ইউজার লগইন

সিগারেট

অন্ধকার রাত। সবাই বিড়ালের পায়ে হেঁটে যাচ্ছে। দলবেঁধে। দলে কতজন লোক তা কেউ বলতে পারবে না। কেউ কাউকে চেনেও না। অন্তত, আগে থেকে চিনতো না। এখন চেনে। সবার একটাই পরিচয় এখন। তাড়া খাওয়া মানুষ।

সবাই পালাচ্ছে। যে যে দিকে পারে। অন্ধকারে, নিজের ছায়া লুকিয়ে।

তবে কেউ এখন আর অন্ধকারকে ভয় পায় না। তাদের ভয় দিনের আলো। আরো নির্দিষ্ট করে বললে, মানুষকে।
মানুষই সবচেয়ে ভয়ংকর প্রাণী। গত কয়মাসে তোফাজ্জল হোসেন এটা ভালো করে জেনেছেন।

তোফাজ্জল হোসেন অন্ধকারে একবার আকাশের দিকে তাকান। বিশাল খোলা আকাশ জায়নামাজের মতো বুক পেতে শুয়ে আছে। যেন মায়ের মমতা বাড়িয়ে অভয় দিচ্ছে। কিন্তু এই আকাশের নিচে কোনো অভয়বাণী নেই। আজ কোথাও ঠাঁয় নেই। একটা দীর্ঘশ্বাস তার গলার কাছে এসে আটকে যায়।

পিপুলবাড়িয়া থেকে হেঁটে এসেছেন। জীবনে এতোটা রাস্তা পায়ে হাঁটেননি কখনো। ক্লান্ত, নুয়ে পড়া শরীর। মনও। পুরোনো ভাঙ্গা, ছাল ওঠে যাওয়া দালানের মেঝেতে বসে পড়লেন তিনি। ক্লান্তি তাকে বসে থাকতে দিলো না। শুয়ে পড়লেন। মেঝে থেকে একটা বিশ্রী গন্ধ আসছে। ইঁদুরের বিষ্ঠার। ওয়াক করে বমি ওঠে এলো। অনেক কষ্টে বমি দমন করলেন। মনে পড়লো, বাড়ির নরম বিছানার কথা। রাবেয়া কত সুন্দর করে প্রতিরাতেই বিছানাটা গুছিয়ে রাখতো। কোথাও একটু ভাঁজও থাকতো না। অনেকটা রাবেয়ার টান টান ঋজু শরীরের মতো।

এই দুর্যোগের রাতে রাবেয়ার শরীরের কথা মনে হওয়ায় তোফাজ্জ্বলের আক্ষেপটা আরো একটু বাড়লো। কতদিন রাবেয়ারা তার কাছে নেই। শহরে জন্তুরা আসছে শুনে বাসার সবাইকে গ্রামের বাড়ি পাঠিয়ে দেন। রাবেয়া অবশ্য একলা যেতে চায়নি। তাকে সাথে যেতে বলে। কিন্তু তিনি যাননি। তিনি গেলে বাড়ির মালসামান কে পাহারা দিবে। এই ভেবে থেকে যান। খলিফাপট্টি পুড়ে গেলে বুঝলেন, সে আশা গুড়ে বালি। তখন সোনাদানা যা ছিল সব পলিথিনে করে বাড়ির পেছনে, মাটির নিচে পুতে রাখলেন। তার ওপর একটা চারা বুনে দিলেন।

তবে সব গয়না মাটিতে পুতে রাখলেন না। কিছু রেখে দেন কাছে। যেগুলো বিয়ের সময় রাবেয়ার মার বাড়ি থেকে পেয়েছিল, সেগুলো কাছে রাখেন। ভেবেছিলেন, গ্রামের বাড়ি গিয়ে রাবেয়ার হাতে দিবেন। রাবেয়ার জিনিস, তাকে বুঝিয়ে দেয়াটাই ভালোÔ। যদিও তিনি জানেন না, ততদিনে রাবেয়ারা গ্রামের বাড়ি ছেড়ে সীমান্তমুখী রাস্তায় গেছে। শহরের একমাত্র সরকারি কলেজে জন্তুরা ক্যাম্প করলে সেগুলো ব্যাগে নিয়ে তিনি পথে নামেন।

একরাতে নৌকায় করে হুরাসাগর পার হচ্ছেন। দূর থেকে হঠাৎ গানবোটের শব্দ শোনা যায়। শব্দটা আরো কাছে এলে, ব্যাগটা পানিতে ফেলে দিলেন। সোনাদানা সব ডুবে গেল। তোফাজ্জ্বল হোসেন ভেবে শান্তি পেলেন, নদীই খাক রাবেয়ার সম্পদ। বাংলাদেশের নদী। তবুও জন্তুদের হাতে তা না পড়–ক।

গানবোটটা আর একটু এগিয়ে এসে আরেক দিকে চলে গেল।

ভাঙ্গা দালানে শুয়ে তার ব্যাগটার জন্য দুঃখ আরো একবার উথলে উঠলো। ব্যাগে করে তাদের বিয়ের কয়েকটা স্মৃতি গেল নদীর জলে।

একটা পিঁপড়া কুটুস করে তার পিঠে কামড় দিলো। দুঃসময়ে পিঁপড়ারাও জ্বালাতন করছে দেখে মেজাজ আর ঠিক রাখতে পারলেন না। যারা দেশের এমন অবস্থা তৈরি করেছে, তাদের ওপর একবার ক্ষেপে গেলেন। তবে সেটা মনে মনে। আশেপাশে অনেক লোক আছে, তাই জোরে কিছু বলতে পারলেন না। কিন্তু ইচ্ছে করছিল, জোরে জোরে তার এই দুরবস্থার জন্য সবাইকে গালাগাল করতে।

তোফাজ্জ্বল হোসেন ছাপোষা মানুষ। কারো সাত-পাঁচেও ছিলেন না। শহরে, সওদাগরি অফিসে চাকরি নিয়ে ভালোই দিন কাটছিল। একাত্তর তার শান্তিতে থাকার সব আয়োজন শেষ করে দেয়। কাজেই তিনি তো একটু ক্ষেপে যেতেই পারেন। তবে ক্ষেপে গালাগাল যা করছিলেন সব মনে মনেই। তাই জন্তুরা কাছের স্কুলে থাকলেও শুনতে পেলো না তা। কিন্তু ক্ষেপে গিয়ে একটা কাণ্ড ঘটালেন তিনি। হঠাৎ পকেট থেকে সিগারেট বের করে ধরান। ফস্ করে কুণ্ডলী পাকিয়ে একটা আলোর শিখা ওপরের দিকে ওঠে। তাতে অনেকগুলো ভয়ার্ত মানুষের মুখ এক পলকের জন্য দেখা যায়। আর সেই ভয়ার্ত মানুষদের লক্ষ্য করে তখনই রাইফেলের গুলি ছুটে আসে। তার ভাগ্য ভালো সেটা লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। তবে জন্তুরা শিকার চিনে ফেলে। তোফাজ্জল হোসেন পুকুরে ঝাঁপ দেন। কচুরিপানার মাঝে নাক ভাসিয়ে যে কতক্ষণ ভেসে ছিলেন, সেটা তিনি নিজেও জানেন না! তারপর থেকে তিনি আর সিগারেট খান না।

অন্ধকার রাত। সবাই বিড়ালের পায়ে হেঁটে যাচ্ছে। দলবেঁধে। দলে কতজন লোক তা কেউ বলতে পারবে না। কেউ কাউকে চেনেও না। অন্তত, আগে থেকে চিনতো না। এখন চেনে। সবার একটাই পরিচয় এখন। তাড়া খাওয়া মানুষ।

সবাই পালাচ্ছে। যে যে দিকে পারে। অন্ধকারে, নিজের ছায়া লুকিয়ে।

তবে কেউ এখন আর অন্ধকারকে ভয় পায় না। তাদের ভয় দিনের আলো। আরো নির্দিষ্ট করে বললে, মানুষকে।
মানুষই সবচেয়ে ভয়ংকর প্রাণী। গত কয়মাসে তোফাজ্জল হোসেন এটা ভালো করে জেনেছেন।

তোফাজ্জল হোসেন অন্ধকারে একবার আকাশের দিকে তাকান। বিশাল খোলা আকাশ জায়নামাজের মতো বুক পেতে শুয়ে আছে। যেন মায়ের মমতা বাড়িয়ে অভয় দিচ্ছে। কিন্তু এই আকাশের নিচে কোনো অভয়বাণী নেই। আজ কোথাও ঠাঁয় নেই। একটা দীর্ঘশ্বাস তার গলার কাছে এসে আটকে যায়।

পিপুলবাড়িয়া থেকে হেঁটে এসেছেন। জীবনে এতোটা রাস্তা পায়ে হাঁটেননি কখনো। ক্লান্ত, নুয়ে পড়া শরীর। মনও। পুরোনো ভাঙ্গা, ছাল ওঠে যাওয়া দালানের মেঝেতে বসে পড়লেন তিনি। ক্লান্তি তাকে বসে থাকতে দিলো না। শুয়ে পড়লেন। মেঝে থেকে একটা বিশ্রী গন্ধ আসছে। ইঁদুরের বিষ্ঠার। ওয়াক করে বমি ওঠে এলো। অনেক কষ্টে বমি দমন করলেন। মনে পড়লো, বাড়ির নরম বিছানার কথা। রাবেয়া কত সুন্দর করে প্রতিরাতেই বিছানাটা গুছিয়ে রাখতো। কোথাও একটু ভাঁজও থাকতো না। অনেকটা রাবেয়ার টান টান ঋজু শরীরের মতো।

এই দুর্যোগের রাতে রাবেয়ার শরীরের কথা মনে হওয়ায় তোফাজ্জ্বলের আক্ষেপটা আরো একটু বাড়লো। কতদিন রাবেয়ারা তার কাছে নেই। শহরে জন্তুরা আসছে শুনে বাসার সবাইকে গ্রামের বাড়ি পাঠিয়ে দেন। রাবেয়া অবশ্য একলা যেতে চায়নি। তাকে সাথে যেতে বলে। কিন্তু তিনি যাননি। তিনি গেলে বাড়ির মালসামান কে পাহারা দিবে। এই ভেবে থেকে যান। খলিফাপট্টি পুড়ে গেলে বুঝলেন, সে আশা গুড়ে বালি। তখন সোনাদানা যা ছিল সব পলিথিনে করে বাড়ির পেছনে, মাটির নিচে পুতে রাখলেন। তার ওপর একটা চারা বুনে দিলেন।

তবে সব গয়না মাটিতে পুতে রাখলেন না। কিছু রেখে দেন কাছে। যেগুলো বিয়ের সময় রাবেয়ার মার বাড়ি থেকে পেয়েছিল, সেগুলো কাছে রাখেন। ভেবেছিলেন, গ্রামের বাড়ি গিয়ে রাবেয়ার হাতে দিবেন। রাবেয়ার জিনিস, তাকে বুঝিয়ে দেয়াটাই ভালোÔ। যদিও তিনি জানেন না, ততদিনে রাবেয়ারা গ্রামের বাড়ি ছেড়ে সীমান্তমুখী রাস্তায় গেছে। শহরের একমাত্র সরকারি কলেজে জন্তুরা ক্যাম্প করলে সেগুলো ব্যাগে নিয়ে তিনি পথে নামেন।

একরাতে নৌকায় করে হুরাসাগর পার হচ্ছেন। দূর থেকে হঠাৎ গানবোটের শব্দ শোনা যায়। শব্দটা আরো কাছে এলে, ব্যাগটা পানিতে ফেলে দিলেন। সোনাদানা সব ডুবে গেল। তোফাজ্জ্বল হোসেন ভেবে শান্তি পেলেন, নদীই খাক রাবেয়ার সম্পদ। বাংলাদেশের নদী। তবুও জন্তুদের হাতে তা না পড়–ক।

গানবোটটা আর একটু এগিয়ে এসে আরেক দিকে চলে গেল।

ভাঙ্গা দালানে শুয়ে তার ব্যাগটার জন্য দুঃখ আরো একবার উথলে উঠলো। ব্যাগে করে তাদের বিয়ের কয়েকটা স্মৃতি গেল নদীর জলে।

একটা পিঁপড়া কুটুস করে তার পিঠে কামড় দিলো। দুঃসময়ে পিঁপড়ারাও জ্বালাতন করছে দেখে মেজাজ আর ঠিক রাখতে পারলেন না। যারা দেশের এমন অবস্থা তৈরি করেছে, তাদের ওপর একবার ক্ষেপে গেলেন। তবে সেটা মনে মনে। আশেপাশে অনেক লোক আছে, তাই জোরে কিছু বলতে পারলেন না। কিন্তু ইচ্ছে করছিল, জোরে জোরে তার এই দুরবস্থার জন্য সবাইকে গালাগাল করতে।

তোফাজ্জ্বল হোসেন ছাপোষা মানুষ। কারো সাত-পাঁচেও ছিলেন না। শহরে, সওদাগরি অফিসে চাকরি নিয়ে ভালোই দিন কাটছিল। একাত্তর তার শান্তিতে থাকার সব আয়োজন শেষ করে দেয়। কাজেই তিনি তো একটু ক্ষেপে যেতেই পারেন। তবে ক্ষেপে গালাগাল যা করছিলেন সব মনে মনেই। তাই জন্তুরা কাছের স্কুলে থাকলেও শুনতে পেলো না তা। কিন্তু ক্ষেপে গিয়ে একটা কাণ্ড ঘটালেন তিনি। হঠাৎ পকেট থেকে সিগারেট বের করে ধরান। ফস্ করে কুণ্ডলী পাকিয়ে একটা আলোর শিখা ওপরের দিকে ওঠে। তাতে অনেকগুলো ভয়ার্ত মানুষের মুখ এক পলকের জন্য দেখা যায়। আর সেই ভয়ার্ত মানুষদের লক্ষ্য করে তখনই রাইফেলের গুলি ছুটে আসে। তার ভাগ্য ভালো সেটা লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। তবে জন্তুরা শিকার চিনে ফেলে। তোফাজ্জল হোসেন পুকুরে ঝাঁপ দেন। কচুরিপানার মাঝে নাক ভাসিয়ে যে কতক্ষণ ভেসে ছিলেন, সেটা তিনি নিজেও জানেন না! তারপর থেকে তিনি আর সিগারেট খান না।

পোস্টটি ৭ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

রাসেল আশরাফ's picture


গল্পের প্লট খুব চেনাজানা কিন্তু ভালো লেগেছে।আর গল্পটা দুইবার এসেছে। একটা ডিলিট করে দিন।

পান্থ রহমান রেজা's picture


ওকে!

মীর's picture


গল্পটা খুব ভালো লাগলো।

নজরুল ইসলাম's picture


পান্থকে স্বাগতম
গল্পটা ভালো লাগছে
দুইবার পেস্ট হইছে। একটা মুছে ফেলেন

জ্যোতি's picture


ভালো লাগলো গল্পটা।

সাহাদাত উদরাজী's picture


সুন্দর, ভাল হয়েছে।

আসিফ's picture


দারুন গল্প।

শেষ থেকে দ্বিতীয় লাইনে তোফাজ্জল সাহেব পুকুরের বদলে নদীতে ঝাঁপ দিলে ভালো করতেন মনে হয়! Thinking

অ.ট. - অটো লগআউট হয়ে যাচ্ছি কেন বুঝতে পারছি না। মন্তব্য প্রকাশের পর দেখতে পাই আমি লগড আউট!!

তানবীরা's picture


পান্থরে ওয়েলকু জানাইলামরে। Love

পান্থ আমি তোর এর থেকে অনেক বেশি মারকুটে গল্প পড়েছি Big smile

মুক্ত বয়ান's picture


টান টান গল্প।
এবিতে স্বাগতম। Smile

১০

রাফি's picture


হেভি লাগলো। চালায়া যান.....

১১

মামুন হক's picture


প্রিয় গল্পকার পান্থকে সুস্বাগতম Smile

১২

পান্থ রহমান রেজা's picture


সবাইকে ধন্যবাদ ব্লগরব্লগর পাঠ এবং স্বাগতম জানানোর জন্য। এখন এমনিতে ব্লগ লেখালিখির তেমন সময় হয় না। তারপরেও এ ব্লগে রেজিঃ একমাত্র উদ্দেশ্য, অনেক পরিচিত ব্লগবন্ধুরা এখানে লেখেন, নানাভাবে তাদের লেখার লিংক পাই, পড়ি, মন্তব্য দিই, কিন্তু তা মডারেশনে যায়, সাথে সাথে প্রকাশ পায় না, মডারেশন পেরিয়ে মন্তব্যটি প্রকাশ পেলেও জানা হয় না, দেখা হয় না চক্ষু মেলিয়া। রিয়েল টাইম মন্তব্য দেখতে, মাঝে মধ্যে (মনে চাইলে) একটু-আধটু ব্লগরব্লগর টাইপ ব্লগ লিখতেই এখানে আসা!

১৩

আহমেদ কায়সার নাসির's picture


ভালোলাগলো...

১৪

মেঘ's picture


এইটা আমাদের পান্থ না কি!!!
দারুণ ব্যাপার দেখি।

১৫

জুয়েইরিযাহ মউ's picture


ভালো লাগলো গপ্পোটি Smile

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

পান্থ রহমান রেজা's picture

নিজের সম্পর্কে

নিজের সম্পর্কে বলবার কিছু নাই। কারণ আজ আমি যা, কাল সেটা নাও থাকতে পারি!

সাম্প্রতিক মন্তব্য

pantha rahman reza'র সাম্প্রতিক লেখা