শুধু চোখ দু'টো জেগে থাকে
১.
প্রিয় হুমায়ূন আহমেদকে ভালোবাসি। তার মায়াবী সান্নিধ্যে জীবনের সেই গুরুত্বপূর্ণ সময়টি কেটেছে, যেটি কাটাতে আমি পাড়ি দিয়ে এসেছিলাম ৪.৫৪ বিলিয়ন বছরের পথ।
অনেক ছোট্টবেলার কথা। আম্মু একবার জন্মদিনে আমাকে গল্পের বই কিনে দেয়ার জন্য নিয়ে গেলেন লাকী প্লাজার দোতলায়। একটা বিখ্যাত বইয়ের দোকানে। দোকানের নামটা মনে পড়ছে না, কিন্তু খুবই পরিচিত একটা দোকান ওটা। সেখানে গিয়ে আম্মু আমাকে ভূত ভূতং ভূতৌ নামের একটা 'মাঝারি' গল্পের বই কিনে দিলেন। শৈশবে আব্বু-আম্মু দু'জনেই আমাকে গল্পের বই কিনে দিতেন।
ভূত ভূতং ভূতৌ কেনার সময় দেখলাম, ভেতরের গল্পের সাইজগুলো আমার পছন্দের সাইজের চেয়ে বড় কিন্তু অপছন্দের সাইজের সমান বড় নয়। বইটা কিনে রিকশায় করে জাম্বুরি ফিল্ড আর সিজিএস কলোনীর মাঝের রাস্তাটা দিয়ে সিএন্ডবি কলোনীর বাসায় ফিরলাম। সে সময় রাস্তা-ঘাটের এখনকার মতো করুণ অবস্থা ছিলো না। বিকালের দিকে রাস্তায় ঘুরে বেড়ানোকে তখন একটা স্বাস্থ্যকর অভ্যাস হিসাবে দেখা হতো। রাস্তায় খুব বেশি প্রাইভেট কার ছিলো না। সেই বাদামতলী পর্যন্ত যেতে হতো লোকাল বাস দেখতে হলে। সেদিন বিকেলে বইটা হাতে নিয়ে আম্মু আর আমি, দু'জনে রিকশায় করে বাড়ি ফিরেছিলাম। সেদিনের ওই বিকেলটিকেই আমি আমার ক্ষুদ্র স্মৃতি-সংগ্রহশালার সবচে' মূল্যবান স্মৃতি হিসেবে উল্লেখ করতে চাই। আমাদের মা-ছেলের খুব বেশি অমন স্মৃতি নেই।
যাক্ সেদিন ফিরতে ফিরতে আমি বইয়ের গল্পগুলোর সাইজ নিয়ে খুব ভেবেছিলাম। ওগুলোকে কি বড়গল্প বলবো, নাকি গল্প বলবো; কি বলবো? শেষ পর্যন্ত মীমাংসা না করতে পেরে সেগুলোর নাম দিয়েছিলাম মাঝারি গল্প। ঘটনাটা আজ অনেকদিন পরও, একদম অবিকল মনে আছে।
২.
বইটা শেষ করার পর আমার কি মনে হয়েছিলো, তা এখন আর মনে নেই। কেবল কয়েকটি দৃশ্য মাথায় ঢুকে আছে। দৃশ্যগুলো ছোটবেলা থেকেই অবিকল একই অবস্থায় রয়ে গেছে। একটা গল্পে নিউটনের মাধ্যাকর্ষণ সূত্রকে ভুল প্রমাণ করে একজন স্কুল শিক্ষক উড়ে উড়ে চলে গিয়েছিলেন মায়ার পৃথিবী ছেড়ে। কারণ এই কাজটা করতে গিয়ে তাকে সমাজের কাছ থেকে 'পাগল' উপাধিটি পেতে হয়েছে। আপনজনেরাও সরে গেছেন দূরে।
এই ঘটনার একটা হাই ডেফিনিশন ভিডিও আমার মস্তিষ্কের হার্ডডিস্কে সেভ করা আছে। তিনি একটা সাদা শার্ট আর একটা কালো প্যান্ট পড়ে আছেন। পায়ে স্যান্ডেল আছে। তার চোখে চশমা এবং মাথার চুলগুলি পরিপাটী করে আঁচড়ানো। তিনি হাত দু'টো সামনের দিকে প্রসারিত করে ভূমির সঙ্গে সমান্তরালে আস্তে আস্তে উড়ছেন। উড়ে উড়ে হেডমাস্টারের বাড়ির সামনে গিয়ে তিনি কিছুক্ষণের জন্য থামলেন। হেডমাস্টারের সঙ্গে তার দেখা হলো। সূত্র যে ভুল প্রমাণিত হয়েছে সেই সুখবরটি তিনি হেডমাস্টারকে দিলেন। হেডমাস্টার তাকে উড়তে দেখে খুব আশ্চর্য হয়ে গেলেন।
৩.
দৃশ্যকল্প তৈরি করার একটা পরাবাস্তব পর্যায়ের ক্ষমতা ছিলো হুমায়ূন আহমেদের। কতবার যে তার নির্দেশনায় আমি নানারকমের ঘর-বাড়ি, পথ-ঘাট, বাসার আলনা, টানা বারান্দা, বড়চাচার ঘর, বাঁধানো কলতলা, ধানমন্ডি থানা, বেকার যুবক এবং আরো অনেক কিছু মনে মনে বানিয়েছি, তার কোনো গোণা-গুনতি নেই।
শৈশবে নীলু মামা নামের এক দয়ালু, বইপ্রেমী বন্ধুর কল্যাণে আমি প্রতিদিন প্রিয় হুমায়ূন আহমেদের একটি করে নতুন বই পড়ার সুযোগ পেয়েছিলাম এবং যত দূর মনে পড়ে প্রায় তিন মাসের মতো দৈর্ঘ্য ছিলো সেই সময়কালটির। প্রতিদিন একটি করে নতুন বই। আমি তাকে পড়া শুরু করার আ্গেই তিনি প্রায় একশ'টি বই লিখে ফেলেছিলেন।
সেই দফায় কোনোবারই তিনি হতাশ করেন নি। শব্দে শব্দ বুনে জাদুর জাল তৈরি করে রেখেছেন। সেই জালের ভেতর একবার ঢুকে পড়তে পারলেই হলো। অনায়াসে পৃথিবীর হিসাবের খাতা থেকে মিলিয়ে যাবে এক-দেড়-দুই বা আরো বেশিসংখ্যক ঘন্টা। প্রিয় হুমায়ূন আহমেদের জন্যেই আমার জীবনের অনেকগুলো কর্মঘন্টা অপার্থিব আনন্দে কেটেছে। একমাত্র আমাদের 'গ্রান্ড মাস্টার অভ রাইটিং' রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছাড়া আর কেউই হুমায়ূনের মতো করে পারেন নি। আমাকে আনন্দ দিতে।
৪.
মাঝে মাঝে কোনো কারণ ছাড়া সারারাত চুপচাপ বিছানায় চোখ মেলে শুয়ে থাকি। কোনো কারণ থাকে না। এমনকি ঘুম না আসার মতো কিঞ্চিত কোনো কারণও না। শরীরের ভেতর ঘাপটি মেরে থাকে ঘুম। অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো একসময় ঘুমিয়ে পড়ে। কিন্তু চোখ দু'টো ঘুমায় না। নিজেদের মেলে নিয়ে চেয়ে থাকে, আমার হারানো শৈশবের দিকে।
আজন্ম প্রিয় সেই শৈশবটিকে সঙ্গে করে নিয়ে চলে গেছেন প্রিয় হুমায়ূন আহমেদ। শূন্য করে দিয়ে গেছেন চিন্তারাজির অনেক বড় একটা ক্ষেত্রকে। অনেকগুলো নিশাচর নিউরণকে করে দিয়ে গেছেন কর্মহীন। একেকরাতে হৃদয়ের খুব কাছের এত প্রিয় একজন মানুষের প্রাণবন্ত জায়গাটি শূণ্য দেখে, আমার চোখ দু'টো শুধু জেগে থাকে।
---





মীর ভাই দ্যা বস!
অসাধারন লাগলো!
ভাল লাগলো পড়তে, বরাবরের মতই।
মীর ভাই দ্যা বস!
প্রিয় লেখকের জন্য মন কেমন করাটা আবার ফিরে আসলো।
সিমপ্লি অসাধারণ !!
অনেক কঠিন কথা খুব সহজ করে প্রকাশ করার এত অসাধারণ ক্ষমতা হুমায়ুন আহমেদ ছাড়া আমি কারো মধ্যে দেখিনি। সময়ের অনেক আগেই চলে গেলেন তিনি!
apnar chhelebela shobshamoy amr chhelebela mone koria dey...Lucky plaza, agrabad, chhotopool, badamtoli...ish, kato prio sheishob din!!! Rashida Afrose (log in kora jaschhe na)apnar chhelebela shobshamoy amr chhelebela mone koria dey...Lucky plaza, agrabad, chhotopool, badamtoli...ish, kato prio sheishob din!!! Rashida Afrose (log in kora jaschhe na)
প্রিয় মানুষেরা চলে যাচ্ছেন। আমরা একা হযে যাচ্ছি।
কেমন আছেন মীর? আপনাকে দেখি না যে!
ব্যস্ততা জয় করে লিখেন। আপনার লেখার অপেক্ষায় পুরো জাতি!
মীর আমার কহুব প্রিয় লেখকের তালিকায় যেমন আছেন হুমায়ূন আহমেদ, তাঁর কথা না হয় নাই বা ব ললাম, কিন্তু তোমার কথা বলতে পারি... আমি তোমার অনেক অনেক ভক্ত।
ঐ যে তুমি একটা সাদা বক পাখি এবং এই নামে কি যেন একটা গল্প লিখছিলে, গত দুবছরের মধ্যে সেটা ছিল আমার পড়া শেষ আলোড়িত করার মত গল্প। আমার খুব ভালো লেগেছিল। ভালও থেক।
মীর, আপনার একটা জম্পেশ লেখা পড়লাম।
নতুন লেখা পড়ার অপেক্ষায় চাতক পাখির মত...
মন্তব্য করুন