নায়করাজের মৃত্যু আর বানের জলে চার শিশুর ভেসে যাওয়ায় বিভিন্ন মাধ্যমে সৃষ্ট শোকের তুলনায় পাওয়া উপলব্ধি
নায়করাজ রাজ্জাক মরে গেছেন। ইন্নালিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। দেশে প্রতিদিন অনেক মানুষ মারা যাচ্ছে। কেউ বা সড়ক দুর্ঘটনা, কেউ নৃশংসতার শিকার হয়ে, কেউ বন্যায়, কেউ বেখেয়ালে- মরছেই। মৃত্যু খুব স্বাভাবিক ঘটনা আমার প্রিয় স্বদেশভূমে। বরং নায়করাজ্জ রাজ্জাকের মতো বার্ধক্যে পৌঁছে যেকোন মাত্রার একটা চিকিৎসা পাওয়ার মতো সৌভাগ্য বিরল অনেকাংশে। সে তুলনায় নায়করাজের অন্তিমযাত্রাও নায়কোচিতই হয়েছে বলা যায়। পত্র-পত্রিকার অনলাইন সংস্করণ আর এ যুগের সবচেয়ে দ্রুতগতির সংবাদ ছড়ানোর মাধ্যম ফেসবুকে তাঁকে নিয়ে অসংখ্য স্তাবক রচিত হয়েছে। মানুষ বড় দুঃখে পড়ে গেছে নায়করাজ রাজ্জাকের প্রস্থানে। যেন জগতের সকল সূত্রকে কাঁচকলা দেখিয়ে তিনি চিরকাল বেঁচে থাকলে ভাল হতো। তারচেয়ে বরং সোনাভানের চার সন্তান ভেসে গেছে বানের জলে, আরও চার সন্তান ভেসে যেতে পারতো। সোনাভানের আর সন্তান না থাকুক, অন্যদের যাদের সন্তানেরা এখনও বানের জলে ভেসে যায় নি. তারা নাহয় ভেসে যেতো। কেন নায়করাজ রাজ্জাককে চলে যেতে হলো?
বন্যার কারণে গত ক'দিনের শতাধিক সলিল সমাধির ঘটনায় ফেসবুক যতো না উদ্বেলিত, আজকের নায়করাজের মৃত্যুতে তার শতগুণ বেশি মাতম। হ্যাঁ, তিনি গুণী মানুষ ছিলেন। আকালের এই যুগে নিজের যেটা কাজ ছিল, অভিনয়, সেটা ঠিকঠাকমতো করে গিয়েছিলেন। যদিও আমাদের বেশিরভাগই নিজের সামান্য কাজটি ঠিকঠাকমতো করি না। রাজ্জাক তাঁর কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ মানুষের ভালবাসাও যথেষ্টই পেয়েছেন। বাংলার মানুষের মনে নায়করাজ হিসেবে জায়গা করে নিয়েছেন। তার মৃত্যুতে মাতম তো লাগবেই। প্রথম আলো, বিডিনিউজের মতো সংবাদপত্র বা সংস্থাগুলো সব ভুলে তার স্তুতি তো গাইবেই। এজেন্ডাটা সময়ের সাথে সঙ্গতিপূর্ণও বটে। এখন এই বন্যার আমলে সরকারকে একটু শান্তি দিতে এমন একটা ইস্যূই তো দরকার। বন্যার সাথে সরকারের কোনো সম্পর্ক আছে কিনা সেটা বিশেষজ্ঞদের খতিয়ে দেখার বিষয়, হয়তো কূটনীতিতে আরেকটু মেরুদণ্ডওয়ালা হতে পারলে পানিবন্টনের মতো ইস্যূগুলোতে আশপাশের দেশগুলোর সাথে আরও ভাল অবস্থানে থাকা সম্ভব ছিল। তাহলে পরিস্থিত এতোটা খারাপ না-ও হতে পারতো। তবে আমি সেটার কথা বলছি না। বাংলাদেশ ছোট্ট একটা দেশ। বড় বড় রুই-কাতলাদের ভিড়ে নেহায়তই এক পুঁটিমাছ। কিন্তু তা বলে বন্যা পরবর্তী পুনর্বাসনের তো একটা নিয়মতান্ত্রিক পন্থা থাকবে। মানুষ যারা সাহায্য করতে চায়, তাদেরতো এগিয়ে আসার সুযোগ দিতে হবে। অবশ্য, মানুষের ওপরও আমার বিশ্বাস হারিয়েছে বহু আগে। নায়করাজ রাজ্জাক মরে গেছেন, তার জন্য মুফতে একটু আহা-উহু করা যেতেই পারে। বন্যাকবলিতদের জন্য শুকনো আহা-উহুতে চিড়ে ভিজবে না। তাই ওভারলুক করাই বেটার!
আর সংবাদমাধ্যমের কথা তো বাদই দিলাম। যাদের শত শত বানভাসি মানুষের খবরের জন্য এক ইঞ্চি জায়গা বরাদ্দ করতে নাড়িতে টান পড়ে, তাদের যখন অবলীলায় জায়গার পর জায়গা বর্গা দিতে দেখি নায়করাজ রাজ্জাকের জীবনের বিভিন্ন দিক বিচার-বিশ্লেষণে, তখন মনে হয় তোমরা শালা সরকারের চাটুকার ছাড়া আর কিছু নও হে। জাস্ট সুযোগের সন্ধানে আছো। তোমরা সাংবাদিকতার সকল বিশেষত্বকে ভূমিতে টেনে নামিয়েছো। টিকে থাকার লড়াইয়ে হয়েছো তেলাপোকা। টিকে থাকো। আর যারা যুক্তি দিয়ে বিচার করার ক্ষমতাটুকু অন্তত রাখে, তারা জানুক তোমরা কতো বড় অথর্ব একেকটা।
পরপারে ভাল থাকুক নায়করাজ। জীবনে তাঁর এক-আধটা ছবি হয়তো দেখা হয়েও থাকতে পারে, যদিও মনে করতে পারছি না। কিন্তু তাঁর জনপ্রিয়তা সম্পর্কে একটা ক্লিয়ার-কাট ধারণা আমার আছে। এমনিতে ব্যক্তি হিসেবে মন্দ লাগে নি রাজ্জাককে কখনও। সেই জায়গা থেকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি অবশ্যই। কিন্তু আজকের এই দিনেই আরও অনেক মানুষ নানা ভাবে মারা গেছে। তাদের সবার নাম জানি না। তবে আমি তাদের সবার মৃত্যুতেও সমানভাবে শোকাহত। ক্ষেত্রবিশেষ বেশি শোকাহত। যারা বন্যায় ডুবে মারা যাচ্ছে, রোগে ভুগে কিংবা অপঘাতে মারা যাচ্ছে তাদের জন্যই আমার বেশি খারাপ লাগছে। আমার নিজস্ব সংবাদপত্র আর সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে তাদের উল্লেখ রাজ্জাকের চেয়ে বেশি সম্মান আর ভালবাসার সাথেই থাকবে। আমার ধারণা সবারই তাই থাকা উচিত ছিল।
আমরা যখন আমাদের ব্যক্তিগত পছন্দ-অছন্দকে নিয়ে নিজের সীমানা ভুলে অন্যদের সীমানায় ঢুকে পড়ি, তখন অবশ্যই একটা নিয়ন্ত্রণহীন পরিবেশ তৈরি হয়। যা কখনোই ভাল কিছু ডেকে আনে না। বিষয়টা বোঝাটা খুব কঠিন কিছুও না। কিন্তু আমরা জাস্ট বুঝতে চাই না। আমাদের জীবনটা যে কতভাবে ভুলে ঠাসা!
---





মন্তব্য করুন