যে সমাজে আমাদের কোনো ঠাঁই থাকবে না
অভ্যন্তরীণ ব্যাপার-স্যাপার সংক্রান্ত ধারণাটা আমি বস্তুত ঠিকঠাকমতো বুঝি না। আমার মনে হয় গণমানুষের অভ্যন্তরটা ঠিক ততোটা গভীর না, যতোটা আমরা শিশুকালে মনে করতাম। কামিনী রায় কি তবে একসময় ভুল ধারণা দিয়েছিলেন? "আপনারে লয়ে বিব্রত রহিতে, আসে নাই কেহ অবনী' পরে"- কি শুধুই কথার কথা? আমি তো দেখি, মানুষ কেবলই স্বার্থ খোঁজে। বিভিন্ন মাত্রায়। সবচেয়ে কম স্বার্থপর যে মানুষ সেও নিজের স্বার্থ খোঁজে, তার প্রিয়জনদের ভেতর।
ঝড়ের গতিতে কাটছে সময়। দিনগুলো ফুরিয়ে যায় চিপসের প্যাকেটের মতো। একরাশ দ্বিধা-দন্দ্ব ছড়িয়ে। সপ্তাহগুলো আকার পাচ্ছে ধাবমান রেলগাড়ির। মাসগুলো যেন চলমান মহাকাশযান। ছুটছে প্রবল গতিতে কিন্তু তাকালে বোঝা যায় না। শীত চলে গিয়ে এখন বসন্ত এসেছে। গাছে গাছে ফুটে আছে বিষাদের ফুল। গাছেরা কি বলতে চায়? ওরা কি বসন্ত চায় নাকি এখনও প্রস্তুত নয়? কার অপেক্ষায় ওদের এই মুখ ফিরিয়ে থাকা?
আমি মানুষের মনের ক্লেদ দেখতে দেখতে ক্লান্ত। ভীষণ। এই পৃথিবী আর বাসযোগ্য নেই মানুষের জন্য। সে কারণেই একটাও এমন জায়গা খুঁজে পাওয়া সম্ভব না, যেখানে গিয়ে খুঁজে পাওয়া সম্ভব সত্যিকারের নির্জনতা। তবে আমি গন্তব্য খোঁজার কাজ এখনও চালিয়ে যাচ্ছি। গন্তব্য, যেখানে সমাহিত হতে চাই। বসফরাস প্রণালী খারাপ না এক হিসেবে। প্রিন্সেস লো'র ইতিহাস জড়িয়ে আছে। জড়িয়ে আছে জিউসের প্রতারণার গল্পও। আর রোমান-অটোমানদের নিষ্ঠুরতা তো আছেই। আছে তুর্কীদের মানসিক আনাগোনাও।
জাতি হিসেবে ওরা নিজেদের প্রমাণ করেছে বহু আগেই, তবে সেটা এক অর্থে ভীষণ ক্ষতিকর। একবার তুমি নিজেকে প্রমাণ করে দিতে পারলেই, অহংকার প্রবলভাবে তোমার ভেতর ঢুকে পড়ার চেষ্টা শুরু করে। সেটা যদি ওভারকাম করতে না পারো, তাহলে নিজেকে প্রমাণের চেষ্টায় ব্যস্ত না হওয়াই ভাল। কবিগুরুর অনেকগুলো কথা আছে প্রায় একই রকম। মনে আছে, একবার তিনি বলেছিলেন- "তোমার পতাকা যারে দাও, তারে বহিবারে দাও শক্তি"। কেন বলেছিলেন এ কথাটা তিনি?
আমরা কি সবাই আসলে একটা বিরাট ধ্বংসযজ্ঞের আয়োজন করছি মাত্র? আমাদের সবার জন্য? যুদ্ধ-হানাহানি-হিংসা-বিদ্বেষ আর ইগো আমাদেরকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে? সেখান থেকে ফেরার উপায় কি? পৃথিবীতে এক সময় আসলেই ইনকম্পিটেন্টদের আর কোনো জায়গা থাকবে না। জার্মানরা যেভাবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নিজেদের খোঁড়া, কানা, ত্রুটিপূর্ণ নাগরিকদের হত্যা করে, আজ একটা প্রায় পারফেক্ট হিউম্যান স্পিসিস্ তৈরি করেছে, সেভাবে এক সময় আমরা সবাই পিছিয়ে পড়াদের বাদ দিয়ে এক নতুন সমাজ গড়বো। সে সমাজ হবে মারামারি-কাড়াকাড়ি-ঝগড়াঝাটি মুক্ত, সে সমাজে সবার মুখে থাকবে হাসি, সে সমাজে সবাই সবাইকে দেখে সকালে বলবে গুড মর্ণিং এবং হাসবে; কিন্তু সে সমাজ হবে রক্তের ইতিহাসে রঞ্জিত, সে সমাজের কেউ কারও জন্য ভালবাসা, মায়া, মমতা কিংবা নিদেনপক্ষে সফট্ কর্ণারটুকুও অনুভব করবে না।
সে সমাজে আমাদের কোনো ঠাঁই থাকবে না প্রিয়, তুমি কি জানো?
---





মন্তব্য করুন