ঘুরে ফিরে নিশীথ সূর্যের দেশে... ৫
দ্বিতীয়বার আবারো নরওয়ে যাওয়া হলো ২০০৮ এর জুনের শেষদিকে। এবার তিনমাসের লম্বা যাত্রা। একই সাথে ভয়, অনিশ্চয়তা আর মনের ভেতর চেপে রাখা একটা ইচ্ছের বোধ কাজ করছিলো। দেশে আমার তখনকার পার্টনারের সাথে সুতো কেটে ফেলার ব্যাপারে কথাবার্তা চলছিলো, আর নরওয়েতে সেই মানুষটা যার টানে আর কোন সুতোই গজালো না চার বছরে। দুই নৌকায় পা দিয়ে চলা আমার স্বভাবে নাই, তাই আমি প্রাণপণে একটা সুতো ছিঁড়বার আর আরেকটা সুতোর টান অগ্রাহ্য করবার দোটানায় ছিলাম। বড়ো অদ্ভুত সময় ছিলো সেটা।
ওখানে যাবার পরে রোজকার অফিস যাবার পালা, আর প্রথমবারের ঘুরে বেড়ানোর স্মৃতি থেকে নিজেকে দূরে রাখতে আমি এইবার মোটামুটি হোটেল আর অফিস এই রুটিনেই কাটিয়েছি বেশিটা সময়। অফিস থেকেই প্রথম ওদের প্রতিবারের সাইক্লিং গ্রুপের সাথে একটা লগ কেবিন মার্কা হোটেলওয়ালা জায়গায় বেড়াতে যাওয়া। যাত্রা অসাধারণ, জায়গাও অসাধারণ, আমি ছিলাম মনোকষ্টে কেবল নিজের থেকে পালিয়ে বেড়াবার টেনশানে। আমি জানি আমি এই ক্ষেত্রে নতুন না, প্রেম চেপে রাখবার অনুভূতি কমবেশি সবার হইসে। কিন্তু একটা অসম্ভব সুন্দর জায়গায়, আমার সবচেয়ে পছন্দের মানুষটার আশেপাশেই আছি চব্বিশ ঘন্টা, অথচ আমি জানি সে আমাকে পাত্তাও দিবেনা - ভাবনাটা বড়ো জ্বালাইসে। যাই হোক ব্যক্তিগত প্যাঁচাল ছেড়ে আসল কথায় যাই।



যেখানে গেলাম সেই জায়গাটার নাম শিকুটস্তোয়া। জায়গাটা মারাত্মক সুন্দর। একটা কালো রং এর কাঠের বাড়িতে আমাদের অবস্থান, তার সামনে বিশাল এক লেক। শুনেছি শীতকালে এইখানে লোকেরা বরফের উপরে দৌঁড়ঝাঁপ দেয়, স্কেটিং করে। আমি গিয়েছিলাম গ্রীষ্মকালে, বরফের ছিঁটেফোঁটাও ছিলোনা তখন। অফিসিয়াল খেলাধুলা শুরু হলো যাবার পরপরই, এইগুলা নাকি টিম স্পিরিট বাড়ায়, সবাই মিলে একসাথে বারবিকিউ করা, তীর ছোঁড়ার প্রতিযোগিতা, লেকে ক্যানূ চালানোর প্রতিযোগিতা। এর আগে আমি জীবনে নৌকার বৈঠাতেও হাত লাগাই নাই। যতোই লাইফ জ্যাকেট পরানো হোক না কেন নৌকাতে উঠতে গিয়েই আমার হাত পা কাঁপছিলো... কিন্তু একবার শুরু করার পরে মজাটা বুঝতে পারলাম। এস্পেন নামের এক নরওয়েজিয়ান সামার স্টুডেন্ট ছিলো আমার সাথে। আমি না থাকলে ছেলেটা নির্ঘাত জিতে যেতো। ওর সাথে তাল রেখে বাইতে গিয়ে আমি হাঁপিয়ে একসা। নৌকা তীরে ভেড়ানোর পরে ক্ষিদেয় মাথা খারাপ হবার জোগাড়। ভেতরে গিয়ে চিপস, হটডগ মার্কা কিছু খেলাম। এর একটু বাদেই আমাদের টিপিক্যাল অফিসিয়াল ডিনার শুরু হইলো। প্রথমে সালাদ, এরপরে সেদ্ধ আর উনুনে শেঁকা মাংস, নরওয়েজিয়ানদের অতিপ্রিয় আলুসেদ্ধ আর শক্ত রুটিও আছে সাইড ডিশ হিসাবে। সবশেষে ডেজার্ট হিসেবে একটা আজীব কিসিমের কেক।

খাওয়া শেষ হবার পরে যথারীতি বক্তিমাপর্ব। অবশ্য খুব কাজের কচকচানি কিছু হলোনা, সেই অফিসের বেশিরভাগই ট্রন্ডহাইমে অবস্থিত নরওয়েজিয়ান টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটির পুরানা ছাত্র। তারা নিজেদের মতো নস্টালজিক গল্প শুরু করলো। বাংলাদেশ আর ভারতের টিম থেকে দুইজন প্রতিনিধি ছোটখাটো বক্তৃতা দিয়ে দিলো। এরপরে শুরু হলো সবার আকাংখিত সত্যিকারের ভোজ। রাজ্যের ওয়াইন, বিয়ার এবং আরো নানান কিসিমের পানীয় হলো সেই ভোজের মূল আকর্ষণ। নিরামিষভোজী বলে সেসবের স্বাদ পাইলাম না। তবে একটু একটু করে টলোমলো হতে থাকা মানুষদের দেখতে মজাই লাগে। যদিও একজন লুল প্রজাতির নরওয়েজিয়ান আমাকে খানিকটা ভিমড়ি খাইয়েছিলেন। ওই সময়ে রুমের ভেতরে গান বাজছে, সবাই মনপসন্দ হরেক রং এর পানীয় খাচ্ছেন। আমি এক কোণার এক সোফায় চুপ করে বসে কফি খাচ্ছি আর মানুষজনের কান্ডকারখানা দেখছি। হঠাত এক বেশ সুদর্শনগোছের নরওয়েজিয়ান কলিগ একটু টলতে টলতে আমার পাশে এসে বসলেন, আমি একটু ইত:স্তত করে উঠে পড়লাম। তিনি ঝপাং করে আমাকে জড়িয়ে ধরবার চেষ্টা করতেই আমি রিফ্লেক্স অ্যাকশানে তাকে মোটামুটি একটা ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিলাম দৌড়। দৌড়টা কেন দিসিলাম জানিনা, কিন্তু ওই মুহূর্তের রিফ্লেক্সে সেইটাই একমাত্র করণীয় বলে মনে হইসিলো। পরে শুনেছিলাম সেই ঘটনার পরে সেই ব্যাটার নাকি নেশা ছুটে গেসলো এবং সে নাকি কিছুতেই বুঝতে পারতেসিলোনা যে সে আমার সাথে এইটুকু ফ্লার্টিং করায় আমি এরকম আঁতকে উঠলাম ক্যানো। কালচারাল শিক্ষা যে কতো জরুরী সেইটা সেইদিন টের পাইলাম। কিন্তু সেইটা ঠিক কালচারাল সমস্যাও মনে হয় নাই, ব্যাটা আসলেই লুল ছিলো, নাইলে আরো তো মানুষেরা ছিলো, তারা তো কাউরে কোলে বসানোর চেস্টা করতেসিলোনা।


আমি অবশ্য সেই লুল বাদ দিয়ে বাকিদের নিজেদের আটকে রাখার ক্ষমতা দেখে মোটামুটি অবাক হয়ে গেসলাম। তারা মোটামুটি ভোর ছটা পর্যন্ত একটানা পান করে গেলো, কিন্তু বেশিরভাগই বেশ ভদ্রস্থ ছিলো। কেউ কেউ এক্টু বেশি কথা বলছিলো কেবল। আমি ঘুমোইনি সারারাত, কিছুক্ষণ নিজের মনে হাঁটাহাঁটি করেছি আশেপাশে। পরে সূর্য উঠে এলে কয়েকজন মিলে ক্যানূ চালানো শুরু করলাম আবারো। চারপাশে পাহাড়, নীল আকাশ, টলটলে লেকের পানিতে সবকিছুর চমতকার প্রতিচ্ছবি, আর এর মধ্যে দিয়ে প্রায় ঘন্টা তিনেক নৌকা চালালাম। আমার সাথে ছিলো এক ছোট ভাই, সে আমাকে বেশ অল্পসময়ের মধ্যে ক্যানূ চালানোর নিয়মকানুন বেশ ভালোমতো রপ্ত করিয়ে দিলো। আমি আর ও মিলে দূরের এক পাহাড়ের ঝর্ণা দেখতে গেলাম। আর মাঝে মাঝে ওর সুরে আর আমার বেসুরে গান। কি কি যে গাইসিলাম সেইদিন।
''সোনা দিয়া বান্ধাইয়াছি ঘর'', ''ঘাটে লাগাইয়া ডিংগা'', ''আমার হাড় কালা করলাম রে।'', ''আজ ধানের ক্ষেতে'' সহ এমনই এলোমেলো কিসিমের কিছু গান। আমি জানিনা, এইটা কি সবার ক্ষেত্রই ঠিক কিনা, পানির খুব কাছাকাছি পানিকে স্পর্শ করে থাকলে এক অদ্ভুত আনন্দ হয়। ওই তিন ঘন্টা ওমনই নির্ভেজাল আনন্দে কেটেছিলো! শেষেরদিকে আমি আর এক ইন্ডিয়ান সহকর্মী আমাদের পুরনো টিমলিডারের সাথে তিনজনের এক ক্যানূও চালাইসি, অবশ্য ইন্ডিয়ান সহকর্মীর কান্নাকাটিতে আমাদের আধারাস্তায় ফেরত যেতে হইসিলো। বেলা পড়ে এলে পাততাড়ি গুটিয়ে ঘরে ফেরার পালা। আমার মাঝে মাঝে মনে হয় আর হয়তো কোনদিন সেই জায়গাটা দেখতেই পাবোনা, তবু সেই সব স্মৃতিগুলো একদম নিজের মধ্যে কোথাও থেকে যায় কেমন করে যেন।






আপনার লেখনী কিন্তু মারাত্মক। পড়তে পড়তে হারিয়ে গিয়েছিলাম।
খাইছে..।
আপ্নেও আমার মতো না ঘুমাইন্যা পাব্লিক নাকি? এতো রাইতে কি করেন?
এখন রাতের খাবার বানাই।
মীর, আমরা যখন জাইগা থাকতাম তখন নেট ছিল না!
১. আনিকা, দুলালও বলে, মাতাল হলে, বেহুশ হলে লুলেরা খালি মেয়েদের ওপরে পড়ে ক্যান? হুশই যদি নাই থাকে তাহলে অন্য ব্যাটাদের ওপর পড়ে না ক্যান?
২. কানো চালানো আমারো খুবইইইইই পছন্দের। আমি প্রতি সামারে যাই নিয়ম করে। আই জাষ্ট লাভ ইট।
লেখা উমদা হয়েছে, আর একটু রেগুলার কন্ট্রিবিউট কর, ব্লগিং ও কিন্তু অন্যান্য অশান্তি থেকে বাঁচাতে পারে, ভেবে দেখিস
আমি অনেক কাছের থেকে কিছু কিছু মাতাল লোকদের দেখছি, আমার কেন জানি মনে হয় মাতাল হইলে মানুষের অবদমিত ইচ্ছাগুলা বাইর হইয়া পড়ে। আবার কেউ কেউ মনে হয় সে যে মাতাল এইটার একটা জাইনাশুইনা ফায়দা উঠায়, ভাবখানা এইরম যে মাতাল থাকাকালে তার লুলামী জায়েজ।
এই কয়দিন আসলে অনেক ব্যস্ত। নয়া চাকরী, একটু সামলে সুমলে চলতেসি। তবে ছুটিছাঁটা পাইলেই লিইখা ফেলবো। আর তোমাদের অনেক ধন্যবাদ আমি যাই লেখি সেইটা মনোযোগ দিয়ে পড়ার জন্য।:)
আপনার অনুভূতিটা মনে হয় সঠিক বোনটি। পানির সংস্পর্শে এলে আসলেই মনটা কেমন পলকা হাওয়ায় উড়তে থাকে। মনে হয় পানি তার ঠান্ডা যাদু দিয়ে আমাদের ভেতরের ভারটা হালকা করে দেয়। ব্যাপারটা আমারও হয়। যেহেতু আমি আপনাদের মতো করে প্রকাশ করতে পারিনা, তাই কাউকে সে কথা বলাও হয়নি। আজ আপনার সাথে মিল পেয়ে বুঝলাম এমন ঘটনা অন্যের বেলাতেও হয়
আরো আসুক স্মৃতি জাগানিয়া এমন লেখা। ভালো থাকা হোক 
হুমম... কে জানি বলসিলো যে আমাদের শরীরের বেশিরভাগ পানি বইলাই নাকি এইরকমের হয়, কিন্তু তাইলে কি সবারই হওয়ার কথা না? হয়তো সবারই হয় আসলে। এইধরণের ব্যাপারগুলা হুটহাট মনে হয়, খুব ইম্পর্টেন্ট কিছু না দেখে হয়তো আমরা তেমন পাত্তা দেইনা।
লেখার কথা নতুন করে কী বলবো!
একটা ছাড়া সব ছবিতে অদ্ভুত নিঃসঙ্গতা...
==========================
আনিকার থোকা থোকা কোঁকড়া চুল আমার দারুণ লাগে। ইশ আমার মেয়েটার যদি এমন হতো!
আপু, সবাই যখন মৌজ-মাস্তিতে ব্যস্ত, আমি একলা একলা ঘুরতে ঘুরতেই ছবিগুলা তুলসি কিনা।
---------------------------------------
আমার কোঁকড়া চুলের কথা আর বইলেন না। ভালো কথা মনে করাইছেন, চুল কাটাইতে গেলে কি কি যন্ত্রণায় পড়তে হয় সেইটা নিয়া একটা ব্লগ লিখবো ভাবতেসি।
লেখা সমেত ছবিগুলা... দারুন হয়েছে...
তানবীরা দুলাভাইয়ের লগে একমত, বেহুশ হলে লুলেরা খালি মেয়েদের ওপরে পড়ে ক্যান? হুশই যদি নাই থাকে তাহলে অন্য ব্যাটাদের ওপর পড়ে না ক্যান?
পাঁচ আর ছয় নম্বর ছবির মধ্যে কিরকম একটা বিপরীত ধরনের মিল আছে মনে হলো, কিন্তু ঠিক কোন জায়গায় বুঝতে পারলাম না। ছবি দুটো কি দুই সময়ে তোলা?
বিপরীতমুখী মিলটা হইলো একটা মূল তীর থেকে তোলা দূরের দ্বীপের, আরেকটা তোলা দ্বীপ থেকে তীরের, সময়ের পার্থক্য ঘন্টা খানেকের হতে পারে, এর বেশি না।
হায়, আমিও এরকম কিছু ভাবছিলাম। মেঘের সাথে মেলানোর চেষ্টা করেছি কয়েকবার। কিন্তু মিললো না, সেজন্যই মনে হয়েছে বিপরীত কিছু একটা আছে
ধুর! কেন যে এত ব্যাস্ত থাকি

আগের পার্ট গুলোও পড়তে হবে.... অনেক সুন্দর লেখা
শেষ ছবিতেই মাত্ করে দিলেন।
মন্তব্য করুন