এই উইন্টারে যারা জার্মানিতে পড়তে আসছেন
এটি একটি উপদেশমূলক লেখা। অক্টোবরের ১ তারিখ থেকে জার্মানিতে উইন্টার সেমিস্টার শুরু হচ্ছে। এখানে উইন্টার সেমিস্টারে সামারের চেয়ে বেশি সংখ্যক আন্তর্জাতিক ছাত্র-ছাত্রী নেয়া হয়। তাই এই সময়টাতে ছাত্র-ছাত্রীদের জার্মানির পানে ভিড়ও থাকে বেশি। যে বা যারা দুই-একদিনের মধ্যে প্রথমবারের মতো জার্মানির উদ্দেশ্যে দেশের বাইরে পা বাড়াচ্ছেন, তারা এই লেখা থেকে উপকৃত হলেও হতে পারেন।
আজ থেকে ঠিক তিন বছর আগে এই দিনটাতে আমি মনে মনে ভাবছিলাম, এখন হাতের কড় গুণে হিসেব করে ফেলা যায় কয় ঘন্টা পর আমার ফ্লাইট; কয় ঘন্টা পর আমি এমন একটা জায়গায় থাকবো, যেখানকার কোনোকিছুর সাথে আমার পরিচয় নেই; কয় ঘন্টা পর আমি প্রিয় পরিবার-পরিজন, বন্ধু-বান্ধব, এবং আমার স্বদেশ থেকে হাজার মাইল দূরে চলে যাবো। হিসেব করে ফেলা যাচ্ছিল সবকিছুই। কঠিন ছিল সময়টা, স্বীকার করতেই হবে।
প্রথমবার উড়াল দেয়ার প্রায় চার ঘন্টা পর আমি কাতার বিমানবন্দরে পৌঁছাই। যারা কাতার এয়ারওয়েজে আসছেন, তাদের ওখানেই ট্রানজিট পড়ার কথা। বিমানবন্দরে চেক-আপের সময় প্যান্টের বেল্ট খুলতে হয়, এটা মনে রাখবেন। অনেক সময় ইমিগ্রেশনের অফিসাররা বেল্ট ধরে টানাটানি করে। ওরকম কোনো পরিস্থিতিতে না পড়তে চাইলে আগেই বেল্ট খুলে প্লাস্টিকের যে ডালিটা ওরা ফোনসহ সব ধরনের ধাতব জিনিস রাখার জন্য দিয়েছে, সেখানে রেখে দেয়া উত্তম হবে। আর কানেক্টিং ফ্লাইট কোন গেট থেকে ছাড়বে, সে জায়গাটা আগেই দেখে-শুনে মার্ক করে রাখা ভাল। তারপর ইচ্ছে হলে বিমানবন্দর ঘুরে দেখতে বের হতে পারেন।
আমি নেমেছিলাম ফ্রাঙ্কফুর্ট আম মাইন এয়ারপোর্টে। এয়ারপোর্টের ভেতরের সাইনবোর্ডগুলোতে জার্মানের পাশাপাশি ইংরেজিও ব্যবহার হয় বলে, খুব অসুবিধা হয় নি। তবে এয়ারপোর্ট থেকে বের হওয়ার সাথে সাথে যে সবকিছু বদলে যাবে, এ ব্যাপারে নিশ্চিত থাকতে পারেন। আসেন দেখা যাক কি কি বদলের সম্মুখীন হতে হবে আপনাকে শুরুতেই।
প্রথমতঃ ভাষা। জার্মানরা অনেকেই স্কুলে ইংরেজি ভাষাটা শেখে। তারপরও একটা বিষয় ভেবে দেখুন, যখন আপনি একজন জার্মানের সাথে ইংরেজিতে কমিউনিকেট করতে চাইবেন, তখন আপনারা দু'জনই কিন্তু নিজের নিজের সেকেন্ড বা থার্ড ল্যাঙ্গুয়েজে কমিউনিকেট করছেন। দ্বি-পাক্ষিক যোগাযোগে অন্তত একজনকে নিজের মাতৃভাষায় কমিউনিকেট করার সুযোগ দিলে, সেটা একটা প্রাণবন্ত ও ফলপ্রসূ যোগাযোগ প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হয়। তাই হাই-হ্যালো টাইপের কথা বলা কিংবা টয়লেটটা কোথায়, বাইরে যাওয়ার রাস্তাটা কোনদিকে, আপনার পাশের সিটটি কি ফাঁকা ইত্যাদি- জার্মান ভাষায় কিভাবে বলতে হয় তা জেনে যাওয়া ভাল। ভাষাটা শিখে যাওয়া তো আরও ভাল।
যদি আপনাকে এয়ারপোর্ট থেকে কোনো সুহৃদ 'পিক' করতে না আসেন, এবং যে শহরে বিমান নেমেছে সেটাই আপনার শেষ গন্তব্য না হয়; তাহলে অবধারিতভাবেই বাস কিংবা ট্রেন ধরতে হবে আপনাকে। কিন্তু বাসস্টেশন বা ট্রেনস্টেশনে যেতে হলে এয়ারপোর্ট থেকে ছোট ছোট দুরত্বের শ্ট্রাসে-বান (সংক্ষেপে এস-বান) কিংবা উ-বান (আন্ডারগ্রাউন্ড রেল) নিতে হবে। এস-বানের স্টেশন কোথায় জানতে চাইলে, খেয়াল রাখুন নীল বৃত্তের ভেতর সাদা রং দিয়ে বড় করে 'S' লেখা সাইনের দিকে। উ-বান ধরতে চাইলে খুঁজুন U।
স্টেশন পেয়ে গেলে আগে গিয়ে দেখুন কাঁচঘেরা টাইমটেবিল সম্বলিত নোটিশবোর্ডটি খুঁজে পান কিনা। এটা দেয়ালে ঝোলানোও থাকতে পারে, আবার ফ্লোরের ওপর পার্মানেন্টলি স্থাপন করাও থাকতে পারে, কিন্তু থাকবেই। ওখান থেকে আপনার বাহনটি ক'টায় ক'নম্বর প্ল্যাটফর্ম থেকে ছাড়বে দেখে নিন। আপনার কাছে থাকা একই তথ্যগুলোর সাথে মিলিয়ে নিন। মাঝে মাঝে সময় ও প্ল্যাটফর্ম নাম্বার চেঞ্জ হয়। সে তথ্যগুলো টিকিটের প্রিন্টেড কপি কিংবা অনলাইন অ্যাপ্লিকেশনে থাকে না। কোথাও কোনো সমস্যা হলে, জার্মানদের জিজ্ঞেস করতে ইতস্তত করবেন না। ওরা যেহেতু ভাষাটা ভাল বোঝে এবং দেশটার স্থানীয়, সেহেতু এসব বিষয়ে সবাই-ই খুব ভাল ধারণা রাখে। ট্রেন, বাস, ট্রামের সময়সূচি, গন্তব্যের গতিপথ ইত্যাদি বিষয়ে সাহায্য চাইলে; বিপুল আগ্রহ নিয়ে সাহায্য করতে ঝাপিয়ে পড়ে।
আসি টিকিট কাটার আলোচনায়। ট্রেন আর বাসের টিকিট কাটার অনেক রকম ব্যবস্থা আছে। অনলাইনে কাটা সম্ভব বাংলাদেশে বসেও। মাস্টারকার্ড বা পে-পল অ্যাকাউন্ট লাগবে সেক্ষেত্রে। বড় ও মাঝারি এয়ারপোর্টগুলোতে ডয়েচে বানের (এদের সাইনটা চতুষ্কোণ, লাল রংয়ের বর্ডার এবং ভেতরে ডি বি লেখা) অফিসও থাকে। সেখানে গিয়ে গন্তব্য কোথায়, কখন যেতে চান বললে, কাউন্টারে বসে থাকা মানুষেরাই বলে দেয় কোন টিকিটটা কাটতে হবে। এছাড়া অটোম্যাটিক মেশিনে কয়েন ও নোট দুইটা দিয়েই টিকিট কাটা সম্ভব। ছাড়ার স্থান আর গন্তব্য লিখে, কমান্ড দিলেই হলো। এই মেশিনগুলোতে ইংরেজি ভাষা পছন্দ করার সুযোগও থাকে। তবে মেশিনে কাটা টিকিট ট্রেনে ওঠার আগে 'ভ্যালিডেট' করে নিতে হয়। এটা করার জন্য স্টেশনে ছোট ছোট হলুদ রংয়ের পিলার থাকে সাধারণত। যেকোন একটা খুঁজে পেলেই, ওর যেখানে টিকিটটি প্রবেশ করানোর জায়গা, সেখানে ঢুকিয়ে ধরে রাখুন দুই সেকেন্ড। আপনার টিকিট ভ্যালিডেট হয়ে যাবে, এবং একটা স্বয়ংক্রিয় সিল পড়ে যাবে। এস-বান ও উ-বানের টিকিটও মেশিন (যেগুলো বাহনের বাইরে থাকে) থেকে কাটলে, একইভাবে ভ্যালিডেট করে নিতে হয়। অন্যথায় ৬০ ইউরো জরিমানা গুনতে হতে পারে। তবে ডিবি অফিস/বুথ থেকে কেনা প্রিন্টেড টিকিটের জন্য এ নিয়ম প্রযোজ্য নয়।
আর যারা বাস ব্যবহার করতে চান, তারা চেষ্টা করবেন অনলাইনে টিকিট কাটার। বাস কাউন্টার থেকে টিকিট কাটতে চাইলে প্রায়শই সার্ভিস চার্জ হিসেবে দুই ইউরো বেশি দিতে হয়। তবে অনলাইনে যারা টিকিট কাটতে পারছেন না, তাদের জন্য কাউন্টার উত্তম। আর যদি ড্রাইভারদের কাছ থেকে টিকিট কেনেন, তাহলে নিশ্চিত দ্বিগুণের বেশি মূল্য দিতে হবে। ফ্লিক্সবাস নামে একটা বাসসার্ভিস জার্মানির প্রায় সব বড় ও মাঝারি শহরে চালু আছে। ফ্লিক্সবাসের ড্রাইভারদের কাছ থেকেও আসন থাকা সাপেক্ষে ইউরো দিয়ে টিকিট কাটা যায়।
টিকিট তো কাটা হলো, এবার তাহলে উঠে বসুন আপনার বাহনটিতে। সুন্দরী বা হ্যান্ডসাম কাউকে দেখে, তার পাশে বসতে চাইলে হাসিমুখে জিজ্ঞেস করুন, আপনার পাশের সিটটি কি ফাঁকা কিনা? জার্মান ভাষায় বলতে চাইলে বলুন, ইস্ট ডি প্লাটজ্ ফ্রাই? ইংরেজিতে কিভাবে বলতে হবে সেটা আপনার জানার কথা। যদি উত্তর ইতিবাচক হয়, ডাংকেশুন বলে 'ফ্রাই' হতে বা করতে বসে পড়ুন। একই নিয়ম আপনার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। সুতরাং কেউ যদি একই প্রশ্ন আপনাকে করে, যখন আপনি সিটে বসে মোবাইল ফোনে ব্যস্ত তখনও কিন্তু আপনাকে হাসিমুখে ইতিবাচক বা নেতিবাচক যেকোন একটা উত্তর দিতে হবে। উত্তর না দেয়াটা অভদ্রতা হিসেবে গণ্য হবে।
যাক, প্রসঙ্গে ফিরে আসি। বাহনে উঠে নিশ্চিন্ত হয়ে গেলে কিন্তু হবে না। জার্মান ট্রেন-জার্নির অবধারিত অংশ হচ্ছে কানেকশন। এক ট্রেন থেকে নেমে আরেক ট্রেনে উঠতে হয় প্রায় সব বড় দুরত্বের যাত্রাতেই। মাঝে মাঝে একাধিক কানেকশনও থাকে। এ সময় পরের ট্রেন কয় নম্বর প্লাটফর্ম থেকে- কয় মিনিটের মধ্যে ছাড়বে, সেসব তথ্য খুব ভাল করে মাথায় গেঁথে নেয়া জরুরি। ভুল প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে ট্রেন মিস্ করার ঘটনা এখানে খুব বিরল নয়। তবে ট্রেন মিস্ হয়ে গেলে বিচলিত হবেন না। নোটিশবোর্ডে টাঙানো টাইমটেবিলটায় (যেটার কথা আগে উল্লেখ করেছি) চোখ বুলান। একই গন্তব্যের পরের ট্রেনটায় উঠে যান। আপনার কাছে যে টিকিট আছে, সেটা দিয়েই হয়ে যাবে। তবে বাসের সাথে কানেকশন থাকলে, অর্থাৎ ট্রেন থেকে নেমে যদি বাস ধরতে হয়, তাহলে একটু সমস্যা হতে পারে। কারণ দুইটার টাইমটেবিল ভিন্ন। ট্রেন হয়তো এক ঘন্টা পর পর ছাড়ে, সেখানে বাস হয়তো ছাড়ে দেড় ঘন্টা পর পর। বা আরও ভিন্ন কোনো বিরতিতে। তাই আপনে যদি একটা বাস মিস্ করেন, খুব সম্ভাবনা রয়ে যায়, দুইটা বা তারও বেশি ট্রেন মিস্ হয়ে যাওয়ার। তবে আশার কথা হলো, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে একই লাইনের পরের বাস ও ট্রেনগুলোতেও একই টিকিটে ভ্রমণ করতে পারবেন। শুধুমাত্র দ্রুতগতির ট্রেনগুলোতে (যেমনঃ আইসিই ট্রেন) এ নিয়ম প্রযোজ্য হবে না।
জার্মান দেশের এই কানেকশনের 'খেলা'টা এখনও মাঝে মাঝে উত্তেজনাকর ঠেকে আমার কাছে। তাই আপনি যদি প্রথমবার এই ভূখন্ডে নেমেই সব কিছু ঠিকঠাকমতো করে ফেলতে না পারেন, তাহলে বিচলিত হবেন না। এটা সবারই হয়। ভুল না করে শেখার বিস্ময়কর ক্ষমতা পৃথিবীর কম মানুষেরই আছে।
আরেকটা ছোট্ট উপদেশ দিয়ে এই লেখাটা শেষ করবো। আরও বাড়াতে পারতাম, কিন্তু মানুষকে উপদেশ দিতে আমার সবসময়ই অস্বস্তি লাগে। জার্মানিতে ট্রেন, এস-বান আর উ-বানের সময়সূচি খুব কড়াকড়িভাবে মেইনটেইন করা হয়। অনেক সময় তাই স্টেশনে পৌঁছেও চোখের সামনে দিয়ে নিজের বাহনকে বের হয়ে যেতে দেখা লাগতে পারে। এ ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে সবসময় হাতে যথেষ্ট সময় নিয়ে প্ল্যান করবেন। আপনাদের সকলের যাত্রা শুভ হোক।
---
পি.এস.: আমার ফ্রাঙ্কফুর্টে প্রথমবার নামার অভিজ্ঞতা লিখেছিলাম প্রায় আড়াই বছর আগে। পড়তে চাইলে নিচের লিংকে ক্লিক করতে পারেন:
কোনো কারণ ছাড়াই এক প্রস্তুতিহীন মেরুভালুক বরফ ভাঙছে





দেশ ছাইড়া চইলা যাইতে মুঞ্চায়
অনেকদিন পর আপনার লেখা পড়লাম। ভাল লাগলো।
যারা জার্মানিতে যেতে ইচ্ছুক, তাদের জন্য লেখাটা অবশ্যই কাজে দিবে।
মন্তব্য করুন