ইউজার লগইন

চড়ুইভাতির লালটিপ / মুহাম্মাদ আমানুল্লাহ

আম্মু, তোমার নাম কী ?
- আব্বুর পাশের চাচুটি আমার নাম জানতে চায় ।
আমি আমার নামটি বলি-অপূর্বা শৈলী।
ভারি সুন্দর নাম বলে তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরেন, আদর করেন। আমার বেশ ভাল লাগে। চাচুটি বেশ মজার-ক্লিক, ক্লিক করে তিনি আমার ছবি তুলেন, আম্মুর ছবি তুলেন, আমাদের ছবি তুলেন। এটি আমাদের অন্যরকম দিন।
আব্বুরা কেউ আজ অফিসে যায়নি। এমনকি আমাকেও খুব ভোরে ওঠে স্কুলের জন্য ছুটতে হয়নি। অন্যরকম দিন বার বার আসেনা। অনেকদিন পর অনেকদিন পর একবার আসে।
কপালে লালটিপ, গায়ে গোলাপি রঙের নতুন জামা, পায়ে হলুদ নতুনজুতো পরে আব্বুআম্মু ও ভাইয়ার সাথে বেরিয়েছি আমি। বেশ ফুরফুরে মনে । গলির মোড়ের দোকানিটা এত দেরিতে আসে কেন জানিনা- দোকানটি আজকেও কী দেরিতে খুলবে? ইচ্ছে করে কয়েকটি লজেন্স নিই। ললিপপ বা আমের আচার নিই। আমরা প্রতিদিন এতক্ষণে এসেম্লিতে যোগ দেই- জাতীয় পতাকার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করি। শপথ পাঠ করি- আমি শপথ করিতেছি যে,মানুষের সেবায় সর্বদা নিজেকে নিয়োজিত রাখিব। দেশের প্রতি অনুগত থাকিব। দেশের একতা ও সংহতি বজায় রাখিবার জন্য সর্বদা সচেষ্ট থাকিব।... ... এই-,ভাইয়া ধমক দিয়ে আমাকে থামিয়ে দেয়। আমার মনটা খারাপ হয়ে যায়। আমার কান্না পায়। আমি দেখি দুটো বড় গাড়ি আমাদের সামনে এসে দাঁড়ায়। আমার মন আবার ভালো হয়ে যায়। আম্মুর হাত ধরে ভাইয়ার সাথে আমরা গিয়ে গাড়িতে বসি।
গাড়িতে ওঠেই আমার মনটা আনন্দে নেচে ওঠে। ওমা একী কাণ্ড-আমার মতো অনেকেই এখানে। সবার গায়ে নতুনজামা, নতুনপ্যান্ট নতুনজুতো । তাদের নামগুলো বেশ মজার । অন্বেষা ,শ্রেয়া, রূপা, বাবলি ,লুবাবা লাবিবা কত্তো নাম। আমার আর মনে পড়ে না। আজকের দিনটি বেশ মজার। এটি আমাদের অন্য রকম দিন। ভাইয়া তো বেশ বড়ো হয়েছে- নাইনে পড়ে; ও তো অনেক কিছু জানে । কথা একেবারে বলেনা। আচ্ছা বড় হলে কী ওভাবে চুপচুচাপ বসে থাকতে হয়, কথাগুলো বেঁধে রাখতে হয়। আব্বু বলে আমি নাকি তার মতো হয়েছি- কথা না বলে পারিনা, শুধু প্রশ্ন করি। রাতে তো আমার ঘুম আসেনা। কত কিছু ভাবি।
আমাদের বেডরুমে প্রজাপতি আসে কেন?
নেঙটি ইঁদুরটি মাঝে মাঝে আমাকে দেখে, আবার আম্মুকে দেখলেই পালিয়ে যায় কেন?
বাসার টিকটিকি পিঁপড়া আরশোলাদের কী দোষ- আরজু কেন প্রতিরাতে ওদের পথে চক ঘষে ?
- সকালে ওদের মরা দেখলে আমার মনটা কেঁদে ওঠে, আমি কাঁদি। আরজু এদের মেরে ফেলে বলে তার বাবাটাও মরে গেছে । আমাদের বাসায় থাকে। রান্না বান্না করে। আমাকে আদর করে ,আমার সাথে থাকে। আমার সাথে খেলে। ওর মা নাকি আবার বিয়ে করেছে। বাবা মরে গেলেই কী মা-দের আবার বিয়ে করতে হয়- আরজুদের নিয়ে থাকতে পারেনা। এগুলো আমার ভালো লাগেনা। এগুলো আমি বুঝিনা।
আমার বেলিনা মিসকে মনে পড়ে। শুধু শুধু কেন ইংলিশ মিডিয়ামে চলে গেল জানিনা। আমি মাছ আঁকতে পারি, বেগুন পারি,আপেল পারি, নৌকো পারি না,শাপলা পারি না। শ্রেয়ারা কী পারে?
আমাদের নাশতা দিয়ে গেলেন এক লম্বু ভাইয়া-সন্দেশ,কলা , পাউরুটি, এক বোতল পানি, ডিম। আমার তো ডিম খেতে ইচ্ছে করেনা। চিপস দিতে পারেনা-কোকের ক্যানগুলো এখনো প্যাকেটে-আমাকে কোক দেবেনা?
আবার নৌকো করে আবার বেড়াতে গেলাম, একটি রাজবাড়িতে গেলাম -বৌদ্ধ বিহার দেখলাম।
আমরা পাহাড় দেখলাম,নদী দেখলাম,ফুল দেখলাম, পাখি দেখলাম, চা বাগানে গেলাম। চাকমা মগ মুরঙের বাড়ি দেখলাম। তাদের বাড়িগুলো বেশ চমৎকার, সাজানো টিলায় টিলায় সারি সারি বাড়ি। দু’তলা বড়ি-নিচতলা খোলা, আলোয় আলোয় ভরা, বাতাসে বাতাসে ঘেরা। আমাদের শহরের বাড়িগুলো কেন অন্য রকম আমি জানিনা।গান ধরলাম- একদিন ছুটি হবে অনেক দূরে যাবো/নীল আকালে সবুজ ঘাসে নিজেকে হারাবো/ একদিন ছুটি হবে।
বাড়িগুলো দেখে আমার দাদুবাড়ির কথা মনে পড়লো। দাদুর কথা মনে পড়লো। লাকির জন্য- দাদুবাড়ির বিড়াল ছানাটির জন্য মন ছুটে গেলো। আমার নামে দেয়া বাছুর দু’টোর কপালে জেগে থাকা সাদাকালোচাঁদের কথা মনে পড়লো। সাজ্জাদ চেয়ারম্যানের কথা মনে পড়লো- সাজ্জাদভাইয়া, যে দাদুর কাছে থাকে, দাদুর কাছে পড়ে, ক্লাসে বার বার ফার্স্ট হয় তার কথা মনে পড়লো। দাদুবাড়ির সারি সারি আম গাছ, নারকেল গাছ, সুপুরি গাছগুলোর ডাক দিয়ে যেন আমাকে ডাকতে থাকে, ভাইয়াকে ডাকতে থাকে, আম্মুআব্বুকে ডাকতে থাকে। আচ্ছা, আমার এত্তো কিছু মনে পড়ে কেন? এগুলো কী ভাইয়ার মনে পড়ে না, আব্বুর মনে পড়েনা? কতটুকু বড় হলে এগুলো ভুলে থাকা যায় আমি জানি না । আমার জানতে ইচ্ছে করে। আমার দাদুআপুকে মনে পড়ে। দাদুভাইয়ার ছবিটি আমার দু’চোখে হাসতে থাকে। আমি তো তাঁকে দেখিনি। তারপরও দেখি।
আমাদের নৌকাটি ঝুলন্তসেতুর কাছে এসে দাঁড়ালো- আমরা ঝুলন্তসেতুটি দেখলাম, হ্রদের বুকে জেগে থাকা টিলায় টিলায় আমার মন ছুটে গেল। আমরা আবার ছবি ওঠালাম।
কখন আমার পাশে এই আন্টিটি এসে বসলো আমি টের পাইনি-তার মুখ কালো ওড়নায় ঢাকা। তার হাতধরা মেয়েটির মাথায় সদাস্কার্ফ । উনিও আমাদের সাথে এসেছেন। আম্মুকে সালাম করেছেন। আম্মুদের কাছাকাছি এতক্ষণ বসে আছেন। মেয়েরা কেন মুখ বেধে রাখে আমি বুঝিনা। উনি আমার লালটিপে হাত দিলেন। আমি কেঁদে উঠতে চাইলে আবার আমার হাতে এটি রেখে দিলেন। আম্মু আমাকে লালটিপটি আবার পরিয়ে দিল। এবার বূপা আমার লালটিপটি নতে চাইলো। আম্মু সবাইকে একটি ্কেটি লালটিপ পরিয়ে দিল। আমরা সবাই হাততালি দিয়ে আনন্দে লাফিয়ে ওঠলাম। আমরা আবার গান ধরলাম- আমাদের দেশটা স্বপ্নপুরী/ সাথী মোদের ফুলপরী/ ফুলপরী লালপরী নীলপরী সবার সাথে ভাব করি/ - চড়ুইভাতির লালটিপ আবার আমার কপালে প্রভাতসূর্যের মতো জ্বলে উঠল। অন্বেষাদের সাথে আবার ছবি ওঠালাম।
লম্বু ভাইয়াটি আবার এলো- আমাদের জুস দিল। চকোলেট দিল। আমার এ রকম ভাইয়াদের বেশ ভালো লাগে। একটি করে কমলা দিল। আমার এবার চাচুর কথা মনে পড়লো। রাতদিন আমাকে নিয়ে পড়ে থাকতো। লুকিয়ে লুকিয়ে চকোলেট দিত। চাচুর জন্যে আমার কান্না পায়। কেউ তো এখন আমাকে উপুড় করে বুকে নিয়ে খেলেনা, ঘোড়া হয়না, গাড়ি হয়না , লাল পরীদের কথা, নীল পরীদের কথা মজা করে বলেনা। ওই আন্টিদের আমার ভালো লাগেনা, যারা টিপ পরতে দেয়না, গান করতে বারণ করে ,ছবি তুলতে চায়না। আমার ওই মিসদের ভালো লাগেনা- যারা খেলতে দেয়না, গল্প করেনা, কথায় কথায় হেড ডাউন দেয়।
প্রতিদিন আমি লাল সবুজের পতাকা আঁকি। লালটিপ পরি। আমার বেলুনের মতো উড়ে যেতে ইচ্ছে করে। চাঁদের বুড়ির কাছে। আমার ঘাসফড়িঙ্গের পিছু নিতে ইচ্ছে করে । মুঠো মুঠো জোনাক পোকায় দু’হাত পুরে নিতে ইচ্ছে করে। দেয়াল কোণে সে মাকড়শাটি একপেট ডিম নিয়ে মরে শুকিয়ে গেছে তা ধরে দেখতে ইচ্ছে করে। আমি দোলযাত্রার ফানুসগুলোর মতো উড়ে উড়ে আলো জ্বালিয়ে আমি ছুটে যাই কালোনীল মেঘেদের দেশে। সুরের দেশে স্বপ্নের দেশে। আমার লালটিপটি পরলে জাতীয় পতাকার কথা মনে পড়ে। লাল টিপের সূর্যটি আমার কপালে পতাকার মতো হাসে।

পোস্টটি ৪ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

মডারেটর's picture


গ. "আমরা বন্ধু" তে শুধু নতুন লেখাই প্রকাশিত হবে। পুরনো লেখা রিপোস্ট করা যাবে না। অন্য কোনো কম্যুনিটি ব্লগে প্রকাশিত লেখা এবিতে প্রকাশ নিষিদ্ধ। এবিতে প্রকাশিত কোন লেখা ২৪ ঘন্টার মধ্যে অন্য কোনো কমিউনিটি ব্লগে প্রকাশ করা যাবে না। ব্যক্তিগত ব্লগ এবং পত্রিকা এই নিয়মের আওতার বাইরে।

ব্লগের নীতিমালার কারনে পোস্টটি প্রথম পাতা থেকে সরিয়ে আপনার পাতায় রেখে দেয়া হলো।

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

মুহাম্মাদ আমানুল্লাহ's picture

নিজের সম্পর্কে

কবি-গল্পকার:
জন্ম:১ আগস্ট ১৯৬৭ সাল। বাবা মৌলানা মুহাম্মাদ হুসাইন এবং মা মুহসেনা বেগম। মৌলানাবাড়ি, জামালপাড়া,হোয়ানক, মহেশখালি,কক্সবাজার,বাংলাদেশ।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে স্নাতক সম্মানসহ স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করি যথাক্রমে ১৯৯১ ও ১৯৯২ সালে ।
নব্বই দশকে কবিতা ও প্রবন্ধ দিয়ে লেখালেখির সূচনা। মূলত কবি,গল্প ও প্রবন্ধের পাশাপাশি শিশুসাহিত্য রচনায় বিশেষভাবে অনুরক্ত। জাতীয় দৈনিক প্রথম আলো, সমকাল, ইত্তেফাক, সংবাদ, জনকন্ঠ, আলোকিত বাংলাদেশ, করতোয়াসহ চট্টগ্রামের দৈনিক আজাদী, পূর্বকোণ, সুপ্রভাত বাংলাদেশ,পূর্বদেশে বিভিন্ন লেখা প্রকাশিত হয়েছে। এ ছাড়া সচিত্র বাংলাদেশ, মাসিক উত্তরাধিকার,মাসিক শিশু ও সুন্দরমে লিখে থাকি। ২০১৪ সালের বইমেলায় প্রকাশিত হয়েছে দুটো বই- প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'মায়াবী রোদের ডানা' (শুদ্ধস্বর,ঢাকা) ও 'চড়ুইভাতির লাল টিপ' (শৈলী প্রকাশন-চট্টগ্রাম)।
গবেষণা অভিসন্দর্ভ - নদী কেন্দ্রিক উপন্যাসে বাঙালির জীবন।
পেশাগত জীবনে একজন নিবেদিত শিক্ষাসেবী; শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তা।