ইউজার লগইন

গল্প: কালবৈশাখী

পর্ব-১

পাচ্ছি না একটুও শান্তি। নীলামনিকে সেদিন স্বপ্নে দেখলাম। দেখলাম কি, সে আমাদের বাড়ির একটা ঘর ভাড়া নিয়েছে। স্বপ্নে তো কতকিছুই দেখা যায়। আমি দেখলাম, এক ঘুঘু ডাকা স্তব্ধ দুপুরে ও ঘুমিয়েছে কিংবা ঘুমোনোর ভান করছে এমন সময় আমি গিয়ে ওকে জড়িয়ে ধরেছি। ধরে বিছানা ওপরে দুইটা পাক দিয়ে দিয়েছি। তারপর হুটোপুটি শুরু করেছি দু'জনে মিলে। নাকের সঙ্গে নাক ঘষছি আর দুইজনই খুব হাসছি। ও আমাকে বজ্জাত, হাড়কেলো ইত্যাদি বলে বলে রাগ দেখানোর আর কিল দেয়ার চেষ্টা করছে। আমি দুইহাতে ওর হাত দু'টিকে বালিশের দু'পাশে ঠেসে ধরে আটকে দিলাম। ওর ঠোঁট থেকে তখন আমার ঠোঁট ঠিক এক ইঞ্চি দূরে। একটা রিনরিনে হাসির শব্দ তখনও দূরে কোথাও ভাসছিলো। আমি সে সময় ওর বুকের ভেতরকার তুমুল তোলপাড় স্পষ্ট অনুভব করতে পারছিলাম।
ঠিক এরকম একটা পর্যায়ে স্বপ্নটা ভেঙ্গে গেল। পিচ্চিবোনটা এক ছটাক পানি এনে নাকে-মুখে ঢেলে দিয়েছে। এই মেয়েটি আমার একেবারে জন্মের শত্রু। অথচ ও জন্ম নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমিই ওকে কোলে নিয়েছিলাম বাসার সবার আগে। আর ও আমার কোলে উঠেই ভ্যাঁ করে দিয়েছিলো কেঁদে। তারপর থেকে ওর সঙ্গে শত্রুতা শুরু হয়ে যায়। নাকে-মুখে পানির দমক সামলে নিয়ে ধড়মড় করে উঠে বসতেই শুরু হলো ওর কানজ্বালানো খিকখিক হাসি। এমন একটা প্রাণসংহারী কাজ করতে পেরে ওর কি অপার আনন্দ। নিশ্চল আক্রোশে বারকয়েক দাঁত কিড়মিড় করলাম। আমার হাতের মুঠোয় পাতলা একটা ম্যগাজিন ছাড়া আর কিছুই ঠেকলো না। সেটাই ওর দিকে ছুঁড়ে মারলাম। সকালে ঘুম থেকে উঠে আমি প্রথম যে শব্দটি উচ্চারণ করলাম তা হলো, রে নরকের প্রহরী। এটা ওকে উদ্দেশ্য করেই বলেছিলাম। শুনে ও বোধহয় আরো মজা পেয়ে গেল। আজকাল ডেপোঁগুলো বড়দের একটু সম্মানও দেয় না। ভয় পাওয়া তো অনেক দূরের কথা। ও যখন আরেকটু ছোট ছিলো, তখন ওকে পাঁজা করে নিয়ে বারান্দার বাইরে ধরে বলতাম; ফেলে দেবো নাকি বল? সে সময়টায় ও আমাকে একটু-আধটু ভয় পেতো। এখন আর তেমন করে শাসাই না। কোনোদিন যদি ও'র কলেজ বন্ধ থাকে তাহলেই হয়েছে। দিনের শুরু থেকেই আমার পেছনে লেগে যায়।
কিন্তু আজ খুবই খাপ্পা হলাম। কারণ আমি একটা দারুণ স্বপ্ন দেখছিলাম। নীলামনির গলার স্বরটা এত সুন্দর আর চেহারাটা কি যে মায়াকাড়া, কিভাবে বোঝাই? আমি প্রথমবার দেখেই ওর সঙ্গে প্রেম শুরু করে দিয়েছি। ও অবশ্য জানে না। প্রেমের মধ্যে কতকিছু করি আমরা। ও কিছুই জানে না।
সেদিন মধুর গোলঘরের ভেতর বসে বসে আড্ডা পেটাচ্ছি। বাহাদুর ইদানীং খুব ফাঁকিবাজ হয়েছে। মোটেও কথা শুনতে চায় না। সেই কখন সিংগারা আর পেঁয়াজ-মরিচ দিয়ে যেতে বলেছি, কোনো খবর নেই। অবশ্য নীলামনির বাসা দরকার, এ সংবাদে আমরা সবাই বিশেষ বিচলিত হয়েছি বলে সেদিকে খুব বেশি ভ্রুক্ষেপ করছি না। মোনালিসা আর মন্দিরাদি বুদ্ধি দিলো, আজিমপুরে কোয়ার্টার পাওয়া যাবে। সেখানে দু'তিনজন মিলে উঠে যাওয়ার জন্য। আড্ডার আলোচনা বলেই হয়তো, ওরাও নীলামনির সঙ্গে উঠে যেতে চাইলো। যদিও জানি দু'টোর একটাও হল ছেড়ে কোথাও এক পা নড়বে না। খুব হিসেবী মেয়ে কি না।
ইশ্ আমাদের পুরান ঢাকায় তো নীলামনি যাবে না। গেলে নিশ্চিত ওর জন্য একটা ঘরের ভাড়াটে তুলে দিতাম। ওর কাছ থেকে এমনকি ভাড়াও নিতাম না। অবশ্য আম্মু সেটা কতটুকু মানতো জানি না। তাও আমি হই-চই একটা লাগিয়ে, বন্ধু থাকবে ইত্যাদি বলে ব্যবস্থা ঠিকই করে ফেলতাম। প্রতিদিন আমরা একসঙ্গে রিকশায় বা আমাদের সিএনজি’গুলোর কোনো একটায় করে ক্যম্পাসে আসতাম।
একসময় বাহাদুর সিংগারা-চা সবই দিয়ে গেলো। সেসব খেয়ে একে একে সবাই যার যার হলে, বাসায় বা টিউশনিতে রওনা হলো। আমি পত্রিকা অফিসের ছোটো চাকুরীটা ছেড়ে দিয়েছি। পড়াশোনা, আড্ডাবাজি আর সংগঠন সামলে মনোযোগ দিতে পারছিলাম না। গোলঘরে তাই আমি আর নীলামনি রয়ে গেলাম শুধু। আমাদের দু'জনের একটা বাড়তি কাজ আছে। পরদিনের মিছিলের ব্যানারটা বানিয়ে রেখে যেতে হবে।
সবাই চলে যাওয়ার পর নীলামনি বললো, এই সিগারেট আছে? দে না।
-নাই। রুবেলের কাছ থেকে আনতে হবে।
তো আন। বসে আছিস ক্যান? সারাদিন বসে বসে কি দেখিস?
-টাকা নাই তাই বসে আছি। বসে বসে তোমাকে দেখি, এমন ভেবো না।
টাকা নাই বললেই হয়। কাজের কথা বললেই শুরু হয় একগাদা ভ্যাজভ্যাজ। এই নে।

লাল প্লাস্টিকের বঙ্গবন্ধুকে ধরতে গিয়ে নীলামনির সঙ্গে ছোঁয়া লেগে গেল। উঠে রুবেলের কাছ থেকে চার টাকা দিয়ে একটা বেনসন কিনে আনলাম। এরকম বিকেলে সাধারণত মধুর কেন্টিনে লোক-জন কম থাকে। যে কারণে গোলঘরের দরজা ভিজিয়ে দেয়াটা একটু অস্বস্তিকর। বিশেষত ভেতরে যদি দুইটা ছেলে-মেয়ে থাকে। কিন্তু নীলামনি সে কথা শুনলে তো।
আমি কি বাজারের মধ্যে বসে সিগারেট ধরাবো? আশ্চর্য!
-তা বলে দরজা ভিজিয়ে দেবো?
হ্যাঁ, সেটা তো দিবিই। দিয়ে আমার সামনের চেয়ারটায় এসে বসবি। যাতে বাইরে থেকে কেউ হুট করে ঢুকে গেলেও টের না পায়। ওকে?
-ওকে বাবা ওকে।

সন্ধ্যায় নীলক্ষেত বাকুশাহ মার্কেট থেকে সাড়ে তিন গজি নীল কাপড় কিনে আনলাম দু'জনে গিয়ে। ১৪ টাকা করে গজ। সাদা আর লাল রংএর কৌটা কিনলাম। একেকটা ৩৫ টাকা। গোলঘরে বসে বসে আমরা শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ কেন মানি না, তা লিখলাম সেই কাপড়ের ওপর। লিখে সেটা গোলঘরের মেঝেতেই টান টান করে রেখে দিলাম। রাত পোহালে জিনিসটা শুকিয়ে যাবে। কাজ শেষ করে গোলঘরে তালা দিতে দিতে নয়টা বেজে গেল। তড়িঘড়ি দু'জনে দৌড় লাগালাম। গন্তব্য তখন ফজিলাতুন্নেসা মুজিব হল। অকর্মণ্যতার সুবাদেই সম্ভবতঃ ওর সঙ্গে আমিই সবচে বেশি সময় কাটানোর সুযোগ পেতাম। কিংবা হয়তো আমার আগ্রহটাই সবচে’ অকৃত্রিম ছিলো।
পরদিন সকাল সাড়ে ১১টায় মিছিল। মধুর সামনে নামতেই দেখি বিশাল জটলা। সভাপতি এসে চমৎকার ব্যানারের জন্য ধন্যবাদ জানালেন। আমরা দু'জন কর্মী তখন খুবই খুশি। অনুপ্রেরণায় ভেসে গেলাম। স্লোগান দেয়ার সময় গলা ফাটিয়ে ফেলছিলাম উল্লাসে। দুপুরে দেখি দু'জনের গলা দিয়েই কোনো স্বর নেই। ভাত খেতে গেলাম বুয়েট ক্যাফেটেরিয়ায়। দু'জনের সাকুল্যে খরচ হলো ৪০ টাকা। ও দিয়েই ট্রে-ভর্তি ভাত, মুরগী এবং ভর্তাসহ আহার্য সেরে ফেরার সময় শুধু সিগারেট টানতে একটু ঢুঁ দিয়েছিলাম জিমনেশিয়ামের মাঠে। যাচ্ছিলাম কার্জন হলে। তখন একটা কর্মীসভা ছিলো। যেটাকে আমরা কৃমিসভা বলতাম। আমি কেবল নিউ সেকেন্ড ইয়ারে উঠেছি। নীলামনি থার্ড ইয়ারে। কৃমিসভায় ফার্স্ট ইয়ারের কৃমিগুলোকে (আসলে কর্মী হবে) নাড়াচাড়া করতে খুব ভালো লাগতো। কোনো কোনোটার খুব তেজ থাকতো। মার্কস-লেনিনের গণ্ডি পেরিয়ে মাও সে তুং বা সুভাষ চন্দ্র বোসকে ধরে টান দিয়ে বসতো। সেসব টানে খারাপ লাগতো না। অনেক রকমের আলোচনা হতো। আমরা ভোলগা থেকে গঙ্গা বা ছোটদের অর্থনীতি, ছোটদের রাজনীতি থেকে অর্জিত প্রাথমিক জ্ঞান শেয়ার করতাম। শেখাতাম টানাটানি না করে, জ্ঞানার্জনের আগ্রহ গড়ে তোলাটা জরুরি বেশি।
যাক্ সিগারেট খাওয়া শেষে গেলাম সেদিন সভায়। আলাপ-আলোচনায় ঠিক হলো এক মাসের কর্মসূচি। আমাদের দু'জনের দায়িত্ব পড়লো কার্জন হলের নতুন কর্মীদের ভালোমতো নাড়াচাড়া করার। ওদেরকে নিয়ে সপ্তাহে সপ্তাহে পাঠচক্র আয়োজনের। কাজটা দু'জনেরই পছন্দ হলো।
দ্রুতই নীলামনি হল ছেড়ে আজিমপুরে বাসা নিয়ে ফেললো। এটা একটা দারুণ বিষয় হয়েছিলো। কারণ এরপরে রাত দশটা বা এগারোটা-কেও আমরা ভয় পেতাম না। অবশ্য এগারোটা পেরিয়ে গেলে একটু টেনশন হতো। কিন্তু সেটা খুব বেশি ঘটতো না।
এদিকে আমি নীলামনিকে যতই আরে-ঠারে একটা জরুরি বিষয় বোঝাতে চাই, ততই দেখি পিছলায়। যেহেতু ব্যপারটি সম্পর্কে আমি নিজেও সেই সময় খুব বেশি নিশ্চিত ছিলাম না, তাই বেশি জোরাজুরি করতাম না। শুধু দেখতাম, এমনিতে মেয়েটি আমাকে ছাড়া নড়তে পারে না একফুটও। কিন্তু বন্ধুত্ব নামক একটা সীমানা প্রাচীর তুলে আমার নড়াচড়া বন্ধ করে রাখে সবসময়।
সেবার বেতিয়ারা গেলাম মুক্তিযুদ্ধের সময় কমিউনিস্ট পার্টির নেতাদের এন্ট্রান্স পয়েন্ট দেখার জন্য। সেখানে একটা স্মৃতিসৌধ আছে। দেখে-টেখে ফিরতে রাত হয়ে গেল। পথে একবার কুমিল্লায় নেমে দলের সবাই রসমালাই খেয়েছিলাম। ওতেই মূলত দেরীটা হয়েছে। যাক্ আমরা দুইজন শেষ পর্যন্ত দৌড়াতে দৌড়াতে সেদিন ঠিক এগারোটায় আজিমপুরে পৌঁছেছিলাম। ও হাঁপাতে হাঁপাতে আমাকে বিদায় দিয়েছিলো। দেয়ার সময় অকারণেই আমার হাতে ওর হাতটা একটু কিছুক্ষণের জন্য রেখেছিলো। অবশ্য পুরোপুরি অকারণে বলা যাবে না। বেতিয়ারায় একটা মজার ঘটনা ঘটেছে।
আমরা কয়েকজন অত্যূৎসাহী গ্রামের ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে চলে গিয়েছিলাম বর্ডার লাইনে। সেখানে গিয়ে তো সীমানা ফলক দেখে বেশ উত্তেজিত হয়ে পড়লাম। উচুঁ টিলার ওপর সীমানা ফলক। তার নিচে ঢালুমতো জমি। ঢালের ওইপারে ভারত। চারিদিকে গাছপালা। ভালোই লাগছিলো। আমরা ক'জন হৈ-হুল্লোড় করছিলাম। করতে করতে ঢাল বেয়ে খানিকটা নিচেও নেমে গিয়েছিলাম। আমাদের সঙ্গে আসা বড়ভাইগুলো মোটেও সতর্ক ছিলো না। ওরা সিগারেটের ভেতরে গাঁজার মশলা ভরে টানছিলো। তাই দেখে আমরাও টানলাম। বেশ আমোদ হচ্ছিলো। হঠাৎ টিলার ওপর থেকে দু'তিনজন চাষীমতো লোক চিৎকার শুরু করে দিলে আমাদের সম্বিত ফিরলো। সীমানা পেরিয়ে বেশ খানিকটা নো ম্যানস্ ল্যন্ডে ঢুকে পড়েছি। যেকোন সময় গুলি খেয়ে মরে যেতে পারি। চাষাগুলো আমাদের সাবধান করার সময় এত জোরে চিৎকার করছিলো যে, আমাদের মনে হলো; বিএসএফ এতক্ষণ না দেখলেও এবার ওদের চিৎকারে ঠিকই দেখে ফেলবে। সবাই পড়িমরি ঢাল বেয়ে উঠতে শুরু করে দিলাম। নীলামনি আর আমি ছিলাম সবার পেছনে। সে সময় হাত-পা নিশ্চল হয়ে আসছিলো বার বার। মনে হচ্ছিলো আমরা কেউই আর এক ধাপও ওপরে উঠতে পারবো না। কয়েকটা বুলেট এসে সবাইকে জায়গায় বিঁধে ফেলবে।
আসলে সে সময় অবস্থাটাও তেমনি ছিলো। প্রায়ই সীমান্তে মানুষ মারা যেতো একেবারে বিনাকারণে। আমি ভাবছিলাম, যেকোন সময় পেছন থেকে একটা গুলি এসে পিঠের ভেতর সেঁধিয়ে যেতে পারে। বিদীর্ণ করে রেখে যেতে পারে ফুসফুস। কোনো শেষ সুযোগ না দিয়েই। সেটা জানা ছিলো বলেই মনে মনে চাচ্ছিলাম; গুলি যদি লাগেই সেটা আমার গাএ লাগুক, নীলামনির গাএ যেন না লাগে। ও বেঁচে থাকুক। এটা ওকে বলতেই ও ক্ষেপে উঠলো,
-কেন আমার গাএ লাগলে সমস্যা কি? আমি কি মারা যেতে পারি না?
এটা একটা ঝগড়া করার সময় হলো? আগে তো এখান থেকে সরতে হবে আগে তাই না?
-না আগে এটার একটা হেস্তনেস্ত হবে। গুলি কেন খালি তুই'ই খাবি?
হ্যাঁ আমিই খাবো। তোমার ভাগের গুলিটাও খেয়ে নেবো তারপর দাঁত কেলিয়ে মরে যাবো। তখন তো আর হাজার খুঁজেও আমাকে পাবে না। খুব মজা হবে।
-পিটিয়ে তোর হাড্ডি গুঁড়ো করবো। তুই খালি বাংলাদেশে চল একবার।

আমরা দুইজনে ওই চরম বিপদের মধ্যেও দুষ্টামী করে যাচ্ছিলাম। বয়সে বড়গুলো সেসব দেখে কিছুটা অবাক হচ্ছিলো। কিন্তু কিছু বলছিলো না। পরে অবশ্য এটা নিয়ে কমিটি মিটিংএর কথা উঠেছিলো। আমরা দুইজনও ছিলাম মিটিংএ। এরকম একটা বিষয় নিয়ে যে আলোচনা হতে পারে, সেটা আমাদের দু'জনের চিন্তারও বাইরে ছিলো। খুবই ব্যক্তিগত একটা বিষয়ে অযাচিত হস্তক্ষেপ বলে মনে হলো দু'জনের কাছেই। কিন্তু সংগঠনের শৃংখলা রক্ষার খাতিরে আমরা কেউই কিছু বললাম না। আর অবাকের পিঠে অবাক করে আমাদের দু'জনকে পরামর্শ দেয়া হলো, চলাফেরায় সংযত হওয়ার জন্য।
আমি ভাবনা-চিন্তা করে দেখলাম, নামেই এরা প্রগতিশীল। আসলে ভেতরে লবডঙ্কা। যাক ওই দিন রাতে ঢাকায় ফিরে প্রথমবার নীলামনির হাত ধরার পর থেকেই নানারকম স্বপ্ন দেখার উপদ্রব শুরু হলো। যার সর্বশেষ নিদর্শনটি এ গল্পের শুরুতে উল্লেখ করা হয়েছে।

আমি মনে মনে ভাবতাম, বাম রাজনীতি করতে এসে প্রেমে পড়াটা একটু কেমন যেন হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু নিজেকে একদমই ব্রেক করতে পারছি না কেন? মাঝে মাঝে গর্ভধারীনির জয়িতা'র কথা মনে পড়ে যাচ্ছিলো। একটা বিপ্লবী মেয়ে। কিন্তু ভালবাসার কাছে সমর্পিত। আমি ওর ভালবাসার দৃশ্যটা চিত্রায়নের চেষ্টা করি। মানুষের পক্ষে এই জিনিসের মোহ থেকে বের হয়ে আসা কঠিন।
নীলামনি'র সঙ্গে কোনো কারণ ছাড়াই সম্পর্কটা একটু ঘনিষ্ঠ হয়ে গেল। হয়তো মানুষ একটু বেশি মনোযোগ দিচ্ছিলো বলে আমরাও বিষয়টাকে একটা বাড়তি গুরুত্ব দিচ্ছিলাম। কিন্তু একদিন হঠাৎ খেয়াল হলো, আমরা একজন আরেকজনের রাতের-দুপুরের খাবার বা সকালের নাস্তার খোঁজখবর রাখছি। একজনের পরীক্ষার জন্য রাত জেগে পড়া দরকার হলে মোবাইলের অপর প্রান্তে আরেকজন জেগে থাকছি। ভিন্ন ভিন্ন ডিপার্টমেন্টে পড়ার কারণে ক্লাসের সময়টুকু ছাড়া অন্যান্য কাজগুলো সাধারণত একসঙ্গেই করা হচ্ছে।
একদিন পার্টি অফিসে যাওয়ার পথে নীলামনির সঙ্গে ব্যপারটা শেয়ার করে ফেললাম। ও অবশ্য তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টাকে খুব একটা গুরুত্ব দিলো না। কি যে বিরক্ত লাগলো, তা বলে বোঝানোর নয়। আমার আকির্মিডিসের ইউরেকাসম আবিস্কার ওর কাছে কোনো পাত্তাই পেলো না! এটা একটা কথা? তবে এর পরপরই একটা ঘটনা ঘটেছিলো। যেটা দু'জনের জীবনের স্টিয়ারিংই একটু ঘুরিয়ে দিয়েছিলো। হয়তো আমাদের যাওয়ার কথা ছিলো অন্য কোথাও। আমরা যাওয়া শুরু করলাম অন্য একটা অন্য কোথাও।
ক্যম্পাসে একটা গণ্ডগোল লেগে গেল। শাহবাগ মোড়ে ইকোনোমিক্সএর এক ছাত্র একদিন রোড এক্সিডেন্টে মারা গেল। ছেলেটাকে চিনতাম না। কিন্তু তবুও বিষয়টা ছিলো হৃদয় বিদারক। আমাদের সবাইকে বিদীর্ণ করেছিলোও। ক্যম্পাসের প্রতিটি বিন্দুতে সে হাহাকার ছড়িয়ে পড়েছিলো। আমাদের মধ্যে একজন নেই। একজন দুম করে হারিয়ে গেছে।
কলাভবন, ক্লাসরুম, মধু, লাইব্রেরী বা শালিক চত্বরে সবাই মন খারাপ করে বসে থাকছিলো। বেলাল চাএর কাপে ঠিংঠিং স্টিলের চামুচে নাড়িয়ে চিনি গোলাচ্ছিলো, কিন্তু মুখটা মনমরা করে। জাকির ভাইএর কাছে তো যাওয়াই যাচ্ছিলো না সিগারেট বা ফ্লেক্সির জন্য। গ্যারেজের স্টিকগুলো ভরা হচ্ছিলো হতাশার মুঠো থেকে মশলা তুলে তুলে।
এমন সময় আমরা বের করলাম, এভাবে বসে থাকা যায় না। সমাজের প্রতিটি মানুষ একটি দুঃখজনক ঘটনার মুখে বোবা হয়ে গেলে চলে না। একদলকে শোক পাশ কাটিয়ে আর যেন এমন দুঃখ না পেতে হয়, সেজন্য কাজ করা লাগে। সেই উপলব্ধি থেকে আমরা নিজের ভাইএর মৃত্যূশোকে দিশেহারা হওয়ার প্রয়োজনীয়তা পাশ কাটিয়ে সড়ক দুর্ঘটনা বিরোধী আন্দোলনের ডাক দিলাম। ক্যম্পাসের বেশির ভাগ ছেলে-মেয়ে তখন বিষয়টার প্রয়োজনীয়তা বুঝতে পেরে আমাদের ডাকে সাড়া দিয়েছিলো। সে সাড়া এত অভূতপূর্ব ছিলো যে আজীবন সে বছরটিকে মানুষ মনে রাখবে। ক্যম্পাসের তথাকথিত পোলাপানের একাত্মতা বিষয়টি একাই যে কি প্রচণ্ড শক্তি ধরে তা আমরা সেদিন বুঝতে পেরেছিলাম। সে শক্তি নষ্ট সময়কে হটিয়ে নতুন সম্ভাবনাকে পথ করে দিতে পারে।
ছেলেরা ক্যন্টিন কিংবা করিডর থেকে রাস্তায় নেমে এসেছিলো একটা কালো নীরবতাকে সঙ্গী করে। আমি একদিন আজম ভাইকেও দেখেছিলাম, গ্যারেজের অন্ধকারের বাইরে, দিনের আলোয়; একটা কালো চাদর জড়িয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন আমাদের একপাশে।
আন্দোলনে পুলিশের নির্যাতন সইতে হয়েছিলো ডান-বাম নির্বিশেষে সবাইকেই। তবে আন্দোলন সফল হয়েছিলো। দেশের বোধহয় সড়ক দুর্ঘটনায় কোনো নিহতের পরিবার সেবারই প্রথম হাতেনাতে বিচার পেয়েছিলো। ঘাতক ড্রাইভারের যাবজ্জীবন কারাদন্ডের সাজা হয়েছিলো। সঙ্গে আদেশ হয়েছিলো, বিশ্ববিদ্যালয় ও আশপাশের এলাকায় যেকোন রকম যান্ত্রিক বাহন চালানোর ওপর কড়াকড়ি নিয়মারোপের। সে আদেশ আজো বহাল রয়েছে। ক্যম্পাসের ভেতরে গাড়ি চালাতে শক্ত নিয়ম মানতে হয়।
আন্দোলনের ফলাফল আমাদের পক্ষে আসলেও জল ঘোলা হয়েছিলো বিস্তর। যদিও ছাত্ররা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কনস্পিরেসি'র স্বীকারই হয়েছে। নোংরা চক্রান্তগুলোর কোনোটিই কাজে আসে নি। ঠুনকো অজুহাতে পুলিশ বাহিনী আমাদের ওপর চড়াও হয়েছিলো। আমরা যারা ন্যায়বিচারের আশায় রাস্তায় নেমে এসেছিলাম, তাদের শরীরে, মাথায় লাঠি ফাটিয়ে রক্তাক্ত করে দিয়েছিলো। এর বিনিময়ে অবশ্য আমরাও প্রতিদিন কয়েকটা করে নীল বাঁদর ধরে পিটিয়ে তক্তা বানাতাম। আসলে ওরা যেমন উপরওয়ালার নির্দেশ পালন করছিলো, আমরাও তেমনি জঘন্য উপরওয়ালা গোষ্ঠীকে আঘাত ফিরিয়ে দিচ্ছিলাম। মার খাওয়া বাঁদরটি ছিলো নিমিত্ত মাত্র।
নীলামনি আমার মাথায় ব্যান্ডেজ দেখে হাসপাতালের মধ্যে একফোঁটা চোখের জল ফেলেছিলো। ওটাই ছিলো আমার জন্য ফেলা ওর প্রথম চোখের জল্য। এরপরে অবশ্য আর আমার কপালে ব্যান্ডেজ জোটে নি। তাই বলা যায় সেটা ছিলো শেষ চোখের জলও। মেয়েরা যে কি নিষ্ঠুর হতে পারে! মাথায় ব্যান্ডেজ না দেখলে একটু কাঁদেও না। ঐ মুক্তোদানার মতো একফোঁটা অশ্রু আমার ভেতরটা আমূল কাঁপিয়ে দিয়েছিলো। মেয়েটিকে কত গভীরভাবে জীবন-মন সঁপে দিয়েছি বুঝতে পারি।
এরপর বেশ কিছুদিন পার করি জীবনের একটা জটিল পর্যায়। নানাদিক থেকে ঝামেলা এসে আমাদেরকে জড়িয়ে ধরতে শুরু করে। বেশ কিছু দায়িত্বও এসে ঘাড়ের ওপর চেপে বসলো। দু'জনে আগের মতো রিকশায় করে ঘুরে ঘুরে দুপুরে খেয়ে মাঠে সিগারেট টানতে ঢুঁ দেয়ার সুযোগ পাই নি অনেকদিন।
সে সময়ও দিনের মালা গেঁথে গেঁথে সপ্তাহের ভেলা ভেসে যেতো মহাকালের নদীতে। কিন্তু একে অপরকে খুব বেশি দূরে সরে যেতেও দিতাম না। মাঝে মাঝে মিথুন বা সংগঠনের অন্যান্য ছেলেগুলোর দিকে ক্রূর চোখে তাকিয়ে থাকতাম। অবশ্য মনে মনে। কারণ আমার মনে হতো ওরা সবাই নীলামনিকে ভালবাসে। ওকে আমার কাছ থেকে কেড়ে নিতে চায়। কখনো আবার মেয়েটির ওপরেই রাগ ধরতো। মনে হতো ও বোধহয় আমাকে একটুও চায় না। নাহলে ও অন্যান্য ছেলেদের সঙ্গে এত মিশতো কেন? কিন্তু এর বেশিরভাগই ছিলো হিংসাপ্রসূত। সেটাও আমি নিজেই বুঝতে পারতাম, যখন ঠান্ডা মাথায় সবকিছু একটু ভাবতাম।
একবার আমরা সব বন্ধু-বান্ধব, মানে যারা একসঙ্গে মধুর টেবিলে বসে সারাদিন পিটাপিটি করি; তারা মিলে গেলাম গাইবান্ধা। সংগঠনে জুনিয়র একটা ছেলে এসেছিলো। গ্রামে ওর দাদার আছে বিশাল বাড়ি। এমনিতেও ক্যম্পাস বন্ধ থাকায় হাতে তেমন কাজ ছিলো না। তারমধ্যে পেয়ে গেছি পাকা আম খাওয়ার এমন জরুরী একটা নিমন্ত্রণ। আমাদের কেউই বাঁধা দিতে পারলো না। মোনালিসা আর মন্দিরাদি'ও এই সুযোগে ঢাকার বাইরে বেড়াতে যাওয়া ছাড়ে নি।
আমরা গাইবান্ধায় কয়টা দিন এ্যকোরিয়ামের মাছের মতো ছোটাছুটি করে কাটিয়েছি। দিনে গ্রাম চষে বেড়ানো, বাঁশঝাড় পর্যবেক্ষণ, পুকুরে ছিপ ফেলা আর নদীতে গোসল করা ছিলো কম্পালসারি। বিকেলে বিশাল পানকৌড়ি নৌকায় নদীতে ঘুরতে বের হতাম। ছেলেটার দাদার নৌকা। প্রতিদিন নদীতে ঘুরলে এক সময় সেটাকে শহরের রাস্তার মতো লাগে। খুঁজলে পাওয়া যায় একটা পরিচিত বাংলামটর মোড়। সন্ধ্যা থেকে নানারকম ইনডোর অন-পেপার টাইপ গেম শুরু হয়ে যেতো। লুডুটা খুব জনপ্রিয় ছিলো। আবার কার্ডও খেলতাম একটু রাত হয়ে গেলে। নীলামনি শুতে যাওয়ার আগে হয়তো আমাকে বলে যেতো, গুড নাইট। তাই দেখে অতনু বণিক খুব দুঃখী দুঃখী চেহারা করে বলতো, কোপাল সবই কোপাল। নীলামনি ততক্ষণে মোনালিসাকে ঠেলতে ঠেলতে ওদের ঘরের দিকে নিয়ে গেছে।
ফিরে এসে একটি বিষয় দেখে মনে কষ্ট পেলাম। কিভাবে যেন নীলামনির বাড়িতে আমার কথা জানাজানি হয়ে গেছে। জানার তেমন কিছু ছিলো না। কিন্তু ওর রক্ষণশীল পরহেজগার বাবা ও বড়বোন যতটুকু জানার ততটুকুও মানতে নারাজ। বড়বোনকে মনে হলো আরো এককাঠি সরেস। পুঁজিপতির স্ত্রী হিসেবে তার ছিলো একটা অনেক লম্বা পাওয়ার খতিয়ান। তিনি নাঁক সিঁটকে ফোনে ধমকালেন, ছিহ্ ঢাকা ভার্সিটির ছেলে? নজরটা আরো বড় কর বোন। মা তো কাঁদো কাঁদো গলায় বলেই বসলেন, তোমার বাবা কিন্তু শুনে খুব রাগ করেছে মা। আমরা তোমাকে পড়াশোনার জন্য ওখানে পাঠিয়েছি। অনেক আশা করে বসে আছি, আমাদের বাসার ছোট মেয়েটি পড়াশোনা করে অনেক বড় হবে।

এমন সেন্টিমেন্টাল একটা জাজমেন্টকে শ্রদ্ধা না করলেই নয়। দু'জনে মিলে ঠিক করলাম। কিন্তু একেকটা দিন কাটানো খুব কষ্টকর হয়ে উঠেছিলো। তখন আবার তোড়জোড় চলছিলো কাউন্সিলের। আমরা দু'জনই শক্ত দু'টো পদে দাঁড়িয়েছি। কিন্তু মনের ভেতর কালবৈশাখীর তোলপাড়।
কাউন্সিলের রাতে কেউ কারো সঙ্গে কথা বলি নি। ভোরে শহীদবেদীতে ফুল রেখে অশ্রুসজল চোখে একজন আরেকজনকে অভিনন্দন জানাই নি। অথচ একই শপথবাক্য আউড়েছিলাম। শপথের সময় আসলে মনের ভেতর একটা ভিন্নরকম অনুভূতি জেগে ওঠে। সবাই মুষ্টিবদ্ধ হাতে একটা কোনো প্রতিজ্ঞা পাঠ করা। এ সেই অবুঝ আবেগ, যা সবসময় ছাত্রদের তৃষ্ণার্ত করে রাখে। সে ওই ভাসিয়ে নেয়া আবেগেই আজীবন বাস করতে চায়।
কিন্তু নীলামনিটা আমার পাশে নেই, সেটা মানতে কষ্ট হচ্ছিলো। এরইমধ্যে কিছু জেলা সফর পড়ে গেল। সেসব করে আসা ছিলো বেশ কষ্টকর আমার জন্য। পটুয়াখালী গিয়ে একবার খুব মন খারাপ হলো। একটা খাঁড়ির ওপর দাঁড়িয়ে বঙ্গোপসাগর দেখছিলাম। জোরোলো শব্দে পাথুরে পাহাড়ের গাএ এসে ঢেউগুলো আছড়ে পড়ছিলো। আর আমি কাতরমনে নীলামনিকে মিস্ করছিলাম।
সফর করে আসতে আসতে বেশ ক'টা দিন পার হয়েছে। আমাদের দু'জনের মনই একটু জুড়িয়ে এসেছিলো। এতদিন ফুটন্ত গরম ছিলো বলে কেউ মনের আশপাশে ঘেঁষতেই পারছিলাম না। টুক-টাক ও জরুরী কথা হতো। সবাই মিলে মিটিং করতাম। চা-সিগারেট খাওয়াও চলতো। টিএসসি'তে সন্ধ্যার পর নিজেদের ঘাঁটিতে বসা হতো। আলাপ হতো সবার সঙ্গেই। যেটাকে বলা যায় প্রায় পুরোপুরি রাজনৈতিক মেলামেশা। তবে কিছুটা হয়তো রাজনীতি বহির্ভূত ব্যপার ছিলো। যেমন গভীর রাতে কেউ কাউকে ফোন দিতাম না। মনটা হঠাৎ কোনো কারণ ছাড়া কেঁপে উঠলেও কিচ্ছু বলতাম না। চুপ করে নিজের ভেতর সেটাকে লুকিয়ে রাখতাম। এভাবে একেবারে যে চলছিলো না, তা না। চলছিলো। তবে ক্ষরণ টের পাচ্ছিলাম।
এর মধ্যে ঘটে গেল এক ভয়াবহ ঘটনা। নীলামনিদের মাস্টার্স পরীক্ষা চলছিলো। আর আমাদের চলছিলো নিউ মাস্টার্সের ক্লাস। কারা যেন একদিন রাঙ্গামাটিতে ইউপিডিএফ-এর কয়েক নেতা গুলি করে মেরে ফেললো। কেউ বললো সরকার, কেউ বললো সেনাবাহিনী আর কেউ আঙ্গুল তুললো সন্তু লারমার দিকে। কিন্তু নিশ্চিত করে কেউ কিছুই বলতে পারলো না। যারা নিশ্চিত করে বলতে পারতো তারা কোনো কথা না বলে একদিন জগন্নাথ হলের চারটা ছেলে আর শামসুন্নাহার হলের একটা আদিবাসী মেয়েকে দিনেদুপুরে একই সময়ে প্ল্যান-পোগ্রাম করে গুলি করে মেরে চলে গেলো। প্রত্যেকটা ডেডবডি পড়ে ছিলো রাস্তার ওপর। কেউ ডাস থেকে শামসুন্নাহার হলের দিকে যাবার রাস্তায়। কেউ জগন্নাথ হলের পুকুর আর মন্দিরের ঠিক মাঝের রাস্তায়, কেউ বা অপরাজেয় বাংলার সামনে। ক্যম্পাসে এমন ছোপ ছোপ রক্তমাখা রাস্তা একাত্তরের পরে আর একবারও দেখা যায় নি। মাত্র পাঁচটা ছেলেমেয়ের লাশ বিশ্ববিদ্যালয়ের পঞ্চাশ হাজার পরিবারকে ভয়ে দিশেহারা করে তুললো।
যদিও সেগুলো ছিলো পলিটিক্যাল মার্ডার সবগুলোই। নোংরা আদিবাসী-বাঙালি রাজনীতি। যার শিকার এবার নিষ্পাপ শিশুরা। কে কাকে কি বলবে? কি সান্ত্বনা দেবে বুঝে উঠতে পারছিলো না। প্রধানমন্ত্রী একদিন শুধু শুধুই ক্যম্পাসে এসে ঘুরে গেলেন। কেউ তার আসায় শ্লোগান দিয়ে চারিদিক কাঁপিয়ে তুললো না। তিনিও বিমর্ষ মনে এদিক-সেদিক হাঁটাহাঁটি করে চলে গেলেন।
এরপরে পাহাড়ের ওদিক থেকে প্রতিদিনই গোলাগুলির শব্দ শুনতে পেতে শুরু করলাম। সরকার জড়িয়ে গেল, সেনাবাহিনী জড়িয়ে গেল। আমাদের পাহাড়ী বন্ধুগুলোও কেমন যেন হয়ে গেল। কোনোকিছুই যেনো ঠিক-ঠাক চলছে না।
ক্যম্পাস বন্ধ থাকলেও প্রতিদিনই কিছু না কিছু ঘটছিলো। আমরা মিছিল-বিক্ষোভ চালিয়ে যাচ্ছিলাম। নিজেরা একা একবার একটা মিছিল করি। এরপরে কয়েকটা সমমনা দল মিলে আবার মিছিল করি। অন্যান্য সংগঠনগুলোও এসবের মধ্যেই ছিলো। কিন্তু তাতে পাহাড়ের পরিবেশ ঠান্ডা হচ্ছিলো না। মাঝখান থেকে গরম হয়ে উঠছিলো সারাদেশও। বিভিন্ন জায়গায় গুপ্তহত্যা, বদলা নেয়ার ঘটনা ঘটছিলো। পত্রিকাগুলো প্রতিদিন গরম গরম ছাপা হতো। টিভির রিমোটটাও গরম হয়ে থাকতো সবসময়। একটু টিপলেই ভীষণ একটা খবর নিয়ে হাজির হয়ে যেতো চোখের সামনে।
আমি এই সবকিছুর মধ্যে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিলাম। ছিলো নীলামনিও। কিন্তু আমাদের হাঁকডাকে ক্যম্পাসে গণ্ডগোল-মারপিট বেড়ে যাওয়া ছাড়া আর কিছু হচ্ছিলো না। অবস্থা একসময় এমন পর্যায়ে দাঁড়ালো যে, ওকে বাড়ি থেকে বাবা আর বড়বোন ডেকে পাঠালেন। প্রবাসী পাত্র পাওয়া গেছে। কন্যা বিদায় করা হবে।
সেবার পাহাড়ের যুদ্ধ শেষ হওয়ার সঙ্গে শেষ হয়েছিলো আরো অনেক কিছু। ক্যম্পাসের ছুটি শেষ হয়েছিলো। নীলামনির মাস্টার্স পরীক্ষা শেষ হয়েছিলো। বলা যায় ক্যম্পাস লাইফটা প্রায় শেষের দিকে এসে উপস্থিত হয়েছিলো। এমন সময় নীলামনি একদিন আমার সঙ্গে কথা বলতে আসলেন।
তাকে খুব ক্লান্ত দেখাচ্ছিলো। সাত বছরের কর্মব্যস্ত ক্যম্পাস জীবন শেষ করে এখন ফিরে যাবেন বাবার বাড়ি। সেখানে থেকে খুব শ্রীঘ্রই হয়তো অন্য কোথাও। সবই জানতাম। ও আমাকে কোনোকিছুই না জানিয়ে রাখতো না। আমার সেদিন ওকে যেতে দিতে ইচ্ছে হচ্ছিলো না মোটেও।
বরং খুব ইচ্ছে হচ্ছিলো ওকে নিয়ে অনেকদূরে কোথাও চলে যেতে। যেখানে এই কোলাহলপূর্ণ জনপদ নেই। যে জনপদের অনেক সমস্যা। আর সব সমস্যা সমাধানে দায়িত্ব যেন আমাদেরই হাতে এসে পড়েছে। চলে যেতে ইচ্ছে হচ্ছিলো এমন কোথাও যেখানে পরিবারের চাপিয়ে দেয়া বোঝা কাঁধে বয়ে বেড়ানোর নিয়ম নেই। যেখানে মানুষ তার নিজের ইচ্ছায় স্বাধীন জীবন যাপন করতে পারে। যেখানে কেউ দাঁড়িপাল্লা হাতে সবকিছুকে মেপে মেপে নেওয়ার জন্য গ্যাঁট হয়ে বসে থাকে না। আমার খুবই ইচ্ছে হচ্ছিলো, সেখানে দু'জন গিয়ে একটু ছোটাছুটি করতে। আমরা একদিন রাত তিনটায় রাজু ভাস্কর্যের সামনের রাস্তায় ছোঁয়াছুয়ি খেলেছিলাম। সেটা ছিলো একটা কাউন্সিলের রাত। দুই সেশনের মাঝের মুক্ত সময়ে আমার দু'জন কংক্রীটের রাস্তায় ফুটিয়েছিলাম নাইটকুইনের ফুলকি ছড়ানো আলো।
আমি নীলামনিকে বললাম, তারচে' চলো সুন্দরবন চলে যাই।
-সেখানে গিয়ে?
গিয়ে একটা ব্যবস্থা করে নেবো।
-কি ব্যবস্থা?
এই এটা-সেটা একটা কিছু ব্যবস্থা।
-কি ব্যবস্থা একটু খুলে বললেই না ভাবতে পারি।
কোনো পরিকল্পনা নেই আপু। শুধুই চলে যাবো এই অপ্রিয় জীবন ছেড়ে। কোনো মুক্ত দুনিয়াতে। হয়তো বন থেকে মধু খুঁজে খুঁজে আনার মৌয়ালিকে পেশা করে নেবো। তাও তুমি আর আমি একসাথে একটা কুঁড়ে ঘরে একজন আরেকজনের খুব কাছাকাছি চুপচাপ বসে থাকবো। দিন আর রাত কেটে যাবে মুগ্ধতায়। চলো যাবে? কি হয় ওই লোকটার সঙ্গে বিদেশে চলে না গেলে? যে অসম বিন্যাসকে আজীবন ঘৃণা করেছো, সেই ব্যবস্থাকেই মেনে নিতে চাও? আর কেবলই আমি তোমার শ্রেণীশত্রু হয়েছি বলে আমাকে ফেলে চলে যাচ্ছো?
-তুমি কেন আমার শ্রেণীশত্রু হবে?
কারণ তুমি একজন স্বার্থক লুম্পেনের মতো শ্রেণী বদলাতে যাচ্ছো।
-না আমি চাই না।
বদলাও, আমি চাই তুমি বদলে যাও। তা না হলে কখনো আমার ভালবাসাটাকে তুমি বুঝতে পারবে না। আজীবন আমায় পেয়ে পেয়ে তোমার ভেতর সেই উপলব্ধির ঘাটতি তৈরী হয়েছে।
-আমি সেটা বুঝতে চাই না।
যাও তুমি মুক্ত। তুমি তোমার পথ খুঁজে নাও। জীবন তোমার জন্য মোহময় মোড়কে সুখ নিয়ে এসেছে। তুমি সেই সুখের ভেলায় উঠে বসো। আমার শুভকামনা সবসময় তোমার সঙ্গে থাকবে।
-আমি কখনোই তোমাকে ছেড়ে যেতে পারবো না ছেলে। তুমি এভাবে কথা বলা বন্ধ করো। প্লীজ।

সেদিন আমি দ্বিতীয়বার নীলামনিকে কাঁদতে দেখেছিলাম। আমাকে জড়িয়ে ধরে ঝরঝর করে কেঁদে ফেলেছিলো। আমিও খুব শক্ত করে তাকে জড়িয়ে ধরেছিলাম। এবং বারবার দু'টো পোড়াচোখ ঝাপসা হয়ে আসছিলো।
---

পোস্টটি ৪ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

মীর's picture


তারপর একদিন এগিয়ে এসেছিলো সমাপ্তি'র প্রথম প্যারা থেকে কেটে ফেলা লাইন।

মেসবাহ ভাই বললেন, আমার একটা অবয়ব দাঁড়াচ্ছে ধীরে ধীরে। আমি একটা অপেক্ষা করে আছি, সে অবয়বটি দেখার। নিজের সামনে দাঁড়ানো, সেটা সহজ কথা নয়। বলছিলাম রাপ গানের ঝাকুনির কথা।

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

মীর's picture

নিজের সম্পর্কে

স্বাগতম। আমার নাম মীর রাকীব-উন-নবী। জীবিকার তাগিদে পরবাসী। মাঝে মাঝে টুকটাক গল্প-কবিতা-আত্মজীবনী ইত্যাদি লিখি। সেসব প্রধানত এই ব্লগেই প্রকাশ করে থাকি। এই ব্লগে আমার সব লেখার কপিরাইট আমার নিজেরই। অনুগ্রহ করে সূ্ত্র উল্লেখ না করে লেখাগুলো কেউ ব্যবহার করবেন না। যেকোন যোগাযোগের জন্য ই-মেইল করুন: bd.mir13@gmail.com.
ধন্যবাদ। হ্যাপি রিডিং!