সাঈদীর মামলার রায় ও বীরঙ্গনাদের প্রতি ইতিহাসের দায়
ব্লগারদের অনেকেই হয়তো ২০০৯ সালে ব্লগে প্রকাশিত 'একাত্তরে নারীর বিরুদ্ধে অপরাধ' শীর্ষক আমার লেখাটি পড়েছেন। সেই সময় থেকেই আমি একাত্তরের কিছুটা অনালোচিত এই অধ্যায়টি নিয়ে গবেষণা করে যাচ্ছি। এ সম্পর্কিত কোন বই, জার্নাল, গবেষণাপত্র, নিবন্ধ যখনই কোথাও পেয়েছি তা সংগ্রহ করার চেষ্টা করেছি। সাঈদীর মামলার বিচার প্রক্রিয়ার দিকে বেশ কয়েকটি কারণে আমার আলাদা মনোযোগ ছিল। সাঈদীর মামলা এমন একটি মামলা, যেখানে ধর্ষণের অভিযোগ ছিল, ধর্ষণের জন্য অপহরণ করে আটক রাখার অভিযোগ ছিল, জোরপূর্বক গর্ভধারণে (forced pregnancy) বাধ্য করার অভিযোগ ছিল, এমনকি জেনোসাইডাল রেপ অর্থাৎ গণহত্যাসম্পর্কিত ধর্ষণের অভিযোগও ছিল। এই অভিযোগগুলোতে সাঈদীর কী দণ্ড হয় তাই দেখার অপেক্ষায় ছিলাম। ২৮ ফেব্রুয়ারির ১২০ পৃষ্ঠার রায়ে ৮ ও ১০ নম্বর অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ ফাঁসির মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার আদেশ প্রদান করেছে। দুইটি অভিযোগই হত্যাকাণ্ড সম্পর্কিত। ৮ নম্বর অভিযোগে ইব্রাহিম কুট্টিকে হত্যার অভিযোগ আনা হয় সাঈদীর বিরুদ্ধে। ১০ নম্বর অভিযোগে বিসাবালি হত্যার অভিযোগ আনা হয় সাঈদীর বিরুদ্ধে। দুটি অভিযোগেই রাষ্ট্রপক্ষ প্রত্যক্ষ স্বাক্ষী হাজির করতে পেরেছে। ফলে ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ দুটি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে।
এর বাইরেও আর ৬ টি অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। এগুলো হলো অভিযোগ নম্বর ৬, ৭, ১১, ১৪, ১৬ এবং ১৯। এরমধ্যে ১৪ নম্বর অভিযোগ ছিল ধর্ষণের। এর সঙ্গে জোরপূর্বক গর্ভধারণে বাধ্য করার অভিযোগও ছিল। এমনকি এই অভিযোগের সাক্ষ্য বিশ্লেষণ করতে গিয়ে রুয়ান্ডা ট্রাইব্যুনালের আকায়েসু মামলার রেফারেন্স দিয়ে জোনোসাইডাল রেপের কথা উল্লেখ করেছে ট্রাইব্যুনাল। ১৬ নম্বর অভিযোগে তিনজন নারীকে অপহরণ করে আটক রেখে ধর্ষণ করার অভিযোগ ছিল। দুঃখজনকভাবে ট্রাইব্যুনাল রায়ে ৮ ও ১০ নম্বর অভিযোগে সর্বোচ্চ শাস্তি প্রদানের কথা উল্লেখ করে বাকি প্রমাণিত অভিযোগগুলোতে কোন শাস্তি প্রদান করেনি। ফলে একাত্তরে সংঘটিত ধর্ষণ, জোরপূর্বক গর্ভধারণে বাধ্য করা, জেনোসাইডাল রেপ এবং অপহরণের মাধ্যমে আটক রেখে ধর্ষণ করার অভিযোগগুলোতে শাস্তি প্রদানের নজির তৈরি হলো না।
একাত্তরে নারীর বিরুদ্ধে যেসব অপরাধ সংগঠিত হয়েছে তা বরাবরই মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের নিরব অধ্যায় হয়ে থেকেছে। ধর্ষণ ও নির্যাতনের শিকার প্রায় ৪ লাখ নারীকে কেবল বীরঙ্গনা খেতাবেই ভূষিত করা হয়েছে (কেবল ধর্ষণের শিকার ২ লাখ। ট্রাইব্যুনালের রায়েও এটি উল্লেখ করা হয়েছে।)। অথচ কুমারখালীর তিনজন নির্যাতিত নারী ১৯৯২ এর গণআদালতে স্বাক্ষী দিয়ে গ্রামে ফিরে যাওয়ার পর তাদের একঘরে করে দিয়েছিল স্থানীয়রা। পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষভাবে আজও বাংলাদেশের প্রতিটি গ্রাম ও শহর যেন একেকটি কুমারখালী গ্রাম। ইতিহাস স্বাক্ষী- ধর্ষণ, জোরপূর্বক গর্ভধারণে বাধ্য করা, আটক রেখে ধর্ষণ ও নির্যাতনের মতো অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পরেও বাংলাদেশের ট্রাইব্যুনাল তার জন্য কোন রকমের দণ্ড প্রদান করেনি অন্য দুইটি অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড প্রদানের অযুহাত দিয়ে। অথচ চার লক্ষ বীরঙ্গনা মা ও বোনের প্রতি ইতিহাসের যে দায় রয়েছে তার কথা আমাদের ট্রাইব্যুনাল একবারও বিবেচনায় নিল না!
সাঈদীর ফাঁসির দণ্ড হয়েছে। এই রায়ে অন্য সবার মতো আমিও খুশি। ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয়েছে এ রায়ের মাধ্যমে। ফাঁসির রায়ে আনন্দিত হওয়ার ব্যাপারটি কোন ধরনের প্রতিহিংসা থেকে নয়, এটি ন্যায়বিচার নিশ্চিত হওয়ার জন্যই। এই রায়ের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের ৪ লক্ষ বীরঙ্গনার প্রতি ন্যায়বিচার নিশ্চিতের সুযোগ ছিল। খুশি হতাম আমাদের ট্রাইব্যুনাল যদি সেই সুযোগটি গ্রহণ করতো। জেনোসাইডাল রেপের মতো অপরাধের বিষয়টি আলোচনায় তুলেও আমাদের ট্রাইব্যুনাল দুঃখজনকভাবে তার জন্য কোন দণ্ড দেয়নি!
বাইরে থেকে দেখলে খুব সহজভাবে প্রতীয়মান হবে, রায়ে সাঈদীর ফাঁসি হয়েছে। এতেই সবার সন্তুষ্টি। কিন্তু রায়ের বিভিন্ন অংশ পড়ে দেখলে নিশ্চয়ই সবারই আফসোস হবে এই ভেবে যে, এই মামলা থেকে আরও অনেকভাবে ন্যায়বিচার পাওয়ার সুযোগ আমাদের ছিল।
পরিশেষে, সাঈদীর মামলার রায়ে বলা একটি কথাকেই পুনরায় ট্রাইব্যুনালকে মনে করিয়ে দিতে চাই। রায়ের উপসংহার অংশের শুরুতেই বলা হয়েছে -As Judges of this Tribunal, we firmly hold and believe in the doctrine that ‘Justice in the future cannot be achieved unless injustice of the past is addressed’.





মাঝে মাঝে মনে হয় ফাঁসি দিলেও যেন এদের শাস্তি হলো না ঠিকভাবে।
হুমম
শামীম-এর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ লেখা।
অসম্ভব গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক তুলে ধরার জন্য ধন্যবাদ শামিম।
আসলে কি বলব? এদের সর্বোচ্চ শাস্তিই নিশ্চিত করা যাচ্ছিল না, যাও বা গেল, এরকম একটা বিষয়কে বিচারকরা আমলেই আনলেন না।
এ জাতির প্রতি করুণা হ্য়। আমরা বড় অধম।
খুব ভাল লেখা।
আসলে ন্যায় বিচারের কোন উদেদশ্যতো ছিল না, ছিল নিরবাচনের তরী পার হওয়ার আই ওয়াশ কিনতু ছোট ছোট পোলাপানরা ধরে ফেলেছে, ফেসে গেছে সরকার
মন্তব্য করুন