সামাজিক ব্যাধির সূচকগুলোর একটি
আজকে একটা খবর পড়লাম। আমার কাছে যে ধরনের সংবাদগুলো সামাজিক ব্যাধির সূচক হিসেবে ধরা দেয়। ধর্ম, বর্ণ, গায়ের রং ইত্যাদির যে সংস্কৃতিগুলো বিশ্বজুড়ে মানবমনের গহীনে ব্যাধির মতোন পোঁতা আছে, তেমনি আরেকটা ব্যাধি। তবে আজকের খবরটা বাংলাদেশের একটা পত্রিকারই। মিস্ বাংলাদেশ নিয়ে ওঠা আরেকটি বিয়ের তথ্য গোপন করার সংবাদ।
গতবছর বিজয়ীর বিরুদ্ধে উঠেছিল এ অভিযোগ। আর গতবছর এ অায়োজনের প্রথম আসর হওয়ায় মানুষের নজরও ছিল একটু বেশি। যে কারণে সংবাদটির তথ্যমূল্য খারাপ ছিল না। তারপরও সত্যিকার তথ্যমূল্য আসলে কোথায় ছিল- সেটা নির্ধারণ করতে ভালভাবেই ব্যর্থ হয়েছিল আমাদের গণমাধ্যম। যে কারণে মেয়েটির ব্যক্তিগত জীবনের ঘটনাবলীর, বিশেষতঃ খুব সুখকর নয় ধরনের অভিজ্ঞতাগুলোর- দিনতারিখের যতোটা না বিস্তারিত বর্ণনা পাওয়া যায় সে সময়কার গণমাধ্যম কর্তৃক আঁকা ছবিগুলোতে, আয়োজকদের দুর্বল স্ক্রুটিনাইজ প্রক্রিয়ার ওপর ধারণা পাওয়া যায় তুলনামূলক অনেক কম। প্রতিযোগিতার নিয়ম-কানুন লঙ্ঘন করে একজন মানুষ যে আয়োজনে অংশ নেয়ার সুযোগ পেল, সেটা কার দ্বারা সংঘটিত কারিগরি ত্রুটির কারণে হল- সেটা কিন্তু বেলাশেষে জনমানুষের কাছে অজানাই রয়ে গেল। অথচ এভ্রিল নামটা কম-বেশি আমরা সবাই জানি।
সামাজিক ব্যাধি যেটার কথা বলছিলাম, সেটা এখানেই মূলত উৎসমুখে প্রোথিত। আমরা অনের ব্যক্তিগত জীবনকে খুব আগ্রহ নিয়ে ধারণ করি। নিজের ভেতরে। তাই যেকোন একমাত্র প্রদত্ত সুযোগে আমরা দলবেঁধে অন্যের প্রয়োজনীয় গোপনীয়তা হরিলুটের মচ্ছবে যোগদান করতে একবারও পিছপা হই না। সমাজ আমাদেরকে এটা শেখায়নি। শেখাতে পারেনি। যেকোন ভাবেই হোক, আমরা জানিই না একটা মানুষকে বেড়ে ওঠার সুযোগ না দিলে সে পশু থেকে সত্যিকারের মানুষে রূপান্তরিত হয়ে ওঠার প্রতিযোগিতায় টিকতে পারে না। একটা পুরো জাতি যখন এভাবে প্রতিযোগিতা থেকে ছিটকে পড়ে, তখন নাগরিকেরা চলে যায় রেলিগেশনে। নিচু ধাপের কোনো এক লীগে। যাক, হাই থটের কথা-বার্তা!
গেল বার তাও ছিল প্রথম আসর, উপরন্তু ঘটনার কুশীলব প্রতিযোগিতার বিজয়ী নিজে। সংবাদমূল্য থাকলেও যাকে লক্ষ্যবস্তু বানানো উচিত ছিল তাকে লক্ষবস্তু বানাতে পারে নি বাংলাদেশের সংবাদ মাধ্যম। তার অর্থ আর প্রতিপত্তি ডানা মেলে আছে বহুদূর। এবারে একটি অভিযোগ এসেছে প্রথম দশে থাকা এক প্রতিযোগীর বিরুদ্ধে। যথারীতি বিয়ের তথ্য গোপনের অভিযোগ। যেটাকে নিয়ে ছোট একটা রিপোর্ট করাই যায়, কার কর্তব্যে গাফিলতির কারণে এমনটা আবারও ঘটতে পারলো, সেটা হতে পারে গণমাধ্যম যে সমাজ নিয়ে প্রকৃতই চিন্তা করে তার একটা প্রতিফলন। অথচ রিপোর্টটি ভরা অভিযুক্তের অন্যান্য "প্রাইভেট" ব্যাপার-স্যাপারের দিনতারিখ দিয়ে।
তারচেয়েও গভীর যে দুঃখের কথা, সেটা হচ্ছে আমরা সহানুভূতি হারিয়ে ফেলছি। অভিযুক্তের মায়ের মৃত্যু হয়েছে প্রতিযোগিতার দুই দিন পর। প্রতিযোগিতার দিন তাহলে অভিযুক্তের মনের অবস্থা কি ছিল- সেটা নিয়ে একবারও গণমাধ্যম ভেবেছে কি? ভাবে নি। কারণ, এটা পেশাদার পৃথিবী। মানুষের নিজস্ব জীবনের ঘটনাবলী, এবং সেসবের মধ্যকার সবচেয়ে হৃদয়বিদারকগুলি একটিও যদি চোখের সামনে ঘটতে থাকে, পেশাদার পৃথিবীতে সেটার দিকে তাকানোর নাকি সুযোগ নেই।
আসলেই কি নেই? সত্যিকার পেশাদাররা কি অন্যের জীবনের শেকড়ের সাথে জড়িয়ে থাকা কষ্টকে এই ভাবে না দেখে কাটাঁ-ছেড়া করে? আসলেই কি তার দরকার পড়ে? আমরা করে সত্যিকারের সভ্য হবো?
একবার হাসিমুখে কাউকে শুধুই কেমন আছো জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করে। শুধুই কেমন আছো।
---





মন্তব্য করুন