মুক্তিযুদ্ধ ও একটি পরিবার
ছোট্ট শহর বগুড়া, যেখানকার কতশত মধুর স্মৃতি আমাকে জড়িয়ে রেখেছে পরম মমতায়। সেই ছোট বয়সে নানাবাড়ির (জলেশ্বরীতলা) পাশের বাড়ির দুই বোনকে আমার রূপকথার পরীর মত মনে হতো, শাহানাআপু- সোমা আপু একই রকম দেখতে, চেহারার এত মিল যে আমার শিশু চোখ তাদের ঠিকমতো নির্ণয় করতে পারতো না- কোনটা কে। তারা দুই বোন দুই ভাই, দাদা-দাদী আর ফুপুর কাছে থাকতো ।স্কুল শিক্ষিকা সেই ফুপুকে যে ওরা কী ভয় পেত (আমরাও ভয় পেতাম)! সেই ফুপুই তাদের অভিভাবক, আমার মনে প্রশ্ন ছিল ওদের মা-বাবা কোথায়?তারপর একদিন সেই প্রশ্নের জবাব পেলাম-তখন অতকিছু বুঝি নাই কিন্তু মনটা বিষাদে ভরে গিয়েছিল। যত বড় হয়েছি সেই বিষাদ বেদনাও বেড়েছে ,মনে হয়েছে দেশের মানুষের তাদের কথা জানা দরকার কিন্তু কিভাবে?
১৯৭১ এর জুলাই-অগাস্ট হবে,ইলেকট্রিক ইঞ্জিনীয়ার সৈয়দ সারোয়ার আলম তখন কর্মরত ছিলেন পার্বতীপুর রেলওয়ে জংশনে। থাকতেন সৈয়দপুর সরকারী বাসভবনে।চমৎকার মানুষ ছিলেন, দেখতেও সুপুরুশ, নম্র-ভদ্র, ধার্মিক পাজামা পাঞ্জাবী পরতেন সবসময়। স্ত্রী আঞ্জুমান আরা আর চার সন্তান-তারেক,আরিফ,সাহানা, সোমা এদের নিয়ে তার সুখের সংসার। বড় ছেলেটির তখন ছয় বছর আর সব ছোট মেয়েটির তিনমাস বয়স।তাঁর বাবা-মা, ছোট ভাই- বোন থাকেন বগুড়ায় পৈত্রিক বাড়িতে।
ছোট ছোট শিশুদের কল-কাকলিতে মুখর থাকতো বাড়িটি বাবা কাজ শেষে বাড়ি ফিরলে সেই আনন্দ পূর্ণ মাত্রা পেত।তেমনি এক দিন সারোয়ার সাহেব দুপুরে খেতে এসেছেন,ছেলেমেয়েরা হয়তো আগেই খেয়ে নিয়েছে..তার স্ত্রী ভাত বেড়ে বসেছিলেন কি না জানিনা..তিনি ওযু করছিলেন,সেই সময় স্থানীয় রাজাকারের সঙ্গে পাকসেনা হানা দিল তার বাড়িতে। মুহূর্তেই দিনটি অভিশপ্ত হয়ে উঠল। ওরা ইঞ্জিনীয়ার সাহেবকে নিয়ে গেল,পিছনে পড়ে রইলো মায়ার সংসার স্তী-সন্তান। ঘটনাটি এখানেই শেষ হতে পারত, হোল না।এই বিপর্যস্ত পরিবারে আশার বানী নিয়ে আবার এল সেই মুখোশধারী শয়তানের দল।আঞ্জুমান আরা বানুকে বলল তার সমস্ত সোনার গহনা নিয়ে এখনি তাদের সাথে গেলে স্বামীকে ছাড়িয়ে আনতে পারবেন,ভদ্রমহিলা সময় নষ্ট না করে ওদের সঙ্গে চলে গিয়েছেন, গৃহকর্মীদের উপর ছেলেমেয়ের দায়িত্ব দিয়ে।
তারপর আর কিছু নেই, তাদের দুজনের একজনও ফিরে আসেন নি। আদৌ দুজনের দেখা হয়েছিল কি না তাও কেউ জানে নাই,তাদের লাশ পাওয়া যায় নাই। শুধু শোনা গিয়েছিলো ইঞ্জিনীয়ার সাহেবকে সৈয়দপুর রেল ওয়ার্কশপের চুল্লীতে..।উহ কী মর্মান্তিক! আর আঞ্জুমান আরা বানু , তিনি মিশে আছেন বাংলাদেশের মানচিত্রে।
কিন্তু তাঁদের পরম আদরের সন্তানেরা সব হারিয়ে গেল, বাড়ির মালী, দারোয়ান, গৃহকর্মীরা বাচ্চাগুলোকে নিয়ে তাদের মত করে নিরাপদ স্থানে চলে গেল এবং মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়েই দাদা- চাচারা ওদের তিনজনকে খুঁজে বাড়ি এনেছিলেন শুধু ছোটটিকে পাওয়া গেল না।তারপর দেশ স্বাধীন হলো আরও কতদিন পর ঐ হারানো মেয়েটিকেও পাওয়া গেল। এই ছোট ছোট নিষ্পাপ শিশুদেরকে কোলে তুলে নিলেন ওদের অবিবাহিত ছোট ফুপু।সেই ফুপু আর বিয়ে করেননি ।
মুক্তিযুদ্ধের এরকম চিত্রকথা এ দেশে আরও অনেক আছে, কিছু জানা কিছু আমাদের অজানা।সেসব জেনে ব্যাথা পাই,কষ্টে বুক ভেঙ্গে যায় কিন্তু কিছু করার থাকে না।এবার বিজয় দিবসে বগুড়ায় ছিলাম,অনেকদিন পর একসাথে হয়ে ভাইবোনরা মজাও করেছি খুব। রাতে মঞ্চ নাটক দেখে ফেরার পথে বাসার কাছেই একজনকে ক্রস করার সময় পরিচিত কি না ঘুরে তাকাতেই আমি ভীষণ লজ্জা পেলাম।( যাকে পাশ কাটিয়ে এলাম তিনি তারেক ভাইয়া, পায়ে ক্ষয়ে যাওয়া চটি, মাথা নিচু করে হেঁটে যাচ্ছেন ।এমনি ভাবেই চলেন তিনি যেন খুবই বিব্রত, প্রাইভেট পড়িয়ে সংসার চালান। ছোট ভাইটার আরও করুন অবস্থা। বোনদের বিয়ে হয়ে গেছে ।)কারন আমরা বিজয় দিবস, স্বাধীনতা দিবস এরকম বিভিন্ন উৎসবে আনন্দে মাতি শহীদমিনারে যাই আর কত কিছু। অথচ মুক্তিযুদ্ধে ক্ষত পরিবারগুলো যারা চিরকাল বঞ্চিত,নিগৃহীত তাদের কথা ভুলে যাই । তাদের হয়ত এই দেশের কাছে কিছুই চাওয়ার নেই কিন্তু আমাদেরও কি কোনই দায় নেই? আমাদের উৎসব শেষে ফিরতি দলের ছোটরা কপালে বাংলাদেশের পতাকা বেঁধে রাস্তায় ছোটাছুটি করছিল আমার শুধু তখন মনে হচ্ছিল সবগুলোকে নিয়ে হাওয়ায় মিলিয়ে যাই।
(আজ মহান স্বাধীনতা দিবস। স্বাধীনতার ৪০ বছর, এই দিনে আমি আমার লেখার খাতা খুললাম)





হৃদয়ছোঁয়া লেখা।পড়ে আপ্লুত হলাম। 'আমারা বন্ধু'তে স্বাগতম।
ধন্যবাদ ঈশান ভাই। ।
চোখের পানি, দীর্ঘশ্বাস, হা-হুতাসের যদি কোন অর্থমূল্য ধরা সম্ভব হতো তা'হলে কোন সাধারন অংকে তা প্রকাশ করা যেতনা, অন্যান্য ত্যাগ, জীবন, সম্পদ এসবের হিসাব বাদ দিলেও। আর সেই মূল্য দিয়ে কেনা আমাদের স্বাধীনতা । আজ সেই স্বাধীনতা দিবস, চল্লিশ বছর আগে পাওয়া একটি দিন ।


এমন একটা দিনে আপনাকে 'আমরা বন্ধু'তে স্বাগতম ।
আপনার পরশে এবি সমৃদ্ধ হয়ে উঠুক, সহব্লগারগণ আপনার সাহচর্য পেয়ে আনন্দিত ।
অনুপ্রানিত হলাম।
আসলেই
অসাধারন লেখা!
"আমরা বন্ধু" তে স্বাগতম..
নাজ, আপনাকেও ধন্যবাদ।
এবি'তে স্বাগতম। স্পেশাল ধইন্যাপাতা বগুড়ার জলেশ্বরীতলা জায়গাটির নামোল্লেখের জন্য। আলতাফুন্নেসা খেলার মাঠের কথা বললে আরো খুশি হতাম।

আপনি কি বগুড়ার ? ধন্যবাদ।
লেখা নিয়ে কিছু বলার নাই।
এবিতে
ধন্যবাদ।
লেখা নিয়ে কিছু বলার নাই আসলে আমাদের।
স্বাগতম এখানে। নিয়মিত থাকুন
অনুপ্রেরনায় মুগ্ধ।
আপনাকে এবি'তে স্বাগতম।
কষ্ট করে লেখাটি পড়ার জন্য ধন্যবাদ।
আমরা বিজয় দিবস, স্বাধীনতা দিবস এরকম বিভিন্ন উৎসবে আনন্দে মাতি শহীদমিনারে যাই আর কত কিছু। অথচ মুক্তিযুদ্ধে ক্ষত পরিবারগুলো যারা চিরকাল বঞ্চিত,নিগৃহীত তাদের কথা ভুলে যাই ।
------ একদম সত্যি কথা।
ধন্যবাদ।
----এই প্রশ্নের উত্তর কি কখনো পাওয়া যাবে?
আসলেই হৃদয়ছোঁয়া লেখা।
ধন্যবাদ
বিবেক আমাদের মরে গেছে।
ঠিক তাই
মন্তব্য করুন