একলা চালা, ছেঁড়া চাদর, বন্ধু আসার নয়া খবর
"ভাঙা চালায় হাওয়া আসে, হাড় কাঁপুনি শীত
দুয়ার খুলে শুনতে পাই, বন্ধু আসার নয়া দিনের গীত।"
মলয়দা'র লেখা গান। লেখার শিরোনামটাও এই গানেরই একটা লাইন। মলয়দা' একজন প্রাণের মানুষ ছিলেন। তার ছোট-খাটো ভুড়িটার ওপর তবলার ঠুক-ঠাক করতে আমার এবং আমার জিরাফের খুবই আমোদ লাগতো। বয়সে বড়; তবুও বন্ধু আগে, পরে বড়ভাই। সেই মলয়দা' আজ নেই। যতবার মনে পড়ে, বুকের ভেতর খা খা করে। কক্সবাজারে থাকতেন জীবনের শেষ দিনগুলোতে। সেখানকার এয়ারপোর্ট রোডে এখনো উনার হাতে লেখা একটা চিকা আছে। ছাত্র ইউনিয়ন। ছাত্র শব্দটা সোজা করে লিখে, ইউনিয়নটাকে রাউন্ড শেপে আগের শব্দটার ডানপাশ দিয়ে উঠিয়ে দিতেন। অমন করে চিকা মারতে উনিই শুধু পারতেন। আর আমি শিখছিলাম লেখার কৌশলটা। ক্লাসের খাতায়, হাতে লেখা পোস্টারে কিংবা মধুর টেবিলে চায়ের চামচ দিয়ে সারাদিন ট্রাই করতাম। শুধু দেয়ালেই আর লেখা হলো না।
মলয়দা'র এই লাইন দু'টো আজ সকালে মাথায় এসে ঠাঁই নিয়েছে। উনি কিভাবে জানতেন এক হাঁড় কাপুনি শীতের পরে এই দেশে নয়া দিনের গীত বেজে উঠবে? বড় অলৌকিকভাবে ঘটনাটা তাই ঘটেছে। মলয়দা' অদ্ভুত ছিলো। তার কার্যকলাপ আরো অদ্ভুত ছিলো। জগন্নাথ হলের রুমের সিলিংয়ে উনি একটা বিটকেলে হাসিমুখো পালোয়ানের ছবি লাগিয়ে রেখেছিলেন। যেটা দেখলে মুচকি হাসি না এসে উপায় নেই। আর জিনিসটা চোখেও পড়তো যখন ওই রুমে রাতে থাকতে যেতাম কেবল তখনই। একদিন মলয়দা' বলছিলো, সকাল ঘুম থেকে উঠে এই ছবিটা দেখে আমি কিছুক্ষণ হাসি। দিনটা হাসি দিয়ে শুরু হয়।
মলয়দা' কি জানেন, যাদের নিয়ে উনি ভাবতেন, যাদের কথা চিন্তা করতেন; সেই বন্ধু-বান্ধব-ছোট ভাই-বোনদের আজ একটানা সাতদিন ধরে হাসিমুখে দিন শুরু হচ্ছে? যত খারাপ সংবাদই কানের চারপাশে ঘুর ঘুর করুক না কেন, সবকিছু পেছনে ফেলে আমরা প্রতিদিন সামনে এগিয়ে যাচ্ছি।
কাল রাতেও বুকের ভেতর খামচে ধরেছিলো সেই পুরোনো শকুন। যখন শুনলাম, লাকী আক্তারকে মারধোর করেছে ছাত্রলীগের পান্ডারা। মুহূর্তের মধ্যে নিজেকে আহত, প্রতারিত মনে হওয়া শুরু হয়েছিলো।
ছাত্রলীগ বা শেখ হাসিনা জানেন কিনা জানি না, এই খবরটা ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে আনন্দে ম্যাৎকার করেছে ছাগুরা। মগবাজারে আনন্দের রোল উঠেছিলো এই খবরে। এটা প্রধানমন্ত্রীর জন্য জানা থাকা জরুরি। কারণ এখনো ছাত্রলীগ বা আওয়ামী লীগের অনেকে হয়তো ওদের সঙ্গে রাজনীতি করতে চায়। বাংলার জনগণ কিন্তু সেটা মানবে না। যারা এখনো ওদের সঙ্গে রাজনীতি করতে চায় এবং এতকিছুর পরেও একটা মডারেট জামায়াতকে প্রতিষ্ঠিত করে দেয়ার ফঁন্দি আঁটছে; তাদের জন্য অদূর ভবিষ্যতে বড় দুর্দিন অপেক্ষা করছে। এই কথাটা সংশ্লিষ্টদের জানিয়ে দিতে চাই।
বারডেমের ভেতর যখন নেগোসিয়েশন চলছিলো তখন বাইরে আমি দেখেছি, জনমানুষের গভীর ভালোবাসা। সিপিবি'র সুমন ভাই যখন শুনলেন লাকীর বেশি কিছু হয় নি, ফার্স্ট এইড ট্রিটমেন্ট নেয়া লেগেছে মাত্র; তখন তো পারলে বিপ্লবীদের কথা'র রফিক ভাইকে ধরে মারেন। কেন? কারণ রফিক ভাই তাকে বলেছিলেন, লাকীকে আইসিইউতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। শোনার পর থেকে তার বুক ধড়ফড় করছে। লাকীর কি হলো জানার জন্য ছটফটাচ্ছিলেন। রফিক ভাই অমন ভুল সংবাদ না দিলে কি আর সুমন ভাইয়ের প্যালপিটিশন এত বেড়ে যেতো?
অন্যদিকে জলি আপুতো ইটিভি'র ক্যামেরাম্যানকেই ধরে মার লাগাতেন আরেকটু হলে। আপা একটা কমেন্ট দেন- রিপোর্টারের কথা শুনে চিৎকার করে উঠলেন, 'যান আপনারা বলে দেন লাকীকে হিট করা হইসে। যান এইখান থেকে।' আমি দেখি আর ভাবি প্রজন্ম চত্বরে আলগা খ্যাতি অর্জন করতে আসে অনেক নামধারী বিপ্লবী। তারা কিন্তু একটু বোল্ডনেসের শিক্ষা নিতে পারেন চাইলে, জলি আপুর কাছ থেকে। টিভি ক্যামেরার সামনে বোল্ড থাকতে জানলে কাজ হয় আরো বেশি।
ফটোগ্রাফার পাভেল ভাইয়ের উৎসুক চোখ খুঁজে বেড়াচ্ছিলো যেন কাকে। সেদিকে দৃষ্টি দেবার আগেই দেখি সেলিম ভাই, প্রিন্স ভাইরা ধরে ধরে বের করে নিয়ে আসছেন লাকীকে। চারপাশে হাতে হাত ধরে গোল হয়ে গার্ড দিতে আগ্রহী লোকের সংখ্যা তখন বারডেমের সামনে কমপক্ষে পাঁচশো'। লাকী কি জানতো, সাত দিনেই মানুষের হৃদয়ের এত গভীরে ঢুকে যাবার ক্ষমতা তার ভেতর লুকিয়ে ছিলো?
লাকী এসেছিলো। এসে বলে গেছে, কে তাকে মেরেছিলো সে জানে না। এই একটা কথায় প্রজন্ম চত্বরে নতুন প্রাণের সঞ্চার হয়েছিলো। সুবিধাবাদী ছাত্রলীগ জানে না, কত বড় দুর্ঘটনা তারা ঘটাতে বসেছিলো। পুরো আন্দোলনকে নষ্ট করে দিতে পারতো এই একটা ঘটনা। লাকী এসে সব শঙ্কা এক ফুঁয়ে নিভিয়ে দিয়ে গেলো। আন্দোলনের স্বার্থে সবাইকে এক থাকতে হবে। তার এই একটা কথাই মন্ত্রের মতো ছড়িয়ে পড়লো প্রজন্ম চত্বরে। লাকী কি আসলেই জানতো, সে একদিন আমাদের সবার প্রাণের মানুষ হয়ে উঠবে?
সবকিছু দেখে-শুনে আমার ভেতর থেকে, গভীর রাতে হল থেকে ছুটে আসা ডিপার্টমেন্টের পিচ্চি তানিয়ার ভেতর থেকে, সুমন ভাই আর রফিক ভাইয়ের ভেতর থেকে, পাভেল ভাই-দূর্জয়দের ভেতর থেকে হতাশা কেটে যায়। আমরা সবাই খুশি খুশি মুখে সিগারেটের আশায় পকেট হাতড়াতে শুরু করি। একে অপরকে চা খাওয়ার প্রস্তাব দিই। এগোতে থাকি জাদুঘরের সামনের রাস্তাটার দিকে।
মনে মনে অবিরাম চলছে স্লোগান। যায় যদি যাক প্রাণ, যুদ্ধে এসো নওজোয়ান।
আজকে আর বেশি কথা না। এবার আসেন ছবি দেখি। এইখানে বসে বসে গান গায় জনতা।

এইখানে বিলি হয় বিস্কুট।

এই প্রজন্মের যোদ্ধারা। স্মার্ট আছে, কি বলেন?

শিশির নামের একজন স্বঘোষিত ভ্যাগাবন্ডকে দেখলাম রাস্তায় বসে আছে কিছু বাংলা বিড়ি আর কিছু পেনিসিলিন নিয়ে। ফ্রি মেডিক্যাল ক্যাম্প এটা তার।

স্পিরিটটা দেখেন শুধু!

ফাঁসির দাবিতে গণমাধ্যমকর্মীদের গণস্বাক্ষর কর্মসূচি।

'ফাঁসির মঞ্চ প্রস্তুত'

এসো ভাই এসো বোন, গড়ে তুলি আন্দোলন/ জনে জনে জনতা, গড়ে তোলো একতা।

ইনি উদভ্রান্ত ও নিরুদ্দেশ। জনসমুদ্রে খাবি খাচ্ছেন। বুঝতেই পারছেন না সমস্যাটা কোথায় হচ্ছে।

সবশেষে জীবন বাংলাদেশ আমার মরণ বাংলাদেশ, প্রথম বাংলাদেশ আমার শেষ বাংলাদেশ।

---
এই পোস্টটা নতুন প্রজন্মের প্রাণের মানুষ লাকী আক্তারকে উৎসর্গিত। পুরোপুরি সুস্থ্য হয়ে উঠুন লাকী। তাড়াতাড়ি।





লাকীপুর জন্য ভালোবাসা। <3
একটা পিচ্চিরে যে কাদের মোল্লা সাজিয়ে আনছিল, দেখেন নাই?
ভালো এক্সপ্রেশন দিতেছিল!
আর ইস্পিশাল টয়লেটগুলা?
দূর্দান্ত মীর... প্রতিদিন আপডেট লিখুন....
আমারে ছবি তোলা শিখাইবেন?
দা রু ন!
দারুণ সব ছবি। লেখার সাথে ছবিগুলো শাহবাগে টেনে নিবে। তারুণ্যের জয় হোক।
বেশী বেশী লেখেন, ছবি দিন।
জেগেছে জনতা, এবার বিজয় হবেই!
ছবিগুলো দূর্দান্ত!
মীর ভাই গেলেন কই?
মিস ইউ তো..
মন্তব্য করুন