বাদুড় হয়ে উড়ে যাওয়া অনুভূতিগুলোর একটির কথা
ঘুরতে ঘুরতে আরও একটি নভেম্বর চলে এসেছে। আর ক'টা দিন পর ২০১৮ খ্রিস্টাব্দটিও 'কালের গর্ভে' চলে যাবে। পৃথিবীর আহ্নিক আর বার্ষিক গতির বেগ কখনোই এক লাফে বাড়ে না, খুব ধীরগতিতে বাড়ে; কিন্তু যতো আমরা বুড়ো হই ততো আমাদের মনে হতে থাকে, সময় যেন আগের চেয়ে দ্রুতগতিতে ফুরিয়ে যাচ্ছে!
এখন আর সবকিছুতে আলসেমীর ইচ্ছেটা আগের মতো তীব্রভাবে জাগে না। এক সময় আলসেমীটাকে খুব কাছের বন্ধু মনে করতাম। নিজেকে একজন "প্রোক্যাস্টিনেটর" হিসেবে জাহির করার মধ্যে একগাদা আনন্দ ধরা দিতো। আজকাল অকারণে খরচা হয়ে যাওয়া সেইসব সময় বড় নির্মমভাবে মুখ ভ্যাংচায়। সেই ভ্যাংচানির জবাবগুলোও আমাকে চুপচাপ হজম করে নিয়ে পথ চলতে হয়। জীবনের ৩৩তম বছরে এসে, ক্ষেত্রবিশেষে যখন নিজেকে ১৮-১৯ বছর বয়েসীদের সাথে পাল্লায় নিযুক্ত দেখি- তখন মনে হয় আমার ১৯ বছর বয়সে আমি কতোই না নির্দয়ভাবে নিজেকে ঠকিয়েছিলাম! সুযোগ ছিল কতকিছু করার। অথচ কিছুই না করে, সম্ভাবনার একরের পর একর বিস্তৃত জমির পাকা ধানে, ক্রমাগত মই জুগিয়ে প্রতিদিন বেলা একটা-দেড়টা পর্যন্ত পড়ে পড়ে ঘুমিয়েছি!
হারানো সময় নিয়ে হাহাকারের উদ্দেশ্যে যেমন লেখাটি শুরু হয় নি, তেমনি আবার কোনো নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য সামনে রেখেও লেখাটি শুরু হয় নি। তবে শিরোনাম থেকে আঁচ করা সম্ভব যে, এই লেখার একটি সঙ্গমোত্তীর্ণ বীজ রয়েছে। বীজটার অঙ্কুরোদ্গমের পথ করে দেবার জন্য মনে মনে একটা লাইন খুঁজছিলাম অনেকক্ষণ ধরে, দু'একবার চেষ্টা করে কিছু না পেয়ে একসময় প্রায় হাল ছেড়ে দিয়েছিলাম। তারপর বের হলো প্রথম প্যারাটা। ওটা লেখার পর এখন একটু একটু করে আরও লেখা বের হচ্ছে। দেখি কতোদূর বের হয়। কিছুদিন আগে পশ্চিম বাংলার লেখক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়কে বলতে শুনেছি, তিনি নাকি সাধারণত এভাবে লেখেন। শীর্ষেন্দুর সবধরনের লেখাই আমার ভাল লাগে। ছেলেবেলার ভাললাগাটা এখনও রয়ে গেছে। সময়সুযোগ পেলে ওঁর কিশোর উপন্যাসগুলো পড়া হয় এখনও। ওঁর লেখার যে দিকটি আমাকে বিশেষ আকর্ষণ করে সেটি হচ্ছে- ছোট একটা বিষয়কেও অনেক বড় আর আকর্ষণীয় করে তুলে ধরার ক্ষমতা। যেমন, ওঁর 'সাদা বেড়াল কালো বেড়াল' বইয়ের একটি প্রধান চরিত্র প্রতিদিন সকালে ১০ মিনিট শরীরচর্চা করে। প্রতিদিন ১০ মিনিট খুব বেশি সময় না, তারপরও ওই ছোট্ট অংশটুকু আমার মনে গেঁথে আছে আজ কত বছর ধরে তার সঠিক গণনা নেই কিন্তু ১০ বছরের কম হবে না!
২০১৮ সালের বিদায়ঘন্টা বাজছে বেশ ভালভাবেই। শীতের দেশগুলোয় বরফ পড়া শুরু হয়েছে। খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীদের দেশগুলোয় বড়দিনের আয়োজন শুরু হয়েছে। আর আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বাড়ির ছাদে পার্টির করার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন। যেমন কুকুর, তেমন মুগুর। জার্মানির শহরগুলোতে এই সময়ের একটা অন্যতম সুন্দর দৃশ্য হচ্ছে 'ভাইনাখ্টমার্ক্ট' বা 'ক্রিস্মাস্ মার্কেট' বা 'বড়দিনের বাজার'। আমাদের দেশের ঈদের মার্কেটের মতোই ব্যাপারটা। পরিসরটা শুধু বিস্তৃত। কেনাকাটার পাশাপাশি নানান আনন্দ আয়োজন ভাইনাখ্টমার্ক্টের সৌন্দর্যকে ভিন্নমাত্রা জুগিয়ে সমৃদ্ধ করে। ধোঁয়া ওঠা গরম মশলাদার ওয়াইনের পেয়ালা, দস্তানাপরা হাত, গলা ঢাকা মাফলার, হাঁটুছোঁয়া ম্যান্টল- এ ধরনের ছবিগুলোর আরও গাঢ় হয়ে ধরা দেবার; বেশি দিন বাকি নেই আর।
সেদিন এক বন্ধু ইনস্টাগ্রামের ছবিতে মন্তব্যের মাধ্যমে জানালো, আমি খুব 'গ্রেসফুলি' বুড়ো হচ্ছি। এই বাক্য একইসাথে ভাল ও খারাপ লাগার অনুভূতি তৈরি করেছিল মনে। ভাল লাগার অনুভূতিটাকে রেখে খারাপ লাগার অনুভূতিটাকে ভাগিয়ে দিয়েছি। যদিও যেতে চাচ্ছিল না সহজে। অনেকক্ষণ চুপচাপ জানালার কার্নিশে বসে ছিল যাওয়ার আগে। তারপর এক সময় ঝুপ করে অন্ধকারে লাফ দিয়ে হারিয়ে গেল। খানিকপরে অবশ্য আবারও ভেসে উঠেছিল জানালা থেকে একটু দূরে বাতাসের মধ্যে। বাদুড়ের মতো ডানা দু'টো প্রসারিত করে সজল চোখে একবার আমার দিকে পূর্ণদৃষ্টিতে তাকিয়ে, চূড়ান্ত উড়ালটা দিয়ে অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল চোখের সীমানা থেকে। আর আমি আরেকবার জানতে পেরেছিলাম, মাঝে মাঝে কিছু চিরসত্য বিষয়ও মেনে নিতে কষ্ট হয়। মানবমন বড়ই অদ্ভুত।
তারপরও জীবনে এমন অনেক ছোট-বড় ব্যাপারই থাকে যেগুলো মেনে নেয়া ছাড়া উপায় থাকে না। আজ থেকে পাঁচ বছর আগে জীবনটা একরকম ছিল, এখন সেটা পুরোপুরি পরিবর্তিত হয়ে অন্যরকম চেহারা পেয়েছে। পাঁচ বছর পর যদি বেঁচে থাকি, তাহলে জীবনটা আরেকটা ভিন্ন চেহারা পাবে। সেই ভিন্নতা যেন আজকের ভিন্নতার মতো বেশি পরিমাণ কষ্ট আর অল্প পরিমাণ ভাললাগা নিয়ে হাজির না হয়, বরং উল্টোবিন্যাস নিয়ে হাজির হতে পারে- সেই চেষ্টায় আছি খুব তোড়জোড় সহকারে। পাশাপাশি আজকের ভিন্নতাটুকুর জন্যও আমি কৃতজ্ঞ। যতোটুকু পথ পাড়ি দিতে পেরেছি, তার জন্য কৃতজ্ঞ পৃথিবীর সবার কাছে। প্রাচুর্যের মধ্যে বড় হয়েও শুধুমাত্র নিজের খামখেয়ালী আর ধ্বংসাত্মক চরিত্রের কারণে পথেঘাটে হাটুরে কিল খেতে খেতে প্রায় নষ্ট হতে বসা একটা জীবনকে, আজ অন্তত চিন্তা-ভাবনার জালে আটকে ফেলতে পেরেছি- এটাই বা কম কিসে!
আমার আরও অনেক অনেক পথ পাড়ি দেয়ার ইচ্ছে আছে, কেননা এখনও জীবনের তেমন কোনো লক্ষ্যই পূরণ করা সম্ভব হয় নি। সেই ইচ্ছের পেছনে শ্রম জোগানোর আকাঙ্ক্ষাও আছে। শুধু ভাগ্যদেবীর কাছ থেকে একটা সুযোগ লাভের আশায় মাঝসমুদ্রে ঝড়ের ভেতর আমার ছোট তরীর হাল ধরে বসে আছি।
জানি না আগামীকালটা কি নিয়ে অপেক্ষা করছে, কিংবা আগামী সপ্তাহ, মাস, ও বছরটা। এই না জানাটাই আমার কানে কানে যেন সবসময় বলে যাচ্ছে, শুধু হালটাকে সোজা করে ধরে রাখো রকি, শুধু হালটাকে সোজা করে ধরে রাখো। মনটাকে সরে যেতে দিও না তার লক্ষ্যের কেন্দ্রবিন্দু থেকে।
আমার চেষ্টাটাও সেখানেই। রাত যতো গভীর হয়, ভোর ততো এগিয়ে আসে- কথাটা অতীতের মণীষীরা নানাভাবে এত বেশিবার বলে গেছেন যে ওটাকে বিশ্বাস করেই আমাকে পথ চলতে হয়। ওটাতে বিশ্বাস করেই আমি সাহস আর শক্তি পাই।
গতবছর ডিসেম্বর মাসে ইতালির ছোট্ট এক দ্বীপে বেড়াতে গিয়েছিলাম। সাহেবগোষ্ঠীর উপনিবিষ্ট পূর্বপুরুষের রক্ত মাঝে মাঝে কথা বলে ওঠে। তেমনি কথা বলে উঠেছিল ওখানে এক শ্বেতাঙ্গিনীকে অ্যাড্রিয়াটিক সাগরের পাড়ে বসে অঝোর ধারায় কাঁদতে দেখে। তাই গিয়ে তার মন ভাল করার জন্য কিছু উসখুসে আলাপ করার চেষ্টা চালিয়েছিলাম। যেটা হয়তো করা হতো না যদি সেই ব্যক্তিটি সাহেবগোষ্ঠীর বংশধর না হয়ে আমার মতোই আরেকজন উপনিবিষ্টের বংশধর হতেন। তবে আমার সেই চেষ্টার মূল ও একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল উক্ত ব্যক্তির মনকে হালকা করা। প্রচেষ্টা কাজে দেয় নি। বরং সে আরও বিরক্ত হয়ে যেখানে বসেছিল, সেখান থেকে উঠে অন্যত্র চলে গিয়েছিল।
ছোট্ট একটা ব্যর্থতার উদাহরণ দিলাম। জীবনটা ভরা এমন অসংখ্য ছোট-বড় ব্যর্থতায়। মাঝে মাঝে তারার মতো যেসব খুশির খবর ঝলমল করে, তাদের সংখ্যা বয়সের অনুপাতে কমেই চলছে শুধু। কষ্টটা ওখানেই। অনুপাতটা যদি সবসময় ধ্রুবক থাকতো তাহলে নিজের যাপিত জীবনটা নিয়ে একটা ফাটাফাটি রোমাঞ্চ- আর উচ্চাটন-রসে ভরপুর বই লেখা যেত, কিংবা বানানো যেত চলচ্চিত্র। এখন কিছু করলে যেটা হবে, সেটা হচ্ছে খুব সাধারণ একজন মানুষের জীবন। যাকে সৌভাগ্যক্রমে ৩৩ তম বছরে এসেও কারও দায়দায়িত্ব নিয়ে হয় নি শুধু আংশিক নিজেরটা ছাড়া। অপরদিকে দুভার্গ্যক্রমে ৩৩ তম বছরেও সে তেমন উল্লেখযোগ্য কোনকিছু অর্জন করতে পারে নি শুধু কিছু মানুষের অকৃত্রিম ভালবাসা ছাড়া। তবে তাতে সে খুশিও বটে!
আমি সত্যি কোনোদিন সুযোগ পেলে নিজের জীবনীটা লিখে ফেলবো। অন্য কারও জন্য নয়, আমার নিজের জন্য। আমি আমার নিজের জন্য এই একটা কাজই শুধু করতে চাই। আর বাকি সবকিছু করতে চাই- পৃথিবী, প্রকৃতি আর পরিবারের জন্য। এই চাওয়াটা কি খুব বেশি চাওয়া?
ভবিষ্যত কি সাজিয়ে রেখেছে তা হয়তো জানি না, কিন্তু অতীত যে সবসময় আমায় সামনের দিকে ঠেলে দিয়েছে তা জানি। প্রতিটা দিনকে তাই অতীতের গর্ভে চলে যেতে দেখার যে মিশ্র অনুভূতি, তা আমার কাছে অতুলনীয়। এই অনুভূতির লোভে ঘুম ভেঙ্গে যায় শীত-গ্রীষ্ম, শরৎ-হেমন্ত সব ঋতুতে। ইংরেজিতে একটা কথা আছে, লাইফ-লাভার। যার মানে হচ্ছে, এমন কেউ যে তার জীবনকে সর্বাবস্থায় ভালবাসে। আমরা সবাই-ই বোধহয় লাইফ-লাভার। চূড়ান্ত হতাশ যে মানুষটি রেললাইনের ওপর শেষবারের মতো শুয়ে পড়ার উদ্দেশ্যে পা বাড়িয়েছে- তার মধ্যেও জীবনের কাছ থেকে অনেক কিছু চাওয়ার আছে। সেই চাওয়ার সাথে পাওয়ার পার্থক্য এত বেশি যে, সে সেই ভার আর বহন করতে অপারগতা ঘোষণা করেছে। সেই ব্যক্তির সাথে আমার মৌলিক পার্থক্যটা শুধু সাহসের জায়গায়। তার মতো সাহসী হয়ে নিজের জীবনটাকে প্রচণ্ড চাপের মুখেও আমি বিসর্জন দিয়ে দিতে পারবো না। তবে তার কষ্টটা আমি প্রায় সমানহারেই অনুধাবন করতে পারি। কিংবা বলা ভাল প্রয়োজন হলে পারবো।
জীবনের প্রতি ভালবাসাই আমার অগোছালো চিন্তারাজিকে গুছিয়ে আনার প্রক্রিয়ার উদ্বোধন ঘটিয়েছে। জীবনের রং যতোদূর পর্যন্ত ছড়িয়ে দেয়া সম্ভব সেই লক্ষ্যে পা বাড়ানোর সাহস জুগিয়েছে। চরম হতাশা আর চরম আশাবাদকে একই বুকের ভেতর পুষে রাখার শক্তি দিয়েছে। আর কি চাই, তাই না?
বেঘোড়ে কোথাও হুট করে মরে না গেলেই আমি খুশি আসলে!!!
---





মন্তব্য করুন