আরেকটা ভালো মুভি হচ্ছে ল্যান্ড এন্ড ফ্রিডম

পারফিউম একটা মুভি যেটা নিয়ে লিখতে হলে সাহস দরকার। এত ভাল মুভি নিয়ে আসলে লেখা যায় না। অপচেষ্টা বৃথা।
পারফিউম তৈরী হয় কিভাবে? বিভিন্ন রকম ফুল সেদ্ধ করে তার নির্যাস দিয়ে। ফুলের নির্যাসই পারফিউমের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। কিন্তু ফুলের বদলে যদি মানুষ সেদ্ধ করা হয়? কিংবা একেকটা মানুষের যে আলাদা আলাদা গন্ধ সেটা দিয়ে যদি কোন পারফিউম তৈরী করা হয় তাহলে?

জন বাপ্টিস্ট রেনোয়া, একজন ভাগ্যবিড়ম্বিত মানুষ। মুভির ব্যাকগ্রাউন্ডের ভাষায়, হি ইজ নোবডি। তাকে জন্ম দেয়ার অপরাধে তার মা'কে ফাসিকাষ্ঠে ঝুলতে হয়। যে এতিমখানায় সে বড় হয়েছে সেটির কর্ত্রী খুন হয় ছিনতাইকারীদের হাতে এবং যে কারখানায় সে প্রথম জীবনে কাজ করতো, কারখানা মালিক তাকে বিক্রি করে দেয়ার পরপরই গাড়ি চাপা পড়ে। যে পারফিউম প্রস্তুতকারকের সাথে সে কাজ করতো, তাকে ছেড়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে সেই লোকের বাড়িই ধ্বসে পড়ে সীন নদীর ওপর। এই লোকের কাছ থেকেই সে ফুলের রস থেকে গন্ধ সংগ্রহের প্রণালী শেখে।
দুর্ভাগা এই যুবকের কাহিনী এমনভাবে মনকে টেনে রাখবে যে এক সেকেন্ডের জন্যও চোখ সরানো সম্ভব নয়। একদিন এক পাহাড়ের গুহায় রেনোয়া আবিস্কার করে পৃথিবীর সবকিছুর একটা গন্ধ আছে। মাটির গন্ধ আছে, মাটির অনেক গভীরে বাস করে যে পোকা তার গন্ধ আছে, নদীর গন্ধ আছে, নদীর তলায় শ্যাঁওলা জমে থাকা পাথরের গায়ে এক ভিন্ন গন্ধ আছে, পাথরের ওপরে যে মাছের ডিমগুলো আছে তাদেরও গন্ধ আছে; কিন্তু ওর নিজের কোন গন্ধ নেই। ও বুঝতে পারে এই পৃথিবীর সে কেউ না। মহাকালের খাতায় লিখা থাকবে না ওর জন্ম-মৃত্যূর হিসাব।
এরপরে রেনোয়া যখন পাহাড়ের গুহা থেকে বের হয়ে শহরের দিকে হাঁটতে শুরু করে সে সময় একটা ডায়লগ হচ্ছিলো যেটা সিনেমার ট্যাগলাইন, সো হি ডিসাইডেড টু শো দ্য ওয়ার্ল্ড দ্যাট হি ওয়াজ সামবডি। স্বল্প পরিসরের লেখা-লেখি বা অন্যান্য কাজে মানুষের কিছু সুনির্ধারিত ট্যাগ দিয়েই কাজ চলে যায়। কিন্তু এরকম একটা পটভূমিতে নির্মিত এরকম একটা মুভির জন্য পুরা একলাইন ট্যাগ ছাড়া আসলে হয় না।
রেনোয়া মূলতঃ একজন সিরিয়াল কিলার। ফ্রান্সের বিখ্যাত এক পারফিউম প্রস্তুতকারকের সাথে কাজ করার সময় সে বিভিন্ন পরীক্ষা-নীরিক্ষা চালাতো। এ সময় সে সিদ্ধান্ত নেয় সে একটা পারফিউম তৈরী করবে, যেটা হবে পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো পারফিউম। সেটা সে নিজের গায়ে মাখবে, সেটা হবে তার নিজের গন্ধ। তার শরীরেরও গন্ধ আছে, এটাই সে দেখাতে চেয়েছিলো পৃথিবীকে।
রেনোয়ার নিজের পারফিউমটি তৈরীর প্রণালী ছিলো একদম ভিন্ন আর স্বতন্ত্র। সে মেয়েদের গায়ের গন্ধ শুঁকতো। যে গন্ধটি তার পারফিউম তৈরীর জন্য প্রয়োজন সেই মেয়েটিকে সে খুন করতো এবং তার লাশে এক ধরনের গাদ মিশিয়ে কাপড় দিয়ে মুড়িয়ে রাখতো। এরপর সেই গাদ সে আমাদের দেশে যাকে কাটারী বলে সেটা দিয়ে চেছে চেছে তুলতো এবং এ্যালকোহলের সাথে মিশিয়ে সেটা সেদ্ধ করতো। এভাবে সংগ্রহ করা একেকটা মেয়ে মানুষের শরীরের গন্ধ সে ছোট ছোট বোতলে ভরে রাখতো। এগুলো হচ্ছে পারফিউম তৈরীর একেকটি উপাদান। এরকম ১৩ টি উপাদান মিলে তৈরী হয় এক অপার্থিব পারফিউম। যার ১২ টির খোঁজ মানুষ জানে কিন্তু ১৩ তম সেই উপাদানটি কি তা কেউ জানে না। রেনোয়া বিভিন্ন রকম মেয়ে মানুষের শরীর থেকে সংগ্রহ করে এই ১৩ টি উপাদান। মেয়েগুলোর লাশ ভাসতে থাকে শহরের খালে আর নালায়, পড়ে থাকে অন্ধকার গলির শেষমাথায়। ১৩ টি মৌলিক উপাদান একত্র করে সে তৈরী করে তার নিজের পারফিউম। আর ওদিকে শহরময় পড়ে গেছে ভয়ংকর এই খুনীর তল্লাশ।
জন ব্যাপ্টিস্ট রেনোয়ার খুন করার একটা কারণ ছিলো। হি ওয়াজ নোবডি, সো হি হ্যাড টু শো দ্য ওয়ার্ল্ড দ্যাট হি ওয়াজ সামবডি। তাই সিরিয়াল কিলার হওয়া স্বত্তেও ও আলাদা। মানুষ ওকে অ্যাঞ্জেল ভেবে ভুল করে। একই চরিত্রে পাপহীনতা আর নিষ্ঠুরতা দুই বিপরীতধর্মী বৈশিষ্ট্য দর্শককে বিভ্রান্ত করে তোলে ঠিকই, তবে সিনেমার শেষে রেনোয়া যখন প্রথম খুন করা মেয়েটির কথা ভাবে তখন পরিস্কার হয়, সে পৃথিবীর আর দশজনের মতোই সাধারণ মানুষ। সে যদি মেয়েটাকে খুন না করে তাকে ভালবাসতো, তাহলে সেও সুখের, শান্তির, আমাদের এই পৃথিবীর একটি জীবন হয়তো পেতে পারতো।
মুভির নামভূমিকায় বেন হুইশ'র অভিনয় বড় বড় চোখে অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখার মতো। এর সাথে পরিচালক টম টাইকারের হাতের কাজ। অষ্টাদশ শতকের ফ্রান্সের সমাজ, জীবনযাত্রা, সিটি মেয়র, পোপ এই বিষয়গুলো দারুণভাবে এসেছে মুভিটায়। মাছের বাজার, চামড়ার কারখানা, শতাব্দীপ্রাচীন নগর কাঠামো সবকিছু এত জীবন্ত করে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে যে, একশ' বছর আগের ফ্রান্স হঠাৎ করে যেনো লাফিয়ে উঠে আসে চোখের সামনে। অসামান্য এক মুভি।
ল্যান্ড এন্ড ফ্রিডম (১৯৯৫)

আগের রিভিউটা বিরাট হয়ে গেল। আরেকটা ভালো মুভি হচ্ছে ল্যান্ড এন্ড ফ্রিডম। ইংরেজ পরিচালক কেন লোচের সবচেয়ে ভালো কাজগুলোর একটি হিসেবে ধরা হয় এ মুভিটিকে। ১৯৩৬ সালের পটভূমিতে নির্মিত এ মুভিটাতে তখনকার তরুণ সমাজের মধ্যে ফ্যাসিবাদ বিরোধী যে মানসিকতা, সেটার অদ্ভূত এক চলচ্চিত্র-রূপায়ন ঘটেছে। ইউরোপের এমন এক অস্থির সময়কে তুলে আনা হয়েছে যখন একেদিকে হিটলার ও তার ফ্যাসিবাদী বাহিনীর উত্থান ঘটছে আরেকদিকে বিভিন্ন জায়গায় সমাজতন্ত্র মার খেয়ে যাচ্ছে নব্য পুঁজিপতিদের কাছে। ক্ষমতালিপ্সু এই পেটি বুর্জোয়ারা তখন সাধারণ মানুষের রক্ত চুষে খেতেও দ্বিধা করেনা -এসবের মধ্যেই একদল মানুষের প্রতিবাদ নিয়ে নির্মিত সিনেমা। এই বিপ্লবীদের বিয়োগাত্মক পরিণতি দেখে শেষ পর্যন্ত কষ্ট পেতে হয়েছে, তবে অওসাম মুভি, বলার অপেক্ষা রাখে না।
দ্য উইণ্ড দ্যাট শেকস্ দ্য বার্লি (২০০৬)

এরপর আবার কেন লোচ। দ্য উইণ্ড দ্যাট শেকস্ দ্য বার্লি। আইরিশ মুভি। ১৯২০ সালের পটভূমি। বৃটিশদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে আইরিশ দুই ভাইয়ের বিপ্লবী হয়ে ওঠার কাহিনী। এটা সে সময়ের গল্প যখন আয়ারল্যান্ডের স্বাধীনতা সংগ্রাম তুঙ্গে। উত্তর আয়ারল্যান্ডে তখন প্রতিদিন নির্বিচারে সাধারণ মানুষ হত্যার ঘটনা ঘটছে। সেখানকার স্থানীয় অধিবাসী 'তান'দের ওপর অকথ্য নির্যাতন চালাচ্ছে বৃটিশ সেনাবাহিনী। ইতিহাসে এই এক যু্দ্ধের কাহিনী পাওয়া যায় যেখানে যুদ্ধ শেষ হয়ে যাওয়ার পরও অনেকদিন পর্যন্ত ঘটেছে নৃশংস হত্যাকান্ডের ঘটনা। আসলে সে সময় যারা নীতি-নির্ধারণী ভূমিকায় ছিলো, তাদের ব্যর্থতাই এর জন্য মূলত দায়ী। দ্য উইণ্ড দ্যাট শেকস্ দ্য বার্লিতেও বিষয়টি স্পষ্টভাবে এসেছে।
সিনেমার বিশেষ বৈশিষ্ট্য আয়ারল্যান্ডের চোখ জুড়ানো ল্যান্ডস্কেপ। সময়টাকে পর্দায় তুলে আনা হয়েছেও নিখুঁতভাবে। আর ভিন্নধর্মী সেটও মজা বাড়িয়ে দেয় অনেকখানি। সবচেয়ে বেশি ভালো লেগেছে সিনেমার কাহিনী। সেই সময়ের সাধারণ মানুষের সাধারণ যুদ্ধকৌশল এবং তার অসাধারণ প্রয়োগ না দেখলে মিস্।





মন্তব্য করুন