ইউজার লগইন

আন্দোলনের কি হবে- এই প্রশ্ন এখনো তোলার সময় হয় নি

বেলুন ওড়ানো কর্মসূচি নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দে ভোগার কোনো কারণ নাই। আগামীকাল বিকাল ৪টা ১৩ মিনিটে কয়েক লাখ বেলুন যে প্রজন্ম চত্বর থেকে উড়বেই, এ ব্যপারে সবাই নিশ্চিত থাকতে পারেন। মানুষের মধ্যে এটার প্রস্তুতি চলছে। বিশেষ করে আন্দোলনের সহযোগী ব্রিগেড/ স্কোয়াডগুলো এই লাইনে কাজ অলরেডী শুরু করে দিয়েছে। ক্যম্পাস, চারুকলা, ছবির হাট সব জায়গায় চলছে তোড়জোড়।

এর আগে যেমন মোমবাতি প্রজ্বলন কর্মসূচির সময় ট্রাকে করে মোমবাতি আসতে দেখা গেছে, তেমন বেলুনও সম্ভবত চলে আসবে। সিজনাল ব্যবসায় যারা পুঁজি খাটাতে জানেন, তাদের জন্য সময়টা এখন পোয়াবারো। পুরান ঢাকার কিছু বন্ধু-বান্ধবের মন্তব্য পাইলাম এমন, মোমবাতির সময় বিরাট ব্যবসা মিস্ করছি। কিন্তু এইবার করুম না।

আসলে লোকজন ইনভেস্ট করার জন্য টাকা নিয়ে বসে আছে। আর মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানীগুলোও দেদারসে স্পন্সরশিপ দিচ্ছে। মোমবাতি প্রজ্বলনের সময়ও এটা হইছিলো। রানী মোম নামের একটা মোমবাতির প্যাকেটে ছোট্ট একটা কাগজ। সেখান প্রস্তুতকারক নাম-লোগা-ঠিকানা ইত্যাদি আছে। সঙ্গে আছে গ্রামীণের লোগো। এবারও তেমন হতে পারে। বেনিয়ারা ব্যবসা করবেই। আমাদেরকে চেষ্টা করতে হবে, তাদেরকে যতটা সম্ভব নিবৃত্ত রেখে; আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।

কথা থেকে যায়, বেলুন উড়িয়ে লাভ কি? কিছুদিন আগে একটা মোবাইল অপারেটরের বিজ্ঞাপনে এই জিনিস দেখানোও হইসে। একটা পিচ্চি মেয়ে মায়ের কাছে চিঠি লিখে বেলুনে বেঁধে আকাশে উড়িয়ে দেয়। ভালো নাড়া দিছিলো মানুষকে ওই বিজ্ঞাপনটা। আগামীকালের বেলুন ওড়ানো কর্মসূচিও কি নাড়া দেবে? নাকি এটা হয়ে উঠবে বিরোধীপক্ষের অপপ্রচারের আরেকটা হাতিয়ার? মানুষের মধ্যে লক্ষ লক্ষ প্রশ্ন।

আসলে বিষয়টা হচ্ছে, আন্দোলনকারীরা যে মাঠে আছে, সেটার একটা শো-অফ দরকার। সরকার আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস্) আইন, ১৯৭৩ সংশোধন করছে। আগামী সপ্তাহে সংশোধিত আইনে কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে আপিল করার কথা ভাবতেসে। আপিল করে নিশ্চই সাজা কমানো হবে না। বাড়ানোই হবে। আর বাড়ানো মানে তো ফাঁসিই, তাই না? একজনের ফাঁসি দেয়া গেলে আরেকজনের ফাঁসি দেয়া সহজ হবে। দেশের মানুষ ফাঁসি চায়। সরকারের সেটা দিতে কোনো সমস্যা আছে? থাকার তো কথা না। সরকারের এখন মধুর বসন্ত চলছে। জনদাবি মেনে ফাঁসিগুলা শুধু দিয়ে দাও। নির্বাচনী বৈতরণী আরাম কেদারায় চড়ে পার হয়ে যাও। আরো সুখবর আছে, ২০০৯ সালের একটা মামলার জের ধরে জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার পাঁয়তারা শুরু হচ্ছে। এটা কতদূর কার্যকর হবে, জানি না। কিন্তু লড়াইটা তো শুরু হলো। জামায়াত নিষিদ্ধের এই লড়াই শুরু করা কি ১৫ দিন আগে সম্ভব ছিলো? আজ নেত্রকোণায় যে ইসলামি ব্যাংক থেকে অ্যাকাউন্ট প্রত্যাহারের হিড়িক পড়েছে, তা কি 'ঘটবে' বলে কেউ ভেবেছিলেন? ভাবতেও হয় নি কিন্তু ঘটে গেছে।

এই সব কিছু কিন্তু পজিটিভ সাইন। ৫ তারিখ যখন ট্রাইব্যুনাল থেকে যাবজ্জীবন সাজার রায় দেয়া হয় কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে, সে সময় পর্যন্ত মানুষের এই চেহারার সঙ্গে কারো পরিচয় ছিলো না। সরকারের ছিলো না, ট্রাইব্যুনালের বিচারক-প্রসিকিউটরদের ছিলো, বিএনপি'র ছিলো না, জামায়াত তো ভেবেছিলো তারা যা বলবে দেশে তাই হবে- যে কারণে তারা গৃহযুদ্ধে হুমকি দিয়ে রেখেছিলো; এমনকি মানুষ নিজেও মনে করতো জামায়াত বুঝি খুবই বিশাল এক দৈত্য বা রাক্ষস ধরনের কোনোকিছু, যেটা চাইলেই এই দেশের প্রত্যেকটা মানুষকে গিলে ফেলেতে পারে। কিন্তু আজ ১৫ দিন পরের পরিস্থিতি চিন্তা করেন।

মানুষ জেগে উঠেছে। জনগণের শক্তিই যে সবচেয়ে বড় শক্তি, সেটা নতুন প্রজন্ম বুঝতে শিখেছেন। যারা ভুলে গিয়েছিলেন, তাদের মনে পড়েছে। জামায়াত নামক দলটি আজ নিষিদ্ধ হবার আশঙ্কার মুখে পড়ে গিয়েছে। সরকার পাঁয়তারা করছে একসঙ্গে কয়েকটা ফাঁসির রায় দিয়ে দেয়ার। ঝামেলা একবারে চুকে যাক। মানুষের মধ্যে জাশি বিরোধী যে চেতনাটি ঘুমিয়ে পড়েছিলো, সেটা জেগে উঠেছে। জামায়াতের নষ্ট অর্থনীতির ওপর আঘাত এসেছে। ছোট ছোট বাচ্চারা প্রজন্ম চত্বরে এসে তাদের কচিকণ্ঠে স্লোগান দিয়ে বলে গেছে, ফাঁসি ফাঁসি ফাঁসি চাই। এইসব কিছু কি আজ থেকে ১৫ দিন আগে চিন্তা করার সুযোগ ছিলো?

এখানেই শেষ নয়। এ আন্দোলন এখন যেভাবে চলছে, সেভাবে যদি আরো ১৫ দিন চলে; তাহলে এ অর্জনের খাতায় আর কি কি যোগ হবে বলে মনে করেন? কেন ‌এখনই 'আন্দোলনের কি হবে? ভবিষ্যত কি?'- এসব ভাবা শুরু করে দিয়েছেন? এখনও কি এসেছে সেই সময়?

আমার তো মনে হয়, আজ যারা মনে মনে হিসাব কষছেন আন্দোলনের ভবিষ্যত নিয়ে; তারা আসলে ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। এখন বোধহয় একটু বিশ্রাম চাচ্ছেন। রাতের বেলা ছোট বাচ্চার যখন টিভি দেখায় মশগুল থাকে, তখন বাড়ির যে বুড়ো সদস্যটি 'আর কতক্ষণ-আর কতক্ষণ' বলে তাগাদা দেয়; সেই বুড়োর ভূমিকায় নেমেছেন। এখন কিন্তু সেটা করাটা ঠিক হবে না। কারণ বিশ্রামে গেলেই, অফ-ট্র্যাক হয়ে যাবেন। চাইলেও আর ফিরতে পারবেন না। নিজের চারপাশে একবার তাকিয়ে দেখুন না, আজ আপনি যে চেতনার উত্তাপের ওপর দাঁড়িয়ে আছেন; সেখানে কি হুট করে এসে দাঁড়ানো সম্ভব? ১৫ দিন পর আজ আপনি যেমন, আপনার চিন্তাধারা যেমন, আলাপের ধরন যেমন, ২ দিন বিশ্রাম নিয়ে আবার ঠিক তেমন অবস্থায় কি ফিরতে পারবেন জনাব?

তাই বলছিলাম, সঙ্গে থাকুন। আন্দোলন শেষ হয় নি, আন্দোলনের কি হবে এই প্রশ্ন এখনো তোলার সময় হয় নি। কর্মসূচি কেমন হলো- সে রায় দেয়ার সময় হয় নি। যা কিছু হচ্ছে, হতে দিন। নিজে তাতে অংশ নিন।

শেষ করি পিজি হাসপাতালের নিচের যে ওষুধের দোকানগুলো, সেইখানকার এক দোকানদারের বক্তব্য দিয়ে। জানতে চেয়েছিলাম, এখানে দোকান করতে কেমন লাগছে? তিনি বললেন, কেমন জানি একটা ভাব হচ্ছে। এখানে আগে সারাদিন গাড়ি চলতো। বড় বড় বাস, ট্রাক, লরি, প্রাইভেট কার, মটরসাইকেল চলতো। ভীড়, হর্ণ, কালো ধোঁয়া, ব্যস্ততা- এইসব নিয়ে ২০-২২ বছর প্রতিটি দিন দোকান করেছি। হঠাৎ করে সেই জিনিসটা নাই হয়ে যাওয়ায়, এখন শরীরে সেটার প্রভাব পড়েছে। ইদানীং কেন যেন খানিকটা বেশি সুস্থ বোধ করছি।

শুনে আমার হাসি পেলো। আমিও গত ক'দিন রাস্তার যানজট থেকে দূরে আছি। ট্রাফিক সিগন্যাল থেকে দূরে আছি। অফিসের প্যানপ্যানানি থেকে দূরে আছি। অহেতুক আড্ডা এবং ততোধিক অপ্রয়োজনীয় টেনশন নিয়ে মাথা ভারী করে রাখার প্রবণতা থেকে দূরে আছি। জীবনে কি হবে, কি করবো- এইসব ভেবে সময় পার করা থেকে দূরে আছি। আমার ভালো লাগছে। নিজেকে হঠাৎ করে অনেক বেশি সুস্থ সুস্থ লাগছে। এতদিন যে নিত্যনৈমিত্তিক সংকটাপন্ন জীবনটি নিয়ে মাথা ঘামাতে হতো, সেটি নিয়ে আর মাথা ঘামাতে হচ্ছে না। আপাতত দেশের কাজে কিভাবে নিজেকে বিলিয়ে দেয়া যায়, তাই নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছি। মনে হচ্ছে জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়টা বুঝি পার করছি।

এমন সময় ফিরে ফিরে আসুক, আমার জীবনে এবং আমাদের সবার জীবনে।
---

পোস্টটি ১৭ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

রন's picture


একদম আমার মনের কথা গুলো বলসেন মীর ভাই! ধন্যবাদ!

মীর's picture


থ্যাংক ইউ রনি ভাই Smile

জ্যোতি's picture


মীর, আপনার মতই বলতে চাই এমন সময় জীবনে বারবার আসুক। আমি নিজে জানি, আন্দোলন চলার প্রতিটাদিন কেটেছে / কাটছে অন্যরকম এক উত্তেজনায়। খুব প্রিয়জনের সাথে কথা বলার টপিকও বদলে গেছে। অন্যরকম দিন। আমার বাসায় আমার ভাগ্নীরা মাথায় ব্যাজ লাগিয়ে স্লোগান দেয়...রাজাকারের ফাঁসি চাই। কেমন যে লাগে বলে বুঝাতে পারব না। সারাদিনে মনে হয় শাহবাগ যাওয়া হলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। কিন্তু হঠাৎ মনে হচ্ছে আন্দোলন যেন প্রাণ হারিয়ে না ফেলে। দাবি আদায়ের লক্ষ্য থেকে যেন দূরে চলে না যায়।

নাঈম's picture


সাবাশ, এমন মনোভাব আন্দোলনকারী সবার মাঝে ছড়িয়ে পড়ুক.....

মাহবুব সুমন's picture


টিপ সই

নাজনীন খলিল's picture


এতদিন যে নিত্যনৈমিত্তিক সংকটাপন্ন জীবনটি নিয়ে মাথা ঘামাতে হতো, সেটি নিয়ে আর মাথা ঘামাতে হচ্ছে না। আপাতত দেশের কাজে কিভাবে নিজেকে বিলিয়ে দেয়া যায়, তাই নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছি। মনে হচ্ছে জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়টা বুঝি পার করছি।

টিপ সই

আরাফাত শান্ত's picture


দেখা যাক কি হয়!

বিষণ্ণ বাউন্ডুলে's picture


এখন কেবল পাশে থাকার সময়,
বাকি টা পরে দেখা যাবে।

শাপলা's picture


সাবাশ মীর। খুব ভালো লাগল লেখাটা পড়ে।

১০

ফাহমিদা's picture


টিপ সই
এই সময়ের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা লেখা

১১

টুটুল's picture


আজ যারা মনে মনে হিসাব কষছেন আন্দোলনের ভবিষ্যত নিয়ে; তারা আসলে ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। এখন বোধহয় একটু বিশ্রাম চাচ্ছেন। রাতের বেলা ছোট বাচ্চার যখন টিভি দেখায় মশগুল থাকে, তখন বাড়ির যে বুড়ো সদস্যটি 'আর কতক্ষণ-আর কতক্ষণ' বলে তাগাদা দেয়; সেই বুড়োর ভূমিকায় নেমেছেন। এখন কিন্তু সেটা করাটা ঠিক হবে না। কারণ বিশ্রামে গেলেই, অফ-ট্র্যাক হয়ে যাবেন। চাইলেও আর ফিরতে পারবেন না। নিজের চারপাশে একবার তাকিয়ে দেখুন না, আজ আপনি যে চেতনার উত্তাপের ওপর দাঁড়িয়ে আছেন; সেখানে কি হুট করে এসে দাঁড়ানো সম্ভব? ১৫ দিন পর আজ আপনি যেমন, আপনার চিন্তাধারা যেমন, আলাপের ধরন যেমন, ২ দিন বিশ্রাম নিয়ে আবার ঠিক তেমন অবস্থায় কি ফিরতে পারবেন জনাব?

টিপ সই

এইভাবে গুছিয়ে বলতে পারা লোকগেুলোর লেখা এখন খুবি বেশী প্রয়োজনীয়। মুক্তিযুদ্ধের সময় যেমন স্বাধীনবাংলা বেতার কেন্দ্রথেকে উদ্দিপক গন প্রচার হতো... ঠিক তেমনি।

১২

উচ্ছল's picture


লিখেন ভাই ... বেশী বেশী করে লিখেন.... আমরা যারা নিয়মিত যেতে পারি না তাদের জন্য এমন লেখা টনিক হিসাবে কাজ করে......... ভালো থাকবেন ।
বাংলাদেশ

১৩

তানবীরা's picture


সাবাশ, এমন মনোভাব আন্দোলনকারী সবার মাঝে ছড়িয়ে পড়ুক.....

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

মীর's picture

নিজের সম্পর্কে

স্বাগতম। আমার নাম মীর রাকীব-উন-নবী। জীবিকার তাগিদে পরবাসী। মাঝে মাঝে টুকটাক গল্প-কবিতা-আত্মজীবনী ইত্যাদি লিখি। সেসব প্রধানত এই ব্লগেই প্রকাশ করে থাকি। এই ব্লগে আমার সব লেখার কপিরাইট আমার নিজেরই। অনুগ্রহ করে সূ্ত্র উল্লেখ না করে লেখাগুলো কেউ ব্যবহার করবেন না। যেকোন যোগাযোগের জন্য ই-মেইল করুন: bd.mir13@gmail.com.
ধন্যবাদ। হ্যাপি রিডিং!