উপন্যাস : অচল পয়সার জবানবন্দি (২)
২.
ক্যম্পাসে প্রায়ই একটা গান গাইতাম আমি আর প্রিয়দর্শিনী। অলি আর বকুল’কে যখনই আড়াল খোঁজার চেষ্টায় হাঁটাহাঁটি করতে দেখতাম তখনই। মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে ওদের দুজনের সামনে এ গানটা গাইলে অলি প্রায়শই নিস্ফল আক্রোশে ফেটে পড়তে চাইতো। কিন্তু আমাদের ডানপিটেপনার সঙ্গে সুপরিচিত থাকার সুবাদে কখনোই সে সাহস দেখাতে পারতো না। গানটা ছিলো-
অলিরো কথা শুনে বকুল হাসে,
কই তাহার মতো তুমি আমার কথা শুনে হাসো না তো।
‘হাসো না তো’র জায়গায় আমরা গাইতাম ‘কাশো না তো’। তারপরে দু’জনে উচ্চস্বরে খক খক করে কাশতাম। দু’একবার।
বন্ধুদের ক্ষেপাতে আমার খুব ভালো লাগে। যেটা প্রিয়দর্শিনীরও লাগতো। এই মেয়েটাকে ভালো লাগার এটা একটা প্রধান কারণ ছিলো। আরেকটা প্রধান কারণ ছিলো, একটা টেক্সট্। যেটাতে সে কোনো কারণ ছাড়াই লিখেছিলো, ও নাকি আমার মাধবীলতা হতে চায়। পাঠিয়েছিলো যখন আমি সমরেশ, জলপাইগুড়ি, অনিমেষ, চা-বাগান, কালপুরুষ, কালবেলা- ইত্যাদিতে ডুবে ছিলাম আচ্ছন্নের মতো। আর বন্ধুদের সঙ্গে দেয়া আড্ডাগুলোয়, মধু’তে বসে গ্লাসভর্তি চা নিয়ে টেবিল পেটানোর সময়ে কিংবা রোদেলা কট্টর দুপুরে গোলঘরের বকবকানিতে ওই বইগুলো আর সেগুলোতে দেখানো স্বপ্নগুলো নিয়েই কথা বলতাম ঘুরে-ফিরে।
মেয়েটি জানতো আমার মাধবীলতা হলে সে কিছুই পাবে না। এমনকি আমি কোনোদিন অনিমেষ হয়েও গিয়ে দাঁড়াতে পারবো না ওর সামনে। আমি তাকে পরিচয়ের পর থেকে কখনোই কোনোকিছু জানাতে বাকি রাখি নি নিজের ব্যপারে। কিন্তু তারপরও সে আমাকে পাঠিয়েছিলো ঐ একটি টেক্সট্।
ঐ টেক্সটির মতো নিঃস্বার্থ আর কিছু আমার জীবনে আগে-পরে আর কখনোই আসে নি। এমন না যে, সমরেশের ঐ সিরিজটা পড়ার পর আমি মনে মনে মাধবীলতা’কে খুঁজে বেরিয়েছি সর্বত্র। কিন্তু আক্রমণটা যে এদিক থেকেই আসবে বুঝতে পারি নি। কেউ যখন সত্যি সত্যি মাধবীলতার মতো করে জীবনে আসতে চায়, তখন তাকে কিভাবে স্বাগতম জানাতে হয়- তা আমার জানা ছিলো না। তবে নিজেকে নিয়ে বিড়ম্বিত হতে হয় নি মেয়েটির স্বতঃস্ফূর্ত আচরণ, কথার ভঙ্গি আর সার্বক্ষণিক হাসির কল্যাণে। তখন আমি মাঝে মাঝে বসে চিন্তা করতাম, কেন আমার পাশে সবসময় এমন একটা আনন্দযন্ত্র চালু হয়ে বসে থাকছে আজকাল? আনন্দময়ী হাতের মুঠোয় ধরা দিয়েছিলেন সে দিনগুলোতে।
যাক্ আগের কথায় ফিরে আসি। বুড়োর কুটির থেকে বের হয়ে রমনার ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটের গেট দিয়ে সোহরাওয়ার্দী পার্কে ঢুকে কিছুদূর যেতেই, ভয়ানক একটা জায়গায় বহুদিন পর দেখতে পেলাম অলি আর বকুলকে। এই জায়গাটায় এক বৃষ্টির দিনে আমি আর প্রিয়দর্শিনী পার্কের ভেতর হাঁটতে হাঁটতে একটু দাঁড়িয়েছিলাম। তখন এ পার্কটা এখনকার মতো যুগলবন্দীদের অভয়ারণ্য ছিলো না। ছিনতাইকারী, পুলিশ আর টাউট ধরনের কিছু মানুষ এদিক-ওদিক ঘুরে-ফিরে বেড়াতো। কিন্তু সেই ঝুম বৃষ্টির দিনে পুরো এলাকায় ছিলো না আর কেউ। শুধু আমরা দু’জন ছিলাম, ছিলো ঝমঝমে বৃষ্টি, একটা স্বচ্ছ শাদা রং-এর ছাতা আর নিশ্চুপ সুবিশাল এক চরাচর। আমরা অনেকক্ষণ পর্যন্ত চুপ করে দাঁড়িয়ে থেকে ব্যপারটা উপভোগ করেছিলাম। দু’জন মানুষ যখন একে অপরকে ভালোবাসে, তখন কিছুই না করে, কেবল নিরিবিলিতে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকেই যে কি অসামান্য আনন্দের মধ্য দিয়ে যাওয়া যায়; সেটা আমরা সে সময় জেনেছিলাম।
অলি’দের বসার ব্যবস্থাটা অবশ্য বেশ দৃষ্টিকটু রকমের ছিলো। পার্কজুড়ে টুনটুনিদের মিলনমেলা। এরই মধ্যে দুই জোড়া টুনটুনিকে ঠেলে-ঠুলে যখন একটা বসার বেঞ্চিতে প্রায় বসে পড়তে পেরেছে ওরা দু’জনেই; আমি তখনই পেছন থেকে ওদের চিনে ফেললাম এবং প্রাণপনে হেঁড়ে গলায় ‘অলিরো কথা শুনে...’ গেয়ে ওঠার লোভকে সংবরণ করে হাঁক দিলাম- ‘আব্বে অলি, অহনো তর চিপা খুঁজা বন্ধ হয় নাই?’
আমার গলার স্বর শুনেই বোধহয় ওরা চিনে ফেললো। ঘুরে অবিশ্বাস ভরা দৃষ্টিতে আমাকে দেখলো এবং দীর্ঘদিন পর প্রিয়জনের সঙ্গে দেখা হলে যেমন উচ্ছ্বসিত হতে দেখা যায় মানুষকে, তেমন হয়ে দু’জন একসঙ্গে লম্বা দু’তিনটে লাফ দিয়ে আমার ঘাড়ে এসে পড়লো। ‘আর্রে দোস্ত, এত্তাদিন পর কৈত্থিকা বাইরাইলি? আজব হয়া গেলাম গা!’ বললো অলি।
বকুলকে নিয়ে বিপদ আরো একটু বাড়লো। সে চট করে চোখ আর ভ্রু নাচিয়ে মেয়েটির কথা জিজ্ঞেস করে বসলো, ‘উনি কেমন আছে, হ্যাঁ?’ কি যে বিপত্তি এই মেয়েগুলোকে নিয়ে!
অলি অবশ্য বিষয়টা জানে। তাই আলোচনাকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে সময় লাগলো না মোটেও। কাছে-পিঠে বিরাট এক দোকান খুলে বসে আলসেমী করছিলো এক চটপটিওয়ালা। সে মাঝখান থেকে দুই-আড়াইশ’ টাকা লাভ করে ফেললো। তিনজনে বসে বসে গল্প-গুজব আর মারপিট করতে করতে এ পরিমাণ টাকার চটপটি, ফুচকা, পানীয় খেয়ে ফেলা সম্ভব কি না; তাও ভরদুপুরের কাছাকাছি একটা সময়ে, ভরপেটের কাছাকাছি একটা অবস্থায়- এ নিয়ে গবেষণা চালানোর দরকার পড়তে পারতো হয়তো। কিন্তু আমরা তিনজনে যেহেতু কাজটা করে দেখিয়েছি, সুতরাং গবেষণা চালানোর এই ভীতিকর সাবজেক্ট’টির হাত থেকে নিশ্চই মুক্তি পেয়েছেন কেউ না কেউ। কোনো না কোনো পূর্ণ কিংবা সহকারী গবেষক।
আমি ষড়যন্ত্রীদের ভঙ্গিতে ওদের কাছ থেকে জানতে চাইলাম, ‘আসলেই এইসব চিপাচুপা খুঁজে গায়ে গা লাগায়ে বসে থাকার মধ্যে কি বাড়তি কোনো ফিলিং আছে? যেটা তোরা পাস, কিন্তু সবাই পায় না? নাকি অন্য কিছু?’
ওরা দুইজনে মিলে রগরগে উত্তর দিলো। ‘ক্যান, মাঝে-মইধ্যে অলস বইসা না থাইকা একটু হাত-টাত চালাবি। তয় সিচুয়েশন বুইঝা। আজকাল যে কত রকমের যন্ত্রণা একটু ডেটিং করতে আসলে, সেইটা তরে পুরাপুরি বুঝাইতে আরো তিন প্লেট চটপটি খাওয়ানি লাগবো।’
বন্ধু-বান্ধব আসলে এমনই। মানুষ বাসায়, অফিসে, প্রেমিকের সঙ্গে, রিকশাওয়ালা বা বাসের হেল্পারদের সঙ্গে, দোকানের মুদীর সঙ্গে যে কাজগুলো এবং যে কথাগুলো করতে ও বলতে পারে না; সেই সবগুলো কাজ-কথা করা-বলা সম্ভব বন্ধুদের সঙ্গে। আলাপে আলাপে জানলাম অলি’র একটা ভালো চাকুরী দরকার। এখন যেটা সে করছে সেটাতে বকুলের বাবা-মা’র মন ভরছে না। বকুল একফাঁকে ফিসফিস করে আমাকে জানালো, ‘হারামী ভীষণ অলস আর নচ্ছাড় রে। সারাদিন বসে বসে ঘষটা-ঘষটি পাড়তে রাজি আছে, কিন্তু যদি একটু বলি চাকুরী খুঁজতে তো তেলে-বেগুনে জ্বলে যায়। লেকচার শুরু করে লম্বা। তুই একটা সিরিয়াস ট্রাই দে।’
আমার মনে পড়ে গেলো, বকুলের সঙ্গে দারুণ একটা বন্ধুত্ব ছিলো একসময়। আমি জানি সে মানুষ হিসেবে ভীষণ ভালো এবং খুব সরল। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের প্রথম দিকে বেশ কিছু জেলায় সাংগঠনিক সফর করেছিলাম আমরা। তখন আমরা বাম রাজনীতি করতাম। একসঙ্গে গিয়েছি, দিনের পর দিন একসঙ্গে থেকেছি, কর্মশালা করেছি, সভায় বক্তব্য রেখেছি; অসংখ্য সুখস্মৃতি আছে আমাদের।
সফরগুলোতে স্থানীয় কমরেডদের বাসাতেই বেশিরভাগ সময় থাকতাম। দুইবার হোটেলে থাকতে হয়েছিলো। খরচ বাঁচাতে একই কক্ষেও থেকেছি। যদিও পরে দলের দপ্তর সম্পাদকের কাছে দুই করে বিল সম্বলিত মেমোই জমা দিয়েছি। তবে এতে করে আমাদের কোনো লাভ হয় নি। কেননা হাতে টাকা-পয়সা যা থাকতো, তার সবই খরচ করে আসার পরও সংগঠন থেকে খুব বেশি ফেরত দেয়া হতো না। দেবে কিভাবে? আমাদের ছোট সংগঠনের ছিলো নুন আনতে পান্তা ফুরানোর দশা। তাতে অবশ্য আমাদের কখনোই খারাপ লাগে নি। বরং সংগঠনের জন্য একটু ত্যাগ স্বীকার করে ফেললাম নাকি, এ চিন্তায় সময় নষ্ট করেছিলাম কিছুটা। এবং সবশেষে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম; এই সামান্য ক’টা টাকা খরচ করতে পেরে যদি মনে করি সংগঠনের জন্য ত্যাগ স্বীকার করে ফেললাম, তাহলে আসলে নিবুর্দ্ধিতা ছাড়া আর কিছু প্রমাণিত হয় না।
প্রথম যেদিন আমরা দু’জনে একটা হোটেলে এক কক্ষে উঠতে গিয়েছি; সেদিন হোটেল মালিকের চোখে যে কিছুটা সন্দেহ মিশে ছিলো, তা আমরা তার হাবভাব দেখেই বুঝে ফেলেছিলাম। তাই তার দিকে সেকেন্ড দশেক চোখে ভীষণ ক্রূর একটা দৃষ্টি ফুটিয়ে তাকিয়ে ছিলাম দু’জনে। এতেই কাজ হয়ে গিয়েছিলো। চমকে সেই যে ব্যাটা একবার চোখ নামিয়ে নিলো, হোটেল ছেড়ে আসার সময় যখন বিল দিচ্ছিলাম, তখনও পর্যন্ত সে দু’টো তুলতে তার আর মনে ছিলো না।
রুমে ঢুকে আমরা দু’জন প্রথমে বেশ কিছুক্ষণ সংকোচ বোধ করলাম। কোনো কারণ ছাড়াই। অথচ আমরা জানতাম, আমাদের দু’জনের টীম ওয়ার্ক ক্যম্পাসে প্রায় প্রবাদের পর্যায়ে চলে গেছে। বকুল প্রতিদিন ভরসকালে তার বাসা থেকে আমার বাসায় এসে আমাকে ঘুম থেকে তুলে নিয়ে ক্যম্পাসে যেতো। এরপরে ক্লাস, সংগঠন, আড্ডাবাজি, অপকর্ম, গোপন কার্যকলাপ, চা-বিড়ি ধ্বংস- সবকিছু সেরে রাত ১১টায় আমরা দু’জন বাসায় ফেরার রিকশা ধরতাম। ক্যম্পাস থেকে রাতে ফিরতাম প্রায় ফাঁকা হয়ে আসা রাজধানীর রাস্তায় হেড়ে গলায় গান গাইতে গাইতে। অথচ সেই আমরাই কিনা রাতে লিটারালি ঘুমাতে এসে সংকুচিত বোধ করছি!
আমাদের সেসব দিনগুলোতে কিন্তু ঢাকায় এখনকার মতো নির্মাণ কাজের মচ্ছব বসতো না প্রতিদিন। আজকাল তো শহরের রাস্তায় পা-ই দেয়া যায় না। তখন কিন্তু আমাদের বেশ আনন্দেই দিন কেটে যেতো। যদিও সেসব দিনের জন্য এখন কোনো আক্ষেপ নেই আমার মনে। কখনো মনে হয় না, কোথায় হারিয়ে গেল সোনালী সে দিনগুলো হায়। বন্ধুত্বের সম্পর্কটা আসলে এমনই। সেই সম্পর্ক থাকুক আর না থাকুক; আজীবনই এর মিষ্টি স্বাদ পাওয়া যায়। হয়তো কিছু কিছু সম্পর্ক খুব অল্প সময় সেই স্বাদ যুগিয়ে, তারপর থেকে তেতো হতে থাকে। তেতো হওয়া শেষ করে আবার একসময় সেটা মিষ্টি হয়ে যায়। আমার একটা ধারণা হচ্ছে, সম্পর্কগুলো ভেঙ্গে যাবার পর মানুষ কোনো না কোনো এক সময় কফি হাউস গানের লাইনগুলো সম্পর্কিত জনদের কথা ভেবে গুনগুন করে গায়।
কিন্তু সেদিন হোটেলে ঢুকে কেন সংকোচ লাগছিলো সেটা বুঝতে পারছিলাম না। যে কারণে কিছুক্ষণ সংকুচিত থাকার চেষ্টা করে মেয়েটিকে বললাম, ‘চল্ বীচ-এ যাই। গোসল করে আসি। ভাল্লাগবে।’ সেবার ছিলো আমাদের কক্সবাজার জেলা সফর। সাংগঠনিক কার্যক্রম সেরে রাত ১১টায় হোটেলে ঢুকেছি। তারপরও আবার বের হলাম এবং চন্দ্রবিহীন নীল অন্ধকার রাতে সমুদ্রের ঢেউয়ে সাঁতার কাটতে কাটতে আমাদের সংকোচ ধুয়ে-মুছে কোথায় যে চলে গেল, তার আর কোনো খোঁজ পেলাম না।
এরপরে আমরা হোটেলের কক্ষে ফিরলাম। একে একে শাওয়ার নিলাম। ক্ষুধা বাইরেই নিবৃত্ত করে এসেছি। তাই এবার সামনাসামনি গল্পের ঝাপি খুলে নিয়ে বসলাম। আরো ছিলো সান্দা নামের রিজলার প্যাকেট। প্যাকেটটিতে লেখা ছিলো সিগারেট পেপার। আমরা অবশ্য রিজলা নামেই চিনতাম। সেটা দিয়ে বব মার্লে স্টিক বানালাম সুন্দর করে। ন্যাট জিও’তে সিংহের প্রজননক্রিয়া বিষয়ক একটি ডকুমেন্টারি দেখাচ্ছিলো। একটা সিংহ কিভাবে কেশরবিহীন একটি সিংহীকে প্রলুব্ধ করে, সে বিষয়টি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখানো হলো। দলিলটি আমাদেরকে খুব বেশি আগ্রহী করে তুলতে পারলো না নিজের প্রতি। তাই একদিকে টিভি চলতে থাকলো; আরেকদিকে আমরা সিগারেট, বব মার্লে, চাএর গরম লিকার ইত্যাদি সহকারে দু’জন দু’টি বিরামহীন মুখের গাড়িতে সওয়ার হয়ে রাত কাটিয়ে দিলাম। ভোরের আযান শুনতে শুনতে দু’জনে যখন ঘুমানোর জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম, তখন একবার কে উপরে-কে নিচে শোবে তা নিয়ে কথা উঠলো। এই আলোচনাটা সিদ্ধান্তমূলক সমাপ্তিতে পৌঁছুনোর আগেই দু’জনে খাটের ওপর বিছিয়ে রাখা আরামদায়ক কম্বলটির ভেতরে ঢুকে ঘুমিয়ে পড়লাম। কারণ অসাধারণ একটা ক্লান্তি আমাদেরকে আস্তে আস্তে গ্রাস করে নিচ্ছিলো।
আমার ছোটবেলা থেকে কোলবালিশ নিয়ে ঘুমানোর অভ্যাস। হোটেলের বিছানাতেও সেটা হাতের কাছেই ছিলো। কিন্তু ঘুমের ঘোরে কোনো না কোনোভাবে সেটা আমার হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার পর একসময় বকুলকেই কোলবালিশ বানিয়ে নিয়েছিলাম। সেও কোলবালিশের মতোই গুটিশুটি হয়ে মিশে গিয়েছিলো আমার সঙ্গে। সকালে ঘুম থেকে উঠে দু’জনে দু’জনকে সেভাবে দেখে একটুও অবাক হই নি।
সেই বকুলকে দেখেই আজ চমকটা বেশি লেগেছে আমার। অলির সঙ্গে মাসে-ছ’মাসেই দেখা হয়। কিন্তু ছেলেটা এত কেঁচোটাইপ যে উল্লেখ্য নয়। এখন যদিও দীর্ঘপ্রেমের বৈতরণী পার হয়ে কিছুটা স্বাভাবিকতা এসেছে তার মধ্যে। কমেছে কেঁচো ধরনের কার্যকলাপ চালানোর প্রবণতাও। কিন্তু প্রথম দিকে বকুলকে পাওয়ার পর; সে সবার আগে যে কাজটি করেছিলো, তা হচ্ছে মেয়েটির চারপাশে একটা বেড়া তুলে দেয়া। যে কারণে দিনে দিনে মেয়েটি সংগঠন, বন্ধুমহল সর্বত্র অদৃশ্য হয়ে উঠেছিলো। একসময় ওকে সংগঠন করা ছেড়েই দিতে হয়েছিলো।
ভালবাসা, তবু একবিন্দুও কম প্রবাহিত হয় নি ভালো মেয়েটির মনে। পার্কে সেজন্যই মেয়েটির চোখে-মুখে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিলো অলির-ভালো-কিছু-না-হওয়া’জনিত সমস্যায় আক্রান্ত হয়ে থাকার সবগুলো লক্ষণ। উঠে আসার সময় আমি ওর চোখে চোখ রেখে প্রতিশ্রুতি দেয়ার মতো করেই বললাম; ঠিক আছে, দেখছি অলির জন্য কি করা যায়।
যদিও জানি না, শর্ট টার্ম মেমোরী লুজিং সমস্যায় আক্রান্ত আমি এই কথাটা কতক্ষণ মনে রাখতে পারবো।
(চলবে)
---





পুরানা বন্ধু বান্ধবদের মনে পড়ে গেলো। আসলেই বন্ধুত্বের মিষ্টি স্বাদ তবে সেইটা মনে মনে থেকে যায় বাস্তব জীবনে মনের মিল একটা সময় এসে কমে যায় হয়তো এক এক জনের স্বপ্ন আলাদা আলাদা হয়ে যায় বলে ।

লেখা ভালো লেগেছে .....পরে কি কি হবে জানতে ইচ্ছা হচ্ছে তাড়াতাড়ি
ভালো বলেছেন।
সমরেশ, জলপাইগুড়ি, অনিমেষ, চা-বাগান, কালপুরুষ, কালবেলা--- আসলেই মনে হয় নেশার মতো! সবাইকে একবার করে পেয়ে বসে!
=========================
কথাটা ঠিক!
আবার অনেক ক্ষেত্রে অন্যরকমও মনে হয়, পরিচিত বা বন্ধুর চেয়ে একজন অপরিচিতের কাছে অকপট স্বীকারোক্তি বেশি সহজ!
===================
ভালো লাগা রইলো!
এইটা অনেক সময় আমার ক্ষেত্রেও হয়। ডিটো
ভালু লাগা রেখে গ্লাম।
ভালু বাসা নিয়ে যান।
আপনার লেখা একটানে পইড়া ফেলা যায়।
তবে যেহেতু উপন্যাস লেখার উদ্যোগ নিছেন তাই কিছু ভয়ে ভয়ে সমালোচনা করতে চাই। পাঠক হিসাবে দুইটা ভিন্ন অধ্যায় পড়তে সমস্যা হয় নাই একেবারেই কিন্তু দুইটা অধ্যায়ের ভাষাভঙ্গীরে একটু জানি আলাদা রকম লাগছে আমার কাছে। এতো অল্প জায়গার মধ্যে দুইদিন গ্যাপ দিয়া পড়তে চোখে ক্যাটক্যাটা লাগে নাই প্রথমে। পরে যখন দুই অধ্যায় টানা পড়তে গেলাম তখন কানে লাগলো কিছুটা।
চরিত্রগুলি বেশ ড্রামাটিক। ক্লীশে হইলেও পড়তে ঝামেলা লাগে না এন্ট্রি'র ধরনে। কিন্তু বর্ণনা ভঙ্গীটা এমন যে চরিত্রগুলির একটা নির্দিষ্ট চরিত্র তৈরী হওয়ার আগেই নতুন তথ্যের ভারে গতিপথ পাল্টাইয়া ফেলে। প্রিয়দর্শিনীরে চিনতে পারার আগেই অলি আর বকুলের পরিচয় পাই। বকুলের বর্তমান বুইঝা ওঠার আগেই অতীতে চইলা যাওয়া। সেইখানে থিতু হওয়ার আগেই বের হইয়া আসা। এই প্রকাশটারে আমার কাছে লেখকের তাড়াহুড়া মনে হইলো। মানে উপন্যাস লিখতে শুরু করার আগেই হাপাইয়া যাওয়ার মতোন অবস্থা। আপনের গদ্য এমনিতেই ইন্টারেস্টিং...ইন্ডিভিজ্যুয়ালি পর্বগুলি পইড়া সবার ভালো লাগারই কথা, কিন্তু উপন্যাসের চেষ্টা যেহেতু শুরু করছেন সেইটা আপনের গল্পের স্ট্যান্ডার্ড বজায় রাইখা শেষ করবেন আশা করি...
এতবড় সমালোচনা পাওয়ার যোগ্য বইলা তো মনে হয় না আমারে ভাস্করদা'।
তাও জানি কখনো সময় আসে, জীবন মুচকি হাসে, ঠিক যেনো পড়ে পাওয়া চৌদ্দ আনা...
ওয়েল আপনার আলোচনার জবাবে যেটা বলবো, সেটা হচ্ছে লেখাটা পুরাটা অলরেডী রেডী। তাই এখন যেগুলো ছাড়াছাড়া লাগছে সেগুলো মনে হয় শেষ তক ছাড়াছাড়াই থেকে যাবে। একটা বিষয় দেখেন, একটা বই কিন্তু পুরাপুরি শেষ করার পর আপনে নির্ধারণ করতে পারবেন বইটার প্রধান চরিত্রগুলো কি কি? তাদের এন্ট্রি দেখে নির্ধারণ করা কঠিন। যেমন এই লেখাটায়, অলি আর বকুলের আর কোনো পার্ট নাই। ইন্ডিভিজুয়াল পর্বগুলো ভালোলাগার হিসাবটা মাথায় রেখেই লেখা হয়েছে পুরোটা। (যদিও জানি কোনোটাই ভালো হয় নাই
)
ক্লীশেত্ব'র অভিযোগ মাইনা নিলাম। তবে সমরেশের ওই বিষয়টা আসলেই ইউনিক একটা ব্যপার ছিলো। বইটা পড়া থাকলে বহু ছেলেমেয়ে যে এভাবে প্রেমে পড়ে, সেইটা অস্বীকার করতে পারবেন না আপনেও, আমার ধারণা।
তাড়াহুড়া ছিলো না। আসলেই তাড়াহুড়া ছিলো না। বরং বহু ধীরে-সুস্থে লিখছি বলে ছাড়াছাড়া লাগার সম্ভাবনাটা আরো জোরালো হয়। একেক সময়, একেক দিন, একেক মাসে মানুষের মনোভাব, জীবনাচরণ, প্রকৃতি ইত্যাদি একেক রকম থাকে। তার প্রচ্ছন্ন প্রভাব থাকতে পারে লেখায়। ইন ফ্যক্ট থাকবেই।
এখনতরি লেখকের ল'ও হয়ে উঠতে পারি নাই, আর আপনে আসচেন আমার সমালোচনা করতে!!! মিয়া এইজন্যই তো জাতি হিসাবে আমরা পিছায়ে থাকলাম জীবনভর। সবসময় সবকিছু অপাত্রেই দিলাম।
(তাড়াহুড়ায় লিখলাম। পরে বিস্তারিত আলাপ হবে। কোনোকিছুতে মাইন্ডায়েন্না কিন্তুক। তাইলে মুনয় শাইন কর্তে পার্বেন্না।
)
রোমান্টিক বিপ্লবের সবগুলি একটাইমে নিয়ম কইরা পড়ছি।
আপনের এতো বড় কমেন্টের দুইটা লজিকাল প্রোপোজিশনে আসলে আমার বেশিরভাগ সমালোচনা নাকচ হইয়া গেছে। উপন্যাসের প্রথম দুই পাতা পইড়াই এমন সমালোচনা সবসময় কার্যকরী না'ও হইতে পারে, হয়তো কাঠামোগতভাবে আপনের উপন্যাসে মূল চরিত্র এরকম পরিব্রাজকই থাকে সারাটা সময়...
ইদানিং জনপ্রিয় সাহিত্য নিয়া ভাবতেছি বইলা মেইনস্ট্রিম ফরম্যাট দিয়া গুলাইয়া ফেলি অনেক সময়। ধরেন ঐ গর্ভধারিনী বা আবুল বাসার'এর অগ্নি বলাকা অথবা সুনীল গাঙ্গুলির একা এবং কয়েকজন কিংবা শীর্ষেন্দু'র পারাপার অথবা শ্যাওলা পড়তে শুরু করার পর খুব বেশি হইলে তিনটা পৃষ্ঠা উল্টাইতে হয় গল্পের বেসিক'এ ঢুকতে। অন্ততঃ প্রধান চরিত্রের সবাই উপস্থিত হইয়া তাগো সোশিও ইকোনমিক বা সোশিও কালচারাল অবস্থা জানান দিয়া ফেলে। মেইনস্ট্রিম সিনেমাতেও এই ফরম্যাট ফলো করা হয় হলিউডে'ও, দেড় ঘণ্টার ছবিতে প্রথম ৮/১০ মিনিটের মধ্যে গল্পের মধ্যে ঢুকাইয়া ফেলে দর্শকরে তারপর আগে বাড়ে।
আর আপনে যেমনে উপন্যাসের সমালোচনারে অপ্রয়োজনীয় কইলেন...এইটাই নয়া জমানার টোন। দেখবেন শহর এলাকার প্রায় ৭০% লোক এই যুক্তি করে যে বাঙালির এই অভ্যাসের জন্যই কিছু হইলো না বা হয় না...তারমানে আপনে আমি প্রত্যাশা করতে শুরু করুম যে এই ৭০% লোক অন্ততঃ ঠিকঠাক মতো দরকারী পদক্ষেপ নিবো। বাস্তবতা হইলো প্রয়োজনটা ঠিকই শিখে তয়, ঠিক যতোটা দরকার ব্যক্তির সুনির্দিষ্ট আগাইয়া যাওনের জন্য ততোটুকই পারফর্ম করে। মানে যা পড়লে তার লাভ হইবো, যা করলে তার চাকরী-চাকরীর পর প্রমোশন-বেতন বাড়বো এর বাইরে আজকের জমানার মানুষ কিচ্ছু ভাবে না। পশ্চিমের যারা আমাগো আদর্শ তারা এইসব আদর্শরে নিয়ম বানাইছে হয়তো কিন্তু নিয়ম মানে এক্কেরে শরীয়াহ আইন না...প্রয়োজনে তারা নিয়ম পাল্টাইয়াও ফেলে। কিন্তু আমরা যারা অনুসরণ করি তারা ঐসবরে স্মার্টনেস বা মূলমন্ত্র হিসাবে গ্র্যান্ট করি। যেই কারনে দেশের আর কিছু হয় না। ৯৩/৯৪'এর পর নতুন কোনো লেখকের বই পড়ি নাই যার লেখা পইড়া মনে হয় এই লোক নিজের স্টাইল দাঁড় করাইছে বা এরে না পড়লে জীবন বৃথা। যেই দেশে নতুন ব্যবসার সম্ভাবনা ছাড়া নতুন কিছু বা স্টাইলাইজ্ড কিছু দাঁড়ায় না সেই দেশ আর কোনদিকে যাইতে পারে ক'ন।
আমি সমালোচনায় কোনোদিন মাইন্ড করি না বস। অযৌক্তিক সমালোচনায় আমার অভক্তি আছে। যেমন আপনের লেখাতে করছি নিজেই, তয় আমি সেকেন্ড চান্স নীতিতে বিশ্বাসী। যদি আপনের যুক্তি না বুইঝা ঘাউরামী করতাম তাইলে টেবিলের উল্টাদিকের আমি খেইপা যাইতো নিশ্চিত...
পুরাটা যদি লেখা শেষ হইয়া গিয়া থাকে তাইলে মনে হয় আপনে প্রত্যেকদিন আর এখনকার চাইতে খানিকটা বেশি ম্যাটেরিয়াল প্রোভাইড করতে পারেন পাঠকের লেইগা।
বকুলের লগেতো আপনেরেই কিছু হৈলে হৈতে পারত ! এর মাঝে অলি বা প্রিয়দর্শিনী কেবা কৈরা হান্দাইলো জানার আগ্রহ রইলো। নিশ্চয়ই জানবো। আপনে সচেতন লেখক, না না উপন্যাসিক মানুষ... আমগো বঞ্চিত কৈরেন্না। তুমুল আগ্রহে লেখা অবজারবেশনে রাখলাম...
লেখা ভালো লাগছে।
লেখার ধারা ঠিক হইতেছে, যদিও একটু ছাড়া ছাড়া মনে হইলো।
কিছু বিষয় হঠাৎ করেই ঢুকে পড়ছে বলে খাপছাড়া লাগছে।
ধইন্যাপাতা ব্রাদার @ মেসবাহ ভাই
@ নেয়ামত
হ বস্। কিছু বিষয় হঠাৎ কৈরাই ঢুকছে। পারি না তো লিখতে, তাই। কিছু মনে কইরেন্না আবার
প্রথম কিস্তির তুলনায় দ্বিতীয় কিস্তি বেশি ভালো লাগছে
চলতে থাকুক 
ওকে চলবে। আপনারে নিয়মিত দেইখা আমারো ভাল্লাগতেসে।
অসাধারণ লাগলো এই পর্বটি পড়তে। আমার একটানে পুরোটাই পড়তে ভীষণ ইচ্ছে করছে। রোজ একটা পর্ব দেওয়া কি সম্ভব?
রোজ একটা পর্ব না, ওইদিন আপনে যখন বললেন তখনই পরের পর্বটা দিয়া দিতাম জানেন? কিন্তু সুমন ভাইয়ের পোস্টটা পড়ে এত মন খারাপ হয়ে গেল যে আর ভালোই লাগলো না। তাই দিই নাই। আর তারপরে সময় কাটতেসে ব্যস্ততায়।
একটানে পড়ে ফেললাম, আর কোনো কথা ফুটছেনা।
আমিও কোনো কথা কইলাম না। অফ গেলাম। আছেন কেমন লীনা আপু?
দুই দিন তো পার করে ফেললেন পরের পর্ব কই??
মন্তব্য করুন