ইউজার লগইন

শাশ্বত ছাব্বিশ

-‘মুক্তি’ আর ‘স্বাধীন’ ! প্রজন্ম ,৭১ আর প্রজন্ম ’৭৫ ! কাকতালীয়ভাবে দু’জনই মাতৃ-পিতৃ হারা ! আমার মায়ের কোলেই মানুষ, আমার মাকেই মা ডাকে !
-মুক্তির জন্ম ১লা এপ্রিল ’৭১ । জন্মটাই তার জীবনে চিরকালের জন্য এপ্রিল ফুল হয়ে আছে । জন্মের আগেই বাপকে খুইয়ে বসেছিল, জন্মের পর মাকে । ছোট চাচা ছিলেন BIWTC’র সিনিয়র নাবিক, চীফ ড্রাইভার । ক্র্যাক ডাউনের দিন তার জাহাজ ছিল নারায়ণ গঞ্জ টারমিনালে । ২৬ এর প্রথম প্রহরে ক্রু সহ চীজ হয়ে গেছিল ওটা । ঈংগীতে সবাইকে কেটে পড়তে বলেছিলেন চাচা । সুযোগ বুঝে নিজেও চেষ্টা করেছিলেন । পারেন নি, ধরা পড়ে গেছিলেন । শুনেছি খুব নির্দয় ভাবে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে তাকে হত্যা করেছিল পাকিরা । বিবস্ত্র লাশ ঝুলিয়ে রেখেছিল তারই প্রিয় “অষ্ট্রিচ” এর মাস্তুলে । মুসলমানীত্বের শারিরীক চিহ্নটি থাকা সত্বেও মালাঊন অপবাদে তাকে খুন করেছিল হায়েনারা ।

-মুক্তির জন্মের ছ’দিন পরেই দূর সম্পর্কের এক কাজ্বিন খবরটা নিয়ে আসেন । ভাগ্য বরাত ডুব সাঁতারে বেঁচে গিয়েছিলেন তিনি । আমাদের পুরো পরিবারের উপর কহর নেমে আসে ! বাবার অবর্তমানে চাচাই ছিলেন আমাদের এক মাত্র অবলম্বন । তাকে হারিয়ে দু’চোখে আঁধার দেখলেন মা ! অনিন্দ সুন্দরী চাচীমা পাগল প্রায় হয়ে যান ! তাঁর করুণ বিলাপে গাছের পাতারা ঝড়ে পড়তো, বাতাস হয়ে উঠতো ভারী, জোৎস্নারা ফিকে হয়ে যেতো, আঁধার হতো গাঢ় ! পরিবারের সবাই, পাড়া-পড়শী, তরু-লতা সহ পুরো প্রকৃ্তিই যেন তাঁর সাথে কাঁদতে বসে যেত । জীবনের সব রঙ মুছে গেছিল তাঁর । নাওয়া খাওয়া ত্যাগ করলেন তিনি । মা, ভাইয়া, আমি অনেক করেও ফেরাতে পারলাম না তাঁকে ! এক রত্তি মুক্তির ছোট হাত দু’টি মাকে ধরে রাখার মতো সবল ছিলনা । চাচার ২১ ‘শের দিন সব বাঁধন কেটে তিনি চাচার পথে চরণ রাখলেন ! মুক্তিকে বুকে চেপে মা অশ্রু চাপলেন ! চাচীমা বলতে অজ্ঞান ভাইয়া কিন্তু একটুও কাঁদলেন না ! সে বিকেলে ভাইয়ার ডাগর চোখ দু’টিতে ধিকি ধিকি জ্বলছিল দুই হাবিয়া দোজক ।

- সে রাতেই মায়ের সাথে কি যেন কথা হয় ভাইয়ার ! গভীর রাতে আমাকে ঘুম থেকে তুলে ভাইয়া বলেন, “ চল মুন্না” ! বাইরে ভাইয়ার সাথীরা অপেক্ষা করছিলেন ! চিরকালের বাঙ্গালী মায়ের মতো মা কিন্তু কাঁদতে বসলেন না । কপালে চুমো খেয়ে সবাইকে আল্লাহর হাতে সঁপে দিলেন । ছোট মুক্তি ছাড়া মায়ের ঘরে আর কেউ রইল না ।

- ট্রেনিং শেষে প্রায় তিন মাস পর একদিন ফিরে আসি আমরা । খিরামের গহীণ জঙ্গলে পরম মমতায় আমাদের গ্রহণ করেন ইঊছুপ মাষ্টার, টুপি ইঊছুপ নামে যিনি সমধিক পরিচিত ।

- এ ক’মাসে দেশের অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে বেশ । পরিস্থিতি ক্রমে ক্রমে অনুকূলে আসছে । প্রায় সব গ্রামে মুক্তিদের জন্য শেল্টার তৈ্রী হয়ে আছে । জীবন আর ইজ্জতের ঝুঁকি নিয়ে ও হাত বাড়িয়ে আছে মানুষ । এমন ও দেখা গেছে ভিন গাঁয়ের মুক্তিযোদ্ধাকে বাঁচানোর জন্য শহরে পড়ুয়া অবিবাহিত নিজের মেয়ের জামাই বলে পরিচয় দিয়েছে মানুষ ।

- আমাদের গাঁয়ের খবর ও পাওয়া গেল । মুক্তি হওয়ার অপরাধে বাড়ী ঘর জ্বালিয়ে দে’য়া হয়েছে আমাদের । আমাদের সাথে আর যারা ছিল তাদের ও । মিঞা বাড়ীর মেজ মিঞা নিজেই সাথে করে নিয়ে এসেছিল পাকিদের । পুরো গাঁয়েই তান্ডব চালিয়েছে কুকুর গুলো । মিনা ভাবী, শ্যামাদি, তরু আপু সহ গাঁয়ের সোমত্ত প্রায় সব মেয়ে লাঞ্ছিতা হয়েছেন ! জান খুইয়েছেন ইদু মাষ্টার, ধীরেন কাকু, কালু বেপারী, মদন খুলু, নিরঞ্জন কবিরাজ, মনির মুনশি । মুনশির অপরাধ, উনি মেজরের হাতে পায়ে ধরে বলেছিলেন, ‘আল্লকি ওয়াস্তে রহম কিজিয়ে ! ছোড় দিজিয়ে ছবকৌ ! আল্লাকি বান্দা হ্যায়না ! ইনসান হ্যায়না’ ! এতে বেজায় চটে গিয়েছিল ‘খান কি বাচ্চে’ । ‘ফায়ার’ ! হুকুম দিয়েছিল । খুব কাছে থেকে গুলি করেছিল একজন সিপাই । মুনশির মগজ ছিটকে পড়েছিল মেজরের মুখে ঠোঁটে । চড়-থাপ্পর-লাথি-বেয়নেটের খোঁচা খেয়েছে অনেকে । একটি মাত্র সকালের মধ্য গাঁওটা বিরাণ হয়ে গেছিল ।

- মাকে অবশ্য ওরা পায়নি । আগের দিন সাঁঝে রাজাকারদের ঘুরাঘুরি দেখে মা আঁচ করতে পেরেছিলেন । কাউকে বুঝতে না দিয়ে রাত থাকতেই মুক্তিকে নিয়ে বহুদূরে বড় খালার বাড়ী পালিয়ে গেছিলেন ।
- আরো জানা গেল দেবদের প্রকাণ্ড বাড়ীটা দখল করে নিয়েছে মিঞারা । রাজাকার ক্যাম্প বসিয়েছে ওখানে ।

- পরের রাতে আমরা দেব বাড়ী রেইড করি । বিনা প্রতিরোধেই সারেন্ডার করে দেশী কুত্তা গুলো । মহিলা আর বাচ্চাদের ছাড়া মিঞয়াদের কাউকে পাওয়া যায়নি । রাতে নাকি মিঞরা এখানে থাকেনা । কোথায় থাকে রাজাকারেরা জানেনা । আমাদের প্রথম অপারেশন অনেকটা ব্যর্থ বলা যায় ! তবে মিঞারা সে দিনের পর গাঁয়ে আসেনি আর । ১৫ অগাষ্ট ‘৭৫ র পর্যন্ত কেউ গাঁয়ে দেখেনি তাদের । পরে অবশ্য ফিরে আসে ওরা, বিপুল প্রতিপত্তি নিয়ে । এখন নাকি তাদের কারো কারো নাম স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় বেশ উপরের দিকেই নিবন্ধিত আছে । সে অন্য এক ইতিকথা, ভিন্ন প্রেক্ষিত । মোট কথা কোন না কোন অজুহাতে শ্ত্রুরা মাফ পেয়ে গেছে ।

- দ্রিম দ্রিম টা টা ! ১৬ ডিসেম্বর ’৭১ সমগ্র মেদিনী কাঁপিয়ে ‘দি রয়েল বেঙ্গল’ আপন জন্ম ঘোষণা করে । ‘জয় বাংলা’ শ্লোগানে দীর্ণ হয় আকাশ । শোককে দূরে ঠেলে রেখে মুক্তির আনন্দে মেতে উঠে পুরো জাতি । প্রসব যন্ত্রণায় কাতর জননীকে নয় মাস যারা অবজ্ঞ্রার চোখে দেখেছিল, শয়তানের চেলা সে আমেরিকা সহ গোটা দুনিয়া অভিনন্দন জানাতে এগিয়ে আসে ।

- কালের চাকায় দিন গড়ায় । রক্ত আর ইজ্জতের দামে কেনা স্বাধীনতার রঙ এরই মাঝে ফিকে হতে শুরু করেছে । প্রাথমিক ঘোর কেটে মানুষ অবাক হয়ে দেখে, মাত্র ক’মাসেই একেবারে পাল্টে গেছে তাদের চেনা পৃ্থিবী । তেল, নূন, মরিচ, পেঁয়াজ নিত্য প্রয়োজনীয় সব কিছুতে আগুন । আইন শৃঙ্খলা্ বলতে কিছুই নাই । খুন-ধর্ষণ, ছিনতাই আর লুঠপাটের স্বর্গে পরিণত হয়েছে দেশ । কিছু মানুষ অল্প দিনে চেকনাই-চর্বিতে থলথলে । বাকি্রা নূন আনতে পান্তা ফুরোর দলে । আমার বোকা সোকা মা বিস্ময়ে বিমূঢ় ! ‘ হায় আল্লা ! এমনতো হবার কথা ছিলনা ! পাকিরা লুঠে নিচ্ছিল বলে ছেলেরা জান দিয়ে ওদের তাড়াল ! আর এখন দেশী পাকিরা চেটে খাচ্ছে সব । এই তোর কেমন বিচার মাবুদ’ ? মা বিড় বিড় করেন ।

- বরাবর ভাল ছাত্র ভাইয়া মাষ্টার্সে প্রথম হন । ভার্সিটি সুযোগ দেয় তাঁকে । মা’র জোরাজুরিতে বিয়েও হয়ে যায় তাঁর । ভাবী অনার্সের ছাত্রী—আমারই ক্লাসমেট ।

- ‘স্বাধীন’ জন্ম নেয় ২৫শে জানুয়ারি ’৭৫ । মা আর মুক্তির আনন্দ দেখে কে ! সারাক্ষণ ওকে নিয়ে মেতে থাকে দু’জন । অনেক দিন পর খুশির ছোঁয়া লাগে আমাদের ঘরে । এতদিন মা ভাইয়ার শহরের বাসায় দু’একদিনের বেশি থাকতে চাইতেন না, গ্রামেই পড়ে থাকতেন । এখন আর ফিরে যাবার কথা মুখে আনেন না । কি এক যাদু বলে ‘স্বাধীন’ আটকে দিয়েছে মাকে । আমদের গাঁয়ের পাট অনেকটা চুকে যায় ।

- দেশের সার্বিক অবস্থার ক্রমাবনতি হচ্ছিল হর হর করে । ক্ষমতার অন্যায়, অবিচা্র, জোরজুলুম, সীমাহীণ লুঠতরাজ, আইন-শৃঙ্খলার চরমাবনতি তৎকালীন তারুণ্যকে ভীষণ ক্ষুব্ধ করে তোলে । এরই মাঝে লীগের বিক্ষুব্ধ অংশ বেরিয়ে এসে ‘জাসদ’ গঠন করেছে যা তরুণদের কাছে প্রতিবাদের প্রতীক হয়ে উঠে ।

- বরাবর রাজনীতি বিমুখ ভাইয়া কবে থেকে যে জাসদের জন্য কাজ করছেন আমরা জানিনা । ছেলে মেয়েরা আসতো তার কাছে---তা শিক্ষকের কাছে তারাতো আসতেই পারে । এতে অন্য কিছু দেখিনি আমরা । কিন্তু যাদের দেখার তারা ঠিকই দেখেছিল !

- ২৬ এর সেমিনারে যাবার জন্য তৈ্রি হচ্ছিলেন ভাইয়া । হুঢ়মুর করে ওরা ঢুকে পড়ে ঘরে । কাউকে কিছু বলতে না দিয়ে টেনে হিঁচড়ে গাড়ীতে তুলে নেয় ভাইয়াকে । ভাবী আর আমি পাগলের মতো পেছনে পেছনে দৌঁড়াতে থাকি । গলির মোড়ে গাড়ী একটু থামিয়ে আমাকে লাথি মেরে ফেলে দিয়ে ভাবীকেও তুলে নেয় ওরা । বেখবর মা নিজের রুমে মুক্তিকে সাজিয়ে দিচ্ছিলেন, জানতেই পারেননি কি সর্বনাশ তার হয়ে গেছে ! আমার চিৎকারে লোকজন ছুটে এলে ঘটনা জানতে পারেন মা !

- আমাদের মাথার উপর আসমান ভেঙ্গে পড়ে । তখনকার দিনে রক্ষী বাহিনী ছুঁলে ‘ইন্নালিল্লা’ পড়ে নিত মানুষ ।’৭১ এর মত—রক্ষী নয় যেন সাক্ষাত ’৭১ এর জল্লাদ । মা পাগলের মতো ছুটে গেলেন মহল্লার নেতার কাছে । তার সম্বন্ধে লোকে ফিসফাস করে । ’৭১ এর প্রথম দিকে নাকি বেশ মউজে ছিল পাকিদের সাথে । পরে অবস্থা বুঝে টুপি ঝেড়ে ফেলে মুজিব-কোট তুলে নেয় । এখনতো ১০০% ভাগ লীগ । কেইবা পেছনের কথা মনে রাখে !

-সব শুনে ঝাঁজের সাথে বলল, “কেমন মা আমনে ? নিজের ছেলেকে সামলে রাখতে পারেন না ! সরকারের খেয়ে সরকারের পোঁদে বাঁশ দিতে যায় ক্যান” ?

- আল্লা আল্লা করে আমাদের দুঃখের নিশি ভোর হয় । রাষ্ট্রীয় শকটে চড়ে সোনালী আঁশ [চট] মুড়ে ভাইয়া আর ভাবী ফিরে আসেন সকালে । নেতার বিশেষ বদান্যতা, তিনি না হলে খুজঁই নাকি পাওয়া যেতনা । যথারীতি মা আর আমি সাদা কাগজে সই করে লাশ বুঝে নিই ।

- সেই সকালেই আমরা গ্রামে ফিরে আসি । খবর আগেই পৌঁছে গেছিল । নীরব পুরো গাঁ ভেঙ্গে এসেছিল তাদের আদরের ছাওয়ালকে শেষ স্নেহটুকু নিবেদন করতে । রা ছিলনা কারো মুখে, চোখেও ছিলনা অশ্রু ! সাগরের সব জল যেন একদিনেই শুকিয়ে গেছিল । গাঁয়ের বুড়ো মৌ্লভি শুধু হাঁউমাঁউ করে কেঁদে উঠেছিল মোনাজাতের সময় ।

- পরদিন চারটি দৈনিকের প্রথম পৃষ্টায় প্রধান হেডিং, “ রাষ্ট্রীয় হেফাজত থেকে পালাতে গিয়ে চট্টগ্রামে দুই দুস্কৃতিকারী [স্বামী-স্ত্রী] পুলিশের গুলিতে নিহত” ।

- এখানে ইতি টানা যেত । তাহলে থেকে যেত ‘মুক্তি’ আর ‘স্বাধীন’ এর কথা । ওরা নব প্রজন্মের ছেলে-মেয়ে । মুক্তিযুদ্ধের মতো ব্যাপক জনযুদ্ধ প্রত্যক্ষ করতে না পারলেও এখন তারা প্রতিদিন অন্য রকম যুদ্ধ দেখে অভ্যস্ত । জনক-ঘোষক, মুজিব-জিয়া, ইন্ডেমিনিটি-বিশেষ ক্ষমতা আইন, বাক স্বাধীনতা-গণতন্ত্র হরণ, যুদ্ধাপরাধ না মানবতা বিরোধী অপরাধ, বিপ্লব না কালো দিবস ইত্যাকার নানা বিষয়ে এরা দারুণ বিভ্রান্ত । যারা ক্ষমতায় বসে ইতিহাস তাদের ইচ্ছায় পাল্টে যায় !

- লেখা পড়া শেষ করে মুক্তি ইতিমধে বাংলাদেশ ব্যাংকে জয়েন করেছে । মায়ের ইচ্ছায় মায়ের এক সইয়ের ছেলের সাথে বিয়েও হয়ে গেছে তার । বর ডাক্তার ।

- স্বাধীন অবিকল ভাইয়া যেন—একেবারে কার্বন কপি । বাপের মতোই হ্যান্ডসাম, ব্রিলিয়েন্ট-স্মার্ট । ভার্সিটির জনপ্রিয় তরুণ শিক্ষক । ছেলে মানুষি যায়নি এখনো । আমার ‘মৌ’ কে নিয়ে রাজ্যের হৈচৈ করে অবসর কাটে তার । এখনো মায়ের কাছে শোয় ।

- ২৬ শে মার্চ ’৯৭ । ২১ বছর পর লীগ আবার ক্ষমতায় । স্বভাবতই খুব ধুমধাম করে পালিত হচ্ছে দিবসটি । অনেকদিন পর আবার “জয়বাংলা” শোনা যাচ্ছে । আমাদের দূর্ভাগ্য, জাতির এই আনন্দের দিনটি আমাদের জন্য কিছু দূঃসহ স্মৃতি বয়ে আনে । ঘরে বসেই দিনটি আমাদের কাটে । ছোট চাচার না দেখা বিবস্ত্র লাশ, ভাই-ভাবীর থ্যাতলানো শব চোখের সামনে মূর্ত হয়ে উঠে । স্বাধীনতার আনন্দে শরীক হওয়া আমাদের হয়না ।

- এবার একটু অন্য রকম হয়ে গেল । স্বাধীনের বন্ধুরা এসেছে ক’জন । মুক্তি তার বর, দেবর আর ননদকে নিয়ে এসেছে । উঠানে খোলা আকাশের নীচে বসেছে ওরা । টিভিতে ২৬ এর অনুষ্টান দেখছে আর নিজেদের মাঝে আলাপ আলোচনা করছে । একটু দূরে ‘মৌ’কে নিয়ে বসেছিলাম আমি । ওদের কথার ছিটেফোঁটা কানে আসছিল । স্বাধীন বলছিল যে সব হত্যার বিচার অবশ্যই হওয়া উচিৎ, তবে জনক হত্যার বিচার সবার আগে । তার এক বন্ধুর মতে জাসদের হিসেব অনুযায়ী বঙ্গ বন্ধুর আমলে তাদের প্রায় চল্লিশ হাজার নেতা কর্মী নিহত হয়েছিল । সে সময় রাষ্ট্রীয় হেফাজতে নিহত হয়েছিলেন সিরাজ শিকদার । এক রাতেই ঢাকা ভার্সিটিতে ঝড়ে গিয়েছিল সাত সাতটি তাজা প্রাণ । সেই থেকে শিক্ষাঙ্গনে রাজনৈ্তিক হত্যাযজ্ঞের শুরুসাত । এ সব নৃশংস হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী জীবিত-মৃত সকল অপরাধীর বিচার হওয়া উচিৎ আগে । তাহলেই কেবল চলমান অপরাধ প্রবণতার রাশ টানা যাবে । ভি আই পি বলে কারো অপরাধের বিচার হবেনা, এমনটা হওয়াতো উচিৎ না । এ পর্যায়ে স্বাধীন উত্তেজিত হয়ে উঠে । তার ধারণা ইঙ্গিতটা নিহত বঙ্গবন্ধুর প্রতি ।

- উত্তেজিত হয়ে উঠে আরো একজন । চিরকালের চুপচাপ গোছের মুক্তি হটাৎ প্রচণ্ড রাগে ফেটে পড়ে, “কার হত্যার বিচার চাস হারামজাদা ? নিজের বাপ-মা হত্যার বিচার পেয়েছিস” ? বলেই হাঁউ মাঁউ করে কেঁদে উঠে । সবাই হতবাক হয়ে যায় । আমি ছুটে গিয়ে ওকে টেনে নিই ।
“২৭ বছর চুপ থেকেছি, আজ আমাকে বলতে দে ভাইয়া” ! সীমাহীণ আবেগে মুক্তি বলতে থাকে, "আমার পিতা সহ তিরিশ লাখ মানুষ যারা খুন করেছিল হাছিনার মহান পিতা সেই পশুদের এক কথায় মাফ করে দিয়েছিলেন । আজ তাঁর কন্যা প্রধান মন্ত্রী শেখ হাছিনা --- মা-বাপ-ভাই-ভাবী সহ মুষ্টিমেয় ক’জন আত্মীয় পরিজনের হন্তারকদের ক্ষমা করার মত মহান হতে পারছেন না কেন ? কেন” ?

- কেউ কথা বলেনা । আমরা দুই ভাই-বোন জড়াজড়ি করে কাঁদতে থাকি ! মা ছুটে আসেন ঘর থেকে । মৌ দৌঁড়ে এসে টি ভি অফ করে দেয় । হতবাক স্বাধীন আমাদের দু’জনকে বুকে জড়িয়ে ধরে কখন । দু’চোখে তার অশ্রুর ঢল ! অন্যান্য সবারও । পরিবেশ বদলে যায় মুহূর্তে । আমাদের শাশ্বত ২৬ ফিরে আসে । বেদনা বিধুর চিরায়ত ২৬ আমাদের !

পোস্টটি ৯ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

সবুজ পাহাড়ের রাজা's picture


গলার মাঝে কি যেন আটকে গেল।
আমি বাকরুদ্ধ।

বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার হল, একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চলছে, সেই সাথে প্রয়োজন ৭২' হতে এ পর্যন্ত চলে আসা সমস্ত রাষ্ট্রীয় রাজনৈতিক হত্যার বিচার।
রাষ্ট্রযন্ত্রের কাজ মানুষকে রক্ষা করা, দেশে সুবিচার প্রতিষ্টা করা, সেই রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে যারা নিজেদের ক্ষমতা পোক্ত করার জন্য মানুষ হত্যা করেছে, তাদেরও বিচার হওয়া জরুরী। এতে করে হয়ত আমাদের জাতির বড় নেতা বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়াবেন কিন্তু অন্যায় তো অন্যায়ই। এর বিচার হওয়া জরুরী।

আনন্দবাবু's picture


কিছু বলার নেই।
...বুক ভরা কষ্ট!

মীর's picture


কি নিস্পৃহভাবেই না কথাগুলো বলে গেলেন আপনি কাদের ভাই। আর আমাদের গাএ কাঁটা দিয়ে উঠলো।
কৃতজ্ঞতা জানাই সেইসব বীরদের প্রতি, যাদের কল্যাণে আজো স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে দাবি করতে পারি নিজেকে।
ঘেন্না সেইসব বেজন্মাদের প্রতি যাদের বিশ্বাসঘাতকতা প্রতিমূহুর্তে বিপন্ন করেছে এদেশের সাধারণ মানুষের জীবন।

এ টি এম কাদের's picture


প্রথম মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ রাজা ভাই ! আমার কষ্ট শেয়ার করার জন্য কৃতজ্ঞতা জানাছি !

এ টি এম কাদের's picture


আনন্দ ! কিছু মনে করোনা তোমার নামটা ছোট করে দিলাম ! ছোটদের ছোট নামেই ডাকতে আমার ভাল লাগে ! মন্তব্যের ধন্যবাদ !

আনন্দবাবু's picture


আমার নাম আসলে আনন্দ-ই !! তাছাড়া, আপনি আমাকে যেভাবে ইচ্ছা সেভাবেই ডাকতে পারেন। যা ইচ্ছে তা ই বলতে পারেন।

মুক্তিযোদ্ধাদের জন্যে আমার ছোট বুকে যেটুকুন ভালোবাসা ধরে সেই একবুক ভালোবাসাতে আপনারও অধিকার আছে।

শওকত মাসুম's picture


কিছু বলার নাই

তানবীরা's picture


আসলে যাদের যায় তারাই টের পায়।
আমাদের পক্ষে বড় বড় বুলি কপচানো অনেক সোজা

কিছু বলার নেই

moomkader's picture


@ তানবীরা,

ধন্যবাদ ! লেখাটা কিন্তু 'আমার বল্গে' যথেষ্ট বিরুপ সমালোচানার মুখে পড়েছে ।

@ মীর ভাই, উপরের মন্তব্যটা আপনার জন্য ও । ধন্যবাদ

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

এ টি এম কাদের's picture

নিজের সম্পর্কে

আমি একজন নগণ্য মুক্তিযোদ্ধা । বিদ্যুৎ প্রকৌশলী । স্বাধীনতা পরর্বতী রাজনীতির প্রতি প্রবল বীতশ্রদ্ধ । অসামপ্রদায়িক চিন্তাধারায় বিশ্বাসী ।
'৭৮ এ নানা কারণে চাকুরি বিদেশে চলে আসি ।