ইস্তান্বুলের গল্পের ভূমিকার ভূমিকা
দিনের বেলা ঘুমিয়ে কাদা হয়েছিলাম। এখন উঠে মন খারাপ লাগছে। জানি রাতে ঘুমানোটা কঠিন হয়ে গেল ভীষণ। কিন্তু কি আর করা। ঘুমানোর সময় ভেবেছিলাম খুব বেশি হলে আধা ঘন্টা ঘুমানো যাবে। ওমা পাক্কা আড়াই ঘন্টা পর চোখ খুলেছি। মাঝখানে তো ঘুমের মধ্যেই মনে হচ্ছিল ঘড়ির কাঁটা রাত আর দিন পেরিয়ে চলছে অজানা গন্তব্যের পানে।
সাগরের তীরে যতোবার বেড়াতে গিয়েছি, ততোবারই আমার কি যেন হয়েছে। মনে হয়েছে মাত্রই তো কয়েকদিনের জন্য এখানে আসা। এই আসার কি কোনো অর্থ আছে? এসব ভেবে ভেবে মন খারাপই থাকতো বেশি। বহু চেয়েও কখনও উপভোগ করতে পারি নি। অথচ সাগরপাড়ের বাতাস যদি মুঠোবন্দি করে এনে আমার সামনে কেউ ছেড়ে দেয়, আমি বলে দিতে পারবো সেটা সাগরপাড়ের বাতাস। জানি আর না জানি, সাগরের কাছাকাছি গেলেই আমি টের পেতে শুরু করি।
সাগর যতো না ভাল লাগে, তারচেয়ে বেশি ভাল লাগে জাহাজ। জাহাজের ভেতর একটা বিশেষ গন্ধ থাকে। লোহার সাথে নোনা পানি মিশে সেই গন্ধের জন্ম হয়। জাহাজে উঠলেই আমার ভেতর একটা টানা শিরশিরানি সৃষ্টি হয়। জাহাজ চলুক আর না চলুক। কোনো একদিন কোনো এক নির্জন জাহাজের ডেকে একা বসে বসে আমার প্রিয় লেখক হুমায়ূন আজাদ বা আহমদ ছফার কোনো একটা বই পড়বো। কিংবা আর্নস্ট ক্লাইনের। জাহাজ ভেসে চলবে দূরের কোনো বন্দরের উদ্দেশ্যে। আমি ঠাঁয় বসে থাকবো বই হাতে, সেই নীলে ঢাকা পরিবেশে। এমন একটা স্বপ্ন আমি দেখি বহুদিন ধরে।
সেবার ইস্তান্বুলে আশা মিটেছিল সাগরের বুকে চিড়ে ঘুরে বেড়ানোর। মার্মারা সাগর প্রতিদিন দু'বার করে পাড়ি দিয়েছি। এশিয়া মহাদেশ থেকে ইউরোপে যাওয়ার লক্ষ্যে। পথিমধ্যে পড়তো বসফরাস প্রণালী। দু'চোখ যেদিকে যায় শুধুই নীলের সমাহার। দেখলে বুকে একরকম চিনচিন করে ওঠে। হয়তো সেখানকার নিয়মিত বাসিন্দাদের অমন হয় না। তবে আমি নিয়মিত বাসিন্দা হলেও একইরকম যে বোধ করতাম না,সেই গ্যারান্টি দিতে পারছি না।
দেশের বাইরে কোথায় আমি সবচেয়ে বেশি উপভোগ করেছি সময়, জানতে চাইলে এখনও উত্তরটা ইস্তান্বুলই দিই। শুধু যে সাগরের বুকে ভেসে বেড়ানোর অবারিত সুযোগ ছিল সেজন্য নয়। আরও অসংখ্য ছোট-বড় অনুষঙ্গ মিলে সময়টাকে অন্যরকম করে তুলেছিল। রাতের শেষ প্রহরে ঘরে ফেরার পথে সুস্বাদু কাবাবের গন্ধে পথ ভুল হতো প্রতিদিন। তারপর দোকানী মামাকে গিয়ে ঠিক নিজে যেমনটা চাই তেমন একটা কাবাবের অর্ডার করা- এমন সুযোগ নিজ দেশের বাইরে খুব বেশি পাওয়া যায় বলে মনে হয় না। দোকানী মামাও যেন আমাদের দলটির জন্যই অপেক্ষা করে থাকতেন। ভান্ডারের সেরা মাংসটি তুলে রাখতেন আমাদের জন্যই। টাটকা লেবু, কাঁচা মরিচ, নানা রংয়ের পেঁয়াজ আর লেটুস পাতার মতো সালাদের উপাদানগুলো বিশাল কড়াইয়ে ভাজা কাবাবটির স্বাদ ছয়-পাঁচ গুণ বাড়িয়ে দিতো লহমায়। আর রুটির জন্য ইস্তান্বুলের খ্যাতি কে না জানে। আমাদের দোকানী মামা বলতেন, একদম তুলতুলে নরম রুটি দিয়ে কাবাব ভাল হয় না। মুখের ভেতর রুটি লেগে থাকে।
আমার প্রতিদিনের অর্ডার ছিল একটু শক্ত কিন্তু তরতাজা রুটি, আর এক পেটি কড়াইয়ে ভাজা চর্বিওয়ালা মাংস। তার ওপর এক প্রস্থ গোলমরিচের গুড়া, এক প্রস্থ গোল করে কেটে রাখা পেঁয়াজ, সরিষায় ডোবানো রসুন, সিরকায় ডোবানো মরিচ, লেটুস পাতা, লেবুর রস; ব্যাস্। চোখ বন্ধ। শুধু মুখ চলবে। খেয়াল করলে দেখবেন, আপনার ঠিক পেছনেই বসফরাসের জল এসে শান বাঁধানো পাড় ধাক্কাচ্ছে। ঠান্ডা বাতাস এসে ছুঁয়ে দিচ্ছে ঘাড়, মাথা, চুল; সবকিছু।
খেতে খেতেই ঘুমটা পেয়ে বসতো ওখানেই। আমাদের বাসাটা ছিল ওখান থেকে কয়েক ব্লকের মধ্যেই। ঘুমে ঢুলু ঢুলু পায়ে ঘরে ফেরা, কোনমতে জুতা আর জিন্সটা খুলে, কোনো একদিকে ছুড়ে ফেলে বিছানায় ঝাপ দেয়া এবং বিছানায় পড়ার সাথে সাথে অতল ঘুমের রাজ্যে ডুবে যাওয়ার অনুভূতি যেন একটু দূরের বসফরাসের পানিতে ঝাপ দেয়ার মতোই। তারপর শুধু গভীরে তলিয়ে যাওয়া। স্বপ্নদের চারপাশ থেকে এগিয়ে এসে ঘিরে ধরা।
তারপর সকালে, তুরস্কের স্থানীয় বন্ধু একিন সোনমেজের চিৎকারে ঝালাপালা হওয়া কান জেগে উঠতো সবার প্রথমে। তারপর মাথা। তারপর শরীর। হাতড়ে হাতড়ে এক কাপ ধূমায়িত কফি আর একটা সিগারেট খুঁজে বের করতে পারলেই হলো। গাড়ির এন্জিনে চাবি পড়ে গেছে। এবার শুধু ছোটার পালা।
ইস্তান্বুলের গল্পের ভূমিকার ভূমিকা এটা। কোনো একদিন আমি সত্যিই আমার ইস্তান্বুল ভ্রমণের কাহিনী লিখবো। কিভাবে বেড়ালেরা ওই শহরে রাস্তার পাশে বসে আগন্তুকদের অভ্যর্থনা জানায় বলবো। শেষ রাতে পথের কুকুরেরা কিভাবে আপনার ঘরে ফেরা নিশ্চিত করে জানাবো। শহরটার আশপাশে বড় বড় চারটা দ্বীপ আছে। সেসবের কোনো একটায় গেলে কেমন অসহনীয় ভাললাগায় মনের আগল পুড়ে যায় এবং এক ঝাপটায় নিজেকে উজাড় করে বিলিয়ে দিতে ইচ্ছে হয় সারা পৃথিবীর তরে- সেসব নিয়ে একদিন অবশ্যই লিখবো।
কিন্তু এখন আপাতত বিছানা ছেড়ে উঠে দেখতে হবে দিন-দুনিয়ার কি অবস্থা। ইলমিনাউ শহরের ভরা গ্রীষ্মে বরফ পড়ছে। আমরা সবাই গৃহবন্দি হয়ে আছি প্রায় দু'দিন যাবত। আরও ক'দিন যে ঠান্ডা আর বরফে জেরবার থাকতে হবে, তা বলতে আবহাওয়াবিদ হওয়ার দরকার পড়ে না। ক'টা দিন ইলমিনাউয়ে থাকলেই চলে। আমার এখানে থাকা হয়ে গেছে আড়াই বছর। এবার ধীরে-সুস্থে তল্পিতল্পা গুটাতে হবে। কেমন হবে যদি ইস্তান্বুলে গিয়ে একটা আস্তানা খুলি?
হাহাহা, সন্ধ্যে বেলা পড়ে পড়ে ঘুমালে যা হয় আরকি! আবোল-তাবোল কতো যে চিন্তা মাথায় ভর করে। যাক ভাল থাকা হোক সবার। শুভকামনা পৃথিবীবাসী।
---





মন্তব্য করুন