প্রিয় বাংলাদেশ
তুমি ভালো নেই, তাই না?
বুঝতে পারি। এভাবে বেড়ে উঠতে তুমি চাও নি। ধর্মান্ধতা, নিরক্ষরতা, কুসংস্কার, কাপুরুষতা, বিকৃতি, পশুপ্রবৃত্তির মতো অসহনীয় সব ব্যাপার-স্যাপার বুকের ভেতর পুরে কেই বা বেড়ে উঠতে চায়? তাই যখনই তোমাকে দেখি ওসবের কোনো একটা দ্বারা আক্রান্ত হতে, বুঝে ফেলি তুমি ভালো নেই। ধর্মান্ধতা কতোটা বেড়ে গেলে একটা দেশে একের পর এক মানুষ মুক্তবুদ্ধির চর্চার জন্য খুন হয়ে যেতে পারে, সেটার শ্রেষ্ঠ না হলেও সমসাময়িক কালের জ্বলজ্বলে উদাহরণ তুমি। হুমায়ুন আজাদ স্যারকে হত্যা করার পর ওরা অনেক দিন চুপ করে ছিল। কেননা তারপর অনেকদিন ওদের সাঙ্গপাঙ্গরা তোমাকে খুব করে চুষে খেতে পেরেছিল। ওদের উদর যতোদিন ভরা ছিল, ততোদিন চাপাতি নিয়ে বেরোয় নি। তারপর যখন আবার খাবারে টান পড়লো, তখনই থাবা আর নখর নিয়ে ওরা তোমার ওপর ঝাপিয়ে পড়লো। আজকাল মাসে মাসে একটা করে লাশ পড়ে। সেই লাশ কাজে লাগে ধর্মান্ধদের ভোজনবিলাসে। ওদের নিয়ে ব্যাবসা করে ক্ষমতালোভীরা। আর তুমি? সবকিছুর যাঁতাকলে যবপেষা হও।
তোমার ভিত্তিতে আজও স্বাক্ষরতার সেই শক্তি হলো না, যা ইন্টারনেটের এই যুগে মূর্খদের অসহনীয় নোংরামি দেখা থেকে তোমাকে মুক্তি দিতে পারতো। তাই আজ যারা বিশ্বের বুকে তোমাকে একটুখানি তুলে ধরে কিংবা তুলে ধরার চেষ্টা করে, তাদেরই টেনে মাটিতে নামিয়ে আনার চেষ্টা করে তোমার মূর্খ, ফঙ্গবেনে, অকর্মণ্যরা। এ যেন দোজখের প্রহরীদের নিয়ে বানানো সেই কৌতুকের মতো। বাংলাদেশ নামক দেশটির পাপী-তাপীদের যে কড়াইয়ে ভাজা হয়, সে কড়াইয়ের জন্য কোনো প্রহরী লাগে না। কেউ কড়াই বেয়ে পালানোর চেষ্টা করলে, অন্যরাই তাকে টেনে নামায়। পরের ভাল এদেশে কেউ সহ্য করতে পারে না।
কুসংস্কার? ওরে বাবা। খুব ভয়াবহ ব্যাপার। আজও এ দেশের কোটি মানুষ বিশ্বাস করে- স্ত্রী'কে শাসন করার জন্য ঘরে বেত ঝুলিয়ে রাখা একজন পরহেজগার স্বামীর অবশ্য কর্তব্য। এই শিক্ষা আজও এ দেশের ঘরে ঘরে বাচ্চারা পাচ্ছে, বুকে নিয়ে বড় হচ্ছে। তারা যখন পান থেকে চুন খসতে সেই বেত পেড়ে আনতে ছোটে, তখন আমি জানি তোমার হৃদয়ে রক্ত ঝরে। আমি জানি, এই কুসংস্কারের অন্ধকার রাজত্বে অন্ধ কাপালিকেরা যখন 'নারী হচ্ছে তেতুঁলের মতো, তেতুঁলের মতো, তেতুঁলের মতো' বলে চিৎকার করে মানুষের মনে সন্তপর্ণে বিকৃতির বীজ বোনে; তখন তোমার কেমন লাগে। এই পোড়ার দেশের নীতি-নির্ধারকেরা যখন স্বার্থলোভী অমানুষ হয়ে, সেই কাপালিককে অগ্রাহ্য করে; এবং যখন ভয় পেয়ে তার কাছে নতি স্বীকার করে, আমি জানি সে সময়গুলোতে তোমার কেমন লাগে।
আজ তোমার শিক্ষিত আর অশিক্ষিত মহলে কাপুরুষতার মাত্রা সমান। হয়তো শিক্ষিত মহলেই একটু বেশি। তাই যখন অনন্ত বিজয়কে খুন করে পালিয়ে যাওয়ার পথে খুনীরা গোটাকয় হিজড়ার হাতে ধরা পড়ে, তখন আমার নিজেরও জানো, মুখটা লুকিয়ে রাখতে ইচ্ছা করে। কি করতাম যদি আমি সেখানে থাকতাম? ভয়ে হাত-পা জমে যেতো এবং সেই খিল ছোটার আগে সবক'টা খুনী পগার পাড় হতো, তাই না? অথচ সমাজ আমাকে যতোটা স্বীকৃতি দিয়েছে, ওই সাহসী মানুষগুলোকে তার শতভাগের একভাগও দেয় নি। খুনীরা ঠিকই পালাতে পেরেছিল টিএসসি থেকে, অভিজিকে কোপানোর পর; সেখানে যে তখন হাজার কয়েক সমাজস্বীকৃত কাপুরুষ বসে পাকোড়া আর বেগুনী ভাজি খাচ্ছিল।
প্রিয় বাংলাদেশ, জানি বিকৃতি আজ আষ্টেপৃষ্টে তোমায় বেঁধে ফেলেছে নানা চেহারায়। তাই আজ নিজের বোনের ছবির দিকে এ দেশের মানুষ তাকিয়ে থাকে লোলুপ দৃষ্টিতে। মর্ষকামী হয় আর মুখে মুখে ধর্ষণ করে দিতে ছাড়ে না। প্রিয় বাংলাদেশ, তোমার ওখানে আজ আর কোনো বিকৃতির বিচার হয় না। হবে কিভাবে, যারা বিচার করবে, বিকৃতি কি তাদের ছেড়ে দিয়েছে ভেবেছো? ঘটনা দেখে তারাও মনে মনে খানিকটা পুলক নেয়ার চেষ্টা শেষে, ভদ্রলোকী মুখোশটা পড়ে নিয়েছে। তাই টিএসসি'র যৌন হয়রানি ঠেকানোর দায়িত্বে যাদের থাকার কথা, তাদের মুখ ফসকে বেরিয়ে গেছে, ওসব ছিল দুষ্ট ছেলেদের দুষ্টুমী। শুনেও আমাদের কারও শরীরে আগুন ধরে যায় নি, তুমি বিশ্বাস করতে পারো প্রিয় বাংলাদেশ? তোমার মাটি যে কতোটা ভীরুপ্রসবা হয়ে গেছে, তুমি কি টের পাও?
কথায় বলে, পশুপ্রবৃত্তি যখন চাগাড় দিয়ে ওঠে তখন মানুষের হিতাহিত জ্ঞান থাকে না। বাংলাদেশ তোমার সর্বত্র আজ পশুপ্রবৃত্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। আজ তরুণীদের মাইক্রোবাসে তুলে ধর্ষণ করে ঠিক সেভাবে রাস্তায় ফেলে দেয়া হচ্ছে, যেভাবে আস্তাকুড়ে নিক্ষেপ করা হয় খাদ্যের অবশিষ্টাংশ। আজ ছোট থেকে বড়, সকল বিষয়ে, সকল ক্ষেত্রে, মানুষ তার নিজের প্রবৃত্তি ভুলে পশুর মতো আচরণ করছে। অপরকে কষ্ট দিয়ে, ঠকিয়ে, হত্যা করে, লুন্ঠন করে, দলাই-মলাই করে নিজেরা কি যে পাওয়ার চেষ্টা করছে, তা নিজেরাও জানে না।
আমি জানি, মানুষের পৃথিবীতে একপাল পশু নিয়ে পথ চলতে তোমার কষ্ট হয়। তবে তুমি দুঃখ করো না প্রিয় বাংলাদেশ। এ দায় তোমার নয়। এ দায় তাদের, যারা বিবেক-বুদ্ধির ঘরে খিল-নাড়া তুলে নিজেদের নিচের দিকে টেনে নামিয়েছে। তাদের, যারা অধঃপতিত মানুষদের টেনে তোলার দায়িত্ব নিয়ে ব্যর্থ হয়েছে। তাদের, যারা তোমার দেয়া সব সুবিধা ভোগ করে, পিছিয়ে পড়াদের পিঠ দেখিয়েছে।
তুমি একসময় বীরপ্রসবাই ছিলে প্রিয় দেশ আমার, কালে কালে সেসব অতীতের গর্ভে হারিয়ে গেছে। আজ কিছু কালো কালো, অস্থিসার, লোভী, মানুষরূপী জন্তুবিশেষ ছাড়া আর কিছু জন্মায় না। তোমার এককালের বীরেরা এবং তাদের বীর্যজাত পরের দুই বা তিন প্রজন্মের প্রতিনিধিরাই নিজেদের এভাবে বিবর্তিত করে নিয়েছে। তুমি কষ্ট পেও না। আমি জানি, তোমার কিছুই করার ছিল না।
---





আমি জানি, মানুষের পৃথিবীতে একপাল পশু নিয়ে পথ চলতে তোমার কষ্ট হয়। তবে তুমি দুঃখ করো না প্রিয় বাংলাদেশ। এ দায় তোমার নয়।
শুধুই দীর্ঘশ্বাস
মন্তব্য করুন