আড়ালের মানুষ
বাবা শব্দটা আসলে মা শব্দটার মত অত মধুর নয়। মা বললেই আমাদের সামনে আসে মমতাময়ী নারী যিনি বাসায় আসতে দেরী হলে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করেন। পাশে বসে ভাত খাইয়ে দেন। আর বাবা!! বাবা বলতে আমরা সাধারনত বুঝি গুম্ফধারী এক ব্যক্তিকে যিনি বাসায় আসতে দেরী হলে কোমড়ে হাত দিয়ে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করেন, আর বিরবির করে বলতে থাকেন “হারমজাদাটা আজকে আসুক। পিটিয়ে আড্ডাগিরি যদি না ছুটাইছি??” ইনিও প্রায়ই খাবার টেবিলে সঙ্গপ্রদান করে থাকেন। তবে তা মার তুলনায় চিরতার রসের মত সঙ্গ। এই সময় আলোচনা চলে পাশের বাসার অমুকের ছেলে তমুকের জীবনের সাফল্যের কথা।
প্রকৃতপক্ষে এ কথাটা স্বীকার করতে বাঁধা নেই যে জীবনের একটা পর্যায়ের আগ পর্যন্ত এই বাবা ব্যক্তিটা আমাদের হৃদয়ে খানিকটা সোপ অপেরার ভিলেনের জায়গাটাই দখল করে রাখে। এই ভালো আর এই মন্দ। মাকে নিয়ে লিখেছি। আরো লিখব-সারাটা জীবন। বাবা বেচারাকে নিয়ে লিখবোনা? তা কি করে হয়? না তাই আজ লিখেই ফেলছি বাবাকে নিয়ে। এই বাবা আমার বাবা। ইনি কোন নায়ক নন। ইনি ছবির নায়ক বা নায়িকার বাবা নন যে গ্রাম থেকে শহরে এসে পাতিল বেঁচে কোটিপতি হয়েছেন। ইনি নাটকের আদুরে “ওল্ড ম্যান” নন যে চাহিবা মাত্র গাড়ির চাবি দিয়ে দিবেন। এ শহরে হাজারো মানুষের ভীড়েই আপনারা তাঁকে পাবেন সারাটা জীবন সংগ্রামরত অবস্থায়। ফ্যাকাশে রোদে পোড়া চেহারা তাঁর-কিন্তু চোখে স্বপ্নেরা এখনো উঁকি দেয়। হয়ত অফিস ফিরতি পথে আপনার পাশে বাসের সিটে যে বসে আছে আপনি তাঁর মাঝেই আমার বাবাকে খুঁজে পাবেন।

আসলে আমার কাছে প্রতিটা বাবাকে পিরামিডের শীর্ষবিন্দু বলে মনে হয়। আমার বাবার সবচেয়ে প্রথম লক্ষনীয় বৈশিষ্ট হল মোচ। কালো রঙের সে মোচ ছোটবেলা থেকে দেখতে দেখতে আমার কাছে মোচ ছাড়া বাবাগুলাকে বাবাই মনে হতোনা। আবার বাবা মানে বকা, ক্ষেত্রবিশেষে পিটানো। আবার বাবা মানেই ভালবাসার এক অদৃশ্য চাদর। চিন্তা করে দেখুন আপনার যেকোন সমস্যা হলে বা আপনি ভেঙে পড়লে জায়নামাজে নিশ্চপ বসে স্রষ্টার কাছে মুক্তি মাঙছে বাবা।
আমার মনে আছে ২০০৬ সালের কথা। আমি ইন্টারমিডিয়েট পাশ করলাম। সারাজীবনের প্রকৌশলী হওয়ার স্বপ্ন পূরনের জন্য ভর্তি পরীক্ষা দিলাম বুয়েটে। বিধি সহায় হলোনা। টিকলাম না। চুয়েটে দিলাম- কোনমতে টিকে যন্ত্রকৌশলে ভর্তি হলাম। জায়নামাজে বসে পিতার সে কি শুকরিয়া আল্লাহর দরবারে। সকালে উঠে আমাকে বললেন তোর আর কোথাও দেয়ার দরকার নাই। তোর মত গাধার পিছনে আর খরচ করার দরকার নাই। আমি যথারীতি ঝগড়া করে চাচার বাসায় গেলাম। ফিরে দরজার আড়ালে শুনি বাবা মাকে বলছেন-“ছেলে আমার বুয়েটে টিকে নাই। যদিও এটা ওর ভুলের জন্যই-কিন্তু তার শাস্তিও ও পাইছে। চুয়েটে টিকেছে। ওতেই চলবে। এখন একটু ঘুরাঘুরি করুক। এদ্দিন অনেক চাপে ছিল। আর কোথাও ভর্তি পরীক্ষা দেয়ার দরকার নাই”। এভাবেই বাবাকে আমরা পাই আমাদের পাশে সর্বদা কিন্তু আড়ালে। তিনি থাকেন আমাদের পিছনে। মাঝে মাঝে অনেক জোড়ে ধাক্কা দেন। আমরা ভাবি “কি ব্যাপার? ধাক্কা দিল কেন?”পরে আমরাই বুঝি পা হড়কে গিয়ে পড়তে বসেছিলাম আমরা। ধাক্কা দিয়ে সোজা করে দিয়েছেন আমাদের। মা হচ্ছেন স্বচছ জলের মত। তার আদর ভালোবাসা তাই আমরা বুঝি সহজেই।
বাবা হল টিপিক্যাল অস্কার জেতা ছবি বা আমার মেশিন ডিজাইন বইটার মত-যার রস পেতে হলে, যাকে ভালোবাসতে হলে অনেক গভীরে যেতে হয়। যেমন এই সালে আমি ইঞ্জিনিয়ার হলাম। চাকুরি তো আর আসেনা।দুই মাস বসে রইলাম। সিভি দেই আর দেই। একটা বেসরকারী ব্যাংকে লিখিত এক্সাম দিলাম। এরপর রেজাল্ট দেয়না ...।দেয়না...। আমি বাবার গোমড়া মুখ দেখি- ভাবি বেকার ছেলে বসে বসে খাচ্ছে তাই তার মন খারাপ। একদিন লোডশেডিং এর অন্ধকারে আমি চিনলাম বাবাকে আবার নতুন করে। সুর্যের আলো বা হাজার ওয়াটের বাতি যা পারেনি- লোডশেডিং এর ঘন অন্ধকার পারলো। আন্ধকারে আলোকিত আমার বাবার চ্যাপ্টারটা আমার হৃদয়ে। অন্ধকারে হয়ত খেয়াল করেননি আমি বসে আছি। ছোটবোনের হাত থেকে চায়ের কাপ নিলেন। আমার বোন মোম হাতে নিয়ে বলে, “আব্বু সারাদিন প্যাঁচার মত মুখ করে রাখো কেন?” বাবা বলেন, “তোমার ভাইয়ের কথা চিন্তা করি মা। আমি ব্যার্থ মানুষ-টাকা পয়সা ও নাই। ওর তো মামা চাচা নাই। না হলে ওর মত এমন একটা ছেলে চাকুরি না পায়? এত ভালো ছেলে আমার- আমি কিছুই করতে পারলাম না।”
তারপর আমি আধা কমিউনিস্ট মানুষ। নামাজ পড়ি শুধু জুমার নামাজ আর মাঝে মাঝে অন্যান্য ওয়াক্ত। আমার কথা তো আর স্রষ্টা শুনবেনা। কিন্তু একজন বাবার কথা মনে হয় ফেলতে পারেন নাই। এবার ঠিক ঈদের দুইদিন আগে একটা চাকুরির এপয়েন্টমেন্ট লেটার এল। ১ ডিসেম্বর জয়েন করব। মানে আমার প্রতিটা বিপদের সময় অসাধারন ভাবে বাবা লোকটা থাকেন কিন্তু ঐ যে আড়ালে। তাঁর উপস্থিতি বুঝতে হলে অনেক গভীরেই যেতে হয়।
বাবা নিয়ে আর কিছু লিখবোনা। কারণ আমার মন অত গভীরে যায়না। তারপরো যদি বারবার পৃথিবীতে আসতে হয় তবে আমি আবার আসতে চাই আমার এই বাবার কাছে। পৃথিবীর সকল আড়ালের মানুষের জন্য রইল শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা।





খাঁটি কথা লিখেছেন।
ধন্যবাদ সাহাদাত ভাই। ভালো থাকবেন।
নতুন চাকুরীর জন্য অভিনন্দন।
নিজেকে ভাগ্যবান ভাবতে পারেন। অল্প কিছুদিন আগে এইচএসসি পাশ করেছেন। ২০১০-এ গ্রাজুয়েশন কমপ্লিট। এমনকি বছর না ঘুরতে চাকুরীও হাজির! এমন কয়জনের হয়?
অশেষ শুভকামনা রইলো। আর এই খবর মিষ্টি ছাড়া দেয়া ঠিক না।
মীর ভাই ধন্যবাদ। আসলেই ভাগ্য একেবারে খারাপ না।
প্রথমে শুভ কামনা নতুন চাকরীর জন্য।
আমার বাবা তোমার বাবা সবার বাবা ভাল থাকুক।
আপনার বাবা দেখি আমার বাবার মতোই। আমার বাবার মৃত্যুদিবস ছিল গত ২১ নভেম্বর। তাই বাবা অনেক বেশি মন জুড়ে। বাবা থাকতে এতোটা বুঝিনি।
কনগ্রাটস। কৈ জয়েন করছেন?
শখত মামা, বললাম না ঘুরে ফিরে বাবাগুলা সব একই মানুষ নানা চেহারায়। আল্লাহ আপনার বাবার বেহেশত নসিব করুক।দোয়া রাইখেন। আশা করি আমার কপাল ভালো হইলে পিকনিকে দেখা হবে।
শুভ কামনা রইল .....।
সবার মা/বাবা ভাল থাকুক .....।
ধন্যবাদ
আশফাকুর র, শুভ সংবাদ পেয়ে খুশী হলাম । একজন বাবা ছেলের চাকরী প্রাপ্তিতে খুশী হচ্ছেন এ জন্যও আমি খুশী । বাবাদেরকে সুন্দর করে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, এজন্য ধন্যবাদ । অভিনন্দন আশফাকুর র ।
ধন্যবাদ নাজমুল ভাই।
বাবারা এমনই। তবে আমরা বোধহয় ভিন্নরকম হব।
ধন্যবাদ আশফাকুর।
ধইন্যা। তবে আমার সিরিয়াল আসতে বহুত দেরী। দিল্লী অনেক দুর।
আমার বাবা নরম-সরম, মোচ নাই বলেই মনে হয়।
হুমম। তাই তো মনে হচ্ছে।
অভিনন্দন আশফাকুর... বাবাকে নিয়ে বেশ ভাল লিখেছেন... আমার বাবা চলে গেছেন ৩১ অক্টোবর ২০০২। আজকাল বাবাকে খুব মিস করি। জীবিত সব বাবারা সুখে থাকুক। চলে যাওয়া বাবাদের আত্মার শান্তি হোক... পিকনিকে দেখা হবে
ধন্যবাদ য়াজাদ ভাই
অভিনন্দন আশরাফুর।
বাবার ব্যাপারে লিখতে আমিও ভয় পাই। তবে কোন একদিন সাহস করে উঠবো নিশ্চয়ই।
ধন্যবাদ নীড় দা
....এ শহরে হাজারো মানুষের ভীড়েই আপনারা তাঁকে পাবেন সারাটা জীবন সংগ্রামরত অবস্থায়। ফ্যাকাশে রোদে পোড়া চেহারা তাঁর-কিন্তু চোখে স্বপ্নেরা এখনো উঁকি দেয়। হয়ত অফিস ফিরতি পথে আপনার পাশে বাসের সিটে যে বসে আছে আপনি তাঁর মাঝেই আমার বাবাকে খুঁজে পাবেন....
।আশফাকুর র. বাবাকে হারিয়েছি বিশবছর আগে...।এতো দিন পর আপনার লেখার মাঝে সেই 'হারানো' বাবাকে আবার যেন খুঁজে পেলাম। আবেগের অতিসয্যে চোখ দুটি ঝাপসা হয়ে গেছে। নিজের বাবার কথা বলতে গিয়ে আপনি যেন আমার বাবারই ছবি এঁকে ফেলেছেন। আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।
ধন্যবাদ।
খুব মনকাড়া লেখা। ছুঁয়ে কান্নার রঙ ছুঁয়ে জ্যোস্নার ছায়া
ধন্যবাদ আপু।
আশফাক, জীবনের প্রথম চাকরী কেমন উপভোগ করছেন ?
খুব বেশী ভালো না নাজমুল ভাই। আমাকে মৌলভিবাজার বদলি করে দিসে। পিকনিক বাদ
হায়, হায়, কপালে সাক্ষাৎ নাই । যে কাজই করুন না কেন, ভালবেসে করবেন । ভাল থাকুন ।
কপালে সাক্ষাত নাই? আছে নাজমুল ভাই দেখা হবেই-আজ না হয় কাল.।
মন্তব্য করুন