অসমাপ্ত বাস্তবতা... ৯
১.
শেষ লেখাটায় যদিও উল্লেখ করেছিলাম রোহিংগা ইস্যু নিয়ে চারিদিকে ডামাডোল দেখা দেয়ার সম্ভাবনা নেই- কিন্তু কথাটা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। দেশের ফেসবুক ব্যবহারকারীর মধ্যে সাড়া জাগিয়ে তুলেছে রোহিংগা ইস্যু। সবাই নিজ নিজ মতামত ব্যক্ত করছেন এই ইস্যুতে। কেউ কেউ সংবিধানের দোহাই দিয়ে সাজাচ্ছেন নিজের যুক্তি। কেউবা টেনে আনছেন একাত্তরে ভারতের সীমান্ত খুলে দেয়ার উদাহরণ। কেউবা বলছেন বাংলাদেশের নিজের সমস্যারই তো কোনো সমাধান নেই, অন্যের সমস্যা সমাধান করবে কিভাবে? মোট কথা রোহিংগা ইস্যুতে ফেসবুক পৃথিবীর বাংলাদেশি জাতি এখন পরিস্কার দুই ভাগে বিভক্ত।
একদল চায় রোহিংগাদের জন্য সর্বস্ব উজাড় করে দিতে, আরেকদল চায় কিছুই না করে হাত গুটিয়ে বসে থাকতে। আমার মাথায়ও একটা ছোটখাটো পরামর্শ চিলিক মেরে গিয়েছিল। কিন্তু সন্তপর্ণে চেপে গিয়েছি। বড় বড় রুই-কাতল ফেসবুকাররা যেখানে মাঠে, সেখানে আমার মতো মাছের ডিমের ঝিমঝাম জেলের জালে ধরা পড়াই ভাল। তারপর কেউ যদি দয়াপরবশ হয়ে বাজার থেকে কিনে নিয়ে রান্না করে ফেলেন তাহলে তো বর্তে যাই। ডিম জন্মের স্বার্থকতা নিশ্চিত করে তার পেটে সমাধিস্থ হয়ে গু হয়ে বের হয়ে যেতে চাই। বাট চিলিক মারা পরামর্শের জোয়ারে কোনো কন্ট্রিবিউশন রাখতে চাই না।
আসলে, পরামর্শ কে না দিতে পারে! কঠিন হচ্ছে সেটা বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখা। আমার দেখা বেশিরভাগ বুদ্ধিজীবীই পরামর্শ দিতে যতোটা পারদর্শী, বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখায় তার শতভাগের এক ভাগও না। এই দেখে দেখে আমি ঠিক করেছি, আগে বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখার যোগ্যতা অর্জন করেই কেবল কোনো একটা বিষয়ে আমি পরামর্শ দেবো। তার আগে না। পাশাপাশি আরও মানুষ যাতে উদ্বুদ্ধ হয় তাই যারা বাস্তবায়নে ভূমিকা না রেখে কেবল পচা ভাতের মতো পরামর্শ ছিটান তাদেরকে কটাক্ষ করবো। কি আছে জীবনে!
২.
চলন্ত বাসে ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটা পড়ে হতভম্ব লাগছে। মানুষ এত নিষ্ঠুরও হতে পারে? মেয়েটি শুধু প্রাণে বাঁচতে চেয়েছিল, বলেছিল সাথে টাকা-পয়সা যা আছে সব নিয়ে হলেও যেন ওকে ছেড়ে দেয়া হয়। ওইটুকু অনুরোধও ওর রাখা হয় নি। অভাগীকে ঘাড় মটকে হত্যা করা হয়েছে।
সেদিন দেখলাম শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টায় জড়িত একদল সন্ত্রাসীকে ফায়ারিং স্কোয়াডে দিয়ে মারার রায় হয়েছে। এই ধর্ষক-খুনীদেরও একই শাস্তির বিধান দেয়া যেতে পারে। দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে এই ঘটনার বিচার চাই। আজ থেকে ১০ বছর পর এর রায় এবং তারও পরে তা কার্যকর দেখতে চাই না। কারণ তাতে একই ধরনের অপরাধ বাড়বে বই কমবে না। কিছুদিন আগে বলেছিলামও, অপরাধজগতে ধর্ষণ বর্তমানে সেনসুয়াল অপরাধ হিসেবে 'ট্রেন্ড' করছে। এ থেকে রক্ষা পেতে হলে দ্রুত বিচার, রায় কার্যকর এবং সর্বোপরি সেটার একটা কঠিন প্রচার হওয়া দরকার। জানি না, আমার ছোট্ট মাথায় বিষয়টার কি কি টেকনিক্যাল সংকট ধরা পড়তে ব্যর্থ হলো। যদি সেসবের মধ্যে যুক্তিযুক্ত কোনো কারণ থাকে দ্রুত বিচার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ার, তাহলে আমি তা শুনতে, জানতে, বা পড়তে আগ্রহী।
৩.
বাংলাদেশ প্রথম টেস্টে যেভাবে অস্ট্রেলিয়াকে হারালো তা দেখে ভাল লেগেছে। ক্রিকেট গৌরবময় অনিশ্চয়তার খেলা। আগের দিন বিকেলে তো মনে হচ্ছিল বাংলাদেশ বুঝি হেরেই গেল। সেদিনের খেলা শেষে এক অস্ট্রেলিয় নাগরিক, যে কিনা ইলমিনাউতে থাকে, আমার সাথে পরিচয় হয়েছিল জার্মান ভাষা শেখার ক্লাসে, স্কোর দিয়ে বানানো একটা ছবিতে ট্যাগ করে দিল। পরের দিন সকালে আমি যখন ঘুম থেকে উঠলাম ততক্ষণে খেলা শেষ (এর মানে কিন্তু এই না যে আমি প্রতিদিন দুপুরবেলা ঘুম থেকে উঠি, দরকার থাকলে সেহেরীর সময়ও উঠতে পারি, হুম)। মজাটা নিতে তাই ওই অস্ট্রেলিয় ট্যাগের নিচে একটা মন্তব্য দিতেই হলো। খেলা যদি দেখার সুযোগ পেতাম তাহলে হয়তো করতাম না কাজটা। বেচারার এমনিতেই মন খারাপ ছিল জানি। তায় আবার কাঁটা ঘায়ে নুনের ছিটা। যদিও আমার কোনো ধারণা ছিল না যে, আগের দিন সে আমার কাঁটা ঘায়ে ঠিক একইভাবে নুনের ছিটা দিতে আসবে। ঢিলটি মারলে পাটকেলটি খেতে হয়। ছোটবেলার বাগধারা। এখনও ঠিক মনে আছে।
যাহোক ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার ফেসবুক পেইজে বাংলাদেশি অনেকেই বাংলায় অশ্রাব্য গালাগাল দিয়ে নিচে ইংরেজিতে ভাল ভাল কথা লিখে এসেছেন। এটা এক ধরনের প্রতারণা অবশ্যই। গাটস্ থাকলে যা বলতে চান, পুরোটাই ইংরেজিতে বলা উচিত। আপনার কথায় যদি যুক্তি থাকে, তাহলে যুক্তিতে যারা বিশ্বাস করে তারা অবশ্যই আপনার কথা শুনবে। যতোই গালাগালি করেন না কেন। যুক্তিসঙ্গত গালাগালি হলে সেটা শুনতে তো আমি কোনো বাধা দেখি না। আর যদি মনে করেন, আপনার গালাগালিতে যুক্তি নাই, তাহলে অন্তঃসারশূন্য গালাগালি করে নিজের ও বংশের পরিচয়টা বিশ্ববাসীর কাছে অমনতর খুলে না দেখালেই কি নয়? আর যদি গাটস্ না থাকে নিজের বক্তব্যের পক্ষে দাঁড়ানোর, তাহলে গাটস্ বাড়ানোর চেষ্টা করে দেখতে পারেন। যদি এত কিছুর কোনোটিই না, কেবল চোরের মতো যে ভাষা অন্যে বোঝে না সেই ভাষায় তাকে গালাগালি করেই আপনি সুখ পান, আর কিছুতে না; তাহলে কি আর বলবো। আপনার অসুস্থতা দেখে খারাপবোধ করছি আমি। ভাল হয়ে উঠুন তাড়াতাড়ি। শুভকামনা।
৪.
বন্যা নিয়ে ফেসবুকে গত দুইদিন কোনো ফীড নাই। আমরা কত সহজেই না ভুলে যাই। বারবার ভুলে যাই। বারংবার ভুল করি কিন্তু শিখি না। দুনিয়ার আরও পাঁচ-দশটা জাতির মানুষজনের সাথে মেলামেশা, আলাপ-চারিতা, একসাথে থাকা এবং কাছ থেকে দেখার সুবাদে বলতে পারি এমন আর কোথাও কেউ করে না। আমরা মনে হয় কোনদিনই উন্নত হবো না। মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তরিত হওয়া, উন্নতির পথে এগিয়ে যাওয়া- এগুলো সবই ফাঁপা বুলি ঠেকে আমার কাছে। যদিও এগুলোর অর্থ এমনিতেও দুর্বোধ্য। কিন্তু জেনারালাইজড্ যে ধারণাটা সবার মনে আছে এগুলোর অর্থ হিসেবে, তা আমার মনেও আছে। আমি তো সেই দেশের আলো-হাওয়াতেই বেড়ে উঠেছি, যেখানে এই দুর্বোধ্য টার্মগুলো শুনিয়ে শুনিয়ে মানুষকে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়েছে। সেই সরলীকৃত ধারণাগুলোও টলোমলো হয়ে যায় যখন জাতিগতভাবে আমরা কেমন, সেটা নিয়ে ভাবতে বসি। আমার নিউজফীডে তো তাও সবাই উচ্চ শিক্ষিত, টাইপ করতে জানা, কি বললে কি বোঝায় তা বিভিন্ন দিক থেকে বিশ্লেষণ করতে পারার ক্ষমতাসম্পন্ন লোকজনের পোস্ট দেখায় শুধু। তাতেই যদি এই পরিমাণ হতাশা জন্মায় মনে, তাহলে অন্যদের নিউজফীড যেখানে উল্লিখত ক্ষমতাসমূহে বলীয়ানদের যাতায়াত আমারটার তুলনায় কম, তাদের কি হয়? খারাপবোধ করি প্রিয় পাঠক। যতোই ভাবি ততোই শুধু খারাপই বোধ করি জানেন?
৫.
তারচেয়ে একটু ভাল কিছু নিয়ে ভাবা যাক। আমাদের দেশে ভাল কি আছে? হীরাঝিলের খিচুড়ি। নাজিরাবাজারের চাপ। বিউটির ফালুদা। আছে কিছু কিছু জিনিস। কিন্তু সেইসব নিয়ে ভাবতে ভাবতেই এক সময় মনে হয়, রূপা নামের সেই মেয়েটির শেষ সময়ের আকুতির কথা। মনে মনে কি একবার কল্পনা করা সম্ভব আপনাদের কারও পক্ষে, জীবনের অন্তিম মুহূর্তে কি ভীষণ অসহায় অবস্থায় ওইভাবে বাঁচার আকুতি জানিয়েছিল সে?
যতোবার ভাবছি, ততোবার অক্ষম আক্রোশে ভেতরটা চৌচির হয়ে যাচ্ছে। ভাল ভাল খাবারগুলোর ছবিতে কিলবিলিয়ে ভেসে উঠছে বিষাক্ত পোকামাকড়, পঁচে-গলে দুর্গন্ধময় হয়ে উঠছে ওগুলো। অনেকদিন এই দুর্বিষহ অবস্থা তাড়া করে বেড়াবে, বুঝতে পারছি।
যাহোক, এখন এখানে শেষ করছি। ভাল থাকবেন সবাই, যতোটুকু পারা যায়। সাবধানে থাকবেন অবশ্যই। নিজের সব নিরাপত্তা নিজেই বিধান করবেন। মনে রাখবেন, জনসংখ্যা আমাদের যতোই হোক না কেন, রাস্তায় আপনি যদি নির্যাতিত হন তাহলে কেউ আপনার দিকে এগিয়ে যাবে না সাহায্যের হাত বাড়িয়ে। নির্যাতককে যদি শুধু প্রাণটা ভিক্ষা দিতে বলেন তো, ঘাড় মটকে দিতে পারে এই আমাদের বাংলাদেশে।
---





মন্তব্য করুন