ঘুরে ফিরে নিশীথ সূর্যের দেশে... ৪ ( একটুকরা জার্মানী)
ছবি: নরওয়েতে শেষ রাত
আমাদের তিন সপ্তাহের অসলো যাত্রার শেষকাল চলছে, পরেরদিন ভোরবেলা অসলো থেকে রওয়ানা দিব... রাতে আমার হঠাত করে মনে পড়লো আমি রাজ্যের মানুষকে লাফালাফি করে জানিয়েছি জার্মানীতে আসছি...এবং শেষ মুহুর্তে আমার যা স্বভাব... কারো সাথে যোগাযোগ করি নাই । শেষে মৌসুমরে বললাম কিছু করতে... সে ভাস্করদারে ফোন দিলো... ভাস্করদা আবার কেমনে কেমনে জানি চোরদা'র (উনি চোর নামে সামুতে লিখতেন এককালে, উনার সত্যিকারের নামটা বেমালুম ভুলে গেসি) সাথে যোগাযোগ করে ফেললো.... শেষমেষ জানা গেলো সাত-সকালে আমাদেরকে রিসিভ করতে ফ্র্যাংকফুর্ট এয়ারপোর্টে কেউ একজন থাকবেন ( কে সেই অভাগা ব্যক্তি তখনো জানিনা।) কেমন জানি লজ্জা করছিলো...কাকে না কাকে জ্বালাচ্ছি কে জানে।
অসলো এয়ারপোর্টে আমি মোটামুটি একটা বিশাল ফাঁড়া কাটাইসি... আমরা এমনিতেই একটু দেরী করে চেকইনের লাইনে দাঁড়াইছি, তার উপরে ভুল এয়ারলাইনস এর কিউ'তে... মাঝখানে আমি একবার বাকি সহকর্মীদের মৃদু গলায় বলার চেষ্টা করেছিলাম এই ভুলের ব্যাপারটা, কারণ সামনের দুই যাত্রীর কথা শুনে মনে হচ্ছিলো তারা লন্ডন যাবে, কিন্তু আমাদের গন্তব্য তো সেইটা না... আমি মোটুমুটি নিজের বেক্কলপনা আর ভুলোমনের জন্যে জগদ্বিখ্যাত না হলেও অফিসবিখ্যাত, তাই আমাকে কেউ পাত্তা-টাত্তা দিলোনা... কিছুক্ষণ বাদে যখন ফ্লাইটের সময় প্রায় ঘনিয়ে এসেছে তখন এক মহাপুরুষের কি জানি বোধোদয় হইলো, সিকিউরিটিকে জিজ্ঞাসা করে জানা গেলো যে আমার অনুমান নেহায়েত মিথ্যা ছিলোনা, তো সবাই মিলে জান বাজি রেখে দৌড়... চেকইন বন্ধ হবার খানিক আগে গিয়ে বড়ো লাগেজ ড্রপ করা হইলো, এরপরে তাড়াহুড়ার ঠেলায় আমি আমার পাসপোর্ট কোন একখান ব্যাগে ঢুকাইছি, সেই ব্যাগ আবার মৌসুম হাতে নিয়া দৌড় দিসে, কারণ আমারে মেটাল ডিটেক্টরে আটকাইসে... জুতা, মোজা, বেল্ট, জ্যাকেট সব খুইলাও কিছু খুঁইজা পাওয়া গেলোনা, সিকিউরিটির ওরাও ফাঁপড়ে, আর আমি তো সাত হাত পানির তলায়... কাইন্দা দিমু প্রায়, এমন সময় টের পাওয়া গেলো আমার বাবুই পাখির বাসার মতো চুলে একখান সেফটিপিন ঝুলতেসে, গলার স্কার্ফ থেকে বাবাজি কখন জায়গা পাল্টেছেন তা তো আর বুঝি নাই, তো ওইটারে ছুঁইড়া ফালাইয়া চেকিং ক্লিয়ার করে মনে হইলো .. ''অ্যাঁ!! আমার পাসপোর্ট কই??'' বেমালুম ভুইলা গেসি... কি করুম বুঝতাসি না কিসু... এমন সময় মৌসুম আবার উল্টা ঘুইরা আমার কাছে আইসা আমারে কিসুক্ষণ ঝাড়ি-ঝুড়ি দিয়া সাজেস্ট করলো যে ''আচ্ছা. আমার হাতে যেই ব্যাগ দিসো ওইটাতে দেখো...''। জানে পানি ফেরত আসলো ব্যাগ খুইলা।
সহযাত্রীদের বিদ্রুপাত্মক দৃষ্টি সইয়া উঠলাম প্লেনে। নিজেরে ঝাড়া বেকুব মনে হইতেছিলো... তারপরে মনে হইতেছিলো.. জার্মানীতে গিয়া না জানি কি হয়...আল্লায় জানে,কত্তগুলা লোকেরে ঝামেলায় ফেলতে যাইতেছি!! যাই হোক ফ্র্যাংকফুর্টে নামলাম... নাইমা আবার গ্যাঞ্জাম.... খবর নিয়া জানা গেলো আমাদের লাগেজের দুই তৃতীয়াংশের কোন পাত্তা নাই। তো ওইখানে সর্বহারার মতো কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করে লাগেজের খোঁজ বের করার চেষ্টা করে আমরা বের হলাম নির্ধারিত সময়ের প্রায় ঘন্টা দেড়েক পরে...
মনে মনে ভাবছিলাম যে বেচারা আমাদের জন্য দাঁড়িয়ে আছেন বাইরে... উনি না জানি কি ভাবছেন!! হঠাত মনে হলো.. মর ঠ্যালা! উনি আমাদের চিনবেন কি করে?? পরক্ষণেই ভাবলাম... আমাদের মতো থ্যাত বাংগাল চেহারার লোক তো বেশি বের হবে না... খুঁজতে বিশেষ অসুবিধা হবে না মনে হয়। সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে বের হলাম... দেখি এক ভালোমানুষ গোছের গোলগাল চেহারার ভদ্রলোক আমাদের দিকে আসছেন... জানা গেলো উনিই ফ্রুলিংক্স... আরেক ব্লগার ( উনার আম্মা কেক বানাইয়া পাঠাইছিলেন আমাদের জন্য... আহা! এই না হইলে আর বাংগালী!!)।
তো আমাদের সাথের বাকি দুই পুরুষ সহকর্মীর একজনও ব্লগটগ পড়েন না বা লেখেন না... ওরা ঠিক করলেন মাঝখানের বারো ঘন্টার সেই যাত্রাবিরতি তারা ঘুমাইয়া কাটাবেন। আমার কিঞ্চিৎ মন খারাপ... কারণ সেই দুইজনের একজনের উপরেই আমি সেই বিশাল ক্রাশ খেয়ে বসে আছি... কিন্তু আমি তাদেরকে কিছু বলিও নাই... তো কিছুক্ষণ নিজেদের মধ্যে আলাপ করে সেই বীরপুরুষদ্বয় আমাদের মতো অবলা মহিলাদেরকে একলা অচিনদেশে অচিন লোকদের সাথে ঘুরতে যাইতে দিতে ঠিক সাহস করলেন না, ঠিক করলেন তারাও আমাদের সাথে যাবেন।
ফ্রুলিংক্স জানাইলেন উলম থেকে হাসিব ভাই আসবেন... আমাদের এসকর্ট করে কাসল এ নিয়ে যাবেন... সুমন ভাইয়ের ডর্মে... কিছুক্ষণের মধ্যেই ফ্রুলিংক্সের ফোন দখল কইরা আমার জার্মানবাসী দোস্ত সুমনরে ফোন দিলাম... সেই বেচারা মিউনিখ থেইকা ফ্রাংকফুর্ট আসতেছে আমার সাথে দেখা করতে... ওরে কইলাম...''কাসল এ আয়''... বেচারা মনে হয় খানিক খেইপা গেলো... কইলো .."বেকুব! আগে কবিনা! তাইলে তো আমি সরাসরি ওইখানে যাইতাম..."।
ছবি: আমি ও আমার দোস্ত 
ছবি: কাসল ইউনিভার্সিটির ডর্ম
শুরু হইলো ইয়া লম্বা ট্রেন-জার্নি। জার্মানীর যট্টুক ট্রেন থাইকা দেখলাম... বিশেষ মুগ্ধ হই নাই.... সেই একঘেয়ে ইউরোপিয়ান স্টাইল।অসলোর মতো বড়োলোক জায়গা দেখার পরে কেমন জানি গরীব-গরীব.. পুরান-পুরান লাগতাসিলো। মনে হইতাছিলো ভুল কইরা মনে হয় ১৯৭০ সালে আইসা পড়ছি।পরে শুনলাম আমরা যেদিক দিয়া গেসি ওই অংশটা ইন্ডাস্ট্রিয়াল এলাকা ছিলো আসলে... যাউকগা... কাসলে নাইমা গেলাম চোরদার বাসায় (সামনের ভিউ জটিল ছিলো বাসাটার)... ভাবি আর তার আতিথ্য স্বীকার শেষ করে আবার সুমন ভাইএর ডর্মে। ওইটা একখান জটিল জায়গা... । ... বেগুনী বেগুনী সিম ফুলের মতো একটা গাছে ছাওয়া দোতলার ঝুলন্ত ব্যালকনিটা কঠিন ছিলো। ধুসর গোধুলী, সুমন ভাই, হাসিব ভাই, চোরদা, আরো কিছু ভাইয়া... ( নাম মনে নাই), আর আমরা চার নরওয়ে ফেরত উদ্বাস্তু... সবেতে মিল্যা -মিশ্যা ঘোরা-ফেরা হইলো... গাল-গল্প হইলো... মইধ্যে আমার সেই দোস্তটাও আইলো... কখন জানি... আমরা চারজন, আমার সেই দোস্ত, সুমন ভাই আর হাসিব ভাই মিল্যা ডর্ম এক্সপ্লোরেশান এ বাইর হইলাম... একখান নদী দেখছি... যেইটারে নদী কইতে হাসি পায়... আমাগো নদীর সামনে হেরে নদীর বাচ্চা তো দূরের কথা... প্রপৌত্রও বলা যায়না... ওইদিনই জীবনের পয়লা কালা আংগুর দেখলাম, মুখে দিয়া ফালাইয়া দেওয়া লাগছিলো যদিও...বিরাট খানা-দানা হইলো... আমাগো যাওয়া উপলক্ষ্যে ডর্মবাসীরা মিলে ভুনা খিচুড়ী, গরুর মাংস, আলু ভর্তা আর সালাদ বানিয়েছেন! প্রায় তিন সপ্তাহ বাদে খাঁটি দেশী খাবার! আহা...! সেই খিচুরির স্বাদ লাইগা আছে জিভে... নোয়াখাইল্যাদের মত খাওয়া শেষ হওনের সাথে সাথেই প্রায় আমরা চইলা আসলাম.... আবার বিশাল যাত্রার শুরু...... আবার আমরা আসমানে উড়লাম... সব মিলাইয়া প্রায় তেত্রিশ ঘন্টা জার্নি করছি!!!... বাপরে!
ছবি: জার্মানী'র নদী
ছবি: কালা আংগুর (যারে ব্লুবেরী ভাবসিলাম)





আপনার ভ্রমণ কাহিনী পড়লাম।পরের মুখে ঝাল খেতে ভালো লাগেনা।সিদ্ধান্ত নিলাম জার্মানী যাবো।স্বপ্নে হলেও যাবো।
এই না হলে স্পিরিট!!!... স্বপ্নের বর্ণনা দিয়েন... আমরাও নয়া ঘটনা পড়তে পারবো।
আনিকা, অন্য লেখাগুলির মতো আপনার এই লেখাটিও গোগ্রাসে গিললাম।
আপনার সাথে লেখার মধ্য দিয়ে আপনার সাথে ঘোরাঘুরি করতে কী ভালো যে লাগে!
দুয়া করেন সারাজীবন যেন ঘুইরা কাটাইয়া দিতে পারি... তাইলে আরো ভ্রমণ কাহিনী উদয় হবে
সত্যি আপনার এই ঘোরাঘুরির লেখা পড়তে বেশ লাগে। আর বেশ প্রাঞ্জল বর্ণনা ....স্বচ্ছন্দে পরা যায়।
ভালো ঠাকুন আর আরও লিখুন।
পড়া যায় হবে...আন্তরিকভাবে দুঃখিত।
ব্যাপার না আপু
জার্মানের নদী দেখে মুগ্ধ হইলাম
বেশ ভালো লাগলো। যদিও জার্মানীর নদী দেখে হতাশ
সে কি! এরম নদী দেইখা বাংলাদেশের গর্বে বুক ফুলান যায়.... এইটারে খারাপ কন ক্যালা?
জার্মানের নদী দেখে মুগ্ধ হইলাম
ভাষা তো বাংলা বলেই মনে হলো ! তবু কেমন যেন অচেনা ! এই ছোট্ট নদীটা দিয়ে পানি প্রবাহিত হয় তো ! নাকি আমাদের অনেক বড় নদীর মত মজে গেছে ? নদীর পাড় কি ভুমিদস্যুরা দখল করে নিয়েছে ? ছবিগুলো সুন্দর !
এইটা আমার জগাখিচুড়ি ভাষা.. বাপের সাথে নানান জেলায় ঘুরছি, সেই সাথে বই এর ভাষা মিলাইয়া একটা গুবলেট পাকাইসে আর কি...
... তিন বছর আগে দেখসিলাম... তো এখন নদী বাবাজি কেমন আছেন সেইটা তো জানিনা... 
ছবিগুলান সোন্দর... সবচেয়ে সোন্দর জার্মানির নদী !!! লেখা মাশাল্লাহ বরাবরের মতন...
ভালো লাগা রেখে গেলাম।
কই গেলেন?
আরে কিছু আন্তে গেছে
এই যে দিনরাত মেটাল ডিটেক্টর নিয়ে সিকিউরিটি বাহিনী পুতপুত শব্দ করছে, আজ পর্যন্ত কোথাও একটা বোমা আবিষ্কার করতে পেরেছে কেউ শুনেছে কি?
সেইটাই... আমার যের কিরম লাগতেসিলো!!!!
ব্লুবেরী কোথায়? ওগুলোতো আঙ্গুর, খালি ফটো তুলছো না মুখে দিয়ে দেখছো?
সুমন ভাইয়ের এই ডর্মে আমরা গিয়েছিলাম। সেই তেহারীর স্বাদ এখনো ভুলি নাই, আর কখনো ভুলবো না। টিটু ভাই আর শীলার বাসায়ও গিয়েছিলাম। সেখানেও ব্যাপক আড্ডা আর খানা দানা করেছি।
কাসেল আসলে পুরনো শহর, পশ্চিম জার্মানী বেশি খারাপ না তবে নরওয়ে অনেক বড়লোক, সেটার জন্য একটু ফকিরা লাগা অসম্ভব কিছু না
ছ্যা ছ্যা... এইটা তো আসলেই আংগুর... ভুল ফটুক দিসি... সাথের কেউ একজন আমারে তাই কইসিলো.. আইজকা পরথম ছবিটা ঠিকমতো খেয়াল করলাম... তখন তো ব্লুবেরী চিনতাম না। মুখে দিসিরাম ... এমনই কাঁচা ছিলো যে ওইগুলা কি মুখে দিয়া বুঝার কোন উপায় ছিলোনা...
আহ! থ্যাংকু.. টিটু ভাইয়ের নাম মনে করাইয়া দেয়ার জন্য।
লেখা, ছবি সবই আনিকায়িত
আনিকায়িত শব্দটা অনেক নস্টালজিক...
দোস্ত আর আপনের দেখি চশমা সেইম। বাই ওয়ান গেট ওয়ান ফিরি

ও আরেক্টা কুশ্ন: কোন দেশ বেশি সুন্দর ইংল্যান্ড নাকি নরওয়ে? আসা ছিলো বিদেশ দেখতে যাপোঁ
(
কুনটা যে বেশি সুন্দর সেইটা তো জানিনা, দুইটা দেশ দুইরকমের.. আবার ইউরোপীয় ঘরানার বইলা মিলও কম নাই... ইংল্যান্ড অনেক লাইভলি লাগসে আমার ... সম্ভবত লন্ঠনে ছিলাম বইলা... আর অসলো হইলো চুপচাপ ছিমছাম বড়োলোক শহর... অসলোর প্রতি আমার অন্য কারণে একটা নস্টালজিক পক্ষপাতিত্ব আছে যদিও... আর অসলোর বাইর নরওয়ে আমি খুব অল্পই দেখসি... যেইটার বর্ণনা আসবে সামনে... ঠিক তেমনি কভেন্ট্রি আর লন্ডনের বাইরে ইংল্যান্ডও আমি খুব কম দেখসি... সুন্দর জায়গা গুলাতে তো যাইও নাই... এই আদার ব্যাপারীর জ্ঞান নিয়া জাহাজের সমালোচনা করতে গেলে এট্টু আউলাইয়া যাবে...
... আপনি বরং আমার সব ভ্রমণ কাহিনী আর ছবি উঠানো পর্যন্ত অপেক্ষা করেন.. নিজেই সিদ্ধান্ত নিয়েন পরে...
আর দুয়া করি আশা পূরণ হোক...
নদীটা দেইখা আসলেই মুগ্ধ হইছি
ময়মনসিংহ শহরে কিছু নদী আছে... যা একেবারে এই নদীর মত

ঢাকাতে বঙ্গবাজারের পেছনে রেলওয়ের একটা হাসপাতাল আছে... তার সামনে দিয়া এরম একটা নদী এখনো আছে
তবে আমাদের অনেক সাগর আছে... যেরম পদ্মা সাগর, মেঘনা সাগর... ওদের এরম সাগর কয়টা আছে?
জার্মানীতে খালরে নদী বলে?আজব তো!
লেখা ব্যাপক ভালু পাইলাম। সামুতেও পড়তাম আপনার ভ্রমণ কাহিনী।
আসলে বলে নাকি যেই মরু এলাকায় কোন নদীই নাই, তারাই খালরে নদী ভাইবা স্বান্তনা লয় সেইটা তো জানিন...
ক্রাশের আপডেট কি?
আরে! এটাতো আমিও ভাবতেছিলাম!!!... মাসুম্ভাই জ্ঞানীজন বলে দিছে!!...
আসলেই আপডেট কি?...
ক্রাশটা চিরস্থায়ী হইসে... একতরফা প্রেমে পাল্টাইসে... এর বাইরে আর কোন আপডেট নাই...
এই নালায় থুক্কু নদীতে কাগজের নৌকাও তো ডুববো না!!!...
মন্তব্য করুন