আজিরা দিনপঞ্জী... ১৩
অনেকদিন আমার অসুখ করে না, আমার যে খুব শখ অসুখ করবার এমনও না। তবু কেন জানিনা, আজকে ভোরে ধানমন্ডি লেকের পাশ দিয়ে দৌড়ুতে দৌড়ুতে আমার এই কথাটাই মনে হলো ... সত্যিই তো! আমার কতোদিন অসুখ করেনা!
ঘুমের রুটিন বড্ডো বাজেভাবে এলোমেলো হয়ে গেছে ক'দিন ধরে, কখন যে ঘুমোই আর কখন জেগে থাকি কোন ঠিক নাই। কোনরকমে দিনের ছয়-সাত ঘন্টা অফিসের কাজগুলো সেরে নিই ( হোম অফিসের ব্যাপক মজা)... এরপরে বাকি সময় শুয়ে বসে কাটে। বেশিটা কাটে ঘুমিয়ে সম্ভবত... কিন্তু খুবই খাপছাড়া বিক্ষিপ্ত ঘুম। বিষন্নতা কাটানোর একটা ভালো উপায় আসলে ঘুমিয়ে কাটানো... আমার মনে মেঘ জমতে শুরু করলেই আমি চুপটি করে ঘুমিয়ে যাই। প্রায়ই রাতের বেশিরভাগ জেগে থাকি, ভোরবেলা নামাজ পড়ে ঘুমাতে যাই। আজকে আমার ছোট বোনটা উঠে গেসলো ঘুম থেকে , মর্নিং ওয়াকে বের হলাম দুই বোন মিলে, ভোর পাঁচটা বিশে। মাইল তিন-চারেক হাঁটলাম। ভোরের গন্ধ এই শহরে কতোদিন পরে পেলাম... দুদিনের বৃষ্টিতে গন্ধটা ভারী কচকচে ছিলো, তবে ভাগ্যিস রাস্তায় বেশি আবর্জনা'র স্তুপ ছিলোনা... নাইলে পরে ভোরের গন্ধ কতোপ্রকার উদাহরণসহ তা বোঝা যেতো।
সারি সারি এপার্টমেন্টের ভিড়ে ছেলেবেলার স্বপ্নের ধানমন্ডি কই হারিয়ে গেছে... স্কুলে যাবার দিনগুলি মনে পড়ে... কল্যাণপুর থেকে বাসে সাতাশ নাম্বার এর মোড়, আর এরপরে বাকিটা হেঁটে ধানমন্ডি গার্লস। রাস্তায় কতো যে অসাধারণ সব বাড়ি ছিলো... দোতলা বাড়ির চওড়া ব্যালকনি, বিশাল লন, শিউলি-বকুল-কাঁঠালচাপা-মাধবীলতা-বাগানবিলাসের ঝরে থাকা ফুল আর হাজারটা নাম না জানা গাছ মিলিয়ে বাড়িগুলোকে আমার চিরকাল নন্দনকানন বলে মনে হতো। লেকের পাড়ের শিউলিতলায় শিউলির বোঁটায় পা পড়বার পরে মনে হলো... আরে, তাইতো... এই বুঝি শরত চলছে। স্কুলে যাওয়ার সময়ে মাঝে মাঝে আমি বাসা থেকে পলিথিন নিয়ে আসতাম... ফুল কুড়িয়ে স্কুলে নিয়ে যেতাম.. আর আমাদের স্কুলের ভেতরটাও কি অসাধারণ ছিলো... বিশাল মাঠ, স্কুল দালানের পেছনের জংগলে আমাদের ক্লাস ফাঁকি দিয়ে লুকিয়ে থাকার চত্বর, অব্যবহৃত হেডমিস্ট্রেসের কোয়ার্টার, সেই কোয়ার্টারের পেছনে বাঁশঝাড় আর ক্যাকটাসের বেড়ে উঠা ঝোপ, বিশাল মাঠজুড়ে সাদা সাদা কাশফুলের মতো সেই ঘাসগুলি, মাঠের চারপাশে সাদাটে শরীরের আকাশছোঁয়া দেবদারু আর বড়ো বড়ো পাতার সেগুনের গাছ। কতো দিন গেছে ওই মাঠে শুয়ে আকাশ দেখতে গিয়ে। বৃষ্টির ঠিক আগে দিয়ে আকাশ দেখতে দেখতে মনে হতো ওই বিশাল আকাশটা এক্ষুণি ঝুপ করে ভেংগে পড়বে মাথার উপরে। আজকে ভোরের এই হাঁটাটুকু মনের ভেতরের কতো স্মৃতি নাড়িয়ে চাড়িয়ে দিয়ে গেলো। কবে যেন স্কুলের শেষে সবাই মিলে একটা মসৃণ গাছের গুঁড়ি দেখতে গেসিলাম লেকের পাড়ে... তখন তো লেকের আশেপাশের সীমানাবন্ধন নাই, ল্যান্ডস্কেপিংও নাই... গাদাগুচ্ছের টাকা খরচ করে তার সৌন্দর্যবর্ধনও হয়নি... তবুও সেই গুঁড়ির উপরে বসে চুরি করে দেখতে যাওয়া লেকের চেহারা কেমন যেন অন্য জগতের মনে হয়েছিলো... মনে আছে সেদিন কোন এক ম্যাডামকে রিকশা খুঁজতে দেখে সাত বান্ধবী জড়াজড়ি করে গাছের পেছনে লুকিয়ে গেসলাম... লেকে গেছি- তার মানেই হলো প্রেম করছি... ছিছি! আমাদের চরিত্রে এতো বড়ো দাগ লেগে যাবে! হিহিহি!
লেকের ঠিক মাঝখানে একটা দ্বীপের মতো জায়গায় একটা বাড়িমতো ছিলো... দেখতে তেমন ছিরিছাঁদের ছিলোনা... কিন্তু ছোটবেলার এডভেঞ্চার কল্পনায় কতো যে অসাধারণ এক রাজপ্রাসাদ ছিলো সেইটা, আমারে ছাড়া আর কে জানবে সেই কথা। সোবহানবাগের জ্ঞানকোষ থেকে আব্বা যতোবার বই কিনে দিতেন... ততোবার লেকের সামনের ঐখানটাতে হেঁটে যাওয়া হতো শুধু বাড়িটাকে দেখতে... আমার মনে হতো আহা! ওইরকম একটা ঘরে যে থাকে, তার জীবনে বুঝি কোন দুঃখ নাই... অবশ্য সেইরকম একটা জায়গায় বাড়ি থাকলে আমার এখনও সব কষ্ট নাই হয়ে যাবে সম্ভবত। কল্পনার ঘোড়া ছুটবার জন্য জায়গার অভাব হবে না মোটেই।





শুভেচ্ছা স্বাগতম আপনার ব্লগে আমার আগমন
পরথম আসলাম আপনার পোষ্টে পড়ে ভালু পাইলাম
ধুমাইয়া লেখতে থাকেন, আপুমনি
শুভেচ্ছা
আপনারে আমার তরফ খেইকাও স্বাগতম
কৈশোরে শিউলি ফুল কুড়ানোর কথা মনে পড়ে গেলো।
এখনও কুড়াইতে পারেন... আমি তো কালকে কুড়াবো বইলা ভাবতেসি।
আপনার লেখা ছোটবেলার ধানমন্ডিকে মনে করিয়ে দিলো। ৯১ তে আমি যখন কাস ওয়ানে,সেই বালিকা সময়ের ধানমন্ডি। জন্ম নিয়েছি, বেড়ে উঠেছি, সব এই এলাকায়। ধানমন্ডির সাথে যে কি রকম একটা টান আমার,বলে বোঝানো যাবে না। আজ সকালে আট নম্বর ব্রিজের ধারে দৌড়াতে গিয়ে আমিও এসবই ভাবছিলাম। মিলে গেলো!!
আট নম্বর ব্রীজ? বাহ! তোমার সাথে তো তাইলে আমার দেখা হইয়া যাওয়ার সম্ভাবনা আছে...
স্কুলটার সাথে মাস চারেকের সম্পর্ক ছিলো, তাই টুকরো টুকরো ছবিগুলা মিলাতে মজা লাগ্লো, ওই ঘরটাকে প্রাসাদ না লাগ্লেও, ওতে থাকতে কেমন মজার হবে, সেই চিন্তা আমারো আসতো!...
লেখাটা ভালো লাগছে...
অসুখের কথায় মনে হল, জয়িতার ভীষণ জ্বর।
এটা তো মন খারাপ করা খবর। আমি ভাবছিলাম কয়েকদিন তাকে ব্লগে দেখি না ক্যান।
হুমম... অনেকদিন সাড়া-শব্দ নাই।
ধানমন্ডি লেক রকস্ ......... ধন্যবাদ
আমিও একই এলাকার লোকতো। তোমার সাথে আমিও সেখান থেকে আবার ঘুরে এলাম
মন্তব্য করুন