ইউজার লগইন

সন্ধ্যাবাতি জ্বলছে কোথাও টিমটিমে

১.

''আমাদের সময় আসবে একদিন
এবং আমরা পাবো সবকিছু...''

শোনার ফাঁকে ফাঁকে এরফুর্টের রংধনু শিশুনিকেতনের মেঝে ফিনাইল মেশানো পানি দিয়ে পরিস্কার করতে করতে ভাবি- গানটা গাওয়ার সময় এমি কি সত্যিই বিশ্বাস থেকে গাইছিল, নাকি শুধুই দায়িত্ব পালন করছিল? যদি দায়িত্ব পালনেও সীমিত থেকে থাকে, তাও সে সেটা এত ভালভাবে পালন করেছে যে, ভক্তদের সামনে একটা চিরকেলে চূড়ান্ত মাত্রার দ্বিধান্বিত পথ ছাড়া আর কিছু খোলা থাকতে পারে নি। সবকিছুকে বন্ধ হয়ে যেতে হয়েছে প্রবলভাবে।

বাচ্চাদের স্কুলে কাজ করার মজা হচ্ছে, অদ্ভুত সব জিনিসপাতির দেখা মেলে। বিশ্বপরিচিতির ম্যাপ, বর্ণমালার বই, ডিভিডি র‍্যাক ভর্তি মিয়াজাকির বিশাল কালেকশন, আর হরেক রকমের খেলনা তো আছেই। কাঠের ঘোড়া, সোনালী চুলের পুতুল, নানা সাইজের পাজল বোর্ড, ট্রেনের সেট, ফায়ার ব্রিগেডের গাড়ি, স্পোটর্সকার, লাইটসেবার; আমি যদি ছোটবেলায় ওই স্কুলটায় পড়তাম, তাহলে রাতে নির্ঘাত বাসায় যেতাম না, স্কুলেই থেকে যেতাম। সকালে ঘুম থেকে উঠে স্কুলের বাথরুমে দাঁত মেজে ক্লাসে আসতাম।

২.

সেদিন দেখি এক পিচ্চির ক্লজেটের দরজা ঠিকমতো লাগে নি। তাড়াহুড়োয় সেভাবেই রেখে চলে গেছে। দরজাটা ঠিকমতো লাগাতে গিয়ে টুপ করে বের হয়ে আসলো ক্যাপ্টেন রেক্স। পুরোদস্তুর ক্লোনট্রুপারের বেশে। হেলমেটে টালি কাটা দাগগুলো পর্যন্ত ঠিক ঠিক জায়গায় আছে। জানতে চাইলো, মাস্টার এনাকিন, আপনার কি কিছু লাগবে? বললাম, নোপ। থ্যাংকিউ রেক্স। আর সঙ্গে সঙ্গেই আবার টুপ করে ক্লজেটে ঢুকে গেল সে।

আমি যখন স্কুলটায় ঢুকি, তখন প্রায় ছুটি হয়ে যায় সবকিছু। ছানাপোনাগুলো শেষবারের মতো দোল খেয়ে নিতে থাকে প্লে-গ্রাউন্ডে, যাতে পরদিন আবার ফিরে আসার আগ পর্যন্ত কাজ চলে যায়; আর আমি কোনোদিকে না তাকিয়ে কানের হেডফোনে এমির তীব্র অাকাঙ্ক্ষা শুনতে শুনতে চাবি ঘুরিয়ে স্কুলভবনের সদর দরজা খুলি।

প্রথম কাজটা হচ্ছে, স্টাফরুমে ঢুকে রুকস্যাকটা পিঠ থেকে নামিয়ে, ক্লিনিং-এর ট্রলিটা ঠিকঠাকমতো চেক করে নেয়া। ওটা প্রায় সময় গোছানোই থাকে। প্রতিদিন কাজ শেষে ওটাকে পরের দিনের জন্য গুছিয়ে রেখেই বের হই আমি। সেদিনের ব্যবহৃত ন্যাকড়াগুলো আলাদা করে রেখে যাই। গ্লাভস, পলিথিনের মতো জরুরি জিনিসগুলো পর্যাপ্ত পরিমাণে আছে কি না চেক করি। আর ফেলে দিয়ে যাই বালতির ময়লা পানি।

৩.

তারপর চাবি ঘুরিয়ে সদর দরজার তালা লাগিয়ে রাস্তায় নেমে পড়ি। কখনও কখনও স্কুলের কাজ শেষে রাস্তায় বের হয়ে খুব অবাক হয়ে খেয়াল করি, এমি গাইছে- "শক্তি ফুরিয়ে এসেছে প্রায় আমার, এগিয়ে চলছি নৈঃশব্দের রাজ্যে..."। আমি কাকতালীয় বিষয়ে আজকাল আর অবাক হই না। ছোটখাটো ম্যাজিক্যাল ঘটনা আমাদের চারপাশে ক্রমাগতই ঘটছে। ম্যাজিজুওলজিস্ট নিউট স্কামান্ডারকে সেই ১৯২৬-এই নিউ ইয়র্কের রাস্তায় ম্যাজিক্যাল ক্রিয়েচারদেরকে ঢিট করতে হয়েছিল। এ বছর নিউট স্কামান্ডারের কাহিনী নিয়ে সিনেমা বানানো হয়েছে। ফ্যান্টাসটিক বিস্টস্ অ্যান্ড হয়ার টু ফাইন্ড দেম।

তারপর হেঁটে হেঁটে এগিয়ে চলা, ট্রাম ধরার উদ্দেশ্যে। ছোট্ট একটা যাত্রী ছাউনি, একটা টিকেট কাটার মেশিন আর ছাউনি থেকে একটু দূরে হয়তো একটা মাল্টিপারপাস বিন, যাতে সিগারেটের ছাই, কফির মগ, বিয়ারের ক্যান, ম্যাকডনাল্ডসের প্যাকেট- সবই ফেলা যায় চাইলে। ট্রামস্টপ। এখান থেকে যেতে হবে এরফুর্ট হপ্টবানহফে। ট্রাম স্টপগুলোতে সব সময়ই অল্প-বিস্তর মানুষ থাকে। ইলমিনাউ রোডা নামের যে ট্রেন স্টেশনটা আমাদের শহরে আছে, সেটায় কখনো যাত্রী ছাড়া একজনও অতিরিক্ত মানুষ দেখা যায় না।

বাসায় ফিরে কি করবো, সেটা ভাবতে বসলে অনুভব করি, ওটা আমার ইদানীংকার প্রিয় ভাবনাগুলোর একটা। যতো বোরিংই হোক, ওটা আমি ভাবতে পছন্দ করি, যখন আমি ঘরে ফিরি। তবে মাঝে মাঝে জীবন নিয়েও ভাবি।

৪.

সেদিন ভাবছিলাম ছেলেবেলায় দেখা একটা স্বপ্নর কথা। আব্বু একবার প্রতি সপ্তাহে একটা বিদেশি সাপ্তাহিক নিয়ে আসা শুরু করলো বাসায়। আমার জন্য। অবাকই লাগতো। অনেক মাস পর্যন্ত নিয়মটা বাসায় বহাল ছিল। আমার ইংরেজি পত্রিকা পড়ার প্রতি খুব বেশি আগ্রহ কখনোই ছিল না। তবে পত্রিকাটার পাতা উল্টাতে ভাল লাগতো। ক্রেডিটের পাতায় গিয়ে সম্পাদক, উপ-সম্পাদক, রিপোর্টার, সাব-এডিটর এবং অন্যদের নামগুলো পড়তে ভাল লাগতো। তাদের কাজের ডেস্কগুলো কেমন, অফিসের পরিবেশটা কেমন, ব্রেইনস্টর্মিংয়ের সময় কে কি রকম অদ্ভুত আচরণ করে, সেসব ভাবতে ভাল লাগতো। একদিন মনে হলো, আমি তাদের সাথে অফিস করছি। পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ছুটে বেড়াচ্ছি অ্যাসাইনমেন্ট নিয়ে। মানুষের দুঃখা, দুর্দশা, আর দুর্ভোগের ছবি তুলে নিয়ে আসছি পাঠকের জন্য। পাঠক পড়ে দুঃখিত হচ্ছে; দুর্ভাগ্যপীড়িতদের জন্য কিছু করতে উদ্যোগী হচ্ছে, এভাবে সবাই মিলে পৃথিবীর ছোট ছোট সমস্যাগুলো সমাধান করতে করতে এগিয়ে যাচ্ছি একটা সামষ্টিক উন্নতির পথে। একটা এমন সময়ের পানে, যেখানে নেই কোনো ভেদাভেদ কালোতে-সাদাতে, কিংবা ধনীতে-গরীবে। এটা শুধু একটা দিনের কথা লিখলাম। এ রকমের স্বপ্নে ডুব দিয়ে গভীর একেকটা দুপুর পার হতো জীবনে একসময়। বারান্দার রেলিংয়ে শুকাতে দেয়া এক শাড়ি নীল রং এর মতো টানা দুপুর।

পরের দিন স্বপ্নটার কথা বলতাম সেই মেয়েটিকে। যে ইউনিভার্সিটির ক্লাস শেষে প্রতিদিন কলাভবনের কমনরুমে বসে আমার জন্য অপেক্ষা করতো। আমি ক্লাস, পত্রিকার কাজ কিংবা অন্য যেকোন ব্যস্ততা সেরে, তার সাথে দেখা করতে যেতাম। কমনরুমের সামনেই করিডরের দেয়ালে গিয়ে বসতাম। ওকে বললে কমনরুমের ভেতর থেকে চা নিয়ে আসতো। আমরা দু'জন এক কাপ চা আর একটা সিগারেট ভাগাভাগি করে পান করতাম। আমি হয়তো পা সামনের দিকে লম্বা করে আর পিলারে হেলান দিয়ে ওই করিডরের দেয়ালটায় রিলাক্স মোডে বসে থাকতাম আর সে আমার গায়েই হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতো। একজন আরেকজনকে সেভাবেই আমরা ছুঁয়ে থাকতাম অনকেক্ষণ পর্যন্ত। আগের দুপুরে দেখা স্বপ্নটার কথা শুনে আমার চেয়ে বেশি খুশি হতো সেই মেয়েটি।

৫.

একসময় ট্রাম পৌঁছে যায় হপ্টবানহফে। ইলমিনাউয়ের ট্রেনটা সোম থেকে শুক্রবার পর্যন্ত ছাড়ে সাত নং প্ল্যাটফর্ম থেকে। শনি আর রোববার ছাড়ে এইট-এ থেকে। প্রতি ঘন্টায় একটা করে। বিজোড় সংখ্যক ঘন্টাসংখ্যার সাথে ৪৪ মিনিট, আর জোড় সংখ্যক ঘন্টাসংখ্যার সাথে ৪৬ মিনিট যোগ করে। স্টেশনে পা দিতেই দেখা হয়ে যায় প্রতিবেশি সুবহান, সাইফ, কিংবা বন্ধু মেজর বা ফ্যাবিয়ানের সাথে। কারো না কারো সাথে দেখা হয়েই যায়।

প্রায় ভুলেই যাই- কি ভাবছিলাম স্কুল থেকে বের হয়ে স্টেশন পর্যন্ত আসার পথটুকুর আড়ালে।

---

পোস্টটি ১৪ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

নিভৃত স্বপ্নচারী's picture


চমৎকার লাগলো স্মৃতিচারণ।

মীর's picture


থ্যাংকস্ নিভৃতদা'। লেখালেখিটা চাইলেও ছাড়তে পারি না।

বিষণ্ণ বাউন্ডুলে's picture


ইস্কুলে কি করা হয় আজকাল?

মীর's picture


ঝাড়পোছ, ধোয়ামোছা Big smile

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

মীর's picture

নিজের সম্পর্কে

স্বাগতম। আমার নাম মীর রাকীব-উন-নবী। জীবিকার তাগিদে পরবাসী। মাঝে মাঝে টুকটাক গল্প-কবিতা-আত্মজীবনী ইত্যাদি লিখি। সেসব প্রধানত এই ব্লগেই প্রকাশ করে থাকি। এই ব্লগে আমার সব লেখার কপিরাইট আমার নিজেরই। অনুগ্রহ করে সূ্ত্র উল্লেখ না করে লেখাগুলো কেউ ব্যবহার করবেন না। যেকোন যোগাযোগের জন্য ই-মেইল করুন: bd.mir13@gmail.com.
ধন্যবাদ। হ্যাপি রিডিং!