একটি দীর্ঘশ্বাস নদী হয়ে যায়
এখন আমার ত্রিশ। দশ বছর আগে মুনিরার বয়স ছিলো ত্রিশ। আমার থেকে মুনিরা দশ বছর বেশি বড়। মুনিরার সাথে কোনো যোগাযোগ বা সাক্ষাত নাই প্রায় সাত বছর। এই সাত বছরে আমি ত্রিশে এসে চাকরী করি একটি প্রাইভেট হসপিটালে। মুনিরা সাত বছরে কই পৌছায়ছে জানি না তবে সে যদিও তেমন কিছু না হয়, খারাপ নেই জানি। যখন চিনতাম তখনই সে উচ্চ পরিবারের বঁধূ ছিলো। আজ এই সাত বছর পর মুনিরাকে তুমি করে লিখতেও আমার ক্যামন ক্যামন লাগছে। সত্যি কেমন লাগছে।
গোপন বারতা মর্মে পোষে গেছি আমি অনেকদিন। অনেক মাস। অনেক বছর। একসময় নিজের উপর বিরক্ত চলে এসেছে। ভালোলাগতো না এই সব যন্ত্রণা। ঠায় আর থাকিনি। পরিবারের কথা মতো লেখাপড়া করে আজ সার্জারী ডাক্তারে এসে দাঁড়িয়েছি।
একটু আগে মুনিরার অপারেশন হলো। আরেকটি মেয়ে সন্তান হলো। মুনিরা অজ্ঞান ছিলো। আমাকে দেখেনি। আমি তাকে দেখেছি। মুনিরা যদি জ্ঞানে থাকতো তবে দূর্বল হয়ে পড়তো অপারেশনের আগেই। সে আমার কাছে প্রতারক এক নারী। তার প্রতারণায় আমাকে যে খুব ক্ষতি করতে পারেনি তা দেখলো হয়তো আগের মতোই আমার উন্নতি দেখে আনন্দিত হতো। কিছু ভালো করলে যেভাবে বলতো “যাক, একটুতো তোমার উন্নতি হলো খোকা”।
এই খোকা ডাকটা সহ্য হতো না। ভাবতাম আমি তারচে’ ছোট তাই বুঝি খোকা ডাকে। মুখটা কালো হয়ে যেতো খোকা শব্দটি তার মুখ থেকে শুনে। এবং সে যখন ব্যাপারটা আঁচ করতে পারতো; ঠোঁটে আলতু পরশ দিতো, পৃথিবীর নিয়মে আমার চঞ্চল তনু-মন কেমন নির্লিপ্ত হয়ে যেতো।
মুনিরা অজ্ঞান হয়ে আছে । এক ঘন্টার ভেতর জ্ঞান ফেরার কথা। ততক্ষনে আমার ডিউটি শেষ হয়ে যাবে। আমি বুঝে উঠতে পারছি না: কেনো আমি লুকোচুরি খেলছি তার সাথে? আমি তো কোনো অপরাধ করিনি তার কাছে? কোনোদিনই করিনি। তবু এই লুকোচুরি খেলা কেনো? আমি কি ভেতর থেকে চাচ্চি না যে, মুনিরাও আমারে দ্যাখুক? ঠোঁটে সেই পরশ না-ই বা দিলো, চোখে চোখ রাখুক?
এমন তো নয় যে মুনিরার পর থেকে ঠোঁটে বয়ে যায় নি কোনো ঝড়। আমার সংসার হলো বীথি নামে একটা বউও আছে। তবে এটা সত্য বীথি প্রথম যখন আমার ঠোঁটে বা তার ঠোঁটে আমি ঠোঁটে ঠোঁটে ব্যারিকেড দিতাম মনে হতো বীথি নয় মুনিরাই আমার সান্নিধ্যে!
মুনিরা প্রথম যে দিন কাছে ডেকে নেয়। মাথার চুল আঁকড়ে ধরে। ঠোঁটে পরশ দেয় আর বলে আজ থেকে তুমি আমাকে তুমি করে বলবে...। প্রথম প্রথম একটু অসুবিধা হতো পরে ঠিক হয়ে গেছলো। শুধু অমিত ভাইর সামনে আমি তাকে আপনি করে বলতাম।
অমিত ভাই আমার থেকে প্রায় পনেরো বছরের বড় হবেন। অমিত ভাই থাকতেন পাশের বাড়িতে, সরকারী চাকরী করতেন। পাশাপাশী থাকায় আমাদের পরিবারের সাথে ভালো একটা সম্পর্ক গড়ে উঠে। আর তাই মুনিরাও আসা শুরু করলো। মায়ের সাথে গল্প করতো। রান্না শিখতো। তারপর ধীরে ধীরে মুনিরা আমার নীরব যন্ত্রণা হয়ে উঠে। এর জন্য আমি দায়ী নয় বিন্দু মাত্র। সব কিছুর জন্য সেই দায়ী। সেই আমাকে কাছে টেনেছে। শিখিয়েছে কোন নক্ষত্রের কোন নাম। শুনয়েছেরাধা-কৃষ্ণ'র গল্প। ধীরে ধীরে কি করে যে আমরা দুজন শুধু দুজনার হয়ে যাই টের ই পেলাম না। আমাদের এমন ঘেষাঁঘেষি কেউ কখনও আঁচ করতে পারে নি। আসলে সে পথে কেউ যায় নি। কেউ হয়তো ভাবে নি যে এক সন্তানের মায়ের সাথে আমার কি আর এমন হবে, তাই এসব উড়িয়ে দিতো।
মুনিরার সাথে যে সম্পর্ক তৈরি হলো তাকে আমি বন্ধুত্বও বলতে পারি না। অমিত ভাইয়ের প্রতি তখন আমার ঈর্ষা হতো। লোকটা কেনো মুনরাকে ছুঁবে? তার চোখ, ঠোঁট, ছুঁয়ে বলেছিলাম একদিন, তারপর কি হাসি না হাসলো। সেদিনই হাসি থামিয়ে মুনিরা বললো : একদিন সকল সম্পর্ক ছেড়ে চলে আসবো, গ্রহণ করবে তো? আমি ভাবছিলাম মশকরা, তাই বলেছিলাম, “তাইলে তো আমাকেও সব ছাড়তে হবে।" আমি জেনো সেটাই চাইতাম, মুনিরা চলে আসুক।
মুনিরা আবার বলে জানো, আমাদের এ সম্পর্ক ভালোবাসার, কিন্তু এই ভালোবাসার কোনো স্বীকৃতি নেই সমাজে, পরিবারে! মুনিরার গলা জড়িয়ে আসে। আমি তার প্রতি যে কোনো উত্তর ছুঁড়বো সে ভাষা খুঁজে পাচ্ছি না।
ঠিক এভাবেই মুনিরা’রা একদিন পাশের বাড়ি থেকে চলে যায় অন্য এক শহরে। শেষ হয় না আমাদের ভালোবাসা। আরো গভীর হয়। অমিত ভাইয়ের অফিসের সময়ে আমি প্রায়ই চলে যেতাম তাদের বাসায়। কিন্তু এভাবে কতোদিন? বলি মুনিরাকে। উত্তরে সে জানায় পালাবে, সাহস আছে? আমি এক কথা রাজি। শুধু বলি তোমার ছেলে? মুনিরা বলে অমিতের রক্ত আমি সাথে নিয়ে যাবো না! অমিত ভাইয়ের সাথে কি কষ্টে ছিলো মুনিরা, বলে নি আমাকে কোনোদিনও।
ঠিক পরশু অমিত ভাই গ্রামের বাড়ি যাবে। আর মুনিরা ভোরে আসবে বাস স্ট্যান্ডে। সেখান থেকে চলে যাবো আমরা দু'জন।
আমি তার কথা মতো বাস স্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে থাকি। পক্ষান্তরে মুনিরাও তৈরি। মনে মনে পন করে যাবার আগে ছেলের মুখ দেখবে না, যদি মায়ায় পড়ে যায়। তবু বের হবার আগে ছেলেটাকে চুমু খেতে যায়। ছেলেটির দিকে তাকিয়ে ভুলে যায় মুনিরা বাস স্ট্যান্ডে কেউ অপেক্ষায়!
সকাল দশটায় আমি বাড়ি ফিরে যাই। এরপর আর কোনোদিন মুনিরার সাথে দেখা হয় না।
নার্স এসে নক্ করে, আমার মূর্ছা কাটে।
আমি ফিরে আসি আবার সাত বছর পরের জীবনাটায়। মধ্যে একটি দীর্ঘশ্বাস নদী হয়ে যায়।





সুন্দর।
ধন্যবাদ মন্তব্যের জন্য।
ভালো থাকুন।
ভালো লাগলো পড়তে
ধন্যবাদ মন্তব্যের জন্য।
ভালো থাকুন।
চমৎকার...
এটা কি আর চলবে না?
আর চালানো কি দরকার বস?
দরকার হলে চালাতে পারি।
চলুক

ভালোলাগছে কৈলম
ভালো হইসে
ধন্যবাদ মন্তব্যের জন্য।
ভালো থাকুন।
ধন্যবাদ মন্তব্যের জন্য।
ভালো থাকুন।
ভালো লাগলো খুব।খু-ব।
ধন্যবাদ মন্তব্যের জন্য।
ভালো থাকুন।
খু-উ-ব ভাল লাগলো ।
ধন্যবাদ মন্তব্যের জন্য।
ভালো থাকুন।
একটি দীর্ঘশ্বাস নদী হয়ে যায়...
ধন্যবাদ মন্তব্যের জন্য।
ভালো থাকুন।
জটিল ভাল হইছে।
ধন্যবাদ মন্তব্যের জন্য।
ভালো থাকুন।
সে এক অন্য রকম ভালবাসা...খুব ভাল লাগলো...
ধন্যবাদ মন্তব্যের জন্য।
ভালো থাকুন।
মোহ আর মায়া...
...সমাপ্তিটাই প্রাপ্তি হৈছে, বেশ সুন্দর..
ধন্যবাদ।
ভাল্লাগছে
এসব এতো হচ্ছে আজকাল চারপাশে যে পড়তেও আমার ভয় লাগে।
বর্ননা একদম জীবন্ত। লেখক সার্থক।
ধন্যবাদ আপু।
মায়ের মমতার কাছে আর সবই তুচ্ছ, আসলেই! ভালো লাগল। তবে, সোহাগ, মনিরাকে হয়ত আরো একটু মেলতে পারতে, গল্প যে বলে গেল, তাকেও।
ধন্যবাদ আপু।
ভালো লাগল...
বর্ননার কারনেই লেখাটায় এতো টান লাগল... নামটা সুন্দর হইছে...
ধন্যবাদ।
মন্তব্য করুন