নিজেরই ছবি হয়তো
এরফুর্ট শহরে এর আগে এসেছিলাম সেই শুরুতে। ২০১৪ সালে। যখন প্রথম জার্মান দেশে এসে উঠি। এখানে নেমে ট্রেন নিয়ে এক ঘন্টারও কম একটা যাত্রা। পৌঁছালাম ইলমিনাউ। সেখানে পড়াশুনা করলাম চার বছর। মাস্টার্স শেষে এক অক্টোবরে সেখান থেকে বের হয়ে, পরে চলে গিয়েছিলাম অফেনবুর্গে। ছ'শ কিলোমিটার দুরে বিখ্যাত ব্ল্যাক ফরেস্টের ভেতরে একটা শহর। ব্ল্যাক ফরেস্ট বনভূমি ছড়িয়ে আছে জার্মানির দক্ষিণে বাডেন-ভুর্টেমবার্গ রাজ্যের প্রায় পুরোটা জুড়েই। অফেনবুর্গও সেই রাজ্যেরই একটা শহর ছিল। ওখানে ঘুম থেকে উঠে জানালা দিয়ে দেখতাম পাহাড়ের মাথার ওপর দিয়ে বিশাল একটা সূর্য উঠছে। প্রতিদিন। বিরামহীন।
তারপর সেখান থেকে এক অক্টোবরে চলে যাই এসেন শহরে। জার্মানির পশ্চিম দিকের এ শহর অপেক্ষাকৃত আধুনিক। বার্লিন বা মিউনিখের মতো আন্তর্জাতিক আর দিবানিশি সচল ২৪ ঘন্টার গতিতে চলে না, কিন্তু বড় ব্যাবসা প্রতিষ্ঠান, কল-কারখানা ইত্যাদি প্রচুর। জায়গাটা আগে ইস্পাত আর কয়লার খনি ছিল। পুরো রাজ্যই এসব খনিজ সম্পদের ওপর ভেসে পাড়ি দিয়েছে অনেক শতক। এখানে গড়ে উঠেছে জার্মানির ইস্পাত শিল্প- কাচাঁমাল আর জ্বালানি উভয়ের সহজলভ্যতার জন্য। রাজ্যটির সব শহরে ইস্পাতের বিশালাকার ভাস্কর্যের উপস্থিতি নির্দেশ করে, এক সময় এ শহরের প্রধান শিল্প ছিল ইস্পাতের ভাস্কর্যের ইতিহাস খোদাই করে রেখে যাওয়া।
সেখানে তিনটি বছর পার করে আরেক অক্টোবরে ফিরে এলাম আবার এরফুর্টে। এবার অবশ্য এখানেই থাকার উদ্দেশ্যে। আগের বার এরফুর্ট ছিল যাতায়াতের পথে এক টুকরো অমনোযোগীতার হাতছানি। এরফুর্টের ওপর দিয়ে কোথাও যাচ্ছি, হাতে সময় আছে, তাই একটু নেমে ঘুরে দেখলাম আকাশছোঁয়া ক্যাথেড্রাল (গীর্জা) কিংবা মধ্যযুগের রাজপ্রাসাদ। মধ্যযুগে খুব রমরমা ছিল এই এলাকাগুলো। এ শহরে তার ছাপ আর চর্চা দুটোই রয়ে গেছে। এখানে যেমন রাস্তাঘাট, বাড়িঘরের নকশায় মধ্যযুগের ছাপ রয়েছে, তেমনি "মেডিয়াভেল মেলা" বিষয়ের ওপর নানারকম কার্নিভাল, প্যারেড, উৎসবের চল রয়েছে। সেসব উৎসবে মানুষ মধ্যযুগীয় পোশাকে রাস্তায় ঘুরে ঘুরে বেড়ায়, পথে পথে ঘুরে আনন্দ করার মতো ব্যাবস্থার অংশ হিসেবে শহরের একটা পুরো অংশ বা এলাকা জুড়ে এসব উৎসব হয় সাধারণত। আবার উৎসব এলাকার ভেতর জায়গায় প্যান্ডেল, বসার জায়গা, সাউন্ড সিস্টেম- ইত্যাদি সম্বলিত আয়োজনও থাকে। যেখানে স্থানীয় ব্যান্ড বা শিল্পীদল নানারকম প্রদর্শনী দেখায়। শুধু স্থানীয়রা নয়, এখানকার উৎসবগুলোতে অংশ নিতে আসে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের মানুষ। কখনো দর্শক, কখনো শিল্পী, কখনো আয়োজন হিসেবে।
সেসব উৎসবের অবধারিত অনুষঙ্গ খাবার ও পানীয়। পথে পথে সেসবের দোকান, ট্রাক, স্টল সবই বসে। মানুষ সেখান থেকে কেনে মধ্যযুগীয় কায়দায় ঝলসানো ষাঁড়ের মাংসের কাবাব, রুটি, যব থেকে উৎপাদিত বিয়ার এবং নানা স্বাদ, গন্ধ ও রকমের ঘরে বানানো চকলেট।
গরমের দিনে এমন উৎসবে গিয়ে সকাল থেকে সন্ধ্যা অনায়াসে কাটিয়ে দেয়া যায়। শহরের মধ্য দিয়ে চলে যাওয়া শান্ত পানির যে খালটি রয়েছে, মাথার ওপর সেট করার জন্য একটা ছাতা সহকারে সেই লেকটার পাশে একটি চাদর বিছিয়ে বসে আর শুয়ে কাটিয়ে দেয়া যায় পুরো বেলাটাই। চাই কি একটা বই পড়ে চাঙ্গা করে নেয়া যায় মস্তিষ্কের নিউরণগুলোকেও খানিকটা। ওদেরকে না জানি কতদিন চাঙ্গা করা হয় না! শুধু অন্ধকার জলরাশি কেটে সামনে সাঁতরে এগিয়ে যাই।
অনেকেই যে কথাটিতে একমত পোষণ করেন, সেটা হলো- জীবন দু'দিনের। সে দু'দিনের ক'টা মুহূর্ত কাটানোর জন্যই হয়তো গ্রেট থুরিনজিয়ান বনভূমির রাজ্যে এসে ঠাঁই নিয়েছি। রাশিয়ান এক বন্ধু বলেছিল, একটি নতুন গন্তব্য তার পরের গন্তব্যকেও সঙ্গে নিয়ে আসে। কথাটা হয়তো সত্যিই। পরের গন্তব্যের আগে এখনকার গন্তব্যটাতে, কমলা আর হলুদ রংয়ের জোয়ার চলছে। বাইরে পথ-ঘাট, খাল-বিল, মাঠ-ঘাট সব এ দুই রংয়ে ছেয়ে আছে। আর সঙ্গে আছে লাল। একটু কম পরিমাণে, কিন্তু আছে। এগুলো সব গাছের পাতার রং। স্বাভাবিক সবুজের পাশাপাশি লাল, কমলা আর হলুদ। এর মাঝে টানা রাস্তা। তার ভেতর দিয়ে হেঁটে যেতে দেখালাম এক কিশোরকে সেদিন। জলরংয়ে আঁকা একটা ছবির মতো। নিজেরই ছবি হয়তো। হেঁটে যাচ্ছি এক গন্তব্য থেকে আরেক গন্তব্যের পানে।
---





মন্তব্য করুন