জীবনযুদ্ধ, বাংলা ব্যাকরণ ও ভালবাসার ছোট্ট মানুষটা
আমি তারায় তারায় রটিয়ে দেবো তুমি আমার
জেমস্ গুরু সবসময় ছিলেন সাথে। বেড়ে ওঠার দিনগুলোতে। আমি এখনও অনেক সময় গুরুর পুরোনো গানগুলো ঘুরিয়ে ফিরিয়ে শুনি। জানি না কথাটা ঠিকভাবে বলা হলো কিনা। বাক্যের গঠন সংক্রান্ত ব্যাকরণ কখনোই ভালভাবে পড়া থাকতো না। এখন আর ওসব নিয়ে ভাবি না। বরং বাংলা ব্যাকরণ ক্লাসগুলো যেসব টিচাররা নিতেন তাদের কথা মাঝে মাঝে ভাবি।
ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নিয়ে একটা ট্রল দেখলাম সেদিন। ট্রাম্প কোনো এক ক্লাসে পর পর দুইবার ফেইল করেছে। সেই ক্লাসের টিচার তাকে বলছে, এই নিয়ে দু'বার একই ঘটনা ঘটলো ট্রাম্প। শুনে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলছে, এর মানে হচ্ছে এই নিয়ে দু'বার তুমি আমাকে শেখাতে ব্যার্থ হলে টিচার।
অবশ্য তারমানে এই না যে আমি আমার টিচারদের কথা বলছি। আমার টিচারেরা আমাকে শিখিয়েছেন অনেক কিছু। প্রচুর প্রয়োজনীয় ইটের জোগান দিয়েছেন উনারা। যেগুলো শক্ত করেছে একটা নড়বড়ে ভিতকে। ভিতের ওপর সাজানো কোনো সুউচ্চ মিনার এখনও তৈরি হয় নি কিন্তু ভিতটা যে এখনও দাঁড়িয়ে আছে তার পেছনে আমার শিক্ষকদের জোগানো ইটগুলোর শক্তিশালী ভূমিকা রয়েছে। একটা উদাহরণ দিই। কলেজে একবার অর্ধবার্ষিক প্রকৃতির এক পরীক্ষার ঠিক এক সপ্তাহ আগে আবিস্কার করলাম জীববিজ্ঞান প্রথম ও দ্বিতীয় পত্র বইগুলোই আমার কেনা হয় নি। প্রথম থেকে ওই ক্লাসটা ফাঁকি দিতে দিতে ওটা এমনভাবে অগোচরে থেকে গিয়েছিল যে পরীক্ষা চলে আসার আগ পর্যন্ত কোনরকম জানান দিতে পারে নি। ব্যাপারটা আবিস্কার করে প্রচন্ড রকম শকড্ হওয়ার বদলে আমার আনন্দ হতে শুরু হলো। সেটা দেখে বাসায় আব্বু-আম্মুর বেড়ে গেল চিন্তা। যদিও ক্লাস ফাঁকি দিতাম কিন্তু বাসায় পড়াশোনার খবর রাখা হতো তখনও পর্যন্ত খুব কড়াকড়িভাবে। এমন সময় একদিন সকালে কলেজের বায়োলজি টিচারের বাসায় গিয়ে হাজির হলাম। মুখের স্যাড ইমোটা যতোটা সম্ভব দুরে সরিয়ে রেখে বললাম, স্যার বই নাই। এখনতো নতুন করে শুরু করারও উপায় নাই। জানি না পরীক্ষার সময় কি হবে। স্যার গো।
তিনি সে সময় বলেছিলেন, নতুন করে শুরু করার উপায় কখনও পুরাপুরি নাই হয় না। থাকে। তুমি জাস্ট শুরু করো। বইটা খুলে প্রথম পাতা থেকে পড়া শুরু করো। নতুন করে শুরু করা নির্ভর করে মানুষের প্রয়োজনের উপর। প্রয়োজন থাকলে উপায় বের হবেই।
কথাটা এখনও আমার কানে বাজে। মাঝে মাঝে যখন নিজের ওপর বেশি নির্যাতন করি, তখন কথাটা ছোট্ট একটা চড়ুই পাখির মতো উড়ে এসে জানালার কার্ণিশে বসে। মনে হয় ঘটনাটা আক্ষরিক অর্থেই ঘটে। নাহলে শুধু ওই সময়গুলোতেই কথাটা কানে বাজতে শুনি কেন আমি?
জেমস্ গুরুর সুন্দরীতমা গানটা প্রথম শুনেছিলাম অন্য একজনের মুখে। একটু ভিন্ন টোনে। খুব সামান্যই ভিন্ন কিন্তু আমি ওই ভিন্নতাটুকুই পছন্দ করে ফেলেছিলাম। পরে যখন আসলটা শুনি তখন দেখলাম সেটা আর তেমন ভাল লাগছে না। ভিন্ন টোনেরটাই বেশি ভাল লাগছে। গানগুলো আসলে এত দক্ষ-ভাষায় এবং এত সততার সাথে লেখা যে প্রথমবার শুনলেই ওগুলোর সাথে একটা যোগাযোগ স্থাপিত হয়ে যায়। যেটা পরে আর ভাঙা যায় না সাধারণত। 'সুন্দরীতমা' গানের সাথেও যোগাযোগটা হয়েছিল ওটির সাথে প্রথম সাক্ষাতে, এবং সেই সাক্ষাতটা আর কখনও হবে না। কেননা আমরা কিছু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র গিয়েছিলাম জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে একটা রাত কাটানোর জন্য। সেখানে এক বড় ভাই গিটারে খালি গলায় গানটি গেয়েছিলেন। আমরা সবাই মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনেছিলাম। সে সময় রেকর্ড করার প্রযুক্তি খুব একটা হাতের নাগালে ছিল না, মানুষের সেদিকে নজরও ছিল না এখনকার মতো।
আমার যে যোগাযোগটা ওই গানের সাথে হয়েছিল সেটা তাই অসম্পূর্ণই রয়ে গেলো, এবং অসম্পূর্ণই থাকবে সবসময়। ওই একই পরিবেশে, একই মানুষদের নিয়ে একই রকম আরেকটা পর্ব নির্মাণ করা হলে হয়তো খানিকটা যোগাযোগ আবার হবে। তবে সেটার সম্ভাবনাও অনেক কম। গুরুর গলায় 'আমি তারায় তারায় রটিয়ে দেবো' শুনে সেই থ্রিলটা একটু কম পাই যেটা পাওয়ার কথা ছিল। তবে এটা তেমন বড় কোনো ইস্যু না। অন্য অনেক গানই জেমস্ নামটার সদ্ব্যহার এত ভালভাবে করেছে যে অভিযোগ করার কোনো জায়গাই নাই।
তবে ইদানীং গানের প্রতি মনোযোগ কেন যেন আগের মতো দেয়া হচ্ছে না। সর্বশেষ প্লে-লিস্টটা তৈরি করেছিলাম অন্তত তিন মাস আগে। অথচ গেল বছরের অক্টোবরে-নভেম্বরের দিকে প্রতি মাসে একটা করে প্লে-লিস্ট তৈরির টার্গেটে দৌড়ুচ্ছিলাম। অবশ্য প্লে-লিস্ট দিয় হয়ই বা কি! মাঝে মাঝে পুরোনো প্লে-লিস্টে গেলে নস্টালজিয়ায় আক্রান্ত হওয়া যায়, যেটার কোনো উপযোগ আমি পাই না। পুরোনো কথা ভেবে একবার প্রয়োজনীয় নোটগুলো নিয়ে তারপর তাদের ভুলে যাওয়াই ভাল। নতুন দিনের জন্য পথ পরিস্কার হয়।
যাহোক মনটা খারাপ। ছোট্ট একটা মানুষ জীবনের সাথে যে কি গভীরভাবে জড়িয়ে যেতে পারে তা প্রত্যক্ষ করলাম প্রথমবার। ভাগনিটা অসুস্থ ছিল কিছুদিন, যেদিন মাত্র ভাল বোধ করতে শুরু করলো, সেদিনই টেবিলের কাঁচে পা কেটে আবার কষ্টের ভেতর চলে গেল। ওকে চুপচাপ শুয়ে থাকতে দেখা যে কতোটা কঠিন একটা ব্যপার সেটা যদি লিখে বোঝাতে পারতাম, তাহলে আমার বাংলা ব্যাকরণের শিক্ষকদের যে কাউকে গর্বিত করা যেতো। অথচ ওর সাথে কিন্তু আমার বাস্তব অস্তিত্বের এখনও দেখা হয় নি। তারপরও ওকে দৌড়াদৌড়ি করতে দেখা, মায়ের ড্রেসিং টেবিলের উপর উঠে তার সংসার চালাতে দেখা, খাটজুড়ে লাফঝাপ, এক সোফা থেকে আরেক সোফায় যাওয়া দেখতে দেখতে কখন যে এত বেশি যোগাযোগ ছোট্ট ওই মানুষটা সাথে হয়ে গেছে, বুঝতেই পারি নি আসলে। যাহোক ওর জন্য আমার সব শুভকামনা বরাদ্দ করে দিয়েছি। যা আমি অন্যদের কাছ থেকে পাই, যে অভিলাষের ইষ্টলাভের উদ্দেশ্যেই পাই, সব ও সুস্থ হয়ে ওঠা পর্যন্ত ওই দিকেই ধাবিত হয়ে যাক।
মানুষের শুভকামনার শক্তি অসীম। যখনই কেউ আমার ভাল চেয়ে কিছু আমাকে বলে, তখনই আমি নিজের ভেতর একটা নড়াচড়া টের পাই। মানে মনের ভেতর এক প্রকার প্রভাব জন্ম নেয়। যেটা আমাকে ভাল লাগতে উদ্বুদ্ধ করে। শুভকামনাকে আমি তাই শ্রদ্ধা করি। মনের ভেতর আমি খুব কম মানুষেরই অশুভ কামনা করি। অনেক ভেবেও তেমন কারো কথা মনে করতে পারছি না। সম্ভবত ডোনাল্ড ট্রাম্প আর প্রেসিডেন্ট না থাকলে সেটা তার জন্য অশুভ একটা ব্যাপার হবে, পুরোপুরি যদিও নিশ্চিত না। খুব সম্ভবত আমি চাই সেটা ঘটুক। তার যুদ্ধবাজ আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নীতি আমি সমর্থন করি না।
যাহোক আমার শুভকামনা সবার জন্য। আমার ভাগনীটার জন্য একটু বেশি। আরও অনেক অনেক লেখা নিয়ে হাজির হওয়ার আকাঙ্ক্ষায়, ভাগনী সুস্থ হয়ে ওঠার আশায়, বিদায় জানাই আজকের সময়টুকুকে।
---





মন্তব্য করুন