তাইওয়ানের নৌকাবাইচ
বরিশালে জন্ম আর শৈশবের অনেকটা কাটানোর কারণে নৌকা বাইচ নিয়ে গ্রামাঞ্চলে যে উন্মত্ততা তার অনেকটা কাছে থেকে দেখেছি। বয়স কম থাকায় মাঝি হবার সৌভাগ্য কোনোদিন হয়নি, কিন্তু চাচা-মামাদের হেল্পার হিসেবে বিস্তর খাটাখাটনির পাশাপাশি অসাধারণ সব আনন্দময় মুহূর্তের ভাগীদার হয়েছি। কে জানত যে একদিন মাঝি হিসেবে আন্তর্জাতিক এক নৌকা বাইচে অংশগ্রহণ করার দুর্লভ সৌভাগ্য এই অভাগার ললাটেও লেখা আছে!
নৌকা বাইচের জন্য সরকারী ছুটি বোধহয় তাইওয়ান ছাড়া পৃথিবীর আর কোথাও নাই। বছরে চাইনিজ নিউ ইয়ার, মুন ফেস্টিভ্যালের পাশাপাশি নৌকা বাইচের দিনটিকেও এখানে জাতীয় উৎসব হিসেবে উদযাপন করা হয়। নৌকা বাইচের অফিসিয়াল নাম ড্রাগন বোট ফেস্টিভ্যাল। কারণ হলো প্রতিটি নৌকারই পেছন দিকটা দেখতে হুবহু ড্রাগনের মাথার মতো। এই উৎসবের ব্যাপকতা এবং উত্তেজনা নিজে উপভোগ করতে না পারলে বলে বোঝানো দুঃসাধ্য। সারা দেশেই সাজ সাজ রব পড়ে যায়, প্রেসিডেন্ট থেকে শুরু করে আমজনতা সবাই সেইদিন মাঝি পরিচয়ে নিজেকে নিয়ে গর্ব করে।
আমি থাকি তাইওয়ানের চার নম্বর বড় শহরে। ধরেন আমাদের দেশের খুলনার মতো এর অবস্থান এই দেশে। সেবার নব নির্বাচিত মেয়র তার আন্তরিকতার প্রমাণ হিসেবে প্রথমবারের মতো এই শহরের ড্রাগন বোট ফেস্টিভ্যালে বিজয়ী দলের জন্য প্রাইজ মানি ঘোষনা করলেন। একেবারে যা তা পরিমাণ না, নগদ দশ হাজার আমেরিকান ডলার। তো বিরাট হাউ কাউ লেগে গেল গোটা শহরে। একে তো টিভিতে সরাসরি সম্প্রচারে নিজের চেহারা দেখানোর সুবর্ণ সুযোগ, তার উপরে আবার জিততে পারলে বিরাট অংকের নগদ ইনকাম। সাথে ট্রিফ, মেডেল, সার্টিফিকেট ইত্যাদি তো আছেই।
আমাকে হুট করে ফোন করলো এক জার্মান বন্ধু। সে একটা দল নামাতে চায় শুধু প্রবাসীদের নিয়ে এবং মেয়র তাতে সম্মতিও দিয়েছেন। জানা গেল এবারে বিদেশ থেকেও মাঝির দল আসছে এই জমজমাট আয়োজনে শরিক হতে। আমেরিকা থেকে একটা খুব সিরিয়াস ধরনের রোয়িং ক্লাবও নাম এন্ট্রি করেছে। আমি নদীমাতৃক দেশের লোক আর কিছুটা শক্তপোক্ত বিধায় সে ধারণাই করে নিয়েছে যে আমাকে দিয়ে মাঝি-মাল্লার কাজ হবে। অথচ আমি ডিঙ্গি নৌকার বাইরে আর কোনো নৌকা কোনোদিনই বাওয়ার চেষ্টাও করিনি। কিন্তু সবার উৎসাহে সস্ত্রীক দলে যোগ দিয়ে ফেললাম ( যদিও বউ বাইচের আগের রাতে আয়োজনের বিশালতা আর ঝাঁকে ঝাঁকে মিডিয়ার লোকজন দেখে পিছিয়ে যায়, ভীতু আর কারে বলে)। আমাদের দলে কানাডা, ইংল্যান্ড, ইরান, অস্ট্রেলিয়া, জার্মানী, মালয়েশিয়া, বাংলাদেশ, সাউথ আফ্রিকা, আমেরিকা আর আয়ারল্যান্ডের ছেলেপেলে ছিল। বলতে গেলে সবাই নতুন, আগে কেউই এই ধরনের নৌকা চালায়নি। আয়োজক কমিটি দুই সপ্তাহ আগে থেকেই অভিজ্ঞ একজন মাঝিকে পাঠালেন, আমাদের শিখিয়ে পড়িয়ে নিতে। কিন্তু দেখা গেল মাস্টার সাহেব ইংরেজি তো দূরের কথা, চাইনিজও জানেন না, কথা বলেন বা বোঝেন শুধু মাত্র একটা লোকাল ডায়ালেক্ট। যাই হোক ইশারা ইঙ্গিতেই আমরা ট্রেইনিং নিতে থাকলাম এবং মোটামুটি শিখেও গেলাম।
প্রতিটি নৌকায় একজন করে ড্রামার থাকেন। সরকারী খরচেই পেশাদার ড্রামারকে নিয়োগ দেয়া হয়। তার কাজ হলো বিশাল আওয়াজে দ্রিম দ্রিম করে ড্রাম বাজিয়ে সবাইকে উৎসাহ দেয়া আর রিদম যাতে ঠিক থাকে সেদিকে খেয়াল করা। বলতে গেলে ড্রামার এবং কাপ্তান দুটা দায়িত্বই তার। প্রতিটা নৌকায় মাঝি মোট ১৪ জন। এটা আসলে শারিরীক শক্তির কোনো খেলা না, মূল বিষয়টা হলো সবার একই তালে বৈঠা ওঠা-নামা করা, আর ফলো থ্রু। তাল ঠিক থাকলে, আর টাইমিং ঠিকমতো হলে নৌকা তরতরিয়ে এগিয়ে যায়। একটানা দুই সপ্তাহ আমরা হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করে( সূর্যোদয়ের আগে থেকে সকাল নয়টা পর্যন্ত) মোটামুটি দলের মধ্যে একটা চমৎকার বোঝাপড়া তৈরী করে ফেললাম। রেসের আগের দিন ড্রেস রিহার্সেলে বেশ ভালো টাইমিংও আসলো আমাদের। মোট ১২টা দল অংশগ্রহণ করেছিল সেবার। চারটা গ্রুপে। প্রতিগ্রুপ থেকে একটা করে বিজয়ী দল ফাইনাল রাউন্ডে যাবে। এবং সেখানকার চূড়ান্ত বিজয়ীদলের ভাগ্যেই জুটবে নগদ অর্থ, মেয়রের সাথে ডিনার, ব্যাপক মিডিয়া কাভারেজ এবং অমূল্য আত্মতৃপ্তি।
রেসের আগের রাতে ড্র, কে কার গ্রুপে পড়বে সেটা নির্ধারণ হবে সেখানে। এমনই মন্দ কপাল আমাদের যে , সেই আধা-পেশাদার আমেরিকার রোয়িং ক্লাবটি গিয়ে পড়লো আমাদের গ্রুপে যারাই পরবর্তীতে সবাইকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়। আমাদের গ্রুপে অন্য দলটি ছিল স্থানীয় এক ইউনিভার্সিটির, তাদের সমর্থকই এসে হাজির হয়েছিল হাজার খানেক। আর আমাদের জন্য গলা ফাটাচ্ছিল শহরের সমস্ত বিদেশিরা। আমরা খুব ভালোভাবে শুরু করলেও, একটু পরেই আমেরিকান দলটি ড্রাগনের গতিতে ছুটে এসে আমাদের পেছনে ফেলে দিল। গ্রুপে আমরা দ্বিতীয় হলাম, সে কোনো প্রবাসী দলের জন্য স্থানীয় কোনো দলকে হারানোর ঘটনা সেবারেই প্রথম। দ্বিতীয় হয়ে শুধু সান্ত্বনা পুরুষ্কার হিসেবে একটা করে টি-শার্ট আর যৎসামান্য কিছু নগদ অর্থ পেয়েই আমাদের আনন্দে মাটিতে গড়াগড়ি দেবার অবস্থা।
চ্যাম্পিয়ন হতে না পারলেও যে অভিজ্ঞতা অর্জন হয়েছে আর যে পরিমাণ আনন্দ-উত্তেজনা, মানুষের আগ্রহ-সমর্থন উপভোগ করেছি তার চিরদিনই স্মৃতির মণিকোঠায় উজ্জ্বল হয়ে থাকবে। এই মাসেই আবার সেই ড্রাগন বোট ফেস্টিভ্যাল, তবে সংসার নিয়ে আমি এখন ঘোরতর ব্যস্ত, জানি না আবার অংশগ্রহণের সুযোগ মিলবে কি না। তাই সবেধণ নিলমণি নৌকা বাইচের কাহিনি আপনাদের জানিয়ে যাচ্ছি। ভালো লাগলে দয়া করে জানাবেন।
আচ্ছা মাথা ধরে গেছে নিশ্চয়ই আপনাদের আমার বকবকানিতে, আর জ্বালাবো না, এবারে ছবি দেখেন।

ড্রাগন বোট ফেস্টিভ্যালের সরকারী তোরন

পানিতে নামার আগে গা-গরম করে নেয়া

একেবারে প্রাথমিক পাঠ, বৈঠা কেমনে ধরবো তা দেখাচ্ছে আমাদেরই একজন

বাইচের দিন লোকে লোকারণ্য চারদিক

সেই কূখ্যাত (!) আম্রিকান দল ( অভিনন্দন তাঁদের)

স্টার্টিং পয়েন্টের দিকে যাচ্ছি সবাই

গ্রুপের তিন দলই প্রস্তুত, টানটান উত্তেজনা
বাকি কাহিনি তো উপরেই কইলাম। জিততে পারি নাই রে ভাই। এর পরের ছবিগুলা এই ল্যাপটপে নাই। থাকলেও দিতাম কি না সন্দেহ আছে। পেটের হিংসা এখনও যায় নাই। মুখের গ্রাস কেড়ে নিয়ে, টেকা-পয়সা, ট্রফি সব নিয়ে গেল সেই আম্রিকান দল। কী দরকার তাদের ছবি দেখিয়ে? রীতিমতো ঝড়ের গতিতে লেখা ব্লগ, ভুল ত্রুটি মার্জনীয়।










মামুন ভাইয়ের সব ছবি দেখি মাইয়া মানুষের পিছনে.।ব্যাপার কি?ওহ আমি তো ভুলেই গিয়ছিলাম আপনি মাইয়াগো পিছনে ঘুরেন না মাইয়ারা আপনার সামনে দিয়া ঘূরে।।

ফাজিল পুলা, খালি কূচিন্তা তোর মাথার ভিতরে
কি করুম???বয়েসের দুষ.।।।কইলাম আপনের শালির লগে একটা ব্যবস্থা করেন.।তা তো করলেন না।।

যা ব্যাটা, আগে বড় হয়ে নে, তারপর এইসব আলাপ
অক্কে বড় হইতে গেলাম.।.।.।
কিন্তু পড়ে যেন মনে থাকে.।.।.।।।
হা হা হা। ভালো লাগলো। লেগে থাকলে সামনের বার জিততে পারবেন। যান দোয়া করে দিলাম।
অসংখ্য ধন্যবাদ মীর ভাই। সামনেরবার জিতলে আপ্নারে মিষ্টি খাওয়ামু
চরম চরম...একটা লিস্টি থাকা দরকার কোথায় কোন দেশে কবে কি উৎসব হয়। একদিন পয়সা জমায়া বাইর হইয়া যাব দেখতে
ঠিক্কথা। তাইওয়ানে লোকজন খুঁজে খুঁজে সারা বছরই হরেক রকমের উৎসব নিয়ে মেতে থাকে। ভাবতেছি এর পরে ল্যান্টার্ন ফেস্টিভ্যাল ( প্রদীপ জ্বালানো উৎসব) নিয়ে একটা ছবি ব্লগ দেব। আশ্চর্য হয়ে যাবেন সেই উৎসবের রঙচঙ আর ব্যাপকতা দেখলে!
দারুন লাগলো পোষ্টটা -- ব্যতিক্রমি জিনিস।
আমি আশা করেছিলাম আপনারা চ্যাম্পিয়ান হয়ে শহরে হাউকাউ লাগাই দিবেন।
আপনাদের ঐখানে আর বাংগালী ভাইজানেরা কই ?
ধন্যবাদ ভাই। আমরাও তো সেটাই আশা করেছিলাম, লেকিন---
এই শহরে প্রথম বাঙ্গালী আমিই, আসলে গোটা দক্ষিণ তাইওয়ানেই পেত্থম আইছিলাম আমি। ইদানিং কয়েকজন স্টুডেন্ট আসছেন, কিন্তু বছর কয়েক আগেও তেমন কেউই ছিল না আশেপাশে।
আম্রিকানদের মাইনাস
অনেক মজা করছেন দেখছি ।
আমার করেকবার কায়াক ট্রাই করছি, সেইরাম মজার জিনিস।
হ ভাই, অনেক মজা হইছিল। কায়াকও অনেক মজার, কিন্তু ড্রাগন বোট আসলেই একটু ভেজাইল্যা জিনিস, শিখতেও অনেক সময় লেগে যায়।
ভাল্লাগ্লো
ধইন্যা বুবুজান
সাবাস, বাংলার নাম রোশন করুন। ভাল লাগলো।
ধন্যবাদ সাহাদাত ভাই
সাবাস, বাংলার নাম রোশন করুন। ভাল লাগলো।
কপি পেস্ট মারলেন নাকি মিয়া? এখন যদি কেউ আপনার নামে কপিরাইট আইনে মামলা করে দেয় তখন!!
উদরাজী ভাই উন্মুক্তবাদী এইটা তার গতোকয়দিনের লেখালেখিতে বুঝছি, তাই বুইঝাই তার কমেন্টটা কপি পেইস্ট মারলাম...lol
ভালো লাগলো পড়ে।
আমরিকানগুলা ঐখানেও সিরিয়াস হয়্যা গেছে......। হেহে...... আমার প্রতিবেশি আছে একটা আমরিকান, পুরা এটিএস......
হে হে, আম্রিকানরা সারা দুনিয়ার সবখানেই আছে, সবখানেই যায়, আর সবকিছুতেই জিততে চায়। পড়ার জন্য ধন্যবাদ
আমার কাছে তো আপনারাই চ্যাম্পিয়ন ............ দারুন আয়োজন।
বাহ্ মনটাই ভালো করে দিলেন! ধন্যবাদ
ভালই মজা মারছে মামুন ভাই
হ মামুন ভাই। মামুন ভাইয়েরা মজা করতেই ভালো পায়
হারজিত বড় না মামা, অংশগ্রহণটাই বড়। ভাল্লাগলো। ব্যাপক মজা তো... প্রদীপ জ্বালানো উৎসবের ছবির জন্য আগাম ধইন্যা
ধন্যবাদ দোস্ত। পুরানা ছবি আছে ল্যান্টার্ন ফেস্টিভ্যালের, দিয়া দিমু? নাকি এই বছরের উৎসবের জন্য অপেক্ষা করুম। ধন্যবাদ যখন বুইঝা পাইছি ছবি না দিয়া তো আর উপায় নাই
দারুন। এরম জিনিস এইখানে হইলে আমিও নাইমা পড়তাম।
নামেন নামেন, আর নাইলে চইলা আসেন এইখানে
আমরা বন্ধুর ১ম রোয়ার পাওয়া গেলো
নৌকা কলাম আমিও চালাই। বন্ধুতে জিম করা মেয়ে ব্লগারও আছে যে নাকি নৌকা চালাইতে পারে:)
আমি প্রথম না, পুরানা মাঝি আরও আছে
দারুণ তো! নেক্সট টাইম জিতবেন ইনশাল্লাহ।
আমরিকানগুলা ত বদ! এইগুলারে মাইনাস। জিততে দিলো না আপনাদেরকে।
হ, আবার যদি ভাগ্যে থাকে টেরাই করুম। কিন্তু আমি তাইওয়ানে আর বেশিদিন নাই, তাই শিওর না আবারও সে সুযোগ মিলবে কি না
তাইতো বলি আপনারে আমার এতো পছন্দ হইলো কেন? বরিশাইল্লা বইলা কথা। বুখে আসেন..........
আরে মনু এতকাল কোম্মে আছেলেন? আহেন আহেন বুখে আহেন
ল্যান্টার্ন ফেস্টিভ্যাল এর ফটো দেখার আশায় আছি।
নৌকা চালাইতে আমিও খুব ভালু পাই। আমি কানো চালাই
। প্রতি সামারে নিয়ম করে আমি কানো চালাই স্বামী - কন্যা নিয়ে
মামুন ভাই, মাঝিনী লাগলে আওয়াজ দিয়েন
লাগবো মানে? তবে মাঝিনীর সাথে একজন ড্রামারও লাগবো, আপ্নে কি ফাইরবেন?
ল্যান্টার্ন ফেস্টিভ্যালের ছবি দেব, একটু গুছিয়ে নেই।
মন্তব্য করুন