ইউজার লগইন

সম্পর্ক

সম্পর্কগুলো ব্যক্তিগত না কি সামাজিক না কি প্রাতিষ্ঠানিক প্রশ্নটার মীমাংসা হওয়া জরুরী। কয়েক দিন আগে দেখলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপকের স্ত্রী সাংবাদিক সম্মেলন ডেকে অভিযোগ করলেন তার স্বামীতারই ডিপার্টমেন্টের এক ছাত্রীর সাথে প্রেম করছে? ২২ বছরের দাম্পত্যজীবন- ২ কিংবা ততোধিক সন্তানের জন্মের পর একজন যদি নতুন সম্পর্কে জড়িয়ে যায় বিষয়টা পারিবারিক পরিমন্ডোলে থেকে পাবলিক স্ফীয়ারে এমন ঘটা করে উথাপনের প্রয়োজন কি? বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে তার দায়িত্ব কি নিজের আবেগ অনুভুতিকে ধামাচাপা দিয়ে জীবনযাপন করা? বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক জুনিয়র শিক্ষকই তো তাদের ছাত্রীর সাথে প্রেম করে বিয়ে করেছেন-

প্রশ্ন অবশ্য নৈতিকতারও, একটি স্ত্রী বর্তমান থাকতে অন্য কারো সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়াটা অনুচিত- ক্ষেত্রবিশেষে অনৈতিক, কিন্তু সেটা সম্পর্কের সাথে জড়িত ব্যক্তিগনের বিষয়- সেটা সংবাদ সম্মেলন করে জনতার রায় নেওয়ার বিষয় না।
গতকাল সিন্ডিকেটের সভা ডেকে ছাত্রীর সাথে বিবাহবহির্ভুত সম্পর্ক রাখবার দায়ে একজন শিক্ষককে চাকুরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে। সিন্ডিকেতে নিন্দা প্রস্তাব উত্থাপিত হয়েছে- কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিমালায় কোথাও কি স্পষ্ট লেখা আছে ছাত্রীর সাথে প্রেম করা বিষেধ? পারিবারিক পরিমন্ডলে মীমাংসা নাওয়া ইস্যুগুলো সংবাদ সম্মেলনে- এইভাই- অমুক তমুককে দেকে নিস্পত্তি করা কিংবা এমন প্রাতিষ্ঠানিক ভাবে নিরুৎসাহিত করার সামাজিক গ্রহনযোগ্যতা বাঞ্ছনীয় কি না সেটা একটা প্রশ্ন

বিবাহবহির্ভুত সম্পর্কের ক্ষেত্রে আমাদের অতীত ইতিহাস কি রকম? ইশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বিধবাবিবাহ আন্দোলন করেছিলেন, বিধবাদের জীবনের প্রতি সহানুভুতি থেকে তিনি এ আন্দোলন করেন নি বরং বিধবারা পারিবারিক বেশ্যায় পরিণত হওয়ায় তিনি সমাজ সংস্কারক হিসেবে এ উদ্যোগ নিয়েছিলেন, সে সময় বিধবাদের নিরামিষ জীবনকে আমিষময় করে তুলতে পরিবারের সদস্য এবং মহল্লার যুবা-বৃদ্ধদের আগ্রহ ছিলো অত্যাধিক, তারা নিয়মিতই এইসব বিধবাদের গর্ভবতী করে ফেলতো, ফলাফল গর্ভপাত এবং মৃত্যু-

মুসলমান সমাজ যে এইসব কান্ড-অকান্ডে পিছিয়ে ছিল এমনও না, তারাও স্ত্রীকে ফেলে শ্বাশুরী নিয়ে ফেরার হয়েছে- বিচিত্র ধরণের পারিবারিক সংকট তৈরি করেছে, এমন কি গত বছর জাতীয় স্বাস্থ্যসংস্থা তাদের প্রতিবেদনে বলেছে দেশের ৫০ থেকে ৮০% বিবাহিত মানুষ বিবাহবহির্ভুত সম্পর্কে জড়িত, মানসিক সমস্যাক্রান্ত অধিকাংশ নারী-পুরুষই মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিতে এসেছেন পারিবারিক পরকীয়ার প্রতিক্রিয়ায়-

এমন অবাধ বিস্তার- বিবাহবহির্ভুত সম্পর্কের হাতছানি কিংবা বিভিন্ন ধরণের নারী-পুরুষের প্রেমে আসক্ত হওয়ার যে সামাজিক প্রবনতা বাংলাদেশে বিদ্যমান সেটাকে মেনে না নিয়ে সামাজিক-প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে সেটাকে নিরুৎসাহিত করার উদ্যোগ একটা পর্যায়ে ব্যর্থ হবে। সময় থাকতেই মেনে নিতে হবে সম্পর্কগুলো ব্যক্তিগত- ব্যক্তি নিজ উদ্যোগে সম্পর্ক তৈরি করে- সম্পর্কে জড়িত হয়, সম্পর্ক স্থগিত করে- একজনের মানসিক চাহিদা পুরণ না হওয়ার বিষয়গুলো প্রতিষ্ঠানের নিয়ম মেনে চলে না। সেসব বিষয়কে ব্যক্তিগত রুচির কাছেই সমর্পন করা শ্রেয় এবং রুচিসম্মত-
এই সিন্ডিকেটের সভা ডেকে বরখাস্ত করা, সংবাদপত্রে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে পরকীয়ার ব্রেকিং নিউজ দেওয়ার মানে হয় না। পরিস্থিতিএমনিতেই জঘন্য- দেশের এত এত রিসোর্টের ঘর দখল করে সপ্তাহান্তে যারা যাচ্ছে তাদের কতজন দম্পতি? রিসোর্টের ঘরের দরজায় কাবিন নামা ঝুলিয়ে কেউ প্রেম করছে না।
কর্পোরেটাইজেশনের যুগে যৌনসম্পর্ক ব্যবহার করে বিধিবহির্ভুত সুযোগ নেওয়ার অভিযোগ যেমন উত্থাপিত হচ্ছে তেমনভাবেই যৌনস্বাধীনতার অপব্যবহারের অভিযোগও উঠছে। সেসব অভিযোগের কতটুকু গসিপ আর সত্যতা কতটুকু যাচাই করার সুযোগ সীমিত সুতরাং স্পষ্ট মন্তব্য করা যাচ্ছে না।

সম্পর্ক প্রতিনিয়ত চর্চা এবং পরিচর্যার বিষয়, পরিস্থিতি অনুযায়ী সম্পর্ক পরিবর্তিত হয় এবং সম্পর্ক ক্ষেত্রবিশেষে অপ্রয়োজনীয় হয়ে উঠে। ভালোবাসা কিংবা বিবাহ কোনো একরৈখিক দাসখত লিখে দিয়ে আজীবন একত্রবাসের সনদ না, সেটা প্রয়োজন কিংবা চাহিদা পুরণ করতে ব্যর্থ হলে মানুষ আলাদা পথ খুঁজে নেয়।

সমস্যা এই সামাজিক খবরদারিত্বের, যেখানে অপ্রয়োজনীয় , চাহিদাপুরণে নিতান্তই ব্যর্থ সম্পর্কগুলোকে চর্চার বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অনেক সময়ই এইসব সম্পর্কছেদ অমানবিক পরিস্থিতি তৈরি করে, অনাকাঙ্খিত শোরগোল তৈরি করে, আমরা সুস্থ সম্পর্ক চর্চায় অভ্যস্ত না, ক্ষেত্রবিশেষে আমাদের আচরণ অনেকটাই বর্বর।

জোর করে আঁকড়ে ধরে থাকাটা সব সময় প্রেমের প্রকাশ এমন না, কখনও কখনও জোর করে আঁকড়ে ধরে থাকতে চাওয়াটা এক ধরণের পাবলিক ন্যুইসেন্সও বিবেচিত হতে পারে বিশেষত এমন পরিস্থিতিতে যেখানে যাকে আঁকড়ে ধরা হয়েছে সে বিষয়টাকে গ্রহনযোগ্য মনে করছে না।

আমরা সম্পর্ক চর্চায় আন্তরিক হয়ে উঠি, আরও সভ্য আচরণ করতে শিখি, সম্পর্ক যে অপ্রয়োজনীয় উৎপাত হতে পারে কোনো কোনো সময় সেটাকে মেনে নিতে শিখি, আর সম্পর্ক অপরাপর নিত্যনৈমিত্যিক চাহিদার মতো ব্যক্তিগত চাহিদা, ব্যক্তিগত চাহিদা-প্রয়োজনীয়তার ভিত্তিতে সেসব নির্মিত হোক কিংবা শান্তিপূর্ণ অবসান ঘটুক।

পোস্টটি ১৬ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

স্বপ্নের ফেরীওয়ালা's picture


সম্পর্ক মনে হয় ব্যক্তিগত একটা জিনিষ যা সামাজিকতার মোড়কে প্রাতিষ্ঠানিক বন্ধনে আবদ্ধ।

জোর করে আঁকড়ে ধরে থাকতে চাওয়াটা মূলতঃ এশিয়ান কালচারেই আছে, সেটার সাথে আবার সামাজিক সম্মান আর আর্থিক নিরাপত্তা জড়িত।

~

সাবেকা's picture


কোন লাইন কোট করছিনা কারণ সম্পূর্ণ লেখাটার সাথেই সহমত ।

কাঁকন's picture


আমার নিজের মনে হয় একটা সম্পর্ক শেষ করে আরেকটা সম্পর্কে জরানো উচিৎ একই সাথে দুটো সম্পর্ক চালিয়ে যাওয়াটা অনৈতিক।।।

আমাদের দেশে বিয়ের পুরো প্রক্রিয়াটাই কিন্তু খুব বেশি ব্যাক্তিগত না (মানে দুজন মানুষ পারস্পরিক বোঝাপরার ভিত্তিতে বা ভালোবেসে একসাথে পথচলার সিদ্ধান্ত নেয় না বরং দুজন অপরিচিত মানুষ পারিবারিক সিদ্ধান্তে এক সাথে থাকে এবং মানিয়ে নেয় ভালোবেসে বা অভ্যাসে বা দায়ে পরে; এই সম্পর্কগুলোতে তাই বোধয় অধিকার বোধটাই অগ্রাধিকার পায় সবচাইতে বেশি)।

মেয়েরা যত বেশি সাবলম্বী হবে (শুধুমাত্র অর্থ উপার্জন ই বোধয় একজন মানুষকে সাবলম্বী করে তোলে না তারপরো এটা বোধয় প্রথম স্টেপ) সম্পর্কের সমীকরণ গুলোও বোধয় বদলে যাবে। একজন সাবলম্বী আত্ম মর্যাদা বোধসম্পন্ন মানুষ বোধয় জোর করে আকরে ধরে রাখার বা একান্ত ব্যাক্তিগত বিষয় দশজনের মুখোরচক আলোচনার বিষয় করে তোলার অসম্মানের মধ্যে দিয়ে যেতে চাইবে না।

সামছা আকিদা জাহান's picture


সব ঠিক আছে কিন্তু এটা উচিত নয় একই সময়ে দুজনের সাথে সম্পর্ক রাখা। একটি সম্পর্ক ভাঙ্গার আগে বা নতুন সম্পর্ক তৈরী করার আগে সামাজিক দিকটিও অবশ্যই চিন্তা করতে হবে।
বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক মেনে নেয়া যায় না। এতে নারী ক্ষতি গ্রস্থ হবে এবং একটি পরিত্যাক্ত শিশুর দূর্বিসহ জীবন্ নাটক উপস্থাপিত হবে। অন্য কাউকে ভাল লাগলে অবশ্যই তার সঙ্গীকে জানাতে হবে এবং পুরান সম্পর্ক ভেঙ্গেই নতুনের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। একসাথে দুইজনের সংগে সম্পর্ক থাকলে সেখানে প্রেম ভালবাসা বলে কিছু থাকে না সেখানে থাকে শুধুই ভোগ এবং লালসা।

জ্যোতি's picture


সম্পর্ক বিষয়টা ভাবলে অনেক সহজ মনে হয় না। তবে বিয়ের পরও কাউকে ভালো লাগতে পারবে না তা তো না। কিন্তু শুধু ভোগ লালসার সম্পর্ক ঘৃণ্য।কাউকে ভালো লাগলেই পুরনো সম্পর্কটা ছেড়ে বেড়িয়ে আসা অথবা সঙ্গীর প্রতি অবহেলা বা নতুন সঙ্গীর সাথে পথচলার সিদ্ধান্ত নেওয়া বোধ হয় ঠিক না। একটা সম্পর্ক এমনি হয়ে যায় না আর এমন যদি হতেই থাকে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিশ্বাস, ভালোবাসা, শ্রদ্ধা কমে যাবে।

মীর's picture


সম্পর্ক সম্পর্কিত লেখা সম্পর্কে মানসিকভাবে নিকটবর্তী সম্পর্ক অনুভব করি। তাই এ লেখাটা ভালো লাগলো, আর রুনা'পুর কমেন্ট।

তানবীরা's picture


ব্যক্তিরা জড়িয়েই সমাজ হয়। সম্পর্কগুলো এর বাইরে থাকবে কি করে?

বিষণ্ণ বাউন্ডুলে's picture


পড়তেছি

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.