অন্তহীন অন্ধকারের আরক্তিম অস্তিত্ব

ছেঁড়া তালপাতা, জন লেননের সোচ্চার ভালবাসা আর বব ডিলানের অভিমান একসঙ্গে মিক্সচারের মধ্যে ঢেলে দিয়েছি। আজকে একটা ক্রাশ বানাবো। এক মগ ক্রাশ সহকারে বসে একটা সময়, সেটার হয়তো ঘন্টা-পৌনেঘন্টা'র সীমা থাকবে; পার করবো। বাস্তব জীবনে আমার তেমন কোনো বন্ধু-বান্ধব নেই, যাদের সঙ্গে নিয়মিত দেখা-সাক্ষাৎ হয়। খোঁজখবর রাখা হয়। এ ধরনের ব্যবস্থার অনেক ধরনের কুফল আছে জানি। তাও এ ধরনের ব্যবস্থা মেনে নিতে আমার খুব বেশি খারাপ লাগে না। ক্রাশটায় দেয়া হবে প্রচুর পরিমাণে চিনি। সঙ্গে মিন্ট থাকতে পারে। খুবই অল্প পরিমাণে। আর দু’এক টুকরো ধইন্যাপাতা। কতভাবেই না মানুষের জীবনটা কাটে? কখনও হয়তো মানুষ মানুষকে বলে ‘তোমাকে ছাড়া বাঁচতে পারবো না একদিনও’; আবার পরে দেখা যায় দু’জনের দু’জনকে ছাড়া খুব চলে যাচ্ছে। ভালো কে কম বেসেছিলো? কেউ জানে না নিরপেক্ষ উত্তর।
কিছু কিছু কড আছে, যেগুলো বাজাতে ইচ্ছে করে। কিন্তু ইচ্ছেই সার। আমি তো গিটারই বাজাতে পারি না। যদি সত্যিই নক নক নকিং অন হেভেনস্ ডোর বাজাতে পারতাম, তাহলে মাঝে মাঝে আমি সেটা নিশ্চই বাজাতাম। এই যে কিছু কিছু ইচ্ছে; যেগুলো জীবনভর অনিশ্চয়তার মধ্যে দুলতে থাকে, সেগুলোকে আমার সবচে’ আদুরে লাগে। এমন না যে ইচ্ছেটা পূরণ না হওয়া জীবনে খুব বড় কোনো মাইনে রাখে, তবু হঠাৎ হঠাৎ প্রিয় কোনো অপূর্ণ ইচ্ছের নস্টালজিয়ায় হারিয়ে যাওয়ার মতো একটা অনুভূতি তৈরি হয়। মনের ভেতর।
আমাদের সিএন্ডবি কলোনীর চারতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে নদীতীর থেকে দূরে নোঙর ফেলে রাখা জাহাজগুলোর লম্বা লম্বা মাস্তুল দেখা যেতো। অবশ্য মাস্তুল কমই দেখতে পেতাম, বড় বড় চিমনি আর ক্রেনের অবয়বগুলো চোখে পড়তো শুধু। একবার ঝড়ের মধ্যে, বারান্দা থেকে বেশ দূরে- একটা চিলেকোঠার চালের টিন তুমুল বাতাসে খুলেই গেল। খুলে সেটা বিপদজনকভাবে উড়তে উড়তে সামনে দিয়ে চলে গেল। আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিলাম। কি যে ভীষন শব্দ বাতাসের! শো শো শো, যেন ক্রমাগত ধারালো একটা লোহার পাতে শান পড়ছে। বৃষ্টি এমনভাবে চোখে, ভ্রু-তে এসে বাড়ি খাচ্ছিলো যে মনে হচ্ছিলো, সামনে দাঁড়িয়ে কেউ ওয়াটার গান দিয়ে গুলি করছে। অন্ধকারের মধ্যে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বাতাসের গর্জন শুনছিলাম আর ক্রমাগত পানির ঝাপটা খাচ্ছিলাম।
তীব্রগতিতে নেমে আসা বৃষ্টির ফোঁটাগুলোর একেকটি দলকে, বাতাস মাঝে মাঝে উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছিলো। যেখানে পড়ার তারচে অনেক দূরে নিয়ে ফেলছিলো। সেই চারতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে, সেই বৃষ্টি, দূরের সেই মাতাল মাস্তুল, যার সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে খুবই আপত্তি, কিন্তু বিপাকে পড়ে থাকতে হচ্ছে; এবং এমন আরো বিভিন্ন উপাদান আশপাশে নিয়ে একটা সময় কাটানো- এমন কি আসলে সম্ভব আর কখনো? একটা ক্রাশ আসলেই বানানো দরকার যেটা আমাকে সীমিতভাবে হলেও সেই সময়টা ফিরিয়ে দেবে।
আবার অনেক সময় এমনও হয় যে নিজেকে কোনো কারণ ছাড়াই অপাংক্তেয় মনে হতে থাকে। তবে বর্তমানকালে এটি মনে হওয়ার কারণ আছে। বহুদিন নতুন কোনো বই পড়ি নি। বই না পড়লে মানুষ আস্তে আস্তে ভাষাহীন হয়ে পড়ে।
আজকাল চাইলেও খুব বেশিক্ষণ একা থাকার সুযোগ পাই না। কেউ না কেউ জুটে যায়। যারা জোটে তাদের সঙ্গে আমি অধিকাংশ সময়ই কোনো কথা বলি না। চুপচাপ থাকি। বুঝি না তারা আমাকে সহ্য করে কিভাবে। একই প্রশ্ন এক বন্ধু একবার নিজের ব্যপারে করেছিলো। প্রশ্নটা তার কাছ থেকেই আসলে পাওয়া। আমি জানি না, সে প্রশ্নের উত্তর পেয়েছিলো কি না, কিন্তু আমি এখনো পাই নি।
এক সেট ভণ্ড লোককে চারপাশে ঘোরাঘুরি করতে দেখি। ওরা সর্বোচ্চ পর্যায়ের ভণ্ড। এমনকি ভণ্ডামির কারণে যে নিজের ক্ষতিই হচ্ছে সবচে’ বেশি, সেটাও বোঝে না। স্পাইডার ম্যান- ৩ এর বালুমানব কিন্তু ততটা ভণ্ড ছিলো না। ওর ভিলেন হওয়ার একটা কারণ ছিলো। মানুষ কুটিল একটু কম হলে সম্ভবত গোলমতো এ পৃথিবীটার একটু সুবিধা হয়। কিংবা নাও হতে পারে, আমি আসলে ঠিক জানি না। হয়তো এখনকার পৃথিবীতে কুটিলতা ছাড়া মানুষের পক্ষে টিকে থাকা অসম্ভব।
পৃথিবীর সবদেশে যেহেতু ধনী-গরীব আছে, সেহেতু আমারও নিশ্চই কোনো না কোনো একটা গতি হবে। তাই নিজেকে নিয়ে ভাবিত নই। সেদিন ক্যন্সার নিয়ে ভাবছিলাম। কেউ নিজের ক্যন্সার নিজেই ধরতে পারলে তার উচিত হবে বিষয়টা নিয়ে বেশি হইচই না করে, সম্পদ-সম্পত্তির একটা হালকা-পাতলা বন্দোবস্ত করে চুপচাপ রাস্তায় বেরিয়ে পড়া। পরিবারের লোকজনকে কষ্ট না দেয়াই সর্বোত্তম পূণ্য।
মেয়েগুলোকে কিন্তু আকাশী রঙএর কাপড়েও দারুণ মানায়! সেদিন তো একটা মেয়ে আকাশী ওড়না, শাদা জামা, আকাশী সালোয়ার আর শাদা স্যন্ডেল পড়ে দেখা করতে আসলো। আর ওকে শুভ্রও দেখাচ্ছিলো খুব। আমরা একসঙ্গে বসে চা খেলাম। ঘুরাঘুরি করলাম। গল্প করলাম। এত ঘুরাঘুরি আর এত গল্প যে, কান্ত হয়ে একবার খানিকক্ষণ ঘাসের ওপর বসলামও। আর সঙ্গে সঙ্গে রায়হান ভাইএর ওই গানটার কথা মনে পড়লো। সাথী রে মালা কার লাগিয়া গাঁথি।
অবশ্য ম্যচিং জামা পড়া মেয়েটির সঙ্গে আমার সম্পর্ক অতোখানি বন্দী হয়ে ওঠে নি তখনো। ক্লোজ শব্দের বাংলা হিসেবে বন্দী ব্যবহার করলাম। প্রায়োগিকভাবে চিন্তা করলেও এর খানিকটা যুক্তিযুক্ততা আছে। সম্পর্ক একটু গভীর হলেই এরমধ্যে বন্দী বন্দী একটা ভাব চলে আসে। যাক্ সবুজ ঘাসের জমিনে বেশিক্ষণ বসা গেল না। এক সময় দেখতে পেলাম, আমার চোখে মেয়েটির আদল ঘোলা হয়ে আসছে। ও একসময় অন্য একটি মেয়েতে রূপ নিলো। যে আর সবকিছু সহ্য করতে পারতো; কিন্তু কোনো বড়ভাই যদি আমাকে কথাচ্ছলে বা দুষ্টামী করে টাউট বলে ডাকতো, তাহলেই তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠতো। তখন তাকে ঠান্ডা করতে আমার দীর্ঘ সময় লেগে যেতো। সেই মেয়েটিকে ভাবতে ভাবতেই দেখলাম আকাশী মেয়েটি ঝিকিমিকি হয়ে মিলিয়ে গেল বাতাসের সঙ্গে। আমি খুব ভীষণ বিস্মিত হলাম। তার অনেকক্ষণ আগে থেকেই একটা গান আমার মাথার ভেতর ঘুরঘুর করছিলো,
প্রিয় আকাশী, গতকাল ঠিক দুপুরে তোমার চিঠি পেয়েছি
ঠিকানা লেখো নি, ঠিকানা পেলে কোথায় তা লেখো নি..
---
(লেখাটা মাসুম ভাইকে উৎসর্গিত
)





সুন্দর ও সাবলীল ভাষার গদ্য। জীবনের অভিজ্ঞতাগুলো একসময় জীবনের উপরই প্রভাব বিস্তার করে। সে প্রভাব কখনও মন্দ, আবার কখনও হয়ে উঠে প্রেরণাদায়ক।
চমৎকার লেখা পড়লাম... মীর পাত্থর
চাপায় বাঙালীরে হারানো কষ্টের আছে... একটা গান শুনছিলাম জহির আহমেদের...
যদি সব সাগরের জ্বল কালি হত / যদি পৃথিবীর সব গাছ লিখনী হত / আর সারাটি জীবন যদি লিখে যেতাম / তবু তোমার আমার প্রেমের কথা / লেখা শেষ হতোনা।
একবার ভাইবা দেখছেন, বিষয়টা কি ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয়ের কথা কইছে এইখানে
অসাধারণ। এতো চমৎকার করে লেখেন যে, পুরোটা দৃশ্যকল্পের মতো চোখের সামনে ভেসে ওঠে। আর একদম শেষ লাইনটাতো আরও দুর্দান্ত।
কই থেইকা কই চইলা যায়! এই পোলাডা একটা জিনিস!
আমি সুনীলের মানুষ মানুষ বইটা পড়ছি এখন। বেশ এঞ্জয় করছি কারণ প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার ওপর লেখা, বানানো গপ্পো নয়। বেশ অনেকটা জুড়ে বাংলাদেশের লেখক কবিদের কথা আছে ওখানে।
ওখানে নারায়নগঞ্জ বা সরাইল বলে একটা জায়গার একজন সাধু বা ক্ষমতাধারী একজনের বর্ননা আছেন যিনি শুধু এ্যালকোহল নজরানা নেন। সব নজরানা বড় একটা পিপার ঢালা হয়। সব একসাথে মিক্স করে সেখানে থেকে সবাই গ্লাস গ্লাস খান
কঠিন লোক তো দেখি...
....পাগলা ঘোড়ারে, কৈ থেইকা কৈ লৈয়া যায়....
সম্পর্ক গভীর হলে বন্দি ভাব আসে এইটা একটা ভুল থিউরী

লেখা যথারীতি স্বাদু
ভালো লাগছে।
আকাশীর ঠিকানা বের করার জন্য একটা কমিটি গঠন করা হোক।
মন্তব্য করুন