তুর্কের ঈদ!
হাত যতই চালাই সেই কাজ শেষ হতে হতে রাত ১১-১২টাই বেজে যায়। চাইলেও আগে ফিরতে পারিনা বাসায়।
ল্যাবের দুটা মাত্র পিসিআর মেশিন, ১২ জন মিলে তাই একের পর এক বুকিং দিয়ে কাজ চালায়। তার উপর আমি এই কোরিয়ান ল্যাবে নতুন। যদিও ছয়মাস হয়ে গেছে এসেছি এখানে, কিন্তু নতুনের তকমা এখনও সেঁটে আছে মাথায়।
আমি নতুন থাকলে অনেকেরই সুবিধা। কারন প্রতি সকালে ল্যাব ক্লিন করবে নতুন স্টুডেন্টরা, ল্যাবের বিভিন্ন মেশিনের ব্যবহারে নতুনদের নাম পরে আসবে। তাই আমি নতুন থাকলে কেউ না কেউ সুবিধা পাবেই। সেই সুযোগটাই বা কে ছাড়তে চায়! ফলাফল, সবার কাজ শেষ হলে আমি ল্যাবের মেশিন গুলো ব্যবহারে সুযোগ পাই। তাই কাজ শেষ করতে করতে সেই ১১টা-১২টা রাত অব্দি ল্যাবে থাকতেই হয়। সুপারভাইজারের দেয়া কাজ তো কম না, শেষও করতে হবে।
আমি এমনিতে অন্তর্মুখি মানুষ, মাঝে মাঝে কেচোর চেয়েও নিরীহ বনে যাই। সুবিধা, বেশি কিছু নিয়ে মাথা ঘামাতে হয় না। তাই সুপারভাইজারও সুযোগ নেয়, সবাইই নেয় কম বেশি। এখানে এসেছিলাম ৯০০ ডলার স্কলারশিপ পাবো আর টিউশন ফি ফ্রি জেনে। আসার ৩য় দিনে আমার নরম সরম ব্যাক্তিত্ব দেখে সুপারভাইজার বলে বসলো টিউশন ফি ফ্রি না, ওটা যেনো আমার ৯০০ ডলার থেকেই দেই। প্রথমে মনে হয়েছিলো প্রতিবাদ করি, পরে ভাবলাম, সুপারভাইজার হয়তো না পারতেই বলেছে। তাই মেনে নিয়েছি। আমার এমন মেনে নেয়ার অভ্যেস অবশ্য বেশ পুরোনো, আর ল্যাবে সেই শুরু। এখন পর্যন্ত মেনে নিয়েই চলছি।
এত নরম হলে যে চলে না সেটা আমিও বুঝি। কিন্তু কি করবো! শক্ত হতে পারি না যে। সেদিন আমাকে রাশিনায় ল্যাবমেট বলে বসলো "তুর্ক"। গুগলিং করে পেলাম "তুর্ক" মানে মুর্খ! তবুও কিছু বলতে ইচ্ছে হয় নি। আমার কয়েক বছরের সিনিয়র সে, আর আমি হয়তো কাজই তেমন কিছু করেছি, তাই বলেছে।
রোজার মাস যখন শুরু হলো তখন আমার "ফাস্টিং" করার কথা শুনে সবার চোখ কপালে! সুপারভাইজার সবার আগে খেপলো, কারন ফাস্টিং করলে যদি কাজ ঠিকমত করতে না পারি!! আমি মদ খাই না, পর্ক খাইনা, আবার আবালের মত ফাস্টিং করি, তাতে আমি একটা দর্শনযোগ্য বস্তুতে পরিনত হলাম। যেখানে এখানে সবার মুখ সারাক্ষন চলছে, একবার খাচ্ছে, একবার দাত ব্রাশ করছে, সেখানে আমার সকাল সন্ধ্যা কিছু না খেয়ে দিব্যি কাজ চালিয়ে যাওয়া একটা বলার মত বিষয় হলো বৈকি। তবে সেটা প্রশংসার মত করে নয়। তুর্ক টাইপের। সুপারভাইজার অবশ্য পরে খুশি, কারন লান্চ করতে সময় নষ্ট হয় না আমার, একলাগা কাজ করতে পারি!
সেই রোজাও শেষ হয়ে এলো। কাল নাকি ঈদ। কিছুই কেনা হয়নি। সারা সপ্তাহ সুপারভাইজারের দেয়া কাজের চাপে মাথা তুলতে পারি না, বাসায় ফিরি ১১-১২টায়। কখন কিনবো? তারউপর এইবারই দেশের বাইরে প্রথম ঈদ। রান্নার চিন্তা তো নয়ই, কি কিনবো কি পড়বো সেগুলোও মাথায় আসেনা। মা বারবার জিজ্ঞেস করে সেমাই কিনেছি কিনা, কিভাবে রাধবো, রাধতে জানি কিনা। কি বলবো মা'কে? কি ভাবে বলি মা, রাধতে জানি আর না জানি, তোমার হাতের সেমাই তো আর পাবো না!! বলতে পারিনা, বলার আগেই কন্ঠস্বর রুদ্ধ হয়ে আসে, চোখে ভিজে যায়। টেলিফোনের ঐপাশেও এমনি কিছু হচ্ছে জানি, সেটা আর বাড়াতে চাই না।
ঈদ কি করবো এই বিদেশ বিভুয়ে একা একা? তবুও মা'কে খুশি করার জন্য হলেও বাসার দিকে না গিয়ে ২৪ ঘন্টা খোলা মার্কেট গুলোর দিকে এগিয়ে যাই, কিছু একটা কিনবো, হোক সেই সেমাইের মত দেখতে নুডলস, হোক কোন কাপড়। মা'কে তো মিথ্যে বলতে পারবো না।
কাল সকালে দেখা যাবে খন, ইমেইলে জানিয়ে দেবো সুপারভাইজারকে, "আমি আজ আসছি না।"





বিদেশ বিভুয়ে একা একা ঈদ
মন খারাপ করে না থেকে আসেন আমরা কোলাকুলি করি
ঈদ মুবারক
ঈদ মোবারক।
এখন তো পুরা সংসার নিয়া মহা আরামেই ঈদ করতেছেন ।
ঈদ মোবারক।
এই একটা মাস প্রতিদিন আধাঘন্টা বয়ান দিতে হয়ছে ল্যাবে।কেন রোজা রাখছি।আজ সন্ধ্যায় ডিনার ছিল প্রফেসরের নতুন ছাত্র আসা উপলক্ষ্যে সেখানেও কিছুক্ষন প্রফেসররে বুঝাতে হলো কেন মদ খাই না।শেষমেশ উনি বললো তোমাদের দেশের অনেক ছাত্রতো দেখি আমাদের চাইতো বেশী মদ খেতে পারে তখন আর কি বলবো.।.।কিছুক্ষন তো তো করে থেকে গেলাম।

ভাল থাকুন। আশা করি ঈদটা ভালই যাবে
তুর্কের ঈদ কিরাম হইছিলো সেটা জানলাম। অখন ফুর্ক(বুদ্ধিমান..বানাইলাম আর কি
) এর ঈদ কিরাম হলু সেইটা নিয়া নতুন লেখা চাই-ই চাই
এই লেখা সেই বিখ্যাত কোরিয়ান সিরিজের না গো ভাইডি? পড়ি নাই এটা আগে। আছেন কিরাম? কেমুন ঈদ করলেন? ঈদের শুভেচ্ছা জানবেন 
গতকাল রাতে জুমানা আর তার বাপরে স্বপ্নে দেখলাম। কী আশ্চর্য!!!
বাতিঘরের মত ফুর্কের ঈদের বর্ণনা শুনতে চাই।
@অমি, ভাইজান এইটা আসলে আমার গল্প না। আমার অবস্থা এর চেয়ে ভালো ছিলো, এত্ত নিরীহ ছিলাম না কোরিয়ায়। থ্যান্কি পড়ার জন্য।
@ভাংগাপেন্সিল, ঈদ মোবারক। দুঃখের কিছু নাইরে ভাই। সিচুয়েশন এখন অনেক ভালো কোরিয়ায়।
@সাঈদ ভাই, ভালো মানে কঠিন ভালো। খাইতে খাইতে জান শেষ।
@নীল ঘূর্ণি, ঈদ মোবারক।
@রাসেল, এই গল্পটা সত্যি অনেকের জন্য। বলতে পারো টুকরো টুকরো করে অনেকের সাথেই মিলবে যারা প্রথম দিকে কোরিয়ায় গিয়েছিলো লেখাপড়ার জন্য। ধরো ২০০৩-২০০৬ পর্যন্ত। তখন সিচুয়েশন আসলেও খারাপ ছিলো। আমি যখন ছিলাম তখন তো অবস্থা অনেক ভালো, বাংলা কম্যুনিটি আছে, মোটামুটি ফেস্টিভাল ভাব আনা যায় ঈদের। কিন্তু প্রথম দিকে না ছিলো কম্যুনিটি সাপোর্ট, তার উপর নেতিবাচক মনমানসিকতার কোরিয়ান ল্যাব মেট আর সুপারভাইজাররা। কত লোকের কষ্টের কাহিনী শুনেছি। বলতে পারো এটা অনেকের কমন কাহিনি।
@নিবিড়, থ্যান্ক্যু।
@বাতিঘর, ফুর্কের কাহিনী খাইতে খাইতে মোটা হওয়ার। (আপনের খবর আছে।)
@হাসান ভাই, কন কি? কি দেখলেন স্বপ্নে?
তুর্ক মানে অশিক্ষিত!!! খাইসে
শেষ লাইনেই বোঝা যায় গল্পকারের হাত। আরও আসুক।
) শুভেচ্ছা, কন্যাকে আদর।
=============================
এতো অনিয়মিত কেন রাফিভাই?
কন্যার বাপমাকে ঈদের (৬ষ্ঠ দিনের
ঈদ মুবারাক রাফি। ঈদ কেমন হলো জানাবেন।
আর টিউশন ফী কাটার ব্যাপারটা মেনে নিয়ে ঠিক করেন নি। আপনার সুপারভাইজার এই অন্যায় চেষ্টাটা আবারো করবে অন্যকোন তৃতীয় বিশ্বের নাগরিকের সাথে। গরীবকে ঠকাতে সবাই দাড়িয়ে থাকে।
মন্তব্য করুন