গল্প: নির্মাণাধীন
আমি যেখানে এসেছি জায়গাটার নাম বাংলা করলে দাঁড়ায় যেমন ছিলো। এখানে বেশিদিন হয় নি এসেছি। গত কয়েক বছরে আমার বন্ধু-বান্ধব কমতে কমতে একদম শূন্যের কোঠায় চলে এসেছে প্রায়। এখানে যারা থাকে তাদের কারো সঙ্গে এখন আর যোগাযোগ নেই। করতে ইচ্ছেও করে না। সবাই নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকতে ভালবাসি।
এই ব্যস্ত থাকাই নিয়ে এসেছে ভিন্ন গোলার্ধের এই জায়গাটায়। এখানে একা একা থাকি, তাতে সমস্যা হয় না। কোনো কাজ করি না, তাতেও কেউ কিছু বলে না। নিজের মতো কাটাতে মজা পাই কারণ এখানে প্রায় সবাই'ই আমার মতো। একটু গরীব আর একটু লাগামছাড়া।
সেদিন মেয়েটির সঙ্গে দেখা হলো অদ্ভুত এক জায়গায়। আমি মাঝে মাঝে করি কি, কোনো একটা পাবে চলে যাই। ছেলেপিলেরা হৈ-হুল্লোড় করে। আমি নিজের মতো বসে থাকি। সান্তুরি সময় কাটাই।
এরকম এক সন্ধ্যায় ভদকা টনিক নিয়ে টেবিলে বসে বসে একটা চুমুক দিতে গিয়ে প্রথমে চোখের কোণায় পড়লো ফর্সা মেয়েটি। এরপরে পুরো চোখ মেলে দেখলাম তাকে। বন্ধু-বান্ধব নিয়ে সময় কাটাতে এসেছে। সবাই মিলে বিয়ার বা অন্যকিছুও হতে পারে খাচ্ছে। কিন্তু মেয়েটি সেই টেবিলে নেই। তার মন পড়ে আছে অন্যকোথাও।
পাবটায় বসে থাকতে ভালো লাগছিলো কারণ তখন আমার সঙ্গে কেউ ছিলো না। কেউ থাকলে তাকে আলাদা করে মনোযোগ দিতে হয়। সে সমস্যাটা ছিলো না। মেয়েটিকে নিয়ে ভাবছিলাম। সে অনুপস্থিত কেন? এই বয়েসের মেয়েদের তো ভরপুর আড্ডায় অনুপস্থিত থাকার কথা না।
এখানে একটা সমস্যা হচ্ছে। ভাষার পার্থক্যের কারণে লোকজনের সঙ্গে ঠিকমতো যোগাযোগ করতে পারছি না। এখন যেমন পাবের টেন্ডারগুলোর সঙ্গে আলাপ জমিয়ে তুলতে পারলে অনেক রকম খবরই বের করতে পারতাম। কিন্তু সেটা ঠিকঠাক হচ্ছে না। সেজন্যই হয়তো আমার চোখগুলোকে অনেক বেশি কাজ করতে হচ্ছিলো। সবকিছুকে বিশ্লেষণ করার জন্যে।
সান্তুরি সময় কাটানোর একফাঁকে মেয়েটির সঙ্গে চোখাচোখি হলো। সে ছোট্ট একটা হাসিও দিলো। এটা বোধহয় কারো দিকে তাকিয়ে থাকলে এখানে ভদ্রতা করে করা হয়। আমিও হাসি ফিরিয়ে দিলাম। দূর থেকে এতটুকুই ঘটলো।
এরপরে মাঝে মাঝে পাবটায় আরো গেছি এবং অস্বীকার করার কিছু নেই, মনে মনে মেয়েটিকে খুঁজেছি। আমার সঙ্গে সাধারণত মানুষের দৃষ্টি বিনিময় হতো না। যে কারণে ঐ দিনের পর থেকে মেয়েটিকে আমি খুঁজতাম। এটাকে অলস সময় কাটানোর জন্য একটা মেকি বিলাসিতার আয়োজন হিসেবেও ধরে নেয়া যায়।
একদিন আমার বিল্ডিংএর লিফটেই ওকে দেখলাম। অনেকগুলো চাইনিজ লোকের সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছে। সেখানে কোনো দৃষ্টি বিনিময় হয় নি। আমি শুধু ওকে খেয়াল করেছিলাম। একটা জিনিস জেনে ভালো লেগেছিলো। মেয়েটি তাহলে এখানেই কোথাও থাকে কিংবা মেয়েটিকে একেবারে হারিয়ে ফেলি নি। যদিও কেন তাকে আমি খুঁজছিলাম সেটা জানতাম না।
আমার আরেকটা যেটা সমস্যা ছিলো, সেটা হলো ঘুমাতে ভালো লাগতো না। মানে ঘুম থেকে উঠলেই নিজের ওপর একটা রাগ ধরে যেত এবং মনে হতে থাকতো আরো একটা ভয়াবহ সূর্যালোকে আমাকে নিয়ে আসার পেছনে আমিই দায়ী। নিজেকে নিজেই আপনমনে অনেক কটু-কাটব্য করতাম।
এই সমস্যাটাকে সঙ্গে নিয়েই আমি একটা জীবন যাপন করছিলাম, যার সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব ছিলো নিঃসঙ্গতা। আমার ক্ষুদ্র জীবনের একমাত্র পাওয়া হিসেবে ছিলো এই জিনিসটিই। এটাকে আমার এপ্রিশিয়েবল মনে হতো। কিন্তু কখনো কখনো আমি এটা থেকে মুক্ত হতে চাইতাম। যার সুযোগ কখনো আসতো না, এবং সুযোগ না পেয়ে পেয়ে আমি কিছুটা অসামাজিক হয়ে উঠেছিলাম। একদিন থেকে খেয়াল করতে শুরু করলাম, আমি কেবল আমার নিজের সঙ্গে কথা বলতে পছন্দ করি। কিন্তু বাইরের কারো সঙ্গে কথা বলতে গেলেই আমার ভেতরে বিরক্তি ও অনাগ্রহ একসঙ্গে কাজ করতো।
একদিন নিঃসঙ্গতায় বিরক্ত হয়ে পাবে গিয়ে বসেছিলাম অনেক রাতে। দুইটা বা তিনটা হবে তখন। আমার স্টেলো'টা রুমে রেখে আসার কারণে সময় সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা ছিলো না। অন্য কাউকে জিজ্ঞেস করতেও ইচ্ছে করছিলো না। খেয়াল করলাম মেয়েটি একটা শাদা শার্ট আর থ্রি কোয়ার্টার প্যান্ট পড়ে পাবে ঢুকছে। আমি বেশ অবাক হলাম। কারণ ও ছিলো একা।
আমার পর পর দুইটা চেয়ার ফাঁকা ছিলো। একা একা ঢুকলে কাউন্টারের সামনেই বসতে হয়। এটাই নিয়ম। ও এসে আমার পাশের চেয়ারটায় বসলো। বারম্যান ওর অর্ডার চাইলে ও একটু বোধহয় আমার জন্য অপেক্ষা করছিলো, আমি কোনোকিছু বলি কি না। আসলে পাড়া-প্রতিবেশি তো, আমার আর কিছু না হোক, ভদ্রতা করেও এখন কিছু কথা বলার দরকার আছে। এই এলাকার লোকজন ভদ্রতাকে খুব দাম দেয় বলেই মনে হচ্ছিলো।
আমি অবশ্য ও'র দিকে তাকাই নি তখনো। বললাম, জাপানিরা ইদানীং ভালো ভদকা বানাচ্ছে। রিলাক্স টাইমে ট্রাই করার জন্য বেশ উত্তম। অপরিচিত পড়শী'কে এরচে' বেশি আর কিইবা বলা যায়। সে বোধহয় একটু মজা পেলো, জানতে চাইলো,
- জাপানি কেন? শীতের দেশের লোকেরা কি এখন আর ভদকা বানাতে পারছে না?
পারছে, ওরাও পারছে জাপানিরাও পারছে। জাপানিদের হাতে কাজ-কাম কম। তাই বসে বসে ভদকা বানাচ্ছে। আর কি করবে?
-তাও ঠিক। পুরো দেশটা এত অটোমেটিক যে অসহ্য লাগে। দেখি ওদের ভদকাটাই চেক করে দেখা যাক।
জায়গাটা চমৎকার। বিশেষত শুয়ে থাকার জন্য এমন সব বিস্তৃত মাঠ আছে, যা কল্পনাই করা যায় না। অবশ্য কল্পনা করা না গেলেও এখানে এসে মাঠগুলো আবিস্কার করে আমি বেশ পুলকিত হয়েছি। এমন মাইলের পর পাহাড়ের মধ্যে দিয়ে চলে যাওয়া খোয়া বিছানো মজবুত রাস্তা আমি আর কখনো দেখি নি। আর কি সে ঝকঝকে তেজ সেই রাস্তার। একদানা ধূলা কোথাও নেই। পাহাড়গুলো মোড়ানো কয়েক পরতের সবুজ কার্পেট দিয়ে। আমার আকৃতি যদি গালিভারের মতো বিশাল হতো তাহলে আমি সেই রাস্তার ধারে বসে পাহাড়ের গাএর ঘাসের ওপর দিয়ে হাত বুলোতাম। একপাশ থেকে বুলিয়ে আরেকপাশে চলে আসতাম। এখনও হাত বুলাই। বিশেষত স্লীপিং ব্যাগের ভেতর শুয়ে শুয়ে কোনো নির্জন পাহাড়ী রাস্তার ধারে ভদকা খেতে খেতে ঘুমিয়ে যাওয়ার কাজটা আমার সবসময়ই দারুণ লাগে!





মন্তব্য করুন