আজ বহুদিন নতুন কোনো স্বপ্ন দেখি না
লাইপছিশ জার্মানীর সাক্সনী প্রদেশের সবচেয়ে বড় শহর। অতুলনীয় যোগাযোগ ব্যবস্থা আর তরুণ প্রজন্মের জন্য অবারিত কাজের সুযোগ এ শহরের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য বললে অত্যুক্তি হয় না। জনসংখ্যা অর্ধ-মিলিয়ন, যার বেশিরভাগই আবার বয়সে তরুণ। আমার এ শহরে আসার প্রায় দুই সপ্তাহ পার হতে চললো। এ পর্যন্ত যতো বুড়ো-বুড়ি চোখে পড়েছে তা মনে মনে গুণে ফেলা সম্ভব। এই বিষয়টাই থুরিনজিয়া প্রদেশের ছোট্ট শহর ইলমিনাউয়ের সাথে লাইপছিশের গুণগত পার্থক্য তৈরি করে দিয়েছে। ইলমিনাউ যেখানে সন্ধ্যা সাতটার পর ধীরে ধীরে নিশুতিযাপনের জন্য প্রস্তুত হতে থাকে, সেখানে লাইপছিশে জীবনের সৌন্দর্যটাই ধরা দেয়া সন্ধ্যা নামার পর।
যদিও এখন সন্ধ্যা হয় সাড়ে চারটায়, তবে অলি-গলি, রাজপথে মানুষের হৈ-হুল্লোড় শুরু হয় আরেকটু পর থেকে। পাঁচটা-ছয়টা, যখন সাধারণ অফিস-অাদালত ভাঙতে শুরু হয়, তখন থেকে দেখা যায় চারিদিকে প্রাণের ছড়াছড়ি। ভালই লাগে যখন দেখি দলবেঁধে উঠতি বয়েসীরা স্কেট-বোর্ডে চেপে রাস্তা, কিংবা ঠোঁটে ঠোঁট বেঁধে চলন্ত সিঁড়ি পাড়ি দেয়। বখাটের দল আছে সব জায়গাতেই। গলির মুখে জটলা বেঁধে বিয়ারের বোতলে চুমুক দেয়া, নানা স্বাদের হ্যাম-পেপারে গাঁজা পুরে গাল ভর্তি ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে অশ্লীল বাক্যের তুবড়ি ছোটানো- দৃশ্য হিসেবে এ শহরে খুব একটা বিরল কিছু না। আরও আছে প্রচুর গৃহহারা 'হোবো'। ওদের সবার ঝোলায় থাকে একটা করে পানির বোতল। নীল রংয়ের লেবেল দেখলেই বোঝা যায় ওটা কার্বোনেটেড পানি। হোবোরা কেন যে শুধু কার্বোনেটেড পানিই পান করে, বুঝি না। প্রথম দিকে আমি স্পার্কলড্ ওয়াটারের খুব একটা ভক্ত ছিলাম না কিন্তু এখন ভালই লাগে। পয়সা দিয়ে কিনে পান করার সামর্থ্য নেই। তবে আমি যেখানে কাজ করি সেখান থেকে ফ্রি পাওয়া যায়। দিনে যতো বোতল পানি পান করি, তার অর্ধেক সম্ভবত কার্বোনেটেড।
এই শহরের এসেছি মূলত পেটের ধান্ধায়। আমাজন-এ ক্রিসমাস্ সিজনে কাজের চাপ বেড়ে যায় প্রায় দশগুণ। চাপ সামলাতে ওরা প্রতি বছরই নভেম্বর-ডিসেম্বর মাস দু'টোর জন্য প্রচুর সংখ্যক ছুটা বুয়া টাইপ লোক নিয়োগ দেয়। বেতন খারাপ না। ঘন্টায় দশ ইউরো। সঙ্গে আছে ওভারটাইম করার সুযোগ। গত বছর ওয়ার্ক পারমিট ছিল না বলে কাজটা পেয়েও করতে পারি নি। এ বছর সেই সমস্যা ছিল না। অক্টোবরের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাগতদের মেন্টরিং করে, এক সকালে ব্যাগ গুছিয়ে উঠে পড়েছিলাম লাইপছিশের ট্রেনে। থুরিনজিয়া প্রদেশের ভেতর ইলমিনাউ বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শিক্ষার্থীর জন্য ট্রেন যাতায়াত কস্ট-ফ্রি, জার্মান ভাষায় বলে কোস্টেনলোস্। থুরিনজিয়া পার হয়ে সাক্সনীতে পড়লেই ভাড়া গোণা শুরু হয়। ট্রেনের ভাড়া সংক্রান্ত সব হিসেব করে দেখা গেল, টিকেটের দাম পড়ে ১৩ ইউরো। টিকেট কাউন্টারে বসা বুড়িকে এক গাল হাসি দিয়ে বলেছিলাম, আমার তো স্টুডেন্ট আইডি। দ্যাখো না, যদি কিছুটা ডিসকাউন্ট দেয়া যায়।
খালি কথায় চিড়ে ভেজে না, কথাটা বোধহয় সব জায়গায় প্রযোজ্য না। বুড়ি ঠিকই খুঁজে পেতে এক বিশাল ডিসকাউন্ট বের করে দিলো। ১৩ ইউরোর ট্রেন টিকেট এবং তারপরের চার-পাঁচ ইউরোর বাস-ট্রাম সব এক টিকেটে এঁটে গেল মাত্র ছয় ইউরোতে। আমাকে আর পায় কে। কাউন্টার ডিঙিয়ে বুড়ির গালে ছোট্ট একটা চুমু দিয়ে ব্যাকপ্যাকটা কোনমতে পিঠে ফেলেই দৌড়। ট্রেন ছাড়ার বাকি মাত্র পাঁচ মিনিট। এর মধ্যে প্ল্যাটফর্ম খুঁজে বের করতে হবে, যেটা মোটেই সহজ না, বিশেষ করে বড় স্টেশনগুলোতে। পেছনে বুড়ির হাসির শব্দ আর শুভাশীষ পড়ে রইলো। বলে গেলাম আরেকদিন এসে তোমার সাথে কফি খেয়ে যাবো, ভালো থেকো।
ট্রেনে উঠে একটু দুশ্চিন্তা লাগছিল। মাঝখানে এক জায়গায় ট্রেন পাল্টাতে হবে। যথারীতি সেখানে আবারও প্লাটফর্ম খুঁজে বের করার ঝামেলা আছে। প্লাটফর্মের নাম্বার দেখেই বুঝতে পারছিলাম কাজটা সহজ হবে না। প্লাটফর্ম নাম্বারগুলো দেখে স্টেশনের আকার আন্দাজ করা যায় সহজেই। ছোট সংখ্যা মানে ছোট স্টেশন, বড় সংখ্যা মানে বড় ঝামেলা। চলন্ত সিড়ি বেয়ে নিচে নেমে খুঁজে দেখতে হয় কোন সিঁড়ি উপরে ঠিক আমার ট্রেনের কাছেই নিয়ে যাবে আমাকে। সিঁড়ি ভুল করলে ট্রেন মিস্ করার সম্ভাবনা তো আছেই। তখন ঠান্ডায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হয় পরের ট্রেনের জন্য। যেটা কেউই চায় না। আমার টিকেট বলছিল, নয় নাম্বার প্লাটফর্মে নেমে আমাকে যেতে হবে ২৩ নাম্বার প্লাটফর্মে।
সমস্যার সমাধান করে দিলেন আরেক বুড়ি। তিনি ছিলেন টিকেট চেকার। আমার আইডি কার্ড হাতে নিয়েই চোখ কুচকে নানান প্রশ্ন করা শুরু করে দিয়েছিলেন প্রথমে। যেন আমি ভূয়া আইডি নিয়ে ঘোরাফেরা করছি। কারণ আছে অবশ্য। আইডিতে দেয়া ছবিটা তোলা বাংলাদেশে। যখন গালের চর্বি বাড়তে বাড়তে কুমড়োর আকার দিয়ে দিয়েছিল পুরো মুখটাকে। আর চুলগুলো কাটা ছিল আর্মিদের মতো করে। জার্মান দেশের আলো-হাওয়াকে মানুষের স্বাস্থ্য মোটাতাজাকরণেই বেশি ভূমিকা রাখতে দেখেছি। তবে ব্যতিক্রমও আছে। যেমন আমি নিজেই। দুই বছরে ওজন কমেছে প্রায় ১০ কিলো। কুমড়ো আকৃতির মুখমন্ডল পেয়েছে পেঁপের শেইপ। চুল লম্বাকরণ প্রকল্প মাঝামাঝি পর্যায়ে বলে, সেখানেও বিশাল অমিল আইডি কার্ডের ছবির সাথে। বুড়ির দোষ দেয়া যায় না।
আইডি কার্ডের জন্য ছবিটা তোলার সময় হাসি হাসি মুখ করে বসে ছিলাম কেন, আজ আর মনে নেই। তবে সেই হাসিটাই সমাধান করে দিলো ছবি সংক্রান্ত সংকটের। বুড়িকে যখন বোঝাচ্ছিলাম ছবির মানুষটা আমিই, তখনও চেষ্টা করছিলাম মুখে হাসি ধরে রাখতে। তাই দেখে বুড়ি বললো, ছবির ছেলেটা আর তোমার মধ্যে মিল একটাই। তোমাদের দু'জনেরই হাসলে গালে টোল পড়ে।
উপরওয়ালা আমার পার্টসপত্র ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের সময় খুব বেশি ইন্টারেস্টিং ফিচার যোগ করার সময় পেয়েছিলেন বলে মনে হয় না। যা দু'একটা যোগ করেছিলেন, তার মধ্যে গালের টোল একটা। জিনিসটার প্রশংসা শুনে এসেছি আজীবন, যদিও জানি না ওটা কি কাজে লাগে। তারপরও বুড়ির কথা শুনে দুই পাশে দন্তরাশি বিস্তার করে দিলাম, যতদূর পারা যায়। এবার বুড়ির মুখেও হাসি ফুটলো। টিকেট আর আইডি কার্ড ফিরিয়ে দিয়ে জানতে চাইলো, লাইপছিশে কেন যাচ্ছি। জানালাম, আমাজনে কাজ করতে। শুনে উনি খুশি হলেন আরও। জানালেন, আজকাল মানুষের মধ্যে আলস্য বেড়ে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। কেউ কাজ করতে চায় না। সরকারী সাহায্য কর্মসূচির মধ্যে কোনোভাবে একবার ঢুকে পড়তে পারলেই যেন সবার জীবনের সব লক্ষ্য পূর্ণ হয়ে গেল! এটা কোনো জীবন হলো? আমি ডানে-বামে মাথা নাড়ালাম। মোটেও না। এটা কোনো জীবনই হলো না। কত লক্ষ জনম ঘুরে ঘুরে আমরা পেয়েছি ভাই মানবজনম, এ জনম চলে গেলো আর পাবো না। তাই হৃদমাঝারে রাখিবো, যেতে দেবো না।
এই বুড়ি বলে দিলেন, টিকেটে যেখানে ট্রেন পাল্টানোর কথা বলা আছে তার এক স্টেশন আগে নেমে পরের ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করতে। তাহলে আর প্লাটফর্ম পাল্টানোর ঝক্কি পোহাতে হবে না। প্রথম বুঝি নি ব্যাপারটা কি, তাই দ্বিতীয়বার জিজ্ঞেস করতো হলো, মানে? বুড়ি বুঝিয়ে দিল, ট্রেন পাল্টে পরে যেটায় উঠতে হবে সেটা ছাড়ে এক স্টেশন আগে থেকে, এবং সেই স্টেশনে প্লাটফর্ম একটাই। তাই এক স্টেশন আগে ট্রেনটা পাল্টে ফেললে, দৌড়াদৌড়ি কমে যায় অনেক-গুণে। এই বুড়িকেও একটা শক্ত চুমু দিয়ে দিবো কিনা ভাবছিলাম, তবে ততক্ষণে তিনি পরের জনের দিকে তাকিয়ে টিকেটের জন্য হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন দেখে সেই ভাবনায় যতিচিহ্ন টানতে হলো। একটা ধন্যবাদ আর দিনের বাকি সময়টার জন্য শুভকামনা জানিয়ে আমি মনোযোগ দিলাম হাতের বইটাতে। আনর্স্ট ক্লাইনের রেডি প্লেয়ার ওয়ান। লেখকের মতো সুবিশাল গীক টিভি নাটকের চরিত্রগুলোতেই কেবল দেখা যায়। আশি-নব্বুই-শূন্য দশকের যত নার্ডি কাজ-কারবার হয়েছে আমেরিকার পপ-কালচারে সব গুলে এক বিরাট সায়েন্স-ফিকশান ক্যাপসুল তৈরি করেছেন তিনি। তারপর সেটাকে বই আকারে ছাপিয়ে বাজারে ছেড়ে দিয়েছেন। কোনমতে একবার সেই ক্যাপসুল গিলে ফেললে, শেষ না করা পর্যন্ত গতি নেই।
লাইপছিশে নেমে ভিমড়ি খেতে হয় নি একটুও। জানতাম ট্রাম-স্টেশনটা ট্রেন-স্টেশনের মূল ফটকের সামনেই। সেখানে গিয়ে দেখলাম আমার ট্রাম আসতে সময় বাকি পাঁচ মিনিট। দ্রুত হাতে একটা সিগারেট রোল করে ধরিয়ে দিলাম। অনেকক্ষণ মস্তিষ্কে নিকোটিনের ধোঁয়া দেয়া হয় নি। সিগারেট ধরালে আমার প্রত্যেকবার সেই মেয়েটির কথা মনে পড়ে। যার সাথে এক সময় জীবনের কয়েক হাজার সিগারেট ভাগ করে টেনেছি। অন্তত ৮৫ শতাংশ সময়ে সিগারেটটা ধরে থাকতে হতো আমাকেই। সে নিজের হাতে কেন যে সিগারেট টানতে চাইতো না, আমি কখনোই বুঝতে পারি নি। পৃথিবীতে কত বিচিত্র রকমের মানুষ যে আছে। কেউ কেউ সারাক্ষণ বয়ফ্রেন্ডের হাত ধরে থেকে ভালবাসা প্রকাশ করে, কেউ কেউ লেপ্টে থাকে একে-অপরের সাথে তাবত পৃথিবীকে অগ্রাহ্য করে, কেউ কেউ দুনিয়ার সবখানে সব মানুষের সামনে চুমু দিয়ে জানায় ভালবাসা, কেউ কেউ সারাক্ষণ কানেক্টেড হয়ে থাকে টেলিফোনে; আর সেই মেয়েটি কিছু করতো না, শুধু ধূমপান করতো আমার হাত থেকে। এমনও হয়েছে, বন্ধু-বান্ধবে ভরা মজলিসে আড্ডা চলছে, এর মধ্যে আমি সিগারেট ধরিয়ে বাড়িয়ে দিচ্ছি ওর ঠোঁটের দিকে।
পুরোনো ভাবনাগুলোকে পাশে সরিয়ে দিতে ট্রামটা এসে হাজির হলো যথাসময়েই। কোন স্টেশনে নামতে হবে, জানা না থাকার কথা ছিল না। পরের বাসের নাম্বার, আর কোথায় সেটার দেখা পাওয়া যাবে, জানা ছিল তাও। অল্প সময়ের ব্যবধানে এক সময় পৌঁছে গেলাম গন্তব্যেও।
বাড়িওয়ালাকে ফোন করতেই শুনি দাঁড়ানো চীনে ছেলেটার পকেটে রিংটোন বাজছে। সে ফোন বের না করেই, আমার দিকে তাকিয়ে জানতে চাইলো, বিস্ট ডু মীর? আমি এবারে উপর-নিচ মাথা নাড়লাম। সে কোনো কথা না বলে আমার লাগেজটা হ্যাঁচকা টানে উঠিয়ে নিয়ে বললো, ফলো মী।
আমার মনে পড়লো, যে ওয়েবসাইট থেকে বাসাটা ভাড়া নিয়েছিলাম সেখানে বাড়িওয়ালার চেহারাটা পরিস্কার ছিল না, কিন্তু একটু চীনে ভাব ছিল। তার মানে এই ছেলেটাই আমার বাড়িওয়ালা। হাঁটা পথ ছিল মাত্র এক মিনিটের। এর মধ্যে সে আমাকে নিজের পরিচয় দিল। আমার অনুমানও সঠিক বলে প্রমাণিত হল।
বাসাটা প্রথম দেখাতেই পছন্দ হয়ে গেল, কারণ আর কিছু না; দেয়ালে সাঁটানো এক সুবিশাল সোমব্রেরো। মেক্সিকো আর ইউএসএ'র দক্ষিণ-পশ্চিমে অমন বিশাল আকারের সোমব্রেরো হ্যাটের প্রচলন আছে জানতাম, জার্মানীতে এর আগে কোথাও দেখি নি। বাড়িওয়ালা জানালো, ওটা ওর মেক্সিকো ভ্রমণের স্মৃতিচিহ্ন। বোঝা গেল ছেলেটার সাথে বন্ধুত্ব হতে খুব বেশি সময় লাগবে না। ভ্রমণ আমারও বিষয় হিসেবে অত্যন্ত প্রিয়।
পরদিন ভোর সাড়ে পাঁচটায় উঠতে হবে ঘুম থেকে। বাসা থেকে আমাজনে যেতে সময় লাগে পৌনে এক ঘন্টা। আর আমার ঘুম থেকে ওঠার পর রেডি হতে লাগে ১৫ মিনিট। কাজ শুরু হবে ভোর সাড়ে ছয়টা থেকে। ছেলেটাকে বলতেই, সে তড়িঘড়ি নিজের রুমে ছুটে গেল। কয়েক সেকেন্ড পরেই বের হয়ে এলো এক প্লেট নুডুলস আর একটা চীনে সসের বোতল নিয়ে। এগিয়ে দিয়ে বললো, তোমার জন্য। আমি আরও একবার অভিভূত হলাম। কেননা নুডুলস স্বাদে-গন্ধে অনন্য ছিল। খেয়ে-দেয়ে, উইকেন্ডে আমরা খুব করে ঘুরবো প্রমিজ করে দরজা লাগিয়ে শুয়ে পড়লাম।
নতুন জায়গায় প্রথম রাতে আমার কখনোই ঘুম আসে না। জানতাম সেই রাতেও আসবে না। আর ঘুম না এলে যা হয়, নিজের জীবনের রি-ক্যাপ চলতে শুরু করে চোখের সামনে। যথারীতি তাই হলো।
এক পয়লা ফাল্গুনের বিকেলে সেই মেয়েটি আর আমি কার্জনের কম্পিউটার ল্যাবের বারান্দায় বসে খুনসুটি করছিলাম। মেয়েটি হলুদ শাড়ি আর লাল ব্লাউজ পড়ে ছিল, আর আমি লাল পাঞ্জাবী আর শাদা পায়জামা। পয়লা ফাল্গুনের আমেজেই ছিলাম আমরা, কিন্তু পাশাপাশি একটা ছোট্ট দুশ্চিন্তাও আমাদের মাথায় বাজছিল। তখন আমি একটা কেবল চালু হওয়া অনলাইন নিউজ এজেন্সীতে জুনিয়র রিপোর্টার হিসেবে কাজ করি। বেতনের টাকায় নিজেরই চলে না ঠিকমতো। মাস্টার্স পরীক্ষা দিয়ে বসে আছি রেজাল্টের অপেক্ষায়। ও তখনও চাকুরী খোঁজা শুরু করে নি। কেননা আমার ভাল কিছু না হওয়া পর্যন্ত ও চাকুরী নিতে চায় না। নিলে আমার সম্পর্কটার ভবিষ্যতে যে যোগ হয়ে যাবে আরও খানিকটা অনিশ্চয়তা। বাংলাদেশে একটা ছেলে আর একটা মেয়ে যখন কোনো একটা কমিটেড সম্পর্কে আবদ্ধ হয়, তখন অবধারিতভাবে যেসব দুশ্চিন্ত মাথায় চলে আসে, সেসবের একটা আরকি। আমরা সেটা নিয়ে প্রচণ্ড চিন্তিত ছিলাম না কিন্তু ভাবছিলাম ঠিকই।
ঠিক সে সময় একটা কল এলো আমার মোবাইলে। পরিচিত এক বড় ভাই, যিনি দেশের একটা সুপ্রতিষ্ঠিত দৈনিকের বিশেষ প্রতিনিধি তখন; ফোন করেছিলেন। জানতে চাইলেন, আগামী পরশু (যেটা ছিল ফেব্রুয়ারির ১৫ তারিখ) আমাকে উনার অফিসে সকালে যেতে হবে নিয়োগপত্র নেয়ার জন্য এবং বিকাল থেকে শুরু করতে হবে কাজ। পারবো কিনা?
আমি একটু ভাবার সময় নিয়ে তখন ফোনটা রেখে দিলাম। তারপর আমরা দু'জন শলাপরামর্শ করে দেখলাম, অফারটা ফিরিয়ে দেয়ার কোনো মানে হয় না। বড় প্রতিষ্ঠানে চাকুরীর নিশ্চয়তা এবং উন্নতির সুযোগ সবসময়ই বেশি। খানিক পর ফোন করে জানিয়ে দিলাম, পারবো।
তারপর সেই মেয়েটি বলেছিল, এটা একটা স্বপ্নপূরণের মতো আমার কাছে জানো? আমি সবসময় জানতাম তুমি একদিন বড় একটা প্রতিষ্ঠানে চাকুরী পাবেই। তোমার উপরে আমার সবসময় বিশ্বাস ছিল।
উত্তরে আমি ওর হাতে হাত রেখে শুধু একটু হেসেছিলাম। তারপর জানতে চেয়েছিলাম, আচ্ছা এভাবে যদি আমাদের সব স্বপ্ন একে একে পূরণ হয়ে যায়, তাহলে একদিন তো দেখা যাবে আর কোনো স্বপ্ন বাকি নেই; তখন কি হবে? মেয়েটি বলেছিল, তখন আমরা নতুন স্বপ্ন দেখবো।
আজ বহুদিন নতুন কোনো স্বপ্ন দেখি না। সবগুলো স্বপ্ন পূরন হয়ে যাওয়ার পর, একদিন এক সুনামীসমান দুঃস্বপ্ন এসে কেড়ে নিয়ে গেছে সকল নতুন স্বপ্ন দেখার অধিকার। সেই সুনামীতে দু'জন দু'দিকে এমনভাবে ভেসে গিয়েছি যে, যৌথ স্বপ্ন দেখা হয় নি আমাদের কারোই আর।
---





মন্তব্য করুন