কৃষ্ণকলি আমি তারে বলি
আজ সারাদিন চট্টলায় একরকম ঝুম বৃষ্টি হল বলা যায়।সাধারনত আমি বৃষ্টি অপছন্দ করি খুব অপছন্দ করি দুই চোখে দেখতে পারিনা।কারণ জানিনা। সাধারণত হটাত বৃষ্টি হলে আমি একটা “বোল্ট” দৌড় দেই কোন ছাদের নিচে।সেটা অবশ্য যতটা না বৃষ্টির প্রতি ঘৃণা থেকে তারচেয়ে বেশি জন্মগত এজমাজনিত সমস্যার ভয়ে।কিন্তু জীবনে আমি গোণা পাচ বার বৃষ্টিতে আস্তে আস্তে হেটে গিয়েছি খুব আস্তে আস্তে খুব আস্তে ভিজতে ভিজতে। কারণ কখনো কখনো আকাশের জলের আড়ালে নিজের চোখের পানি লুকিয়ে ফেলাটা জরুরি বেশ জরুরি।
দিনটা আমার স্পষ্ট মনে পড়ে। ২০০৭ সালের ৭ই সেপ্টেম্বর।আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস থেকে জিইসি মোড়ে নামার সাথে সাথে বৃষ্টি। সাথে সাথে একটা দোকানের ভিতরে আশ্রয় নিলাম এবং সময় ও ক্ষুধা কাটানোর জন্য জিলাপি চিবাতে ব্যস্ত হলাম।ঝাড়া আধা ঘন্টা পর বৃষ্টি থামল।মেজাজ খারাপ করে বের হলাম।কারণ আজ রিক্সাতে চড়ে টিউশনিতে যেতে হবে।রিক্সায় উঠতে না উঠতে একটা মেয়ে এসে বলল, “আপনি অনিককে পড়ান না? আমি ওদের বাসার উপরতলায় থাকি।আমার কাল একটা টিউটরিয়াল আছে।রিক্সা পাচ্ছিনা।”আমি আর কিছু না বলে রিক্সা থেকে নেমে গেলাম।রিক্সায় চড়ে সোজা চলে গেল।আমি কষে মনে মনে একটা গালি দিলাম।টিউশনিতে ঢুকার পর আবার হারমজাদার বৃষ্টি নামল।ছাতাও আনি নাই।পড়ানো শেষ হলে কিছুক্ষণ একথা ওকথা বলে সময় কাটিয়েও দেখি বৃষ্টি কমার নাম নাই।বাসা থেকে বের হলাম।নিচে নামার পর দেখি উপর থেকে কে যেন ডাকে।আমি উপরে তাকিয়ে দেখি বিকালের ঐ মেয়েটা।আমি দাড়ালাম নিচে নেমে বলল আপনি ছাতা আনেননি?।আমি বললাম “না”।ও একটা মেয়েলি ফুলফুল মার্কা ছাতা এগিয়ে বলল “এটা নিয়ে যান”।ছোটবেলা থেকেই আমার সবচেয়ে প্রিয় শব্দ “না”।আমি কষে বললাম “না লাগবেনা”।তারপর কি ভেবে আবার বললাম “আচ্ছা দিন।পরশু দেখা হবে”।ছাতা খুলে চলে গেলাম।হলে এসে আমার ছাতাটা মেলে দিলাম শুকানর জন্য।আমার দুই রুমমেট বলল “ছাতাটা সুন্দর।চলন্ত বাগান মার্কা ছাতা।তোর চয়েস খারাপ জানতাম! এত খারাপ এটা জানতাম না”।আমি কথা না বাড়িয়ে বাথরুমে গেলাম-এসে দেখি রুমমেট তোর কি আজ বাসে ছাতা চেঞ্জ হয়ে গেছে। আমি বললাম “কেন”। “যদ্দুর জানি তোর নাম এনি না।আর তুই চবিতে বিবিএ পড়িস না” । আমি বললাম ফালতু কথা বলিস না।ও বলল “মাদারি তুমি কার না কার ছাতা নিয়ে আসছ দেখ।আর আমারে বল ফালতু না।”আমি দেখি ছাতার ভিতরের পিঠে লেখা “Annie BBA -CU”।
সারারাত কোন কারণ ছাড়া ঘুম আসছিলোনা।মাথা ঘুরছিল--******এনি -বিবিএ সি।ইউ।*********
অপেক্ষার প্রহর দীর্ঘ হয় জানা ছিলোনা।আজ মনে মননে টের পেলাম।আমার মনে হল হটাত করেই আমি আমার প্রথম স্বার্থক প্রেমে পড়ে গেছি।স্বার্থক বলার কারন আমি কলেজেও একটা মেয়েকে পছন্দ করেছিলাম। সে যাক গা অবশেষে ‘পরশুদিন’ আসল।আমি ছাতা নিয়ে টিউশনির উদ্দেশ্যে বাসে উঠলাম।জিইসি নেমে বেশ অপেক্ষা করলাম।তারপর ভাঙা মনে হেটে হেটে টিউশনিতে আসলাম।পড়ান শেশ হল। বের হলাম- উপর তলায় গিয়ে বেশ কিচুক্ষণ দাঁড়িয়ে তারপর বাজালাম রিং।এক মাঝ বয়সী মহিলা দরজা খুলে বললেন “কাকে চান আপনি”।আমি কিছু কথা বলে ছাতা দিয়ে চলে আসলাম। ভাবলাম না আর হলনা এ জীবনে আমার আর প্রেম হলোনা।কাছাকাছি কিছুও না।
\\\কৃষ্ণকলি আমি তারে বলি\\\\\\\\
এরপর আবার একদিন দেখা হল।সেই জিইসির মোড়ে –সেই যাওয়ার পথে।তবে এবার রিক্সায় চড়ে গেলাম একসাথে।কথা শুনতে শুন্তে।আমাকে বলল “আশফাক আপনি খুব কম বলেন?”আমি বললাম “কই না তো।”তারপর তার হাসি।হ্যা আমি সত্যি তার প্রেমে পড়েছি।আমার এক বন্ধু পরে একবার বলেছিল “”প্রেমে পড়লি তো পড়লি এক কালীর সাথে”। আমার মাথায় খুন চেপে গিয়েছিল। আমি নিজে কি ফর্সা আমি নিজেও কালো—ও হারামজাদা বলে তাইলে ঠিক আছে ভাল।
তোমার মাঝে অন্য কিছু ছিল।একটা মায়া-একটা টান-আমার প্রথম যুগপত ভাললাগা ভালবাসা।কেমন করে বলে ফেলেছিলাম জানিনা।সেদিন গলায় ভালবাসার প্রচন্ড বাসনা,তোমাকে হারানোর প্রচন্ড ভয় আমার গলায় অসুরের শক্তি দিয়ে ছিল।রিক্সাতেই বলে ফেলেছিলাম এত জোড়ে যে আর তাড়াতাড়ি যে রিক্সাওয়ালাও থামল তুমি যে বিহবল দৃষ্টিতে তাকিয়েছিলে তা আজো চোখে ভাসে।তোমার কথাটা যা তুমি জবাবে দিয়েছিলে তা হয়ত আজ অনেকেই বিশ্বাস করবেনা-“যে জোড়ে বললা-কান একটা পুরা গেছে।আর কেউ পছন্দ করবেনা।একে ত গায়ের রঙ কালো তা্রউপর এক কান নষ্ট।”
তারপর দিনগুলা মারাত্মক যেত।স্বপ্নের মত জীবন কাটছিল।শনিবার বাসা থেকে আসার পথে সকালে তোমাকে নামিয়ে দিতাম ষোলশহর রেলস্টেশনে।কাউকে কখনো বুঝতে দেইনি আমি কাউকে ভালবাসি।কখনো ধরা দেইনি কারো সামনে।একবার ফাল্গুনের প্রথম দিন তোমাকে আমাকে আমার ক্লাসের এক সহপাঠিনী দেখে ফেলে।আমি নানাভাবে ঘটনা ঘুরাই। তুমি সেদিন আমাকে বলেছিলে “আমাকে ভালবাস, আমার সাথে প্রেম এ কথা জানাতে তোমার খুব বাধে তাই না”। আমি সেদিন কথাটার ধাক্কা সামলাতে না পেরে ঠিক জবাবটা দিতে পারিনাই।আসলে আড়ালে থেকে চলতে আমার খুব ভাল লাগত।কেন জানি মনে হত কি দরকার মানুষ জানানোর। তুমি দরকার মনে করতে।তুমি মনে করতে ভালবাসা মানে চিৎকার করে সবাইকে জানানো –“এ শুধু আমার।” আমি ভাবতাম ভালবাসা মানে ছায়া হয়ে থাকা।প্রবল ঝড়ে কিংবা গাড় অন্ধকারে অনেক দূরে থেকেও তোমার কাছাকাছি থাকা-নিরবে তোমার হাসির শব্দ শোনা বা তোমার কান্নার সময় রুমাল এগিয়ে দেয়া।আমি সবসময় তোমার সাথেই থাকতে চেয়েছি।কখনো তোমাকে দূরে রাখতে চাইনি।কিন্তু তোমার স্বপ্ন আমাকে ভয় দেখাত। তুমি আমার ইঞ্জিনিয়ারিং এর তৃতীয় বর্ষ থেকে আমরা একসাথে ওটা করব এটা করব।তুমি চাকুরি করবে আমি বাসায় থাকব। আমাকে ভয় দেখাত-আমি খুব ভয় পেতাম।
তোমার সাথে পয়লা বৈশাখ কাটালাম।অদ্ভুত এক পয়লা বৈশাখ ছিল।আমার জীবনে সুদুর স্বপ্নেও আমি ভাবিনি কোন এক বৈশাখ কারো হাত ধরে আমি দাড়াব।ভাবিনি কখনো প্রচন্ড ভীড়ের মাঝে আমার হাত টা কেউ এত শক্ত করে ধরে রাখবে।
সেই বৈশাখ ই যে শেষ হবে তাও কখনো ভাবিনি।তুমি চলে গেছ- রেখে গেছ একগাদা স্মৃতি,স্পর্শ।বছর ঘুরে আরেক ফাল্গুনের সামনে আমি দাঁড়িয়ে একা।আমি এজন্যই স্বপ্ন দেখতে ভয় পেতাম।হারানোর আশংকায় জড়োসড়ো থাকতাম। কি দরকার ছিল এভাবে আসার......আর কি দরকার ছিল চলে যাবার এভাবে...।।
গত বছর খানেক কাউকে বুঝতে দেইনি।নিজের ভিতরেই আগলে রেখেছি তোমাকে...যখন ছিলে তখনো কাউকে জানাইনি।আজ নেই সে ব্যাথা শুধু আমার।তোমার ছোট বোনটার সাথে দেখা হয় মাঝে মাঝে...আমার দিকে মাঝে মাঝে অবাক হয়ে তাকায় মাঝে মাঝে বলে আশফাক ভাইয়া আপনার কি কিছু করার ছিল?কিছু কি ছিল?
জানিনা এভাবে আর কতদিন পারব।কিন্তু এক অতি সাধারন এক মানুষের জীবনে তুমি অনেকটা দিন স্বুর্গের আলো হয়ে ছিলে।তোমার কাছে আমার অনেক ঋণ......
আজ অনেল=ক দিন পর বৃষ্টিতে হাটলাম।কারণ মাঝে মাঝে যে কাদতে ভাল্লাগে...।।





আমরা সবাই বুঝি বুকের ভেতর এরকম চেনা দুঃখ কিংবা সুখের স্মৃতি বয়ে বেড়াই। পথ চলতে চলতে জানা হয়ে যায়, ওর দুঃখ আমারই মতো...।কিংবা সুখের স্মৃতিটা আমারই যেনো। তবে কী আমরা সবাই পরস্পরের আয়না? একে অন্যের ভেতর নিজের চেহারা দেখে থমকে যাওয়া কেনো তবে!.... আপনি এক ব্যাপক গুণের আধিকারী, সময়ে 'না' বলাটা সবাই ঠিক পারে না। মনটা উদাস করা পোষ্টের জন্য আপনাকে ধুমাইয়া মাইনাস দেয়া উচিৎ কিন্তু দিয়ে গেলাম অনেককককককককক শুভকামনা আর ভালোবাসা। ভালো থাকা হোক নিরন্তর।
লেখাটা যত না সুন্দর তারচেয়ে অনেক সুন্দর একটা কমেন্টের জন্য আপনার প্রতি ও রইল অনেক শুভকামনা ও ভালবাসা।
।
ভাল লাগল , প্রিয় তে নিলাম। ভাল থাকুন।
অনেকদিন পর এমনি হাবিজাবি লিখলাম।আপনার এত ভালো লেগেছে জেনে খুব ভাল লাগলো।ধন্যবাদ।
ছ্যাকা মার্কা লেখা ভাল লাগেনা।

তবে আপনার অনুভূতি বুঝতে পারছি। ব্যাপার না, ভগবান যা করেন ভালর জন্যই করেন। ভাল থাকবেন।
চেনাশোনা জায়গা দিয়ে হেটে গেছেন, বৃষ্টিতে ভিজছেন.....লেখা পড়ে ব্যাথা পাওয়ার মতো।
আছেন কিরম? কই গেছিলেন?
ভাল আছি। আপনি কেমুন আছেন-আপনার বাবুটা কেমন আছে?ওর জন্য কাক্কুর পক্ষ থেকে শুভকামনা রইল।
লেখা ভালো পাইলাম। এইভাবে অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ সবাই পারে না।
ধন্যবাদ মীর ভাই।অনেক দিন পর কথা হল?ভাল আছেন?
পুরো লেখার এই এক জায়গাতে আমি মুগ্ধ হয়ে গেলাম। আপনার কষ্টেও না হেসে পারলাম না
কিছু বলতে ইচ্ছে করে না
দুঃখের গল্প, শুধু গল্পই যেন হয়
চেনাজানা জায়গার নাম দেখলে কেমন আপন-আপন লাগে
নিয়মিত লেখা আসুক
ভাবলাম জ্যাকেটের পর এবার আসল ছাতি। কিন্তু এভন আর সেইটা নিয়া কিছু বললাম না।
মন্তব্য করুন