জয়নব
মাঝরাতে দরজায় কে ধাক্কা দিচ্ছে এমন জোরে জোরে? ফাগুনের মাঝামাঝি কিন্তু ঠিকই সন্ধ্যা নামলে জারের চাদর মোলায়েম বিছিয়ে থাকে চারপাশে আর ফিনফিনে মশারীর মতো কুয়াশা ঢেকে রাখে চারপাশে। কুপির আলো উসকে জয়নাব বিছানা ছাড়ে, মিলের চাদরটা জড়িয়ে বারান্দায় থামে, শব্দটা আবার পায়, ঠিকই কেউ দরজায় ধাক্কা দিচ্ছে।
জয়নাব ত্রস্ত গলায় হাঁক দেয় কে?
আমি, দরজা খুল।
এই সময় তো তার আসবার কথা না, জয়নাব নিজেকে সামলে নিয়ে পুনরায় প্রশ্ন করে আপনি?
হ্যাঁ, এখন দরজাটা খুল।
জয়নাব পাখীর মতো উড়ে উড়ে দরজার দিকে গেলো যেনো। দরজা খুলে মানুষটাকে অবাক হয়ে দেখে জয়নাব, চোখে প্রশ্ন
শহরের অবস্থা খারাপ রে বৌ, সব বন্ধ, হাতে কাজ নাই তাই চলে আসলাম বাসায়
দাঁড়ান আপনাকে পানি গরম করে দেই, এত রাইতে আবার কলঘরে যান ক্যান? এই রাইতে ঠান্ডাপ ানিতে গোসল করে একটা জ্বর বাধান আর কি তারপর যমে মানুষে টানাটানি হউক। আপনি দাঁড়ান আমি চুলাটাতে এক হাঁড়ি পানি বসায় আসতেছি।
জয়নাবের ভেতরটা আনন্দে থইথই করে। মানুষটা এমন হুট করে চলে আসলো, কি না কি অবস্থা শহরে এইসব কিছুই তাকে পীড়িত করে না, মানুষটা আচমকা এই রাতে চলে এসেছে, যার আসবার কোনো কথা ছিলো না, এই শীত শীত রাতগুলো একলা কাটাতে হবে এই আনন্দের আছন্ন ভাবনায় আসন্ন দু:সংবাদগুলো তেমন কোনো জোড়ালো সংবেদন তৈরি করে না তার ভেতরে।
চুলা থেকে পানির হাঁড়ি নামিয়ে নতুন করে ভাত বসায় জয়নাব। সারা রাস্তায় ঠিকই কিছু খায় নাই লোকটা, লোকটাকে তো ও হাড়ে হাড়ে চিনে, ঘাটের হোটেলে কিছুই খাবে না। সেই দুপুরে হয়তো খেয়েছে তারপর এতটা সময় ঠিকই কিছু খায় নি।
যখন হারুন ফিরে আসলো গোসল শেষে তখনও রান্না শেষ হয় নি জয়নাবের । ভেজা কাঠে ফুঁকনি দিয়ে ফুঁ দিতে গিয়ে ধোঁয়া লেগে চোখ জ্বলছে ওর। নাকের কাছে ধোঁয়া আটকে আছে মনে হয়,একবার হাঁচি দিয়ে নিজেকে সামলে নিলো জয়নাব।তারপর আঁচলে চোখ মুছলো। হারুন মুগ্ধ হয়ে জয়নাবকে দেখছে, চুলার লালচে আলোর আভায় জয়নাবকে ওর কিছুটা অচেনা লাগে, মনে হয় অন্য কোনো বাসায় ঢুকে পরেছে ও ভুলে, এই যে মেয়েটা যত্ন করে রান্না করছে, সে ওর পরিচিত কেউ না। কানের পাশে পরে থাকা একগোছা চুল তুলে জয়নাব তাকালো
এইভাবে তাকায় আছেন যে?
লালচে হলুদ আলোতে জয়নাবের গালের লাল রংটা মিলিয়ে যায় ধীরে ধীরে, হারুন মোরা নিয়ে রান্না ঘরের দাওয়ায় এসে বসে।
থাক আপনাকে আর বসতে হবে না এইখানে, চোখে ধোঁয়া লেগে ছোকহটা জ্বলবে, আপনি পাটি বিছায় বসেন আমি ভাত দিতাছি।
হারুন খুব যত্ন করে খাচ্ছে, জয়নাব একমনে তাকিয়ে তাকিয়ে হারুনের খাওয়া দেখে, কোনো প্রশ্ন করে না। হারুনই জিজ্ঞাসা করলো গত মাসের টাকাটা ঠিকমতো পাইছিলা?
জয়নাব মাথা নাড়ায়
কিছু জমা আছে ?
জয়নাব আবার মাথা নাড়ায়
বুঝলা সামনে কি হবে কিছুই বলা যায় না, দেশের অবস্থা সুবিধার না, এইসময় হাতে টাকা পয়সা থাকা ভালো, কখন কি হয় কিচ্ছু বলা যাচ্ছে না।
ক্যান কি হইছে শহরে?
অনেকক্ষণ পর ঘোর ভেঙে জয়নাব জিজ্ঞাসা করলো
আর কি এই পরা মাসটাই তো হরতাল আর হরতাল, কারখানা বন্ধ, শুধু হেঁটে হেঁটে কারখানায় যাওয়া আর সেইখানে বসে গল্প করে দুপুরে ফিরে আসা, মিছিল আর মিটিং, গুলি হচ্ছে আর শ্লোগান দিতে দিতে মানুষ মিছিল নিয়ে যাচ্ছে
আপনি যান নাই তো আবার? আপনার এইসব মিছিল মিটিং এ কোনো কাম নাই, আপনি এইসবে যাবেনই না।
না রে আমার কি এইসব করার বয়েস আছে।
হারুন মাথা নামিয়ে ভাতের থালার দিকে তাকিয়ে উত্তর দিলো। মিল থেকে ফেরার সময় কয়েকটা মিছিলের সাথে ও হেঁটেছে, শ্লোগানও দিয়েছে, শ্লোগানটাও চমৎকার
তোমার আমার ঠিকানা পদ্মা মেঘনা যমুনা
একটা মিছিলে গুলিও হয়েছিলো, মিছিল খানিকটা সময় থমকে ছিলো কিন্তু ক্ষুব্ধ সাপের মতো ঠিকই মিছিলের ফণা সামনের ব্যারিকেড ছোবল দিয়েএগিয়ে গেছে
অবশ্য জয়নাবের দিকে তাকিয়ে ও মিথ্যাটা বলতে পারে না, জয়নাব ওর চোখের দিকে তাকালেই বুঝবে ও মিথ্যা বলছে।
রাতের স্তব্ধতা ঘিরে ধরে তাদের, জয়নাব মৃদু স্বরে বললো চলেন ঘুমাতে চলেন।
বাসনাটা ধুয়ে চুলার আগুণে অবশিষ্ট পানি ঢেলে দিয়ে জয়নাব দরজা লাগিয়ে কুপির সলতে নামিয়ে দেয়। ঘরটা আলো আঁধারিতে ঢেকে যায়, তারপর হারুনকে বলে ঐদিকে না ঐ দিকে বাবু ঘুমাচ্ছে।





চমৎকার...
এটা কি চলবে?
জানি না। পরিস্থিতি কি রকম হয়
মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে মনে হছে। কিন্তু শেষ তো হলো না!
চমৎকার লাগলো!
রাসেল ভাই, শেষ করুন । দারুণ হয়েছে । বাকিটার জন্য ওয়েট করছি ।
রাসেল ভাই, আদর্শ গল্প বা উপন্যাসের চমৎকার রুপ, চালিয়ে যান...।আমি '৫২ এর গল্প নিয়ে আসছি খুব শীঘ্রই...
চমৎকার..........
বাকি অংশ পড়ার জন্য অপেক্ষায় আছি.....।
দারুণ গল্প । চলুক । থেমে না যাক।
বেশ ভাল লাগতেছে। চলুক।
মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে মনে হছে। কিন্তু শেষ তো হলো না!
মন্তব্য করুন