ইউজার লগইন

নীলপদ্মের অপেক্ষা - ২

অনেকক্ষণ ধরে কানে আসছিলো নদীর কুলকুল ঢেউয়ের শব্দ। শরীর জুড়ানো একটা ঠান্ডা বাতাসও টের পাচ্ছিলাম। কিন্তু নদীটা যে কোথায়, ঠাহর করতে পারছিলাম না। নগরীর বিভিন্ন পুরানো রাস্তায় চক্কর দিয়ে দিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়ার পরও নদীটাকে খুঁজে পেলাম না। পেলাম আশ্বিনগেটের কোনো এক নির্জন নাম না জানা রাস্তার মোড়ে একটা বিবর্ণ হয়ে পড়া চায়ের দোকান।

ক্ষয়ে যাওয়া লাল রংয়ের গুটিকয় দাঁতওয়ালা কোঁকড়া চুলের দোকানীটা আমাকে তার দোকানের বেঞ্চির দিকে এগোতে দেখে, কোনো আদেশ-নির্দেশ-ফরমায়েশের অপেক্ষা না করেই কাঁচের কাপে টুং টুং শব্দ তুলে চা বানানো শুরু করে দিলো। আমিও কিছু না বলে চুপচাপ বসে চায়ের জন্য অপেক্ষা শুরু করলাম। দোকানীর উপরের পাটির সামনের দু'টো দাঁত নেই। কে জানে পানের সঙ্গে ও দু'টোও খেয়ে ফেলেছে কিনা! তবে লোকটার কাজে এক ধরনের সাজানো-গোছানো ভাব ছিলো, যে কারণে বসে বসে মনোযোগ দিয়ে তার হাতের কাজ পর্যবেক্ষণ করতে ভালো লাগছিলো।

দোকানী চায়ের কাপ আমার হাতে তুলে দেবার পর সেটায় চুমুক দিয়ে দুধ-চিনি সবকিছুর পরিমাণ যথাযথ পেয়ে ততটা অবাক হই নি, যতটা অবাক হয়েছিলাম এরপর তার আমার দিকে একটা গোল্ড লীফ বাড়িয়ে দেয়া দেখে। সে কিভাবে জানলো, ওইটাই আমার ব্র্যান্ড? বুঝতে পারলাম না। ব্যপারটা নিয়ে যে একটা প্রশ্ন করবো, সে ইচ্ছেও হচ্ছিলো না। শুধু প্রসন্ন দৃষ্টিতে দোকানীর দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে থাকলাম। দোকানী যেন সেই অবসরে আমার মুগ্ধ হওয়া দেখে লজ্জা পেয়ে গেলো।

চা আর সিগারেট প্রায় শেষ করে এনেছি এমন সময় হঠাৎ করে দোকানী সেদিনের একমাত্র কথাটি বলে উঠলো- নদীটারে আর খুঁইজা পাবেন না গো, কোনোদিন। আপাদমস্তক চমকে উঠলাম কথাটা শুনে। হঠাৎ যেনো আমার শ্বাসনালীর ভেতর খুন্তি-শাবলের চাড় টের পেতে শুরু করলাম। তাড়াতাড়ি উঠে চা-সিগারেটের বিল মিটিয়ে দোকান থেকে বের হয়ে আসলাম।

এরপর চলতি পথে বারবার আমার চোখ দু'টা ভিজে যাচ্ছিলো। কেন যাচ্ছিলো বুঝতে পারছিলাম না। মনে হচ্ছিলো দোকানীটাকে যদি আমার সব কথা বলে আসতে পারতাম, তাহলে হয়তো বারবার এভাবে চোখ ভিজে উঠতো না। আমি তো জানিই নদীটাকে আর খুঁজে পাবো না। এমন না যে নদীটাকে আজই আমি প্রথম খুঁজছি। অনেক বছর ধরেই খুঁজছি। প্রথম প্রথম নদীটার অভাব বুকের ভেতর যে হাহাকার হয়ে বাজতো, এখন আর তেমন বাজে না। এখন আগের মতো ব্যথায়-কষ্টে সারা পৃথিবী ভেঙ্গে চুরমার করে ফেলতে ইচ্ছে করে না। তবে এখনও নদীর বাতাস, ঢেউয়ের শব্দ আমাকে আচ্ছন্ন করে। বুকের ভেতর তিরতিরে কষ্ট হতে থাকে। আর মনে হতে থাকে কেউ যেন আমার শ্বাসনালীর ভেতরটা খুঁড়ছে। ক্রমাগত খুঁড়েই চলেছে।

ফোকলা অন্তর্যামী দোকানীটা কি আমার না বলা কথাগুলো বুঝতে পেরেছিলো? আমি ঠিক জানি না। বুঝে থাকতেও পারে, আবার নাও থাকতে পারে। আমি অনিশ্চয়তা নিয়ে এগিয়ে যাই বুড়িগঙ্গার দিকে। নিজের নদীটা হারিয়ে যাবার পর, এই গণ-জলাধারটা আমার বন্ধু হয়েছে। যেদিন খুব বেশি নাচার হয়ে যাই, সেদিন বুড়িগঙ্গার কোনো এক নির্জন প্রান্তরে গিয়ে চুপচাপ বসে থাকি। বসে থাকতে থাকতে একসময় ক্লান্ত হয়ে গেলে, আমি নিজের অপাঙক্তেয় শরীরটাকে টেনে নিয়ে আসি একটা দশ বাই বারো ফুট খোপের ভেতর। তারপর খোপটার সব লাইট অফ করে দিই। অন্ধকারে শুয়ে শুয়ে মহাকালের নিস্তব্ধতাকে শরীরের প্রতিটি কোষ দিয়ে অনুভব করার চেষ্টা করতে থাকি এবং একসময় আমার চারপাশ নিঃশব্দ হয়ে আসে।

এভাবেই আজকাল নদীটার কথা মনে পড়ে যাওয়া দিনগুলো পার হয় আমার।

---

পোস্টটি ৯ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

টুটুল's picture


এইতো লেখার ফর্ম চইলা আসছে Smile

নিভৃত স্বপ্নচারী's picture


আমার মনের মধ্যে একটা নদীর বাস, সেই ছোটবেলা থেকেই। নদীর সাথে খেলা করেই তো বড় হয়ে ওঠা ! কি করে ভুলবো ! ওর সাথে যে আমার জন্ম জন্মান্তরের সম্পর্ক ! ওর চলার ছন্দে, বয়ে চলা কলকল শব্দে যে সঙ্গীতের সুমধুর ধ্বনি! আমায় আবিষ্ট করে রাখে সারাক্ষণ, ওর বুকে বয়ে চলা উথাল পাথাল ঢেউয়ের মেলা, রিমঝিম হাওয়ার খেলা আমার সব এলোমেলো করে দেয়। ওর ছলাৎ ছলাৎ ঢেউ পাড়ে আছড়ে পড়ার শব্দ যেন বহুদূর থেকে ভেসে আসা কোন সুর তরঙ্গ! মাঝে মাঝে মনে হয় যেন সব হারানো কোন হতভাগিনীর কান্নার সুর! কখনো দেখেছি কত মানুষের সবকিছুই ওর বুকে বিলীন হতে, তবুও সরিয়ে দিতে পারিনা ওকে মন থেকে, ওর কাছে গেলে একাকার হয়ে যায় আমার অতীত বর্তমান ভবিষ্যৎ।

প্রিয়'s picture


লেখাটা খুব মায়া হইসে।

আরাফাত শান্ত's picture


এই রকমের অন্তর্যামী দোকানদার দরকার!
লেখা সুপার হইছে।

অনিমেষ রহমান's picture


আহা !!
চমৎকার লিখেছেন।
Smile Smile

জ্যোতি's picture


আহা! কত আবেগ, কত মমতা! আহা!

রন's picture


লেখা খুবই ভাল্লাগসে!
পুরাই মনে ধরসে!

বিষণ্ণ বাউন্ডুলে's picture


মায়াভরা লেখা। ভাল হইছে।

মেসবাহ য়াযাদ's picture


আফসুস, আপনের জন্য

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

মীর's picture

নিজের সম্পর্কে

স্বাগতম। আমার নাম মীর রাকীব-উন-নবী। জীবিকার তাগিদে পরবাসী। মাঝে মাঝে টুকটাক গল্প-কবিতা-আত্মজীবনী ইত্যাদি লিখি। সেসব প্রধানত এই ব্লগেই প্রকাশ করে থাকি। এই ব্লগে আমার সব লেখার কপিরাইট আমার নিজেরই। অনুগ্রহ করে সূ্ত্র উল্লেখ না করে লেখাগুলো কেউ ব্যবহার করবেন না। যেকোন যোগাযোগের জন্য ই-মেইল করুন: bd.mir13@gmail.com.
ধন্যবাদ। হ্যাপি রিডিং!