মিনিটে আমার স্ত্রী একটি কন্যা সন্তানের জন্ম দেন। খবরটি শুনে আমি রীতিমত দিশেহারা, ভেবে পাচ্ছিলাম না কি করব। এদিক সেদিক ফোন করে সবাইকে খবরটি জানাই, এ যেন আকাশের চাঁদ হাতে পাওয়ার মত। তার কিছুক্ষন পর ভেতর থেকে বাচ্চাটিকে একটি কাথাঁ মোড়ানো কাপড় জড়িয়ে নিয়ে এসে বাচ্চার বাবা কে তাকে খুজছিল। আমি গেট থেকে দৌড় দিয়ে কাছে আসি এবং কোলে নেই। আহা! কি যে আনন্দ, কি যে সুখ, ভাষায় বোঝাতে পারবো না। সবাই যখন বাচ্চাটিকে ঘিরে খুশিতে আত্নহারা, ওর (স্ত্রীর) কথা যেনো কারো মনেই নেই। হঠাৎ আমি ডাক্তারকে জিজ্ঞাসা করি ম্যাডাম, আমার স্ত্রীর কি অবস্থা, তথন ডাক্তার বলল বাচ্চার মা ভালো আছে চিন্তার কোন কারণ নেই, আপনারা নিশ্চিত থাকেন। যাক এভাবে সবাইকে নিয়ে দারিয়ে থাকতে থাকতে প্রায় আরও প্রায় 30 মিনিট চলে গেল। রাত তখন আনুমানিক 12টা, যাদের রক্ত দেওয়ার জন্য নিয়ে আসছিলাম, তাদেরও বাসায় ফেরার সময় চলে এসেছে। তাছাড়া ভিতর থেকে আর কোন সাড়া শব্দও পাচ্ছিলাম না। ঠিক কিছুক্ষন পর একজন ডাক্তার বের হলেন, তাকে জিজ্ঞাসা করলাম স্যার আমার স্ত্রীর কি ব্লাড লাগবে? তারপর ডাক্তার আবার লেবার রুমে চলে গিয়ে রোগীর (স্ত্রীর) কন্ডিশন দেখে বাহিরে এসে বলে, আপনারা চলে যেতে পারেন, রক্ত লাগবে না। যাক সবাইকে নিশ্চিন্ত মনে চলে যেতে বলি এবং আমি ও আমার শশুর-শাশ্বড়ীকে নিয়ে বাসায় চলে আসি। শশুর এর বাসাটি অবশ্য মগবাজারেই ছিল, যার দূরত্ব ছিল মাত্র 10 মিনিটের। বাসায় এসে হাত মুখ ধূয়ে থেতে বসেছি সবে মাত্র, যাক সবার খাওয়া দাওয়া শেষ হলো, ঘুমানোর জন্যও সব ধরনের প্রস্তুতি শেষ। রাত তখন আনুমানিক 2:30 মিনিট মাত্র বিছানায় পিঠ ঠেকালাম ঘুমানোর জন্য। আচমকা মাথার কাছে রাখা সেল ফোনটি বেজেঁ উঠে, ফোনটি রিসিভ করে হ্যালো বলতেই ওপাশ থেকে কে যেনো বলছে শাহজাহান সাহেব বলছিলেন? আমি আদদীন হাসপাতাল থেকে ডিউটি ডাক্তার বলছি। আপনার রোগীর অবস্থা খুব খারাপ, তাড়াতাড়ি হাসপাতালে আসেন। বাহিরে তখন প্রচন্ড কালবৈশাখী ঝড় শুরু হয়ে গেছে। কোন উপায়ন্তর না দেখে তাড়াতাড়ি ছাতা নিয়ে বের হয়ে হাসপাতালের উদ্দেশ্যে রওনা করি। প্রচন্ড ঝড়ে ছাতা যেন বাধ মানে না, মনে হচ্ছে ছাতাটি ছিড়ে যাবে, এক পযায় ঠিকই ছাতাটি ভেঙ্গে গেল। যাই হোক অবশেষে হাসপাতালে প্রবেশ করতেই ওখানে (হাসপাতালে) অবস্থানরত ওর (স্ত্রীর) ভাবি দৌড়ে এসে বলল সাজু ওকে বাচাঁও, জরুরী ভিত্তিতে রক্ত লাগবে। ঐ সময় পুরো হাসপাতাল যেন এক ভূতরে অবস্থা স্ব স্ব কেবিন/ওয়ার্ডে রোগী ছাড়া কোন অতিরিক্ত লোক ছিল না। পুরো হাসপাতাল খোজাঁখুজি করেও একব্যাগ রক্ত কোথাও পাইনি। আমার দু’চোখ যেন অশ্রু সিক্ত হয়ে আসছে, যাই হোক নিজেকে শক্ত করে নিলাম, কারন আমি জানি, আমি ভেঙ্গে পড়লে সবাই হতাশ হয়ে পড়বে। এভাবে প্রায় 1-2 ঘন্টা অতিবাহিত হয়ে যায়, ওর (স্ত্রীর) অবস্থা প্রায় সংকটাপন্ন, হঠাৎ হাসপাতালের সিঁড়ির নিচে কে যেন ঘুমিয়ে আছে। তৎক্ষনাৎ ডিউটি ডাক্তার সেই ব্যক্তিটিকে ডেকে বলল..ভাই একটু উঠুন, আপনার রক্তের গ্রুপ কি? লোকটি বলল..বি+ (এ যেন মেঘ না চাইতে বৃষ্টি পাওয়ার মত)। ডাক্তার তখন আমার স্ত্রীর ব্যাপারটি খুলে বলল এবং সঙ্গে সঙ্গে লোকটি রাজি হয়ে গেল। যাই হোক অবশেষে একব্যাগ রক্ত দিয়ে ওকে (স্ত্রীকে) মোটামুটি সেটেল রাখা হল। আরও দু’ব্যাগ রক্ত লাগবে..তাই এ বৃষ্টি মধ্যে দিয়েই বের হয়ে পড়লাম কোথায় রক্ত পাওয়া যায়। মগবাজার, মালিবাগ এবং ইস্কাটন পুরো এলাকায় ঘুরেও কোথাও রক্ত না পেয়ে নিরুপায় হয়ে হাসপাতালে ফিরে এসে শুনে কে যেনো একব্যাগ রক্ত দিয়েছে। শুনে একটু স্বস্তি পেলাম এবং ঐ লোকটিকে খুজছিলাম, একটু ধন্যবাদ দেওয়ার জন্য। কিন্তু অবশেষে লোকটিকে পুরো হাসপাতালের কোথাও খুজে পেলাম না..বার বার মনে হচ্ছিল, এ মনে হয় আল্লাহর প্রেরিত কোন ফেরেস্তা হবে। যাই হোক এরই মধ্যে আমার দু’বন্ধু চলে এসেছে..তাদের কাছ থেকে আরও দু’ব্যাগ রক্ত নেয়া হল। পরিশেষে তিনব্যাগ রক্ত দেওয়ার পর সকালের দিকে ওর অবস্থা সম্পূন ভালো। সবচেয়ে যে ব্যাপারটি শুনে বেশি হতবাক হয়েছি তা হলো..সকালে ওর যখন জ্ঞান ফিরে তখন ও (স্ত্রী) বলল..রাতের যে ঘটনাটি ঘটেছে তা হলো ডাক্তারদের দায়িত্ব অবহেলা, বার বার বলা সত্ত্বে ও কোন গুরুত্ব না দেওয়া।
আমি আশা করি এবং আল্লাহ পাকের নিকট দোয়া করি উক্ত ঘটনার পূনরাবৃত্তি যাতে কারও জীবনে না ঘটে। যাই হোক সব দুঃখ-কষ্টকে অবসান ঘটিয়ে আজ আমি একজন সার্থক বাবা।





সব ভালো আছে জেনে ভালো লাগলো। পুরো পরিবারের জন্য রইলো শুভকামনা
ধন্যবাদ আপনাকে, আপনাদের দোয়ায় আল্লাহর রহমতে মেয়েটি ভালো আছে, এখন তার বয়স ৫+ , সে এখন নার্সারীতে পড়ে। আমার মেয়েটির জন্য দোয়া করবেন।
মেয়েটা কেমন আছে? সবার জন্য শুভকামনা
সব ভালো আছে জেনে ভালো লাগলো। পুরো পরিবারের জন্য রইলো শুভকামনা
আজকালকার ডাক্তারদেরও কাণ্ডজ্ঞান কমে যাচ্ছে মনে হয়।
শুভ কামনা রইলো।
আদদ্বীন হাসপাতালের অবস্থা যা-তা।
এদের ডাক্তারের অবহেলার স্বীকার হয়েছে আমাদের পরিবারের এক সদস্য।
ভুলেও কেউ এই হাসপাতালে না যাবার জন্য অনুরোধ করছি
আপনার বাবুটার জন্য শুভকামনা।
ধন্যবাদ, বস!
মন্তব্য করুন