ইউজার লগইন

সিলেটে হুদাই

নৈসর্গ , প্রাকৃতিক সৈন্দর্য আমাকে খুব বেশী টানে না, ক্যারিবিয়ানের গাঢ় নীল সমুদ্র টিভিতে দেখে ভালো লাগে, ট্রাভেল চ্যানেলে মাঝে মাঝে কোনো কোনো দ্বীপ দেখে মুগ্ধ হই কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমার মনে হয় স্মৃতি-মানুষ কিংবা ইতিহাসের বাইরে কোনো লোকালয় আমাকে আকর্ষণ করে না।

প্রথমবার কোলকাতায় গিয়ে ভালো লেগেছিলো, এর সাথে আমার অনেক ধরণের স্মৃতি জড়ানো, বইয়ে পড়া মাঠ-রাস্তাঘাট একেবারে জীবন্ত হয়ে উঠেছিলো- তাই অবাঙালী অধ্যুষিত কোলকাতায় বাংলা ভাঙা হিন্দিতে কিংবা ইশারায় কথা বলতে বাধ্য হলেও শহরটাকে ভালো লেগেছিলো। মনে হয়েছিলো স্মৃতির বিস্মৃত কোনো অঞ্চল হঠাৎ জীবন্ত হয়ে উঠেছে। ভ্রমণ সেভাবে ভাবলে আমার কাছে অনেকটাই মানসিক অভিজ্ঞতার সাথে বাস্তবকে মিলিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া।

আমি খুব বেশী ভ্রমণ বিলাসী না, আমার নিজেরঘরের পরিচিত কোণ বেশী পছন্দের, বন্ধুত্বের খাতিরে মাঝে মাঝে এদিক ওদিকে চলে গেলেও আমি মোটামুটি ঘরকুনো। তবে আমার ধারণা ভ্রমণে টিকেট, ব্যাকপ্যাক গোছানোর বাইরেও অনেক ধরণের প্রস্তুতি থাকে, নিছক জনপ্রি ট্যুরিস্ট স্পটগুলো ছুঁয়ে এসে কয়েক গাদা ছবি দিয়ে আমি সেখানে গিয়েছিলাম ভিউকার্ড প্রচারণায় হয়তো দেশ-বিদেশের বিভিন্ন স্থানে উপস্থিত হওয়া যায় কিন্তু সেটা ঠিক ভ্রমন হয়ে উঠে না। এইসব ট্যুরিস্টদের কেউই স্থানীয় সংস্কৃতি সম্পর্কে জানে না, যে কয়েকজন স্থানীয় ব্যক্তির সাথে এদের পরিচয় হয় তারা সবাই কোন না কোনো ভাবে এদের ভ্রমণ সেবার সাথে যুক্ত- এদের কেউ ট্যুরিস্টদের কাছে পানি বেচে, কেউ খাওয়া বেচে আর কেউ বেচে তথ্য , ট্যুরিস্ট ব্যবসার সাথে সংযুক্ত মানুষের বাইরে এইসব ট্যুরিস্টদের তেমন যোগাযোগের সুযোগ হয় না, এরা সবাই দৌড়ে বুড়ি ছুঁয়ে আসে।

আমার মনে হয় ভ্রমণের প্রস্তুতির চেয়ে বড় ভ্রমণের ব্যপ্তিকাল, সেটার প্রস্তুতি নিতে হয় একটা নির্দিষ্ট সময় ধরে, বছরে একবার একটা নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে লোকালয় ভ্রমণে যাওয়াটা প্রকৃত ভ্রমণ। আমার ধারণা আদর্শ ভ্রমণের আগে এই যন্ত্রযুগে অন্তত দুই তিন দিন শুধু শহরের বৈশিষ্ঠ্য-মানচিত্র পাঠ করে, শহরের ঐতিহাসিকতা এবং গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রগুলো জেনে নিয়ে তারপর সেখানে যাওয়া ভালো।

আমি বেশ কয়েকজন বিখ্যাত লেখকের বাসায় গিয়েছি, নিচক ভ্রমনার্থী হিসেবে কিন্তু সত্যি কথা বলতে সেখানে উপস্থিত হয়ে জেনেছি তিনি বিখ্যাত লেখক ছিলেন- তার সাহিত্যকর্মের সাথে আমার কোনো পরিচয় নেই, সেসবের সামাজিক অবদান আমি জানি না, সে মানুষটা লোহার শেকল পায়ে বেধে লিখতো না কি জলন্ত উনুনে কয়লা ঠেসে লিখতো, সে কাঠের চেয়ারে বসতো না কি রান্না ঘরের ছোট টেবিলে লিখতো সেটা জেনে আমি কি করবো? এসব দৃশ্যে আপ্লুত হওয়ার কিছু নেই আমার।

শহরের রাস্তার নাম যাই হোক না কেনো সে রাস্তায় হেঁটে গা চমকে উঠবে না আমার। যদি জানি কোনো পরিচিত মানুষ কোনো একদিন এ রাস্তায় হেঁটেছে এ বাতাসে শ্বাস নিয়েছে, এই গাছের ছায়ায় বসে ভেবেছে তাহলে তার সাথে স্মৃতি বিনিময় হবে, একই সাথে মাঝের সময়ের ব্যবধান ঘুচে গিয়ে সেসব শহর আর শহরতলী জীবন্ত হয়ে উঠবে কল্পনায়, আমিও সে ইতিহাসের অংশ হয়ে যাবো, সেভাবেই শহরের সাথে এক ধরণের সম্পর্ক তৈরি হবে, যদি শহরের সাথে কোনো সম্পর্কই তৈরি না হয় তাহলে সে ভ্রমন অর্থহীন।

গতবার সিলেটে জেবতিক আমার সাথে টেলিফোনে ছিলো এ বছর যাওয়ার আগে যোগাযোগ করলাম হাসান মোরশেদের সাথে। দীর্ঘ সময়ের ব্লগীয় পরিচয়ের পরে সরাসরি দেখাও হয়েছে একবার। বিদেশের পাট চুকিয়ে এখন এখন সিলেটেই থিতু হয়েছে, তার ক্যামেরায় সিলেটের বিভিন্ন এলাকার ছবি দেখি, তাকেই জানালাম সিলেট যাচ্ছি, কি করা যায়?

আমার এক বন্ধু বলেছিলো চুল কাটানো অনেকটা জাহাজ চালানোর মতো, যদি ক্যাপ্টেন ভালো হয় তাহলে চুল কাটাটা সুন্দর হয় আর যদি ক্যাপ্টেন খারাপ হয় তাহলে চুল কাটার অভিজ্ঞতা খুব বেশী সুখকর হয় না। আমি সেব বিবেচনায় তেমন দক্ষ নাবিক না, আমাকে চুল কাটানোর পর চোরের মতো লাগে, তারপরও সিলেট পৌঁছে ক্যাপ্টেন জ্যাক স্প্যারোর মতো আমিও জাহাজ খুঁজতে বের হলাম।
এই রমজানে সিলেে মহাসমারোহে রমজান পালিত হচ্ছে- হাঁটতে হাঁটতে মৌসুমী রেস্টুরেন্টের ব্যানার দেখলাম -এখানে হিন্দু ভাইদের জন্য খাওয়ার বন্দোবস্ত আছে- কোনো না কোনো ধর্মীয় আনতি না থাকলে মানুষকে মানুষ হিসেবে সম্মান দেয় না বাংলাদেশে- আমি কয়েক বছর আগে কোনো এক রোজার দিনে মার্কেটে ঢুকেছি দুপুরে, সাথে আরও দুইজন, সবারই উদ্দেশ্য দুপুরে কিছু একটা খাওয়া।
এস্কিলেটরে দাঁড়িয়ে খাওয়ার গল্প করছি এমন সময় একজন থামালো- এই রোজার মাসে আপনারা খাবেন?
আমি পাল্টা প্রশ্ন করলাম রোজার মাসে কি খাওয়া নিষেধ? কোথাও কি এমন লেখা আছে?

লোকটা বিন্ডুমাত্র দমে না গিয়ে বললো আপনারা কি হিন্দু?
না
বললো আপনারকি বৌদ্ধ?
না
তাহলে আপনার কি?
মানুষ
আমাদের এই উচ্চমার্গীয় আলাপে তার কোনো বোধোদয় হয়েছে এমনটা তার অভিব্যক্তি দেখে মনে হলো না, আমাদের ধর্মীয় পরিচয়বিষয়ক সংশয়ে তার ধারণা আমরা এই রমজানে খেতে চেয়ে বড় কোনো অপরাধ করেছি- শুধুমাত্র মানুষ পরিচয়টা আমাদের জন্য যথেষ্ট না, আমাদের ক্ষুধা-তৃষ্ণাবোধটাও তেমন গুরুত্বপুর্ণ কিছু না।
অনেকগুলো বন্ধ রেস্টুরেন্ট, বোরখা পরা চায়ের দোকান পেরিয়ে বিভিন্ন মানুষের মুখ আর মাথা দেখছি, যদিও ৩৩ আউলিয়া এখানে বসতি গেড়েছেন, তাদের মাজারে ভক্তদের নিয়মিত ভীড়ও আছে কিন্তু স্থানীয় অধিবাসীদের কারোই সন্ন্যাসীদের মতো চুল দাড়িতে জটা নেই, নিয়মিত ছাটা চুল আর কামানো গালের মানুষদের সবাই রিকশা ভাড়া করে চুল কাটাতে যায় এটা অবিশ্বাস্য- কাছে পিঠে কোথাও না কোথাও সেলুনটা থাকবে, শুধু চোখে পরছে না এই যা

অনেক কষ্টে একটা সেলুন পেলাম শাহ পরানের মাজারের গেটে , সম্ভবত একটাই সেলুন, বেশ ভীড়, সেখানে লাইন দিয়ে বসে অন্যের চুল ছাঁটা দেখলাম, দেখলাম ক্ষৌরি, অবশেষে আমারও ডাক আসলো, বসলাম, কিছুক্ষণ এলেমেলো জাহাজ চালিয়ে ফিরেও আসলাম দাম দিয়ে, এই বয়েসে লোকজন আর হাসে না তাই বুঝলাম না কতটা সফল হলো জাহাজ চালানো।

পোস্টটি ১১ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

তানবীরা's picture


আপনার আজকের লেখাটা কেন যেনো মনে হলো ভীষন এলোমেলো। মনটা বিক্ষিপ্ত আছে বোধহয় কিছু নিয়ে নাকি তাড়াহুড়ো?

ছোটবেলা থেকে আমি বাচ্চা ভীষন অপছন্দ করতাম। বিয়ের পর রীতিমতো ভয় খেয়েছি বাচ্চা কি করে পালবো। এখন মেয়ে ছাড়া জীবন ভাবা অসম্ভব। নিজেরটাতো বটেই পরের গুলোরেও অনেক ভাল লাগে

ঘরে বসে কল খুলে পানি দেখলে বৃষ্টিতে ভেজা বা সমুদ্র স্নানের আনন্দ পাওয়া যাবে? লন্ডন প্যারিস নিউইয়র্ক বাঙ্গালী যেমন আছে ছবি দেয়া পাব্লিক। তেমনি সারা বৎসর ধরে গুগল, ট্র্যাভেল সাইট ঘেটে সাইট সিয়িং পাব্লিকও আছে। একবার প্রকৃতির কাছে ধরা পড়লে দেখবেন, নেশা হয়ে যাবে। বাড়িতেই থিতু হতে পারবেন না। মাইন্ড ইট।

সাবেকা's picture


পড়লাম, কিছু বুঝলাম কিছু বুঝলাম না । তানবীরার মত আমারো মনে হচ্ছে বিক্ষিপ্ত মন নিয়ে লেখা ।

মীর's picture


লেখা ভাল্লাগসে। ঢাকা শহরে সেলুন নিয়া সমস্যায় আছি। পারলে এই ব্যপারে একটা পোস্ট দিয়েন।

জ্যোতি's picture


Smile

বিষণ্ণ বাউন্ডুলে's picture


আরও জমবে ভাবসিলাম।

শাশ্বত স্বপন's picture


এস্কিলেটরে দাঁড়িয়ে খাওয়ার গল্প করছি এমন সময় একজন থামালো- এই রোজার মাসে আপনারা খাবেন?
আমি পাল্টা প্রশ্ন করলাম রোজার মাসে কি খাওয়া নিষেধ? কোথাও কি এমন লেখা আছে?

লোকটা বিন্ডুমাত্র দমে না গিয়ে বললো আপনারা কি হিন্দু?
না
বললো আপনারকি বৌদ্ধ?
না
তাহলে আপনার কি?
মানুষ
আমাদের এই উচ্চমার্গীয় আলাপে তার কোনো বোধোদয় হয়েছে এমনটা তার অভিব্যক্তি দেখে মনে হলো না, আমাদের ধর্মীয় পরিচয়বিষয়ক সংশয়ে তার ধারণা আমরা এই রমজানে খেতে চেয়ে বড় কোনো অপরাধ করেছি- শুধুমাত্র মানুষ পরিচয়টা আমাদের জন্য যথেষ্ট না, আমাদের ক্ষুধা-তৃষ্ণাবোধটাও তেমন গুরুত্বপুর্ণ কিছু না।
অনেকগুলো বন্ধ রেস্টুরেন্ট, বোরখা পরা চায়ের দোকান পেরিয়ে বিভিন্ন মানুষের মুখ আর মাথা দেখছি, যদিও ৩৩ আউলিয়া এখানে বসতি গেড়েছেন, তাদের মাজারে ভক্তদের নিয়মিত ভীড়ও আছে কিন্তু স্থানীয় অধিবাসীদের কারোই সন্ন্যাসীদের মতো চুল দাড়িতে জটা নেই, নিয়মিত ছাটা চুল আর কামানো গালের মানুষদের সবাই রিকশা ভাড়া করে চুল কাটাতে যায় এটা অবিশ্বাস্য- কাছে পিঠে কোথাও না কোথাও সেলুনটা থাকবে, শুধু চোখে পরছে না এই যা.

আপনাকে ভাল লাগল ।ভাল করে বই পরুন।ভাল লিখক হবেন।

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.